খুলনা জেলে যেয়ে আমি অবাক হয়ে গেলাম। কোনো জায়গাই নাই। একটা মাত্র দালান, তার মধ্যেই কয়েদি ও হাজতি সকলকে একসঙ্গে রাখা হয়েছে। আমাকে কোথায় রাখবে? একটা সেল আছে, সেখানে ভীষণ প্রকৃতির কয়েদিদের রাখা হয়। জেলার সাহেব আমাকে নিয়ে গেলেন ভিতরে। বললেন, “দেখুন অবস্থা, কোথায় রাখব আপনাকে, ছোট জেল।” আমি আবার রাজনৈতিক বন্দি হয়ে গেছি। সাজা আমার খাটা হয়ে গেছে। মাত্র তিন মাস জেল দিয়েছিল। অন্য কোনো রাজনৈতিক বন্দিও এ জেলে নাই। আশ্চর্য হয়ে গেলাম। কর্তৃপক্ষ আমাকে পাঠাল কেমন করে এখানে! বোধহয় ছয়টা সেল, সেলগুলির সামনে চৌদ্দ ফিট দেওয়াল। একদিকে ফাঁসির ঘর, অন্যদিকে বত্রিশটা পায়খানা। সমস্ত কয়েদিরা ঐখানেই পায়খানা করে। যে তিন-চার হাত জায়গা আছে সামনে সেখানেও দাঁড়াবার উপায় নাই দুর্গন্ধে। খাবারেরও কোনো আলাদা ব্যবস্থা করা যাবে না, কারণ উপায় নাই। একটা সেলে আমাকে রাখা হল আর হাসপাতাল থেকে ভাত তরকারি দিবে তাই খেতে হবে, রোগীরা যা খায়। বাড়ি থেকে কিছু চিড়া, মুড়ি, বিস্কুট আমাকে দিয়েছিল। তাই আমাকে খেয়ে বাঁচতে হবে। আমার জীবনটা অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। আমি জেলার সাহেবকে বললাম, “আপনি লেখেন ওপরে। এখানে জায়গা নাই। আমার এখানে থাকা চলবে না। আর যদি রাখতে হয়, থাকার ভাল ব্যবস্থা করতে হবে।”
কয়েকদিনের মধ্যে আবার মামলার তারিখ। জাহাজে উঠে ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোরে গোপালগঞ্জ পৌঁছে দিবে। এই কয়েকদিনের মধ্যেই আমার শরীর অনেকটা খারাপ হয়ে গেছে। একদিন আমাকে জেল অফিসে ডেকে পাঠানো হল। সিভিল সার্জনরা জেলা জেলের এক্স-অফিসিও সুপারিনটেনডেন্ট। এখন খুলনায় মোহাম্মদ হোসেন সাহেব সিভিল সার্জন। তিনি জেল পরিদর্শন করতে এসে আমার কথা শুনে আমাকে অফিসে নিয়ে যেতে বললেন। আমি যেয়ে দেখি তিনি বসে আছেন। আমাকে বসতে বললেন তার কাছে। আমি বসবার সাথে সাথে জিজ্ঞাসা করলেন “আপনি কেন জেল খাটছেন।” আমিও উত্তর দিলাম, “ক্ষমতা দখল করার জন্য।” তিনি আমার মুখের দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ক্ষমতা দখল করে কি করবেন?” বললাম, “যদি পারি দেশের জনগণের জন্য কিছু করব। ক্ষমতায় না যেয়ে কি তা করা যায়?” তিনি আমাকে বললেন, “বহুদিন জেলের সাথে আমার সম্পর্ক রয়েছে। অনেক রাজবন্দির সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। অনেকের সাথে আলাপ হয়েছে, এভাবে কেউ আমাকে উত্তর দেয় নাই, যেভাবে আপনি উত্তর দিলেন। সকলের ঐ একই কথা, জনগণের উপকারের জন্য জেল খাটছি। দেশের খেদমত করছি, অত্যাচার সহ্য করতে পারছি না বলে প্রতিবাদ করেছি, তাই জেলে এসেছি। কিন্তু আপনি সোজা কথা বললেন, তাই আপনাকে ধন্যবাদ দিলাম।” তারপরে আমার সুবিধা অসুবিধার কথা। আলোচনা হল। তিনি আমাকে বললেন যে, তিনিও উপরের কর্মকর্তাদের কাছে রাজবন্দিদের অসুবিধার কথা লিখেছেন। শীঘ্রই উত্তর পাবার আশা করেন। আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে তাও বললেন। জেল অফিসের পিছনে সামান্য জায়গা ছিল। বিকালে ওখানে আমি হাঁটাচলা করতাম। জেলার সাহেব হুকুম দিয়েছিলেন। এই অন্ধকূপের মধ্যে থাকা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। জানালা নাই, মাত্র একটা দরজা, তার সামনেও আবার দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। রাজশাহীর একজন সিপাহির ডিউটি প্রায়ই ওখানে পড়ত। চমত্তার গান গাইত। সে আসলেই তার গান শুনতাম।
৫৮.
আমি গোপালগঞ্জে আসলাম, মামলা চলছিল। সরকারি কর্মচারীরা সাক্ষী। সকলেই প্রায় বদলি হয়ে গেছে। আসতে হয় দূর দূর থেকে, এক একজন এক একবার আসেন। আমি জেল থেকে যাই আর সরকারি উকিল ও কোর্ট ইন্সপেক্টর ফরিদপুর থেকে আসেন। বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে এসেছে। বললাম কিছু ডিম কিনে দিতে, কারণ না খেয়ে আমার অবস্থা খারাপ হয়ে পড়েছে। এক মাসে শরীর আমার একদম ভেঙে গিয়েছে। চোখের অবস্থা খারাপ। পেটের অবস্থা খারাপ হয়ে পড়েছে। বুকে ব্যথা অনুভব করতে শুরু করেছি। রেণু আমাকে সাবধান করল এবং বলল, “ভুলে যেও না, তুমি হার্টের অসুখে ভুগেছিলে এবং চক্ষু অপারেশন হয়েছিল।” ওকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, আর কি করা যায়। হাছ আমাকে মোটেই ছাড়তে চায় না। আজকাল বিদায় নেওয়ার সময় কাঁদতে শুরু করে। কামালও আমার কাছে এখন আসে। হাচু আব্বা বলে দেবে কামালও ‘আব্বা’ বলতে শুরু করেছে। গোপালগঞ্জ থানা এলাকার মধ্যে থাকতে পারি বলে কয়েক ঘন্টা ওদের সাথে থাকতে সুযোগ পেতাম। কিছুদিন পরে দুইজন সাথী পেলাম। নূরুন্নবী নামে একজন রাজনৈতিক বন্দি রাজশাহী থেকে এসেছে, কোর্টে হাজিরা দিতে। কারণ তার বিরুদ্ধে একটা মামলা আছে খুলনা কোর্টে। রাজশাহীতে যখন রাজবন্দিদের উপর গুলি করে তখন সে ওখানেই ছিল। গুলির আঘাতে তার একটা পা ভীষণভাবে জখম হয় এবং ডাক্তার সাহেবরা পা টা কেটে ফেলে দেয়। তাকে এখন এক পায়ে হাঁটতে হয়। অল্প বয়স, সুন্দর চেহারা, জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছে, কিন্তু মুক্তি দেয় নাই। তার বাড়ি বর্ধমান।
কিছুদিন পরে ঢাকা জেল থেকে কৃষক নেতা বিষ্ণু চ্যাটার্জি এলেন, পায়ে ডাণ্ডা বেড়ি দেওয়া অবস্থায়। তার সাজা হয়েছে একটা মামলায়। এখন একজন সাধারণ কয়েদি। আর একটা মামলা খুলনা কোর্টে আছে। তার বিচার শুরু হবে। সদা হাসি খুশি মুখ, কোনো দুঃখ নাই বলে মনে হল। একদিন বললেন, “দুঃখ তো আর কিছু নয়, এরা আমাকে ডাকাতি মামলার আসামি করল!” বিষ্ণু বাবুকে ডিভিশন দেয় নাই। তাই কয়েদির কাপড় তাকে পরে থাকতে ও কয়েদির খানা খেতে হয়। নূরুন্নবী সকল সময়ই মুখটা কালো করে থাকত। জীবনের তরে খোড়া হয়ে গিয়েছে এই তার দুঃখ। তার কাছ থেকে রাজশাহী জেলের অত্যাচারের করুণ কাহিনী শুনলাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও একজন ইংরেজ কর্মচারী কি নির্দয়ভাবে গুলি চালাতে হুকুম দিয়েছিল এবং তাতে সাতজন স্বাধীনতা সগ্রামী রাজনৈতিক বন্দি সকলে মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যারা বেঁচে আছে তাদের অবস্থাও শোচনীয়। কারণ, এমনভাবে তাদের মারপিট করেছে যে জীবনে কিছুই করবার উপায় নাই।
