এদিকে ছাত্রনেতাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর প্রতিবাদ করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করেছে, ১৭ই এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে। ছাত্রলীগ ও অন্যান্য ছাত্র কর্মী—যারা ঢাকায় ছিল, ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে বসে এক সভা করে ঠিক করল যে, ১৭ তারিখ থেকে প্রতিবাদ দিবস পালন করা হবে। ছাত্ররা ধর্মঘট করবে যে পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ তাদের উপর থেকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার না করে। কিছু সংখ্যক কর্মী টাঙ্গাইল রওয়ানা হয়ে গেল। বেশিরভাগ পুরানা লীগ কর্মী। মুসলিম লীগের মন্ত্রীরা ও এমএলএরা টাকা-পয়সা, গাড়ি, সকল কিছু নিয়েই টাঙ্গাইলে উপস্থিত হয়েছিল। মুসলিম লীগ প্রার্থী করটিয়ার বিখ্যাত জমিদার খুররম খান পন্নী—যার প্রজাই হল অধিকাংশ ভোটার। তার সাথে আছে সরকারি ক্ষমতা এবং অর্থবল। আমাদের প্রার্থী গরিব, কিন্তু নিঃস্বার্থ, ত্যাগী কর্মী; আর আছে আদর্শ ও কর্মক্ষমতা। তখন কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানও আমাদের পিছনে নাই। কর্মীরা পায়ে হেঁটে, না খেয়ে নির্বাচন শুরু করল। ঢাকায় ছাত্ররা ব্যস্ত ধর্মঘট নিয়ে। ঠিক হল সকলেই টাঙ্গাইল চলে যাবে, আমি ১৯ এপ্রিল টাঙ্গাইল পৌঁছাব।
১৬ এপ্রিল খবর পেলাম, ছাত্রলীগের কনভেনর নইমউদ্দিন আহমেদ, ছাত্রলীগের আরেক নেতা আবদুর রহমান চৌধুরী (এখন এডভোকেট)—ভিপি সলিমুল্লাহ হল, দেওয়ান মাহবুব আলী (এখন এডভোকেট) আরও অনেকে গোপনে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেয়ে বন্ড দিয়েছেন। যারা ছাত্রলীগের সভ্যও না, আবার নিজেদের প্রগতিবাদী বলে ঘোষণা করতেন, তাঁরাও অনেকে বন্ড দিয়েছেন। সাতাশজনের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই বন্ড দিয়ে দিয়েছে। কারণ ১৭ তারিখের মধ্যে বন্ড না দিলে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকবে না।
ছাত্রলীগের কনভেনর ও সলিমুল্লাহ হলের ডিপি বন্ড দিয়েছে খবর রটে যাওয়ার সাথে সাথে ছাত্রদের মনোবল একদম ভেঙে গিয়েছিল। আমি তাড়াতাড়ি কয়েকজনকে নিয়ে নইমউদ্দিনকে ধরতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু তাকে পাওয়া কষ্টকর, সে পালিয়ে গিয়েছিল। সে এক বাড়িতে লজিং থাকত। সন্ধ্যার কিছু পূর্বে তাকে ধরতে পারলাম। সে স্বীকার করল আর বলল, কি করব, উপায় নাই। আমার অনেক অসুবিধা। তার সাথে আমি অনেক রাগারাগি করলাম এবং ফিরে এসে নিজেই ছাত্রলীগের সভ্যদের খবর দিলাম, রাতে সভা করলাম। অনেকে উপস্থিত হল। সভা করে এদের বৃহিষ্কার করা হল এবং রাতের মধ্যে প্যামপ্লেট ছাপিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিলি করার বন্দোবস্ত করলাম। কাজী গোলাম মাহাবুবকে (এখন এডভোকেট) জয়েন্ট কনভেনর করা হয়েছিল। সে নিঃস্বার্থভাবে কাজ চালিয়েছিল।
তখন ভোরবেলায় আইন ক্লাস হত। আইন ক্লাসের ছাত্ররা ধর্মঘট করল। দশটায় পিকেটিং শুরু হল। ছাকমারা বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় শুয়ে পড়ল। একজন মাত্র ছাত্রী সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল। তার নাম নাদেরা বেগম। প্রফেসর মুনীর চৌধুরীর ভগ্নি। নাদেরা একাই ছেলেদের সাথে দরজায় বসেছিল। মাত্র দশ-পনেরজন ছাত্র নিখিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সমর্থক। এই কয়েকজন বার বার ছাত্রদের উপর দিয়ে একবার ভিতরে একবার বাইরে যাওয়া-আসা করতে লাগল এবং এর মধ্যে একজন নাদেরাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিয়েছিল। সাধারণ ছাত্ররা এদের ওপর ক্ষেপে গেল। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম এবং সকলকে নিষেধ করলাম গোলমাল না করতে। আমি তাদের বললাম, “আপনারা ক্লাস করতে চান, ভিতরে যান, আমাদের আপত্তি নাই। তবে বার বার যাওয়াআসা করবেন না। আর আজেবাজে কথা বলবেন না।”
তারা আমার কথা না শুনে আবার বের হয়ে এল এবং ভিতরে ফিরে যেতে লাগল যারা পিকেটিং করছিল, তাদের উপর পা দিয়ে। আর আমি কিছু করতে পারলাম না, সাধারণ ছাত্র তখন অনেক জমা হয়েছে। তারা এদের আক্রমণ করে বসল। এরা পালিয়ে দোতলায় আশ্রয় নিল, যে যেখানে পারে। আমি দরজায় দাঁড়িয়ে ক্রুদ্ধ ছাত্রদের বাধা দিলাম। যাহোক, ধর্মঘট হয়ে গেল। সভা হল, ধর্মঘট চলবে ঠিক হল। এ সময় ড. ওসমান গনি সাহেব সলিমুল্লাহ হলের প্রভোস্ট ছিলেন। তিনি এক্সিকিউটিভ কমিটি সভায় আমাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করতে অনুরোধ করলেন। তাঁকে সমর্থন করলেন, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম বী, কিন্তু কমিটির অন্যান্য সদস্য রাজি হলেন না। ১৮ তারিখে ধর্মঘট হয়েছিল, আবার ১৯ তারিখে ধর্মঘট হবে ঘোষণা করা হল। ছাত্রদের মধ্যে উৎসাহ কমে গেছে বলে আমার মনে হল। ১৮ তারিখ বিকালে ঠিক করলাম, ধর্মঘট করে বোধহয় কিছু করা যাবে না। তাই ১৮ তারিখে ছাত্র শোভাযাত্রা করে ভাইস চ্যান্সেলরের বাড়িতে গেলাম এবং ঘোষণা করলাম, আমরা এখানেই থাকব, যে পর্যন্ত শাস্তিমূলক আদেশ প্রত্যাহার না করা হয়। একশজন করে ছাত্র রাতদিন ভাইস চ্যান্সেলরের বাড়িতে বসে থাকবে। তাঁর বাড়ির নিচের ঘরগুলিও দখল করে নেওয়া হল। একদল যায়, আর একদল থাকে। ১৮ তারিখ রাত কেটে গেল, শুধু আমি জায়গা ত্যাগ করতে পারছিলাম না। কারণ শুনলাম, তিনি পুলিশ ডাকবেন। ১৯ তারিখ বিকাল তিনটায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, এসপি বিরাট একদল পুলিশ বাহিনী নিয়ে হাজির হলেন। আমি তাড়াতাড়ি সভা ডেকে একটা সংগ্রাম পরিষদ করতে বলে দিলাম। সকলের মত আমাকেও দরকার হলে গ্রেফতার হতে হবে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পাঁচ মিনিট সময় দিলেন আমাদের স্থান ত্যাগ করে যেতে। আমি আটজন ছাত্রকে বললাম, তোমরা এই আটজন থাক, আর সকলেই চলে যাও। আমি ও এই আটজন স্থান ত্যাগ করব না। ছাত্র প্রতিনিধিদের ধারণা, আমি গ্রেফতার হলে আন্দোলন চলবে, কারণ আন্দোলন ঝিমিয়ে আসছিল। একে চাঙ্গা করতে হলে, আমার গ্রেফতার হওয়া দরকার। আমি তাদের কথা মেনে নিলাম। পাঁচ মিনিট পরে এসে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আমাদের গ্রেফতারের হুকুম দিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ (এখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক) আটকা পড়েছে। তাকে নিষেধ করা হয়েছে গ্রেফতার না হতে। তাজউদ্দীন বুদ্ধিমানের মত কাজ করল। বলে দিল, “আমি প্রেস রিপোর্টার।” একটা কাগজ বের করে কে কে গ্রেফতার হল, তাদের নাম লিখতে শুরু করল। আমি তাকে চোখ টিপ মারলাম। আমাদের গাড়িতে তুলে একদম জেলগেটে নিয়ে আসল।
৪১-৫০. জনগণের মধ্যে আন্দোলনও দানা বেঁধে উঠল
পরের দিন থেকেই জনগণের মধ্যে আন্দোলনও দানা বেঁধে উঠল। পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হল। যাদের আমি নিষেধ করেছিলাম, তারাও প্রায়ই তিন দিনের মধ্যে গ্রেফতার হয়ে গেল। খালেক নেওয়াজ খান, কাজী গোলাম মাহাবুব, আজিজ আহমেদ, অলি আহাদ, আবুল হাসানাত, আবুল বরকত, কে. জি. মোস্তফা, বাহাউদ্দিন চৌধুরী ও আরও অনেকে। এরাই ছিল প্রথম শ্রেণীর কর্মী। বুঝতে আর বাকি রইল না যে, আন্দোলন আর চলবে না। কর্মীরা গ্রেফতার হওয়ার পরে আর আন্দোলন চলল না। ক্লাস শুরু হয়ে গেল, আমরা জেলে রইলাম। বোধহয় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশজন ছাত্রনেতা গ্রেফতার হয়েছিল। আমাদের ঢাকা জেলের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের দোতালায় রাখা হয়েছিল। কয়েকজনকে উচ্চ শ্রেণীর মর্যাদা দিয়েছিল। আর কয়েকজনকে দেওয়া হয় নাই। তাতে আমাদের খুব অসুবিধা হতে লাগল। খাওয়া-দাওয়ার কষ্টও হয়েছিল। তবুও আমরা ঠিক করলাম, এক জায়গায় থাকব এবং যা কিছু পাই ভাগ করে খাব।
