সকালে প্রস্তুত হয়ে আমি মানিক ভাইয়ের বাড়িতে চললাম। তখন ঢাকায় রিকশাই একমাত্র সম্বল। সকাল আটটায় যেয়ে দেখি তিনি আরামে শুয়ে আছেন। অনেক ডাকাডাকি করে তুললাম। আমাকে বলেন, “কি করে যাব, যাওয়া হবে না, আপনারাই বেড়িয়ে আসেন। আমি রাগ করে উঠলাম। ভাবীকে বললাম, “আপনি কেন যেতে বলেন না, দশ-পনের দিনে কি অসুবিধা হবে? মানিক ভাই লেখক, তিনি গেলে নতুন চীনের কথা লিখতে পারবেন, দেশের লোক জানতে পারবে। কাপড় কোথায়? সুটকেস ঠিক করেন। আপনি প্রস্তুত হয়ে নেন। আপনি না গেলে আমাদের যাওয়া হবে না।” মানিক ভাই জানে যে, আমি নাছোড়বান্দা। তাই তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে নিলেন। আমরা আতাউর রহমান সাহেবের বাড়িতে উপস্থিত হলাম। প্লেন সময় মতই আসছে। আজ আমাদের এগারটার মধ্যে পৌঁছাতে হবে। অনেক ফরমালিটিজ আছে। টিকিট অনেক পূর্বেই নিয়েছি। আমাদের সিটও রিজার্ভ আছে। আমরা পৌঁছার কিছু সময় পরেই বিওএসি’র প্লেন এসে নামল। কিছু কিছু বন্ধুবান্ধব আমাদের বিদায় দিতে এসেছে। শান্তি কমিটির সেক্রেটারি আলী আকসাদ কয়েকটা ফুলের মালাও নিয়ে এসেছে। আমাদের মালপত্র, পাসপোর্ট যথারীতি পরীক্ষা করা হল। এই প্লেনেই মিয়া মাহমুদ আলী কাসুরী ও আরও দুই তিনজন পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা চীন চলেছেন। শুনলাম, পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা করাচি থেকে হংকং রওয়ানা হয়ে গিয়েছেন, সেখানেই আমাদের সাথে দেখা হবে এবং একসাথে চীনে যাব। প্লেন প্রথমে রেঙ্গুন পৌঁছাবে। রাতে রেঙ্গুনে আমাদের থাকতে হবে। আমরা অনেক সময় পাব। বিকাল ও রাতটা রেঙ্গুনে থাকতে হবে। আতাউর রহমান সাহেব বললেন, “রেঙ্গুনে ব্যারিস্টার শওকত আলীর বড় ভাই থাকেন, তাঁর বিরাট ব্যবসা আছে। ঠিকানাও আমার জানা আছে।”
আমরা রেঙ্গুন পৌঁছার পরেই বিওএসির বিশ্রামাগারে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হল। ব্রহ্মদেশ ও বাংলাদেশ একই রকমে ফুলে ফলে ভরা। ব্রহ্মদেশে তখন ভীষণ গোলমাল, স্বাধীনতা পেলেও চারিদিকে অরাজকতা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর জাপান ও চীনের কাছ থেকে জনসাধারণ অনেক অস্ত্র পেয়েছিল। নিজেদের ইচ্ছামত এখন তা ব্যবহার করতে শুরু করেছে। কমিউনিস্ট ও কারেন বা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। গৃহযুদ্ধে দেশটা শেষ হতে চলেছে। আইনশৃঙ্খলা বলে কোন জিনিস নাই। যে কোন সময় এমনকি দিনেরবেলায়ও রেঙ্গুন শহরে রাহাজানি ও ডাকাতি হয়। সন্ধ্যার পরে সাধারণত মানুষ ভয়েতে ঘর থেকে বের হয় না। যাদের অবস্থা ভাল অথবা বড় ব্যবসায়ী তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। যে কোন মুহূর্তে তাদের ছেলেমেয়েদের ধরে নিয়ে যেতে পারে। আর যে টাকা দুবৃত্তরা দাবি করবে, তা না দিলে হত্যা করে ফেলবে। প্রায়ই এই সকল ঘটনা ঘটছে। আমাদের হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়েছে। কোথাও বের হলে বলে যেতে বলেছে। হোটেলকে রক্ষা করার জন্য রীতিমত সশস্ত্র সিপাহি রাখা হয়েছে। আমরা বিদেশী মানুষ, আমাদের আছেই বা কি?
হোটেলে পৌঁছেই আতাউর রহমান সাহেব রয়্যাল স্টেশনারির মালিক আমজাদ আলীকে টেলিফোন করলেন। তখন তিনি বাইরে ছিলেন, কিন্তু কিছু সময় পরে ফিরে এসে খবর পেয়ে হোটেলে উপস্থিত হলেন। আমাদের পেয়ে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। বিদেশে আপনজন বা দেশের লোক পেলে কেই বা খুশি না হয়। তাঁর নিজের গাড়ি আছে, আমাদের নিয়ে তিনি বেড়াতে বের হলেন। প্রথমেই তার দোকানে নিয়ে গেলেন। রেঙ্গুনের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দোকান ছিল রয়্যাল স্টেশনারি। মনে হল যেন, সবকিছু ঝিমিয়ে পড়ছে আস্তে আস্তে। তিনি আমাদের রেঙ্গুনের অবস্থা বললেন। তবে যা কিছু হোক, রেঙ্গুন তিনি ছাড়বেন না। রেঙ্গুন শহর ও তার আশেপাশের কুড়ি মাইলই মাত্র বার্মা সরকারের হাতে আছে। সরকার কিছুতেই বিদ্রোহীদের দমাতে পারছে না। যাহোক, ভদ্রলোক তার বাড়িতেও আমাদের নিয়ে গেলেন এবং স্ত্রীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ভদ্রমহিলা অমায়িক ও ভদ্র। রাতে আমাদের তার ওখানেই খেতে হবে। কোনো আপত্তি শুনলেন না।
আমাদের নিয়ে আমজাদ সাহেব বের হয়ে পড়লেন রেঙ্গুন শহর দেখাতে। বড় বড় কয়েকটা প্যাগোডা (বৌদ্ধ মন্দির) দেখলাম। একটার ভিতরেও আমরা যেয়ে দেখলাম। সকলের চেয়ে বড় প্যাগোডা কয়েক মাইল দূরে। ফিরে আসতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে তাই যাওয়া চলবে না, পথে বিপদ হতে পারে। আতাউর রহমান সাহেবের আর এক পরিচিত লোক আছেন, তিনিও পূর্ব বাংলার লোক। একবার মন্ত্রীও হয়েছিলেন। তাঁর বাড়িতে আমরা উপস্থিত হলাম। তিনি বাড়ি ছিলেন না, অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পরে উপর থেকে এক ব্ৰহ্ম মহিলা মুখ বের করে বললেন, বাড়িতে কেউ নাই। দরজা খুলতে পারবেন না। কারণ, আমাদের চিনেন না। কাগজ চাইলাম। তিনি বললেন, “দরজা খুলব না, কাগজ বাইরেই আছে, লিখে জানালা দিয়ে ফেলে যান।” এই ব্যবহার কেন? আমজাদ সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, “এইভাবে গাড়িতে করে ব্যান্ডিটরা আসে। বাড়ির মালিকের নাম ধরে ডাক দিলে আগে লোকেরা সাধারণত দরজা খুলে দিত। ব্যান্ডিটরা দরজা খুললেই হাত-মুখ বেঁধে বন্দুক ও পিস্তল দেখিয়ে সবকিছু লুট করে নিয়ে যায়। এ রকম ঘটনা প্রায়ই রেঙ্গুন শহরে ঘটছে, তাই কেউই এখন আর দরজা খোলে না—জানাশোনা লোক না দেখলে।
রেঙ্গুন শহরের একদিন শ্রী ছিল। এখনও কিছুটা আছে, তবে লাবণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। আমজাদ সাহেব কয়েক ঘণ্টা আমাদের নিয়ে অনেক জায়গা দেখালেন। পরে আমাদের বার্মা ক্লাবে নিয়ে গেলেন। স্বাধীন হওয়ার পূর্বে এই ক্লাবে ইউরোপিয়ান ছাড়া কেউ সদস্য হতে পারত না। এমনকি ভিতরে যাওয়ার হুকুম ছিল না। লেকের পাড়ে এই ক্লাবটা অতি চমৎকার। আমজাদ সাহেবকে সকলেই চিনে এবং শ্রদ্ধা করে। দিনভর বেড়িয়ে রাতে আমাদের পৌঁছে দিলেন হোটেলে এবং বিশেষ করে অনুরোধ করলেন ফেরার পথে দুই একদিন থেকে বেড়িয়ে যেতে। আমি ও ইলিয়াস এক রুমে ছিলাম। রেঙ্গুন শান্তি কমিটির কয়েকজন সদস্য আমাদের সাথে দেখা করতে আসলেন। অনেকক্ষণ আলোচনা হল। তাদের নেতা আমাদের জানালেন, পূর্বেই শান্তি কমিটির কয়েকজন সদস্য চীন চলে গিয়েছেন। আরও সদস্য যাবেন, তবে পাসপোর্ট এখনও পান নাই। কিছু সদস্য পালিয়ে চলে গিয়েছেন, একথাও জানালেন।
