জেলে যারা আছে, তাদের মধ্যেও দুইটা গ্রুপ ছিল। তিনজন ছিল উগ্রপন্থী। এদের অন্য ছাত্র বন্দি কমিউনিস্ট বলত। এই তিনজনের মধ্যে একজন ছাত্রলীগের সভ্য ছিল না। আর সকলেই ছাত্রলীগের সভ্য। আমাদের খেলাধুলা করে সময় কেটে যেত। আমার কাছে বরকত থাকত। রাতে বরকত গান গাইত, চমক্কার গাইতে পারত। বইপত্রও কিছু আনা হয়েছিল, জেল লাইব্রেরিতেও বই কিছু ছিল। কিছু সময় সকলেই লেখাপড়া করত। সকলেই ছাত্র, খুব দুষ্টামি করত। আমি ও আজিজ আহমেদ ছিলাম এদের মধ্যে বয়সে বড়। ডাক্তার সাহেবরা জেলে মেডিকেল ডায়েট দিতে পারতেন। এরা দল বেঁধে ডাক্তার সাহেবের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলত। বরকত ছিল দুষ্টু বেশি। ডাক্তার সাহেব আসলেই বলত, “আমার পায়ে ব্যথা, কিছু দুধ ও ডিম পাস করে দেন।” সকলেই হেসে ফেলত তার কথায়। রাজনীতি নিয়ে চলত ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা।
একমাত্র বাহাউদ্দিন চৌধুরীর বাবা-মা ঢাকায় ছিলেন। সকলের চেয়ে বয়সে ছোট ছিল সে, আমি খুব স্নেহ করতাম। বাহাউদ্দিনের মা অনেক খাবার দিতেন। সকলকে দিয়েই সে খেত। তবু রাতে সে যখন ঘুমাত তখন দলবল বেঁধে ওর খাবারগুলো খেয়ে ফেলত, না হয় সরিয়ে রাখত। বাহাউদ্দিন কিছু না বলে চুপ করে আমাকে বলত। আমি সকলের সঙ্গে রাগ করতাম। কিন্তু কেউই স্বীকার করত না। রাতে যারা তাস খেলত তারাই এই কাজ করত। বরকত আমার কাছে মিছা কথা বলত না, সব বলে দিত।
খালেক নেওয়াজকে নিয়ে আর এক মহাবিপদ ছিল। ওর গায়ে বড় বড় লোম ছিল। সমস্ত গা লোমে ভরা। ছাত্ররা ছারপোকা ধরে চুপি চুপি ওর শরীরে ছেড়ে দিত। ওর মুখও খুব খারাপ ছিল, অকথ্য ভাষায় গালাগালি করত। আমরা বিকালে ভলিবল খেলতাম। তখন সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন আমীর হোসেন সাহেব। আমাদের খুবই স্নেহ করতেন। যা প্রয়োজন, চাইলেই তিনি আমাদের দিতেন এবং সকলকে হুকুম দিয়েছিলেন আমাদের যেন কোন অসুবিধা না হয়।
একদিন আমার হাতের কজি সরে গিয়েছিল, পড়ে যেয়ে। ভীষণ যন্ত্রণা, সহ্য করা কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। আমাকে বোধহয় মেডিকেল কলেজে পাঠানোর ব্যবস্থা হচ্ছিল। একজন নতুন ডাক্তার ছিল জেলে। আমার হাতটা ঠিকমত বসিয়ে দিল। ব্যথা সাথে সাথে কম হয়ে গেল। আর যাওয়া লাগল না। বাড়িতে আমার আব্বা ও মা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। রেণু তখন হাচিনাকে নিয়ে বাড়িতেই থাকে। হাচিনা তখন একটু হাঁটতে শিখছে। রেণুর চিঠি জেলেই পেয়েছিলাম। কিছু টাকাও আব্ব পাঠিয়ে ছিলেন। রেণু জানত, আমি সিগারেট খাই। টাকা পয়সা নাও থাকতে পারে। টাকার দরকার হলে লিখতে বলেছিল।
জুন মাসের প্রথম দিক থেকে দু’একজন করে ছাড়তে রু করে। এখন আর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো গোলমাল নাই। শামসুল হক সাহেব মুসলিম লীগ প্রার্থী খুররম খান পন্নীকে পরাজিত করে এমএলএ হয়েছেন। মুসলিম লীগের প্রথম পরাজয় পাকিস্তানে। মুসলিম লীগকে কোটারি করার ফল তাদের পেতে হল। আমরা জেলের মধ্যে খুবই চিন্তিত ছিলাম। হক সাহেব আমার উপর অসন্তুষ্টও হয়েছিলেন; কেন আমি গ্রেফতার হয়েছিলাম, টাঙ্গাইল না যেয়ে! পরে যখন সমস্ত খবর পেলেন তখন দেখতে পেলেন, আমার কোনো উপায় ছিল না।
১৯৪৭ সালে যে মুসলিম লীগকে লোকে পাগলের মত সমর্থন করছিল, সেই মুসলিম লীগ প্রার্থীর পরাজয়বরণ করতে হল কি জন্য? কোটারি, কুশাসন, জুলুম, অত্যাচার এবং অর্থনৈতিক কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ না করার ফলে। ইংরেজ আমলের সেই বাঁধাধরা নিয়মে দেশ শাসন চলল। স্বাধীন দেশ, জনগণ নতুন কিছু আশা করেছিল, ইংরেজ চলে গেলে তাদের অনেক উন্নতি হবে এবং শোষণ থাকবে না। আজ দেখছে ঠিক তার উল্টা। জনগণের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছিল। এদিকে ভ্রুক্ষেপ নাই আমাদের শাসকগোষ্ঠীর। জিন্নাহর মৃত্যুর পর থেকেই কোটারি ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়েছে। লিয়াকত আলী খান এখন সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী। তিনি কাউকেও সহ্য করতে চাইছিলেন না। যদিও তিনি গণতন্ত্রের কথা মুখে বলতেন, কাজে তার উল্টা করছিলেন। জিন্নাহকে পূর্ব বাংলার জনগণ ভালবাসত এবং শ্রদ্ধা করত। ঘরে ঘরে জনসাধারণ তার নাম জানত। লিয়াকত আলী খান প্রধানমন্ত্রী। এইটুকু শিক্ষিত সমাজ জানত এবং আশা করেছিল জিন্নাহ সাহেবের এক নম্বর শিষ্য নিশ্চয়ই ভাল কাজ করবেন এবং শাসনতন্ত্র তাড়াতাড়ি দিবেন। জিন্নাহ সাহেব শাসনতন্ত্র দিয়ে গেলে কোনো গোলমাল হওয়া বা ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা থাকত কি না সন্দেহ ছিল। যাই তিনি করতেন জনগণ মেনে নিতে বাধ্য হত। জিন্নাহ সাহেব বড়লাট হয়ে প্রচণ্ড ক্ষমতা ব্যবহার করতেন। খাজা সাহেব কোন ক্ষমতাই ব্যবহার করতেন না। তিনি অমায়িক ও দুর্বল প্রকৃতির লোক ছিলেন। ব্যক্তিত্ব বলে তার কিছুই ছিল না।
লিয়াকত আলী আমাদের এই আন্দোলন ভাল চোখে দেখছিলেন না। পূর্ব বাংলার নেতারা তাঁকে ভুল বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমিন সাহেব সরকারি কর্মচারীদের উপর নির্ভর করতেন এবং তাদের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে অত্যাচার করতে শুরু করলেন। টাঙ্গাইল উপনির্বাচনে পরাজিত হয়েও তাদের চক্ষু খুলল না। সরকারি দল তাদের সভায় ঘোষণা করল, যা কিছু হোক, শামসুল হক সাহেবকে আইনসভায় বসতে দেওয়া হবে না। তারা নির্বাচনী মামলা দায়ের করল। শামসুল হক সাহেব ইলেকশনে জয়লাভ করে ঢাকা আসলে ঢাকার জনসাধারণ ও ছাত্রসমাজ তাকে বিরাট সম্বর্ধনা জানাল। বিরাট শোভাযাত্রা করে তাকে নিয়ে ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করল। আমরা জেলে বসে বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করলাম। শামসুল হক সাহেব ফিরে আসার পরেই পুরানা লীগ কর্মীরা মিলে এক কর্মী সম্মেলন ডাকল ঢাকায়—ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করার জন্য। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন সে সভা আহ্বান করা হয়েছিল।
