তিনি জনগণের প্রধানমন্ত্রী হতে চান নাই, একটা দলের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছেন। রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দল যে এক হতে পারে না, একথাও তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অনেকগুলি রাজনৈতিক দল থাকতে পারে এবং আইনে এটা থাকাই স্বাভাবিক। দুঃখের বিষয়, লিয়াকত আলী খানের উদ্দেশ্য ছিল যাতে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল পাকিস্তানে সৃষ্টি হতে না পারে। “যে আওয়ামী লীগ করেগা উসকো শের কুচাল দে গা”— একথা একমাত্র ডিকটেটর ছাড়া কোনো গণতন্ত্রে বিশ্বাসী লোক বলতে পারে না। জিন্নাহর মৃত্যুর পরে সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে তিনি ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছিলেন।
মওলানা সাহেব আমাকে বললেন, “তুমি লাহোর যাও, কারণ সোহরাওয়ার্দী সাহেব লাহোরে আছেন। তাঁর এবং মিয়া ইফতিখারউদ্দিনের সাথে সাক্ষাৎ কর। তাঁদের বল পূর্ব বাংলার অবস্থা। একটা নিখিল পাকিস্তান পার্টি হওয়া দরকার। পীর মানকী শরীফের সাথে আলোচনা করে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকে সারা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারলে ভাল হয়। সোহরাওয়ার্দী সাহেব ছাড়া আর কেউ এর নেতৃত্ব দিতে পারবেন না।”
করাচি থেকে লিয়াকত আলী খান সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে অকথ্য ভাষায় গাল দিয়ে বলেছেন, “ভারত কুকুর লেলিয়ে দিয়েছে। অথচ জিন্নাহ সাহেব সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে একদিনের জন্যেও মন্দ বলেন নাই। একেই বলে অদৃষ্টের পরিহাস! লিয়াকত আলী খানকে নির্বাচনে পাস করাতে সমগ্র আলিগড়ে মুসলিম ছাত্রদের নামতে হয়েছিল। রফি আহমেদ কিদোয়াই প্রায়ই তাকে পরাজিত করে দিয়েছিলেন, যদি মুসলিম ছাত্ররা আলিগড় থেকে না যেত। জিন্নাহর ছায়ায় বসে দিল্লি থেকে বিবৃতি দেওয়া ছাড়া তিনি কি যে করেছেন পাকিস্তান আন্দোলনে, আমার জানা নাই। সোহরাওয়ার্দী সাহেব বাংলার প্রধানমন্ত্রী না হলে আর মুসলিম লীগ গড়ে না তুললে কি যে হত তা বলা কষ্টকর। জিন্নাহ সাহেব সেটা জানতেন, তাই তিনি কিছুই বলেন নাই।
সোহরাওয়ার্দী সাহেব লাহোরে নবাব মামদোতের মামলা নিয়েছেন।১৯ এটাও লিয়াকত আলী সাহেবের কীর্তি! নবাব মামদোতকে বিপদে ফেলার জন্য আর একজনকে সাহায্য করা। কারণ নবাব মামদোত একটু কমই গ্রাহ্য করতেন লিয়াকত আলী খানকে। আমি ভাসানী সাহেবকে বললাম, “কি ভাবে যাব? ভারতবর্ষ হয়ে যেতে হবে। আমি যে পাকিস্তানী, তার প্রমাণ লাগবে, তাহলেই পশ্চিম পাকিস্তানে ঢুকতে দিবে। তখনও পাসপোর্ট ভিসা চালু হয় নাই। গরম কাপড়ও বাড়িতে রয়েছে। টাকা পয়সাও হাতে নাই। ওদিকে আবার পূর্ব পাঞ্জাবে মুসলমান পেলেই হত্যা করে। কি করে লাহোর যাব বুঝতে পারছি না। আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ঝুলছে। খুঁজে বেড়াচ্ছে পুলিশ।” ভাসানী সাহেব বললেন, “তা আমি কি জানি! যেভাবে পার লাহোর যাও। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে দেখা কর এবং তাঁকে সকল কিছু বল।” ১৯৪৯ সালের প্রথম দিকে ঢাকায় মওলানা ভাসানী, মিয়া ইফতিখারউদ্দিন, আরও অনেকে সোহরাওয়ার্দীর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন যদি মুসলিম লীগে কোটারি করা হয়, তবে নতুন পার্টি করা হবে। সোহরাওয়ার্দী সাহেব মত দেন। এখন শহীদ সাহেব ও মিয়া সাহেবের সাহায্য প্রয়োজন। তাঁদের সম্পর্ক ভাল।
আমি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসলাম। আমার একটা গরম আচকান ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আমার মামা জাফর সাদেকের কাছ থেকে সামান্য কিছু টাকা ধার নিলাম। আর ইত্তেহাদে আমার কিছু টাকা পাওনা ছিল সেখান থেকে সামান্য কিছু পেলাম। তাই নিয়ে রওয়ানা করলাম। লাহোর পর্যন্ত কোনোমতে পৌঁছাতে পারলে হয়, সোহরাওয়াদ সাহেব আছেন কোন অসুবিধা হবে না। আমি অনেক কষ্টে লাহোর পৌঁছালাম। পূর্ব বাংলার পুলিশকে আমার অনেক কষ্টে ফাঁকি দিতে হয়েছিল। আমার জন্য অনেক বাড়ি খানা তল্লাশি হচ্ছিল। বাড়িতেও পুলিশ গিয়ে খবর এনেছে আমি বাড়ি যাই নাই।
৪৭.
লাহোরে তখন ভীষণ শীত। আমার তা সহ্য করা কষ্টকর হচ্ছিল। কোনোদিন লাহোর যাই নাই। মিয়া ইফতিখারউদ্দিন সাহেব ছাড়া কেউ আমাকে চিনত না। সোহরাওয়ার্দী সাহেব নবাব মামদোতের বাড়িতে থাকতেন, একথা আমি জানি। এক দোকানের সামনে মালপত্র রেখে আমি নবাব সাহেবের বাড়িতে ফোন করলাম। সেখান থেকে উত্তর এল, সোহরাওয়ার্দী সাহেব লাহোরে নাই, বাইরে গেছেন, দুই দিন পরে ফিরবেন। আমার কাছে মাত্র দুই টাকা আছে, কি করব? কোথায় যাব ভাবছিলাম, মালপত্রই বা কোথায় রাখি? বেলা তখন একটা, ক্ষিধেও লেগেছে, সকাল থেকে কিছুই পেটে পড়ে নাই। দুইটা টাকা মাত্র, কিছু খেলেই তো শেষ হয়ে যাবে। অনেক চিন্তা করে মিয়া সাহেবের বাড়িতে ফোন করলাম। মিয়া সাহেব লাহোরে আছেন, কিন্তু বাড়িতে নাই। আমি একটা টাঙ্গা ভাড়া করে মিয়া সাহেবের বাড়ির দিকে রওয়ানা করলাম। ঠিকানা লেখা ছিল। আমি যখন সুটকেস ও সামান্য বিছানা নিয়ে তাঁর বাড়ির সামনে নামলাম, দারোয়ান বলল, সাহেব বাড়িতে নাই। একটা বাইরের ঘরে বসতে দিল। সুটকেসটা বাইরেই একপাশে রেখে দিলাম। আমার নাম ও ঠিকানা কাগজে লিখে দিলাম, মিয়া সাহেব আসলে তাকে দিতে। মিয়া সাহেব এসে কাগজটা দেখেই বের হয়ে এলেন, আমাকে চিনলেন এবং খুব আদর করলেন। আমার অবস্থা দেখে তাড়াতাড়ি একটা রুম ঠিক করে দিয়ে গোসল করে নিতে বললেন। একসাথে খানা খাবেন এবং পূর্ব বাংলার অবস্থা শুনবেন। বরিশালের এস, এ. সালেহ মিয়া সাহেবকে ও শহীদ সাহেবকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন এবং আমি যে লাহোর যেতে পারি একথাও জানিয়েছিলেন। সালেহ আমার বাল্যবন্ধু ও নূরুদ্দিন সাহেবের চাচাতো ভাই। পাকিস্তান আন্দোলনে একসাথে অনেক দিন কাজ করেছি। মিয়া সাহেব, বেগম সাহেবা ও আমি একসাথে খানা খেয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে আলোচনা করলাম। পূর্ব বাংলার সকল খবর দিলাম। মওলানা ভাসানীর কথাও বললাম, সরকারের অত্যাচারের কাহিনীও জানালাম। মিয়া সাহেব মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেছেন, আমাকে বললেন, “দেখ, কিছুদিনের জন্য রাজনীতি আমি ছেড়ে দিয়েছি। সক্রিয় অংশগ্রহণ করব না, আমার নিজের কিছু কাজ আছে।”
