চন্দ্র বাবু রাজি হলেন এবং জেলগেটে আসলেন, তার সামান্য জিনিস নিতে। আমাকে যাবার পূর্বে খবর দিয়েছিলেন। তার চলে যাওয়াতে সত্যই আমি দুঃখ পেয়েছিলাম। কয়েকদিন পরে ফণি বাবুও যেন কোথায় চলে গেলেন। এখন এই কামরায় আমি একলা পড়লাম; দিনেরবেলায় যদিও দেখা হত অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দিদের সাথে। রাতে আমাকে একলাই থাকতে হত। তবে প্রত্যেক রবিবার আমরা এক জায়গায় বসতাম এবং হালকা গল্পগুজব করতাম, যে যা জানে। আমাদের মধ্যে রাজনীতির বেশি আলাপ হত না। কোনো সময় আলোচনা শুরু হলেই তর্ক-বিতর্ক শুরু হত। চারজন ছিলেন একমতাবলম্বী, আমি একা এবং বাবু নেপাল নাহা অন্য মতের। আমাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। ডা, মারুফ হোসেন আমাদের খাবার ইনচার্জ ছিলেন। আমরা তাঁকে ম্যানেজার বলতাম। আমাদের কষ্ট হত কারণ যা আমাদের দেওয়া হত, তাতে চলা কষ্টকর ছিল। ফরিদপুর জেলে যথেষ্ট শাক-সবজি হত। তার থেকে কিছু আমাদের মাঝে মাঝে দেওয়া হত।
যাহোক, আরও একবার গোপালগঞ্জ যাই। আমার স্বাস্থ্য খুব খারাপ হয়ে পড়েছিল। হার্ট দুর্বল হয়ে গেছে, চক্ষু যন্ত্রণা বেড়ে গেছে, লেখাপড়া করতে পারছি না। আমার বাম পায়ে একটা রিউম্যাটিকের ব্যথা হয়েছিল। সিভিল সার্জন ও ডাক্তার সাহেব আমাকে খুব ভালভাবে চিকিৎসা করছিলেন, ন্তুি কোনো উন্নতি হচ্ছে না দেখে আমাকে বললেন, “আপনাকে ঢাকা জেলে পাঠিয়ে দিতে চাই। কারণ চোখের ও হার্টের চিকিৎসা এখানে হওয়া সম্ভব নয়। মেডিকেল কলেজে আপনার ভর্তি হয়ে চিকিৎসা করা দরকার।” আমি বললাম, “যা ভাল হয়, তাই আপনারা করবেন। আমি কি বলতে পারি!” লেখালেখি করতে কয়েকদিন সময় লাগল। তারপর আরও কিছুদিন পরে সরকার থেকে হুকুম এল আমাকে ঢাকা জেলে পাঠাতে। ফরিদপুর থেকে ট্রেনে গোয়ালন্দ। গোয়ালন্দ থেকে জাহাজে নারায়ণগঞ্জ আসলাম এবং নারায়ণগঞ্জ থেকে ট্যাক্সিতে করে ঢাকা জেল। জেলগেট থেকে জেল হাসপাতাল।
গোয়ালন্দের জাহাজ তখনও ভাল এবং আরামদায়ক ছিল। সরকার আমাকে ইন্টার ক্লাসে নিয়ে যাওয়ার পাস দিয়েছিলেন। আমি বললাম, “আমি প্রথম ক্লাসে যাব। কারণ, জাহাজে অত্যন্ত ভিড়, আমার ঘুমাতে হবে। আমার টাকা আছে আপনাদের কাছে, সেই টাকা দিয়ে প্রথম শ্রেণীর টিকিট কিনে নেন।” কি করবে? আমার সাথে গোলমাল করে বোধহয় বেশি সুবিধা হবে না। তারা রাজি হলেন। এছাড়াও গরিব সরকারি কর্মচারীরা কখনও চায় নাই আমার কোনো অসুবিধা হোক।
৬২.
আমি যখন ঢাকা জেলে আসলাম তখন ১৯৫১ সালের শেষের দিক হবে। প্রায় এক মাস জেল হাসপাতালে রইলাম। আমার মালপত্র সেই পুরানা জায়গায় নিয়ে রাখা হয়েছিল। মওলানা ভাসানী সাহেব পূর্বেই মুক্তি পেয়ে গেছেন। কয়েকদিন পরে খবর পেলাম, বরিশালের মহিউদ্দিন সাহেবকে ঢাকা জেলে নিয়ে আসা হয়েছে, নিরাপত্তা আইনে বন্দি করে। সে কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত জেলা মুসলিম লীগের সম্পাদক ছিল। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জড়িত থাকার জন্য তাকে নাকি সরকার গ্রেফতার করেছে। ১৯৫১ সালে বরিশালে এক ভয়াবহ দাঙ্গা হয়েছিল। মহিউদ্দিন পাকিস্তান আন্দোলনের ভাল কর্মী ছিল। ছাত্র আন্দোলনে সে আমার বিরুদ্ধ দলে ছিল। আমরা মুসলিম লীগ ত্যাগ করলেও সে ত্যাগ করে নাই। বরিশালে তারই এক সহকর্মী আমার বিশিষ্ট বন্ধু কাজী বাহাউদ্দিন জেলা ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন এবং মহিউদ্দিন সাহেবের বিরুদ্ধ দলে ছিলেন। আমি ও আমার সহকর্মীরা মহিউদ্দিনকে ভাল চোখে দেখতাম না। কারণ, তখন পর্যন্ত সে সরকারের অন্ধ সমর্থক ছিল। মহিউদ্দিনের সাথে আলাপ করে দেখলাম, তার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বের হতে পারলে সে আর মুসলিম লীগ করবে না, সেটা আমি বুঝতে পারলাম। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি যে পাকিস্তানের জন্য ক্ষতিকর একথাও সে স্বীকার করল।
ঢাকা জেল হাসপাতালে আমার চিকিৎসা হবে না, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হবে। আমি জানিয়ে দিলাম আমাকে কেবিন দিতে হবে, না হলে আমি যাব না। সরকার কেবিন দিতে রাজি হলেন। আমাকে মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত চলছে। আমার ও মহিউদ্দিনের মধ্যে অনেক ভুল বোঝাবুঝি ছিল পূর্বে, এখন দুইজনই বন্দি। আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। মহিউদ্দিন আমাকে বলল, “তোমার জন্য তো তোমার দল ও ছাত্রলীগ মুক্তি-আন্দোলন করবে। আমার জন্য কেউ করবে না, আমি তো মুসলিম লীগে ছিলাম, আর মুসলিম লীগ সরকারই আমাকে গ্রেফতার করেছে। তুমি তো বোঝ, আমি রাজনৈতিক কর্মী। আমার পক্ষে নিজ হাতে দাঙ্গা করা সম্ভব নয়; আমার নামে মিথ্যা কথা রটাচ্ছে। কারণ, লীগের মধ্যে দুইটা দল হয়ে গেছে। আমি নূরুল আমিন সাহেবের দলের বিরুদ্ধে, তাই তিনি আমাকে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করেছেন।” আরও বলল, “তোমার জন্য শহীদ সাহেব ও ভাসানী সাহেবও আন্দোলন করবেন।” আমি বললাম, “যা হবার হয়ে গেছে, তারা আমার মুক্তি চাইলে তোমার মুক্তিও চাইবেন। সে বন্দোবস্তও আমি করব, তুমি দেখে নিও।”
কয়েকদিন পরেই আমাকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হল। চক্ষু দুইটা বেশি যন্ত্রণা দিতেছিল। তাই প্রথমে চোখের চিকিৎসা শুরু করলেন ক্যাপ্টেন লস্কর, চোখের বিখ্যাত ডাক্তার। কিছুদিনের মধ্যে কিছুটা উপকার হল, আরও কিছুদিন লাগবে। ডা. শামসুদ্দিন সাহেব হার্টের চিকিৎসা শুরু করলেন। বিকালে অনেক লোক আসত আমাকে দেখতে। কারণ, বিকাল চারটা থেকে ছয়টা পর্যন্ত যে কেউ হাসপাতালে আসতে পারত। তখন সামান্য কয়েকটা কেবিন ছিল। আমার কেবিনটা ছিল দোতলায় ঠিক সিড়ির কাছে। মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা দলে দলে আসত, কেউ কিছু বলতে পারত না। পুলিশরা কেবিনের বাইরে ডিউটি করত। সন্ধ্যার পরে যখন ভিড় কম হত, আমি বাইরে বারান্দায় ঘুরতাম। আমি খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম।
