আমি পারমিট পেলাম, দেরি হল না, কারণ মিয়া সাহেব বলে দিয়েছেন। পারমিটে ছিল, তিন দিনের মধ্যে ভারতবর্ষ ত্যাগ করতে হবে। তিন দিনের বেশি ভারতবর্ষে থাকতে পারব না। আমি হিসাব করে দেখলাম, তিন দিনের মধ্যেই পূর্ব বাংলায় ঢুকতে পারব। শহীদ সাহেব আমার হোটেলের টাকা শোধ করে দিলেন, দিল্লি পর্যন্ত প্লেনের টিকিট কিনে দিলেন। তখন ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজ ছিল পাকিস্তানে। আর সামান্য কিছু টাকা দিলেন, যাতে বাড়িতে পৌঁছাতে পারি। পাকিস্তানের টাকা বেশি নেওয়ার হুকুম নাই। বোধহয় তখন ছিল পঞ্চাশ টাকা পাকিস্তানী এবং পঞ্চাশ টাকা ভারতবর্ষের। ভারতবর্ষের টাকা পাওয়া কষ্টকর। সোহরাওয়ার্দী সাহেব নবাবজাদা জুলফিকারকে (নবাব সাহেবের ছোট ভাই) বললেন, আমাকে প্লেনে তুলে দিতে। কারণ, একটা খবর পেয়েছিলেন আমাকে গ্রেফতার করতে পারে এয়ারপোর্টে। আমাকে গ্রেফতার করলে যাতে শহীদ সাহেব তাড়াতাড়ি খবর পেতে পারেন, সেজন্যেই তাকে সঙ্গে দেওয়া হয়। আমাকে নিয়ে তিনি এয়ারপোর্ট পৌঁছালেন। আমার মালপত্র আলাদা করে রাখল দেখলাম। আমাকে একজন কর্মচারী উপরের একটা ঘরে নিয়ে গেলেন। আমার পারমিট দেখলেন। মালপত্র ভালভাবে তল্লাশি করলেন এবং বললেন, “আপনি এখানে বসুন, কোথাও যাবেন না।” নবাবজাদা জুলফিকার সাহেব আমার কাছে আসলেন এবং বললেন, “মনে হয় কিছু একটা করবে। প্লেন ছাড়ার সময় হয়ে গেছে কিন্তু প্লেন ছাড়ছে না।” প্যাসেঞ্জারদের একবার চড়তে দিল, আবার নামিয়ে নিয়ে আসল। বোধহয় উপরের হুকুমের প্রতীক্ষায় রয়েছে। নবাবজাদা খবর আনলেন এবং বললেন, আপনার ব্যাপার নিয়েই প্লেন দেরি হচ্ছে। এক ঘণ্টা পর প্লেন ছাড়ার অনুমতি পেল এবং আমাকে বলল, “আপনি যেতে পারেন। আমি নবাবজাদার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্লেনে উঠলাম এবং তাঁকে অনুরোধ করলাম, শহীদ সাহেবকে ঘটনাটা বলতে। আমি বুঝতে পারলাম, আমাকে যেতে দিবে, না আটক করবে, এই নিয়ে দেরি করছে। বোধহয় শেষ পর্যন্ত দেখল, বাংলার ঝাট পাঞ্জাবে কেন? তিন দিনের মধ্যেই ভারত ত্যাগ করতে হবে। পূর্ব বাংলা সরকারকে খবর দিলেই আমাকে হয় দর্শনায়, না হয় বেনাপোলে গ্রেফতার করতে পারবে। আমি যে ভারতবর্ষে থাকতে পারব না একথা পারমিটে লেখা আছে। কলকাতার সরকারি কর্মচারীরা খবর পেলে আমাকে কলকাতার জেলের ভাতও খাওয়াতে দ্বিধাবোধ করবে না, কারণ আমি শহীদ সাহেবের দলের মানুষ।
সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে ছেড়ে আসতে আমার খুব কষ্টই হচ্ছিল, কারণ জীবনের বহুদিন তার সাথে সাথে ঘুরেছি। তার স্নেহ পেয়েছি এবং তাঁর নেতৃত্বে কাজ করেছি। বাংলাদেশে শহীদ সাহেবের নাম শুনলে লোকে শ্রদ্ধা করত, তার নেতৃত্বে বাংলার লোক পাকিস্তান আন্দোলনে শরিক হয়েছিল। যার একটা ইঙ্গিতে হাজার হাজার লোক জীবন দিতে দ্বিধাবোধ করত না, আজ তাঁর কিছুই নাই। মামলা না করলে তার খাওয়ার পয়সা জুটছে না। কত অসহায় তিনি! তার সহকর্মীরা—যারা তাকে নিয়ে গর্ববোধ করত, তারা আজ তাঁকে শত্রু ভাবছে। কতদিনে আবার দেখা হয় কি করে বলব? তবে একটা ভরসা নিয়ে চলেছি, নেতার নেতৃত্ব আবার পাব। তিনি নীরবে অত্যাচার সহ্য করবেন না, নিয়েই প্রতিবাদ করবেন। পূর্ব বাংলায় আমরা রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করতে পারব এবং মুসলিম লীগের স্থান পূর্ব বাংলায় থাকবে না, যদি একবার তিনি আমাদের সাহায্য করেন। তার সাংগঠনিক শক্তি ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব জাতি আবার পাবে।
৫১-৬০. দিল্লি পৌঁছালাম
দিল্লি পৌঁছালাম এবং সোজা রেলস্টেশনে হাজির হয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর ওয়েটিংরুমে মালপত্র রাখলাম। গোসল করে কিছু খেয়ে নিয়ে মালপত্র দারোয়ানের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। টিকিট কিনে নিয়েছি। রাতে ট্রেন ছাড়বে। অনেক সময় হাতে আছে। আমি একটা টাঙ্গা ভাড়া করে জামে মসজিদের কাছে পৌঁছালাম। গোপনে গোপনে দেখতে চাই মুসলমানদের অবস্থা। পার্টিশনের সময় এক ভয়াবহ দাঙ্গা হয়েছিল এই দিল্লিতে। দেখলাম, মুসলমানদের কিছু কিছু দোকান আছে। কারও সাথে আলাপ করতে সাহস হচ্ছিল না। হাঁটতে হাঁটতে লালকেল্লায় গেলাম। পূর্বেও গিয়েছি, হিন্দুস্তানের পতাকা উড়ছে। ভিতরে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। মুসলমানদের অনেক দোকান ছিল পূর্বে, এখন দু’একটা ছাড়া নাই। বেশি সময় থাকতে ইচ্ছা হল না। বেরিয়ে আসলাম, আর একটা টাঙ্গা নিয়ে চললাম এ্যাংলো এ্যারাবিয়ান কলেজের দিকে, যেখানে ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগ কনভেনশনে যোগদান করেছিলাম।
নতুন দিল্লিও ঘুরে দেখলাম। নতুন দিল্লি এখন আরও নতুন রূপ ধারণ করেছে। ভারতবর্ষের রাজধানী। শত শত বৎসর মুসলমানরা শাসন করেছে এই দিল্লি থেকে, আজ আর তারা কেউই নাই। শুধু ইতিহাসের পাতায় স্বাক্ষর রয়ে গেছে। জানি না যে স্মৃতিটুকু আজও আছে, কতদিন থাকবে! যে উগ্র হিন্দু গোষ্ঠী মহাত্মা গান্ধীর মত নেতাকে হত্যা করতে পারে, তারা অন্য সম্প্রদায়কে সহ্য করতে পারবে কি না? এই দিল্লিতেই মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত নেহেরু ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। খোদা শহীদ সাহেবকে রক্ষা করেছিলেন। নাথুরাম গডসের সহকর্মী মহাত্মা গান্ধী হত্যা মামলার সাক্ষী হিসাবে জবানবন্দিতে এই কথা স্বীকার করেছিল।
আমি রাতের ট্রেনে চড়ে বসলাম। আমার সিট রিজার্ভ ছিল। দ্বিতীয় শ্রেণীতে আরও তিনজন ভদ্রলোক ছিলেন। কারও সাথে আলাপ করতে সাহস হল না। একটা কাগজ নিয়ে পড়তে লাগলাম। তখনও ভারতবর্ষে মাঝে মাঝে গোলমাল চলছিল। তবে মহাত্মাকে হত্যা করার পর কংগ্রেস সরকার বাধ্য হয়েছিল সাম্প্রদায়িক আরএসএস ও হিন্দু মহাসভার কর্মীদের উপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। মহাত্মা গান্ধী যে মুসলমানদের রক্ষা করবার জন্য জীবন দিলেন তার জন্য তাঁর ভক্তদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। তারা মুসলমানদের সাথে ভাল ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে দেখি দুইজন প্যাসেঞ্জার নেমে গেছেন, একজন আছেন। তিনি পশ্চিম বাংলার লোক। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কোথা থেকে এসেছি? কোথায় যাব? আমি সত্য কথাই বললাম। লাহোর থেকে এসেছি, পূর্ব বাংলায় যাব। আমার বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। ভদ্রলোক বললেন, “আমার বাড়িও বরিশাল জেলায় ছিল। এখন চাকরি করি দিল্লিতে।” অনেক আলাপ হল, পূর্ব বাংলার মাছ ও তরকারি, পূর্ব বাংলার আলো-বাতাস। আর জীবনে যেতে পারবেন না বলে আফসোস করলেন, কেউই নাই তার এখন বরিশালে। ভদ্রলোক আমাকে হাওড়ায় নেমে যেতে বললেন, “আপনি আমার বাড়িতে রাতে থাকতে পারেন, কোনো অসুবিধা হবে না।” আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বললাম, “কাল সকালে চলে যেতে হবে, সেজন্য রাতটা এক বন্ধুর বাড়িতে থাকব।”
