আমি ঝুঁকে আছি একটি জ্যামিতির বইয়ে, যেন এক কঠিন জ্যামিতি বুঝতে আমার সমস্যা হচ্ছে খুব, আর কে কোথায় কিসের ভেতর এসব আমার জানার কথা নয়, আর আমার সময়ও নেই ওসবে ফিরে তাকানো, যেন হুংকারটি মোটেও আমার কানে যায়নি। জ্যামিতির সমস্যা মিমাংসায় আমি এতই ব্যস্ত যে কারও দিকে কোনও চোখ না ফেলে, কারও কোনও হুংকার কানে পৌঁছেনি এভাবে দ্রুত হেঁটে যাই গোসলখানার দিকে। যেন গোসলখানাটি এ মুহূর্তূ আমার বিষম প্রয়োজন, মাথায় যেহেতু জ্যামিতির জটিলতা, চাঁদিতে জল ঢেলে তার জট খুলতে হবে। দরজা এঁটে আমি বড় একটি শ্বাস ফেলি। বাড়িতে কী ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, তা কল্পনা করার সাহস বা শক্তি আমি অনুভব করি, নেই আমার। যা কিছু ঘটে, চোখের আড়ালে ঘটুক। কিন্তু পালিয়ে বাঁচা আমার পক্ষে সম্ভব হবে কেন! আমার দরজায়ও শাবলের কোপ পড়ে। দরজা খোল, দরজা খোল! বেরিয়ে এলেই চিতার মত চেপে ধরেন বাবা, ওই ঘরের ভেতরে কেডা?
বাবার রুদ্রমূর্তি দেখে শ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকি দাগি আসামির মত। যেন অপরাধ আমার। যেন বন্ধ ঘরটির সব দায়িত্ব একা আমার। বাবা আমাকে মুঠোর ভেতর নিয়ে দাপান সারা বারান্দা, জবাব তাঁর চাই। তা নইলে ভয়ংকর কোনও কান্ড ঘটাবেন এক্ষুণি। শেষ পর্যন্ত কালো মুখের, ফিনফিনে চুলের, ভোঁতা নাকের মা ত্রাতার ভূমিকায় নামেন। বাবার ছোবল থেকে আমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে হিমে ডুবে থাকা গলায় বলেন–কামাল আইছে বউ নিয়া। বউ মুসলমান হইছে।
–কি? কি কইলা? কে আইছে? বাবা প্রশ্ন করেন খনখনে গলায়।
–কামাল। কামাল আইছে। মা আবার বলেন।
–কামাল কেডা? কোনও কামালরে আমি চিনি না। বলতে বলতে বাবা ছুটে আসেন বন্ধ দরজার সামনে। সারা বাড়ি কাঁপিয়ে গর্জন তোলেন–এক্ষুণি ওদেরে বাইর কর আমার বাসা থেইকা। এক্ষুণি। এক্ষুণি।
আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে তখনও। হাত পা আবার অবশ হতে শুরু করেছে।
বাবার তর্জনি তখনও কালো ফটকের দিকে উঁচু করে ধরা।
পেছনের দরজা খুলে ছোটদা বউএর হাত ধরে দৌড়োতে থাকেন কালো ফটকের দিকে।
১৩. ঋতুস্রাব
ইস্কুল থেকে ফিরে জামা কাপড় বদল করতে গিয়ে দেখি শাদা পাজামা রক্তে লাল। কেন! কাটল কিছুতে! কোথায় কেটেছে! কাটার তো কথা নয়! ব্যথা তো লাগছে না! কী হল! ভয়ে বুক কাঁপছে তখন আমার। এত রক্ত বেরোচ্ছে, আমি আবার মরে যাচ্ছি না তো!
দৌড়ে, মা ফুলকপি তুলছিলেন সবজির বাগান থেকে, তাঁর কোলের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে গলা ছেড়ে কাঁদি।
–ও মাগো, আমার শরীর কাইটা গেছে। সমানে রক্ত বার হইতাছে।
–কই কাটছে! কই! মা কোল থেকে আলতো হাতে আমাকে তোলেন।
আমি তলপেটের নিচে আঙুল নামাতে থাকি।
মা বলেন, মাথায় হাত বুলিয়ে– কাইন্দ না।
আমি গালে নামা চোখের জল মুছে বলি, ডেটল তুলা নিয়া আসো তাড়াতাড়ি।
মা হেসে বলেন–কান্দার কিছু নাই। ঠিক হইয়া যাইব।
রক্ত বেরোচ্ছে আমার গা থেকে, আর মা’র মুখে দুশ্চিন্তার লেশ নেই। তিনি দুটো ফুলকপি হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। আমার ক্ষত খুঁজে তুলোয় ডেটল মেখে, যা সচরাচর করেন, ব্যান্ডেজ করলেন না। বরং ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ঝুলিয়ে, ফুলকপির বালু ঝেড়ে বললে–তুমি এখন বড় হইছ। বড় মেয়েদের এইগুলা হয়।
–এইগুলা হয় মানে? কোনগুলা? মা’র চাপা হাসির দিকে ঘৃণা ছুঁড়ে বলি।
–এই রক্ত যাওয়া। এরে স্রাব কয়। হায়েজ কয়। প্রত্যেক মাসেই এইরকম হয় মেয়েদের। আমারও হয়। মা হেসে বলেন।
–ইয়াসমিনেরও হয়! উদ্বিগ্ন আমি, জিজ্ঞেস করি।
–ওর এখনও হয় না। তুমার মত বড় হইলে ওরও হইব।
হঠাৎ এক বিকেলে আমি, এভাবে, বড় হয়ে গেলাম। মা আমাকে বলেন–তুমি এখন আর ছোট না। তুমি এখন ছোটদের মত খেলাধুলা করা, বাইরে যাওয়া এইসব করতে পারবা না। বড় মেয়েদের মত ঘরে থাকবা। দৌড়াইবা না, শান্ত হইয়া থাকবা। পুরুষলোকের সামনে যাইবা না।
মা তাঁর পুরোনো একটি শাড়ি ছিঁড়ে টুকরো করে, টুকরোগুলো ভাঁজ করে আমার হাতে দিলেন, পাজামার একটি ফিতেও দিলেন। বললেন, গম্ভীর মুখে, চাপা হাসিটি নেমে গেছে ঠোঁট বেয়ে, পেটে ফিতাটা শক্ত কইরা বাইন্ধা তারপরে এই ভাঁজ করা কাপড়টা ফিতার দুইদিকে গুইঞ্জা রাখবা। রক্ত ঝরব তিন দিন, চাইর পাঁচ দিনও ঝরতে পারে। ডরের কিচ্ছু নাই। সবারই হয় মা। এইটা খুব স্বাভাবিক। এই কাপড় রক্তে ভিইজা গেলে এইটা ধইয়া লাইড়া দিবা, আরেকটা পরবা। খুব গোপনে সব করবা, কেউ যেন না দেখে। এইগুলা শরমের জিনিস। কাউরে কইতে হয় না।
আমার ভয় হতে থাকে। এ কেমন অদ্ভুত কান্ড যে রক্ত ঝরবে শরীর থেকে, তাও প্রতি মাসে! কেন ছেলেদের ঘটবে না ব্যপারটি। কেন মেয়েদের কেবল! কেনই বা আমার! আল্লাহতায়ালার মত প্রকৃতিও কি একচোখা! নিজেকে হঠাৎ মনে হয় আমি যেন এখন মা খালাদের মত বড় হয়ে গেছি, আমার আর পুতুল খেলার বয়স নেই। আমার আর খুনসুটি করার বয়স নেই, আমাকে এখন শাড়ি পরে রাঁধাবাড়া করতে হবে, মন্থরগতিতে চলতে হবে, নিচুগলায় কথা বলতে হবে। আমি এখন বড়। গোল্লাছুটের মাঠ থেকে, এক্কাদোক্কার ঘর থেকে কেউ যেন আমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিল। আমি আর আগের সেই আমি নই। আমি অন্য আমি, ভীষণ বিভৎস আমি। যেটুকু স্বাধীনতা অবিশিষ্ট ছিল, তাও উড়ে গেল নিমেষে তুলোর মত হাওয়ায়। আমি কি কোনও দুঃস্বপ্ন দেখছি! নাকি যা ঘটছে, মা যা বলছেন, সব সত্যি! যদি সবই দুঃস্বপ্ন হত, যদি ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখতাম যেমন ছিলাম, তেমনই আছি! আহা, তেমন হয় না কেন! মনে মনে প্রবল ইচ্ছে করি যেন এই রক্তপাত মিথ্যে হয়! যেন এ স্রেফ দুর্ঘটনা হয়, শরীরের ভেতরে কোনও গোপন ক্ষত থেকে রক্তপাত হয়, এটিই প্রথম আর এটিই যেন শেষ হয়। যেন শাড়ির টুকেরোগুলো মা’কে ফিরিয়ে দিয়ে বলতে পারি, সেরে গেছে।
