কোথায় যাব ভাবলাম? হোটেলে থাকব না। বন্ধু খন্দকার নূরুল আলমের বাসা চিনি, তার কাছেই যাব। নূরুল আলমের বাড়ি পার্ক সার্কাসে আসলাম। ওর ভাই বাসায় আছে, আলম নাই, বাইরে গেছে। আমাকে খুব যত্ন করে গ্রহণ করল। কিছু সময়ের মধ্যে নূরুল আলম এল। আমাকে পেয়ে কত খুশি। একসাথে খেলাম, তারপর বেড়ালাম। আলম বলল, “কি করি একেবারে একা পড়ে গেছি। বন্ধুবান্ধবও নাই, ঢাকা যেয়েই বা কি হবে? টাকা নাই যে ব্যবসা করব? চাকরি তো নূরুল আমিন সাহেবরা দিবে না, কারণ আমি তো শহীদ সাহেব ও হাশিম সাহেবের দলের লোক ছিলাম। আমি তাকে কিছুই বলতে পারলাম না, কারণ আমি তাকে আসতে বলব কি অধিকারে। আমারই তো কোনো ঠিক নাই, আগামীকালই জেলের ভাত কপালে থাকতে পারে। তবে নূরুল আলম বলল যে, সে পাকিস্তান ডেপুটি হাইকমিশনার অফিসে একটা চাকরির জন্য দরখাস্ত করেছে।
টেলিফোন করে জানলাম সকাল এগারটায় খুলনার ট্রেন ছাড়ে, প্রায় সন্ধ্যায় বেনাপোলে পৌঁছে এবং রাত দশটায় খুলনা পৌঁছে। ইন্টারক্লাস টিকিট কাটলাম। কারণ বেনাপোলে আমাকে পুলিশের চোখে ধুলা দিতে চেষ্টা করতে হবে। পূর্ব বাংলা সরকারও খবর রাখে আমি দু’একদিনের মধ্যে পৌঁছাব। গোয়েন্দা বিভাগ ব্যস্ত আছে, আমাকে গ্রেফতার করবার জন্য। আমিও প্রস্তুত আছি, তবে ধরা পড়ার পূর্বে একবার বাবা-মা, ভাইবোন, ছেলেমেয়েদের সাথে দেখা করতে চাই। লাহোর থেকে রেণুকে চিঠি দিয়েছিলাম, বোধহয় পেয়ে থাকবে। বাড়ির সকলেই আমার জন্য ব্যস্ত। ঢাকায়ও যাওয়া দরকার, সহকর্মীদের সাথে আলাপ করতে হবে। আমি গ্রেফতার হওয়ার পর যেন কাজ বন্ধ না হয়। কিছু অর্থের বন্দোবস্তও করতে হবে। টাকা পয়সার খুবই অভাব আমাদের। আমি কিছু টাকা তুলতে পারব বলে মনে হয়। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কয়েকজন ভক্ত আছে, যাদের আমি জানি, গেলে একেবারে ‘না’ বলতে পারবে না। রানাঘাট এসে গাড়ি থামল অনেকক্ষণ। ভারতবর্ষের কাস্টমস অফিসাররা গাড়ি ও প্যাসেঞ্জারদের মালপত্র তল্লাশি করল, কেউ কোনো নিষিদ্ধ মালপত্র নিয়ে যায় কি না? আমার মালপত্রও দেখল। সন্ধ্যা হয় হয়, ঠিক এই সময় ট্রেন বেনাপোল এসে পৌঁছাল। ট্রেন থামবার পূর্বেই আমি নেমে পড়লাম। একজন যাত্রীর সাথে পরিচয় হল। তাকে বললাম, আমার মালগুলি পাকিস্তানের কাস্টমস আসলে দেখিয়ে দিবেন, আমার একটু কাজ আছে। আসতে দেরিও হতে পারে। অন্ধকার দেখে একটা গাছের নিচে আশ্রয় নিলাম। এখানে ট্রেন অনেকক্ষণ দেরি করল। গোয়েন্দা বিভাগের লোক ও কিছু পুলিশ কর্মচারী ঘোরাফেরা করছে, ট্রেন দেখছে তন্নতন্ন করে। আমি একদিক থেকে অন্যদিক করতে লাগলাম। একবার ওদের অবস্থা দেখে ট্রেনের অন্য পাশে গিয়ে আত্মগোপন করলাম। ফাঁকি আমাকে দিতেই হবে। মন চলে গেছে বাড়িতে। কয়েক মাস পূর্বে আমার বড় ছেলে কামালের জন্ম হয়েছে, ভাল করে দেখতেও পারি নাই ওকে। হাচিনা তো আমাকে পেলে ছাড়তেই চায় না। অনুভব করতে লাগলাম যে, আমি ছেলে মেয়ের পিতা হয়েছি। আমার আব্বা ও মাকে দেখতে মন চাইছে। তাঁরা জানেন, লাহোর থেকে ফিরে নিশ্চয়ই একবার বাড়িতে আসব। রেণু তো নিশ্চয়ই পথ চেয়ে বসে আছে। সে তো নীরবে সকল কষ্ট সহ্য করে, কিন্তু কিছু বলে না। কিছু বলে না বা বলতে চায় না, সেই জন্য আমার আরও বেশি ব্যথা লাগে।
মওলানা সাহেব, শামসুল হক সাহেব ও সহকর্মীরা জেল অত্যাচার সহ্য করছেন। তাঁদের জন্য মনটাও খারাপ। কিছু করতে না পারলেও তাঁদের কাছে যেতে পারলে কিছুটা শান্তি তো পাব। ট্রেন ছেড়ে দিল, আস্তে আস্তে ট্রেন চলছে, আমি এক দৌড় দিয়ে এসে ট্রেনে উঠে পড়লাম। আর এক মিনিট দেরি হলে উঠতে পারতাম কি না সন্দেহ ছিল। ট্রেন চলল, যশোরেও হুশিয়ার হয়ে থাকতে হবে। রেলস্টেশনে যে গোয়েন্দা বিভাগের লোক থাকে, আমার জানা আছে। যশোরে ট্রেন থামবার কয়েক মিনিট পূর্বেই আমি পায়খানায় চলে গেলাম। আর ট্রেন ছাড়লে বের হয়ে আসলাম। একজন ছাত্র আমার কামরায় উঠে বসে আছে। আমি পায়খানা থেকে বের হয়ে আসতেই আমাকে বলল, “আরে, মুজিব ভাই।” আমি ওকে কাছে আসতে বললাম এবং আস্তে আস্তে বললাম, “আমার নাম ধরে ডাকবা না।” সে ছাত্রলীগের সভ্য ছিল, বুঝতে পেরে চুপ করে গেল। অনেক যাত্রী ছিল, বোধহয় কেউ বুঝতে পারে নাই। আর আমাকে তখন বেশি লোক জানত না। ছাত্রটি পথে নেমে গেল।
খুলনার অবস্থা আমার জানা আছে। ছোটবেলা থেকে খুলনা হয়ে আমাকে যাতায়াত করতে হয়েছে। কলকাতায় পড়তাম, খুলনা হয়ে যেতে আসতে হত। রাত দশটা বা এগারটায় হবে এমন সময় খুলনায় ট্রেন পৌঁছাল। সকল যাত্রী নেমে যাওয়ার পরে আমার পাঞ্জাবি খুলে বিছানার মধ্যে দিয়ে দিলাম। লুঙ্গি পরা ছিল, লুঙ্গিটা একটু উপরে উঠিয়ে বেঁধে নিলাম। বিছানাটা ঘাড়ে, আর সুটকেসটা হাতে নিয়ে নেমে পড়লাম। কুলিদের মত ছুটতে লাগলাম, জাহাজ ঘাটের দিকে। গোয়েন্দা বিভাগের লোক তো আছেই। চিনতে পারল না। আমি রেলরাস্তা পার হয়ে জাহাজ ঘাটে ঢুকে পড়লাম। আবার অন্য পথ দিয়ে রাস্তায় চলে এসে একটা রিকশায় মালপত্র রাখলাম। পাঞ্জাবিটা বের করে গায়ে দিলাম। রিকশাওয়ালা গোপালগঞ্জের লোক, আমাকে চিনতে পেরে বলল, “ভাইজান না, কোথা থেকে এইভাবে আসলেন।” আমি বললাম, “সে অনেক কথা, পরে বলব। রিকশা ছেড়ে দাও।” ওকে কিছুটা বলব, না বলে উপায় নাই। গোপালগঞ্জের লোক, কাউকেও বলবে না, নিষেধ করে দিলে।
