সকালবেলা উঠে হাত মুখ ধুয়ে প্রস্তুত হতে লাগলাম। খবর রটে গেছে গোপালগঞ্জ শহরে। পুলিশ লাইনের পাশেই শামসুল হক মোক্তার সাহেব থাকেন, তাঁকে সকলে বাসু মিয়া বলে জানেন। তাঁর স্ত্রীও আমাকে খুব স্নেহ করেন, তাঁকে আমি শাশুড়ি বলে ডাকতাম, আমার দূরসম্পর্কের আত্মীয়াও হতেন। ভদ্রমহিলা অমায়িক ও বুদ্ধিমতী। আমার জন্য তাড়াতাড়ি খাবার পাঠালেন। দশটার সময় আমাকে কোর্টে হাজির করল। অনেক লোক জমা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট হুকুম দিলেন, আমাকে থানা এরিয়ার মধ্যে রাখতে। পরের দিন মামলার তারিখ। গোপালগঞ্জ সাবজেলে ডিভিশন কয়েদি ও নিরাপত্তা বন্দি রাখার কোনো ব্যবস্থাই নাই। কোর্ট থেকে থানা প্রায় এক মাইল, আমাকে হেঁটে যেতে হবে। অন্য কোনো ব্যবস্থা নাই। কারণ, তখন গোপালগঞ্জে রিকশাও চলত না। অনেক লোক আমার সাথে চলল। গোপালগঞ্জের প্রত্যেকটা জিনিসের সাথে আমি পরিচিত। এখানকার স্কুলে লেখাপড়া করেছি, মাঠে খেলাধুলা করেছি, নদীতে সাঁতার কেটেছি, প্রতিটি মানুষকে আমি জানি আর তারাও আমাকে জানে। বাল্যস্মৃতি কেউ সহজে ভোলে না। এমন একটা বাড়ি হিন্দু-মুসলমানের নাই যা আমি জানতাম না। গোপালগঞ্জের প্রত্যেকটা জিনিসের সাথে আমার পরিচয়। এই শহরের আলো-বাতাসে আমি মানুষ হয়েছি। এখানেই আমার রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছে। নদীর পাড়েই কোর্ট ও মিশন স্কুল। এখন একটা কলেজ হয়েছে। ছাত্ররা লেখাপড়া ছেড়ে বের হয়ে পড়ল, আমাকে দেখতে। কিছুদূর পরেই দু’পাশে দোকান, প্রত্যেকটা দোকানদারের আমি নাম জানতাম। সকলকে কুশলাদি জিজ্ঞাসা করতে করতেই থানার দিকে চললাম।
থানায় পৌঁছালেই দারোগা সাহেবরা আমাকে একটা ঘর দিলেন, যেখানে স্বাধীনতার পূর্বে রাজনৈতিক কর্মীদের নজরবন্দি রাখা হত। এই মহল্লায় আমি ছোট সময় ছিলাম। তখন নজরবন্দিদের সাথে আলাপ করতাম ও মিশতাম। আমি ছোট ছিলাম বলে কেউ কিছু বলত না। আজ ভাগ্যের পরিহাস আমাকেই সেই পুরানা ঘরে থাকতে হল, স্বাধীনতা পাওয়ার পরে!
থানার পাশেই আমার এক মামার বাড়ি। তিনি নামকরা মোক্তার ছিলেন। তিনি আজ আর ইহজগতে নাই। আবদুস সালাম খান সাহেবের ভাই। আবদুর রাজ্জাক খান তার নাম ছিল। অনেক লেখাপড়া করতেন, রাজনীতিও তিনি বুঝতেন। তাঁকে সকলেই ভালবাসত। এই রকম একজন নিঃস্বার্থ দেশসেবক খুব কম আমার চোখে পড়েছে। কোনোদিন কিছু চান নাই। আমি তার উপর অনেক সময় অন্যায় করেছি, কিন্তু কোনোদিন রাগ করেন নাই। সালাম খান সাহেব ও তিনি আপন ভাই ছিলেন না, সৎ ভাই ছিলেন। কিন্তু কেউ বুঝতে পারত না কোনোদিন। সালাম সাহেব যখন আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেছিলেন, তিনি দল ত্যাগ করেন নাই। একজন আদর্শবাদী লোক ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে গোপালগঞ্জ এতিম হয়ে গেছে বলতে হবে। লোকে তাকে খুব ভালবাসত ও বিশ্বাস করত। সরকারি কর্মচারীরাও তাঁকে শ্রদ্ধা করত। তাকে লোকে রাজা মিয়া বলে ডাকত। আমি রাজা মামা’ বলতাম। কোর্ট থেকে বাড়িতে খবর দিয়েছে। আমার খাবার তার বাড়ি থেকেই থানায় আসবে। থানায় পৌঁছাবার পূর্বেই আমার নানী ও মামী খবর দিলেন, খাবার প্রস্তুত, গোসল হলেই খবর দিতে। আমি থানার বাইরে এসে দাঁড়িয়ে দেখি মামী ও নানী দাঁড়িয়ে আছেন। আমি সালাম দিলাম। থানার দুই পাশের রাস্তায় অনেক লোক দাঁড়িয়ে আছে আমাকে দেখতে। আমি বাইরে এসে সকলকে আদাব করলাম। তারপর সকলকেই শুভেচ্ছা জানিয়ে যে ঘরে থাকবার বন্দোবস্ত হয়েছে সেই ঘরে চলে যাই। বাড়ি থেকে লোক এসেছিল, সকল খবর নিলাম।
বহুদিন সূর্যাস্তের পরে বাইরে থাকতে পারি নাই। জেলের মধ্যে এক বৎসর হয়েছে, সন্ধ্যার পরে বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দেয়। জানালা দিয়ে শুধু কিছু জ্যোৎস্না বা তারাগুলি দেখার চেষ্টা করেছি। আজ আর ঘরে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে না। বাইরে বসে রইলাম, পুলিশ আমাকে পাহারা দিচ্ছে। পুলিশ কর্মচারী যিনি রাতে ডিউটি করছিলেন, তিনিও এসে বসলেন। অনেক আলাপ হল। বাইরে থেকে দু’একজন বন্ধুবান্ধবও এসেছিল। অনেক রাতে শুতে যেয়ে দেখি, ঘুমাবার উপায় নাই। এক রুমে আমি আর এক রুমে ওয়্যারলেস মেশিন চলছে। খট খট শব্দ; কি আর করা যাবে। আবার বাইরে যেয়ে বসলাম। পরে যখন। আর ভাল লাগছিল না, শুতে গেলাম। বাইরে শোবার ইচ্ছা করছিল, কিন্তু উপায় নাই। গোপালগঞ্জের মশা নামকরা। একটু সুযোগ পেলেই আর রক্ষা নাই। ভোর রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়লাম, অনেক বেলা করে উঠলাম। কোর্টে পরের দিন হাজিরা দিলাম, তারিখ পড়ে গেল। কারণ, ফরিদপুর থেকে কোর্ট ইন্সপেক্টর এসেছেন। তিনি জানালেন, সরকার পক্ষের থেকে মামলাটা পরিচালনা করবেন সরকারি উকিল রায় বাহাদুর বিনোদ ভদ্র। তিনি আসতে পারেন নাই। এক মাস পরে তারিখ পড়ল এবং আমাকে ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট জেলে রাখবার হুকুম হল। আমাকে ফরিদপুর যেতে হবে, সেখান থেকেই মাসে মাসে আসতে হবে, মামলার তারিখের দিনে।
গোপালগঞ্জ মহকুমা যদিও ফরিদপুর জেলায়, কিন্তু কোন ভাল যাতায়াতের বন্দোবস্ত নাই। খুলনা থেকে গোপালগঞ্জে রোজ দুইবার জাহাজ আসে। বরিশাল থেকেও গোপালগঞ্জ সরাসরি জাহাজে যাওয়া যায়। গোপালগঞ্জ থেকে জাহাজে রওয়ানা করলাম মাদারীপুর। সিন্ধিয়াঘাট নামে একটা স্টেশনে নেমে রাতে সেখানে থাকতে হবে। পরের দিন সকালে লঞ্চে যেতে হবে ভাঙ্গা নামে একটা স্থানে; সেখান থেকে ট্যাক্সিতে যেতে হবে ফরিদপুর। পুরা দেড় দিন লাগে। সন্ধ্যায় সিন্ধিয়াঘাট পৌঁছালাম, এখানে একটা ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টের ডাকবাংলো আছে। তিন নদীর মোহনায় এই ডাকবাংলোটাও তিন নদীর পাড়ে। আমি ডাকবাংলোয় রাত কাটাব ঠিক করলাম, পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মচারীরা রাজি হল, কারণ কোথায় রাখবে? এটা একটা বন্দর, ডাকবাংলোর চৌকিদার আমাকে জানত। একটা কামরায় একজন কর্মচারী থাকে আর একটা কামরা আমাকে দেওয়া হল। পাশের গ্রামেও আমার কয়েকজন ভক্ত ছিল। তারা খবর পেয়ে ছুটে আসল। চৌকিদারকে খাবার বন্দোবস্ত করতে বললাম, সিপাহিরাও তাকে সাহায্য করল। কোরবান আলী ও আজহার নামে দুইজন কর্মীর বাড়ি ডাকবাংলোর কাছেই। তারা পীড়াপীড়ি করতে লাগল, তাদের ওখানে খেতে। আমি বললাম, আমার তো কোন আপত্তি নাই। তবে যাওয়া উচিত হবে না তোমাদের বাড়িতে। কারণ যারা আমাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে চলেছে সরকারের কাছে খবর গেলে তাদের চাকরি থাকবে না। বাড়ি থেকে তরকারি পাক করে দিয়েছিল। অনেক রাত পর্যন্ত বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে রইলাম নদীর দিকে মুখ করে। নৌকা যাচ্ছে আর নৌকা আসছে। পুলিশদের বললাম, “আমার জন্য চিন্তা করবেন না, ঘুমিয়ে থাকেন। আমাকে গলাধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দিলেও যাব না। তারা সকলেই হেসে দিয়ে বলল, “আমরা তা জানি, আপনার জন্য আমরা চিন্তা করি না।”
