ভাসানী সাহেব জেল থেকে বের হয়ে বসে নাই। হক সাহেব কিছুদিন চুপ করে ছিলেন। শহীদ সাহেবও পূর্ব বাংলায় এসেছেন। ভাসানী সাহেবকে নিয়ে তিনি ময়মনসিংহ, কুমিল্লা আরও অনেক জায়গায় সভা করলেন। প্রত্যেক সভায় মুসলিম লীগ গোলমাল করতে চেষ্টা করেছে। ঢাকার সভায় ১৪৪ ধারা জারি করেছিল, তবুও শহীদ সাহেব আরমানিটোলায় গিয়েছিলেন, কারণ অনেক লোক জমেছিল। শহীদ সাহেব সকলকে অনুরোধ করেছিলেন চলে যেতে। কারণ তিনি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে চান না। শহীদ সাহেব ও ভাসানী সাহেব আমার মুক্তির জন্য জোর দাবি তুলেছিলেন। আমি যে অসুস্থ, হাসপাতালে আছি সে কথাও বলতে ভোলেন নাই। শহীদ সাহেব ও আতাউর রহমান সাহেব বিশেষ অনুমতি নিয়ে আমাকে দেখতে আসেন হাসপাতালে। অনেক কথা হল, শহীদ সাহেব আমাকে খুব আদর করলেন। ডাক্তার সাহেবদের ডেকে বললেন, আমার দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে। আমি মহিউদ্দিনের কথা তুললাম। শহীদ সাহেব আমার দিকে আশ্চর্য হয়ে চেয়ে রইলেন এবং বললেন, “তুমি বোধহয় জান না, এই মহিউদ্দিনই আমার বিরুদ্ধে লিয়াকত আলী খানের কাছে এক মিথ্যা চিঠি পাঠিয়েছিল যখন বরিশাল যাই, শান্তি মিশনের জন্য সভা করতে ১৯৪৮ সালে। আবার সে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও করেছে ১৯৫১ সালে।” আমি বললাম, “স্যার মানুষের পরিবর্তন হতে পারে, কমী তো ভাল ছিল, আপনি তো জানেন, এখন জেলে আছে, আমার সাথেই আছে। আমি আপনাকে বলছি আপনি বিশ্বাস করুন, ওর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ভালপথে আনতে পারলে দেশের অনেক কাজ হবে। আমরা উদার হলে তো কোন ক্ষতি নাই। আমার জন্য যখন মুক্তি দাবি করবেন ওর নামটাও একটু নিবেন, সকলকে বলে দিবেন।” শহীদ সাহেব ছিলেন সাগরের মত উদার। যে কোন লোক তার কাছে একবার যেয়ে হাজির হয়েছে, সে যত বড় অন্যায়ই করুক না কেন, তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।
শওকত সাহেব এবং ছাত্রলীগ কর্মীরা একটা আবেদনপত্র ছাপিয়েছে, ঢাকার বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দিয়ে দস্তখত করে আমার মুক্তি দাবি করে। আমি শওকত মিয়াকে বললাম, মেহেরবানি করে মহিউদ্দিনের নামটাও আমার নামের সাথে দিবে। ছাত্রলীগ তো ক্ষেপে অস্থির। ছাত্রলীগ নেতারা পালিয়ে অনেক রাতে আমার সাথে মেডিকেল কলেজে দেখা করতে আসত। অনেকে আবার মেডিকেল কলেজের ছাত্র সেজে আমার সাথে দেখা করতে আসত। আমি অনেককে বুঝিয়ে রাজি করলাম। কিন্তু বরিশালের ছাত্রলীগ নেতারা আমাকে ভুল বুঝল। যদিও আমি মুক্তি পাওয়ার পরে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে পেরেছিলাম।
৬৩.
১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসে মওলানা ভাসানী ও আমি যখন জেলে, সেই সময় জনাব লিয়াকত আলী খানকে রাওয়ালপিন্ডিতে এক জনসভায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেব গভর্নর জেনারেলের পদ ছেড়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হলেন এবং গোলাম মোহাম্মদ অর্থমন্ত্রী ছিলেন, তাঁকে গভর্নর জেনারেল করলেন। লিয়াকত আলী খান যে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু করেছিলেন সেই ষড়যন্ত্রেই তাঁকে মরতে হল। কে বা কারা লিয়াকত আলী খানকে হত্যা করার পেছনে ছিল আজ পর্যন্ত তা উদঘাটন হয় নাই। আর হবেও না। এই ষড়যন্ত্রকারীরা যে খুব শক্তিশালী ছিল তা বোঝা যায়। কারণ তারা কোনো চিহ্ন পর্যন্ত রাখে নাই। প্রকাশ্য দিবালোকে জনসমাবেশে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। কি করে হত্যাকারী অত নিকটে স্থান পেল? কি করে পিস্তল তুলে গুলি করল কেউই দেখতে পেল না কেন? গুলির সাথে সাথে আততায়ীকে গুলি করে হত্যা করার কারণ কি? অনেক প্রশ্নই আমাদের মনে জেগেছিল। যদিও তারই হুকুমে এবং নূরুল আমিন সাহেবের মেহেরবানিতে আমরা জেলে আছি, তবুও তাঁর মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলাম। কারণ ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে আমরা বিশ্বাস করি না।
পাকিস্তানে যে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়ে গেছে, তাতেই আমাদের ভয় হল। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে গুলি করে হত্যা করা যে কত বড় জঘন্য কাজ তা ভাষায় প্রকাশ করা কষ্টকর। আমরা যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, তারা এই সমস্ত জঘন্য কাজকে ঘৃণা করি। খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেব তার মন্ত্রিত্বে একজন সরকারি আমলাকে গ্রহণ করলেন, তার নাম চৌধুরী মোহাম্মদ আলী। তিনি পাকিস্তান সরকারের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন। তাঁকে অর্থমন্ত্রী করা হল। এরপর আমলাতন্ত্রের প্রকাশ্য খেলা শুরু হল পাকিস্তানের রাজনীতিতে। একজন সরকারি কর্মচারী হলেন গভর্নর জেনারেল, আরেকজন হলেন অর্থমন্ত্রী। খাজা সাহেব ছিলেন দুর্বল প্রকৃতির লোক। তিনি অনেক গুণের অধিকারী ছিলেন, তবে কর্মক্ষমতা এবং উদ্যোগের অভাব ছিল। ফলে আমলাতন্ত্র মাথা তুলে দাঁড়াল। বিশেষ করে যখন তাদেরই একজনকে অর্থমন্ত্রী করা হল, অনেকের মনে গোপনে গোপনে উচ্চাশারও সঞ্চার হল। আমলাতন্ত্রের জোটের কাছে রাজনীতিবিদরা পরাজিত হতে শুরু করল। রাজনীতিকদের মধ্যে তখন এমন কোনো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নেতা মুসলিম লীগে ছিল না, যারা এই ষড়যন্ত্রকারী আমলাতন্ত্রকে দাবিয়ে রাখতে পারে। নাজিমুদ্দীন সাহেব গণতন্ত্রের মূলে কুঠারাঘাত করলেন। কারণ জাতীয় পরিষদের সদস্য নন, একজন সরকারি কর্মচারী, তাকে চাকরি থেকে পদত্যাগ করিয়ে মন্ত্রিত্ব দেওয়ার কি অর্ধ থাকতে পারে? আমাদের মনে হল একটা বিশেষ প্রদেশের চাপে পড়েই তাকে একাজ করতে হয়েছিল। তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও দুইটা গ্রুপ তার ক্যাবিনেটে কাজ করছিল। একটা গ্রুপ পাঞ্জাবিদের আর একটা গ্রুপ বাঙালিদের। পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের নেতারা বাঙালি গ্রুপকে তলে তলে সাহায্য করছিল। খাজা সাহেব বিরাট ভুল করে বসলেন।
