কয়েকদিন পরে হাজী দানেশ সাহেবকে ঢাকা জেলে এনে আমাদের সাথে রেখেছে। দুই দিন পরেই আবার তাঁকে আমাদের কাছ থেকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হল। কারণ, সরকারি হুকুমে আমাদের সাথে কাউকেও রাখা চলবে না। বিশেষ করে সরকারের মতে যারা কমিউনিস্ট, তাদের সাথে তো রাখা চলবেই না। তাহলে আমরা যদি কমিউনিস্ট হয়ে যাই! জেলের মধ্যে আরও দুই-তিন জায়গায় রাজনৈতিক বন্দিদের রাখা হয়েছে, আলাদা আলাদা করে। এই প্রথম আমি সেলে থাকি। জেলের মধ্যে জেল, তাকেই বলে সেল’। প্রায় দুই মাস পরে যখন দাঙ্গার আসামিরা প্রায়ই জামিন পেয়ে বাইরে গেছে, আর যে সামান্য কয়েকজন আছে তাদের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ড থেকে চার নম্বর ওয়ার্ডে নিয়ে গিয়েছে তখন আমাদের আবার পুরানা পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হল।
তিনতলা বিরাট দালান। তিনতলায় ছোট ছোট ছেলেদের রাখে। আর দোতলার একপাশে আমরা থাকি, একপাশে জেলের অফিস। নিচের তলায় গুদাম। জেলে যে সমস্ত জিনিস তৈরি করে কয়েদিরা, তা এখানেই রাখে। পূর্ব বাংলার একমাত্র কম্বল ফ্যাক্টরি ঢাকা জেলের ভিতরে। কয়েদিরা সুন্দর সুন্দর কম্বল তৈরি করে। দর্জিদের একটা দল আছে। প্রায় একশত লোক কাজ করে এই দর্জি দফায়। পুলিশ, চৌকিদার ও সরকারের অন্যান্য বিভাগের ইউনিফর্ম এখানে তৈরি হয়। ঢাকা জেলের কাঠের মিস্ত্রিরা ভাল ভাল খাট, টেবিল, চেয়ার তৈরি করে। এখানে বেতের কাজও হয়। একজন ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট এই সকল কাজের দায়িত্ব নিয়ে আছেন। এই ডিপার্টমেন্টকে কয়েদিরা এক কথায় ‘এএসডি’ বলে থাকে। আমি নিচে বেড়াতাম এবং এই সমস্ত জিনিস দেখতাম। দোতলা থেকে নামলেই এই গুদাম। এর পাশেও একটা অফিস।
আমি একটা ফুলের বাগান শুরু করেছিলাম। এখানে কোনো ফুলের বাগান ছিল না। জমাদার সিপাহিদের দিয়ে আমি ওয়ার্ড থেকে ফুলের গাছ আনাতাম। আমার বাগানটা খুব সুন্দর হয়েছিল। এই ওয়ার্ডের দেয়ালের পাশেই সরকারি প্রেম ছিল। এটা জেলের একটা অংশ। ভিতরে দেওয়াল দিয়ে বাইরে একটা দরজা করে দেওয়া হয়েছে। প্রেসের শব্দ পেতাম, কিন্তু প্রেস দেখতে পারতাম না। সকালবেলা যখন কর্মচারীরা আসতেন এবং বিকালে ছুটির পর যখন যেতেন আমি জানলা দিয়ে তাদের দেখতাম। ওদের দেখলেই আমার মনে হত যে ওরা বড় জেলে, আর আমরা ছোট্ট জেলে আছি। স্বাধীন দেশের মানুষের ব্যক্তি ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নাই, এর চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কি হতে পারে?
পাকিস্তানের নাগরিকদের বিনা বিচারে বৎসরের পর বৎসর কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছে। ছয় মাস পর পর একটা করে হুকুমনামা সরকার থেকে আসে। ইংরেজ আমলেও রাজনৈতিক বন্দিদের কতগুলি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হত, যা স্বাধীন দেশে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক বন্দিদের খাওয়া-দাওয়া, কাপড়চোপড়, ঔষধ, খবরের কাগজ, খেলাধুলার সামগ্রী এমনকি এদের ফ্যামিলি এলাউন্সও দেওয়া হত ইংরেজ আমলে। নূরুল আমিন সাহেবের মুসলিম লীগ সরকার সেসব থেকেও বন্দিদের বঞ্চিত করেছেন। সাধারণ কয়েদি হিসাবে অনেককেই রাখা হয়েছিল। রাজনৈতিক বন্দিরা দেশের জন্য ও আদর্শের জন্য ত্যাগ স্বীকার করছে, একথা স্বীকার করতেও তারা আপত্তি করছেন। এমনকি মুসলিম লীগ নেতারা বলতে শুরু করেছে, বিদেশী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে জেল খাটলে সেটা হত দেশ দরদীর কাজ। এখন দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে জেল খাটছে যারা, তারা হল রাষ্ট্রদ্রোহী’। এদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে না। ইংরেজের স্যার’ ও ‘খান বাহাদুর উপাধিধারীরা সরকার গঠন করার সুযোগ পেয়ে আজ একথা বলছেন।
জনাব লিয়াকত আলী খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং জনাব নূরুল আমিন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। এদের আমলে যে নির্যাতন ও নিপীড়ন রাজনৈতিক বন্দিদের উপর হচ্ছে তা দুনিয়ার কোনো সভ্য দেশে কোনোদিন হয় নাই। রাজনৈতিক বন্দিরা যাতে কারাগারের মধ্যে ইংরেজ আমলের সুযোগ-সুবিধাটুকু পেতে পারে তার জন্য অনেক দরখাস্ত, অনেক দাবি করেছে কিন্তু কিছুতেই সরকার রাজি হল না। বাধ্য হয়ে তাদের অনশন ধর্মঘট করতে হয়েছিল। ১৯৪৯ সালে ৩৬৫ দিনের মধ্যে ২০০ দিন রাজনৈতিক বন্দিরা অনশন করে, যার ফলে ঢাকা জেলে শিবেন রায় মারা যান। যারা বেঁচেছিলেন অনেকের স্বাস্থ্য চিরদিনের জন্য শেষ হয়ে গিয়েছিল। অনেকে পরে যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হন। অনেকের মাথাও খারাপ হয়ে গিয়েছিল। খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে তাঁদের অবস্থা কি হয়েছিল তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউই বুঝতে পারবেন না।
১৯৫০ সালে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে খাপড়া ওয়ার্ডের কামরায় বন্ধ করে রাজনৈতিক বন্দিদের উপর গুলি করে সাতজনকে হত্যা করা হয়। যে কয়েকজন বেঁচেছিল তাদের এমনভাবে মারপিট করা হয়েছিল যে, জীবনের তরে তাদের স্বাস্থ্য শেষ হয়ে গিয়েছিল। বিভিন্ন জেলে অত্যাচার চলেছিল, রাজনৈতিক বন্দিরাও তাদের দাবি আদায়ের জন্য কারাগার থেকেই অনশন ধর্মঘট করছিল। রাজনৈতিক বন্দিদের অনেক পরিবারের ভিক্ষা করেও সংসার চালাতে হয়েছে। নিয়তিই বলতে হবে। কারণ যারা ইংরেজের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আন্দামানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করেছেন তাঁদের অনেকেই দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে স্বাধীন দেশের জেলে দিন কাটাতে বাধ্য হয়েছেন। লিয়াকত আলী। খান তার কথা রাখবার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যারা আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল করবে তাদের ‘শের কুচাল দেহে’—কথা তিনি ঠিকই রেখেছিলেন। মাথা ভাঙতে না পারলেও মাজা ভেঙে দিয়েছিলেন, জেলে রেখে ও নির্যাতন করে। আমরা তিনজনই এর প্রতিবাদ করেছিলাম। মুসলিম লীগ সরকারের ইচ্ছা থাকলেও আমাদের খাওয়া-দাওয়ার কষ্ট হয় নাই। কারণ, কিছু সংখ্যক সরকারি কর্মচারীর কিছুটা সহানুভূতি ছিল বলে মনে হয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষও আমাদের কষ্ট হোক তা চান নাই। আমীর হোসেন সাহেব সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন ঢাকা জেলে। আমাদের যাতে কোন কষ্ট না হয় তার দিকে নজর রাখতেন। মওলানা সাহেব ও আমাকে আমীর হেসেন সাহেব সপ্তাহে একদিন দেখতে আসলেই আমীর হোসেন সাহেবকে অনুরোধ করতাম যাতে অন্য রাজনৈতিক বন্দিদের কষ্ট না হয়। এদেরও অনেক অসুবিধা ছিল। কারণ, সরকার জেলের ভিতরও গোয়েন্দা রেখে খবর নিত। সেই ভয়েতে এরা কিছুই করতে চাইতেন না। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুর পরে লিয়াকত আলী খান সময় ক্ষমতার মালিক হয়ে এক ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছিলেন। তার হুকুম মত প্রাদেশিক সরকারের নেতারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে বিরোধী দলের নেতা ও কর্মীদের উপর। সীমান্ত প্রদেশ ও বাংলার জেল তখন রাজনৈতিক বন্দিতে প্রায় ভর্তি হয়ে গেছে।
