প্রায় তিন মাস হয়েছে খুলনা জেলে এসেছি। নিরাপত্তা আইনের বন্দিরা ছয় মাস পর পর সরকার থেকে একটা করে নতুন হুকুম পেত। আমার বোধহয় আঠার মাস হয়ে গেছে। ছয় মাসের ডিটেনশন অর্ডারের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। নতুন অর্ডার এসে খুলনা জেলে পৌঁছায় নাই। জেল কর্তৃপক্ষ আমাকে কোন হুকুমের ওপর ভিত্তি করে জেলে রাখবেন? আমি বললাম, “অর্ডার যখন আসে নাই, আমাকে ছেড়ে দেন। যদি আমাকে বন্দি রাখেন, তবে আমি বেআইনিভাবে আটক রাখার জন্য মামলা দায়ের করে দিব।” জেল কর্তৃপক্ষ খুলনার ম্যাজিস্ট্রেট ও এসপির সাথে আলাপ করলেন, তারা জানালেন তাঁদের কাছেও কোন অর্ডার নাই যে আমাকে জেলে বন্দি করে রাখতে বলতে পারেন। তবে আমার ওপরে একটা প্রডাকশন ওয়ারেন্ট ছিল, গোপালগঞ্জ মামলার। কাস্টডি ওয়ারেন্ট নাই যে জেলে রাখবে। অনেক পরামর্শ করে তারা ঠিক করলেন, আমাকে গোপালগঞ্জ কোর্টে পাঠিয়ে দিবে এবং রেডিওগ্রাম করবে ঢাকায়। এর মধ্যে ঢাকা থেকে অর্ডার গোপালগঞ্জে পৌঁছাতে পারবে। আমাকে জাহাজে পুলিশ পাহারায় গোপালগঞ্জ পাঠিয়ে দিল। গোপালগঞ্জ কোর্টে আমাকে জামিন দিয়ে দিল পরের দিন। বিরাট শোভাযাত্রা করল জনগণ আমাকে নিয়ে। বাড়িতে খবর পাঠিয়ে দিয়েছি। রাতে বাড়িতে পৌঁছাব। আমার গোপালগঞ্জ বাড়িতে বসে আছি। নৌকা ভাড়া করতে গিয়েছে। যখন নৌকা এসে গেছে, আমি সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওয়ানা করব ঠিক করেছি এমন সময় পুলিশ ইন্সপেক্টর ও গোয়েন্দা কর্মচারী আমার কাছে এসে বলল, “একটা কথা আছে। কোনো পুলিশ তারা আনে নাই। আমার কাছে তখনও একশতের মত লোক ছিল। আমি উঠে একটু আলাদা হয়ে ওদের কাছে যাই। তারা আমাকে একটা কাগজ দিল। রেডিওগ্রামে অর্ডার এসেছে আমাকে আবার গ্রেফতার করতে, নিরাপত্তা আইনে। আমি বললাম, “ঠিক আছে চলুন”। কর্মচারীরা ভদ্রতা করে বলল, “আমাদের সাথে আসতে হবে না। আপনি থানায় চলে গেলেই চলবে।” কারণ, আমাকে নিয়ে রওয়ানা হলে একটা গোলমাল হতে পারত। আমি সকলকে ডেকে বললাম, “আপনারা হৈচৈ করবেন না, আমি মুক্তি পেলাম না। আবার হুকুম এসেছে আমাকে গ্রেফতার করতে। আমাকে থানায় যেতে হবে। এদের কোনো দোষ নাই। আমি নিজে হুকুম দেখেছি।” নৌকা বিদায় করে দিতে বললাম। বাক্সে কাপড়চোপড়, বইখাতা বাধা ছিল সেগুলি থানায় পৌঁছে দিতে বললাম। কয়েকজন কর্মী কেঁদে দিল। আর কয়েকজন চিৎকার করে উঠল, “না যেতে দিব না, তারা কেড়ে নিয়ে যাক।” আমি ওদের বুঝিয়ে বললাম, তারা বুঝতে পারল। গোয়েন্দা বিভাগের অফিসার সাহেব খুবই ভদ্রলোক ছিলেন। তাকে আমি বললাম, আপনি আমার সাথে চলুন, তা না হলে ভাল দেখায় না, কোনো গোলমাল হবে না। বাড়িতে আবার লোক পাঠালাম। রাতেই লোক রওয়ানা হয়ে গেল। আগামীকালই বোধহয় আমাকে অন্য কোন জেলে নিয়ে যাবে। নিষেধ করে দিয়েছিলাম, কেউ যেন না আসে, আমাকে পাবে না।
রাতে আবার থানায় রইলাম। থানার কর্মচারীরাও দুঃখ পেয়েছিল। সতের-আঠার মাস পরে ছেড়ে দিয়েও আবার গ্রেফতার করার কি কারণ থাকতে পারে? পরের দিন লোক ফিরে এসে বলল, রাতভর সকলে জেগেছিল বাড়িতে, আমি যে কোনো সময় পৌঁছাতে পারি ভেবে। মা অনেক কেঁদেছিল, খবর পেলাম। আমার মনটাও খারাপ হল। আমার মা, আব্বা ও ভাইবোন এবং ছেলেমেয়েদের এ দুঃখ না দিলেই পারত। আমি তো সরকারের কাছে বন্ড দেই নাই। আমাকে মুক্তি দিল কেন? হুকুমনামা সময়মত আসে নাই কেন? আমার তো কোনো দোষ ছিল না? এই ব্যবহার আমার সাথে না করলেই পারত। অনেক রাত পর্যন্ত লোকজন থানায় রইল। আমিও বসে রইলাম। ভাবলাম, অনেক দিন থাকতে হবে কারাগারে। দুই দিন গোপালগঞ্জ থানায় আমাকে থাকতে হল। ঢাকা থেকে খবর আসে নাই আমাকে কোন জেলে নিবে। আমার শরীর খুবই খারাপ হয়ে পড়েছিল খুলনা জেলে থাকার সময়। এ ঘটনার পরে আরও একটু খারাপ হল।
৫৯.
দুই দিন পরে খবর এল, আমাকে ফরিদপুর জেলে নিয়ে যেতে। আমি ফরিদপুর জেলে ফিরে এলাম। এবার আমাকে রাখা হল রাজবন্দিদের ওয়ার্ডে। এই ওয়ার্ডে দুইটা কামরা; এক কামরায় পাঁচজন ছিল। আরেক কামরায় গোপালগঞ্জের বাবু চন্দ্র ঘোষ, মাদারীপুরের বাবু ফণি মজুমদার ও আমি। এই দুইজনকে আমি পূর্ব থেকেই জানতাম। ফণি মজুমদার পূর্বে ফরোয়ার্ড ব্লকের নেতা ছিলেন। ইংরেজ আমলে আট-নয় বৎসর জেল খেটেছেন। দেশ স্বাধীন হবার পরেও রেহাই পান নাই। বিবাহ করেন নাই। তাঁর বাবা আছেন পাকিস্তানে, পেনশন পান। ফণি বাবু দেশ ছাড়তে রাজি হন নাই বলে তিনিও দেশ ছাড়েন নাই। হিন্দু-মুসলমান জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে তাকে ভালবাসত। কেউ কোন বিপদে পড়লে ফণি মজুমদার হাজির হতেন। কারো বাড়িতে কেউ অসুস্থ হলে ফণি মজুমদারকে পাওয়া যেত। আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। সরকার যাদের কমিউনিস্ট ভাবতেন, তারা আছে এক কামরায়। আমরা তিনজন কমিউনিস্ট নই, তাই আমরা আছি অন্য কামরায়।
চন্দ্র ঘোষ ছিলেন একজন সমাজকর্মী। জীবনে রাজনীতি করেন নাই। মহাত্মা গান্ধীর মত একখানা কাপড় পরতেন, একখানা কাপড় গায়ে দিতেন। শীতের সময়ও তার কোনো ব্যতিক্রম হত না। জুতা পরতেন না, খড়ম পায়ে দিতেন। গোপালগঞ্জ মহকুমায় তিনি অনেক স্কুল করেছেন। কাশিয়ানী থানার রামদিয়া গ্রামে একটা ডিগ্রি কলেজ করেছেন। অনেক খাল কেটেছেন, রাস্তা করেছেন। এই সমস্ত কাজই তিনি করতেন। পাকিস্তান হওয়ার পরে একজন সরকারি কর্মচারী অতি উৎসাহ দেখাবার জন্য সরকারকে মিথ্যা খবর দিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করায় এবং তার শাস্তি হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেব গোপালগঞ্জে এসে ১৯৪৮ সালে সেই কর্মচারীকে বলেছিলেন, চন্দ্র ঘোষের মত মানুষকে গ্রেফতার করে ও মিথ্যা মামলা দিয়ে পাকিস্তানের বদনামই করা হচ্ছে।
