ভরসা হল, আর দমাতে পারবে না। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা না করে উপায় নাই। এই আন্দোলনে দেশের লোক সাড়া দিয়েছে ও এগিয়ে এসেছে। কোনো কোনো মওলানা সাহেবরা ফতোয়া দিয়েছিলেন বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে। তারাও ভয় পেয়ে গেছেন। এখন আর প্রকাশ্যে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না। জনমত সৃষ্টি হয়েছে, জনমতের বিরুদ্ধে যেতে শোষকরাও ভয় পায়। শাসকরা যখন শোষক হয় অথবা শোষকদের সাহায্য করতে আরম্ভ করে তখন দেশের ও জনগণের মঙ্গল হওয়ার চেয়ে অমঙ্গলই বেশি হয়।
৬৭.
মার্চ মাস পুরাটাই আমাকে বাড়িতে থাকতে হল। শরীরটা একটু ভাল হয়েছে, কিন্তু হার্টের দুর্বলতা আছে। আব্বা আমাকে ছাড়তে চান না। ডাক্তারও আপত্তি করে। রেণুর ভয় ঢাকায় গেলে আমি চুপ করে থাকব না, তাই আবার গ্রেফতার করতে পারে। আমার মন রয়েছে ঢাকায়, নেতারা ও কমারা সকলেই জেলে। সংগ্রাম পরিষদের নেতারা গোপনে সভা করতে যেয়ে সকলে একসাথে গ্রেফতার হয়ে গেছে। ছাত্রলীগের নেতা ও কর্মীরা অনেকেই জেলে বন্দি। আওয়ামী লীগের কাজ একেবারে বন্ধ। কেউ সাহস করে কথা বলছে না। লীগ সরকার অত্যাচারের স্টিমরোলার চালিয়ে দিয়েছে। যা কিছুই হোক না কেন বসে থাকা চলবে না।
এই সময় মানিক ভাইয়ের কাছ থেকে একটা চিঠি পেলাম। তিনি আমাকে অতিসত্বর ঢাকায় যেতে লিখেছেন। চিকিৎসা ঢাকায়ই করা যাবে এবং ঢাকায় বসে থাকলেও কাজ হবে। আমি আব্বাকে চিঠিটা দেখালাম। আব্বা চুপ করে থাকলেন কিছু সময়। তারপর বললেন, যেতে চাও যেতে পার। রেণুও কোনো আপত্তি করল না। টাকা পয়সারও দরকার। খবর পেয়েছি, আমার বিছানাপত্র কাপড়চোপড় কিছুই নেই। আবার নতুন করে সকল কিছু কিনতে হবে। আব্বাকে বললাম, খাট, টেবিল-চেয়ার, বিছানাপত্র সকল কিছুই নতুন করে কিনতে হবে। আমার কিছু টাকার দরকার। কয়েক মাসের খরচও তো লাগবে। ঢাকা থেকে আবদুল হামিদ চৌধুরী ও মোল্লা জালালউদ্দিন খবর দিয়েছে তাঁতীবাজারে একটা বাসা ভাড়া নিয়েছে। আমি তাদের কাছে উঠতে পারব। ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে আর উঠতে চাই না, কারণ সেখানে এত লোক আসে যায় যে, নিজের বলতে কিছুই থাকে না। তবে ওখানে থাকার আকর্ষণও আছে। শওকত মিয়ার মত মুরব্বি থাকলে চিন্তা করতে হয় না। আমার শরীর ভাল না, চিকিৎসা করাতে হবে। রেণুও কিছু টাকা আমাকে দিল গোপনে। আব্বার কাছ থেকে টাকা নিয়ে ঢাকায় রওয়ানা করলাম, এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। হাচিনা ও কামাল আমাকে ছাড়তে চায় না, ওদের উপর আমার খুব দুর্বলতা বেড়ে গেছে। রওয়ানা করার সময় দুই ভাইবোন খুব কাঁদল। আমি বরিশাল হয়ে ঢাকায় পৌঁছালাম। পূর্বেই খবর দিয়েছি, জালাল আমাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে নিয়ে যেতে আসল ওদের বাসায়। আমার জন্য একটা কামরাও ঠিক করে রেখেছে।
শামসুল হক সাহেব আওয়ামী লীগের অফিস নবাবপুর নিয়ে এসেছেন। এই বাড়ির দুইটা কামরায় মানিক ভাই তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে কিছুদিন ছিলেন। মানিক ভাই, আতাউর রহমান সাহেব ও আরও অনেকের সাথে দেখা করলাম। ডাক্তার নন্দীর কাছে যেয়ে নিজেকে দেখলাম। তিনি ঔষধ লিখে দিলেন, আওয়ামী লীগ অফিসে যেয়ে দেখি একখানা টেবিল, দুই তিনখানা চেয়ার, একটা লং টুল। প্রফেসার কামরুজ্জামান অফিসে বসেন। একটা ছেলে রাখা হয়েছে, যাকে অফিস পিয়ন বলা যেতে পারে। শামসুল হক সাহেব জেলে। আমি জয়েন্ট সেক্রেটারি। ওয়ার্কিং কমিটির সভা ডাকলাম। তাতে যে বার-তেরজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন তারা আমাকে এ্যাকটিং জেনারেল সেক্রেটারি করে প্রতিষ্ঠানের ভার দিলেন। আতাউর রহমান সাহেব অন্যতম সহ-সভাপতি ছিলেন, তিনি সভাপতিত্ব করলেন।
ঢাকায় তখন একটা ত্রাসের রাজত্ব চলছে। ভয়ে মানুষ কোনো কথা বলে না। কথা বললেই গ্রেফতার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলিতে একই অবস্থা। আওয়ামী লীগ অফিসে কেউই আসে না ভয়ে। আমি ও কামরুজ্জামান সাহেব বিকালে বসে থাকি। অনেক চেনা লোক দেখলাম, নবাবপুর দিয়ে যাবার সময় আমাদের অফিসের দিকে আসলেই মুখ ঘুরিয়ে নিতেন। দু’একজন আমাদের দলের সদস্যও ছিল। আমার সাথে কেউ দেখা করতে আসলে আমি বলতাম, অফিসে আমার সাথে দেখা করবেন, সেখানেই আলাপ করব।
শহীদ সাহেব যখন এসেছিলেন, তাঁর এক ভক্তের কাছ থেকে একটা টাইপ রাইটিং মেশিন নিয়ে অফিসের জন্য দিয়ে গিয়েছিলেন। ঢাকার একজন ছাত্র সিরাজ, এক হাত দিয়ে আস্তে আস্তে টাইপ করতে পারত। তাকে বললাম, অফিসে কাজ করতে, সে রাজি হল। কাজ করতে করতে পরে ভাল টাইপ করা শিখেছিল। একজন পিয়ন রাখলাম, প্রফেসার কামরুজ্জামান সাহেবের বাসায় থাকত।
এই সময় একজন এডভোকেট আমাদের অফিসে আসলেন। তিনি বললেন, “আমি আপনাদের দলের সভ্য হতে চাই। আমার দ্বারা বেশি কাজ পাবেন না, তবে অফিসের কাজ আমি বিকালে এসে করে দিতে পারি।” আমি খুব খুশিই হলাম। ভদ্রলোক আস্তে আস্তে কথা বলেন, আমার বয়সীই হবেন। আমার খুব পছন্দ হল। আমি তাকে অনুরোধ করলাম, অফিসের ভার নিতে। তিনি বললেন, কোর্টের কাজ শেষ করে বাড়ি যাওয়ার পূর্বে রোজই আসব। সত্যই তিনি আসতে লাগলেন এবং কাজ করতে লাগলেন। পুরানা অফিস সেক্রেটারি ভদ্রলোক কেটে পড়েছেন। পরে ওয়ার্কিং কমিটির সভায় আমি প্রস্তাব করলাম, তাঁকে অফিস সেক্রেটারি করতে। সকলেই রাজি হলেন। আজ ষোল বৎসর তিনি অফিস সেক্রেটারি আছেন। কোনোদিন কোনো পদের জন্য কাউকেও তিনি বলেন নাই। আমার সাথে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বও হয়ে গিয়েছে। তিনি কোনোদিন সভায় বক্তৃতা করেন না। তাকে অফিসের কাজ ছাড়া কোনো কাজেও কেউ বলেন নাই। তিনিও চান না অন্য কাজ করতে। অফিসের খরচও তাঁর হাতে আমি দিয়েছিলাম। হিসাব-নিকাশ তিনিই রাখতেন। আমাদের আয়ও কম, খরচও কম। কোনোদিন কোনো সরকার তাঁকে খারাপ চোখে দেখে নাই। আর গ্রেফতারও করে নাই। এবারেই তাকে কয়েকদিনের জন্য গ্রেফতার করে এনেছিল। তার শরীরও ভাল না। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ তার মত অফিস সেক্রেটারি পেয়েছিল বলে অনেক কাজ হয়েছে। তার নামটা বলি নাই, মিস্টার মোহাম্মদউল্লাহ। শহীদ সাহেব ও ভাসানী সাহেবও তাকে ভালবাসতেন এবং বিশ্বাস করতেন। অফিসের কাজ কখনও পড়ে থাকত না।
