ইন্দো-চীনে একজন পাজি সার্জেন্টের অধীনে কাজ করতে দেয়া হলো তাকে। ভয়ঙ্কর বদ-মেজাজী, মদ্যপ সার্জেন্ট; দুর্বল কাউকে পেলে তার ওপর অত্যাচারের স্টীম রোলার চালিয়ে দেয়। মনের সাধ মিটিয়ে অত্যাচার চালাবার জন্যে নতুন আসা এই সৈনিকটিকেই বেছে নিলো সে।
দু এক হপ্তা কাটতেই দেখা গেল, কাশতে কাশতে রাত দুপুরে ঘুম ভেঙে যায় সৈনিকটির। কয়েক দিন পর, যা কোনোদিন ছিলো না, সেই হাঁপানিতে আক্রান্ত হলো। সে। ডাক্তাররা তাকে অত্যন্ত যত্নের সাথে পরীক্ষা করে রায় দিলো, শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ। ইতিমধ্যে আরো নানা রকম অসুস্থতা ছেকে ধরলো তাকে। কাজে মন বসে না, শরীর দুর্বল লাগে। কোনো কাজ দিলে লেজেগোবরে করে ফেলে। তার অবস্থার যতো অবনতি হচ্ছে, সার্জেন্টের ভয়ঙ্কর মনোযোগও তার ওপর সেই পরিমাণে বাড়ছে।
তার ইউনিটের আর সবাই ড্রাগসের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। কিন্তু সৈনিকটি আশ্রয় নিলো সেই দুটো বাক্যের। ভাগ্য ভালো বলতে হবে, রোজ তিনবার ধ্যানমগ্ন হবার সুযোগ পেতো সে। ফলাফল? তার নিজের ভাষায় শুনুন, মাত্র তিন দিনের মধ্যে সার্জেন্টের অত্যাচার থেকে বেঁচে গেলাম আমি। আমাকে যা করতে বলতে সব আমি করতাম, কিন্তু তার খোঁচা মারা একটা কথাও আমাকে স্পর্শ করতো না। হাঁপানি আর সর্দি-কাশি সারতে এক হপ্তাও লাগেনি।
মনের যে ক’ টা লেভেলে আমরা মন-নিয়ন্ত্রণ চর্চা করি, শব্দ তার চেয়েও গভীর লেভেলে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ওকলাহোমার একজন নার্স-অ্যানেসথেটিস্ট, মিসেস জিন মাব্রে তাঁর রোগীদের সাহায্য করার জন্যে এই জ্ঞানটা কাজে লাগান। অ্যানেসথেশিয়ার সাহায্যে একজন রোগীকে অজ্ঞান করার পরপরই তিনি তার কানের কাছে মুখ নামিয়ে সাজেশন দিতে শুরু করেন। প্রায় সব ক্ষেত্রেই আশ্চর্য ফল পাওয়া গেছে। কেউ কেউ দ্রুত সেরে উঠেছে, আবার কেউ বেঁচে গেছে প্রাণে।
একদিন একটা অপারেশনের সময়, যখন প্রচুর রক্তক্ষরণ আশা করা হচ্ছিলো, কিন্তু তার কোনো লক্ষণ নেই দেখে অবাক হয়ে গেল সার্জেন। রক্ত বেরুচ্ছে, কিন্তু তা নেহায়েতই সামান্য। ব্যাপারটা কি? জানা গেল, রোগীকে অজ্ঞান করার পর তার কানে। কানে মিসেস মাত্রে বলেছেন, ‘তোমার শরীরকে বলো যেন বেশি রক্ত না ফেলে। অপারেশন চলাকালেও, প্রতি দশ মিনিট পর পর এই সাজেশন দিয়ে গেছেন তিনি।
আরেকটা অপারেশনের সময় তিনি ফিসফিস করে বলেছিলেন, তুমি জেগে উঠে অনুভব করবে, তোমার আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধব সবাই তোমাকে ভালোবাসে, নিজের ওপরও তোমার ভালোবাসা জন্মাবে। এই রোগিনী তার সার্জেনকে বিশেষ উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। সারাক্ষণ উত্তেজিত হয়ে থাকতো মহিলা, যে-কোনো ব্যথাই অমঙ্গল ডেকে নিয়ে আসবে বলে ভয় পেতো। এই প্রবণতার ফলে সেরে উঠতে প্রচুর সময় লেগে যাবে। কিন্তু জ্ঞান ফিরে এলে দেখা গেল তার চেহারায় নতুন একটা ভাব। এর তিন মাস পর সার্জেন মিসেস মাব্রেকে জানালেন, তাঁর সেই সদা উত্তেজিত রোগিনী সম্পূর্ণ বদলে গেছে। অপারেশনের ধকল খুব তাড়াতাড়ি কাটিয়ে উঠেছে সে, শুধু তাই নয়, জীবনের প্রতি নতুন আকর্ষণ ও বিশ্বাস জন্মেছে তার, অস্থিরতা কেটে গিয়ে তার মধ্যে এসেছে শান্ত একটা ভাব।
মিসেস মাত্রের কাজগুলো থেকে তিনটে ছবি পাই আমরা। এক, মনের গভীর স্তরে শব্দ বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন বা বিশেষ তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে। দুই, যতোটুকু ধারণা করা হয় শরীরের ওপর তারচেয়ে অনেক বেশি কর্তৃত্ব রয়েছে মনের। তিন, আগেই অবশ্য কথাটা বলা হয়েছে–আসলে আমরা অচেতন হই না, সব সময় সচেতন থাকি।
ঘুমন্ত ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক মা-বাবাই চিন্তা করেন, এই ছেলেকে মানুষ করবো কিভাবে! লেখাপড়ায় মন নেই, সারাদিন শুধু ভাই-বোনদের সাথে ঝগড়া-ঝাঁটি, ডানপিটের একশেষ, কারো কোনো শাসনই মানে না। এসব ভেবে উদ্বিগ্ন হওয়ার চেয়ে যদি ঘুমন্ত ছেলেমেয়ের কানের কাছে ঠোঁট নামিয়ে ফিসফিস করে কিছু উপদেশ, সাজেশন ইত্যাদি দেয়া হয়, আশ্চর্য ফল পাওয়া যেতে পারে।
০৮. কল্পনার শক্তি
ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে মুক্ত হওয়ার সহজ একটা উপায় আছে সেটা হলো কল্পনা। কল্পনা খপ করে লক্ষ্যবস্তু ধরে ফেলে। যা চায় তাই পায় সে।
– কল্পনা আমাদের জন্যে একটা অত্যন্ত কাজের, দরকারী হাতিয়ার। এর কাছ থেকে উপকার পাবার কোনো শেষ সীমা নেই। সেজন্যেই এই বইয়ের প্রথম দিকে বার বার করে বলা হয়েছে, গভীর স্তরে পৌঁছে মনের পর্দায় জ্যান্ত ছবি দেখাটা আপনাকে ভালো করে শিখে নিতে হবে। আপনি যদি বিশ্বাস, বাসনা আর প্রত্যাশা দিয়ে কল্পনাকে উজ্জীবিত করতে পারেন, এবং উদ্দেশ্য আর লক্ষ্য চাক্ষুষ করার কাজে এমনভাবে ব্যবহার করতে পারেন, যার ফলে উদ্দেশ্য আর লক্ষ্যগুলো আপনি দেখতে, অনুভব করতে, শুনতে, স্বাদ নিতে এবং এমন কি প্রায় ছুতে পারবেন, তাহলে জীবনের কাছ থেকে কিছু চেয়ে আপনাকে কখনো নিরাশ হতে হবে না।
ড. কুয়ে বলেছেন, ‘ইচ্ছা শক্তি (Will Power) আর কল্পনার মধ্যে বিরোধ বাধলে কল্পনাই সব সময় জেতে।
যদি ভাবেন, একটা বদভ্যাস ত্যাগ করতে চান আপনি, সম্ভবত নিজের সাথে প্রতারণা করছেন। সত্যি যদি ওটা ছাড়তে চান, আপনা থেকেই আপনাকে ছেড়ে যাবে ওটা। আপনার আসলে চাওয়া উচিত বদভ্যাসটি ছাড়লে কি লাভ হবে, সেইটা। এই লাভটা যখন পাবার জন্যে অস্থির হয়ে উঠবেন, তখনই ছাড়তে পারবেন ক্ষতিকর অভ্যেস। লাভ পাবার জন্যে অস্থির হওয়া, এটা একটা শেখার বিষয়। লাভ পাবার জন্যে কিভাবে অস্থির হতে শিখতে হয় তা যখন জানা হয়ে যাবে আপনার, অবাঞ্ছিত অভ্যেস ছেড়ে দেয় তখন আর সমস্যা হবে না।
