আমরা ক্যাম্বেলপুর পৌঁছালাম। ডাকবাংলো পীর সাহেবের জন্য রিজার্ভ ছিল। কিছু সময়ের মধ্যে পেশোয়ার, মর্দান ও অন্যান্য জায়গা থেকে সীমান্ত আওয়ামী লীগের কর্মকর্তা ও সদস্যরা এসে পৌঁছালেন। এখানে সভা করার উদ্দেশ্য হল জনাব লুখোর পাত্ৰাব ছেড়ে সীমান্ত প্রদেশে যেতে পারেন না। এইখানেই আমার প্রথম পরিচয় হয় পীর মানকী শরীফ, সর্দার আবদুল গফুর, সর্দার সেকেন্দার, ভূতপূর্ব মন্ত্রী শামীম জং ও আরও অনেক নেতার সাথে। তাঁদের সভা অনেকক্ষণ চলল। আমাকে তাঁদের সভায় যোগদান করতে অনুমতি দিয়েছিলেন। ডাকবাংলোয়ই সভা হল। বন্দুকধারী দুইজন পাহারাদার ডাকবাংলো পাহারা দিয়েছিল, যাতে গোয়েন্দা বিভাগের কেউ কাছে আসতে না পারে। রাত পর্যন্ত সভা চলল, আমি সভায় বক্তৃতা করলাম ইংরেজিতে। এক ভদ্রলোকনাম মনে নাই, পশতুতে সকলকে বুঝিয়ে দিলেন। আমি যে নিখিল পাকিস্তানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়া উচিত বলে প্রস্তাব দিলাম এই নিয়ে আলোচনা শুরু হল। আমি বুঝতে পারলাম, প্রায় সকলেই শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন। গোলাম মোহাম্মদ লুন্দখোরের বক্তৃতার পরে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনজন প্রতিনিধি শহীদ সাহেবের সাথে আলোচনা করবেন এবং তাঁকে নেতৃত্ব নিতে অনুরোধ করবেন। রাতে সভা শেষ হল। আটক ব্রিজ পার হতে হলে বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন হত। পীর সাহেবের অনুমতিপত্র ছিল, তিনি দলবল নিয়ে রাতেই চলে গেলেন। কয়েকজন ডাকবাংলোয় থাকল। লুখোর সাহেব আমাকে নিয়ে একটা ছোট্ট হোটেলে আসলেন। সেখানে খাওয়া-দাওয়া করে রাত কাটালাম। পাঞ্জাবের শীত যে কি ভয়ানক এই রাতে তা একটু বেশি বুঝলাম।
আমি পূর্ব বাংলার মানুষ, একটা গরম চাদর গায়ে দিয়েই শীতকাল কাটিয়ে দিতে পারি। এখানে তো গরম কাপড়ের ওপর গরম কাপড়, কম্বলের ওপর কম্বল তারপর ঘরের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতে হয়; তবুও ঘুম হবে কি না বলা কষ্টকর। পীর সাহেব পূর্ব বাংলার অবস্থা শুনে খুবই দুঃখিত হলেন এবং আমাকে সীমান্ত প্রদেশে কাইয়ুম খান কি কি অত্যাচার করছে তাও বললেন। অনেক নেতা ও কর্মীকে জেলে দিয়েছে। কোন সভা করতে গেলেই ১৪৪ ধারা জারি করছে, লাঠিচার্জ ও গুলি করতে একটুও দ্বিধাবোধ করছে না। অত্যাচার চরম পর্যায়ে চলে গেছে। পূর্ব বাংলার অত্যাচার সীমান্তের অত্যাচারের কাছে কিছুই না বলতে হবে। লুখোরকে জেলে দিয়েছিল। মুক্তি দিয়ে সীমান্ত প্রদেশের সীমানা পার করে দিয়েছে। এখন তিনি লাহোরে আছেন।
পরের দিন সকালে আমরা রওয়ানা করলাম। আমি অনুরোধ করলাম, এত কাছে এসে আটক ব্রিজ ও আটক ফোর্ট না দেখে যাই কি করে! মাত্র কয়েক মাইল। লুন্দােের সাহেব রাজি হলেন, আমাকে আটক ব্রিজে নিয়ে গেলেন। আমি ব্রিজ পার হয়ে সীমান্ত প্রদেশে ঢুকলাম। লুন্দরে সাহেব একজন লোক সাথে দিয়েছিলেন। ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটা ফলের দোকান। ফল কিনে নিয়ে ফিরলাম। আটক ফোর্টের ভিতরে যাওয়ার অনুমতি লাগে, কারণ কিছু যুদ্ধবন্দি সেখানে আছে। কয়েকজন শিখকে কাজ করতে দেখলাম দূর থেকে। আমি ফিরে আসার পরে আবার লুবোর সাহেব গাড়ি ছাড়লেন লাহোরের দিকে। আবার রাওয়ালপিন্ডি ফিরে এলাম। এখানেই বিশ্রাম করলাম কিছু সময়। লুন্দখোর সাহেবকে অনেক লোকে জানে দেখলাম। তিনি মাঝে মাঝে গাড়ি রেখে হুক্কা খান। যেখানেই তিনি গাড়ি থামান—কোনো হোটেল বা রেস্টুরেন্টে ঢুকলে প্রথমেই হুক্কা এনে সামনে। দেয় খান সাহেবের। এরা প্রায় সকলেই সীমান্ত প্রদেশের লোক বলে মনে হল। আমরা ঝিলাম, গুজরাট ও গুজরানওয়ালায় থেমে চা খেয়েছি। রাত প্রায় দশটায় লাহোরে পৌঁছালাম। আমাকে হোটেলে দিয়ে তিনি চলে গেলেন এবং বললেন, আগামীকাল সকালে আমাকে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কাছে যাবেন এবং কি সিদ্ধান্ত হয়েছে রিপোর্ট দিবেন।
এই সময় পাঞ্জাবের নবাব মামদোতের দলের মুসলিম লীগে স্থান হয় নাই। তিনি তখনও কোন দল করেন নাই। তবে করবেন ভাবছেন, তার প্রোভা মামলা শেষ হবার পরে। অনেক ভাল ভাল কর্মী ও নেতা শহীদ সাহেবের কাছে আসা যাওয়া শুরু করেছেন, তাঁরা সকলেই প্রায় পুরানা লীগ কর্মী। শহীদ সাহেব একটা জনসভায় যোগদান করবেন বলে মত দিয়েছেন। আমরা মোটরে গিয়েছিলাম। সারগোদা জেলায় এই সভা হবে। আমাকে বললেন সাথে যেতে। আমার কাজ কি! রাজি হলাম। সারগোদায় অনেক মোহাজের এসেছে, তাদের দুরবস্থার সীমা নাই। শহীদ সাহেব বক্তৃতা করলেন। আমাকে বক্তৃতা করতে অনেকে অনুরোধ করলেন, আমি বললাম, “স্যার, না জানি উর্দু, না জানি পাঞ্জাবি; ইংরেজিতে কেউ বুঝবে না, কি বক্তৃতা করব!” তিনি বললেন, থাক, প্রয়োজন নাই। আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল। আমি সালাম জানিয়ে বসে পড়লাম। সুদূর সারগোদা জেলায়ও শহীদ সাহেব জনপ্রিয় ছিলেন এইবার প্রথম বুঝলাম।
লাহোরে যে হোটেলে আমি থাকতাম তার দুইটা রুম ভাড়া নিয়ে মিস্টার আজিজ বেগ ও মিস্টার খুরশিদ (যিনি আজাদ কাশ্মীরের প্রেসিডেন্ট ছিলেন) সাপ্তাহিক গার্ডিয়ান কাগজ বের করতেন। এরা পাকিস্তান টাইমসে আমার বিবৃতি দেখেছিলেন এবং বিবৃতির কিছু কিছু অংশ গার্ডিয়ান কাগজে প্রকাশ করেছিলেন। আমি তাদের সাথে দেখা করলাম এবং সকল বিষয় আলোচনা করলাম। গার্ডিয়ান প্রতিনিধি আমার সাথে দেখা করে একটা সাক্ষাতের রিপোর্ট বের করলেন। আস্তে আস্তে লাহোরের রাজনীতিবিদরাও জানতে পারলেন, আমি লাহোরে আছি। গোয়েন্দা বিভাগও যে আমার পিছু লেগেছে সে খবরও হোটেলের ম্যানেজার আমাকে বলে দিলেন এবং আরও বললেন, সকল সময়ের জন্য একজন লোক আপনাকে অনুসরণ করছে। আমি তো টাঙ্গায় বা হেঁটে চলতাম, ওরা আমাকে সাইকেলে অনুসরণ করত। পীর সালাহউদ্দিনের মারফতে আমি পাঞ্জাব মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের এক প্রতিনিধির সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং অল পাকিস্তান ছাত্র প্রতিষ্ঠান হওয়া দরকার এ বিষয়ও আলোচনা করলাম। মিস্টার ফাহমী, মিস্টার নূর মোহাম্মদ (দিল্লি থেকে এসেছেন) এবং আরও কয়েকজন ছাত্রনেতা তখন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ছিলেন, তারাও আমার সাথে একমত হলেন। আমি কয়েকদিন তাঁদের ল’কলেজ হোস্টেলে গিয়েও আলাপ করলাম। আমি তাঁদের বললাম, “যদিও আমি এখন আর ছাত্র প্রতিষ্ঠানে নাই, তবুও আপনারা যদি রাজি হন অল পাকিস্তান ছাত্র প্রতিষ্ঠান করতে, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগকে রাজি করাতে পারব। তারা রাজি হলেন এবং কিভাবে তা গঠন হবে সে পস্থাও ঠিক হল। তাঁরা একটা গঠনতন্ত্র লিখে আমাকে দিলেন। আমি তাঁদের কথা দিলাম ঢাকা যেয়েই ছাত্রলীগ নেতাদের মাঝে আমি পৌঁছে দিব আপনাদের মতামত। তারা আপনাদের কাছে চিঠি লিখবে এবং একসাথে পাঞ্জাব ও বাংলা থেকে ঘোষণা বের হবে।
