হামিদ খাবার আনতে গিয়েছিল হোটেল থেকে, পুলিশ দেখে খাবার নিয়ে ভেগে গেছে। ভদ্রলোকেরা কতক্ষণ দেরি করবে? হামিদ যখন আর আসছে না, জালালও বাইরে গেছে, কখন ফিরবে ঠিক নাই তাই আলী আমজাদ খান সাহেবের বড় ছেলে হেনরীকে খবর দিলাম। হেনরী ছুটে এসেছে। আমি যে কিছুই খাই নাই, একথা শুনে বাড়িতে যেয়ে খাবার নিয়ে আসল। কিছু খেয়ে নিলাম। হেনরীর ছোট ভাই শাহজাহান, বোধহয় সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে, সেও এসেছে এবং তার মামুকে গালাগালি করতে শুরু করেছে। তার মামা এই বাড়ির দোতলায় থাকত। শাহজাহান বলতে লাগল, “আর কেউ পুলিশকে খবর দেয় নাই, মামাই দিয়েছে। বাবা বাড়িতে আসুক ওকে মজা দেখাব।” শাহজাহান আমাকে খুব ভালবাসত, সময় পেলেই আমার কাছে ছুটে আসত। আমি যখন পুলিশের গাড়িতে উঠে চলে যাই, শাহজাহান কেঁদে দিয়েছিল। আমার খুব খারাপ লেগেছিল। শাজাহানের ঐ কান্নার কথা কোনোদিন ভুলতে পারি নাই। পরে খবর পেয়েছিলাম, ওর মামাই টাকার লোভে আমাকে ধরিয়ে দিয়েছিল। আলী আমজাদ সাহেব ও আনোয়ারা বেগম ওকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
আমাকে লালবাগ থানায় নিয়ে আসল। দুইজন আইবি অফিসার আমাকে ইন্টারোগেশন করতে শুরু করল। প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সে পর্ব চলল। আমি বললাম, “আওয়ামী লীগ করব। আমি লাহোর গিয়েছিলাম কি না? কোথায় ছিলাম? কি কি করেছি? ঢাকায় কবে এসেছি? বাড়িতে কতদিন ছিলাম? ভবিষ্যতে কি করব? সোহরাওয়ার্দী সাহেব কি কি বলেছেন? এইসব প্রশ্নে যে কথা বলার সেইটুকু বললাম, যা বলবার চাই না সে কথার উত্তর দিলাম না। আমাকে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার দেখাল এবং সন্ধ্যার পরে কোতোয়ালি থানায় নিয়ে গেল। রাতে আমাকে থানায় রাখল। জালাল আমার সুটকেস ও বিছানা থানায় পৌঁছে দিল। সন্ধ্যার পরে আনোয়ারা খাতুন এমএলএ, আতাউর রহমান খান সাহেব, আমার বিয়াই দত্তপাড়ার জমিদার শামসুদ্দিন আহমদ চৌধুরী এমএলএ আমাকে দেখতে থানায় এসেছিলেন। রাতে জনাব সিদ্দিক দেওয়ান, বোধহয় তখন ইন্সপেক্টর ছিলেন, বাড়ির থেকে বিছানা, মশারি এনে দিলেন। আমার বিছানাও এসে গিয়েছিল, কোনো অসুবিধা হয় নাই। তিনি ও অন্যান্য পুলিশ কর্মচারী আমার সাথে খুবই ভাল ব্যবহার করেছিলেন, যাতে কোনো অসুবিধা না হয় তার দিকে সকলেই নজর দিয়েছিলেন।
৫৩.
পরের দিন দুপুরবেলায় আমাকে ঢাকা জেলে পাঠিয়ে দিল। আমি জেলে আসার পরে শুনলাম, আমাকে ডিভিশন দেয় নাই। সাধারণ কয়েদি হিসাবে থাকতে হবে। তখনও রাজনৈতিক বন্দিদের জন্য কোনো স্ট্যাটাস দেওয়া হয় নাই। যাকে ইচ্ছা ডিভিশন দিতে পারে সরকার, আর না দিলে সাধারণ কয়েদি হিসাবে জেল খাটতে হবে। সাধারণ কয়েদিরা যা খায় তাই খেতে হবে। দুপুরে কিছুই পেলাম না। আমাকে হাজতে রাখা হয়েছে সাধারণ কয়েদিদের সাথে। আরও দুই তিনজন রাজনৈতিক কর্মীও সেখানে ছিল। তারা আমাকে তাদের কাছে নিয়ে রাখল। রাতে ওদের সাথেই কিছু খেলাম, কারণ খুবই ক্ষুধা পেয়েছিল। মওলানা সাহেব ও শামসুল হক সাহেব পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডে আছেন। তাদের ডিভিশন দেওয়া হয়েছে। আমাকে ডিভিশন দেওয়া হয় নাই বলে তাঁদের কাছে রাখা হয় নাই।
খুব ভোরে একজন জমাদার সাহেব এসে বললেন, “চলুন আপনাকে অন্য জায়গায় নিতে হবে। আমি বললাম, “কোথায় যেতে হবে বলেন, তারপর যাব।” তিনি বললেন, “আপনার ডিভিশন অর্ডার এসে গেছে রাতেই। মওলানা সাহেবের কাছে আপনাকে নিয়ে যাওয়ার হুকুম হয়েছে। এর বেশি আমি জানি না। আমি অন্যদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। যে দুই তিনজন রাজনৈতিক কর্মী সেখানে ছিল তাদের নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে নাই। মামলা আছে, দুই একদিনের মধ্যে জামিন পেয়ে যাবে বলে আশা করে। আমি মওলানা সাহেব ও শামসুল হক সাহেবের কাছে এলাম। একই রুমে আমরা থাকব। শামসুল হক সাহেবের কাছে বিছানা করলাম, কারণ আমি সিগারেট খাই। মওলানা সাহেবের সামনে সিগারেট খাই না।
১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি জেলে আসলাম। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হয়েছে। আমার তিনবার জেলে আসতে হল, এইবার নিয়ে। মওলানা সাহেবের কাছে সকল কিছুই বললাম। মওলানা সাহেব এক এক করে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব কি বলেছেন? পীর মানকী শরীফের মতামত কি? মিয়া সাহেব রাজনীতি করবেন কি না? নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গঠন হবে কি না? হলে, কতদিন লাগবে? লাহোরে কোথায় ছিলাম? ঢাকার খবর কি? মওলানা সাহেবের কাছে শুনলাম, আমাদের বিরুদ্ধে একটা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মওলানা সাহেব, শামসুল হক সাহেব, আবদুর রব, ফজলুল হক বিএসসি ও আমি আসামি। আবদুর রব ও ফজলুল হককে জামিন দিয়েছে। নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে নাই, তাই তারা বাইরে আছে। মামলা শুরু হয় নাই, কারণ আমাকে গ্রেফতার করতে পারে নাই। নাজিরা বাজারে পুলিশের সাথে ১১ই অক্টোবর তারিখে যে গোলমাল হয় তার উপর ভিত্তি করেই মামলা দায়ের করেছে।
যে কামরায় আমরা আছি সেখানে আমরা তিনজন ছাড়াও কয়েকজন ডিভিশন কয়েদি আছে। এদের কয়েকজনের বিশ বৎসর জেল, আর কয়েকজনের অল্প শাস্তি হয়েছে। এদের আর্থিক অবস্থা ভাল বলে সরকার ডিভিশন দিয়েছে এবং এরাও আমাদের মত খাট, মশারি, বিছানা, সাদা কাপড় পায়। এদের মধ্যে একজন ম্যানেজার আছে, সে আমাদের বাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা এবং দেখাশোনা করে। আমাদের দিন ভালভাবেই কাটছিল। শামসুল হক সাহেব আমার উপর খুব রাগ করেছিলেন। কারণ, কেন আমি শোভাযাত্রা করতে প্রস্তাব দিয়েছিলাম। শোভাযাত্রা না করলে তো গোলমাল হত না। আর আমাদের জেলে আসতে হত না এই সময়।
