তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “মুসলিম লীগের অবস্থা কি?” আমি বললাম, “নির্বাচন হলেই মুসলিম লীগকে আমরা পরাজিত করতে পারব এবং সে পরাজয় হবে শোচনীয়।” মিয়া সাহেব বিশ্বাস করতে চাইলেন না। বেগম ইফতিখারউদ্দিন বললেন, “হলে হতেও পারে, কারণ কিছুদিন পূর্বেও তো এক আন্দোলন পূর্ব বাংলায় হয়ে গেল। বেগম সাহেবা রাজনীতি বুঝতেন এবং দেশ-বিদেশের খবরও রাখেন, যথেষ্ট লেখাপড়াও তিনি করেছেন বলে মনে হল।
রাতে আমার ভীষণ জ্বর হল। মিয়া সাহেব ব্যস্ত হয়ে ডাক্তার ভাকলেন। ঔষধ কিনে দিলেন, দুই দিনেই আমার জ্বর পড়ে গেল। মিয়া সাহেবের বাড়িতে এই একটাই অতিথিদের থাকবার ঘর ছিল। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ভাই প্রফেসর শাহেদ সোহরাওয়ার্দী লাহোরে আসবেন এবং মিয়া সাহেবের বাড়িতে থাকবেন। তাই দুই দিনের মধ্যেই আমার ছেড়ে যাওয়া উচিত হবে। আলাপ-আলোচনার মধ্যেই সেটা বুঝতে পারলাম।
মিয়া সাহেব আমার জন্য অন্য বন্দোবস্ত করতে রাজি আছেন জানালেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব ফিরে এসেছেন, ফোন করে জানলাম। আজ আর জ্বর নাই। ভীষণ শীত। বেলা এগারটার সময় নবাব সাহেবের বাড়িতে পৌঁছালাম। শহীদ সাহেব লনে বসে কয়েকজন এডভোকেটের সাথে মামলা সম্বন্ধে আলোচনা করছিলেন। আমি কাছে যেয়ে সালাম করতেই তিনি উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, “কিভাবে এসেছ? তোমার শরীর তো খুব খারাপ, কোথায় আছ?” আমাকে সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সকলকে বিদায় দিয়ে আমাকে নিয়ে বসলেন। আমি সকল ইতিহাস তাঁকে বললাম। প্রত্যেক কর্মী ও নেতাদের কথা জিজ্ঞেস করলেন। পূর্ব বাংলার অবস্থা কি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাও জিজ্ঞাসা করলেন। বাংলাকে তিনি যে কতটা ভালবাসতেন তার সাথে না মিশলে কেউ বুঝতে পারত না। শহীদ সাহেব বললেন, তার আর্থিক অবস্থার কথা। মামলাটা না পেলে খুবই অসুবিধা হত। তিনি আমাকে যেতে দিলেন না মিয়া সাহেবের বাসায়। একসাথে থানা খেলাম, নবাব মামদোত উপস্থিত ছিলেন। তাঁকেও আমাদের অবস্থার কথা বললেন। তিনিও পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা এক এক করে জিজ্ঞাসা করলেন।
বিকালবেলা খান গোলাম মোহাম্মদ খান লুথাের ও পীর সালাহউদ্দিন (তখন ছাত্র) শহীদ সাহেবের সাথে দেখা করতে এলেন। গোলাম মোহাম্মদ খান লুখোরকে সীমান্ত প্রদেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তার সীমান্ত প্রদেশে যাওয়া নিষেধ। তিনি সীমান্ত আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক। আমাকে পেয়ে তিনি খুব খুশি হলেন। শহীদ সাহেব তাকে বললেন, একটা হোটেল ঠিক করে দিতে, যেখানে আমি থাকব। অল্প খরচের হোটেল হলেই ভাল হয়। পীর সালাহউদ্দিন তখন পাঞ্জাবের ছাত্রনেতা। কর্মী হিসাবে তার নাম ছিল।
আমি রাতেই মিয়া সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হোটেলে চলে এলাম। মিয়া সাহেব বললেন, জায়গা থাকলে তোমাকে হোটেলে যেতে দিতাম না। আমি বললাম,
অসুবিধা হবে না।
শহীদ সাহেব আমাকে নিয়ে দোকানে গেলেন এবং বললেন, “কিছু কাপড় আমার বানাতে হবে, কারণ দুইটা মাত্র স্যুট আছে, এতে চলে না। তিনি নিজের কাপড় বানানোর হুকুম দিয়ে একটা ভাল কম্বল, একটা গরম সোয়েটার, কিছু মোজা ও মাফলার কিনে নিলেন এবং বললেন, কোনো কাপড় লাগবে কি না! আমি জানি শহীদ সাহেবের অবস্থা। বললাম, না আমার কিছু লাগবে না। তিনি আমাকে যখন গাড়িতে নিয়ে হোটেলে পৌঁছাতে আসলেন, জিনিসগুলি দিয়ে বললেন, “এগুলি তোমার জন্য কিনেছি। আরও কিছু দরকার হলে আমাকে বোলো।” গরম ফুলহাতার সোয়েটার ও কম্বলটা পেয়ে আমার জানটা বাঁচল। কারণ, শীতে আমার অবস্থা কাহিল হতে চলেছিল।
৪৮.
সকালেই শহীদ সাহেবের কাছে যেতাম আর রাতে ফিরে আসতাম। তাঁর সাথেই কোর্টে যেতাম। নবাব সাহেবের ভাইদের সাথেও আমার বন্ধুত্ব হয়ে উঠেছিল। এর তিন দিন পরে লুখোর সাহেব আমাকে এসে বললেন, “চল, আমরা ক্যাম্বেলপুর যাই। সেখানে সীমান্ত আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সভা হবে। তুমি পীর মানকী শরীফ ও অন্যান্য নেতাদের সাথে আলোচনা করতে পারবে। আমিও তোমার সাথে একমত। আমাদের দুই প্রদেশের আওয়ামী লীগ নিয়ে একটা নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গঠন করা উচিত-সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্বে।” আমরা দুইজন শহীদ সাহেবের কাছে এলাম। শহীদ সাহেব বললেন, “যাও, আলাপ করে এস। হলে তো ভালই হয়, আমিও পাঞ্জাবে নবাব সাহেবের সাথে আলাপ করেছি।”
শহীদ সাহেব আমাকে কিছু টাকা দিলেন। আমরা দুইজন একসাথে সুন্দখোর সাহেবের মোটর গাড়িতে চড়ে ক্যাম্বেলপুর রওয়ানা হলাম রাত দশটায়। লুখোর সাহেব নিজেই গাড়ি চালান। তিনি গাড়ি চালিয়ে রাওয়ালপিন্ডি পৌঁছালেন ভোের রাতের দিকে। আমরা বিশ্রাম করলাম, সকালে নাশতা করে আবার রওয়ানা করলাম ক্যাম্বেলপুরের দিকে। এগার-বারটার মধ্যে সেখানে পৌঁছালাম। এই আমার জীবনের প্রথম পাঞ্জাব প্রদেশের ভিতরে বেড়ান। আমার ভালই লাগল পঞ্চনদীর এই দেশটাকে।
পূর্ব পাঞ্জাব ও পশ্চিম পাঞ্জাবের ভয়াবহ দাঙ্গার স্মৃতি আজও মানুষ ভোলে নাই। লক্ষ লক্ষ মোহাজের এসেছে পশ্চিম পাঞ্জাবে, তবে বেশি অসুবিধা হয় নাই। কারণ পশ্চিম পাত্ৰাব থেকেও লক্ষ লক্ষ হিন্দু এবং শিখ চলে গিয়েছে। মুসলমানরা তা দখল করে নিয়েছে। ক্যাম্বেলপুর যাওয়ার পূর্বে আমি একটা বিবৃতি দিয়েছিলাম, পূর্ব বাংলায় কি হচ্ছে তার উপরে; মওলানা ভাসানী, শামসুল হক সাহেবের কারাগারে বন্দিত্ব, রাজনৈতিক কর্মীদের উপর নির্যাতন ও খাদ্য সমস্যা নিয়ে। পাকিস্তান টাইমস, ইমরোজ ভালভাবেই ছাপিয়ে ছিল। কারণ, মিয়া সাহেব তখন এই কাগজ দুইটির মালিক ছিলেন। এই সময় সম্পাদক ও বিখ্যাত কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ ও তাঁর সহকর্মী জনাব মাজহারের সাথে আমার পরিচয় হয়। এই দুইজনকে বিদ্বান, বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী বললে ভুল হবে না। বাংলা ভাষা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত—মিয়া সাহেব ও ঐ দুইজনই তখন তা সমর্থন করেছিলেন। আমাদের দাবি যে ন্যায্য একথাও স্বীকার করেছিলেন। আমি বিবৃতি লিখে শহীদ সাহেবকে দেখিয়েছিলাম। তিনি দেখে দিয়েছিলেন।
