আমাকে একা রাখা হত শাস্তি দেওয়ার জন্য। কারাগারের অন্ধকার কামরায় একাকী থাকা যে কী কষ্টকর, ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ অনুভব করতে পারবে না। জেল কোডে আছে কোনো কয়েদিকে তিন মাসের বেশি একাকী রাখা চলবে না। কোনো কয়েদি জেল আইন ভঙ্গ করলে অনেক সময় জেল কর্মচারীরা শাস্তি দিয়ে সেলের মধ্যে একাকী রাখে। কিন্তু তিন মাসের বেশি রাখার হুকুম নাই।
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে কিছু সময় হাঁটাচলা করে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলাম, এমন সময় একজন আধবুড়া কয়েদি, সেও হাসপাতালে ভর্তি আছে, আমার কাছে এল এবং মাটিতে বসে পড়ল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার বাড়ি কোথায়? বললেন, “বাড়ি গোপালগঞ্জ থানায়, ভেন্নাবাড়ী গ্রামে, নাম রহিম।” আমি বললাম, আপনার নামই রহিম মিয়া? রহিম মিয়া নামে তাকে সকলেই জানে। এত বড় ডাকাত গোপালগঞ্জ মহকুমায় আর পয়দা হয় নাই। তার নাম শুনলেই লোকে ভয় পেয়ে থাকত। রহিম মিয়া চুরি বেশি করত। তবে বাধা দিলে ডাকাতি করত। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “রহিম মিয়া আপনিই না আমাদের বাড়িতে চুরি করে সর্বস্ব নিয়ে এসেছিলেন।” রহিম মিয়া কোন কথা না বলে চুপ করে রইলেন অনেকক্ষণ। ১৯৩৮-১৯৩৯ সালে আমার মা, বড়বোন এবং অন্যান্য বোনদের সোয়াশ’ ভরি সোনার গহনা এবং আমার মার নগদ কয়েক হাজার টাকা চুরি হয়ে যায়। আব্বা তখন গোপালগঞ্জ ছিলেন। আমাদের বাড়ির দুই চারশত বৎসরের ইতিহাসে কোনোদিন চুরি হয় নাই। এই প্রথম চুরি। রহিম মিয়া আস্তে আস্তে বললেন, “হ্যা আমি চুরি করেছিলাম। আমি বললাম, “আমাদের বাড়িতেও সাহস করে এলেন কি করে? আমাদের ঘরে বন্দুক আছে। অনেক শরিকদের বাড়িতে বন্দুক আছে। এত বড় বাড়ি, কত লোক।” সে বলল, “গ্রামের লোক এবং আপনাদের বাড়ির লোক সাথে ছিল। আমরা দুই দিন পরে খবর পেয়েছিলাম, আমাদের এক প্রজা, আমাদের গ্রামের মানুষ-অনেক দিন আমাদের বাড়িতে কাজ করেছে, সে তখন কেরায়া নৌকা চালাত, তার নিজের নৌকায় রহিম ও তার দলকে নিয়ে আসে। চুরি হওয়ার তিন দিন পরে সে আমাদের বাড়িতে এসে ঘটনার কথা স্বীকার করে। মালপত্র ধরা না পড়ার জন্য মামলায় কিছু হল না। থানার এক দারোগাই ওকে নষ্ট করেছিল। রহিমকে ধরতে পারলে গহনা কিছু পাওয়া যেত। অনেক দিন তাকে ধরতে পারে নাই। আব্বা লড়েছিলেন থানার দারোগার বিরুদ্ধে, সে জন্য দারোগা সাহেবের অনেক বিপদে পড়তে হয়েছিল। তখনকার পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট দারোগার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।
রহিম বলতে লাগল তার ইতিহাস। আজ অনেক দিন জেলে আছে। বলল, “আপনাদের বাড়িতে চুরি করে যখন কিছু হল না, তখন ঘোষণা করলাম, লোকে বলে চোরের বাড়িতে দালান হয় না, আমি দালান দেব। দেশের লোক বুঝতে পারল। কিছুদিন পরে আর একটা ডাকাতি করতে গেলাম বাগেরহাটে। সেখানে ধরা পড়লাম। অনেক টাকা খরচ করে জামিন নিয়ে দেশে এলাম। তারপর আরেকটা ডাকাতি করতে গেলাম, গোপালগঞ্জের উলপুর গ্রামের রায় চৌধুরীদের বাড়িতে ডাকাতি করে ফিরবার পথে পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করল। তাদের জানা ছিল আমি কোন পথে ফিরব। এ মামলাটায় জামিন নিলাম, তারপরে আবার ডাকাতি করতে গেলাম আর এক জায়গায়। সেখানেও ধরা পড়লাম, আর জামিন পেলাম না। সকল মামলা মিলে আমার পনের-ষোল বৎসর জেল হয়েছে। পাকিস্তান হওয়ার পূর্বে দমদম জেলে ছিলাম। সেখান থেকে রাজশাহী, তারপর ফরিদপুর জেলে এসেছি। জানেন, জীবনে ডাকাতি বা চুরি করতে গিয়ে আমি ধরা পড়ি নাই, কিন্তু আপনাদের বাড়ি চুরি করার পর যেখানেই গেছি ধরা পড়েছি। জেলে বসে চিন্তা করে দেখলাম, আপনাদের বাড়ি আমাদের পুণ্যস্থান ছিল, সেখানে হাত দিয়ে হাত জ্বলে গেছে। আপনার মা’র কাছে ক্ষমা চাইতে পারলে বোধহয় পাপমোচন হত।” আমি বললাম, “রহিম মিয়া, আমার মা ও আব্বা বড় দুঃখ পেয়েছিলেন। কারণ আমাদের সর্বস্ব গেলেও কিছু হত না কিন্তু আমার বিধবা বড়বোনের গহনাই বেশি ছিল। সে একটা ছেলে ও একটা মেয়ে নিয়ে উনিশ বছর বয়সে বিধবা হয়েছিল।” বলল, “আর জীবনে চুরি করব না। আরও কয়েক বৎসর খাটতে হবে। শরীর ভেঙে গেছে।” আমাকে অনুরোধ করল, কিছু দরকার হলে বলতে, কারণ তার গলায় ‘খোকর’ আছে। তার মধ্যে সোনার গিনি রাখা আছে। আমি বললাম, কোনো প্রয়োজন নাই। মনে মনে বললাম, “হ্যাঁ, সোনার গিনি থাকবে না, তো থাকবে কি? সোয়া শত ভরির গহনা তো সোজা কথা না!” আরও বলল, ফরিদপুর জেলের অনেককে কিনে রেখেছে, কেউ তাকে কিছু বলবে না। ভাবলাম, কেন কিছু বলে না বুঝতে আর বাকি নাই। রহিম মিয়া হাসপাতালে প্রায়ই ভর্তি হয়ে থাকত। শরীর স্বাস্থ্য খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সময় পেলেই আমার কাছে আসত। সুখ-দুঃখের অনেক কথাই বলত। আমার মনে হচ্ছিল, বোধহয় একটা পরিবর্তন এসেছে ওর মনে।
জেলার ছিলেন সৈয়দ আহমেদ সাহেব। তিনি সকল সময় আমার খোজখবর নিতেন। কোন কিছুর অসুবিধা হলে বলতে অনুরোধ করতেন। যদিও সরকার কয়েদিদের দিয়ে ঘানি ঘুরিয়ে তেল করতে নিষেধ করেছেন, তথাপি ফরিদপুর জেলে তখনও ঘানি ঘুরিয়ে তেল করা হচ্ছিল। আমি জেলার সাহেবকে বললাম, “এখনও আপনার জেলে মানুষ দিয়ে ঘানি ঘুরান?” তিনি বললেন, “কয়েকদিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যাবে। গরু কিনতে দিয়েছি।” কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
