শামসুল হক সাহেব পূর্বেই ময়মনসিংহে কমিটি গঠন করেছিলেন। জনাব আবুল মনসুর আহমদ সাহেব কলকাতা থেকে ফিরে এসেছেন। তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি হলেন এবং হাশিমউদ্দিন সাহেবকে সেক্রেটারি করলেন। হাশিমউদ্দিন আহমদ সাহেব, রফিকুদ্দিন ভূঁইয়া, হাতেম আলী তালুকদার রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় গ্রেফতার হয়ে রাজবন্দি হিসাবে জেলে ছিলেন। নোয়াখালীতে আবদুল জব্বার খদ্দর সাহেব জেলা কমিটি গঠন করেছেন। চট্টগ্রামে আবদুল আজিজ, মোজাফফর আহম্মদ, জহুর আহমদ চৌধুরী ও কুমিল্লায় আবদুর রহমান খান, লাল মিঞা ও মোশতাক আহমদ আওয়ামী লীগ গঠন করেছেন। আমি এই সমস্ত জেলায়ও ঘুরে প্রতিষ্ঠানকে জোরদার করতে চেষ্টা করলাম। আগস্ট মাসের শেষের দিকে বরিশাল হয়ে বাড়ি যেতে হল, টাকা পয়সার খুব অভাব হয়ে পড়েছে। কিছুদিন বাড়িতে থাকলাম, তারপর ঢাকায় ফিরে এলাম। লপড়া ছেড়ে দিয়েছি। আব্বা খুবই অসম্ভষ্ট, টাকা পয়সা দিতে চান না। আমার কিছু একটা করা দরকার। ছেলেমেয়ে হয়েছে, এভাবে কতদিন চলবে! রেণু কিছুই বলে না, নীরবে কষ্ট সহ্য করে চলেছে। আমি বাড়ি গেলেই কিছু টাকা লাগবে তাই জোগাড় করার চেষ্টায় থাকত। শেষ পর্যন্ত আব্বা আমাকে টাকা দিলেন, খুব বেশি টাকা দিতে পারেন নাই, তবে আমার চলবার মত টাকা দিতে কোনোদিন আপত্তি করেন নাই। আমার নিজের বেশি কোনো খরচ ছিল না, একমাত্র সিগারেটই বাজে খরচ বলা যেতে পারে। আমার ছোট ভাই নাসের ব্যবসা শুরু করেছে খুলনায়। সে আমার ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করে। বাড়ি থেকে তার কোনো টাকা পয়সা নিতে হয় না। লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে কিছু টাকা বাড়িতে দিতেও শুরু করেছে।
৭১-৮০. পূর্ব পাকিস্তান শান্তি কমিটির সভা
ঢাকায় ফিরে এসে পূর্ব পাকিস্তান শান্তি কমিটির সভায় যোগদান করলাম। আতাউর রহমান খান সাহেব সভাপতি। ‘আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই’—এই আমাদের স্লোগান। সেপ্টেম্বর মাসের ১৫-১৬ তারিখে খবর এল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলির প্রতিনিধিরা শান্তি সম্মেলনে যোগদান করবে। আমাদেরও যেতে হবে পিকিং-এ, দাওয়াত এসেছে। সমস্ত পাকিস্তান থেকে ত্রিশজন আমন্ত্রিত। পূর্ব বাংলার ভাগে পড়েছে মাত্র পাঁচজন। আতাউর রহমান খান, ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, উর্দু লেখক ইবনে হাসান ও আমি। সময় নাই, টাকা পয়সা কোথায়? পাসপোর্ট কখন করব? টিকিট অবশ্য পাওয়া যাবে যাওয়া-আসার জন্য শান্তি সম্মেলনের পক্ষ থেকে।
আমরা পাসপোর্টের জন্য দরখাস্ত করলাম, পাওয়ার আশা আমাদের খুবই কম। কারণ, সরকার ও তার দলীয় সভ্যরা তো ক্ষেপে অস্থির। কমিউনিস্ট না হলে কমিউনিস্ট চীনে যেতে চায়? শান্তি সম্মেলন তো না, কমিউনিস্ট পার্টির সভা, এমনি নানা কথা শুরু করে দিল। মিয়া ইফতিখারউদ্দিন সাহেব চেষ্টা করছেন করাচিতে, আমাদের পাসপোর্টের জন্য। পাসপোর্ট অফিসার ভদ্রলোক বললেন, “আমি লিখে পড়ে সব ঠিক করে রেখেছি, হুকুম আসলেই দুই মিনিটের মধ্যে পেয়ে যাবেন। তিনি নিজেও করাচিতে খবর দিলেন। আমরা পূর্ব বাংলা সরকারের হোম ডিপার্টমেন্টে খবর নিতে লাগলাম। আতাউর রহমান সাহেবও জয়েন্ট সেক্রেটারি ও সেক্রেটারির সাথে দেখা করলেন। কেউই কিছু বলতে পারে। আমরা চেষ্টায় রইলাম, বিওএসি অফিসে খোজ নিলাম। তারা আমাদের জানালেন, আপনাদের টিকিট এসে গেছে। তবে পাসপোর্ট না আনলে টিকিট ইস্যু করতে পারব না, সিটও রিজার্ভ করা যাবে না। সপ্তাহে একদিন বিওএসি’র প্লেন ঢাকায় আসে। শুনলাম, ২৩ কি ২৪ তারিখ ঢাকা-রেজুন হয়ে হংকং যাবে।
জানলাম পিকিংয়ে ভীষণ শীত, গরম কাপড় লাগবে। কিন্তু গরম কাপড় আমার ছিল না। তবে হংকং থেকেও কিনে নেওয়া যাবে। খুব নাকি সস্তা। ২২-২৩ তারিখে আমরা আশা ছেড়ে দিলাম। বোধহয় ২৪ তারিখ একটা প্লেন ঢাকায় আসবে। সরকার থেকে খবর এসেছে আমাদের পাসপোর্ট দেওয়া হবে। আমরা বুঝলাম এটা দেয়া না, শুধু মুখ রক্ষা করা। পাসপোর্ট পেলাম একটায়। কখন বাড়িতে যাব, কাপড় আনব আর কখনই বা প্লেনে উঠব। আতাউর রহমান সাহেব টেলিফোন করলেন বিওএসি অফিসে, প্লেনের খবর কি? তারা বলল, প্লেনের কোন খবর নাই। তবে কয়েক ঘন্টা লেট আছে। মনে আশা এল, তবে বোধহয় যেতে পারব। আমরা দেরি করতে লাগলাম, আতাউর রহমান সাহেবের বাড়িতে। এক ঘণ্টার মধ্যে খবর দেবে বলেছে, ঠিক কত ঘন্টা লেট আছে। মানিক ভাই বলতে শুরু করেছেন, তার যাওয়া হবে না, কারণ ইত্তেফাক কে দেখবে? টাকা কোথায়? ইত্তেফাঁকে লিখবে কে? কিছু সময় পরে খবর পেলাম চব্বিশ ঘন্টা প্লেন লেট। আগামী দিন বারটায় প্লেন আসবে, একটায় ছাড়বে। আমরা একটু আশ্বস্ত হলাম। কিছু সময় পাওয়া গেল। আওয়ামী লীগের কাজ চালাবার জন্য কিছু ব্যবস্থা করতে হবে। বাসায় এলাম, মোল্লা জালাল ও হামিদ চৌধুরী আমার সকল কিছু ঠিক করে দিল। আওয়ামী লীগ অফিস হয়ে মানিক ভাইয়ের কাছে ইত্তেফাক অফিসে চললাম। মানিক ভাইকে অনেক করে বললাম, একটু একটু করে রাজি হলেন, তবে ঠিক করে বলতে পারছেন না। আমাদের কথা ছিল, সকাল দশটায় আমরা আতাউর রহমান সাহেবের বাড়ি থেকে একসাথে এয়ারপোর্ট রওয়ানা করব। খন্দকার ইলিয়াস আমার ব্যক্তিগত বন্ধু, যুগের দাৰী সাপ্তাহিক কাগজের সম্পাদক। দুজনেই এক বয়সী, একসাথে থাকব ঠিক করলাম। মানিক ভাইকে নিয়ে বিপদ! কি যে করে বলা যায় না।
