লাহোর থেকে প্লেনে ঢাকা আসলাম। তখন সোজা করাচি বা লাহোর থেকে প্লেন আসত না। দিল্পি ও কলকাতা হয়ে প্লেন আসত। ঢাকা এসেই ওয়ার্কিং কমিটির সভা ডাকলাম। মওলানা সাহেবের সাথে যোগাযোগ করলাম। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মতামত সকলকে জানালাম। সকলেই এফিলেশন নিতে রাজি হলেন। সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব নেওয়া হল। সাপ্তাহিক ইত্তেফাক তখন খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। মানিক ভাই সব দিয়ে কাগজটি চালাচ্ছেন। আমি তাঁকে দরকার মত সাহায্য করছি। আতাউর রহমান সাহেবও সাহায্য করতে ক্রটি করেন নাই।
এই সময় মওলানা সাহেব অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সরকার তার কেবিন খরচ দিতে রাজি হল না। ওয়ার্ডে রাখতে রাজি আছে। কেবিনে থাকতে দিতে আপত্তি নাই, তবে খরচটা বাইরে থেকে দিতে হবে আমাদের। মওলানা ভাসানী বন্দি, টাকা পয়সা কোথায় পাবেন? সরকারের খরচ দেওয়া উচিত, তবুও দেবে না। কতটুকু নিচ হলে এ কাজ করতে পারে একটা সরকার। আমাকে মওলানা সাহেব খবর দিলেন, কি করবেন? মহাবিপদে পড়লাম, টাকা কোথায় পাব, আর কেইবা আমাদের সাহায্য করবে? দশ দিনে প্রতিদিন প্রায় একশত পঞ্চাশ টাকা করে লাগবে। কেবিনে থাকলে ঔষধ এবং অন্যান্য জিনিস নিজের কিনতে হবে। তবুও আমি মওলানা সাহেবকে কেবিনে যেতে বললাম এবং টাকার বন্দোবস্তে লাগলাম। আতাউর রহমান সাহেবও কিছু সাহায্য করবেন বললেন। আমার এক সরকারি কর্মচারী বন্ধু এবং আনোয়ারা খাতুনও মাঝে মাঝে সাহায্য করতেন। তবে একজনের কথা স্বীকার করা দরকার। হাজী গিয়াসউদ্দিন নামে একজন বন্ধু ছিলেন আমার। তিনি ব্যবসা করতেন। কোনোদিন আওয়ামী লীগের সভ্য হন নাই; তবে আমাকে ভালবাসতেন। তাঁর বাড়ি কুমিল্লায়। যখন আর কোথাও টাকা জোগাড় করতে পারি নাই, তখন তার কাছে গেলে কখনও আমাকে খালি হাতে ফিরে আসতে হয় নাই। দশ দিনের মধ্যেই টাকা জোগাড় করতে হত। দেরি হলেই মওলানা সাহেবের কাছে নোটিশ আসত আর মওলানা সাহেব আমাকে চিঠি দিতেন হাসপাতাল থেকে। দু’একবার মওলানা সাহেবের সাথে আমি হাসপাতালে সাক্ষাৎও করেছি। তবে কথা বেশি বলতে পারতাম না। গেলেই পুলিশ বা আইবি কর্মচারী বলতেন, তাদের চাকরি থাকবে না। ফলে আমি বাধ্য হয়ে চলে আসতাম। এই সময় ঢাকার বংশাল এলাকার অনেক কর্মী জনাব আবদুল মালেক ও হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগে যোগদান করে। তারা নিজেরাও টাকা তুলে সাহায্য করত। তখন কর্মীরাই আওয়ামী লীগে টাকা দিয়ে কাজ চালাত।
মওলানা সাহেব যখন হাসপাতালে তখন আমি জেলায় জেলায় সভা করার জন্য প্রোগ্রাম করলাম। আতাউর রহমান খান ও আবদুস সালাম খানের মধ্যে তখন মনে মনে রেষারেষি চলছিল। সালাম সাহেবও সহ-সভাপতি, তাকে কোন গুরুত্ব দেওয়া হয় না, শুধু আতাউর রহমান খানকে দেওয়া হয়। তাই তিনি বলতে আরম্ভ করলেন, তিনি হাইকোর্টের এডভোকেট আর আতাউর রহমান জজ কোর্টের এডভোকেট, বয়সেও তিনি বড়, আর রাজনীতিতেও তিনি সিনিয়র, তবু তাকে গুরুতুও দেওয়া হয় না। আমি তাকে বুঝাতে শুরু করলাম। বললাম, “আতাউর রহমান খান সাহেব পূর্বের থেকেই ঢাকায় আছেন, ঢাকার জনগণ তাঁকে জানে। আপনি ঢাকায় নতুন এসেছেন। এতে কিছুই আসে যায় না।” ওয়ার্কিং কমিটির সভায় একদিন আতাউর রহমান সাহেব সভাপতিত্ব করতেন, আর অন্য দিন আবদুস সালাম খান করতেন। মওলানা সাহেব বন্দি। আমি পড়লাম বিপদে। সালাম সাহেব কর্মীদের সাথে মিশতে জানতেন না। দরকার মত তাকে পাওয়া কষ্টকর ছিল। কিন্তু আতাউর রহমান সাহেবকে যে কোন সময় ডাকলে পাওয়া যেত। কাজী গোলাম মাহাবুব আত্মগোপন করে থাকার সময় ও পরে জেলে গেলে আতাউর রহমান সাহেব রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক হন। ফলে তিনি কর্মী ও ছাত্রদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করার সুযোগ পান। যে কোন সময় আতাউর রহমান সাহেবকে পেতাম। ফলে আমিও তাঁর দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছিলাম। তিনি কোনো সময় কোনো কাজে আপত্তি করতেন না। তাঁর নিজের উদ্যোগ খুব কম ছিল, তবুও ডাকলে পাওয়া যেত। আমি বাইরে প্রকাশ করতাম
যে, আতাউর রহমান সাহেবকে আমি বেশি পছন্দ করি। আমি সালাম সাহেবকে বললাম, আতাউর রহমান সাহেবকে নিয়ে আওয়ামী লীগ গড়তে উত্তরবঙ্গে যাচ্ছি। আপনি আমার সাথে ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনা যাবেন। তিনি রাজি হলেন।
আতাউর রহমান সাহেব ও আমি পাবনা, বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুরে প্রোগ্রাম করলাম। নাটোর ও নওগাঁয় কমিটি করতে পেরেছিলাম, কিন্তু রাজশাহীতে তখনও কিছু করতে পারি নাই। দিনাজপুরে সভা করলাম, সেদিন বৃষ্টি ছিল। তাই লোক বেশি হয় নাই। রাতে এক কর্মিসভা করে রহিমুদ্দিন সাহেবের নেতৃত্বে একটা জেলা কমিটি করলাম। এইভাবে বিভিন্ন জেলায় কমিটি করতে পারলাম। কিন্তু রাজশাহীতে পারলাম না। পাবনায়ও কেউ এগিয়ে আসল না। থাকার জায়গা পাওয়া কষ্টকর ছিল। পরে ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও আবদুর রব ওরফে বগাকে দিয়ে একটা কমিটি করলাম। অন্য কোনো লোক পাওয়া গেল না বলে, কয়েকজন ছাত্রের নাম দিয়ে দিলাম। পাবনায় ছাত্রলীগের কর্মীরা দুই ঘণ্টার নোটিশে এক সভা ডাকল টাউন হল মাঠে। মাইক্রোফোন ছিল না। আমি ও আতাউর রহমান সাহেব মাইক্রোফোন ছাড়াই সভা করলাম। এইভাবে উত্তরবঙ্গ সেরে আবার দক্ষিণ বঙ্গে রওয়ানা করলাম। কুষ্টিয়া, যশোরে ভাল কমিটি হল। খুলনায় কোন বয়েসী লোক পাওয়া গেল না। আমার সহকর্মী যুবক শেখ আবদুল আজিজ সভাপতি এবং মমিনুদ্দিনকে সেক্রেটারি করে জেলা আওয়ামী লীগ গঠন করলাম। সালাম সাহেব আপত্তি করছিলেন। আমি বললাম, “বয়স্ক লোক না পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠান গড়ব না মনে করেছেন। দেখবেন এরাই একদিন এই জেলার নেতা হয়ে কাজ করতে পারবে। যেখানে এডভোকেট সাহেবরা যেতে পারে নাই, সে সমস্ত জেলায় আমি একলাই যেতাম এবং সভা করতাম, কমিটি গঠন করতাম। জুন, জুলাই, আগস্ট মাস পর্যন্ত আমি বিশ্রাম না করে প্রায় সমস্ত জেলা ও মহকুমা ঘুরে আওয়ামী লীগ শাখা গঠন করতে সক্ষম হয়েছিলাম।
