খুব ভোরে আমাদের রওয়ানা করতে হল। আমরা ব্যাংকক পৌঁছালাম। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক, বেশ বড় এয়ারপোর্ট তাদের। এখানে আমরা চা-নাশতা খেলাম। এক ঘণ্টা পরে হংকং রওয়ানা করলাম। সোজা হংকং, আর কোথাও প্লেন থামবে না। আমার প্লেনে ঘুমাতে কোনো কষ্ট হয় না। থাইল্যান্ড, লাওস, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ চীন সাগর পাড়ি দিয়ে বেলা একটায় হংকংয়ের কাইতেক বিমান ঘাঁটিতে পৌঁছালাম। সিনহুয়া সংবাদ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা আমাদের অভ্যর্থনা করল। ইংরেজিতে ‘নিউ চায়না নিউজ এজেন্সি’ বলা হয় সংবাদ প্রতিষ্ঠানটাকে। কৌলুন হোটেলে আমাদের থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে দশ-বারজন প্রতিনিধি আগেই পৌঁছে গেছেন। ঐদিন সন্ধ্যায় ও পরের দিন ভোরের মধ্যে পাকিস্তানের প্রতিনিধি সকলেই পৌঁছাবে। পরের দিন ভোরে আমাদের সভা হল, সভায় পীর মানকী শরীফকে নেতা করা হল।
রাতে ও দিনে হংকং ঘুরে দেখলাম। হংকংয়ের নাম ইংরেজরা রেখেছে ভিক্টোরিয়া। নদীর এক পাড়ে হংকং, অন্য পাড়ে কৌলুন। আমরা সকলেই কিছু কিছু গরম কাপড় কিনে নিলাম। আমাদের টাকা বেশি নাই, কিন্তু জিনিসপত্র খুব সস্তা। তবে সাবধান হয়ে কিনতে হবে। এক টাকা দামের জিনিস পঁচিশ টাকা চাইবে, আপনাকে এক টাকাই বলতে হবে, লজ্জা করলে ঠকবেন। জানাশোনা পুরানা লোকের সাহায্য ছাড়া মালপত্র কেনা উচিত না। হংকংয়ের আরেকটা নাম হওয়া উচিত ছিল ঠগিজ শহর। রাস্তায় হাঁটবেন পকেটে হাত দিয়ে, নাহলে পকেট খালি। এত সুন্দর শহর তার ভিতরের রূপটা চিন্তা করলে শিউরে উঠতে হয়। এখন ইংরেজের কলোনি। অনেক চীনা অর্থশালী লোক পালিয়ে হংকং এসেছে। বাস্তুহারা লোকেরা পেটের দায়েও অনেক অসৎ কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এক পাকিস্তানী বন্ধুর সাথে আলাপ হয়েছিল। সিন্ধুতে তার বাড়ি ছিল, এখন হংকংয়ে আছে। তার সাথে বসে বসে অনেক গল্প শুনলাম। পরে অনেকবার হংকংয়ে যেতে হয়েছে এবং কয়েকদিন থাকতেও হয়েছে। হংকং এত পাপ সহ্য করে কেমন করে, শুধু তাই ভাবি।
৭২.
বোধহয় হংকং থেকে ২৭ তারিখে রেলগাড়িতে ক্যান্টন পৌঁছালাম। সেনচুন স্টেশন কমিউনিস্ট চীনের প্রথম স্টেশন। ব্রিটিশ এরিয়ার পরে আর ব্রিটিশ রেল যায় না। আমরা হেঁটে হেঁটে পুল পার হয়ে স্টেশনে পৌঁছালাম। শান্তি কমিটির স্বেচ্ছাসেবক ও স্বেচ্ছাসেবিকারা আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানাল। কোন চিন্তা নাই। মালপত্র সব কিছুর ভার তারা গ্রহণ করেছেন। আমাদের জন্য ট্রেনে খাবার ও থাকার সুবন্দোবস্ত করা হয়েছে। দুই তিনজনের জন্য একজন করে ইন্টারপ্রেটার রয়েছে। এদের সকলেই প্রায় স্কুল, কলেজের ছেলেমেয়ে। আমি ট্রেনের ভিতর ঘুরতে শুরু করলাম। ট্রেনে এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত যাওয়া যায়। নতুন চীনের লোকের চেহারা দেখতে চাই। আফিং’ খাওয়া জাত যেন হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। আফিং এখন আর কেউ খায় না, আর ঝিমিয়েও পড়ে না। মনে হল, এ এক নতুন দেশ, নতুন মানুষ। এদের মনে আশা এসেছে, হতাশা আর নাই। তারা আজ স্বাধীন হয়েছে, দেশের সকল কিছুই আজ জনগণের। ভাবলাম, তিন বছরের মধ্যে এত বড় আলোড়ন সৃষ্টি এরা কি করে করল! ক্যান্টন পৌঁছালাম সন্ধ্যার পরে। শত শত ছেলেমেয়ে ফুলের তোড়া নিয়ে হাজির। শান্তি কমিটির কর্মকর্তারা আমাদের রেলস্টেশনে অভ্যর্থনা করলেন। পার্ল নদীর পাড়ে এক বিরাট হোটেলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাতেই আবার ডিনার, শান্তি কমিটির পক্ষ থেকে। চীনের লোকেরা বাঙালিদের মত বক্তৃতা করতে আর বক্তৃতা শুনতে ভালবাসে।
খাবার শুরু হবার পূর্বে বক্তৃতা হল। আমাদের পক্ষ থেকে পীর সাহেব বক্তৃতা করলেন। হাততালি কথায় কথায়, আমাদেরও তালি দিতে হল। ভোরেই রওয়ানা করতে হবে পিকিং। আমাদের অনেক দেরি হয়ে গেছে পৌঁছাতে। তাই কনফারেন্স বন্ধ রাখা হয়েছে। কারণ, অনেক দেশের প্রতিনিধিরাই সময় মত পৌঁছাতে পারে নাই। ক্যান্টন থেকে প্লেনে যেতে হবে দেড় হাজার মাইল। সকালে নাশতা খেয়ে আমরা রওয়ানা করলাম। দিনেরবেলা প্লেনে দেড় হাজার মাইল চীনের ভূখণ্ডের উপর দিয়ে যাবার সময় সেদেশের সৌন্দর্য দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ হয়ে পড়েছিলাম।
ক্যান্টন প্রদেশ বাংলাদেশের মতই সুজলা সুফলা। শত শত বছর বিদেশীরা এই দেশকে শোষণ করেও এর সম্পদের শেষ করতে পারে নাই। নয়া চীন মন প্রাণ দিয়ে নতুন করে গড়তে শুরু করেছে। বিকেলবেলা আমরা পৌঁছালাম পিকিং এয়ারপোর্টে। পিকিং শান্তি কমিটির সদস্যরা, ভারতবর্ষেরও কয়েকজন প্রতিনিধি এবং ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা উপস্থিত হয়েছে। আমাদের পরিচয় পর্ব শেষ করে পিকিং হোটেলে নিয়ে আসা হল। এই সেই পিকিং, চীনের রাজধানী। পূর্বে অনেক জাতি পিকিং দখল করেছে। ইংরেজ বা জাপান অনেক কিছু ধ্বংসও করেছে। অনেক লুটপাট করেছে, দখল করার সময়। এখন সমস্ত শহর যেন নতুন রূপ ধরেছে। পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তি পেয়ে প্রাণভরে হাসছে।
আমাদের পিকিং হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করেছে। এই হোটেলটাই সবচেয়ে বড় এবং সুন্দর। আতাউর রহমান সাহেব, মানিক ভাই ও আমি এক রুমে। বড় ক্লান্ত আমরা। রাতে আর কোথাও বের হব না। আমাদের দলের নেতা পীর সাহেব বলে দিয়েছেন, কোনো মুসলমান হোটেলে খাওয়ার ব্যবস্থা করতে। রাতে বাসে চড়ে সেখানে যেতে হবে খাবার জন্য। ভীষণ শীত বাইরে, যেতে ইচ্ছা আমাদের ছিল না, তবুও উপায় নাই। প্রায় দুই মাইল দূরে এই হোটেলটা। আমরা পৌঁছার সাথে সাথে খাবার আয়োজন করে ফেলেছে। মনে হল হোটেলের মালিক খুব খুশি হয়েছেন। চীনা ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা তারা জানে না। ইন্টারপ্রেটার সাথেই আছে। খেতে শুরু করলাম, কিন্তু খাবার উপায় নাই। ভীষণ ঝাল। দু’এক টুকরা রুটি মুখে দিয়ে বিদায় হলাম। যা কিছু খেয়েছিলাম তার ধাক্কা চলল, পেটের ব্যথা শুরু হল। রুমে আঙ্গুর ও অন্যান্য ফলফলারি ছিল, তাই খেয়ে আর চা খেয়ে রাত কাটালাম। মানিক ভাই বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন, তিনি আর যাবেন না ঐ হোটেলে খেতে। পিকিং হোটেলেই সব কিছু পাওয়া যায়। যা খেতে চাইবেন, তাই দিবে। মানিক ভাই আর কয়েকজন পরের দিন দুপুরে পিকিং হোটেলে খেয়ে শুয়ে পড়লেন। আমি ও আতাউর রহমান সাহেব দুপুরেও বাধ্য হয়ে খেলাম ঐ হোটেলে। রাতে দেখা গেল পাঁচ ছয়জন আছেন পীর সাহেবের সাথে। পরের দিন পীর সাহেব ও তাঁর সেক্রেটারি হানিফ খান (এখন কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি) ছাড়া আর কেউ মুসলমান হোটেলে খেতে গেলেন না। পিকিং হোটেলে ভাত, তরকারি, চিংড়ি মাছ, মুরগি, গরুর মাংস, ডিম সবকিছুই পাওয়া যায়। কয়েক মিনিট দেরি করলে এবং বলে দিলে ঐসব খাবার পাক করে এনে হাজির করে। আমাদের এখন আর কোনো অসুবিধা হয় না। কয়েকদিন পূর্বে কলকাতা থেকে বিখ্যাত লেখক বাবু মনোজ বসু এবং বিখ্যাত গায়ক ক্ষিতীশ বোস এসেছেন। তাঁরা বাঙালি খানার বন্দোবস্ত করে ফেলেছেন। তাঁদের সাথে আমাদের আলাপ হওয়ার পরে আরও সুবিধা হয়ে গেল।
