বেশি সময় বসতে পারলাম না, কোথাও সাড়া শব্দ নাই। মাত্র এগারটা বাজে, মনে হল সারা দেশ ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু দু’একখানা নৌকা চলছে, তার শব্দ পাই।
ভোরবেলা উঠলাম, নয়টা-দশটার সময় মাদারীপুর থেকে লঞ্চ আসে। সেই লঞ্চেই ভাঙ্গা যেতে হবে। লঞ্চ এল, আমরা উঠে পড়লাম। অনেক লোকের সাথে পরিচয় হল। ভাঙ্গায় একটা দেওয়ানি আদালত আছে। এখানে আমার এক দূরসম্পর্কের ভাই ওকালতি করেন। ভাঙ্গার কাছেই নূরপুর গ্রাম। ওখানে আমার ফুপুর বাড়ি। আদালতের ঘাটেই লঞ্চ থামে। ভাই খবর পেয়ে এলেন, দেখা হল। ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে চললাম। ফুফাতো ভাইয়েরা খবর পায় নাই। ট্যাক্সি ঠিক করে ফরিদপুর রওয়ানা করলাম। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। রাতে জেলে আমাকে নাকি গ্রহণ করবে না। আমাকে পুলিশ লাইনে নিয়ে যাওয়া হল। তার একটা রুম-বোধহয় ক্লাবঘর হবে, সেখানে আমার থাকার বন্দোবস্ত করা হল। রিজার্ভ ইন্সপেক্টর যিনি ছিলেন, তিনি এসে আমার যাতে কোনো কষ্ট না হয় সেদিকে তাঁর লোকদের নজর রাখতে বললেন। আমি কাউকেও খবর দিলাম না। অনেকে আমাকে দেখতে আসল। যদিও ফরিদপুর শহরে আমার অনেক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় রয়েছে। কিন্তু আমার জন্য কারও কোনো কষ্ট হয়, তা আমি কোনোদিন চাই নাই। সকালবেলা চা-নাশতার ব্যবস্থা করেছিল পুলিশ লাইনের সিপাহিরা। আমাকে খেতেই হল। মনে মনে ভাবলাম, আপনারা আমাকে ভালবাসেন। যাদের সাথে একসাথে কাজ করলাম, আমার মত কর্মী হয় না’ এমন কত কথাই না বলেছে পাকিস্তান হওয়ার পূর্বে। তারা আজ আমাকে বিনা বিচারে জেলে তো রেখেছেই, আমার যাতে শাস্তি হয় তার জন্য চেষ্টা করতে একটুও ক্রটি করছে না। তাদের কাছে বিদায় নিয়ে ফরিদপুর জেলে আসলাম। জেল কর্তৃপক্ষ পূর্বেই ডিআইজি থেকে খবর পেয়েছে। জেলগেটে পৌঁছালাম সকালবেলা। জেলার ও ডেপুটি জেলার সাহেব অফিসে। ডেপুটি জেলার সাহেবের কামরায় বসলাম। আমার কাগজপত্র দেখলেন। বললেন, আপনার তো সাজাও আছে তিন মাস। আবার নিরাপত্তা আইনেও আটক আছেন। বললাম, বেশি দিন সাজা নাই, এক মাসের বেশি বোধহয় হয়ে গেছে।
আমাকে কোথায় রাখা হবে তাই নিয়ে আলোচনা করলেন। বোধহয় টেলিফোনও করেছিলেন। কয়েকজন রাজনৈতিক বন্দিও একটা ওয়ার্ডে আছেন। আমাকে সেখানে রাখা হবে, না আলাদা রাখতে হবে? শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের একটা কামরা খালি করতে হুকুম দিলেন, শুনলাম। আমার বাক্স, কাপড়, জামা তল্লাশি করে দেখা হল। আমি চুপ করে বসে আছি। একজন জমাদার এসে আমাকে বলল, আপনি এই কামরায় আসেন। আমি সেই কামরায় গেলে, সে এসে আমার পকেটে হাত দিল। আমি তাকে বললাম, “আপনি আমার গায়ে হাত দেবেন না। আপনি আমাকে তল্লাশি করতে পারেন না। আইনে নাই। জেলার সাহেব বা ডেপুটি জেলার সাহেব দরকার হলে আমাকে তল্লাশি করতে পারেন।” আমি রাগ করেই কথাটা বললাম, বেচারা ঘাবড়িয়ে গেছে। আমি বললাম, “কার হুকুমে আপনি আমার শরীরে হাত লাগালেন, আমি জানতে চাই!” একথা বলে ডেপুটি জেলারকে বললাম, “ব্যাপার কি? আপনি হুকুম দিয়েছেন?” ডেপুটি জেলার তাকে যেতে বললেন এবং আমাকে বললেন, “মনে কিছু করবেন না। ও জানে না। ডেপুটি সাহেবকে বললাম, “দেখুন কি আছে আমার কাছে। সিগারেট, ম্যাচ ও রুমাল আছে।” তিনি লজ্জা পেয়েছিলেন। আমাকে তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দিলেন।
৫৬.
আমি এই প্রথম ফরিদপুর জেলে আসলাম। হাসপাতালটা দোতলা। একতলার একটা রুমে আমি একাকী থাকব। অন্য রুমগুলিতে রোগীরা আছে। বারান্দা আছে, বাইরে বসতে পারব এটাই আমার ভাল লাগল। নিজের জেলা, কিছু কিছু চেনাশোনা লোক আছে। আমাকে একটা ফালতু দিয়েছিল, আমার খেদমত করার জন্য। আমার খাবার আসবে রাজনৈতিক বন্দিদের ওয়ার্ড থেকে। তারা পাঁচ ছয়জন আছেন শুনলাম। বই আমার কাছে যা আছে তাই সম্বল। খবরের কাগজ দিতে বললাম। হাসপাতালের সামনে সামান্য জায়গা ছিল, একটা ফুলের বাগানও ছিল, তাকে যাতে আরও ভাল করা যায় তার ভার নিলাম। সময় তো কাটাতে হবে, ভালই লাগছিল।
রাজনৈতিক বন্দিদের সাথে আমার দেখা হবার উপায় নাই। জেল বেশি বড় না হলেও তারা যেখানে থাকে সেখান থেকে দেখাশোনা হওয়ার উপায় নাই।
আমি তখন নামাজ পড়তাম এবং কোরআন তেলাওয়াত করতাম রোজ। কোরআন শরীফের বাংলা তরজমাও কয়েক খণ্ড ছিল আমার কাছে। ঢাকা জেলে শামসুল হক সাহেবের কাছ থেকে নিয়ে মওলানা মোহাম্মদ আলীর ইংরেজি তরজমাও পড়েছি।
জেলার সাহেব নিজে এসেই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোনো অসুবিধা হলে তাকে বলতে। দিনেরবেলা জেলের ভিতর আমি ঘুমাতে চাই না। তবুও আজ ঘুমিয়ে পড়লাম, কারণ ক্লান্ত ছিলাম। বিকেলে ঘুম থেকে উঠে চা খেয়ে একটু হাঁটাচলা করলাম। সন্ধ্যার সময় তালা বন্ধ করে দিল। পাঁচজন কয়েদি পাহারা থাকবে আমার কামরায় এবং ফালতু থাকবে আমার কাজকর্ম করার জন্য। কয়েদি পাহারাদাররা দুই ঘণ্টা করে এক একজন পাহারা দিত, কামরার ভিতর থেকে। সিপাহি বাইরের থেকে জিজ্ঞাসা করবে, আর পাহারাদাররা চিৎকার করে বলবে, “জানলা বাতি ঠিক আছে।” কয়জন কয়েদি আছে তাও বলবে। আমি বলেছিলাম, “চিৎকার করতে পারবেন না, সিপাহিরা জিজ্ঞাসা করলে আস্তে বলবেন, আমার ঘুমের যেন অসুবিধা না হয়।“ আমার এখানে চিৎকার কম করলে কি হবে, অন্যান্য ওয়ার্ডে ভীষণ চিৎকার করে। ভাগ্য ভাল ওয়ার্ডগুলি দূরে ছিল। তা না হলে উপায় থাকত না।
