৫৪.
আমরা আওয়ামী লীগ গঠন করার সাথে সাথে যে ড্রাফট পার্টি ম্যানিফেস্টো বের করেছিলাম, তাতে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের কথা থাকায় লিয়াকত আলী খান আরও ক্ষেপে গিয়েছিলেন। পূর্ব বাংলা সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও যে উদারতা দেখিয়েছিল দুনিয়ার কোথায়ও তাহার নজির নাই। প্রথম গণপরিষদে পূর্ব বাংলার মেম্বার সংখ্যা ছিল চুয়াল্লিশজন। অর পাত্রাব, সিন্ধু, সীমান্ত ও বেলুচিস্তান নিয়েছিল আঠাশজন। পূর্ব বাংলার কোটার চুয়াল্লিশজন থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের বাসিন্দাদের ছয়জন মেম্বার পূর্ব বাংলা নির্বাচিত করে দেয়। কেউই আপত্তি করে নাই। আমরা সংখ্যাগুরু থাকা সত্তেও রাজধানী পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিকে করা হয়। আমাদের সদস্যরা বা জনগণ আপত্তি করে নাই। কিন্তু যখন দেখলাম, শিল্প কারখানা যা কিছু হতে চলেছে সবই পশ্চিম পাকিস্তানেই গড়ে উঠতে শুরু করেছে, আর কয়েকজন মন্ত্রী ছাড়া পূর্ব বাংলার আর কেউ কোথায়ও নাই, বিশেষ করে বড় বড় সরকারি চাকরিতে পূর্ব বাংলাকে বঞ্চিত করা শুরু হয়ে গেছে।
লিয়াকত আলী খান বাঙালি ও পাঞ্জাবি সদস্যদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে রেখে শাসন করতে চাইছিলেন, কারণ তিনি রিফিউজি। তাঁকে বিশেষভাবে নির্ভর করতে হয়েছিল আমলাতন্ত্রের উপরে—যারা সকলেই পশ্চিম পাকিস্তানের। এই সকল বড় বড় কর্মচারী সকলেই মুসলমান ছিলেন। পূর্ব বাংলার জনগণ নিজের গ্রামের হিন্দু ও বড় কর্মচারীকে বিশ্বাস না করে মুসলমান হিসাবে পশ্চিম পাকিস্তানের কর্মচারীদের বিশ্বাস করেছিলেন। তার ফল হল, বাংলার মুসলমানকে ভাই বললে কি হবে, তারা তাদের নিজের অংশকে গড়তে সাহায্য করতে লাগল, বাংলাদেশকে ফাঁকি দিয়ে।
১৯৫০ সালে গ্রান্ড ন্যাশনাল কনভেনশন ডাকা হয়েছিল ঢাকায়। পূর্ব বাংলার শিক্ষিত সমাজ, আওয়ামী লীগ সদস্যরা, বিশেষ করে—আতাউর রহমান খান, কামরুদ্দিন আহমদ আরও অনেকে এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছিলেন। জনাব হামিদুল হক চৌধুরী তখন মন্ত্রিত্বের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনিও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। পাকিস্তান অবজারভার তখন তিনি বের করেছেন। এতে অনেক সুবিধা হয়েছিল। গ্রান্ড ন্যাশনাল কনভেনশন থেকে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি করা হল। লিয়াকত আলী খান ঢাকায় আসলে এক প্রতিনিধিদল তাঁর সাথে দেখা করলেন এবং তাঁকে পূর্ব বাংলার দাবির কথা জানালেন। জনাব লিয়াকত আলী খান এই আন্দোলনকে ভাল চোখে দেখলেন না। সোহরাওয়ার্দী সাহেবও চুপ থাকার মত নেতা নন। তিনি জীবনভর সংগ্রাম করেছেন। পশ্চিম পাকিস্তানে তিনি একটা দল গঠন করতে সক্ষম হয়েছেন। করাচিতে একদল যুবক মোহাজের কর্মী তাঁর সাথে দেখা করে আওয়ামী লীগ গঠন করতে অনুরোধ করলেন। পাঞ্জাব ও সিন্ধের রাজনৈতিক কর্মীরা এগিয়ে আসলেন। নবাব মামদোতের দলও লিয়াকত আলী খানকে মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করেছিল। জনাব গোলাম মোহাম্মদ পাকিস্তান হওয়ার পূর্বে একজন সরকারি কর্মচারী ছিলেন। তাকে অর্থমন্ত্রী করার ফলে আমলাতন্ত্র মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুর সাথে সাথে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। চৌধুরী মোহাম্মদ আলী কেন্দ্রীয় সরকারের সেক্রেটারি জেনারেল হয়ে একটা শক্তিশালী সরকারি কর্মচারী গ্রুপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পূর্ব বাংলায় জনাব আজিজ আহমদ চিফ সেক্রেটারি ছিলেন। সত্যিকার ক্ষমতা তিনিই ব্যবহার করতেন। জনাব নূরুল আমিন তার কথা ছাড়া এক পা-ও নড়তেন না।
৫৫.
আমরা দিন কাটাচ্ছি জেলে। তখন আমাদের জন্য কথা বলারও কেউ ছিল বলে মনে হয় নাই। সোহরাওয়ার্দী সাহেব লাহোর থেকে একটা বিবৃতি দিলেন। আমরা খবরের কাগজে দেখলাম। আমাদের বিরুদ্ধে মামলাও চলছে। শামসুল হক সাহেবকে নিয়ে মওলানা সাহেব ও আমি খুব বিপদে পড়লাম। তার স্বাস্থ্যও খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। প্রায় বাইশ পাউন্ড ওজন কম হয়ে গেছে। তারপরও রাতভরই জিকির করেন। মাঝে মাঝে গরমের দিন দুপুরবেলা কম্বল দিয়ে সারা শরীর ঢেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুয়ে থাকতেন। মওলানা সাহেব ও আমি অনেক আলোচনা করলাম। আর কিছুদিন থাকলে পাগল হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। দু’একদিন আমার ওপর রাগ হয়ে বলে, “আমাকে না ছাড়লে বন্ড দিয়ে চলে যাব। তোমার ও ভাসানীর পাগলামির জন্য জেল খাটব নাকি?” একদিন সিভিল সার্জন আসলে মওলানা সাহেব ও আমি শামসুল হক সাহেবের অবস্থা বললাম। তার যেভাবে ওজন কমছে তাতে যে কোনো সময় বিপদ হতে পারে। তিনি বললেন, সরকার আমার কাছে রিপোর্ট না চাইলে তো আমি দিতে পারি না অথবা হক সাহেব দরখাস্ত করলে আমি আমার মতামত দিতে পারি। শামসুল হক সাহেব এক দরখাস্ত লিখে রেখেছিলেন, আমি ওটা দিতে নিষেধ করলাম, তিনি আমার কথা রাখলেন। তিনি আর একটা লিখলেন মুক্তি চেয়ে, স্বাস্থ্যগত কারণে। যদিও দুর্বলতা কিছুটা ধরা পড়ে, তবুও উপায় নাই। সিভিল সার্জন সাহেব সত্যিই তাঁর শরীর যে খারাপ হয়ে পড়েছিল তা লিখে দিলেন। পাঁচ-সাত দিন পরেই তার মুক্তির আদেশ আসল। তিনি মুক্তি পেয়ে চলে গেলেন। ভাসানী সাহেব ও আমি রইলাম। কোর্টে হক সাহেবের সাথে আমাদের দেখা হত। সরকার ভাবল, হক সাহেবের মত শক্ত লোক যখন নরম হয়েছে তখন ভাসানী এবং আমিও নরম হব। আমার মেজোবোন (শেখ ফজলুল হক মণির মা) ঢাকায় থাকতেন, আমাকে দেখতে আসতেন। আমি বাড়িতে সকলকে নিষেধ করে দিয়েছিলাম, তবুও আব্বা আমাকে দেখতে আসলেন একবার।
