একদিন ভাসানী সাহেব ও আমি কোর্টে যেয়ে দেখি মানিক ভাই দাঁড়িয়ে আছেন, আমাদের সাথে দেখা করার জন্য। আলাপ-আলোচনা হওয়ার পরে মানিক ভাই বললেন, “নানা অসুবিধায় আছি, আমাদের দিকে খেয়াল করার কেউই নাই। আমি কি আর করতে পারব, একটা বড় চাকরি পেয়েছি করাচিতে চলে যেতে চাই, আপনারা কি বলেন?” আমি বললাম, “মানিক ভাই, আপনিও আমাদের জেলে রেখে চলে যাবেন? আমাদের দেখবারও কেউ বোধহয় থাকবে না। আমি জানতাম মানিক ভাই চারটা ছেলেমেয়ে নিয়ে খুবই অসুবিধায় আছেন। ছেলেমেয়েদের পিরোজপুর রেখে তিনি একলাই ঢাকায় আছেন। মানিক ভাই কিছু সময় চুপ করে থেকে আমাদের বললেন, “না, যাব না আপনাদের জেলে রেখে।”
মওলানা সাহেব সাপ্তাহিক ইত্তেফাক কাগজ বের করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহ বের হওয়ার পরে বন্ধ হয়ে যায়। কারণ টাকা কোথায়? মানিক ভাইকে বললেন, কাগজটা তত বন্ধ হয়ে গেছে, যদি পার তুমিই চালাও। মানিক ভাই বললেন, কি করে চলবে, টাকা কোথায়, তবুও চেষ্টা করে দেখব। আমি মানিক ভাইকে আমার এক বন্ধু কর্মচারীর কথা বললাম, ভদ্রলোক আমাকে আপন ভাইয়ের মত ভালবাসতেন। কলকাতায় চাকরি করতেন, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ভক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের বাসিন্দা নন তবুও বাংলাদেশকে ও তার জনগণকে তিনি ভালবাসতেন। আমার কথা বললে কিছু সাহায্য করতেও পারেন। মানিক ভাই পরের মামলার তারিখে বললেন যে, কাগজ তিনি চালাবেন। কাগজ বের করলেন। অনেক জায়গা থেকে টাকা জোগাড় করতে হয়েছিল। নিজেরও যা কিছু ছিল এই কাগজের জন্যই ব্যয় করতে লাগলেন। কিছুদিনের মধ্যে কাগজটা খুব জনপ্রিয় হতে লাগল। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তাঁকে সাহায্য করতে লাগল। এ কাগজ আমাদের জেলে দেওয়া হত না, আমি কোর্টে এসে কাগজ নিয়ে নিতাম এবং পড়তাম। সমস্ত জেলায় জেলায় কর্মীরা কাগজটা চালাতে শুরু করল। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠানের কাগজ হিসাবে জনগণ একে ধরে নিল। মানিক ভাই ইংরেজি লিখতে ভালবাসতেন, বাংলা লিখতে চাইতেন না। সেই মানিক ভাই বাংলায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ কলামিস্টে পরিণত হলেন। চমৎকার লিখতে শুরু করলেন। নিজেই ইত্তেফাঁকের সম্পাদক ছিলেন। তাকে ছাত্রলীগের দুই-তিনজন কর্মী সাহায্য করত। টাকা পয়সার ব্যাপারে আমার বন্ধুই তাঁকে বেশি সাহায্য করতেন। বিজ্ঞাপন পাওয়া কষ্টকর ছিল, কারণ ব্যবসা-বাণিজ্য কোথায়? আর সরকারি বিজ্ঞাপন তো আওয়ামী লীগের কাগজে দিত না। তবুও মানিক ভাই কাগজটাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন একমাত্র তার নিজের চেষ্টায়।
১৯৫০ সালের শেষের দিকে মামলার শুনানি শেষ হল। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব যে রায় দিলেন, তাতে মওলানা সাহেব ও শামসুল হক সাহেবকে মুক্তি দিলেন। আবদুর রউফ, ফজলুল হক ও আমাকে তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হল। শাস্তি দিলেই বা কি আর না দিলেই বা কি? আমি তো নিরাপত্তা বন্দি আছিই। মওলানা সাহেবও জেলে ফিরে এলেন, কারণ তিনিও নিরাপত্তা বন্দি। আতাউর রহমান সাহেব, কামরুদ্দিন সাহেব ও আরও অনেকে মামলায় আমাদের পক্ষে ছিলেন। আমাকে ডিভিশন দেওয়া হয়েছিল। আপিল দায়ের করলেও আমাকে খাটতে হল। কিছুদিন পরে আমাকে গোপালগঞ্জ পাঠিয়ে দিল, কারণ গোপালগঞ্জে আরও একটা মামলা দায়ের করেছিল। মওলানা সাহেবের কাছে এতদিন থাকলাম। তাঁকে ছেড়ে যেতে খুব কষ্ট হল। কিন্তু উপায় নাই, যেতে হবে। আমি সাজাও ভোগ করছি এবং নিরাপত্তা বন্দিও আছি। ঢাকা জেলে আমাকে সুতা কাটতে দিয়েছিল। আমি যা পারতাম তাই করতাম। আমার খুব ভাল লাগত। বসে বসে খেতে খেতে শরীর ও মন দুইটাই খারাপ হয়ে পড়ছিল। আমাকে নারায়ণগঞ্জ হয়ে খুলনা মেলে নিয়ে চলল। খুলনা মেল বরিশাল হয়ে যায়। বরিশালে আমার বোন ও অনেক আত্মীয় আছে। বেশি সময় জাহাজ বরিশালে থামে না, আর কাউকে পেলামও না। একজন রিকশাওয়ালাকে বলেছিলাম, আমার এক খালাতো ভাই, জাহাঙ্গীরকে খবর দিতে। জাহাঙ্গীরকে সকলে চিনে। জাহাজ ছাড়ার সময় দেখি ছুটে আসছে সাইকেল নিয়ে। সিঁড়ি টেনে দিয়েছে। দাঁড়িয়েই দুই মিনিট আলাপ করলাম। ও বলল, এই মাত্র খবর পেয়েছে। জাহাজ ছেড়ে দিল। আমার বাড়ির স্টেশন হয়েই যেতে হয়। আমার বাড়ি থেকে তিন স্টেশন পরেই গোপালগঞ্জ অনেক রাতে পৌঁছে। পাটগাতি স্টেশন থেকে আমরা ওঠানামা করি। আমাকে সকলেই জানে। স্টেশন মাস্টারকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমাদের বাড়ির খবর কিছু জানেন কি না? যা ভয় করেছিলাম তাই হল, পূর্বের রাতে আমার মা, আব্বা, রেণু ছেলেমেয়ে নিয়ে ঢাকায় রওয়ানা হয়ে গেছেন আমাকে দেখতে। এক জাহাজে আমি এসেছি। আর এক জাহাজে ওরা ঢাকা গিয়েছে। দুই জাহাজের দেখাও হয়েছে একই নদীতে। শুধু দেখা হল না আমাদের। এক বৎসর দেখি না ওদের। মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। বাড়িতে আর কাউকেও খবর দিলাম না। কিছুদিন পূর্বে রেণু লিখেছিল, ঢাকায় আসবে আমাকে দেখতে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি হবে বুঝতে পারি নাই। অনেক রাতে মানিকদহ স্টেশনে পৌঁছালাম। সেখান থেকে কয়েক মাইল নৌকায় যেতে হয় গোপালগঞ্জ শহরে। আমাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল কয়েকজন বন্দুকধারী পুলিশ, একজন হাবিলদার, আর তাদের সাথে আছেন দুইজন গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারী, একজন দারোগা আর একজন বোধহয় তার আর্দালি বা বডিগার্ড হবে। আমরা শেষ রাতে গোপালগঞ্জ পৌঁছালাম। আমাকে পুলিশ লাইনে নিয়ে যাওয়া হল। পুলিশ লাইন থেকে আমার গোপালগঞ্জ বাড়িও খুবই কাছাকাছি। বাড়িতে কয়েকজন ছাত্র থাকে, লেখাপড়া করে। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের অফিসও আমার বাড়িতে। আমার মন খারাপ, আর ক্লান্তও ছিলাম। একটা খাট আমাকে ছেড়ে দিল। খুব যত্ন করল। তাড়াতাড়ি আমার বিছানাটাও করে দিল। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
