উনিশ শো উনপঞ্চাশের দিকে যখন স্বপ্ন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম, আমার কোনো ধারণাই ছিলো না। শেষ পর্যন্ত কি আবিষ্কার করবো, বা কি ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছুবো। স্বপ্নকে গঠনমূলক কাজে লাগানো যায় কিনা, সেটাই ছিলো আমার জানার আর গবেষণার বিষয়। স্বপ্নের বৈচিত্র্য সম্পর্কে অনেক গল্পই শোনা ছিলো আমার। সীজার, আমরা জানি, আশ্চর্য একটা অর্থপূর্ণ স্বপ্ন দেখেছিলেন পনেরোই মার্চ সম্পর্কে। স্বপ্নে সাবধান করে দেয়া হয়েছিলো তাঁকে। ওই তারিখেই নিহত হন তিনি। নিজের নিহত হওয়া সংক্রান্ত স্বপ্ন লিংকনও দেখেছিলেন। জানতাম, এই ধরনের স্বপ্ন যদি স্রেফ দুর্লভ অ্যাকসিডেন্ট হয়, তাহলে আমার পরিশ্রম বৃথাই যাবে।
এক সময় আমার দৃঢ় ধারণা হলো, আসলে আমি বৃথাই সময় নষ্ট করছি। দশ বছর ধরে ফ্রয়েড, অ্যাডলার আর ইয়াং-এর রচনা পড়ছিলাম–মনে হতে লাগলো। যতোই পড়ছি ততোই কম জানছি। একদিনের এক ঘটনা। রাত তখন দুটো। হাতের বইটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বিছানায় গিয়ে উঠলাম। ঠিক করলাম, অনেক হয়েছে, অ্যথা আর সময় নষ্ট করবো না। এসব বই আজেবাজে লোকেরা লেখেননি, এরা প্রত্যেকে এক একজন মহাপণ্ডিত। অথচ একটা বিষয়েও তাঁরা নিজেদের মধ্যে একমত হতে পারছেন না!
এর ঘন্টা দুয়েক পর একটা স্বপ্ন দেখে আমার ঘুম ভেঙে গেল। আর-সব স্বপ্নের মতো কয়েকটা ঘটনার সমষ্টি নয় ওটা, স্রেফ একটা আলো। আমি শুধু দুপুরবেলার প্রখর, সোনালি, উজ্জ্বল রোদ দেখতে পেলাম। চোখ খুললাম, ঘরটা অন্ধকার। চোখ বন্ধ করলাম, আবার সেই আলো। এভাবে কয়েক বার চোখ খুললাম আর বন্ধ করলাম। চোখ খুললে অন্ধকার, বন্ধ করলে আলো। তিন কি চার বার এই রকম করার পর আবার যখন চোখ বন্ধ করলাম, তিনটে সংখ্যা দেখতে পেলাম। ৩-৪-৩। তারপর আরেক প্রস্থ সংখ্যা দেখলাম ৩-৭-৩। পরের বার প্রথম সংখ্যা তিনটে ফিরে এলো, তারপর দ্বিতীয়। সংখ্যা তিনটে।
সংখ্যার চেয়ে আলোটাই আমাকে বেশি কৌতূহলী করে তুললো। ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল ওটা। আমার ভয় হলো, এই আলো মিলিয়ে যাবার সাথে সাথে আমার জীবন-প্রদীপও নিভে যাবে। তারপর, সাহস হলো মনে, ভাবলাম, না, তা কেন হতে যাবে, মরবো কেন! যখন বুঝলাম, মরতে যাচ্ছি না, ইচ্ছে করলাম, উজ্জ্বল আলোটাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে এসে ওটাকে ভালো করে লক্ষ্য করবো। নড়েচড়ে শুলাম, মনের আরো গভীর লেভেলে চলে গেলাম, কিন্তু কিছুতেই কোনো লাভ হলো না। আগের। মতোই ম্লান হতে থাকলো আলোটা। সব মিলিয়ে মিনিট পাঁচেক ছিলো, তারপর মিলিয়ে গেল।
‘ভাবলাম, কে জানে, সংখ্যাগুলোর হয়তো একটা মানে আছে। বাকি রাতটা জেগে টেলিফোন নাম্বার, ঠিকানা, লাইসেন্স নাম্বার মনে করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু স্বপ্নে দেখা ওই সংখ্যাগুলোর সাথে মিল আছে এমন কিছু মনে পড়লো না।
‘আজ স্বপ্নের ব্যাখ্যা বের করার অত্যন্ত ফলপ্রসূ একটা উপায় জানা আছে আমার, কিন্তু সে-সময় আমার গবেষণার একেবারে প্রথম দিকে ছিলাম আমি। সকাল বেলা খুব ক্লান্তি লাগলো, কারণ মাত্র দু’ঘন্টা ঘুমিয়েছি। বেলা বাড়তে লাগলো, কিন্তু সংখ্যা গুলোর কথা আমি ভুলতে পারলাম না। ভাবছি আর ভাবছি, আমার জীবনের কোনো কিছুর সাথে এগুলোর কোনো মিল আছে কিনা।
‘এবার তুচ্ছ কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। এই তুচ্ছ ঘটনাগুলোই আমার সেই স্বপ্ন-রহস্য ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করেছিল।
‘আমার ইলেকট্রনিকসের দোকান পনেরো মিনিট পর বন্ধ হয়ে যাবে, এই সময় এক বন্ধু এসে বললো, চলো, কফি খেয়ে আসা যাক। রাজি হয়ে বললাম, একটু অপেক্ষা করো। এই সময় দোকানে এলো আমার স্ত্রী। বললো, “কফিই যখন খাবে, মেক্সিকান সাইডের ওদিকে গিয়ে খাও, ফেরার সময় আমার জন্যে খানিকটা রাবিং অ্যালকোহল নিয়ে এসো।” ব্রিজের কাছে একটা দোকান ছিলো, যেখানে ওই অ্যালকোহল সস্তায় পাওয়া যেতো।
‘মেক্সিকান সাইডে যাবার পথে বন্ধুকে স্বপ্নের কথাটা বললাম। ওকে বলার সময় হঠাৎ একটা আইডিয়া এলো মাথায় হতে পারে স্বপ্নে দেখা ওই সংখ্যাগুলো আসলে কোনো লটারির নাম্বার। আমাদের গাড়ি একটা দোকান পেরিয়ে এলো, দোকানটায় মেক্সিকান লটারির টিকেট বিক্রি হয়। দোকান বন্ধের সময় হয়ে এসেছে। দরজার খানিকটা অংশ বন্ধ হয়ে গেছে, তাই আর গাড়ি থামালাম না। ভাবলাম, থাকগে! দরকার নেই লটারির টিকেট কিনে। এ-ধরনের ছেলেমানুষির কোনো অর্থ হয় না।
‘খানিক দূর এগিয়ে অ্যালকোহলের দোকানের সামনে গাড়ি থামালাম।
‘অ্যালকোহলের বোতলটা কাগজে মুড়ে দিচ্ছে দোকানদার, দোকানের আরেক অংশ থেকে বন্ধু আমাকে ডাকলো। জানতে চাইলো, “তুমি যেন কি সংখ্যা খুজছো হে?”
‘বললাম, “তিন-চার-তিন আর তিন-সাত–তিন।”
‘বন্ধু শো-কেস থেকে একটা টিকেটের অর্ধেক তুলে আমাকে দেখালো। দেখলাম, টিকেটের নম্বর ছাপা রয়েছে, তিন-চার-তিন।
‘রিপাবলিক অব মেক্সিকো জুড়ে হাজার হাজার দোকানদার প্রতি মাসে প্রথম তিনটে সংখ্যা বিশিষ্ট লটারির টিকেটের অর্ধেক অংশ পেয়ে থাকে। গোটা দেশের শুধু মাত্র এই দোকানেই ৩৪৩ নম্বর টিকেট বিক্রি হয়। ৩৭৩ নম্বর টিকেট বিক্রি হয় মেক্সিকো সিটিতে।
‘কয়েক হপ্তা পর আমি জানলাম, জীবনে প্রথম কেনা আমার টিকেটের প্রথম অর্ধেক অংশ দশ হাজার ডলারের একটা প্রাইজ পেয়েছে। টাকাটা আমার দরকার ছিলো, সন্দেহ নেই। কিন্তু যে ঘটনার মধ্যে দিয়ে লটারি জিতলাম, সেটা আমার কাছে টাকার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হলো। আমার প্রত্যয় দৃঢ় হলো, বছরের পর বছর ধরে এই যে লেখাপড়া আর গবেষণা করেছি, এসব বৃথা যাবে না। কিভাবে জানি না, তবে হাইয়ার ইন্টেলিজেন্সের সাথে আমার যোগাযোগ ঘটেছে। হতে পারে এর আগেও অনেক বার এই যোগাযোগ ঘটেছে, কিন্তু জানতে পারিনি।
