বাবা তাঁর খসখসে আঙুলে আমার চুল আঁচড়ে ঘাড়ের পেছনে জড়ো করেন। ব্যাকব্রাশের বাবা চুল কপালে আসা সইতে পারেন না, নিজের যেমন নয়, অন্যেরও নয়। আগেও দেখেছি, তাঁর আদর মানে চুল পেছনে সরিয়ে দেওয়া। আহ! এত রুক্ষ কারও হাত হতে পারে! খসখসে আঙুলগুলো আমার পিঠে দৌড়োয়। আদর নয় তো এ যেন ঝামা ঘসে আমার চামড়া তুলছেন গায়ের।
ঋতুস্রাব হল আর ধুলোখেলা ছেড়ে গম্ভীর মুখে বসে থাকব ঘরে, এ আমার মনে ধরে না। বড় শখ ছিল বড় হতে, তত বড় হতে যে দরজার সিটকিনির নাগাল পাব। এখন একাই আমি পায়ের আঙুলে ভর রেখে সিটকিনি খুলতে পারি। কিন্তু এই রক্তপাত আমাকে এত বড় করে দেয়, এত আড়াল করে দেয় সবার, যে, আমার ভয় হতে থাকে। মা আমাকে এগারো বছর বয়সে জন্মের মত হাফপ্যান্ট ছাড়িয়ে দিয়ে নিজে হাতে পাজামা বানিয়ে দিয়েছেন পরার। বারো বছরে এলে বলেছেন ওড়না পড়তে, আমার ঠ্যাং বড় হচ্ছে, বুক বড় হচ্ছে সুতরাং বড় হওয়া জিনিসগুলো আড়াল করে রাখতে হবে। আমি যদি এসব না পরি, লোকে আমাকে বেশরম বেলাজ বলবে। সমাজে কেউ বেশরম মেয়েদের পছন্দ করে না। যাদের লাজ লজ্জা আছে, তাদের ভাল বিয়ে হয়। আমারও, মা’র আশা, ভাল বিয়ে হবে। বইয়ের পোকা মমতার বিয়ে হয়ে গেছে ক’দিন আগে। ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি কি চেন, যার সাথে তুমার বিয়ে হইতাছে?
মমতা না বলেছে, চেনে না।
হাতি চড়ে সে লোক মমতার বিয়েতে এসেছিল। সারা শহর দেখেছে হাতিতে বসে বর যাচ্ছে বিয়ে করতে। যৌতুক নিয়েছে অঢেল, সাত ভরি সোনা, তিরিশ হাজার টাকা, রেডিও, হাতঘড়ি। হাতির পিঠে চড়িয়ে মমতাকে সে তার বাড়ি নিয়ে গেছে।
মমতা এখন থেকে শ্বশুরবাড়ির লোকদের দেখাশুনা করবে। লেখাপড়ার পাট চুকেছে ওর। ওর বই পড়ার শখকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করবে হাতি চড়া লোকটি।
ঋতুস্রাবের ধকল না পোহাতেই গ্রামের এক হাবিলদার লোক বড় এক রুই মাছ নিয়ে আমাদের বাড়ি এসে বাবাকে বললেন তিনি তাঁর ছেলের সঙ্গে বাবার বড় কন্যার বিয়ে দিতে চান। শুনে, লোকটির হাতে মাছটি ফেরত দিয়ে কালো ফটক দেখিয়ে দিয়েছেন বাবা, আর একটি শব্দ উচ্চারণ না করে যেন লোকটি বেরিয়ে যান বাড়ি থেকে।
মা অসন্তোষ স্বরে ঢেলে বাবাকে বলেছেন, এমন করলে চলব! মেয়েরে কি বিয়া দিবা না! মেয়ে ত বড় হইছে। এই বয়সেই বিয়া হইয়া যাওয়া ভালা।
মা’কে আর অগ্রসর হতে না দিয়ে বাবা বলেন–আমার মেয়েরে কহন বিয়া দিতে হইব, সেইডা আমি বুঝাম। তুমার মাতব্বরি করতে হইব না। মেয়ে আমার লেখাপড়া করতাছে। ডাক্তার হইব। আমার মত এম বি বি এস ডাক্তার না। এফ আর সি এস ডাক্তার। ওর বিয়া নিয়া আর কুনো কথা যেন আমি শুনি না।
কান পেতে বাবার কথাগুলো শুনে, বাবার ওপর আমার সব রাগ জল হয়ে যায়। বাবাকে ইচ্ছে করে নিজের হাতে এক গ্লাস লেবুর শরবত বানিয়ে দিই, বাবার নিশ্চয় তেষ্টা পেয়েছে। কিন্তু বাবা না ডাকলে তাঁর কাছে ভেড়ার, না চাইলে কিছু দেওয়ার অভ্যেস আমার নেই। আমি অভ্যেসের খোলস ফুঁড়ে বেরোতে পারি না।
মা, আমি লক্ষ করি, আমার বড় হওয়া বিষয়ে বিষম উচ্ছ্বসিত। বাজার থেকে একটি কালো বোরখা কিনে এনে আমাকে বললেন–দেখ তো মা, এই বোরখাটা কিইনা আনলাম তুমার জন্য। পইরা দেখ তো লাগে কি না।
অপমানে আমি লাল হয়ে উঠি। বলি–কি কও! আমারে বোরখা পরতে কও!
–তাই তো। বড় হইছস না। বড় হইলে মেয়েদেরে বোরখা পরতে হয়।
মা বোরখাটি হাতে নিয়ে তার দৈর্ঘপ্রস্থ মাপতে মাপতে বলেন।
–না আমি বোরখা পরব না। শক্ত গলায় বলি।
–তুই মুসলমান না! মুসলমান মেয়েদেরে পর্দা করার কথা আল্লাহ তায়ালা নিজে বলছেন। মা মোলায়েম কণ্ঠে বলেন।
–তা বলুক গিয়া। আমি বোরখা কিছুতেই পরব না। বলি।
–ফজলির সবগুলা মেয়ে কী সুন্দর বোরখা পরে। কত ভাল মেয়ে ওরা। তুমিও ত ভাল মেয়ে। বোরখা পরলে মানষে কইব মেয়েটা কত লক্ষ্মী।
পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন মা। পিঠে উষ্ণ স্পর্শ পড়লে আমি মোমের মত গলে যাই। কিন্তু আজ আমাাকে গললে চলবে না। আমাকে না বলা শিখতে হবে। মনে মনে আওড়াই শব্দটি–না।
–না।
–কি পরবি না? মা ক্ষেপে ওঠেন।
–না ত কইলাম। মা’র নাগাল থেকে ছিটকে সরে বলি।
মা যে হাতটি পিঠে বুলোচ্ছিলেন, সেটি দিয়েই থাপ্পড় কষে পিঠে বলেন–তুই জাহান্নামে যাইবি। আমি তরে কইয়া দিলাম তুই জাহান্নামে যাইবি। তর মতি গতি আমার ভালা ঠেকতাছে না। নওমহলে এত নিয়া গেলাম, তারপরও তর চোখ খুলল না। দেখলি না চোখের সামনে, তর বয়সী, এমন কি তর ছোটরাও বোরখা পরে। কী সুন্দর লাগে ওদেরে। নামাজ রোজা করে। তুই যত বড় হইতাছস, নামাজ রোযা সব ছাড়তাছস। তর কপালে জাহান্নাম লেখা আছে।
মা থাপড়ে আমার পিঠ লাল করে দিন, বোরখা আমি পড়ব না। ঘাড় গুঁজে বসি এসে পড়ার টেবিলে। বই সামনে নিয়ে বসে থাকা কেবল, অক্ষরগুলো শকুনির ডানার তলে ঢাকা।
মা থপথপ করে হাঁটেন বারান্দায়। আমার ঘরটি ভেতর-বারান্দার লাগোয়া। যেন শুনতে পাই, মা বলেন–আসলে ও হইছে একটা মিড়মিড়া শয়তান। দেখলে মনে হয় কিচ্ছু বুঝে না, মা বাপে যা কয়, তাই শোনে। আসলে না। এ আমার মুখে মুখে তর্ক করে। আর কেউ ত এমন করে না। এ এত সাহস পায় কোত্থেকা। বাপের মত মাইরা চামড়া তুলতাম যদি পিঠের, তাইলে সবই শুনত। সুজা আঙুলে ঘি উঠে না।
বাঁকা আঙুলে ঘি ওঠানোর সময় মা আর মা থাকেন না, ডাইনি হয়ে যান। এত বিচ্ছিজ্ঞর লাগে মা’কে দেখতে তখন। মনেই হয় না এই মা আমাকে মুখে তুলে আদর করে খাওয়াতেন, ছড়াগান শেখাতেন, এই মা রাত জেগে বসে থাকেন গায়ে জ্বর হলে। ধুলোর মত মিশে যেতে থাকি মাটিতে, আমার হাড়ে রক্তে মাংসে ক্রোধ জমা হতে থাকে হীরের কণার মত।
