অনেক আলোচনার পরে তিনি মানতে রাজি হলেন এবং নিজ হাতে তার সম্মতির কথা লিখে দিলেন। কারণ, আমাকে ফিরে যেয়ে ওয়ার্কিং কমিটির সভায় তা পাস করিয়ে এফিলিয়েশনের জন্য দরখাস্ত করতে হবে। আমি বললাম, “আপনার হাতের লেখা থাকলে কেউই আর আপত্তি করবে না। মওলানা সাহেবের সাথে জেলে আমার কথা হয়েছিল। তাতে আমাদের ম্যানিফেস্টো, নাম ও গঠনতন্ত্র মেনে নিলে এফিলিয়েশন নিতে তার আপত্তি নাই।” আমি আর একটা অনুরোধ করলাম, তাকে লিখে দিতে হবে যে, উর্দু ও বাংলা দুইটাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসাবে তিনি সমর্থন করেন। কারণ অনেক ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেছে। মুসলিম লীগ এবং তথাকথিত প্রগতিবাদীরা প্রপাগান্ডা করছেন তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি বললেন, “নিশ্চয়ই লিখে দেব, এটা তো আমার নীতি ও বিশ্বস।” তিনি লিখে দিলেন।
মামলা শেষ হলেই তিনি পূর্ব পাকিস্তানে আসবেন, কথা দিলেন। বললেন, এক মাস থাকবেন এবং প্রত্যেকটা জেলায় একটা করে সভার ব্যবস্থা করতে হবে। সময় নষ্ট করা। যাবে না। তবে বিপদ হয়েছে, কতদিন এই মামলা চলে বলা যায় না। তাকে যখন জিজ্ঞাসা করলাম, “পিডি ষড়যন্ত্র মামলা সত্য কি না? আসামিদের রক্ষা করতে পারবেন কি না? আর ষড়যন্ত্র করে থাকলে তাদের শাস্তি হওয়া উচিত কি না?” তিনি বললেন, “ওসব প্রশ্ন কর না, আমি কিছুই বলব না, কারণ এডভোকেটদের শপথ নিতে হয়েছে, কোন কিছু কাউকেও না বলতে এ মামলা সম্বন্ধে। তিনি একটু রাগ করেই বললেন, আমি চুপ করে গেলাম।
বিকালে করাচি রওয়ানা করলাম, শহীদ সাহেব নিজে গাড়ি চালালেন, আমি তার পাশেই বসলাম। পিছনে আরও কয়েকজন এডভোকেট বসলেন। রাস্তায় এডভোকেট সাহেবরা আমাকে পূর্ব বাংলার অবস্থার কথা জিজ্ঞাসা করলেন। বাংলা ভাষাকে কেন আমরা রাষ্ট্রভাষা করতে চাই? হিন্দুরা এই আন্দোলন করছে কি না? আমি তাদের বুঝাতে চেষ্টা করলাম। শহীদ সাহেবও তাঁদের বুঝিয়ে বললেন এবং হিন্দুদের কথা যে সরকার বলছে, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা তা তিনিই তাঁদের ভাল করে বুঝিয়ে দিলেন। আমার কাছে তাঁরা নজরুল ইসলামের কবিতা শুনতে চাইলেন। আমি তাঁদের কে বলে তোমায় ডাকাত বন্ধু’, ‘নারী’, সাম্যআরও কয়েকটা কবিতার কিছু কিছু অংশ শুনালাম। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কবিতাও দু’একটার কয়েক লাইন শুনালাম। শহীদ সাহেব তাদের ইংরেজি করে বুঝিয়ে দিলেন। কবিগুরুর কবিতার ইংরেজি তরজমা দু’একজন পড়েছেন বললেন। আমাদের সময় কেটে গেল। আমরা সন্ধ্যারাতেই করাচি পৌঁছালাম। শহীদ সাহেব আমাকে ওসমানী সাহেবের বাড়িতে নামিয়ে দিলেন এবং সকালে ১৩ নম্বর কাচারি রোডে যেতে বললেন।
তাঁর সাথে দেখা করতে গেলে তিনি বললেন, আমাকে লাহোর হয়ে ঢাকায় যেতে। তিনি লাহোরে খাজা আবদুর রহিম বার-এট-ল এবং রাজা হাসান আখতারকে টেলিগ্রাম করে দিবেন বললেন। লাহোরেও প্রেস কনফারেন্স করতে এবং কর্মীদের সাথে আলোচনা করতে বললেন। অনেক দিন হয়ে গেছে, দেরি না করে ট্রেনে আমি লাহোর রওয়ানা করলাম। খাজা আবদুর রহিম পূর্বে আইসিএস ছিলেন (তখন ওকালতি করেন), ধুবই ভদ্রলোক। আমাকে তার কাছে রাখলেন, জাভেদ মঞ্জিলে’। তিনি জাভেদ মঞ্জিলে থাকতেন। জাভেদ মঞ্জিল’ কবি আল্লামা ইকবালের বাড়ি। কবি এখানে বসেই পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আল্লামা শুধু কবি ছিলেন না, একজন দার্শনিকও ছিলেন। আমি প্রথমে তার মাজার জিয়ারত করতে গেলাম এবং নিজকে ধন্য মনে করলাম। আল্লামা যেখানে বসে সাধনা করেছেন সেখানে থাকার সুযোেগ পেয়েছি!
খাজা সাহেব ও লাহোরের শহীদ সাহেবের ভক্তরা প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করলেন। আমি অনেকের সাথে দেখা করেছিলাম। হামিদ নিজামীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। পূর্বে যখন লাহোর এসেছিলাম, তিনি আমাকে খুব আদর আপ্যায়ন করেছিলেন। তিনি নিজেই প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত থাকবেন বললেন এবং সকলকে ফোন করে দিলেন। প্রেস কনফারেন্সে সমস্ত দৈনিক কাগজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এমনকি এপিপি’র প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন। আমার বক্তব্য পেশ করার পরে আমাকে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন, আমি তাদের প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পেরেছিলাম। আমরা যে উর্দু ও বাংলা দু’টাই রাষ্ট্রভাষা চাই, এ ধারণা তাঁদের ছিল না। তাদের বলা হয়েছে শুধু বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করছি আমরা। পাকিস্তান আন্দোলনে যে সমস্ত নেতা ও কর্মী মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানের জন্য কাজ করেছে তারাই আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠান গড়েছে তা আমি প্রমাণ করতে পেরেছিলাম। আমি যখন এক এক করে নেতাদের নাম বলতে শুরু করলাম তখন তারা বুঝতে পারলেন বলে মনে হল। লাহোরের আওয়ামী লীগ নেতারা আমাকে অনেক ধন্যবাদ দিলেন। আমি তাঁদের বললাম, আমি মুখে যা বলি, তাই বিশ্বাস করি। আমার পেটে আর মুখে এক কথা। আমি কথা চাবাই না, যা বিশ্বাস করি বলি। সেজন্য বিপদেও পড়তে হয়, এটা আমার স্বভাবের দোষও বলতে পারেন, গুণও বলতে পারেন। একটা কথা লাহোরে পরিষ্কার করে বলে এসেছিলাম, ইলেকশন হলে খবর পাবেন মুসলিম লীগের অবস্থা। তারা এমনভাবে পরাজিত হবে যা আপনারা ভাবতেও পারবেন না।
৭০.
এক বিপদ হল, সাত দিন পরে একদিন প্লেন লাহোর থেকে ঢাকায় আসে। তিন দিন পরে যে প্লেন ছাড়বে সে প্লেনে যাওয়ার উপায় নাই। কাজ শেষ হয় নাই, আর টিকিটও পাওয়া যাবে না। পরের সপ্তাহেও প্লেন যাবে না, শুনলাম প্রায় সতের-আঠার দিন আমাকে লাহোরে থাকতে হবে। খাজা আবদুর রহিম ও রাজা হাসান আখতার রাওয়ালপিন্ডি ও মারী বেড়াতে যাবেন। আমাকেও যেতে বললেন। আমি রাজি হলাম। একদিন রাওয়ালপিন্ডিতে দেরি করে দেখে নিলাম আমাদের মিলিটারি হেডকোয়ার্টার্স, আরও দেখলাম সেই পার্ক–যে পার্কে লিয়াকত আলী খানকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। পরের দিন সকালে মারী পৌঁছালাম। মারীতে রীতিমত শীত। গরম কাপড় প্রয়োজন, রাতে কম্বলের দরকার হয়েছিল। রাওয়ালপিন্ডির গরমে আমার মুখ আগুনে পুড়লে যেমন গোটা গোটা হয়, তাই দু’একটা হয়েছিল। মারী পিন্ডি থেকে মাত্র ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ মাইল দূরে, কিন্তু কি সুন্দর আবহাওয়া! বড় আরাম লাগল। পাহাড়ের উপর ছোট্ট শহর। পাঞ্জাবের বড় বড় জমিদার ও ব্যবসায়ীদের অনেকের নিজেদের বাড়ি আছে। গরমের সময় ছেলেমেয়ে নিয়ে মারতে থাকেন। আমার খুব ভাল লাগল। সবুজে ঘেরা পাহাড়গুলি, তার উপর শহরটি। একদিন থাকলাম, ইচ্ছা হয়েছিল আরও কিছুদিন থাকি। পরের দিনই আমাদের চলে আসতে হল। লাহোরে পীর সালাহউদ্দিন আমার সাথী ছিলেন। তাঁকে নিয়ে ঘোরাফেরা করতাম। নওয়াই ওয়াক্ত, পাকিস্তান টাইমস, ইমরোজ ও অন্যান্য কাগজে আমার প্রেস কনফারেন্সের বক্তব্য খুব ভালভাবে ছাপিয়েছিল। সরকার সমর্থক কাগজগুলি আমার বক্তব্যের বিরুদ্ধে সমালোচনাও করেছিল। আমি রাষ্ট্রভাষা বাংলা, রাজবন্দিদের মুক্তি, গুলি করে হত্যার প্রতিবাদ, স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক সমস্যার উপর বেশি জোর দিয়েছিলাম।
