যাহোক, দুই তিনটা জেলা ছাড়া জেলা কমিটিও গঠন হয় নাই। প্রতিষ্ঠান গড়ার সুযোগ এসেছে। সাহস করে কাজ করে যেতে পারলে প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। কারণ, জনগণ এখন মুসলিম লীগ বিরোধী হয়ে গেছে। আর আওয়ামী লীগ এখন একমাত্র বিরোধী দল, যার আদর্শ আছে এবং নীতি আছে। তবে সকলের চেয়ে বড় অসুবিধা হয়েছে টাকার অভাব।
এদিকে মুসলিম লীগের কাগজগুলি শহীদ সাহেবের বিবৃতি এমনভাবে বিকৃত করে ছাপিয়েছে যে মনে হয় তিনিও উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হোক এটাই চান। আমি সাধারণ সম্পাদক হয়েই একটা প্রেস কনফারেন্স করলাম। তাতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে হবে, রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে হবে এবং যাঁরা ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ হয়েছেন তাঁদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দান এবং যারা অন্যায়ভাবে জুলুম করেছে তাদের শাস্তির দাবি করলাম। সরকার যে বলেছেন, বিদেশী কোন রাষ্ট্রের উসকানিতে এই আন্দোলন হয়েছে, তার প্রমাণ চাইলাম। হিন্দু ছাত্ররা’ কলকাতা থেকে এসে পায়জামা পরে আন্দোলন করেছে, একথা বলতেও কৃপণতা করে নাই মুসলিম লীগ নেতারা। তাদের কাছে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ছাত্রসহ পাঁচ ছয়জন লোক মারা গেল গুলি খেয়ে, তারা সকলেই মুসলমান কি না? যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের মধ্যে শতকরা নিরানব্বইজন মুসলমান কি না? এত ছাত্র কলকাতা থেকে এল, একজনকেও ধরতে পারল না যে সরকার, সে সরকারের গদিতে থাকার অধিকার নাই। পার্টির কাজে আতাউর রহমান খান সাহেবের কাছ থেকে সকল রকম সাহায্য ও সহানুভূতি আমি পেয়েছিলাম। ইয়ার মোহাম্মদ খানও আমাকে সাহায্য করেছিলেন কাজ করতে। আমরা এক আলোচনা সভা করলাম, তাতে ঠিক হল আমাকে করাচি যেতে হবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের সাথে সাক্ষাৎ করে রাজবন্দিদের মুক্তির দাবি করতে হবে। শহীদ সাহেবের সাথেও আলাপ-আলোচনা করা দরকার। তার সাহায্য আমাদের খুব প্রয়োজন।
৬৮.
পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাব, সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও করাচিতে আওয়ামী লীগ গঠন করা হয়েছে। তবে নবাব মামদোতের দল জিন্নাহ মুসলিম লীগে যোগদান করায়, জিন্নাহ আওয়ামী মুসলিম লীগ করা হয়েছে পাবে। আমরা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি সভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমাদের প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করব না। জিন্নাহ সাহেবের নাম কোন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে রাখা উচিত না। কোনো লোকের নামেই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হতে পারে না। আমাদের ম্যানিফেস্টোও আমরা পরিবর্তন করব না। তখন পর্যন্ত আমরা এফিলিয়েশন নেই নাই। সোহরাওয়ার্দী সাহেব তাতে অসন্তষ্ট হয়েছেন। এ সমস্ত বিষয় নিয়েও তার সাথে আলোচনা করা দরকার হয়ে পড়েছে। তিনি আমাকে চিঠিও লিখেছেন হায়দ্রাবাদ (সিন্ধু) থেকে। তখন তিনি ‘পিন্ডি কন্সপিরেসি’ মামলার আসামিদের পক্ষ সমর্থন করছিলেন। মে মাসে আমি করাচি পৌঁছালাম। আমাকে করাচি আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহমুদুল হক ওসমানী ও জেনারেল সেক্রেটারি শেখ মরুল হক দলবল নিয়ে অভ্যর্থনা করল। আমি ওসমানী সাহেবের বাড়িতে উঠলাম। আওয়ামী লীগ কর্মীদের এক সভা ডাকা হয়েছিল। সেখানে আমাকে ইংরেজিতেই বক্তৃতা করতে হল। উর্দু বক্তৃতা আমি করতে পারতাম না, তাঁরাও বাংলা বুঝতেন না।
আমি পৌঁছেই খাজা সাহেবের কাছে একটা চিঠি পাঠালাম, তার সাথে দেখা করার অনুমতি চেয়ে। তিনি আমার চিঠির উত্তর দিলেন এবং সময় ঠিক করে দিলেন দেখা করার অনুমতি দিয়ে।
আমানুল্লাহ নামে এক বাঙালি ছাত্র করাচিতে লেখাপড়া করত, সে আমার সেক্রেটারি হিসাবে সকল কাজকর্ম করে দিত। সর্বক্ষণ আমার সাথেই থাকত। সে করাচি আওয়ামী লীগের সভ্যও ছিল। সমস্ত কাজ করতে পারত, কোনো বিশ্রামের প্রয়োজন তার ছিল না বলে মনে হত। করাচির কফি হাউসই ছিল করাচির রাজনৈতিক কর্মীদের প্রধান আড্ডাখানা। সেখানেও সে আসর গরম করে রাখত এবং একাই লড়ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য। জনাব ওসমানী ও মর ঠিক করল আমাকে এক প্রেস কনফারেন্স করে পূর্ব পাকিস্তানে কি ঘটেছিল এবং কি ঘটছে তা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করতে হবে এখানে। কারণ, পশ্চিম পাকিস্তানে একতরফা প্রপাগান্ডা হয়েছে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সম্বন্ধে।
আমি যথাসময়ে প্রধানমন্ত্রী খাজা সাহেবের সাথে দেখা করতে তাঁর অফিসে হাজির হলাম। প্রধানমন্ত্রীর এ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি মিস্টার সাজেদ আলী আমাকে অভ্যর্থনা করলেন। তাকে আমি পূর্ব থেকে জানতাম, তিনি কলকাতার বাসিন্দা। পূর্বে তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রীর পিএ ছিলেন। আমাকে নিয়ে বসালেন তার কামরায়। আমার জন্য বিশ মিনিট সময় ধার্য করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। আমাকে খাজা সাহেব তার কামরায় নিজে এগিয়ে এসে নিয়ে বসালেন। যথেষ্ট ভদ্রতা করলেন, আমার শরীর কেমন? আমি কেমন আছি, কতদিন থাকব—এইসব জিজ্ঞাসা করলেন। তিনিও জানতেন, ব্যক্তিগতভাবে তাকে আমি শ্রদ্ধা করি। আমি যে একজন ভাল কর্মী সে কথা তিনি নিজেই স্বীকার করতেন এবং আমাকে স্নেহও করতেন। আমি তাকে অনুরোধ করলাম, “মওলানা ভাসানী, শামসুল হক, আবুল হাশিম, মওলানা তর্কবাগীশ, খয়রাত হোসেন, খান সাহেব ওসমান আলীসহ সমস্ত কর্মীকে মুক্তি দিতে। আরও বললাম, জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি বসাতে, কেন গুলি করে ছাত্রদের হত্যা করা হয়েছিল?” তিনি বললেন, “এটা প্রাদেশিক সরকারের হাতে, আমি কি করতে পারি?” আমি বললাম, “আপনি মুসলিম লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী, আর পূর্ব বাংলায়ও মুসলিম লীগ সরকার, আপনি তাদের নিশ্চয়ই বলতে পারেন। আপনি তো চান না যে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হোক, আর আমরাও তা চাই না। আমি করাচি পর্যন্ত এসেছি আপনার সাথে দেখা করতে, এজন্য যে প্রাদেশিক সরকারের কাছে দাবি করে কিছুই হবে না। তারা যে অন্যায় করেছে সেই অন্যায়কে ঢাকবার জন্য আরও অন্যায় করে চলেছে।” তিনি বিশ মিনিটের জায়গায় আমাকে এক ঘণ্টা সময় দিলেন। আমি তাকে বললাম যে, “আওয়ামী লীগ বিরোধী পার্টি। তাকে কাজ করতে সুযোগ দেওয়া উচিত। বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র চলতে পারে না। আপনি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তা আমি জানি।” তিনি স্বীকার করলেন, আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল। আমি তাঁকে বললাম, “আওয়ামী লীগ বিরোধী দল আপনি স্বীকার করে নিয়েছেন, একথা আমি খবরের কাগজে দিতে পারি কি না?” তিনি বললেন, “নিশ্চয়ই দিতে পার।” তিনি আমাকে বললেন, প্রদেশের কোন কাজে তিনি হস্তক্ষেপ করেন না, তবে তিনি চেষ্টা করে দেখবেন কি করতে পারেন। আমি তাকে আদাব করে বিদায় নিলাম। তিনি যে আমার কথা ধৈর্য ধরে শুনেছেন এ জন্য তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। দুই দিন পরে প্রেস কনফারেন্স করলাম। আমার লেখা বিবৃতি পাঠ করার পরে প্রেস প্রতিনিধিরা আমাকে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন, অনেক প্রশ্নই আমাকে করলেন। আমি তাদের প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পেরেছিলাম এবং পূর্ব বাংলার অবস্থা তাদের বুঝিয়ে বলতে পেরেছিলাম। এখানে এক প্রশ্নের উত্তরে তাদের বলেছিলাম, “প্রায় ত্রিশটা উপনির্বাচন বন্ধ করে রাখা হয়েছে। যে কোন একটায় ইলেকশন হোক, আমরা মুসলিম লীগ প্রার্থীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করতে সক্ষম হব।”
