৩৮.
আমরা রাতে ঢাকা এসে পৌঁছালাম। ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে যেয়ে শুনলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীরা ধর্মঘট শুরু করেছে এবং ছাত্ররা তার সমর্থনে ধর্মঘট করছে। নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীরা বহুদিন পর্যন্ত তাদের দাবি পূরণের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন-নিবেদন করেছে একথা আমার জানা ছিল। এরা আমার কাছেও এসেছিল। পাকিস্তান হওয়ার পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রেসিডেন্সিয়াল বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এখন এটাই পূর্ব বাংলার একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্র অনেক বেড়ে গিয়েছিল। কর্মচারীদের সংখ্যা বাড়ে নাই। তাদের সারা দিন ডিউটি করতে হয়। পূর্বে বাসা ছিল, এখন তাদের বাসা প্রায়ই নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কারণ নতুন রাজধানী হয়েছে, ঘরবাড়ির অভাব। এরা পোশাক পেত, পাকিস্তান হওয়ার পরে কাউকেও পোশাক দেওয়া হয় নাই। চাউলের দাম ও অন্যান্য জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। চাকরির কোনো নিশ্চয়তাও ছিল না। ইচ্ছামত তাড়িয়ে দিত, ইচ্ছামত চাকরি দিত।
আমি তাদের বলেছিলাম, প্রথমে সংঘবদ্ধ হোন, তারপর দাবিদাওয়া পেশ করেন, তা নাহলে কর্তৃপক্ষ মানবে না। তারা একটা ইউনিয়ন করেছিল, একজন ছাত্র তাদের সভাপতি হয়েছিল। আমি আর কিছুই জানতাম না। জেলায় জেলায় ঘুরছিলাম। ঢাকায় এসে যখন শুনলাম, এরা ধর্মঘট করেছে তখন বুঝতে বাকি থাকল না, কর্তৃপক্ষ এদের দাবি মানতে অস্বীকার করেছে। তবু এত তাড়াতাড়ি ধর্মঘটে যাওয়া উচিত হয় নাই। কারণ, এদের কোনো ফান্ড নাই। মাত্র কয়েকদিন হল প্রতিষ্ঠান করেছে। কিন্তু কি করব, এখন আর উপায় নাই। সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম, ছাত্ররা এদের প্রতি সহানুভূতিতে ধর্মঘট শুরু করে দিয়েছে। কর্মচারীরা শোভাযাত্রা বের করেছিল। ছাত্ররাও করেছিল। আমি কয়েকজন ছাত্রনেতাকে নিয়ে ভাইস-চ্যান্সেলর সাহেবের কাছে দেখা করতে যেয়ে তাকে সব বুঝিয়ে বললাম। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সকল কর্মচারীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দেবেন ঠিক করেছেন। বিকেলে আবার ফজলুল হক হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপিদের নিয়ে সাক্ষাৎ করলাম এবং তাকে অনুরোধ করলাম, এই কথা বলে যে, “আপনি আশ্বাস দেন, ওদের ন্যায্য দাবি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আদায় করে দিতে চেষ্টা করবেন এবং কাউকেও চাকরি থেকে বরখাস্ত করবেন না এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কারও বিরুদ্ধে গ্রহণ করবেন না।“ অনেক আলোচনা হয়েছিল, পরের দিন তিনি রাজি হলেন। আমাদের বললেন, “আগামীকাল ধর্মঘট প্রত্যাহার করে চাকরিতে যোগদান করলে কাউকেও কিছু বলা হবে না এবং আমি কর্তৃপক্ষের কাছে ওদের ন্যায্য দাবি মানাতে চেষ্টা করব।”
আমরা তার কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এলাম, তখন বিকাল তিনটা বেজে গিয়েছে। আমরা ওদের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করে ঘোষণা করলাম, কাল থেকে ছাত্ররা ধর্মঘট প্রত্যাহার করবে। কারণ বহু কর্মচারীও ধর্মঘট প্রত্যাহার করবে; ভাইস-চ্যান্সেলরের আশ্বাস পেয়ে তারা রাজি হয়েছে। অনেক কর্মচারী দূরে দূরে থাকে, সকলকে খবর দিতে বললাম, যতদূর সম্ভব। পরের দিন ছাত্ররাও ক্লাসে যোগদান করেছে; কর্মচারীরাও অনেকেই যোগদান করেছে। যারা বারটার মধ্যে এসে পৌঁছাতে পেরেছে তাদের কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেছে। আর যারা বারটার পরে এসেছে তাদের যোগদান করতে দেওয়া হয় নাই। অনেককে খবর পেয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকেও আসতে হয়েছিল। শতকরা পঞ্চাশজন কর্মচারী দেরি করে আসতে বাধ্য হয়েছিল, কারণ বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর দিয়ে তাদের আনাতে হয়েছিল। আমাকে ও আমার সহকর্মীদের কাছে কর্মচারীরা এসে সব কথা খুলে বলল। একে একে আবার সকলে জড়ো হল। আমরা মিথ্যেবাদী হয়ে যাবার উপক্রম হলাম। সকলকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রেখে আবার আমরা ভাইস-চ্যান্সেলারের বাড়িতে উপস্থিত হলাম এবং বললাম, “কি ব্যাপার?” তিনি বললেন, “আমি যখন আগামীকাল কাজে যোগদান করতে বলেছি, তার অর্থ এগারটায় যোগদান করতে হবে, এক মিনিট দেরি হয়ে গেলে তাকে নেওয়া হবে না। আমরা তাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, তিনি বুঝেও বুঝলেন না। এর কারণ ছিল সরকারের চাপ। আমরা বললাম, সামান্য দু’এক ঘণ্টার জন্য কেন গোলমাল সৃষ্টি করলেন? তিনি কিছুতেই রাজি হলেন না, আমরা তাঁকে আরও বললাম, “আপনি পূর্বেই তো বলতে পারতেন, এগারটার মধ্যেই যোগদান করতে হবে। আপনি তো বলেছিলেন, আগামীকালের মধ্যে যোগদান করতে চলবে।” তিনি আর আলোচনা করতে চাইলেন না। আমরা বলে এলাম, তাহলে ধর্মঘটও চলবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ছাত্র-কর্মচারীদের যুক্ত সভা হল। সভায় আমি সমস্ত ঘটনা বললাম এবং আগামীকাল থেকে ছাত্র-কর্মচারীদের ধর্মঘট চলবে, যে পর্যন্ত না এদের ন্যায্য দাবি মানে। শোভাযাত্রা হল, আবার পরের দিন সকাল এগারটায় শোভাযাত্রা শুরু হবে বলে ঘোষণা করা হল। এবার আমাকে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে হল। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্ণধার ও শিক্ষাবিদ সরকারের চাপে এই রকম একটা কথার মারপ্যাচ করতে পারে এটা আমার ভাবতেও কষ্ট হয়েছিল। রাতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সভার পরে ঘোষণা করল, “বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হল। হল থেকে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে চলে যেতে হবে। আর যে সমস্ত কর্মচারী ধর্মঘটে যোগদান করেছে তাদের বরখাস্ত করা হল।” আমি সলিমুল্লাহ হলে ছিলাম। সেই মুহুর্তেই সভা ডাকা হল এবং সভায় ঘোষণা করা হল, হল ত্যাগ করা হবে না। ফজলুল হক হলেও সন্ধ্যায় এই ঘোষণা করা হয়। একটা কমিটি করা হয়েছিল, কর্মচারীদের জন্য একটা ফান্ড করা হবে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে টাকা তুলে সাহায্য করা হবে। কারণ, এদের প্রায় সকলেই বিশ-ত্রিশ টাকার বেশি বেতন পেত না। সংসার চালাবে কি করে? এদের মধ্যে কয়েকজনকে টাকা তোলার ভার দেওয়া হয়েছিল।
