শামসুল হক সাহেব মাত্র দেড় মাস পূর্বে বিবাহ করেছিলেন। হক সাহেব ও তাঁর বেগম আফিয়া খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতেন। একে অন্যকে পছন্দ করেই বিবাহ করেছিলেন। আমাকে বেশি কিছু বললে আমি তাকে বউ পাগলা’ বলতাম। তিনি ক্ষেপে আমাকে অনেক কিছু বলতেন। মওলানা সাহেব হাসতেন, তাতে তিনি আরও রাগ করতেন এবং মওলানা সাহেবকে কড়া কথা বলে ফেলতেন। মওলানা সাহেবের সাথে আমরা তিনজনই নামাজ পড়তাম। মওলানা সাহেব মাগরিবের নামাজের পরে কোরআন মজিদের অর্থ করে আমাদের বোঝাতেন। রোজই এটা আমাদের জন্য বাঁধা নিয়ম ছিল। শামসুল হক সাহেবকে নিয়ে বিপদ হত। এক ঘণ্টার কমে কোনো নামাজই শেষ করতে পারতেন না। এক একটা সেজদায় আট-দশ মিনিট লাগিয়ে দিতেন। মাঝে মাঝে চক্ষু বুজে বসে থাকতেন।
আমাদের মামলা শুরু হয়ে গেছে, পনের দিন পর পর কোর্টে যেতে হত। কোর্ট হাজতের বারান্দায় আমাদের চেয়ার দেওয়া হত। তাড়াতাড়ি আমাদের আবার পাঠিয়ে দিত।
অনেক সহকর্মী আমাদের সাথে দেখা করতে আসত। ছাত্রলীগ কর্মীরা প্রায় তারিখেই আসত। আতাউর রহমান সাহেব আমাদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করতেন। যেদিন হক সাহেবের সাথে তার বেগম দেখা করতে আসতেন, সেদিন হক সাহেবের সাথে কথা বলা কষ্টকর হত। সত্যই আমার দুঃখ হত। দেড় মাসও একসাথে থাকতে পারল না বেচারী। একে অন্যকে যথেষ্ট ভালবাসত বলে মনে হয়। আমি বেগম হককে ভাবী বলতাম, ভাবী আমাকেও দু’একখানা বই পাঠাতেন। হক সাহেবকে বলে দিতেন, আমার কিছু দরকার হলে যেন খবর দেই। আমি ফুলের বাগান করতাম। তাদের দেখা হবার দিনে ফুল তুলে হয় ফুলের মালা, না হয় তোড়া বানিয়ে দিতাম। হক সাহেব জেলের আবদ্ধ অবস্থা আর সহ্য করতে পারছিলেন না।
তিনি এক নতুন উৎপাত শুরু করলেন। রাতে বারটার পরে জিকির করতেন। আল্লাহু, আল্লাহু করে জোরে জিকির করতে থাকতেন। এক ঘণ্টা থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত। অনেক সময় মধ্যরাতেও শুরু করতেন। আমরা দশ-পনেরজন কেউই ঘুমাতে পারতাম না। প্রথম কয়েকদিন কেউ কিছু বলে নাই। কয়েদিরা দিন কাজ করে। তারা না ঘুমিয়ে পারে না। মওলানা সাহেবের কাছে গোপনে নালিশ করল এবং বলল এবাদত মনে মনে করলেও তো চলে, আমরা ঘুমাতে পারছি না। মওলানা সাহেব হক সাহেবকে বললেন, মনে মনে এবাদত করতে। হক সাহেব শুনলেন না। আমার খাট আর হক সাহেবের খাট পাশাপাশি। আমার পাশে জায়নামাজ বিছিয়ে তিনি শুরু করতেন। আধ ঘণ্টা মাত্র ঘুমিয়েছি, হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। আর শুনতে পাই, কানের কাছে হক সাহেব জোরে জোরে জিকির করছেন। কি করব? আমার তো চুপ করে অত্যাচার সহ্য করা ছাড়া উপায় নাই। যখন আরম্ভ করেন একটানা দশ-পনের দিন পর্যন্ত চলে। একদিন দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়ার পরে হক সাহেবকে বললাম, “এভাবে চলবে কেমন করে? রাতে ঘুমাতে না পারলে শরীরটা তো নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি রাগ করে বললেন, “আমার জিকির করতে হবে, যা ইচ্ছা কর। এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যাও। আমি তখন কিছুই বললাম না, কিছু সময় পরে বললাম, রাতে যখন জিকির করবেন আমি উঠে আপনার মাথায় পানি ঢেলে দেব, যা হবার হবে। তিনি রাগ করলেন না, আস্তে আস্তে আমাকে বললেন, “বুঝতে পারছ না কিছুই, আমি সাধনা করছি। একদিন ফল দেখবা।” কি আর করা যাবে নীরবে সহ্য করা ছাড়া! হক সাহেবের শরীর খারাপ হয়ে চলেছে।
আমরা যখন জেলে তখন এক রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হল, কলকাতা ও ঢাকায়। কলকাতায় নিরপরাধ মুসলমান এবং ঢাকায় ও বরিশালে নিরপরাধ হিন্দু মারা গেল। কে বা কারা রটিয়ে দিয়েছিল যে, শেরে বাংলা ফজলুল হক সাহেবকে কলকাতায় হত্যা করেছে। আর যায় কোথায়! মুসলমানরাও ঝাঁপিয়ে পড়ল। তাদের অনেক লোককে গ্রেফতার করে আনল ঢাকা জেলে। আমরা যেখানে থাকি সেই পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডেই এদের দিনেরবেলায় রাখত। আমার মনে হয়, সাত-আটশত লোককে গ্রেফতার করেছে। আমি তাদের সাথে বসে আলাপ করতাম। সকলেই অপরাধী নয়, এর মধ্যে সামান্য কিছু লোকই দোষী। সাধারণত দোষী ব্যক্তিরা গ্রেফতার বেশি হয় না। রাস্তার নিরীহ লোকই বেশি গ্রেফতার হয়। তাদের কাছে বসে বলি, দাঙ্গা করা উচিত না; যে কোনো দোষ করে না, তাকে হত্যা করা পাপ। মুসলমানরা কোনো নিরপরাধীকে অত্যাচার করতে পারে না, আল্লাহ ও রসুল নিষেধ করে দিয়েছেন। হিন্দুদেরও আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। তারাও মানুষ। হিন্দুস্তানের হিন্দুরা অন্যায় করবে বলে আমরাও অন্যায় করব—এটা হতে পারে না। ঢাকার অনেক নামকরা গুণ্ডা প্রকৃতির লোকেদের সাথে আলাপ হল, তারা অনেকেই আমাকে কথা দিল, আর কোনোদিন দাঙ্গা করবে না। জানি না, তারা আমার কথা রেখেছে কি না? তবে কয়েকজন যে আমার খুবই ভক্ত হয়ে গিয়েছিল তার প্রমাণ আমি জেল থেকে বের হয়ে পেয়েছি। এরা আমাকে রীতিমত ভক্তি করতে শুরু করেছে। আপদে বিপদে আমার পাশেও দাঁড়িয়েছে বিপদ ঘাড়ে নিয়ে। জেল কর্তৃপক্ষ আমাদের সাথে এদের মেলামেশা পছন্দ করছিল না। একদিন সকালে আমাদের এখান থেকে নিয়ে গেল নতুন বিশ নম্বর সেলে। সেলগুলি খুবই ভাল ছিল, নিচতলায় দশটা সেল, আর উপরে দশটা সেল। মওলানা সাহেব দোতলায় একটা সেল নিলেন। আমাকে পাশের সেলে থাকতে বললেন। হক সাহেব আমার পাশের সেলে থাকবেন ঠিক করলেন এবং বললেন, “খুব ভাল হয়েছে। এখন আমি রাতভর জিকির করব, কেউ কিছু বলতে পারবে না। আমি ভাবলাম, মহাবিপদ! তাকে বললাম, “হয় আপনি উপরে থাকেন, না হয় আমি উপরে থাকব। আমার পাশের সেল থেকে যদি শুরু করেন, তবে ঘুমের কাজ হয়েছে।” হক সাহেব রাগ করে নিচে চলে গেলেন এবং এক পাশের একটা সেল নিলেন। আমি তাকে অনেক অনুরোধ করলাম, মওলানা সাহেবও বললেন, কিছুতেই শুনলেন না। এখন থেকে তিনি আরও জোরে জোরে জিকির করতে লাগলেন। আর তার উৎপাতে আমরা ঘুমাতে পারি না।
