পরদিন দেখা গেল শতকরা পঞ্চাশজন ছাত্র রাতে হল ত্যাগ করে চলে গিয়েছে। তার পরদিন আরও অনেকে চলে গেল। তিন দিন পর দেখা গেল আমরা ত্রিশ-পঁয়ত্রিশজন সলিমুল্লাহ হলে আছি আর বিশ-পঁচিশজন ফজলুল হক হলে আছে। পুলিশ হল ঘেরাও করে রেখেছে। এক কামরায় আলোচনা সভায় বসলাম। আমাদের পক্ষে আর পুলিশকে বাধা দেওয়া সম্ভব হবে না। সকলে একমত হয়ে ঠিক হল, হল ত্যাগ করার এবং নিম্ন কর্মচারীদের জন্য টাকা তুলে সাহায্য করা, তা না হলে তারাও ধর্মঘট চালাতে পারবে না। চার দিন পরে আমরাও হল ত্যাগ করতে বাধ্য হলাম এবং চাঁদা তুলে এদের সাহায্য করতে লাগলাম। দশ-পনের দিন পর দেখা গেল এক একজন করে কর্মচারী বন্ড দিয়ে কাজে যোগদান করতে শুরু করেছে। এক মাসের মধ্যে প্রায় সকলেই যোগদান করল। ধর্মঘট শেষ হয়ে গেল। এই সময় আমি ও কয়েকজন কর্মী দিনাজপুর যাই। কারণ, কয়েকজন ছাত্রকে গ্রেফতার করে জেলে রেখেছে এবং দবিরুল ইসলামকে জেলের ভিতর মারপিট করেছে। ১৪৪ ধারা জারি ছিল। বাইরে সভা করতে পারলাম না। ঘরের ভিতর সভা করলাম। আমরা হোস্টেলেই ছিলাম। আবদুর রহমান চৌধুরী তখন ছাত্রলীগের সেক্রেটারি ছিল। আমরা যখন ঢাকা ফিরে আসছিলাম বোধহয় আবদুল হামিদ চৌধুরী আমার সাথে ছিল। ট্রেনের মধ্যে খবরের কাগজে দেখলাম, আমাদেরসহ সাতাশজন ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেছে। এর মধ্যে দিনাজপুরের দবিরুল ইসলাম, অলি আহাদ, মোল্লা জালালউদ্দিন (এখন এভভভাকেট), আবদুল হামিদ চৌধুরীকে চার বৎসরের জন্য আর অন্য সকলকে বিভিন্ন মেয়াদে। তবে এই চারজন ছাড়া আর সকলে বন্ড ও জরিমানা দিলে লেখাপড়া করতে পারবে। মেয়েদের মধ্যে একমাত্র লুলু বিলকিস বানুকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তিনি ছাত্রলীগের মহিলা শাখার কনভেনর ছিলেন। এক মাসের মধ্যে প্রায় সকল কর্মচারীই গোপনে গোপনে কাজে যোগদান করল। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, ছাত্ররা নাই। এই সুযোগে কর্তৃপক্ষ নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীদের মনোবল ভাঙতে সক্ষম হয়েছিল।
৩৯.
এই সময় বাইরে পুরানা লীগ কর্মী ও নেতারা আলাপ-আলোচনা শুরু করেছে কি করা যাবে? একটা নতুন দল গঠন করা উচিত হবে কি না? আমার মত সকলকে বললাম, শুধুমাত্র ছাত্র প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করে রাজনীতি করা যায় না। সরকারি মুসলিম লীগ ছাড়া কংগ্রেসেরও একটা প্রতিষ্ঠান ছিল। তবে গণপরিষদে ও পূর্ব বাংলার আইনসভায় এদের কয়েকজন সভ্য ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এদের সকলেই হিন্দু, এরা বেশি কিছু বললেই রাষ্ট্রদ্রোহী’ আখ্যা দেওয়া হত। ফলে এদের মনোবল একেবারে ভেঙে গিয়েছিল। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামারও ভয় ছিল। কংগ্রেসকে মুসলমান সমাজ সন্দেহের চোখে দেখত। একজন মুসলমান সভ্যও তাদের ছিল না। এদিকে মুসলিম লীগের পুরানা নামকরা নেতারা সকলেই সরকার সমর্থক হয়ে গিয়েছিলেন। মন্ত্রিত্ব, পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি কিছু না কিছু অনেকের কপালেই জুটেছিল। নামকরা কোনো নেতাই আর ছিল না, যাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ানো যায়।
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তখন সদ্য আসাম থেকে চলে এসেছেন। তাঁকে পূর্ব বাংলার জনসাধারণ তেমন জানত না। শুধু ময়মনসিংহ, পাবনা ও রংপুরের কিছু কিছু লোক তার নাম জানত। কারণ তিনি আসামেই কাটিয়েছেন। তবে শিক্ষিত সমাজের কাছে কিছুটা পরিচিত ছিলেন। একজন মুসলিম লীগের নেতা হিসাবে তিনি আসামের বাঙ্গাল খেদা’ আন্দোলনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এবং জেলও খেটেছিলেন। টাঙ্গাইলের লোকেরা তাকে খুব ভালবাসত। শামসুল হক সাহেব তাকে ভালভাবে জানতেন। কারণ, হক সাহেবের বাড়িও সেখানে। তিনি মওলানা সাহেবের সাথে পাকাপাকি আলোচনা করবেন ঠিক হল। পূর্বেও তিনি পুরানা মুসলিম লীগ কর্মীদের সভায় যোগদান করেছিলেন। কিছুদিনের জন্য তিনি আসাম গিয়েছিলেন। ফিরে আসলেই আমরা কর্মিসভা করে একটা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করব ঠিক হল। সীমান্ত প্রদেশের পীর মনকী শরীফ একটা প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। তার নাম দিয়েছেন, আওয়ামী মুসলিম লীগ। সীমান্ত প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী খান আবদুল কাইয়ুম খান মুসলিম লীগ থেকে পুরানা কর্মীদের বাদ দিয়েছেন এবং অত্যাচারের স্টিমরোলার চালিয়ে দিয়েছেন। অনেক লীগ কর্মীকে জেলে দিতেও দ্বিধাবোধ করেন নাই। এখন তিনি সীমান্ত শার্দুল’ বনে গিয়েছেন। পাকিস্তান আন্দোলনে সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গাফফার খান ও ডাক্তার খান সাহেবের মোকাবেলা করতে পারেন নাই। ফলে সীমান্ত প্রদেশে কংগ্রেস সরকার গঠন হয়। একমাত্র পীর মানকী শরীফই লাল কোর্তাদের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগকে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবু পীর সাহেবের জায়গাও মুসলিম লীগে হয় নাই। পীর মানকী শরীফ সভাপতি এবং খান গোলাম মোহাম্মদ খান লুথাের সাধারণ সম্পাদক হয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেন।
৪০.
১৯৪৯ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে অথবা এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে টাঙ্গাইলে উপনির্বাচন হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। আমরা ঠিক করলাম, শামসুল হক সাহেবকে অনুরোধ করব মুসলিম লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে লড়তে। শামসুল হক সাহেব শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন, কিন্তু টাকা পাওয়া যাবে কোথায়? হক সাহেবেরও টাকা নাই, আর আমাদেরও টাকা নাই। তবু যেই কথা সেই কাজ। শামসুল হক সাহেব টাঙ্গাইল চলে গেলেন, আমরা যে যা পারি জোগাড় করতে চেষ্টা করলাম। কয়েক শত টাকার বেশি জোগাড় করা সম্ভব হয়ে উঠল না। ছাত্র ও কর্মীরা ঘড়ি, কলম বিক্রি করেও কিছু টাকা দিয়েছিল।
