আমাদের হাতে দুই-তিন দিন সময় আছে। ১লা অক্টোবর নয়া চীনের স্বাধীনতা দিবস। ১৯৪৯ সালের ১লা অক্টোবর এরা স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। চীন থেকে পালিয়ে চিয়াং কাইশেকের দল ফরমোজায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল।
শান্তি সম্মেলন শুরু হবে ২রা অক্টোবর থেকে। ভাবলাম, সম্মেলন শুরু হবার আগে দেখে নিই ভাল কত্রে পিকিং শহরকে। পিকিং শহরের ভিতরেই আর একটা শহর, নাম ইংরেজিতে ‘ফরবিডেন সিটি’। সম্রাটরা পূর্বে অমাত্যবর্গ নিয়ে এখানে থাকতেন। সাধারণ লোকের এর মধ্যে যাওয়ার হুকুম ছিল না। এই নিষিদ্ধ শহরে না আছে এমন কিছুই নাই। পার্ক, লেক, প্রাসাদ সকল কিছুই আছে এর মধ্যে। ভারতে লালকেল্লা, ফতেহপুর সিক্রি এবং আগ্রাকেল্লাও আমি দেখেছি। ফরবিডেন সিটিকে এদের চেয়েও বড় মনে হল। এখন সকলের জন্য এর দরজা খোলা, শ্রমিকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। মিউজিয়াম, লাইব্রেরি, পার্ক, লেক সবকিছুই আজ জনসাধারণের সম্পত্তি। হাজার হাজার লোক আসছে, যাচ্ছে। দেখলাম ও ভাবলাম, রাজ-রাজড়ার কাণ্ড সব দেশেই একই রকম ছিল। জনগণের টাকা তাদের আরাম আয়েশের জন্য ব্যয় করতেন, কোনো বাধা ছিল না।
পরের দিন গ্রীষ্ম প্রাসাদ দেখতে গেলাম, যাকে ইংরেজিতে বলা হয়, সামার প্যালেস’। নানা রকমের জীব জানোয়ারের মূর্তি, বিরাট বৌদ্ধ মন্দির, ভিতরে বিরাট লেক, লেকের মধ্যে একটা দ্বীপ। এটাকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রমোদ নগরী বলা চলে।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল রেজা পিকিং হোটেলে আমাদের সাথে দেখা করতে এলেন। তিনি বললেন, আমাদের কোন অসুবিধা হলে বা কোনো কিছুর দরকার হলে তাকে যেন খবর দেই। তিনি আমাদের খাবার দাওয়াতও করেছিলেন। তাঁর কাছ থেকে গল্প শুনলাম অনেক। কালোবাজার বন্ধ, জনগণ কাজ পাচ্ছে। চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি বন্ধ হয়ে গেছে। কঠোর হাতে নতুন সরকার এইসব দমন করেছে। যে কোন জিনিস কিনতে যান, এক দাম। আমি একাকী বাজারে সামান্য জিনিসপত্র কিনেছি। দাম লেখা আছে। কোনো দরকষাকষি নাই। রিকশায় চড়েছি। কথা বুঝতে পারি না। চীনা টাকা যাকে ইয়েন বলে, হাতে করে বলেছি, “ভাড়া নিয়ে যাও কত নেবা।” তবে যা ভাড়া, তাই নিয়েছে, একটুও বেশি নেয় নাই।
এবারের ১লা অক্টোবর তৃতীয় স্বাধীনতা দিবস। শান্তি সম্মেলনের ডেলিগেটদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের ঠিক পিছনে উঁচুতে মাও সে তুং, চু তে, মাদাম সান ইয়েৎ সেন (সুং চিং লিং), চৌ এন লাই, লিও শাও চী আরও অনেকে অভিবাদন গ্রহণ করবেন। জনগণ শোভাযাত্রা করে আসতে লাগল। মনে হল, মানুষের সমুদ্র। পদাতিক, নৌ, বিমান বাহিনী তাদের কুচকাওয়াজ ও মহড়া দেখাল। তারপরই শুরু হল, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, ইয়াং পাইওনিয়ারের মিছিল, শুধু লাল পতাকাসহ। একটা জিনিস আমার চোখে পড়ল। এতবড় শোভাযাত্রা কিন্তু শৃঙ্খলা ঠিকই রেখেছে। পঁচ-সাত লক্ষ লোক হবে মনে হল। পরের দিন খবরের কাগজে দেখলাম, পাঁচ লাখ। বিপ্লবী সরকার সমস্ত জাতটার মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে নতুন চিন্তাধারা দিয়ে।
আমি জানতাম না মাহাবুব এখানে আছে। মাহাবুব তৃতীয় সেক্রেটারি পাকিস্তান রাষ্ট্রদূতের অফিসে। আমার সাথে কিছুদিন ল’ পড়েছে। তার আব্বাকেও আমি জানতাম; জনাব আবুল কাশেম, সাবজজ ছিলেন। চট্টগ্রামে বাড়ি। বড় স্বাধীনচেতা লোক ছিলেন। সত্য কথা বলতে কখনও ভয় পেতেন না। মাহাবুবও দেখলাম তার স্ত্রীকে নিয়ে চলেছে স্বাধীনতা দিবসে যোগদান করতে। আমি মাহাবুবকে দূর থেকে দেখে ডাক দিলাম। হঠাৎ পিকিংয়ে নাম ধরে কে ডাকছে, একটু আশ্চর্যই হল বলে মনে হল। আমাকে দেখে খুবই খুশি হল। কাগজে দেখেছে আমি এসেছি। বিকালে হোটেলে এল, তার স্ত্রীও এলেন। আমাকে নিয়ে নিজেই শহরের অনেকগুলি জায়গা দেখাল। রাতে খাবার দাওয়াত ছিল বলে বেশি সময় থাকতে পারলাম না। পরদিন আবার দেখা হবে। যে কয়দিন পিকিংয়ে ছিলাম, রাতে আমি ওদের সাথেই খেতাম। বাংলাদেশের খাবার না খেলে আমার তৃপ্তি কোনোদিনই হয় নাই। মাহাবুবের বেগম আমাকে একটা ক্যামেরা উপহার দিলেন। টাকার প্রয়োজন ছিল, তাই মাহাবুব কিছু টাকাও আমাকে দিল। বলল, হংকং থেকে কিছু জিনিস কিনে নিও, খুব সস্তা। আমার স্ত্রীর কথাও বলল, “কিছু দিতে পারলাম না তাকে। এই টাকা থেকে ভাবীর জন্য উপহার নিও।” বেগম মাহাবুব আমাকে একটা ঘটনা বললেন। একদিন তিনি স্কুল থেকে আসছিলেন রিকশায়, কলম পড়ে গিয়েছিল রিকশার মধ্যে। বাড়ি এসে খোজাখুঁজি করে দেখলেন, কলম পাওয়া গেল না। তখন ভাবলেন, রিকশায় পড়ে গিয়াছে, আর পাওয়া যাবে না। পরের দিন রিকশাওয়ালা নিজে এসে কলম ফেরত দিয়ে গিয়েছিল। এ রকম অনেক ঘটনাই আজকাল হচ্ছে। অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে চীনের জনসাধারণের মধ্যে। বেগম মাহাবুব ও মাহাবুবের আদর আপ্যায়নের কথা কোনোদিন ভুলতে পারি নাই। চীনের পাকিস্তান দূতাবাসে মাহাবুবই একমাত্র বাঙালি কর্মচারী।
৭৩.
শান্তি সম্মেলন শুরু হল। তিনশত আটাত্তর জন সদস্য সাঁইত্রিশটা দেশ থেকে যোগদান করেছে। সাঁইত্রিশটা দেশের পতাকা উড়ছে। শান্তির কপোত একে সমস্ত হলটা সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। প্রত্যেক টেবিলে হেডফোন আছে। আমরা পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা একপাশে বসেছি। বিভিন্ন দেশের নেতারা বক্তৃতা করতে শুরু করলেন। প্রত্যেক দেশের একজন বা দুইজন সভাপতিত্ব করতেন। বক্তৃতা চলছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও অনেকেই বক্তৃতা করলেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আতাউর রহমান খান ও আমি বক্তৃতা করলাম। আমি বাংলায় বক্তৃতা করলাম। আতাউর রহমান সাহেব ইংরেজি করে দিলেন। ইংরেজি থেকে চীনা, রুশ ও স্পেনিশ ভাষায় প্রতিনিধিরা শুনবেন। কেন বাংলায় বক্তৃতা করব না? ভারত থেকে মনোজ বসু বাংলায় বক্তৃতা করেছেন। পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে না জানে এমন শিক্ষিত লোক চীন কেন দুনিয়ায় অন্যান্য দেশেও আমি খুব কম দেখেছি। আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি। তবু আমার মাতৃভাষায় বলা কর্তব্য। আমার বক্তৃতার পরে মনোজ বসু ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “ভাই মুজিব, আজ আমরা দুই দেশের লোক, কিন্তু আমাদের ভাষাকে ভাগ করতে কেউ পারে নাই। আর পারবেও না। তোমরা বাংলা ভাষাকে জাতীয় মর্যাদা দিতে যে ত্যাগ স্বীকার করেছ আমরা বাংলা। ভাষাভাষী ভারতবর্ষের লোকেরাও তার জন্য গর্ব অনুভব করি।”
