চন্দ্র ঘোষ শাস্তি ভোগ করে আবার নিরাপত্তা বন্দি হয়েছেন। আমি গোপালগঞ্জের লোক, আমি সকল খবরই রাখতাম। মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানের আন্দোলন আমি বেশি করেছি এই সমস্ত এলাকায়। দেশের মুসলমান, হিন্দু সকলেই ভালবাসত চন্দ্র ঘোষকে। তাঁর অনেক মুসলমান ভক্তও ছিল। তফসিলী সম্প্রদায়ের হিন্দুরাই তার বেশি ভক্ত ছিল। গোপালগঞ্জের কিছু সংখ্যক তফসিলী সম্প্রদায়ের হিন্দু পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করেছিল, এমনকি কিছু সংখ্যক নমশূদ্র হিন্দু কর্মী আমাদের সাথে সিলেটে গণভোটে কাজ করেছিল। চন্দ্র ঘোষ একটা মেয়েদের হাইস্কুলও করেছিলেন। আমিও অনেক সরকারি কর্মচারীকে বলেছিলাম, এ ভদ্রলোককে অত্যাচার না করতে। কারণ, তিনি কোনোদিন রাজনীতি করেন নাই। সমাজের অনেক কাজ হবে তার মত নিঃস্বার্থ ত্যাগী সমাজসেবক দিয়ে। দেশ স্বাধীন হয়েছে, এদের ব্যবহার করা দরকার। কে কার কথা শোনে! সরকারকে খবর দেওয়া হয়েছিল, হিন্দুরা আইন মানছে না। হিন্দুস্থানের পতাকা তুলেছে। চন্দ্র ঘোষ এদের নেতা। শীঘ্রই আরও আর্মড পুলিশ পাঠাও, আরও কত কি, খোদা জানে! কিন্তু আমি জানি, সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। গোপালগঞ্জে মুসলমানদেরও শক্তি কম ছিল না। সে রকম হলে মুসলমানরা নিশ্চয়ই বাধা দিত। যদি এ সমস্ত অন্যায় করত, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও বেধে যেত। তেমন কোনো কিছুই হয় নাই। চন্দ্র ঘোষের গ্রেফতারে হিন্দুরা ভয় পেয়েছিল। বর্ণ হিন্দুরা পশ্চিমবঙ্গের দিকে রওয়ানা করতে শুরু করেছে। যা সামান্য কিছু আছে, তাও যাবার জন্য প্রস্তুত। তাঁকে গ্রেফতারের একমাত্র কারণ ছিল সরকারকে দেখান, দেখ আমি কিভাবে রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ দমন করলাম। পাকিস্তানকে রক্ষা করলাম, ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমি ফরিদপুর জেলে আসলাম, স্বাস্থ্য খারাপ নিয়ে। এসেই আমার ভীষণ জ্বর; মাথার যন্ত্রণা, বুকে ব্যথা অনুভব করতে লাগলাম। চিকিৎসার জটি করছেন না জেল কর্তৃপক্ষ, তবুও কয়েকদিন খুব ভুগলাম। রাতভর চন্দ্র বাবু আমার মাথার কাছে বসে পানি ঢেলেছেন। যখনই আমার হুশ হয়েছে দেখি চন্দ্র বাবু বসে আছেন। ফণি বাবুও অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকতেন আমার জন্য। তিন দিনের মধ্যে আমি চন্দ্র বাবুকে বিছানায় শুতে দেখি নাই। আমার মাথা টিপে দিয়েছেন। কখনও পানি ঢালছেন, কখনও ওসুধ খাওয়াচ্ছেন। কখনও পথ্য খেতে অনুরোধ করছেন। না খেতে চাইলে ধমক দিয়ে খাওয়াতেন। আমি অনুরোধ করতাম, এত কষ্ট না করতে। তিনি বলতেন, “জীবনভরই তো এই কাজ করে এসেছি, এখন বুড়াকালে কষ্ট হয় না।” ডাক্তার সাহেব আমাকে হাসপাতালে নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু চন্দ্র বাবু ও ফণি বাবু দেন নাই, কারণ সেখানে কে দেখবে? অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দিরাও আমার জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। কয়েকদিন পরেই আমি আরোগ্য লাভ করলাম। কিন্তু খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম বলে গোপালগঞ্জে মামলার দিনে যেতে পারি নাই। বাড়ির সকলে এসে ফিরে গিয়েছিল। বাড়ি থেকে নৌকায় আসতে হয় ও গোপালগঞ্জে থাকতে হয়, নানা অসুবিধা। আমি গোপালগঞ্জ না যাওয়ায় আব্বা খুব চিন্তিত হয়ে পরে টেলিগ্রাম করেছিলেন।
৬০.
এদিকে জ্বর থেকে মুক্তি পেলেও হার্ট দুর্বল হয়ে পড়েছে। চোখের অসুখ বেড়েছে। পেটে একটা বেদনা অনুভব করতাম। এইভাবে আরও এক মাস কেটে গেল। গোপালগঞ্জ মামলার তারিখে আবার সেই পুরানা পথ দিয়ে যেতে হল। এবার যেন সিন্ধিয়া ঘাট ডাকবাংলোকে আমার আরও ভাল লাগল। অনেক দিন পরে রাতে ঘরের বাইরে আছি। কত কথাই না মনে পড়ল। ১৯৪৫ সালে এই জায়গাটায় সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে নিয়ে একরাত কাটিয়েছিলাম। আমার বন্ধু ও সহকর্মী মোল্লা জালালউদ্দিন আমার সাথে ছিল। এখান থেকেই পরের দিন নৌকায় তাকে গোপালগঞ্জ নিয়ে যায়। ফরিদপুরের জালাল ও হামিদ আমার সাথে পাকিস্তানের আন্দোলনে কাজ করেছে।
সন্ধ্যার পরে অনেক লোক আমাকে দেখতে আসল। এটা একটা ছোট্ট বন্দর। কয়েকজন ছোটখাটো সরকারি কর্মচারী এখানে থাকতেন। তাঁরাও অনেকে আমার শরীর খারাপ গুনে দেখতে আসলেন। কিছু সময় আলাপ করার পরে একে একে সকলে বিদায় হলেন। ভয় তো কিছুটা আছে, যদি গোয়েন্দারা রিপোর্ট দেয়।
এর মধ্যে একটা ঘটনাও ঘটে গেছে। মাদারীপুরের গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মচারী রিপোর্ট দিয়েছে যে, আমি যখন মাদারীপুরে জাহাজে ছিলাম তখন লোক দেখা করেছে। আমার সাথে। তাই যারা আমাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসত তারা এখন ভয় পেয়ে গেছে। তারা আমাকে অনুরোধ করেছে যাতে আমি বাইরের লোকের সাথে বেশি আলাপ না করি। আলাপ তো করব না সত্য, কিন্তু যারা আমাকে দেখতে আসে তাদের বাধা দেই কেমন করে? আলাপ তো শুধু এইটুকু আসসালামু আলাইকুম, ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছেন? আপনারা কেমন আছেন?’ তারা ভুলে গেছেন, এটা আমার জেলা, এখানে আমার আত্মীয়স্বজন অনেক। রাজনীতি করেছি এ জেলায়। আমি প্রায় সকল থানায়ই পাকিস্তানের জন্য সভা করেছি, অনেকে আমাকে জানে। অন্ততপক্ষে বিশ-ত্রিশজন আর্মড পুলিশ দিয়ে আমাকে পাঠান উচিত ছিল। সোজা সরকারি লঞ্চ দিয়ে ফরিদপুর থেকে গোপালগঞ্জ এবং গোপালগঞ্জ কোর্ট থেকে ফরিদপুর আনা নেয়া করা দরকার ছিল। এদের দোষ দিয়ে লাভ কি? যতদূর পারা যায় আমি নিজেই চেষ্টা করি, যাতে এই গরিবদের চাকরির ক্ষতি না হয়।
