আমরা বড়রাও এই খেলা খেলছি বৈকি। জীবনের প্রতি আমাদের যে আকর্ষণ সেটা আমরা অনেকেই নেতিবাচক বা না-সূচক চিন্তা আর কথা ব্যবহার করে হারিয়ে ফেলছি। হ্যাঁ-সূচক কথার মতোই না-সূচক কথারও ধার এবং ক্ষমতা আছে, না-সূচক কথা বার বার ব্যবহার করে সেই ধার ও ক্ষমতা আমরা আরো বাড়িয়ে তুলি। ফলে জীবনের কাছ থেকে চেয়ে পাবার মতো কিছুই থাকে না।
‘কেমন আছো?’
‘আমাদের আর থাকাথাকি! দিন কেটে যাচ্ছে এই আর কি।‘
কিংবা, ‘ভালো না।’ অথবা, ‘বেঁচে আছি সে তো দেখতেই পাচ্ছো!’
এই ধরনের কথায় কিভাবে সাড়া দেয় আমাদের ব্রেন?
হয়তো মাথাব্যথা কোনমতে ছাড়তে চায় না। ঘাড়ে ব্যথা পাই। আবহাওয়া। বদলের সাথে সাথে অসুস্থ হয়ে পড়ি। সর্দিটা ভালো হতে চায় না। তবে জেনে রাখা ভালো যে ডাক্তার আর ওষুধের পিছনে যতো টাকা আমরা খরচ করি, তার একটা মোটা অংশ খরচ করাবার কৃতিত্ব আমাদের ব্যবহার করা কথাবার্তার। জীবনের প্রতি আমা দের দৃষ্টিভঙ্গি যদি ইতিবাচক বা হাঁ-সূচক না হয়, আমাদের ব্রেনও নেতিবাচক বা না-সূচক ভূমিকা পালন করে। সে বলে, ‘এই লোক মাথায় ব্যথা চাইছে। ঠিক আছে। ওকে দেয়া হচ্ছে মাথাব্যথা।’
ক্ষতিকর কিছু বললেই সাথে সাথে ব্যথা পাই না আমরা, ক্ষতিটাও তখুনি ঘটে না। শরীরের স্বাভাবিক প্রবণতা সুস্থ থাকা, তার সমস্ত আচরণ আর নিজস্ব গতিধারা সুস্থতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে কাজ করছে। রোগ আর অসুস্থতাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতাও তার যথেষ্ট। কিন্তু এই প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় যখন আমরা ক্ষতিকর শব্দ ব্যবহার করে সেই ক্ষমতার গায়ে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ছড়ি। একটা সময় আসে, আমরা যা চাই শরীরকে দিয়ে ঠিক সেটাই আদায় করিয়ে নিতে পারে ব্রেন।
দুটো জিনিস আমাদের ব্যবহার করা শব্দ বা কথার ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। এক, আমাদের মনের লেভেল। দুই, আমরা যা বলি তাতে আমাদের ভাবাবেগের মাত্রা।
‘ইস, প্রচণ্ড ব্যথা লাগছে!’ সত্যি যদি প্রচণ্ড ব্যথা না-ও লাগে কথাটা আন্তরিক বিশ্বাসের সাথে বলা হলে প্রচণ্ড ব্যথা সত্যি সত্যি অনুভব করবেন আপনি। ‘গুছিয়ে কোনো কাজ করবো, তার কোনো উপায় নেই এখানে!’ গভীর বিশ্বাসের সাথে কথাটা বলা হলে পরিবেশ সত্যি সত্যি বৈরি হয়ে উঠবে, যেখানে গুছিয়ে কাজ করা কিছুতেই সম্ভব হবে না।
.
ফ্রান্সের এমিল কুয়ে একটা সাজেশন তৈরি করে বিখ্যাত হয়ে আছেন। ‘ডে বাই ডে, ইন এভরি ওয়ে, আই অ্যাম গেটিং বেটার অ্যাও বেটার।’ হাজার হাজার লোকের গুরুতর অসুখ সারিয়ে দিয়েছে এই শব্দ ক’ টা। ড. কুয়ের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলছি, এই বাক্যটির জন্যে তাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি। তাঁর সেল-মাস্টারী থু অটোসাজেশন বইটি অমূল্য জ্ঞান দিয়েছে আমাকে।
একজন কেমিস্ট হিসেবে প্রায় ত্রিশ বছর কাজ করেছেন ড, কুয়ে। সম্মোহন নিয়ে পড়াশোনা এবং গবেষণা করার পর তিনি নিজেই একটা সাইকোথেরাপি উদ্ভাবন করেন, যার ভিত্তি হলো অটোসাজেশন। ইংরেজি উনিশ শো দশ সালে নান্সিতে তিনি একটা ফি ক্লিনিক খোলেন, যেখানে তিনি সফলতার সাথে হাজার হাজার লোকের চিকিৎসা করেছেন। তাঁর চিকিৎসা পদ্ধতির সাহায্যে ভালো হয়েছে বাত, ভয়ঙ্কর জাতের মাথাব্যথা, হাঁপানি, হাত বা পায়ের প্যারালাইসিস, তোতলামি, টিউমার, আলসার ইত্যাদি। কিন্তু এ-ব্যাপারে তাঁর নিজের বক্তব্য ছিলো, তিনি কাউকে সুস্থ করেননি, শুধু মানুষকে শিখিয়েছেন নিজেদের কিভাবে সুস্থ করে তুলতে হয়। রোগ যে সারতো সেটা কোনো গল্প-কথা নয়, বাস্তব প্রমাণ আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় উনিশ। শো ছাব্বিশ সালে তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে পদ্ধতিটিও হারিয়ে যায়। তাঁর এই পদ্ধতি যদি অত্যন্ত জটিল আর কঠিন হতো, এবং ফলে মাত্র অল্প দু’ একজন বিশেষজ্ঞ চর্চা করার জন্যে শিখতে পারতো তাহলে আজও হয়তো টিকে থাকতো সেটা। পদ্ধতিটা একেবারে সহজ। যে কেউ শিখতে পারে, তাই অতটা মূল্য পায়নি ওটা কারও কাছে।
মাত্র দুটি মৌলিক বিধির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে পদ্ধতিটি।
১। একবারে মাত্র একটি বিষয়ে চিন্তা করতে পারি আমরা, এবং
২। আমরা যখন কোনো চিন্তার ওপর গভীর মনোযোগ আরোপ করি, তখন চিন্তাটা সত্যি হয়ে ওঠে, কারণ আমাদের শরীর-মন সেটাকে অ্যাকশন বা তৎপরতায় রূপান্তরিত করে।
কাজেই আপনি যদি ভেতরের মেশিন চালু করে শরীর বা মনকে সুস্থ করে তুলতে চান, যেটা হয়তো না-সূচক চিন্তা-ভাবনার (সচেতন বা অবচেতন) দরুন অচল হয়ে পড়ে আছে, তাহলে পর পর ত্রিশ বার এই বাক্যটি আওড়ান-’প্রতিদিন সবদিক থেকে উন্নতি করছি। সকাল-বিকেল, ছন্দ মিলিয়ে বলতে থাকুন ত্রিশবার করে, তাহলেই জানবেন ড. কুয়ের পদ্ধতি ব্যবহার করছেন আপনি।
আগেই বলেছি, ধ্যানমগ্ন অবস্থায় শব্দের ক্ষমতা অনেক গুণ বেড়ে যায়। তাই আলফা বা থিটা লেভেলে পৌঁছে এই সাজেশনটা প্রতিদিন একবার দিলেও পারেন। কিন্তু এই সাজেশনের সাথে আরো ক’ টা শব্দ যোগ করবেন, ‘না-সূচক চিন্তা, না সূচক সাজেশন আমার মনের কোনো লেভেলেই কোনো প্রভাব ফেলে না।’
শুধু এই বাক্য দুটোই বেশ অনেকগুলো ফল দিতে পারে। এখানে একজন মার্কিন সৈনিকের কথা উল্লেখ করবো। হোসে সিলভার ট্রেনিং কোর্সে ভর্তি হয়েছিল সে, কিন্তু একদিনের বেশি ক্লাস করার সুযোগ পায়নি, হঠাৎ নির্দেশ পেয়ে তাকে চলে যেতে হয়। ইন্দো-চীনে। তার শুধু মনে ছিলো কিভাবে ধ্যান করতে হয়, আর এই বাক্য দুটো।
