বেশি সময় বাইরে বসে থাকা উচিত না, আবার জ্বর হলে আর উপায় থাকবে না। ভোররাতে আবার জাহাজ ধরতে হবে, যদিও ঘাট একদম কাছে। গোপালগঞ্জ পৌঁছালাম। এবারও বাড়ি থেকে সকলে এসেছে। দুই তিনটা বড় নৌকা নিয়ে এসেছে। সকলেই আমার শরীরের অবস্থা দেখে চিন্তাযুক্ত হয়ে পড়েছিল। মা তো চিল্কার করে কাঁদতে শুরু করলেন। কোর্ট থেকে ফিরে এলাম বিকালে। আগামীকাল আবার তারিখ পড়েছে। কোর্ট ইন্সপেক্টর সাহেবকে বললাম, “দেরি করছেন কেন? সমস্ত সাক্ষী হাজির করেন।” গোপালগঞ্জের পুরানা এসডিও সাক্ষী ছিলেন। তিনি তো আসলেনই না, তখন বোধহয় চট্টগ্রামে ছিলেন। না এসে ভদ্রলোক ভালই করেছেন, কারণ একটা গোলমাল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। লোক খুব ক্ষেপেছিল।
এক আশ্চর্য ঘটনা দেখলাম, গোপালগঞ্জের পুরানা পুলিশ ইন্সপেক্টর সাহেব সাক্ষী দিতে এসেছেন। বোধহয় এখন ঢাকায় বদলি হয়েছেন। গোপালগঞ্জে তাঁর নাম ছিল খুব, সাধু কর্মচারী হিসাবে। ঘুষ খেতেন না। তিনি সাক্ষী দিতে উঠে একটা মিথ্যা কথাও বললেন না, যা সত্য, যা দেখেছেন তাই বললেন। আমি যে জনগণকে শান্তভাবে চলে যেতে বলেছিলাম, সেকথাও স্বীকার করলেন। সরকারি উকিল ভদ্রলোক খুব চটে গেছেন দেখলাম। কিন্তু বলা তো হয়ে গেছে। আর হাকিম সাহেবও লিখে ফেলেছেন, এখন আর উপায় কি? আমি বুঝলাম, মামলায় বোধহয় কিছু হবে না, তবে ঘুরতে হবে আরও কিছুদিন। পাকিস্তানে এ রকম পুলিশ কর্মচারীও আছে, যারা মিথ্যা কথা বলতে চান না। আমাদের দেশে যে আইন সেখানে সত্য মামলায়ও মিথ্যা সাক্ষী না দিলে শাস্তি দেওয়া যায় না। মিথ্যা দিয়ে শুরু করা হয়, আর মিথ্যা দিয়ে শেষ করতে হয়। যে দেশের বিচার ও ইনসাফ মিথ্যার উপর নির্ভরশীল সেদেশের মানুষ সত্যিকারের ইনসাফ পেতে পারে কি না সন্দেহ।
আবার পরের মাসে তারিখ পড়ল। আমি আগের মত থানায় ফিরে এলাম। দুই দিন সকাল ও বিকালে সকলের সাথে দেখা হল। রাজা মামা ও মামী কিছুতেই অন্য কোথাও খাবার বন্দোবস্ত করতে দিলেন না। মামী আমাকে খুব ভালবাসতেন। নানীও আছেন সেখানে। আমার খাবার তাঁদের বাসা থেকেই আসত। বাড়ি থেকে যারা এসেছিল তাদের মধ্যে মেয়েরা মামার বাড়ি, আর পুরুষরা নৌকায় থাকতেন। রেণু আমাকে যখন একাকী পেল, বলল, “জেলে থাক আপত্তি নাই, তবে স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখ। তোমাকে দেখে আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেছে। তোমার বোঝা উচিত আমার দুনিয়ায় কেউ নাই। ছোটবেলায় বাবা-মা মারা গেছেন, আমার কেউই নাই। তোমার কিছু হলে বাঁচব কি করে?” কেঁদেই ফেলল। আমি রেণুকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, তাতে ফল হল উল্টা। আরও কাঁদতে শুরু করল, হাচু ও কামাল ওদের মা’র কাদা দেখে ছুটে যেয়ে গলা ধরে আদর করতে লাগল। আমি বললাম, “খোদা যা করে তাই হবে, চিন্তা করে লাভ কি?” পরের দিন ওদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। মাকে বোঝাতে অনেক কষ্ট হল।
৬১-৭০. ফরিদপুর জেলে ফিরে এলাম
ফরিদপুর জেলে ফিরে এলাম। দেখি চন্দ্র বাবু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, অবস্থা খুবই খারাপ। তাঁর হার্নিয়ার ব্যারাম ছিল। পেটে চাপ দিয়েছিল, হঠাৎ নাড়ি উল্টে গেছে। ফলে গলা দিয়ে মল পড়তে শুরু করেছে। যে কোন সময় মারা যেতে পারেন। সিভিল সার্জন সাহেব খুব ভাল ডাক্তার। তিনি অপারেশন করতে চাইলেন, কারণ মারা যখন যাবেনই তখন শেষ চেষ্টা করে দেখতে চান। আত্মীয়স্বজন কেউ নাই যে, তার পক্ষ থেকে অনুমতিপত্র লিখে দিবে। চন্দ্র ঘোষ নিজেই লিখে দিতে রাজি হলেন। বললেন, “কেউ যখন নাই তখন আর কি করা যাবে!” সিভিল সার্জন সাহেব বাইরের হাসপাতালে নিতে হুকুম দিলেন। চন্দ্র ঘোষ তাঁকে বললেন, “আমাকে বাইরের হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন। আমার তো কেউ নাই। আমি শেখ মুজিবুর রহমানকে একবার দেখতে চাই, সে আমার ভাইয়ের মত। জীবনে তো আর দেখা হবে না।” সিভিল সার্জন এবং জেলের সুপারিনটেনডেন্ট, তাদের নির্দেশে আমাকে জেলগেটে নিয়ে যাওয়া হল। চন্দ্র ঘোেষ স্ট্রেচারে শুয়ে আছেন। দেখে মনে হল, আর বাঁচবেন না, আমাকে দেখে কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, “ভাই, এরা আমাকে সাম্প্রদায়িক’ বলে বদনাম দিল; শুধু এই আমার দুঃখ মরার সময়। কোনোদিন হিন্দু মুসলমানকে দুই চোখে দেখি নাই। সকলকে আমায় ক্ষমা করে দিতে বোলো। আর তোমার কাছে আমার অনুরোধ রইল, মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখ। মানুষে মানুষে কোন পার্থক্য ভগবানও করেন নাই। আমার তো কেউ নাই, আপন ভেবে তোমাকেই শেষ দেখা দেখে নিলাম। ভগবান তোমার মঙ্গল করুক।” এমনভাবে কথাগুলো বললেন যে সুপারিনটেনডেন্ট, জেলার সাহেব, ডেপুটি জেলার, ডাক্তার ও গোয়েন্দা কর্মচারী সকলের চোখেই পানি এসে গিয়েছিল। আর আমার চোখেও পানি এসে গিয়েছিল। বললাম, “চিন্তা করবেন না, আমি মানুষকে মানুষ হিসাবেই দেখি। রাজনীতিতে আমার কাছে মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিষ্টান বলে কিছু নাই। সকলেই মানুষ। আর কথা বলার শক্তি আমার ছিল না। শেষ বারের মত বললাম, “আল্লাহ করলে আপনি ভাল হয়ে যেতে পারেন। তাকে নিয়ে গেল। সিভিল সার্জন সাহেব বললেন, “আশা খুব কম, তবে শেষ চেষ্টা করছি, অপারেশন করে।”
আমরা সকলেই খুব চিন্তায় রইলাম, কি হয়! দুই ঘণ্টা পরে জেল কর্তৃপক্ষ খবর দিল, অপারেশন করা হয়ে গেছে, অবস্থা ভালই মনে হয়। সন্ধ্যায় আবার খবর পেলাম, বাঁচার সম্ভাবনা আছে, তবে এখনও বলা যায় না। রাতটা অনেক উদ্বেগে কাটালাম, সকালবেলা খবর পেলাম তার অবস্থা উন্নতির দিকে। গলা দিয়ে মল আসছে না। আশা করা যায়, এবারকার মত বেঁচে যাবেন। পরের দিন সরকার থেকে খবর এসেছে তাকে মুক্তি দিতে। মুক্তি তিনি পেলেন, তবে কিছুদিন হাসপাতালে থাকতে হবে, যদি বেঁচে যান। বোধহয় পনের দিন হাসপাতালে ছিলেন। আর ভয় নাই, শুধু ঘা এখনও সম্পূর্ণরূপে ভাল হয় নাই। তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়ার সাথে সাথে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অন্তরীণ আদেশ দিলেন। তার গ্রাম রামদিয়ায় তাকে থাকতে হবে। চন্দ্র ঘোষ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের সাথে দেখা করতে গেলে তিনি বললেন, “যদি পাকিস্তানে থাকতে হয়, তবে গ্রামে অন্তরীণ থাকতে হবে। আর যদি চিকিৎসা করতে কলকাতা যেতে চান, আমাদের আপত্তি নাই। যখন আসবেন, পুলিশকে খবর দিতে হবে।”
