গোসলখানার দেয়ালে মাথা ঠুকে কোনও যন্ত্রণার বোধ হয় না। শরীর একটি বাহন মাত্র, রক্তাক্ত একটি হৃদয় বহন করে চলেছি এতে। বুকের ভেতর কষ্টের নুড়িপাথর জমে জমে পাহাড় হতে থাকে। হাতে ধরা মা’র দেওয়া শাড়ির টুকরো। আমার নিয়তি ধরে আছি আমি হাতে। একচোখা কুৎসিত নিয়তি।
মা গোসলখানার দরজায় টোকা দিয়ে চাপা স্বরে বলেন কী হইছে, দেরি কর ক্যান! যেমনে কইছি অমনে কইরা তাড়াতাড়ি বার হও।
মা’কি আমাকে কাঁদতে দিতেও চান না সাধ মিটিয়ে! লজ্জায় মুখ ঢেকে কাঁদতে, অপমনে বিবর্ণ হতে! যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেতে আশংকায়! মা’র ওপর রাগ হয় আমার। বাড়ির সবার ওপরই, যেন সবার এক গোপন ষড়যন্ত্রের শিকার আমি। আমাকেই বেছে নেওয়া হয় আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতে। গা থেকে দুর্গন্ধ বেরোয় আমারই। গায়ে পায়ে সর্বনাশ যদি কারও জড়িয়ে থাকে, সে আমারই। এই ছেঁড়াখোঁড়া আমার। কী করে এই গা রি রি করা ঘটনাটি আমি লুকিয়ে রাখব! কী করে আমি হাঁটব, দৌড়োব, যদি কেউ জেনে ফেলে আমার পাজামার তলে ত্যানা লুকিয়ে আছে, আর সেই ত্যানা চুপসে আছে রক্তে। নিজেকে বড় ঘেন্না লাগে। ঘেন্নায় থুথু ছুঁড়ি নিজের গায়ে। আমি এখন সার্কাসের ক্লাউন ছাড়া কিছু নই। আমি এখন আর আর সবার মত নই। অন্যরকম। বিশ্রিরকম। আমার ভেতর গোপন এক অসুখ আছে। যে অসুখ কখনও সারে না।
এ কে কি বড় হওয়া বলে! আমি লক্ষ করি আমি যেমন ছিলাম, তেমনই রয়ে গেছি। আমার তখনও দৌড়ে গোল্লাছুট খেলতে ভাল লাগে কিন্তু মা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন–লাফ দিবি না, দৌড়াবি না, তুই এখন আর ছোট না। মাঠে দাঁড়ালে মা খেঁকিয়ে ওঠেন, ঘরের ভিতরে আয়, অন্য বাড়ির ছাদ থেইকা বেডারা তাকাইয়া রইছে।
–তাতে কি মা! কেউ তাকাইলে দোষ কি! ম্লান স্বরে বলি।
–তুই বড় হইয়া গেছস। অসুবিধা আছে।
কি অসুবিধা? তা কখনও মা’র কাছে জানতে পারিনি। বাইরের পুরুষ ক্রমশ আমার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমাকে আড়াল করার, আবৃত করার খেলায় মা বিষম মেতে ওঠেন। মামারা বন্ধু নিয়ে বেড়াতে এলে মা আমাকে ঠেলে পাঠান ভেতরের ঘরে। আমি যেন মামার বন্ধুদের চোখের সামনে না পড়ি। ক্রমশ অস্পৃশ্য হয়ে উঠতে থাকি।
মা’র আলমারিতে চাবি খুঁজতে গিয়ে হাত লেগেছিল কোরান শরিফের ওপর, মা ছুটে এলেন–নাপাক শইলে কোরান শরিফ ধরবি না।
–নাপাক শরীর মানে? তেতো গলায় বলি।
–হায়েজ হইলে শইল নাপাক থাকে। তখন আল্লাহর কালাম ছোঁয়া নিষেধ। নামাজ রোজা করা নিষেধ।
মা কুকুরকে বলেন নাপাক। তাহলে মেয়েরাও সময় সময় নাপাক হয়! অযু করলে সবাই পাক হতে পারে, ঋতুস্রাবের মেয়েরা ছাড়া। দুর্গন্ধ এক ডোবায় পড়েছি আমি, আমার চুলের ডগা থেকে পায়ের আঙুল অবদি নোংরা। ঘেন্নায় আমার বমি আসে। নিজের ওপর ঘেন্না। রক্তের ত্যানা ধুতে গিয়ে উগলে আসে পেটের নাড়ি। এর চেয়ে জ্বিনের বাতাস লাগলে বোধহয় ভাল ছিল, ভাবি। এই নোংরা, নষ্ট, নাপাক ব্যাপারটিকে পুষে রাখতে হয় মনের একটি কৌটোয়, কৌটাটিকে পুরে রাখতে হয় মাটির তলে, যে মাটিতে কারও পা পড়ে না।
আমার হাঁটতে ভয় হয়, দাঁড়াতে ভয় হয়। সারাক্ষণ আশংকা করি, এই বুঝি ত্যানা বেরিয়ে এল বাইরে। টুপ করে আলগোছে পড়ে গেল ঘরভর্তি মানুষের সামনে। এই বুঝি জেনে গেল সবাই। এই বুঝি মেঝে ভেসে গেল পচা রক্তে। এই বুঝি ঠা ঠা শব্দে হেসে উঠল মানুষ। এ আমার শরীর, এ শরীর আমাকেই অপমান করছে। আমাকেই দিনের আলোয় নর্দমায় চুবোচ্ছে।
দুপুরের কাঠ ফাটা রোদে দাঁড়িয়ে থেকেও পারি না জামা খুলে ফেলতে। বুকের মধ্যে বড় হচ্ছে কাজুবাদামের মত স্তন। শরীর থেকে কুলকুল করে স্রোত বইছে রক্তের। আমি বিমর্ষ শুয়ে থাকি বিছানায়।
তিনদিনের রক্তপাতে আমি যখন ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, বিছানায় মৃতের মত শোয়া, বাবা দেখে, চোখ কপালে তুলে বুনো ষাঁড়ের মত তেড়ে আসেন, –কি ব্যাপার অবেলায় শুইয়া রইছস কেন! উঠলি এখনও! শিগরি পড়তে বস।
শরীর টেনে তুলে পড়ার টেবিলে বসি। বাবা ধমকে বলেন–এত আস্তে চলস ক্যান! শইলে জোর নাই। ভাত খাস না!
মা আবারও সেই ত্রাতার ভূমিকায়। বাবাকে ডেকে নিয়ে যান অন্য ঘরে, অন্য ঘরটি ঠিক আমার ঘরের বাঁপাশের ঘরটি। ঘরটি থেকে দেয়াল ফুঁড়ে হিস হিস ফিস ফিস শব্দ আসে, শব্দের আগায় বাঁধা অদৃশ্য আগুন। আমার কান পুড়ে যেতে থাকে সে আগুনে। মেলে রাখা বইয়ের অক্ষরগুলো ঝাপসা হতে থাকে। আগুনে পুড়তে থাকে আমার বই খাতা, পেনসিল সব। সারা মুখে হলকা লাগে আগুনের।
বাবা অন্য ঘর থেকে এসে নিঃশব্দে আমার কাঁধে হাত নাকি চাবুক জানি না, রেখে বলেন, বিশ্রাম নিতে চাইলে নেও। শুইয়া থাকো কিছুক্ষণ। পরে পড়তে বও। যাও, বিছানায় যাও। বিশ্রামেরও দরকার আছে শরীরের। নিশ্চয়ই আছে। এইজন্য কুম্ভকর্ণের মত সারাদিন ঘুমাইলে আর আইলসার মত শুইয়া থাকলে ত চলবে না। তুমার একটা আইলসা ভাই আছে না! নোমান। ওর আইলসামির জন্য ও লেখাপড়া করতে পারল না। দেখ না ছাইকলুজি পড়ে। কী ছাতা পড়ে আমার! পইড়া একেবারে রাজ্য শাসন করব! আমাকে চেয়ার থেকে টেনে তুলে বিছানায় শুইয়ে দেন বাবা। শিয়রে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে–জান ত, বাবা বলেন, আমার এখন সন্তান বলতে দুইটা মেয়েই। তোমরাই আমার বুকের ধন। তোমরাই আমার ভরসা, আমার বাঁচার আশা। তোমাদেরে মানুষ কইরা যাইতে পারলেই আমার জীবনে শান্তি হইব। তুমরা যদি আমারে কষ্ট দেও, আমার আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না। শরীরটা ক্লান্ত লাগলে একটু বিশ্রাম নিবা। আবার ভাল বোধ করলে উইঠা পড়তে বসবা। কয় না, শরীরের নাম মহাশয়, যা সওয়াবা, তাই সয়! তুমাদের খাওয়া পরা কোনকিছুরই অভাব আমি রাখি নাই। কেন! যেন ঠাইস্যা লেখাপড়া কইরা মানুষ হইতে পার। ছাত্রজীবনে অধ্যয়নই একমাত্র তপস্যা। তারপরে ধর কর্মজীবন, তহন কর্ম করবা। আর কর্মজীবনের পরে আসে হইল অবসর জীবন, তহন অবসর নিবা, কর্ম থেইকা অবসর। সবকিছুরই একটা নিয়ম আছে। আছে না!
