৪৯.
এ সময় একটা দুঃখজনক ঘটনা ঘটে গেল। আমি একদিন মিয়া সাহেবের সাথে দেখা করতে পাকিস্তান টাইমসের অফিসে যাই। তখন প্রায় সকাল এগারটা। মিয়া সাহেব সেখানে নাই। আমি কিছু সময় দেরি করলাম। মিয়া সাহেব আসলেন না। আমার কাজ ছিল শহীদ সাহেবের সাথে। হাইকোর্টে যাব তার সাথে দেখা করতে। যখন আমি বের হয়ে কিছুদূর এসেছি, তিন চারজন লোক আমার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, আমার বাড়ি কোথায়? আমি বললাম, “পূর্ব পাকিস্তানে।” হঠাৎ একজন আমার হাত, আর একজন আমার জামা ধরে বলল, “তোম পাকিস্তান কা দুশমন হ্যায়”। আরেকজন একটা হান্টার, অন্যজন একটা ছোরা বের করল। আমি হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম, “আপনারা আমাকে জানেন, আমি কে?” তারা বলল, “যা, জানতা হ্যায়।” আমি বললাম, “কথা শোনেন, কি হয়েছে বলুন, আর যদি লড়তে হয় তবে একজন করে আসুন।” একজন আমাকে ঘুষি মারল, আমি হাত দিয়ে ঘুষিটা ফিরালাম। অনেক লোক জমা হয়ে আছে। কয়েকজন ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞাসা করল, কি হয়েছে? আমি বললাম, “কিছুই তো জানি না। এদের কাউকেও চিনিও না। আমি পূর্ব বাংলা থেকে এসেছি। পাকিস্তান টাইমস অফিসে এসেছিলাম মিয়া সাহেবের সাথে দেখা করতে। এরা কেন আমাকে মারতে চায়, বুঝতে পারলাম না। কয়েকজন ভদ্রলোক ও কয়েকজন ছাত্রও ছিল। তারা ওদের কি যেন বলল, আর একজন ওদের ওপর রাগ দেখাল, ওরা সরে পড়ল। আমি ল’কলেজ হোস্টেলে গেলাম, কাজমীকে খবর দিতে। কাজমী ছিল না হোস্টেলে। একটা টাঙ্গা নিয়ে হাইকোর্টে আসলাম সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কাছে। কিছুই পেলাম না, ভীষণ রাগ হয়েছে। বিকালে তার সাথে নবাব সাহেবের বাড়িতে যেয়ে সকল ঘটনা বললাম। শহীদ সাহেব নবাব সাহেবকে জানালেন। সন্ধ্যার পূর্বেই হোটেলে চলে এলাম। কাজমী সন্ধ্যার পরে হোটেলে এসে সবকিছু শুনে নিজেই সেই জায়গায় চলে গেল কয়েকজন ছাত্র নিয়ে এবং দোকানদারদের কাছে জিজ্ঞাসা করল। তারা বলেছিল যে, যারা আমাকে আক্রমণ করেছিল তারা ঐ জায়গার কেউ নয়। বাইরের কোথাও থেকে এসেছিল। বোঝা গেল মুসলিম লীগ ওয়ালাদের কাজ। এখানেও গুণ্ডা লেলিয়ে দিয়েছে। লুথাের আমাকে বলল, “সাবধানে থেকো।”
আমি এই ঘটনা আর কাউকে বললাম না। নবাব সাহেবকে পাঞ্জাবের বড় বড় সরকারি কর্মচারীরা সম্মান করত। আমার উপর আক্রমণের কথাটা সেখানেও পৌঁছে ছিল। আমার অসুবিধা ছিল ভাল উর্দু বলতে পারতাম না। আর সাধারণ পাঞ্জাবিরাও ভাল উর্দু বলতে পারে না। পাঞ্জাবি ও উর্দু মিলিয়ে একটা খিচুড়ি বলে। যেমন আমি বাংলা ও উর্দু মিলিয়ে খিচুড়ি বলতাম। এই সময় পাঞ্জাবে প্রগতিশীল লেখকদের একটা কনফারেন্স হয়। মিয়া সাহেব আমাকে যোগদান করতে অনুরোধ করলেন। আমি যোগদান করলাম। লেখক আমি নই, একজন অতিথি হিসাবে যোগদান করলাম। কনফারেন্স দুই দিন চলল। লুথাের সাহেবও যোগদান করেছিলেন, বেচারার গাড়িটি বাইরে রেখে সভায় যোগদান করেছিলেন; কে বা কারা গাড়িটায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। লুথাের সাহেবের বাহনটাও নষ্ট হয়ে গেল। ইংরেজরা ১৯৪২ সালের আন্দোলনে তাঁর বাড়িটি পুড়িয়ে দিয়েছিল। কারণ, তখন তিনি সীমান্ত কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। জেল থেকে বের হয়ে মুসলিম লীগে যোগদান করেছিলেন। লুথাের আমাকে বললেন, “লাহোরে এ সকল ঘটনা হয়ে থাকে, তবে আমি পাঠান, আমাকে এরা ভয় করে। সামনে কিছুই বলতে বা করতে সাহস পাবে না, তাই পিছন থেকে আঘাত করার চেষ্টা করছে।”
৫০.
প্রায় এক মাস হয়ে গেল, আর কতদিন আমি এখানে থাকব? “ঢাকায় মওলানা সাহেব, শামসুল হক সাহেব এবং সহকর্মীরা জেলে আছেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে বললাম। তিনি বললেন, “ঢাকায় পৌঁছার সাথে সাথেই তারা তোমাকে গ্রেফতার করবে। লাহোরে গ্রেফতার নাও করতে পারে।” আমি বললাম, “এখান থেকে গ্রেফতার করেও আমাকে ঢাকায় পাঠাতে পারে। কারণ লিয়াকত আলী সাহেবও ক্ষেপে আছেন। পূর্ব বাংলার সরকার নিশ্চয়ই চুপ করে বসে নাই। তারা কেন্দ্রীয় সরকারকে খবর পাঠিয়েছে পাঞ্জাব সরকারকে হুকুম দিতে। সে খবর এসে পৌঁছাতেও পারে। এখানেও আমি তো চুপ করে নাই। তাই যা হবার পূর্ব বাংলায় হোক, পূর্ব বাংলার জেলে ভাত পাওয়া যাবে, পাঞ্জাবের রুটি খেলে আমি বাঁচতে পারব না। রুটি আর মাংস খেতে খেতে আমার আর সহ্য হচেছ না। আর জেলে যদি যেতেই হবে, তাহলে আমার সহকর্মীদের সাথেই থাকব।” শহীদ সাহেব বললেন, তবে যাবার বন্দোবস্ত কর। কি করে কোন পথে যাবা, তিনি জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, “রাস্তা তো একটাই, পূর্ব পাঞ্জাব দিয়ে আমি যাব না। প্লেনে লাহোর থেকে দিল্লি যাব, সেখান থেকে ট্রেনে যাব। ভারতবর্ষ হয়ে যেতে হলে একটা পারমিটও লাগবে। ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার পারমিট দেওয়ার মালিক। লাহোরে তাদের অফিস আছে।” আমি আরও বললাম, “মিয়া সাহেবকে বলেছি, তিনি ডেপুটি হাইকমিশনারকে বলে দেবেন। কারণ, তাঁকে তিনি জানেন।” শহীদ সাহেব আমাকে প্রস্তুত হতে বললেন। এই সময় পূর্ব বাংলার সিএসএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কয়েকজন বন্ধু লাহোরের সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে ছিলেন। তাঁদের সাথে দেখা করতে গেলাম। অনেকের সাথে দেখা হল। একজন সরকারি দলের ছাত্রনেতা ছিলেন, তিনি বাংলা ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন। আমার সাথে তাঁর পরিচয় ছিল। আমাকে বললেন, “আপনি আমার কাছে চা খাবেন। কারণ আমি বুঝতে পেরেছি লাহোরে এসে, যে বাংলা ভাষার দাবি আপনারা করেছিলেন তা ঠিক ছিল, আমিই ভুল করেছিলাম। বাঙালিদের এরা অনেকেই ঘৃণা করে।” আমি কোন আলোচনা করলাম না সেখানে বসে, কারণ সেটা উচিত না। এরা এখন সকলেই সরকারি কর্মচারী, কেউ কিছু মনে করতে পারেন।
