ঢাকা ও ফরিদপুর জেলে অনেক বড় চোর ও দুর্ধর্ষ ডাকাতের সাথে আলাপ হয়েছে। কারও কারও গলার মধ্যে খোকর’ (মানে গর্ত) থাকে। তার মধ্যে লুকিয়ে টাকা সোনার আংটি, গিনি রাখে। দরকার হলে সেগুলি দিয়ে জিনিসপত্র কিনে আনায়। একটু ভালভাবে থাকার জন্য কিছু কিছু খরচও করে। আমার কাছে সিগারেটের কাগজও চেয়ে নিয়েছে অনেকে। একবার ঢাকায় এক কয়েদিকে বললাম, “আমাকে খোকরের কেরামতি দেখালে কাগজ দিব, নতুবা কাগজ দিব না।” বলল, “দেখাব আপনাকে একটু দেরি করেন।” সিপাহি একটু দূরে গেলে বমি করার ভান করল, তাতে একটা কাঁচা টাকা বের হয়ে আসল। বললাম, “হয়েছে আর দরকার নাই। বুঝতে পেরেছি।”
৫৭.
এক মাস পার হয়ে গেল। আবার গোপালগঞ্জ যাবার সময় হয়েছে। আমাকে সন্ধ্যার পূর্বে গোয়েন্দা বিভাগের একজন কর্মচারী আর বন্দুকধারী সিপাহিরা জেলগেট থেকে নিয়ে গেল। রাতে আমাকে পুলিশ লাইনে থাকতে হল, কারণ ভোর পাঁচটায় ট্যাক্সি ধরে ভাঙ্গায় যেতে হবে। অত ভোরে জেল থেকে কয়েদি নেওয়া সম্ভবপর নয়। পুলিশ লাইনের পাশেই আমার এক বন্ধুর বাড়ি। তাকে খবর দিলে সে আসল আমার সাথে দেখা করতে। অনেকক্ষণ আলাপ করলাম, সে রাজনীতি করে না। তাই কেউ কিছু বলল না। রাতে পুলিশ লাইনের ক্লাবেই ঘুমালাম। খুব ভোরে ভাঙ্গায় রওয়ানা করলাম। ভাঙ্গায় যেতে কয়েক ঘন্টা সময় লাগত। দুইটা ফেরি নৌকা পার হতে হত। রাস্তাও খুব খারাপ ছিল। আমার দু’একজন আত্মীয়স্বজন উপস্থিত ছিল! তারাই খাবার বন্দোবস্ত করল। লঞ্চ বেশি দেরি করবে না। আমরা লঞ্চে উঠে বসলাম, সিন্ধিয়া ঘাটে বিকালে পৌঁছালাম। রাত এখানে কাটাতে হবে। আমি বললাম, কি দরকার সিন্ধিয়া ঘাটে নেমে, চলুন মাদারীপুর যাই। সেখান থেকেই তো রাত এগারটায় জাহাজ ছাড়বে। ভোররাতে সিন্ধিয়া ঘাট থেকে ওঠা বড় কষ্টকর। সিপাহিরা আপত্তি করল না। অনেকদূর উল্টা যেতে হয়। বিকালে মাদারীপুর পৌঁছালাম। জাহাজ ঘাটেই ছিল। আমি জাহাজে উঠে সকলের খাওয়ার কথা বাটলারকে বলে দিলাম। সিপাহিরা বলল, কেন এত খরচ করবেন। ঘাটেই হোটেল, জাহাজ ছাড়তে অনেক দেরি, ওখানেই খেয়ে নিব। মাদারীপুর ঘাটে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা দেরি হবে। আমার আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবরা খবর পেল। অনেকে আসল। কিছু সময় আলাপ করলাম, কে কেমন আছে। আমাকে অনেকগুলি মিষ্টি কিনে দিল। সকলকে খেতে দিতে বাটলারকে বললাম। রাত এগারটায় জাহাজ ছাড়ল। আমি এখন স্বাধীন মানুষ-যদিও পুলিশ পাহারায়, তবু কম কিসে, বাইরের হাওয়া তো পাচ্ছি।
সকাল আটটায় হরিদাসপুর স্টেশনে নেমে নৌকায় গোপালগঞ্জ পৌঁছালাম। সঙ্গের পুলিশদের আমাকে থানায় নিয়ে যেতে বললাম। তাহলে আমাকে রেখে যেখানে হয় তারা যেতে পারবে। গোপালগঞ্জ যেয়ে দেখি থানার ঘাটে আমাদের নৌকা। আব্বা, মা, রেণু, হাচিনা ও কামালকে নিয়ে হাজির। ঘাটেই দেখা হয়ে গেল। এরাও এইমাত্র বাড়ি থেকে এসে পৌঁছেছে। গোপালগঞ্জ থেকে আমার বাড়ি চৌদ্দ মাইল দূরে। এক বৎসর পরে আজ ওদের সাথে আমার দেখা। হাচিনা আমার গলা ধরল আর ছাড়তে চায় না। কামাল আমার দিকে চেয়ে আছে, আমাকে চেনে না আর বুঝতে পারে না, আমি কে? মা কাঁদতে লাগল। আব্বা মাকে ধমক দিলেন এবং কাদতে নিষেধ করলেন। আমি থানায় আসলাম, বাড়ির সকলে আমাদের গোপালগঞ্জের বাসায় উঠল। থানায় যেয়ে দেখি এক দারোগা সাহেব বদলি হয়ে গেছেন, তার বাড়িটা খালি আছে। আমাকে থাকবার অনুমতি দিল সেই বাড়িতে।
তাড়াতাড়ি কোর্টে যেতে হবে। প্রস্তুত হয়ে কোর্টে রওনা করলাম, এবার রাস্তায় অনেক ভিড়। বহু গ্রাম থেকেও অনেক সহকর্মী ও সমর্থক আমাকে দেখতে এসেছে। কোর্টে হাজির হলাম, হাকিম সাহেব বেশি দেরি না করে সাক্ষ্য নিতে শুরু করলেন। পরের দিন আবার তারিখ রাখলেন। আমি আমার আইনজীবীকে বললাম অনুমতি নিতে, যাতে আমার মা, আব্বা, ছেলেমেয়েরা আমার সাথে থানায় সাক্ষাৎ করতে পারেন। তিনি অনুমতি দিলেন। গোপালগঞ্জের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারী এবং যিনি ফরিদপুর থেকে গিয়েছিলেন, তাঁরা আমাকে বললেন, বাইরের লোক দেখা করলে অসুবিধা হবে। আপনার আব্বা, মা, স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা দেখা করলে কোনো অসুবিধা হবে না। আমি আমাদের কর্মী ও অন্যান্য বন্ধুদের থানায় যেতে নিষেধ করলাম, কারণ এদের বিপদে ফেলে আমার লাভ কি? কোর্টেই তো দেখা হয়েছে সকলের সাথে। থানায় ফিরে এলাম এবং দারোগা সাহেবের বাড়িতেই আমার মালপত্র রাখা হল। আব্বা, মা, রেণু খবর পেয়ে সেখানেই আসলেন। যে সমস্ত পুলিশ গার্ড এসেছে ফরিদপুর থেকে তারাই আমাকে পাহারা দেবে এবং মামলা শেষ হলে নিয়ে যাবে। আব্বা, মা ও ছেলেমেয়েরা কয়েক ঘন্টা রইল। কামাল কিছুতেই আমার কাছে আসল না। দূর থেকে চেয়ে থাকে। ও বোধহয় ভাবত, এ লোকটা কে?
পরের দিন সকালবেলা আবার দেখা হল, আমি কোর্ট থেকে ফিরে আসার পরেই আমাকে রওয়ানা করতে হল। বিকালবেলা সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জাহাজে চড়ে সন্ধ্যার পরে সিন্ধিয়া ঘাট পৌঁছালাম। রাত এখানেই কাটাতে হবে। রাতে ডাকবাংলোয় রইলাম। রাতটা ভালভাবেই কেটেছিল। খাওয়া-দাওয়া ভাল ছিল না। তবে বাড়ি থেকে কিছু খাবার দিয়েছিল। খুব সকালবেলা লঞ্চ ধরলাম। সিন্ধিয়া ঘাটেও কয়েকজন কর্মী দেখা করেছিল। লঞ্চ দেরি করে নাই বলে আজ সন্ধ্যার সময়ই ফরিদপুর পৌঁছাতে পেরেছি। আমাকে রাতেই জেলে পৌঁছে দিল। জেলে শুধু তালা আর চাবি। গেটে তালা, ওয়ার্ডে তালা, কামরায় তালা। বাইরে থেকে তালা দেওয়া ঘরে রাত কাটাতে হবে। এইভাবে মামলার জন্য তিন চার মাস আমাকে যাওয়া-আসা করতে হল ফরিদপুর থেকে গোপালগঞ্জ পর্যন্ত। প্রত্যেক তারিখেই আমার বাড়ির সকলের সাথে দেখা হয়েছে। ফরিদপুর থেকে গোপালগঞ্জ যাওয়া-আসা খুবই কষ্টকর ছিল। তাই সরকারের কাছে আমি লিখলাম, আমাকে বরিশাল বা খুলনা জেলে রাখলে গোপালগঞ্জ যাওয়া-আসার সুবিধা হবে। সোজা খুলনা বা বরিশাল থেকে জাহাজে উঠলে গোপালগঞ্জ যাওয়া যায়। কোনো জায়গায় ওঠানামা করতে হয় না। সরকার সেইমত আদেশ দিল, বরিশাল বা খুলনায় আমাকে রাখতে। কর্তৃপক্ষ আমাকে খুলনা জেলে পাঠিয়ে দিলেন। রাজবাড়ী, যশোর হয়ে খুলনা যেতে হল।
