০১. বয়স

মেট্রিক পরীক্ষার ফরম পুরণ করে জমা দেবার পর বাংলার মাস্টার চারফুট এক ইঞ্চি বেড়ালচোখি দ্য ভিঞ্চি কল্যাণী পাল বলে দিলেন তোমার পরীক্ষা দেওয়া হবে না। কী কারণ, না তোমার বয়স কম, চৌদ্দ বছরে পরীক্ষায় বসা যায় না, পনেরো লাগে। তা হঠাৎ করে পুরো এক বছর আমি যোগাড় করি কোত্থেকে? মন খারাপ করে বাড়ি ফিরে সবাইকে জানিয়ে দিলাম এবছর আমার পরীক্ষা দেওয়া হচ্ছে না। কেন দেওয়া হচ্ছে না? বয়স কম বলে হচ্ছে না। বয়স বেশি বলে তো শুনি অনেক কিছু হয় না, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া হয় না, চাকরি বাকরি হয় না—মা ভাবতে বসেন। তা হয়ত হয় না কিন্তু মেট্রিকে উল্টো—বয়স কম তো ভাগো, বাড়িতে বসে বয়স বাড়াও, ষোল হলে পরে এসো পরীক্ষায় বসতে। সন্ধের দিকে মা এশার নামাজ পড়ে দু রাকাত নফল নামাজও পড়লেন, আল্লাহর দরবারে মাথা নুয়ে চোখের জল নাকের জল ফেলতে ফেলতে জানালেন তাঁর কন্যার এবার পরীক্ষা দেওয়া হচ্ছে না, কিন্তু আল্লাহতায়ালা চাইলে বয়সের এই বিশ্রি বিপদ থেকে কন্যাকে উদ্ধার করতে পারেন এবং ভালয় ভালয় পরীক্ষা দেওয়াতে এবং ভালয় ভালয় পাশ করাতে পারেন।

আল্লাহতায়ালা আমাকে কতটুকু উদ্ধার করেছিলেন জানি না, তবে বাবা করেছিলেন, তিনি পরদিনই আমার ইশকুলে গিয়ে আমার ফরমে বাষট্টি সাল কেটে একষট্টি বসিয়ে দিয়ে আমাকে জানিয়ে দিলেন এহন থেইকা যেন পড়ার টেবিলের চেয়ারে জিগাইরা আঠা লাগাইয়া বইসা যাই, আড্ডাবাজি আর শয়তানি পুরাপুরি বন্ধ কইরা ঠাইস্যা লেখাপড়া কইরা যেন মেট্রিকে চাইরটা লেটার লইয়া ফার্স্ট ডিভিশন পাই, না পাইলে, সোজা কথা, বাড়ি থেইকা ঘাড় ধইরা বাইর কইরা দিবেন।

বয়স এক বছর বাড়াতে হয়েছে আমার, কচি খুকি আমি বড়দের সঙ্গে বসে পরীক্ষা দেব, আমার খুশি আর ধরে না। আমার সেই খুশি মাটি করে দিয়ে দাদা বললেন কেডা কইছে তর জন্ম বাষট্টিতে?

বাবা কইছে।

হুদাই। বাবা তর বয়স কমাইয়া দিছিল।

তাইলে একষট্টি সালেই আমার জন্ম?

একষট্টি না, তর জন্ম ষাইট সালে। মনে আছে চৌদ্দই আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে সার্কিট হাউজে কুচকাওয়াজ দেখলাম। তার পর পরই তুই হইছস।

ছোটদা লুঙ্গির গিঁট বাধঁ তে বাঁধতে কালো মাড়ি প্রসারিত করে বললেন দাদা তুমি যে কি কও, ষাইট সালে ওর জন্ম হইব কেন? ও তো ফিফটি নাইনে হইছে।

আমি চপু সে যাই। মাকে গিয়ে ধরি আমার সত্যিকার জন্মের সালডা কও তো!

মা বললেন রবিউল আওয়াল মাসের বারো তারিখে হইছস। বছরডা খেয়াল নাই।

এইসব রবিউল আওয়াল ইশকুলে চলে না। ইংরেজি সালডা কও। তারিখটা কও।

এতবছর পর সাল তারিখ মনে থাকে নাকি! তর বাপেরে জিগা। তার হয়ত মনে আছে।

 

বাবার এনাটমি বইয়ের প্রথম পাতায় দুটো জন্মতারিখ লেখা আছে, দাদার আর ছোটদার। আমার আর ইয়াসমিনের জন্ম কবে, কোন সালে, তার কোনও চিহ্ন এনাটমি বইয়ের বারোশ পাতার কোনও পাতার কোনও কোণে লেখা নেই, এমন কি বাড়ির আনাচ কানাচের কোনও ছেঁড়া কাগজেও নেই। মার জন্ম হয়েছিল ঈদে, কোনও এক ছোট ঈদে। কোন সালে, না জানা নেই। বাবার জন্মের সাল তারিখ নিয়ে বাবাকে প্রশ্ন করার বুকের পাটা আজ অবদি কারও হয়নি। যখন বয়স নিয়ে বিষম চিন্তিত আমি, যোগ বিয়োগ করে এর ওর বয়স বার করছি সারাদিন, দাদার বয়সের সঙ্গে বারো বছর যোগ দিলে যে বয়স দাঁড়ায়, সে বয়স মার বয়স আর দশ বছর বিয়োগ দিলে বেরোয় আমার বয়স ইত্যাদি মা বললেন এইসব থইয়া পড়াশুনা কর। বয়স পানির লাহান যায়, মনে হয় এই কয়দিন আগে চুলে কলাবেণী কইরা দৌড়াইয়া ইশকুলে যাইতাম, আর আজকে আমার ছেলে মেয়েরা বি এ এম এ পাশ করতাছে।

বয়স নিয়ে মার কোনও ভাবনা না হলেও আমার হয়। নানিবাড়ি থেকে মামা খালা যাঁরাই অবকাশে আসেন জিজ্ঞেস করি কেউ আমার জন্মের সাল জানেন কি না। কেউ জানেন না। কারও মনে নেই। নানিবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে নানিকে ধরি, এক মখু পানের পিক চিলমচিতে ফেলে নানি বলেন, ফেলু জন্মাইল শ্রাবণ মাসে, ওই বছরই তুই হইলি কাত্তিক মাসে।

ওই বছর কোন বছর?

কোন বছর কার জন্ম হইল এত কেডা হিশাব রাখে!পুলাপান বছর বছর জন্মাইছে এই বাড়িত, একটা দুইডা পুলাপান হইলে সাল তারিখের হিশাব থাকত।

জন্মের বছরের মত তুচ্ছ একটি জিনিস নিয়ে আমি পড়ে আছি, ব্যাপারটি অবকাশের সবাইকে যেমন হতাশ করে, নানিবাড়ির লোকদেরও করে। যেদিন আমি জন্মেছি, সেদিন নানিবাড়ির পুকুরে কই মাছের পোনা ছাড়া হয়েছিল নানির মনে আছে, রুনু খালার মনে আছে সেদিন টুটুমামা ঘর থেকে দৌড়ে পেচ্ছাবখানায় যাওয়ার সময় সিঁড়িতে পা পিছলে ধপাশ, কিন্তু কোন সাল ছিল সেটি, তা মনে নেই। হাশেম মামার মনে আছে সেদিন উঠোন থেকে চারটে সোনাব্যাঙ তুলে তিনি কুয়োর ভেতর ফেলেছিলেন, কিন্তু সেদিনের সাল তারিখ কিছু জানেন না।

নিজের জন্মের বছর জানার ইচ্ছে আগে কখনও এমন করে হয়নি। বাবা বাষট্টির জায়গায় একষট্টি বসিয়ে দিয়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা পাকা করে এসেছেন তা ঠিক, এখন কেউ বয়স কমের অভিযোগ করবে না সুতরাং নো চিন্তা ডু ফুতির্, আদা জল খেয়ে লেখাপড়ায় নেমে যাওয়ার ফুতির্, কিন্তু মন পড়ে থাকে একটি না -জানা বয়সে, যেন আমার বয়সই আমার চেয়ে মাইল মাইল দূরে, যার সঙ্গে আমার দেখা হয় দেখা হয় করেও দেখা হচ্ছে না, অথচ দেখা হওয়া বিষম জরুরি। যখন বিদ্যাময়ী ইশকুলে মাত্র ভর্তি হয়েছি, মাকে আমার বয়স জিজ্ঞেস করেছিলাম, মা বললেন সাত। নতুন ক্লাসে ওঠার পরও জিজ্ঞেস করেছিলাম তিনি তখনও সাত বললেন, কেন সাত কেন, আট হবে তো! মা আমার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে দুপাশে ধীরে মাথা নেড়ে বলেছিলেন, আট বেশি হইয়া যায়, সাতই। পরের বছর বললেন এগারো। এগারো কেন? দেখতে নাকি আমাকে এগারো লাগে তাই। দিন দিন এমন কলাগাছের মত লম্বা হচ্ছি, এগারো না হয়ে যায় না, মার ধারণা। মার কাছে বয়স না পাওয়া গেলেও বাবার কাছে পাওয়া যাবে এরকম বিশ্বাস তখন থেকেই আমার ছিল, ছিল কারণ বাড়ির সবচেয়ে বিজ্ঞ মানুষটি ছিলেন বাবা। তিনি সবার চেয়ে বেশি লেখাপড়া করেছেন, তিনি জ্ঞানের আধার, তিনি এ বাড়ির কর্তা তাই। বাবা যখন আমার বয়স জানিয়ে দিলেন নয়, তার মানে নয়। এই বাবাও আমার বয়সের হিশেব রাখেননি, সে স্পষ্ট বোঝা যায়, রাখলে এনাটমি বইয়ের পাতায় দাদা আর ছোটদার জন্মতারিখের পাশে আমার তারিখটিও থাকত। নেই। নেই। এই নেইটি আমাকে সারাদিন ঘিরে রাখে, এই নেই আমাকে বারান্দায় উদাস বসিয়ে রাখে, এই নেইটি উঠোন ঝাঁট দিতে থাকা জরির মার বয়স জানতে চায়। প্রশ্ন শুনে জরির মা খিল ধরা কোমর টান করে দাঁড়ায়, যে দাঁড়িয়ে থাকাটুকুই তার সারাদিনের বিশ্রাম, প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে জরির মা আকাশের দিকে তাকায় ভাবতে, যে ভাবনার সময়টুকুই তার কেবল নিজের, ভেবে আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে উবু হতে হতে আবার উঠোন-ঝাঁটে, ঘাড় নেড়ে বলে, উনিশ। বিকেলের শেষ আলো আলতো আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছে উঠোনের গায়ে, জরির মার কালো শরীরেও।

মা বারান্দায় এসে বসেন, জরির মার উনিশ-উত্তর পছন্দ হয়নি বলে মাকে জিজ্ঞেস করি জরির মার বয়স।

চল্লিশ বিয়াল্লিশ তো হইবই। মা তেরচা করে জরির মার ঝুলে থাকা শরীরের ঝুলে থাকা বুকের দিকে তাকিয়ে বলেন, পঁয়তাল্লিশও হইতে পারে।

জরির বয়স কত জরির মা?

জরির বয়স বলতে এবারও জরির মা কোমর টান করে দাঁড়ায়। মা ধমকে বলেন তাড়াতাড়ি কর, উঠান ঝাঁট দিয়া তাড়াতাড়ি খাইতে যাও। খাইয়া বাসন মাইজা রাইতের ভাত চড়াইয়া দেও।

দুপুরের খাওয়া আমাদের দুপুরেই শেষ। কেবল জরির মারই বাকি। কেবল জরির মার জন্যই রান্নাবান্না শেষ করে সবাইকে খাইয়ে দাইয়ে বাসন মেজে ঘর দোর ধুয়ে মুছে উঠোন ঝাঁট দিয়ে তবে খাওয়া।

জরির বয়সের কথা ভাবতেও জরির মাকে আকাশের দিকে তাকাতে হয়। লালচে আকাশ জুড়ে পাখির দল নীড়ের দিকে যাচ্ছে, জরির মার কোনওদিন কোনও নীড়ে ফেরা হয়নি তার জরিকে নিয়ে। জরির জন্মের পর থেকেই এ বাড়ি ও বাড়ি বাঁধা কাজে বাধাঁ পড়ে আছে।

কত আর, বারো !খালা, বারো হইব না জরির বয়স?

জরির মা অসহায় তাকায় মার দিকে।

বারো কও কি, ওর তো মনে হয় চোদ্দ পনর হইব।

মা জানেন না কবে জরির জন্ম হয়েছে, জরিকে মা জন্মাতে দেখেননি, মাত্র বছর দুই আগে জরিকে নিয়ে জরির মা এ বাড়িতে উঠেছে। জরির মাকে এ বাড়ির জন্য রেখে জরিকে নানিবাড়িতে দিয়ে এসেছেন মা নানির ফুটফরমাশ করতে। বয়স নিয়ে মা যা বলেন, সবই অনুমান। মা শরীর দেখে বয়স অনুমান করেন। মার এই অনুমান জরির মা সানন্দে মেনে নেয়, জরির বয়স এখন থেকে জরির মা জানে যে চোদ্দ পনর, আর তার নিজের চল্লিশ বিয়াল্লিশ, অথবা পঁয়তাল্লিশ।

জরির মা উঠোনে পড়া ঝরা পাতা ঝরা ডাল ঝরা পালক জড়ো করে পুকুর ধারে আবর্জনার স্তূপে ঢেলে দিয়ে রান্নাঘরে কুপি জ্বেলে ভাত আর বেগুনের তরকারি যখন খাচ্ছে, বারান্দায় বসে হাঁস মুরগির খোপে ফেরার দিকে উদাস তাকিয়েছিলেন মা, মার পায়ের কাছে সিঁড়িতে পা ছড়িয়ে বসে মাথার ওপরে চক্রাকারে ঘুর্ণি খেতে থাকা সন্ধ্যাৎসবে নৃত্যরত মশককূলের সঙ্গীত আর ডলি পালের বাড়ি থেকে ভেসে আসা উলু ধ্বনির শব্দ শুনতে শুনতে দেখতে থাকি কি করে বিষণ্ন কিশোরির ভেজা চুল বেয়ে টপু টুপ করে জল ঝরার মত আকাশ থেকে অন্ধকার ঝরে আমাদের ঝাঁট দেওয়া মেটে উঠোনটিতে।

টিনের ঘরের পেছনের সেগুন গাছটির দিকে তাকিয়ে মাকে মিহি স্বরে জিজ্ঞেস করি, সেগুন গাছটার বয়স কত মা?

মা অদ্ভুত চোখে গাছটির দিকে তাকিয়ে বলেন, মনে হয় তিনশ বছর।

মা কি করে সব মানুষ আর গাছপালার বয়স অনুমান করেন, আমি বুঝে পাই না।

মানুষ কেন তিনশ বছর বাঁচে না মা?

মা কোনও কথা বলেন না। আমি ফিরি মার দিকে, নৈঃশব্দের জলের ওপর গাঙচিলের মত উড়তে থাকা মার মুখটি তখন আর আমি দেখতে পাচ্ছি না। বাদুড়ের ডানার মত ঝটিতে এক অন্ধকার উড়ে এসে মখু টি ঢেকে দিয়েছে।

 

বয়স-ভাবনা সেই থেকে আমাকে ছেড়ে এক পা কোথাও যায়নি। মেট্রিকের ফরমে লেখা তারিখ মত নিজের একটি জন্মদিন করার ইচ্ছে জাগে আমার হঠাৎ, বাবার মন ভাল ছিল বলে রক্ষে, চাইতেই একটি কেক, এক খাঁচা মালাইকারি, এক প্যাকেট চানাচুর, এক পাউন্ড মিষ্টি বিস্কুট, এক ডজন কমলালেবু চলে আসে বাড়িতে। কেকের ওপর মোম জ্বেলে বিকেলে বাড়িতে যারা ছিল তাদের আর একজনই সবেধন নীলমণি অতিথি চন্দনাকে নিয়ে এক ফুঁয়ে মোম নিবিয়ে বাড়িতে ছুরি নেই কি করি রান্নাঘর খুঁজে কোরবানির গরু কাটার লম্বা ছুরি এনে এক পাউন্ড ওজনের কেকটি কাটি। কেকের প্রথম টুকরোটি আমাকে কে মুখে তুলে দেবে গীতা না কি ইয়াসমিন,ইয়াসমিন বলে ইয়াসমিন, গীতা বলে গীতা, গীতা এগিয়ে এলে যেহেতু গীতা এ বাড়ির বউ, বাড়ির বউএর সাধ আহলাদের মূল্য ইয়াসমিনের সাধ আহলাদের চেয়ে বেশি, ইয়াসমিন গাল ফুলিয়ে কেকের সামনে থেকে সরে যায় আর ক্যামেরা আলো জ্বলার আগে গীতা নিজের মুখে মিষ্টি একটি হাসি ঝুলিয়ে আমার মুখে কেকের টুকরো তুলে দেয়, চোখ ক্যামেরায়। কেক কাটা, হাততালি, ক্যামেরার ক্লিক, আর মালাইকারির রসে ভিজিয়ে বিস্কুট আর কেকের ওপরের শাদা ক্রিম জিভে চেটে খেয়ে আমার জন্মদিন পালন হল এবং এ বাড়িতে প্রথম কারও জন্মদিন হল এবং হল সে আমার এবং সে আমার নিজের উদ্যোগেই। চন্দনা তিনটে কবিতার বই উপহার দিয়েছে। রাজা যায় রাজা আসে, আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি আর না প্রেমিক না বিপ্লবী। দাদা দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ। জীবনে ওই প্রথম কিছু উপহার পাওয়া আমার জন্মদিনে। বই থেকে হাত সরে না, চোখ সরে না, মন সরে না। অনেক রাতে মা শুকনো মুখে বললেন, মিষ্টির একটা কোণা ভাইঙ্গা জরির মার হাতে দিলে পারতি। কোনওদিন মিষ্টি খায় নাই। দেখত কিরকম লাগে খাইতে। হঠাৎ খেয়াল হয়, কেবল জরির মা নয়, মার ভাগেও জন্মদিনের খাবার জোটেনি। মা অবশ্য বলেন, এসব না খেলেও মার চলে। কখনও কোনও বিস্কুট বা এক মুঠো চানাচুর মার দিকে বাড়ালে মা বলেন, আমি ত ভাতই খাই। তরা পুলাপান মানুষ, তরা খা। তরা ত পাখির দানার মত ভাত খাস, তগর এইডা ওইডা খাইতে হয়।

আমার জন্মদিন পালন করা দেখে ইয়াসমিনেরও নিজের জন্মদিন পালনের ইচ্ছে হল খুব। কোন মাসে তার জন্ম, কোন তারিখে তা জানতে সে বাবাকে ধরল। বাবা ওকে আজ বলেন তো কাল বলেন, ইয়াসমিনও ঝুলে রইল। মাস দুয়েক ওকে ঝুলিয়ে রাখার পর বাবা একদিন বলে দিলেন নয়ই সেপ্টেম্বর। ব্যস,সেপ্টেম্বরের নয় তারিখ আসার আগেই ইয়াসমিন বাবার কাছে একটা লম্বা লিস্টি পাঠিয়ে দিল, তিনরকম ফল আর দুরকম মিষ্টি, সঙ্গে চানাচুর আর বিস্কুট। ইশকুলের মেয়েদের প্রায় সবাইকে ওর নেমন্তন্ন করা হয়ে গেছে। লিষ্টি পেয়ে বাবা বললেন, জন্মদিন আবার কি? এইসব জন্মদিন টন্মদিন করতে হইব না। লেখাপড়া কইরা মানুষ হও। আমার বাড়িতে যেন কোনওরকম উৎসবের আয়োজন না হয়। মা আবদারের ঝুড়ি উপুড় করেন বাবার সামনে, নিভৃতে। জন্মদিন করতে চাইতাছে, করুক না! মেয়েরা হইল লক্ষ্মী, ওদেরে মাইরের ওপর রাখা ঠিক না। শখ বইলা ওদেরও কিছু আছে। আবদার করছে, আবদারটা রাখেন। মা অনেকদিন থেকেই বাবাকে আপনি বলতে শুরু করেছেন, তুমি থেকে আপনিতে নামার বা ওঠার এত বেশি কারণ যে মার এই আপনি সম্বোধন শুনে বাবা যেমন চমকে ওঠেন না, আমরাও না। তবে তুমি বা আপনিতে, লঘু বা গুরু স্বরে, কেঁদে বা হেসে যে আবদারই করুন না কেন মা, মার আবদারের মূল্য বাবার কাছে যে একরত্তি নেই, এ বাবা যেমন জানেন, মাও জানেন।

আজাইরা ফুর্তি ফার্তা বাদ দেও। মেয়ে নাচে, সাথে দেখি মাও নাচে। যত্তসব বান্দরের নাচ।

বাবার ভ্রুকুটিতে মা দমে যান না। বাবার সর্দি লাগা শরীরের বুক পিঠ গরম রসুনতেল দিয়ে মালিশ করতে করতে আবদার করে যান। মেয়েরা ত বিয়া দিলেই পরের বাড়িতে চইলা যাইব। মেয়েদের সাধ আহলাদ যা আছে তা তো বাপের বাড়িতেই পূরণ করতে হয়। রসুন তেল বাবার ত্বক নরম করলেও মন নরম করে না। ইয়াসমিন মন খারাপ করে বসেছিল, জন্মদিনের কোনও উৎসব শেষ অবদি হচ্ছে না। কিন্তু বাড়ির সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেদিন দুপুরে বাবা খাবার পাঠিয়ে দিলেন ইয়াসমিনের লিস্টি মত। পুলকে নাচে মেয়ে। পিরিচে খাবার সাজিয়ে সেজেগুজে কালো ফটকের দিকে চোখ ফেলে অতিথিদের অপেক্ষায় সারা বিকেল বসে থাকে। কারও দেখা না পেয়ে অগত্যা শেষ বিকেলে গোল্লাছুট খেলার সঙ্গী পাড়ার তিনজন মেয়ে মাঠে খেলতে এলে ওদের ঘরে ডেকে জন্মদিনের খাবার খেতে দেয় ইয়াসমিন।

সন্ধেয় বাড়ি ফিরে রকমারি খাবার দেখে ছোটদা অবাক,কি রে কিয়ের উৎসব আজকে?

ইয়াসমিন লাজুক হেসে বলল আমার জন্মদিন।

কেডা কইছে এই তারিখে তর জন্ম হইছিল?

বাবা কইছে। বাবা কওয়ার পর আর কারও মুখে টুঁ শব্দ মানায় না। কারণ বাবা যা কন, বাড়ির সবাই জানি যে তা খাঁটি,কারণ বাবার চেয়ে বেশি জ্ঞান বুদ্ধি কারও নেই। হ বুঝছি, একটা জন্মদিনের দরকার, তাই তুই চাইলি একটা জন্মদিন, আর বাবাও বানাইয়া কইয়া দিল।

ছোটদার স্পর্ধা দেখে ইয়াসমিন থ হয়ে গেল।

সেদিনও যার ভাগে ইয়াসমিনের জন্মদিনের কোনও কেকের টুকরো পড়েনি, সে মা। মা সেই যে দুপুরের পর বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন, ফিরলেন সন্ধেয়। হাতে বাদামি রঙের একটি কাগজের মোড়ক, ভেতরে ইয়াসমিনের জন্য লাল একটি জামার কাপড়। মা নিজেই এই কাপড় দিয়ে কুচিঅলা একটি ফ্রক বানিয়ে দেবেন ওর জন্য। হাতে টাকা ছিল না বলে হাশেমমামার কাছ থেকে টাকা ধার করে নিজে গৌরহরি বস্ত্রালয়ে গিয়ে তিন গজের এই কাপড়টি কিনেছেন।

আমি হায় হায় করে উঠি,কিন্তু আজকে ত ওর জন্মদিন না!

কেডা কইছে জন্মদিন না?

ছোটদা কইছে।

কি হইল তাতে! মা ধমকে ওঠেন। না হোক জন্মদিন। একটু আমোদ করতে চাইছে মেয়েটা, করুক।

ঈদ উৎসব ছাড়া কোনও জামা আমাদের জোটে না। বছরে বাবা একবারই আমাদের জামা দেন, সে ছোট ঈদে। পরের বছর ছোট ঈদ আসার আগেই আমাদের জামা হয় ছিঁড়ে যায় নয় ছোট হয়ে যায়। বাবার কাছে নতুন জামার আবদার করলে বাবা দাঁত খিঁচিয়ে বলে দেন,জামা দুইটা আছে না? একটা পরবি,ময়লা হইলে ধইয়া দিয়া আরেকটা পরবি। দুইটার বেশি জামা থাকার কোনও দরকার নাই। মা আমাদের ছেঁড়া আর ছোট হয়ে আসা জামা শাড়ির পাড় বা বাড়তি কোনও টুকরো কাপড় লাগিয়ে বড় করে দেন, ছেঁড়া অংশ সেলাই করে দেন। ইশকুলের মেয়েদের ঘরে পরার আর বাইরে পরার দুরকমের জামা থাকে। কোনওদিন কোনও ঈদের জামাকে বাইরে পরার জামা হিসেবে রেখে ঘরে পরার জামা চাইলে বাবা বলেন,বাইরে তর যাইতে হইব কেন? ঘরের বাইরে যদি কোথাও যাস, সেইডা হইল ইশকুল। ইশকুলের জন্য ইশকুলের ইউনিফর্ম আছে। ইশকুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা বনভোজনের আয়োজন হলে মেয়েদের স্বাধীনতা দেওয়া হয় ইউনিফর্মের বাইরে অন্য জামা পরে যাওয়ার। মেয়েরা নানান রকম জামা পরে সেসব অনুষ্ঠানে যায়, আর আমি প্রতিটি অনুষ্ঠানে একটি জামাই পরে যাই বলে ক্লাসের এক মেয়ে একবার প্রশ্ন করেছিল, তোমার কি আর জামা নাই? লজ্জা আমাকে সেদিন এমনই তাড়া করেছিল যে দৌড়ে বড় একটি থামের আড়ালে গিয়ে অনেকক্ষণ লুকিয়ে রেখেছিলাম নিজেকে। ইশকুলের ইউনিফর্ম বানিয়ে দিতে বাবা কোনওদিন না করেননি। নিজে তিনি আমাদের সঙ্গে নিয়ে গৌরহরি বস্ত্রালয় থেকে কাপড় কিনে গাঙ্গিনার পাড়ের দরজির দোকানে যান, দরজি যখন গায়ের মাপ রাখে, দরজিকে বারবার বলে দেন, যেন বড়সড় করে বানায়, যেন অনেকদিন যায়। জুতোর দোকানে গিয়েও বাবা বলেন, এই মেয়েদের পায়ে জুতা দেন তো। একটু বড় দেইখা দিবেন, যেন অনেক দিন যায়। মাপের চেয়ে বড় জামা জুতো পরেও দেখতাম, আমাদের জামা জুতো ছোট হয়ে যায় দ্রুত। মা বলেন, জামা জুতা ছোট হয় না, তরা বড় হস। আমরা গায়ে বড় হতে থাকি বলে, আমার ভয় হয়, বাবা রাগ করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দাদা মাসোহারার টাকা বাঁচিয়ে আমাকে আর ইয়াসমিনকে দুটো সিল্কের জামা কিনে দিয়েছিলেন। ফুটপাত থেকে কেনা বিদেশি পুরোনো জামা, সস্তার মাল, লান্ডির মাল। ও পেয়েই খুশির শেষ ছিল না।

মার কিনে আনা লাল কাপড়টি গায়ে জড়িয়ে ইয়াসমিন মহা আহলাদে বাড়িময় লাফাচ্ছিল যখন, অন্ধকার বারান্দায় চুল খুলে বসে ঘরের উজ্জ্বল আলোয় লাল টুকটুকে ইয়াসমিনকে বড় সুন্দর লাগছে, দেখছিলেন মা।

০২. উতল হাওয়া

কুমিল্লা থেকে বদলি হয়ে ময়মনসিংহের নতুন ইশকুলে ভর্তি হয়ে যেদিন প্রথম এল ও ক্লাস করতে, সেদিনই ওর সঙ্গে আমার কথা হল, চোখে চোখে। ওর প্রায় বুজে থাকা চোখ দুটো একই সঙ্গে এত কথা বলল সেই প্রথম দিনই, প্রথম দিন ও অবশ্য ওর মামাতো নাকি কাকাতো নাকি ফুপাতো বোন সীমা দেওয়ানের গা ঘেঁসে ছিল, দ্বিতীয় দিনও তাই, আমার বেঞ্চে বসল তৃতীয় দিন আর ওদিনের পর আমার বেঞ্চ ছাড়া কারও বেঞ্চে ও বসেনি। চন্দনার গায়ের রং না-লেখা কাগজের মত শাদা, নাক যেন ইটে থেতলে দেওয়া হয়েছে এমন, আধেক চোখ আড়াল করা চোখের পাতায়, বাকি আধেকের দ্যুতি আমারই অলক্ষ্যে আমার হৃদয় আলোকিত করে। ওর বিনুনিবিহীন দীঘল ঘন চুল বন্ধন মুক্ত হলেই পিঠে বর্ষার জলের মত উপচে পড়ে আর আশরীর ভিজে গোপনে গোপনে স্নিগ্ধ হতে থাকি আমি। দিলরুবা চলে যাওয়ার পর থেকে আমার পাশের জায়গাটি কারও জন্য নির্দিষ্ট ছিল না, আমার বুঝে ওঠার আগেই চন্দনা আমার পাশে নির্দিষ্ট হয়ে গেল। প্রতিদিন চন্দনার শব্দ গন্ধ বণর্ আর প্রতিদিনই দিলরুবার না থাকা দুটোই আমার পাশে বসে থাকে আমারই ছায়ার মত। কেবল চন্দনাই তখন ক্লাসে নতুন ভর্তি হওয়া মেয়ে ছিল না, বিদ্যাময়ী থেকে দলে দলে মেয়ে আসছে, আমার সেই যুদ্ধংদেহি বন্ধুরাই। কিন্তু কেউ আমার কপালের চন্দন-তিলকে একতিল কালি ছোঁয়াতে পারেনি। একটি তরঙ্গও তুলতে পারেনি সেই চন্দন-সুবাসে, যেখানে অহর্নিশি আমার আকণ্ঠ অবগাহন।

শহরের এক কোণে নির্জন এলাকায় আবাসিক আদর্শ বালিকা বিদ্যায়তন দাঁড়িয়ে আছে বটে, গুটিকয় হাতে গোনা মেয়ে আছে বটে এখানে, কিন্তু মেট্রিকে বিদ্যাময়ীর মেয়েদের চেয়ে ভাল ফল করেছে এই ইশকুলের মেয়েরা, কেবল তাই নয় গড়ে প্রথম বিভাগ বেশি জুটেছে অন্য যে কোনও মেয়েদের ইশকুলের চেয়ে এই ইশকুলে, তাই ঘাড় ধরে আমার বাবা যেমন ঠেলে দিয়েছিলেন যখন আমি সপ্তম শ্রেণীতে সবে পা দিয়েছি, অন্যদের বাবাও সপ্তম অষ্টমে যদি সম্ভব না হয়েছে, নবম দশমে পড়া কন্যাদের একই রকম করে এই ইশকুলে ঠেলেছেন। নির্জনতা এই ইশকুলের অনেকটাই তখন কেটেছে। সবচেয়ে বড় শ্রেণীর ছাত্রী বলে তখন বিষম এক আনন্দ হয়। বই খাতার মলাটের ওপর মোটা কলমে নিজের নাম যত না বড় করে লিখি, তার চেয়ে বড় করে লিখি দশম শ্রেণী।

চন্দনার উতল হাওয়ায় উড়ছি যখন, সামনে বিকট দজ্জালের মত রাম দা হাতে মেট্রিক পরীক্ষা, চৌকাঠ পেরিয়ে প্রায় অন্দরমহলে ঢুকছে এমন, বাড়িতে বাবা মুহুর্মুহু উপদেশ বষর্ণ করছেন যেন মুখস্থ ঠোঁটস্থ এবং অনঃ্ত স্থ করে ফেলি সবকটি বইএর সবকটি পৃষ্ঠার সবকটি অক্ষর। কালো কালো অক্ষর ছাড়া আমার জগত জুড়ে আর কিছু যেন না থাকে। বাবার উপদেশ পালন করার ইচ্ছে বাবা বাড়ি থেকে বেরোলে বা তাঁর নাক ডাকার শব্দ শুনলেই উবে যায় আমার। ইশকুলে যাবার পথে এক ক্লাস ওপরে পড়া এডওয়ার্ড ইশকুলের ছেলেগুলো ইস্ত্রি করা জামা গায়ে, চোখের কোণে ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি নিয়ে ত্রিভঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকে, দেখে সারাদিন আমার মনে লাল নীল সবুজ হলুদ যত রকম রং আছে জগতে, লেগে থাকে। ইশকুলে পৌঁছে পড়ালেখার চেয়ে বেশি সেঁটে থাকি নাটকঘর লেন থেকে হেঁটে আসা মাহবুবার কাছে খবর নিতে ছেলেগুলোর নাম, কে কোন পাড়ায় থাকে, কার মনে কী খেলে এসব। মাহবুবা তার ভাইদের কাছ থেকে যে তথ্য পায় তাই পাচার করে, যে তথ্য পায়নি তাও অনুমান করে বলে। চন্দনা মুঠো খুলতেই আষাঢ়ে বৃষ্টির মত ঝরে প্রেমের চিঠি, দিনে ও চার পাঁচটে করে চিঠি পেতে শুরু করেছে। পাবে না কেন! পণ্ডিতপাড়ার আঠারো থেকে আঠাশ বছর বয়সের ছেলেরা অনিদ্রা রোগে ভগু ছে ওকে দেখে অবদি। ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে মমতা বানুকে নিয়ে প্রতিদিন গুঞ্জন, বাঘমারা মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসের ইমতিয়াজ তরফদার নাকি মমতার প্রেমের জলে ডুবে আত্মহত্যা করতে বসেছিল। কারও সাতে নেই পাঁচে নেই নাক উঁচু বুক উঁচু ভাল ছাত্রী আসমা আহমেদেরও জিলা ইশকুলের কোনও এক ভাল ছাত্রর সঙ্গে নাকি কোথায় দৃষ্টি বিনিময় হয়েছে। সারার দিকে ইশকুল ঘেঁসা বাড়ির ছেলে জাহাঙ্গীর হাঁ করে তাকিয়ে থাকে, সারার নাকি ছেলেটিকে মন্দ লাগে না। পপির সঙ্গে নাদিরা ক্লাসের ফাঁকে ফিসফিস কথা বলে, আশরাফুনন্নেসা নামের ঠোঁটকাটা মেয়ে তাই দেখে অনুমান করে পপির ভাই বাকির প্রেমে পড়েছে নাদিরা। শিক্ষক শিক্ষিকা কে কার ঘরে উঁকি দিলেন, কার কথায় কে হেসে গড়িয়ে পড়লেন, কার চোখের তারায় কার জন্য কী ছিল—টুকরো টুকরো গল্প বাতাসের পাখা মেলে আমাদের কানেও পৌঁছোয়। চন্দনা এসব উড়ো খবর নিয়ে মাতে, আমিও। ও আবার নিজের দু-একটি খুচরো প্রেম নিয়েও থাকে মেতে। ক্লাসে বসেই পাতার পর পাতা প্রেমের পদ্য লিখে ফেলে হয়ত কারও উদাস দুচোখের কথা মনে করে, সেদিন সকালেই দেখা কারও চোখ। রাস্তায় দেখা লৎু ফর নামের চশমা চোখের ছেলেটির জন্য আমারও কেমন কেমন যেন লাগে। ইশকুলে যেতে আসতে ছুঁড়ে দেয়া ওর দুটো তিনটে চিরকুট পেয়ে রাতের ঘুম উবে যায়। চোখ যে মনের কথা বলে ইতি লৎু ফর লেখা একটি চিরকুট আমার পদার্থবিজ্ঞান বইএর ভেতর থেকে পড়বি পড় মালির ঘাড়ে না হয়ে বাবার পায়ের কাছে উড়ে গিয়ে যেদিন পড়ল, বাবা পরদিন থেকে আমার ইশকুল যাতায়াতে পাহারা বসালেন, বড়দাদার দায়িত্ব পড়ল আমাকে সকাল বেলায় ইশকুলে দিয়ে যাওয়ার আর ছুটির পর বাড়ি ফেরত নিয়ে যাওয়ার। ছুটি হলে ইশকুলের গেটের কাছ থেকে মেয়েরা রিক্সা নিয়ে বাড়ি চলে যায়, কেউ যায় হেঁটে, দএু কজনকে নেবার জন্য পিঠকুঁজো ফক্সওয়াগন গাড়ি আসে, সব চলে গেলে এমনকি মমতা বানুও(ওকে দিতে এবং নিতে চিরকালই ওর রণরঙ্গিণী মা আসেন), আমার দাঁড়িয়ে থাকতে হয় যতক্ষণ না লম্বা শাদা দাড়ি মুখে সবুজ লুঙ্গি পরে কালো রাবারের জুতো পায়ে বুড়ো দাদা উদয় হচ্ছেন। ইশকুল ছুটির পর গেটের কাছে ওভাবে একা দাঁড়িয়ে থাকাও অশান্তির, আর যদি বড়দাদা আগেভাগেই উপস্থিত হন তবে সবার চোখের সামনে তাঁর সঙ্গে রিক্সায় উঠতে গিয়েও আমার অস্বস্তির শেষ থাকে না কারণ তখন আমি নিশ্চিত বড়দাদার মাথার টুপি মুখের দাড়ি রাবারের জুতো পরনের লুঙ্গির দিকে তাকিয়ে সকলেই ঠোঁট টিপে হাসছে আর মনে মনে অনুমান করছে কত বড় গেঁয়ো ভুতের বংশের মেয়ে আমি। আমার সাধ্য বা সাহস কোনওটাই নেই মিথ্যেচার করার যে দাড়িঅলা লোকটি আদপেই আমার কেউ হয় না। তিনি যে বড়ই নিকটাত্মীয়, সে কথাও মখু ফুটে কাউকে বলা হয় না। অনেকদিন চিরকূটের গন্ধ না পেয়ে পাহারা তুলে দেন বাবা। পাহারা তুলতে হয় বড়দাদার শস্যভরা ক্ষেত গোয়াল ভরা গরু আর গোলা ভরা ধানের টানে, আপন কুঁড়েঘরে, মাদারিনগর গ্রামে ফেরার সময় হয় বলেও। গ্রাম ছেড়ে শহরে দীর্ঘদিন কাটালে বড়দাদার মাথায় গোলমাল শুরু হয়। প্রতিদিনই তাঁর জায়নামাজ হাতে নিয়ে কাউকে না কাউকে জিজ্ঞেস করতেই হয় পশ্চিম কোন দিকে। আমাকে যতবারই তিনি জিজ্ঞেস করেছেন আমি উত্তর দক্ষিণ পূর্ব সব দিককেই পশ্চিম বলে দেখিয়ে দিয়েছি কেবল পশ্চিম দিক ছাড়া আর তিনি দিব্যি জায়নামাজ পেতে সেদিকে ফিরেই দু হাতের দু বুড়ো আঙুলে দু কানের দুলতি ছুঁয়ে আল্লাহু আকবর বলে নামাজ শুরু করেছেন।

বড়দাদা সঙ্গে থাকলে তাঁর আপাদমস্তকের লজ্জায় আমাকে ঘাড় নুয়ে বসে থাকতে হত, সেই ঘাড় সোজা করার সুযোগ হল, রিক্সায় বসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেদের দিকেও লুকিয়ে তাকানোর। লুৎফরের সঙ্গে নীল প্যান্ট শাদা শার্ট পরা নতুন একটি নাদুসনুদুস ছেলেকে দেখে ছেলেটির জন্যও হঠাৎ একদিন মন কেমন করতে লাগল। এক পলকের দেখাতেই মন কেমন করে, প্রেমের অতল জলে ডুবে মরছি বলে মনে হতে থাকে, মনে হতে থাকে বাড়ি ফিরে নাদুসনুদুস আমার কথা ভাবছে, পরদিন সকাল দশটায় ইশকুলে যাবার পথে আমাকে এক পলক দেখবে বলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে সে। রাস্তায় দাঁড়ায় সে পরদিন, দেখে মনে হয় পৃথিবীতে এই নাদুসনুদুসের চেয়ে সুদর্শন আর কেউ নেই, মনে হয় কি আশ্চর্য ভাবে আমার পুরোটা জীবনই নাদুসনুদুসের সঙ্গে জড়িয়ে গেল, মনে হতে থাকে ওর ঠোঁটের হাসি চোখের হাসি প্রতিদিন না দেখতে পেলে আমার এই জীবনটিই ব্যথর্। এসব এক পলকের প্রেম থেকে, যেগুলোকে মনে হত না হলে নির্ঘাত মারা পড়ব, একদিন হঠাৎই মন অন্যদিকে ফেরে, সে লাইব্রেরির বইয়ে। যত বই আছে তাকে, নিমেষে পড়ে ফেলার আকুলতা হাঁমুখো হাঙরের মত এগোয়। নাগালের বইগুলো পড়া হয়ে গেলে নাগালের বাইরের বই পায়ের আঙুলে ভর করে দাঁড়িয়ে বা মই বেয়ে উঠে ওপরের তাক থেকে পেড়ে এনে আমি আর চন্দনা গোগ্রাসে পড়ি; বাড়িতে পাঠ্য বইয়ের তলে, বালিশের তলে, তোশকের তলে সেসব বই অথচ পরীক্ষা সামনে। গৃহশিক্ষক শামসুল হুদা পদার্থবিজ্ঞান রসায়নবিজ্ঞান জীববিজ্ঞান অঙ্কবিজ্ঞান ইত্যাদি সাত রকম বিজ্ঞান যখন পড়ান, প্রায় বিকেলেই তাঁর চড় থাপড় খাওয়া আমার নৈমিত্তিক হয়ে ওঠে। তা হোক, শামসুল হুদা আমাকে বিজ্ঞান-জ্ঞান বিতরণ করে চা বিস্কুট খেয়ে বাড়ি থেকে বেরোতেই আবার সেই তোশকের বালিশের তলের অপাঠ্যে ঝুঁকে পড়ি। আমার চেয়ে চার কাঠি এগিয়ে থাকে চন্দনা। বই আমি দুটি শেষ করলে ও করে সাতটি। ওর সঙ্গে বইপড়া-দৌড়ে আমি বরাবরই পেছনে। বইপোকা মমতাও চন্দনার সঙ্গে পেড়ে উঠত না, আমার বিশ্বাস। লাইব্রেরির বইগুলোকে ইশকুলের মেয়েরা বলে আউটবই। আউটবই শব্দটির মানে কি, একবার জানতে চেয়েছিলাম, উত্তর ছিল সিলেবাসের বাইরে যে বই, সে বই আউটবই। আউটবই পড়া মেয়েদের শান্তশিষ্ট লেজবিশিষ্ট ভাল ছাত্রীরা খুব ভাল চোখে দেখে না। আউটবই যারা পড়ে, তারা ক্লাসের পড়ায় মন দেয় না, মন তাদের থাকে উড়ু উড়ু মোদ্দা কথা তারা মেয়ে ভাল নয়, পরীক্ষায় গোল্লা জাতীয় জিনিস পায়, এরকম একটি ধারণাই চালু ইশকুলে। এই ধারণাটি কেন, তা আমার বোঝা হয় না। আমি আউটবই পড়েও পরীক্ষায় ভাল ফল করতে পারি, তা প্রমাণ করার পরও ধারণাটি ঘোচে না। ওই পড়ার নেশাতে অন্যরকম একটি জগত তৈরি হয় আমার আর চন্দনার। শিক্ষক শিক্ষিকার বা ক্লাসের মেয়েদের ব্যক্তিগত কোনও প্রেম বিরহের খবর বাতাসের সঙ্গে বা বাতাসের আগে আমাদের কানে আসে না, মাঝপথে কোথাও থমকে থাকে। আমাদের বাতাস তখন ভারি পার্বতীর কান্নায়, রাজলক্ষ্মীর নগ্ন পদধ্বনিতে, চারুলতার নিঃসঙ্গতায়, বিমলার দ্বিধায়।

বাতাস যে সবসময় ভারি হয়েই থাকে তা নয়, মাঝে মধ্যে অমল হাসিতে আবার অমলিন হয়ে ওঠে, আবার ফুরফুরে। আমাদের লাইব্রেরিয়ান সাইদুজ্জামানের ঠোঁটে তেমন একটি অমল হাসি খেলে প্রায়ই। মাঝে মাঝে আমাদের ইসলামিয়াত পড়ান তিনি, এই একটি বিষয়ের জন্য ইশকুলে কোনও শিক্ষক নেই, যে শিক্ষকের যখনই অবসর থাকে, ইসলামিয়াত পড়াতে ক্লাসে আসেন। ইসলামিয়াত ক্লাসে সাইদুজ্জামানের হাসি নিখাদ আকর্ণবিস্তৃত। তাঁর হাসির মূল্য আছে, কারণ এ ক্লাসটি অন্য যে কোনও ক্লাসের চেয়ে অগুরুত্বপূর্ণ। কল্যাণী পাল বাংলা পড়াতে এসে ঠোঁটে মোনালিসার হাসি ঝুলিয়ে রাখেন, সাহিত্যের রস আস্বাদনের সময় ওরকম একটি হাসির প্রয়োজন আছে। সুরাইয়া বেগমও তাঁর উঁচু উঁচু দাঁতের হাসিতে রজনীগন্ধার সুগন্ধ ছড়ান। হাসিতে কি সুগন্ধ ছড়ায়? চন্দনা বলে, ছড়ায়। অংকের শিক্ষক বাংলার পাঁচের মত মখু করে ক্লাসে আসেন, ক্লাস থেকে বেরোন, সে মানায়। সাইদুজ্জামানের হাসির প্রশ্রয়ে ইসলামিয়াত ক্লাসে বসে আকাশের দিকে অন্যমন তাকিয়ে থাকলেও বা খাতা ভরে পদ্য লিখলেও বা পেচ্ছাব পায়খানা করতে গিয়ে বা জল খেতে গিয়ে পাঁচ মিনিটের জায়গায় আধঘন্টা কাটিয়ে দিলেও কিছু যায় আসে না। সাইদুজ্জামান ইসলামিয়াত পড়ানো রেখে গল্প করে সময় কাটান বেশি,তাঁর গল্পগুলো নেহাত নিরস নয়, তবে বারবারই তিনি বলেন বিষয় হিসেবে ইসলামিয়াত একেবারে ফেলনা নয়, ফেলনা নয় কারণ এটিতে নম্বর ওঠে, সূরা ফাতিহা ঠিকঠাক লিখে দিতে পারলে বা আসমানি কিতাবের চারটে নাম বলতে পারলেই দশে দশ। পদার্থবিজ্ঞান বা রসায়নে নম্বর যদি কম পাওয়া যায়, প্রথম বিভাগে পাশ করার ভরসা হল ইসলামিয়াত, খাটাখাটনি ছাড়াই নম্বর। ক্লাসের মুসলমান মেয়েদের জন্য ইসলামিয়াত পাঠ্য, হিন্দুদের জন্য সনাতন ধর্ম শিক্ষা, সারা ইশকুলে হিন্দু ধর্ম পড়াবারও কোনও শিক্ষক নেই, কল্যাণী পাল হিন্দু বলে তাঁকে প্রায়ই ওই ক্লাসে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়, ছাত্রীদের তিনি বলেন, খামোকা ধর্মের পেছনে সময় নষ্ট না করে অঙ্ক বিজ্ঞান নিয়ে থাকো, ওতে কাজ হবে। হিন্দু মেয়েরা ধর্ম ক্লাসে বিরাট এক ছুটি পেয়ে যায়, অঙ্ক বিজ্ঞানের পেছনেও সময় নষ্ট না করে মাঠে খেলতে চলে যায়, নয়ত আড্ডা পেটায় খালি ক্লাস-ঘরে। চন্দনা যেহেতু বৌদ্ধ, ওরও বেরিয়ে যাওয়ার কথা ক্লাস থেকে, হিন্দু ধর্মের শিক্ষকই নেই, বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষক থাকার তো কোনও প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু ও ঠায় বসেই থাকে ইসলামিয়াত ক্লাসে, গল্পের বইয়ে ডুবে, নয়ত কবিতায়। আমি ওর পাশে বসে না দিতে পারি মন ইসলামিয়াতে, না পারি সাইদুজ্জামানের নাকের ডগায় নীহাররঞ্জন গুপ্ত খুলতে। অতঃপর আঁকিবুকি কর, ছড়া লেখ।

সাইদুজ্জামান কামান দাগান,
ধর্মের ঘোড়া স্কন্ধে চাপান
হাবিজাবি কন যেখানে যা পান
কাশি তো আছেই, আবার হাপাঁন
মাথায় একটি টুপিও লাগান
কোরান হাদিস মানেন নাকি মানার ভান?

সাইদুজ্জামানকে তুলোধুনো করে আমারই পরে দুঃখ লেগেছে, রীতিমত শার্টপ্যান্ট পরা ভদ্রলোক, কোনও টুপি তার চাঁদি স্পর্শ করেনি, তাঁকে কেন এই হেনস্থা! আসলে এ সাইদুজ্জামান বলে কথা নয়, যে কাউকে নিয়েই এমন হতে পারে, টেংরা মাছের মত দেখতে কাউকে বিশাল হাঁমখু বোয়ালও নির্বিঘ্নে বানানো চলে। বিশেষ করে চন্দনার আশকারা পেলে। বাংলার শিক্ষক সুরাইয়া বেগম হেলে দুলে হেঁটে যাচ্ছেন, পেছনে চন্দনা আর আমি দুটো পিপঁ ড়ের মত, চন্দনা ফিসফিসিয়ে বলছে—ওলো সুরাইয়া, ফুল কুড়াইয়া, মখু ঘুরাইয়া

আমি যোগ করছি—আর কত হাঁটো, বেলা তো গেল

কপট দীর্ঘশ্বাস ফেলে চন্দনা শেষ করে, যেতে যেতে গেল ফুরাইয়া।

 

আবাসিক আদর্শ বালিকা বিদ্যায়তনের শিক্ষকমণ্ডলী যে ছোটখাট ব্যাপার নয় তা জেনেও আমাদের ছড়া কাটা, যদিও প্রকাশ্যে কিছুই নয় সবই নিভৃতে-নির্জনে-নিরালায়, থেমে থাকে না। অন্য ইশকুলে বি এ পাশ নেবে, আবাসিকে ঢুকতে হলে হতে হবে এম এ, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে গেলে যা হতে হয়। এই বিদ্যায়তনের শিক্ষক শিক্ষিকা কেউ এ শহরের নয়, দূর দূর শহর থেকে আসা, বেশির ভাগই ঢাকা থেকে। শিক্ষককুলের বাড়িঘর সবই ইশকুলের ভেতর। এক একজন শিক্ষকের জন্য এক একটি বাড়ি, বাড়ির সামনে মাঠ, পেছনে বাগান। যখন এ ইশকুলটি বানানো হয়, তখন কেবল শিক্ষককুলের জন্যই আবাসিক ব্যবস্থা ছিল না, ছাত্রীকুলের জন্যও ছিল। বাধ্যতামূলক আবাসিকতা। প্রায় ক্যাডেট কলেজের মত করে এই ইশকুলটির আগপাস্তলা গড়ার স্বপ্ন ছিল পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের। তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহে, তাই এই শহরেই তাঁর মৃত স্ত্রীর স্মরণে রাবেয়া মেমোরিয়াল নামে এই আবাসিক ইশকুলটি তিনি বানাতে শুরু করেছিলেন প্রায় একশ একর জমির ওপর, হাওড় বিল সব ভরে। তারপর তো পাকিস্তান গেল, গভর্নর গেল, একাত্তরে বোমারু বিমান শহরে চক্কর খেয়ে রাবেয়া মেমোরিয়ালের একাকি দাঁড়িয়ে থাকা আধখেঁচড়া ইশকুল-দালানে বোমা ফেলে অনেকখানি ধসিয়ে ফেলল। যুদ্ধের পর ধস সরিয়ে অবশিষ্ট দালানটুকু সারাই করে চুনকাম করে রাবেয়া মেমোরিয়াল নাম তুলে দিয়ে আবাসিক আদর্শ বালিকা বিদ্যায়তন বসিয়ে এটি চালু করা হল,ওই একই নকশায় বলা যায়, আবাসিকের নকশা, কিন্তু শিক্ষককুল দ্বারা আবাসিক ব্যবস্থা সম্ভব হলেও ছাত্রীকুল দ্বারা হল না। একটি নতুন দেশের পক্ষে অত বিশাল আয়োজনে সবকিছু করা সম্ভব হয়নি, তবু যা হয়েছে তাই বা কম কিসে! ছাত্রীদের ইশকুলের সীমানায় বাধ্যতামূলক করা হল না, ছাত্রীনিবাস পড়ে রইল মাঠের এক কোণে ভুতুড়ে নির্জনতায়। কেবল প্রধান শিক্ষিকা ওবায়দা সাদের বাড়ির নিচতলায় খুলনা রাজশাহি থেকে আসা কিছু মেয়ের থাকার ব্যবস্থা হল। তবু এই ইশকুল শহরের নামি ইশকুল, দামি ইশকুল। বাছাই করে ভাল শিক্ষক শিক্ষিকাদেরই কেবল চাকরি দেওয়া হয়েছে। বাছাই করে ভাল ছাত্রীদেরই কেবল ভর্তি করা হয়েছে। অন্য ইশকুলগুলোর চেয়ে এই ইশকুলের ঢংঢাং তাই অনেকটাই আলাদা। এই ইশকুলে ছাত্রীদের বৃত্তি দেওয়া হয়, অন্য ইশকুলে এমন ব্যবস্থা নেই। বৃত্তির জন্য অন্য ইশকুলে বোর্ডের পরীক্ষার ওপর নির্ভর করতে হয়। এই ইশকুলের অডিটোরিয়াম যেমন দেখার মত, অনুষ্ঠানও হয় দেখার মত। এ তো আর অন্য ইশকুল-অডিটোরিয়ামের মত মুরগির খোপ জাতীয় কিছু নয়, বড় কোনও সিনেমাহল বলা চলে। বোতাম টিপলেই ভারি মখমলের পর্দা মঞ্চের এপাশ থেকে ওপাশে সরে যায়। মঞ্চও চক্রাকারে ঘোরে। দর্শকের আসন নিচ থেকে ওপরে চলে গেছে। নাটক, নৃত্যনাট্য, সঙ্গীতানুষ্ঠান যা হয় এই মঞ্চে তা অন্য ইশকুলের সাধ্য নেই হওয়ানোর। প্রতি মাসে না হলেও দুমাস অন্তর অন্তর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, বারোই দিবস তেরই দিবস পালন তো আছেই। এমনিতেও চাপাচাপি করলে ডাকসাইটে শিক্ষক শিক্ষিকারা খোলস থেকে বেরিয়ে গান গেয়ে ওঠেন অদ্ভুত সুরেলা কণ্ঠে। বোমা ফেলার দরকার হয় না, পরিমাণ মত সুড়সুড়ি ফেললেই কবিতা বেরিয়ে আসে অনেকের পেট থেকে, এমন কি অংকের শিক্ষকের পেট থেকেও। অনুষ্ঠানাদি ছাড়া যে একেবারে নীরস সময় কাটে তা নয়, সুরাইয়া বেগম বাংলা পদ্য পড়াতে এসে প্রায়ই নিজের লেখা পদ্য শোনান। সুরাইয়া বেগমের মন কাদার মত নরম হলেও জিন্নাতুন নাহার শক্ত পাথর-মত। তিনি পড়ান ইংরেজি। ইংরেজির শিক্ষকদের কোনওকালেও আসলে আমার ভাল লাগেনি। বিষয়টি যেমন কঠিন, বিষয়ের শিক্ষকগুলোও তেমন। আমার ভাল লাগে বাংলা, চন্দনারও বাংলা। ওই সময় একদিন অন্যদিনের মতই ইশকুলে পৌঁছে সকাল বেলা মাঠে ক্লাস অনুযায়ী লাইনে দাঁড়িয়ে উঠবস করে আর ডানে বামে পেছনে সামনে মাথা থেকে পা অবদি নেড়ে চেড়ে অর্থাৎ দৈনন্দিন ব্যায়াম সেরে সোজা হও আরামে দাঁড়াও পবের্ আদেশ অনুযায়ী আরামে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকার সামনে সমস্বরে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি গেয়ে লাইন করে ক্লাসঘরে ঢোকার পর যে সংবাদটি প্রধান শিক্ষিকা নিজে এসে আমাদের দিয়ে যান, সে হল লেখক কাজী মোতাহার হোসেন এখন আমাদের ইশকুলে, তাঁর সঙ্গে ইচ্ছে করলে আমরা দেখা করতে পারি। উত্তেজনায় বুক কাঁপে। কাজী মোতাহার হোসেন আমাদের প্রধান শিক্ষিকার বাবা। তিনি লেখেন ভাল, খেলেনও ভাল, মাথা ভালদের যা হয়—সর্ব বিদ্যায় পারদর্শী। অনেকগুলো গুণী সন্তান জন্ম দিয়েছেন তিনি, এই ওবায়দা সাদ ছাড়া বাকি সবাই স্বনামধন্য, ছেলে কাজী আনোয়ার হোসেন নামি লেখক, মেয়ে সানজিদা খাতুন-ফাহমিদা খাতুন দুজনই বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী। আমি আর চন্দনা বিখ্যাত সন্তানদের বিখ্যাত বাবার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে অবশ্য বিষম এক ফাপঁরে পড়ি। প্রথম কিছুক্ষণ উঁকি দিয়ে দরজায়, আলতো করে দরজা সরিয়ে পঁচাশিভাগ ভয়ে পনেরোভাগ নির্ভয়ে তাঁর ঘরখানায় উপস্থিত হতেই তিনি শাদা দাড়ি দুলিয়ে হাসলেন, কৌতূহলে চোখদুটো উজ্জ্বল, তাঁর কৌতূহল নিবৃত্ত করি আমরা আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি বাক্যটি বড় ব্রীড়িত বিনম্রস্বরে বলে। শুনে তিনি মধুর হাসলেন, হেসে টেবিলে একটি রেডিও ছিল সেটি বেজায় শব্দ করে চালিয়ে দিলেন। অনেকক্ষণ রেডিও চলল, আমি আর চন্দনা নিজেদের মধ্যে বিস্মিত দৃষ্টি বিনিময় করছি, তিনি শুভ্রকেশ শুভ্রশ্মশ্রু শুভ্রহাস্য অধরে, রেডিওতে কান পেতে আছেন। আমরা আবারও জানালাম কেন এসেছি, তিনি এবার মাথা নাড়লেন, অথার্ৎ তখন না হলেও এখন বুঝতে পেরেছেন আমরা কেন এসেছি। মাথা নেড়েই তিনি বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে, কেবল ঘর থেকে নয়, বাড়ি থেকে, হন হন করে হেঁটে সোজা ইশকুলের দিকে। পেছন পেছন গিয়ে দেখি ওমা তিনি তাঁর কন্যার কাছে গিয়ে বলছেন, তুমি আমাকে ডেকে পাঠালে যে! ওবায়দা সাদ তাজ্জব, তিনি মোটেও ডেকে পাঠাননি পিতৃদেবকে। ঘটনা কি? পিতৃদেব কানে খাটো। কানে খাটোর সঙ্গে আমরা কি করে কথোপকথন চালাবো তবে ওবায়দা সাদ এর কোনও মীমাংসা করতে পারলেন না। অতঃপর মান্যগণ্য প্রণম্য নমস্য সৌম্যদর্শনের আপাদমস্তকের দিকে নীরবে শ্রদ্ধা ছুঁড়ে দেওয়া ছাড়া আমাদের গত্যন্তর রইল না। বুদ্ধি হওয়ার পর কোনও জলজ্যান্ত লেখককে চোখের সামনে এই আমার প্রথম দেখা। মার কাছে শুনেছি, যখন ছ মাস বয়স আমার, রাহাত খান, বাবার এক লেখকবন্ধু আমাদের বাড়ি আসতেন, আমাকে কোলে নিয়ে দোলাতেন, দোলাতে দোলাতে নিজের বানানো গান গাইতেন। মার ইশকুলের বান্ধবী ফরিদা আখতারের উদ্দেশে ছিল সে সব গান, আমার স্বপ্নে দেখা ফকিরকন্যা থাকে সে এক পচা ডোবার ধারে, কিস্তি নৌকা ভাসিয়ে দিয়ে আমি দেখে এলেম তারে ..। রাহাত খান নাসিরাবাদ কলেজের মাস্টার ছিলেন। ডাক্তারে আর মাস্টারে খাতির হইল কেমনে? জিজ্ঞেস করলে মা উত্তর দিয়েছেন, দুইজনে এক মুক্তারনির প্রেমে পড়ছিল, সেই মুক্তারনি, মুক্তারের সুন্দরী বউ, যার বাড়িতে জায়গির থাইকা লেখাপড়া করছিল তর বাপ! ফরিদা আখতারের প্রেমেও নাকি বাবা পড়েছেন। মুখে বসন্তের দাগঅলা ফর্সা উঁচালম্বা ফরিদা আবার আমার শিক্ষিকা ছিলেন ছোটবেলার সেই রাজবাড়ি ইশকুলে। ফরিদা লাস্ট বেঞ্চের ছাত্রী ছিল, আমি ছিলাম ফার্স্ট বেঞ্চের, আমার চেয়ে কত খারাপ ছাত্রী ছিল ফরিদা, সেই ফরিদা এখন ইশকুলে পড়ায় আর আমি চুলায় খড়ি ঠেলি। এই হইল আমার কপাল! মার কপাল নিয়ে আর যে কেউ ভাবুক, বাবা ভাবেন না। মা ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করবেন, রেঁধেবেড়ে খাওয়াবেন, চোর ছ্যাঁচড়ের উপদ্রব থেকে বাড়ি সামলাবেন, এই মহান দায়িত্ব যাঁর হাতে, তাঁর আবার কপালের কথা ভাবার অবকাশ আছে নাকি!

রাহাত খানের গল্প শুনতে আমি যত আগ্রহী, মা তত নন। বই পড়া মেয়ের কাছে লেখক মানে বিশাল কিছু না ছুঁতে পারা আকাশ। যাঁরা বই লেখেন, তাঁরা যে আর সবার মত মানুষ, তাঁরা যে আর মানুষের মত পেচ্ছাব পায়খানা করেন, তাঁদের নাকেও যে মাঝে মধ্যে সর্দি জমে, ছিৎ করলে থিকথিকে মোটা হলদে সর্দিও যে তাঁদের নাকের ফুটো দিয়ে কখনও বেরোতে পারে, তা আমার বিশ্বাস হয় না। সিনেমার লোকদের বেলাতেও আমার একই বিশ্বাস। তাঁরা সুন্দর-শোভন জীবন যাপন করেন, ঝলমলে জগতে বাস করেন, ঝকঝকে গাড়িতে চড়েন, চোখ ঝলসানো জামা কাপড় পরেন, রাজা বাদশাহর মত তাকিয়ায় হেলান দিয়ে আপেল আঙুর খান, তুলো-নরম বিছানায় ঘুমোন, গা থেকে ঘামের গন্ধ তো দূরের কথা, গায়ের গন্ধও নয়, বেরোয় গোলাপের সুঘ্রাণ, কখনও কোনও কাজে একবিন্দু ভুল করেন না, মিথ্যে বলেন না, কাউকে কষ্ট দেন না। অতিমানব যাকে বলে। বইয়ের যেমন পোকা আমি, সিনেমারও। চন্দনারও একই হাল। দাদাকে অনুরোধ আবদার করে সিনেমায় যেতে রাজি করিয়ে যাওয়ার পথে চন্দনাকেও উঠিয়ে নিই। হুজ্জত হাঙ্গামা করে মাঝে সাঝে সিনেমা দেখাবার ব্যবস্থা দাদা করেন বটে, কিন্তু ঘরে বসে সিনেমা পত্রিকার দেখা পাওয়া ছোটদার কারণেই আমার প্রথম হয়। ছোটদা পড়াশোনায় মন না বসা টই টই করে শহর ঘুরে বেড়ানো সাত কাজের কাজি অকাল-বিবাহিত তরুণ, প্রতি সপ্তাহে দুপুরের পর হাতে করে চিত্রালী নিয়ে আসেন বাড়িতে অবসরে তাঁর চিত্ত বিনোদনের তাগিদে। ছোটদার বিত্ত নেই কিন্তু চিত্ত আছে। ছোটদার চিত্তের বিনোদন সাঙ্গ হলেই আমার ঔৎসুক্য লম্ফ দিয়ে ওঠে। কি আছে লেখা ওই ছবিঅলা কাগজে? কোথাও কোনও মুদ্রিত অমুদ্রিত শব্দ দেখামাত্র পড়ে ফেলা মেয়ে আমি। ইশকুলে যাওয়ার পথে ছেলেছোকড়া না থাকলে সহস্রবার পড়া সাইনবোর্ড আবারও নতুন করে পড়তে পড়তে যাই। বাদাম কিনে বাদাম খেতে খেতে বাদামের ঠোঙার লেখা পড়ে ফেলি। তেঁতুলের আচার কিনলেও সে আচার চেটে খেয়ে আচারের তেলের তলে আবছা লেখাও উদ্ধার করে ছাড়ি। এমন যে পড়ুয়া, সে কেন চিত্রালী বলে চিত্ত বিনোদনের কাগজটি ফেলে রাখবে!ছোটদার সেই চিত্রালীতে চোখ বুলোতে বুলোতে অভ্যেসে দাঁড়িয়ে যায় চোখ বুলোনো। অভ্যেস গড়াতে গড়াতে নেশায় গিয়ে নামে। অথবা ওঠে কে জানে! ছোটদা যদি চিত্রালী কেনায় অনিয়ম করেন, তবে আর কী! ইশকুলের রিক্সাভাড়া বাঁচিয়ে চিত্রালী কেনো, প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা অবদি পড়ে ফেলো যা লেখা, নায়ক নায়িকার বাড়ির গাড়ির হাঁড়ির, প্রেমপ্রণয়বিরহের খবর সব নখদর্পণে নিয়ে রাতে ঘুমোতে যাও, ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখো কোনও এক নায়কের সঙ্গে ঝিকমিক জ্যোৎস্নায় ঝিলমিল করা ঝিলের ধারে ঝিরঝিরে হাওয়ায় তোমার দেখা হচ্ছে, সেই নায়ক তোমার উদ্দেশে নেচে নেচে গান গাইছে, গাছপালাআকাশবাতাসঝিলেরজলচাঁদেরআলো সবকিছুকে সাক্ষী রেখে বলছে যে তোমাকে ছাড়া সে বাঁচবে না। শুক্রবার চিত্রালী হাতে না পেলে আমার পেটের ভাত হজম হয় না, মা অন্তত তাই বলেন। হজম নিয়ে আমি মোটেও উদ্বিগ্ন নই, তবে ভাত খাচ্ছি, চিত্রালী এল বাড়িতে, ব্যস ভাতের থালা ঠেলে উঠে গেলাম নয়ত এক হাত চিত্রালীতে, আরেক হাত ভাতে, ভাতের হাত অচল হতে থাকে, চিত্রালীর হাত সচল। চিত্রালী আমার ক্ষিধে কেন বাপ মা ভুলিয়ে দেওয়ার মত শক্তি রাখে। এমন শুরু হয়েছে চিত্রালীর পাঠকের পাতায় আমার একটি লেখা ছাপা হওয়ার পর। এমনি একটি লেখা পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, কিন্নরকণ্ঠী সাবিনা কেন অবহেলিত, সাবিনার কণ্ঠে মাধুর্য, রুনার কণ্ঠ কর্কশ ইত্যাদি। ওই আমার প্রথম কিছু ছাপা হওয়া কোনও পত্রিকায়। লেখা পাঠানোর আগে ছোটদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যদি চিত্রালীতে লেখা পাঠাই, তবে কি ছাপবে ওরা! ছোটদা দুব্বোকা বলে আমাকে সরিয়ে দিয়ে বলেছেন যে চিত্রালীতে দিনে পাঁচ হাজার চিঠি পৌঁছয়, পাঁচ হাজারের মধ্যে চার হাজার বিরানব্বইটি চিঠি ওরা পড়া তো দূরের কথা, খোলেই না, ছুঁড়ে দেয় ময়লা ফেলার বাক্সে, আমি যদি কোনও চিঠি পাঠাই তা সোজা ওই ময়লার বাক্সেই যাবে। ছোটদা যদিও ঝাড়বাতি এক ফৎু কারে নিবিয়ে আমার আশার ঘরে হতাশার বস্তা বস্তা বালু ঢেলে দিয়েছেন, তবু আমি গোপনে লেখাটি পাঠিয়েছিলাম চিত্রালীর ঠিকানায়, ভাগ্য পরীক্ষা করা অনেকটা। দিব্যি পরের সপ্তাহে ছাপা হয়ে গেল, লেখাটির পাশে সাবিনা ইয়াসমিন আর রুনা লায়লার ছবি বসিয়ে। বাড়িতে হৈ চৈ পড়ে গেল, হিপ হিপ হুররের তোড়ে ভাসতে থাকি। আমার নামখানি পত্রিকায় ছাপার অক্ষরে, অবিশ্বাস্য কাণ্ড বটে। ছোটদা কিছুক্ষণ হাঁ হয়ে থেকে তোতলালেন, বাহ ত-তর লে-লেখা ছাপা হইয়া গে-গেল! যেন আমি সাংঘাতিক অসম্ভব কিছু সম্ভব করে ফেলেছি! আমার ঠোঁটে সারাক্ষণই রাজ্য জয় করার হাসি মিছরির গায়ের লাল পিপঁড়ের মত লেগে থাকে। বাবাকে বাদ দিয়ে পত্রিকাটি সবার চোখের সামনে একাধিকবার উঁচু করি, এমনকি জরির মার চোখের সামনেও। জরির মা অবাক হয়ে পত্রিকাটির দিকে তাকিয়ে বলে, এইডারে ত ঠোঙ্গার কাগজের মতই দেহা যায়। অবিশ্বাস্য ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর আরও একটি ঘটনা ঘটে, এটিও অবিশ্বাস্য। পরের সপ্তাহে দেখি আমার লেখার প্রশংসা করে এবং আপত্তি জানিয়ে বেশ কয়েকটি লেখা চিত্রালীতে ছাপা হয়েছে। আমার উৎসাহ তখন ভাত ফোটার মত টগবগ করে ফোটে। এরপর পাঠকের পাতায় তো বটেই চিঠিপত্র বিভাগেও লেখা পাঠানো শুরু করি। চিত্রালীর ধাঁচে শরীর সাজিয়ে পূর্বাণী নামের নতুন একটি পত্রিকা উঁকি দিচ্ছে শিল্প-সাহিত্য-বিনোদনের জগতে। পূর্বাণীকে হেলা করব, এমন হৃদয়হীন আমি নই। চিত্রালী পূর্বাণী, এ দুটো পত্রিকা প্রতি সপ্তাহে আমার না হলেই নয়। চিত্রালী বা পূর্বাণীতে আমার লেখা থাকলে ঠোঁটে চিকন হাসি ঝুলিয়ে ছোটদা প্রতি সপ্তাহে বলেন হ হইছে ছাপা, আর না থাকলে কি রে তর লেখা ত ছাপল না! চন্দনাকে এই জগতটিতে টেনে নামাতে হয় না, আড়ম্বর দেখে ও নিজেই নামে। আমি যত না লিখি, আমাকে নিয়ে লোকে তার চেয়ে বেশি লেখে। রীতিমত আসরের অন্যতম একজন হয়ে উঠি। চিত্রালীতে চিঠির উত্তর যিনি দেন, যাঁকে সবাই উত্তরদা বলে ডাকে, রসের কলসে চুবিয়ে তাঁর উত্তর তোলেন। লিখতে লিখতে সেই কোনওদিন দেখা না হওয়া উত্তরদাকে আমার আপন দাদার মত মনে হতে থাকে। ইয়াসমিনের সঙ্গে পেনসিল নিয়ে ছোটখাট একটি চুলোচুলির যুদ্ধ হয়ে গেল, সবার আগে উত্তরদাকে চিঠি লিখে জানাই আজ আমার মন ভাল নেই। মনে ফুর্তি হলেও তাঁকে জানানো চাই সবার আগে। গোলপুকুর পাড়ের আড্ডা থেকে ছোটদা একটি বাক্য তুলে একদিন অবকাশে বিতরণ করলেন কুড়িটা বসন্ত পার হয়ে গেল, কোনও কোকিল তো দূরের কথা, একটা কাকও ডাকল না। বাক্যটি লুফে নিয়ে উত্তরদাকে জানিয়ে দিই, ঘটনা এই। তিনি এমনই মর্মাহত শুনে যে ঢাকা শহরের সবগুলো কাককে ময়মনসিংহের দিকে ধাওয়া করলেন, যেন কা কা রব তুলে আমার বসন্তকে সার্থক করে এবং তিনি এবং তাঁর শহরবাসি কাকের যন্ত্রণা থেকে এই জনমের মত মুক্তি পান। ধুত্তোরি, আমি কি এমনই বুড়ি যে কুড়ি হব! ও তো মজা করতে! কেবলই মজা করার জন্য সে আসর নয়, যথেষ্ট গুরুগম্ভীর কথাবার্তাও হয়। লোকের সত্যিকার মান অভিমান, দুঃখ শোক, প্রেম বিরহ, কূটকচাল এমনকি সংসারের ঝুটঝামেলারও মীমাংসা হয় পত্রিকার পাতায়। পাঠকসংখ্যা এত ব্যাপক যে তখন দেশের প্রতিটি শহরে চিপাচস নামে চিত্রালী পাঠকপাঠিকা সমিতি খোলা শুরু হল। ময়মনসিংহে চিপাচসের কণর্ধার বনে বসলেন স্বয়ং ছোটদা। হতেই হবে, লেখক না হলেও পাঠক তো তিনি। পড়াশোনা লাটে উঠেছে, কাজ নেই কম্ম নেই, তাঁর পক্ষেই সম্ভব চিপাচস নিয়ে চব্বিশ ঘন্টা পড়ে থাকা। চিপাচসের একটি সভাও একদিন হয়ে গেল টাউন হলের মাঠে। ঘন সবুজ মাঠের বটবৃক্ষ ছায়ায় বিকেলের সভাসমিতি জমে ওঠে বেশ। এক বটতলায় চিপাচস গড়ে তোলা হচ্ছে, অন্য বটতলায় ধাড়ি ধাড়ি ছেলেমেয়ে নিয়ে বসেছে পুরোনো কচি কাঁচার মেলা। কাঁচারা এদ্দিনে পেকে লাল, কিন্তু কাঁচা নামটি খোয়াতে নারাজ। ইত্তেফাক পত্রিকার রোকনুজ্জামান খান যাঁকে কচি কাঁচারা দাদাভাই বলে ডাকে, পত্রিকায় কচিকাঁচার আসরও যেমন খুলেছেন, কচিকাঁচাদের সংগঠনও গড়ে তুলেছেন বিভিন্ন শহরে। সংস্থা সমিতি সংগঠন পরিষদ এসবের কমতি নেই ময়মনসিংহ শহরটিতে। ছোটদার কাছেই খবর জোটে শহরের এখানে ওখানে নানা রকম আলোচনা অনুষ্ঠান হচ্ছে, সাহিত্য সভা হচ্ছে, নাচ গান নাটক হচ্ছে। শুনে ইচ্ছের জিভে লোল জমে। চিপাচসের সভা থেকে ফিরলে ছোটদাকে পই পই করে জিজ্ঞেস করি, কে কে এসেছিল, দেখতে কেমন? কেউ কি কিছু বলল, কি বলল? ছোটদা এক এক করে নাম বলেন, এক এক করে পরিচয়। এর ওর বলা দুএকটি শব্দ বা বাক্য উপরোধে ঢেঁকি গিলতে গিলতে শোনান। ময়মনসিংহের পদ্মরাগ মণি, চিত্রালীর আসরে নজর কাড়া মেয়ে, সগৌরবে চিপাচসের সভায় উপস্থিত থাকলেও আমার আর চন্দনার পক্ষে সম্ভব হয়নি পুরুষমানুষের ভিড়ভাট্টায় ছায়া সুনিবিড় শান্তির মাঠটির শীতল ঘাসে পা ফেলার অনুমতি পাওয়া। পুরুষ- আত্মীয় আর পুরুষ-শিক্ষক ছাড়া অন্য কোনও পুরুষের আড্ডায় বা সভায় আমাদের অবাধ যাতায়াতের কোনও সুযোগ নেই, যতই আমরা যাওয়ার জন্য গোঁ ধরি না কেন।

চিত্রালীতে লেখা ছাপা হওয়ার পর থেকে আমার নামে অবকাশের ঠিকানায় বেশ কয়েকটি চিঠি আসে, পত্রমিতালির আবেদন দেশের বিভিন্ন শহর থেকে। এমন কখনও ঘটেনি, ডাকে কোনও চিঠি আমার জন্য আসেনি আত্মীয় স্বজনের বাইরের কারও, কোনও অচেনা কারও। চিঠি পেয়ে রীতিমত উত্তেজিত আমি। পত্রমিতালি ব্যাপারটি অভিনব একটি ব্যাপার, কেবল চিঠিতে দূরের মানুষদের চেনা, চিনতে চিনতে বন্ধ-ু মত আত্মীয়মত হয়ে যাওয়া। ঢাকা থেকে জুয়েল, সিলেট থেকে সাব্বির, চট্টগ্রাম থেকে শান্তন-ু – পত্রমিতা হওয়ার আমন্ত্রণ জানানোর সঙ্গে সঙ্গে লুফে নিই। মেয়েরা ছেলেরা চমৎকার বন্ধু হতে পারে এই বিশ্বাসটি আমার মনে একটু একটু করে বাসা বাধঁ তে থাকে। আত্মীয়তার বাইরে সম্পর্কের যে ব্যাপারটি আমি দেখেছি, তা প্রেম, ছোটদা আর দাদার জীবনে হয়েছে, রুনুখালা রুনুখালার জীবনেও। প্রেমের উদ্দেশ্য একটিই, বিয়ে। দাদার পক্ষে শীলাকে সম্ভব হয়নি, ছোটদা সম্ভব করে ছেড়েছেন। এর বাইরে ছেলে মেয়েতে কোনও রকম সম্পর্ক আমি আমার চেনা কারও মধ্যে দেখিনি। নাটক উপন্যাসে থাকে, সিনেমার গল্পে থাকে। আমি যে জগতে বাস করি, সে জগতে এর কোনও স্থান নেই। কিন্তু আমার কাছে আসা চিঠিগুলোই এই প্রথম অন্যরকম কিছু ঘটিয়ে ফেলে। পর পুরুষের চিঠি কিন্তু কোনও প্রেমের চিঠি নয়, কারও সঙ্গে আমার কোনও বিয়ের কথা হচ্ছে না, কিন্তু চিঠি। ডাকে আসা পত্রমিতাদের চিঠি বাড়িতে অনেকটা দল বেঁধে পড়া হয়। ডাকপিয়ন যার হাতে চিঠি দিয়ে যায়, সে ই পড়ে প্রথম। তারপর যার চিঠি তাকে দিতে গিয়ে চিঠির কথাগুলোও বলে দেয়, যে দেয়। জুয়েলের একটি চিঠি এল, ইয়াসমিন খামখোলা চিঠিটি আমার হাতে দিতে দিতে বলল, জুয়েল জানতে চাইছে তোমার কার গান পছন্দ, হেমন্তর না কি মান্না দের। সাব্বির পাতার পর পাতা ধর্মের কথা লেখে, ছোট ছোট ধমর্পু স্তিকাও উপহার পাঠায়, তার চিঠি এল তো ছোটদা আমার পড়ার আগে সে চিঠি পড়ে নিয়ে ছুঁড়ে দেন, যা পড়, মুন্সি বেডার চিডি পড়। চিঠি ব্যাপারটি যে ব্যক্তিগত, তা আমার তখনও বোঝা হয়নি। পত্রমিতালির ব্যাপারটি চন্দনাকে সংক্রামিত করেছে পরে, দাদাকেও। দাদা ঢাকার এক মেয়ে সুলতানার সঙ্গে পত্রমিতালি শুরু করলেন হঠাৎ। অদ্ভুত সুন্দর হাতের লেখা সুলতানার। চিঠি এলে দাদা আমাদের সবাইকে ডেকে সুলতানার হাতের লেখা দেখান। কেবল দেখান না, আমাদের সামনে বসিয়ে চিঠি পড়ে শোনান। পড়ে চিঠির উপর হাত বুলোতে বুলোতে বলেন, মেয়েডা নিশ্চয়ই দেখতে খুব সুন্দরী। দাদার বিশ্বাস যার হাতের লেখা এত সুন্দর, যার চিঠির ভাষা এমন কাব্যময়, সে প্যারাগন অব বিউটি না হয়েই যায় না।

চন্দনা চিত্রালী আর পূর্বাণীর বাইরে আরও একটি পত্রিকা পড়তে শুরু করেছে, বিচিত্রা। বিচিত্রার পাঠকের পাতায় ওর একটি লেখাও ছাপা হয়েছে। পুলিশবাহিনীতে মহিলা নেওয়ার খবর শুনে চন্দনা মহিলা পুলিশের পোশাকের একটি প্রস্তাব দিয়েছে, বোরখা, বোরখার তলে থাকলে ধমর্ও থাকল আর চোর ছ্যাঁচড়ের কাজ কর্ম চোখের ফুটো দিয়ে দেখাও গেল, পথচারি কারও পুলিশ বলে সন্দেহও হবে না। বিচিত্রা আবার ওর লেখাটির সঙ্গে এক বোরখাওয়ালির কার্টুন এঁকে দিয়েছে। ইশকুলে যাওয়ার রিক্সাভাড়া থেকে চার আনা ছ আনা বাঁচিয়ে চিত্রালী পূর্বাণী কিনি, বিচিত্রা কেনার পয়সা জোটানো সবসময় সম্ভব হয় না। দাদার কাছে হাত পেতে রাখি। পাতা হাত দেখতে দাদার আনন্দ হয়, কদাচিৎ ফেলেন ওতে কিছু ও দিয়েই নেশাখোরের মত বিচিত্রা কিনে নিই। কিনে নেওয়া মানে ইয়াসমিনকে নয়ত জরির মাকে কালো ফটকের কাছে দাঁড় করিয়ে অথবা নিজেই দাঁড়িয়ে হকার দেখলেই ডেকে কেনা। হকার না এলে ইয়াসমিনকে গাঙ্গিনারপাড় মোড়ে পাঠিয়ে কিনে আনি। ডাঙ্গর হয়েছি বলে রাস্তায় একা হাঁটা আমার বারণ। ইয়াসমিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা এখনও জারি হয়নি, তাই দুঃসময়ে ওরই ওপর ভরসা করতে হয় আমার। পত্রিকা কেনার খরচই তো শুধু নয়, পত্রিকার জন্য লেখা আর পত্রমিতাদের চিঠির উত্তর পাঠাতেও খরচা আছে। ছোটদার হাতে চিঠি দিলে ডাকটিকিটের পয়সাও গুনে গুনে দিতে হয়। দাদার মেজাজ বিগড়ে থাকলে অগত্যা শিশিবোতলকাগজ। অবকাশের গা ঘেঁসে তিনটি রাস্তা চলে গেছে তিন দিকে, একটি গোলপুকুরপাড়ের দিকে, আরেকটি দগুর্াবাড়ির দিকে, আরেকটি গেছে সেরপুকুর পাড়ের দিকে। এই তিন রাস্তায় সকাল থেকে শুরু করে সারাদিনই সুর করে ফেরিঅলা হেঁকে যায়। শাড়িকাপড়অলা, বাদামঅলা, চানাচুরঅলা, আচারঅলা, চুরিফিতাঅলা, আইসক্রিমঅলা, হাওয়াই মিঠাইঅলা, শাকসবজিঅলা, ঘিঅলা, মুরগিঅলা, কবুতরঅলা, হাঁসঅলা, কটকটিঅলা, মুড়িঅলা, শিশিবোতলকাগজঅলা। শিশি-বোতল-কাগজ ডাকটি শুনলেই হাতের কাছে যে ই থাকে পাঠাই দৌড়ে ধরতে ব্যাটাকে। ব্যাটার মাথায় থাকে বড় ঝাঁকা। মাথা থেকে ঝাঁকা নামানোর আগে দরাদরি চলে, কত? পত্রিকা তিন টাকা সের, বইখাতা দুইটাকা। কি কন তিন টাকা! চাইর টাকা কইরা নিলে কন। চাইর টাকা বেশি হইয়া যায়, সাড়ে তিন টাকাই দিয়েন। পাল্লা পাত্থর ঠিক আছে? দেইখা লইয়েন। ঝাঁকা নামিয়ে শিশিবোতলকাগজঅলা বারান্দায় বসলে শোবার ঘরের খাটের তলে রাখা পুরোনো পত্রিকা মায়া কাটিয়ে নিয়ে এসে সামনে দিই। খুঁজে খুঁজে পুরোনো বইখাতাও নিয়ে আসি। বিক্রি করে দশ পনেরো টাকা হয়। দশপনেরোটাকাই নিজেকে রাজা বাদশাহ মনে করার শক্তি যোগায়। ছোটদাও বিক্রি করেন পত্রিকা, মাও করেন পুরোনো শিশিবোতল জমিয়ে রেখে, উঠোন ঝাঁট দিতে গিয়ে পাওয়া ছেঁড়া কাগজের টুকরোও ধুলো ঝেড়ে জমা করে রেখে। ভাঙা শিশি আর ছেঁড়া কাগজ থেকে যে দপু য়সা আয় করেন মা, তা তোশকের তলে রাখেন, অথবা আঁচলের কোণায় বেঁধে যা আমার ছোটদার আর ইয়াসমিনের বিষম হাহাকার থামাতে কোনও এক সময় কাজে লাগে। চন্দনাকে দারিদ্র এমন কষাঘাত করে না, পণ্ডিতপাড়ার একটি সবুজ টিনের ভাড়া বাড়িতে থেকেও চন্দনা দিব্যি পত্রিকার টাকা জুটিয়ে নেয় প্রতি সপ্তাহে। চন্দনা পুরুষভরা টাউনহল প্রাঙ্গনে না যেতে পারুক, কিন্তু বিস্ময়কর কাণ্ডও হঠাৎ হঠাৎ ঘটিয়ে ফেলতে পারে, খুব ভোরবেলা কাকপক্ষী জাগার আগে ও একদিন চলে এল অবকাশে ছোট ভাই সাজুর সাইকেল চালিয়ে। চন্দনাকে দেখে আমার হৃদয়ে খুশি উথলে ওঠে। বাড়ির সবাই হুড়মুড় করে বিছানা ছেড়ে হাঁ হয়ে চন্দনার দিকে তাকিয়ে রইল। কত বড় দুঃসাহসী হলে মেয়ে হয়ে সাইকেল নিয়ে শহরের রাস্তায় বের হতে পারে, সে ভোর হোক কি শুনশান মধ্যরাত হোক—তা অনুমান করে সবাই বিমূঢ় বিস্মিত। চন্দনাকে ভেতরঘরে বসিয়ে দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে চালের রুটি আর মাংস গরম করে এনে মা ওকে পাশে বসিয়ে খাওয়ালেন। নাকে মুখে গুঁজে চন্দনাকে অবশ্য দৌড়োতে হল, রাস্তায় লোক বের হওয়ার আগেই বাড়ি পোঁছতে হবে ওকে। চন্দনা যখন সাইকেলে চড়ে ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়ায় চুল উড়িয়ে চলে যাচ্ছিল, কালো ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে ওর চলে যাওয়ার দিকে আমি মুগ্ধ তাকিয়ে ছিলাম। পৃথিবীতে ওই দৃশ্যের চেয়ে চমৎকার আর কোনও দৃশ্য আমার দেখা হয়নি। যেন সাইকেলে চুল উড়িয়ে চলে যাওয়া মেয়েটি চন্দনা নয়, আমি। আমার ইচ্ছে করে চন্দনার মত সাহসে ভর করে সারা শহর ঘুরে বেড়াতে সাইকেলে।

এমন যখন মন, তখন প্রায় বিকেলের পাট চুকিয়ে প্রতি বিকেলে শামসুল হুদা আসেন আমাকে পড়াতে। হুদার মুখটি কালো ফটকের ধারে কাছে দেখলেই আমার হৃদকম্প শুরু হয়। চমৎকার বিকেল জুড়ে এখন অঙ্ক কর, পদার্থ বিদ্যা ঘাঁটো, রসায়নের পুকুরে হাবুডুবু খাও। ইয়াসমিনকে পড়াতে যখন রবীন্দ্রনাথ দাস আসেন, আমার একরকম আনন্দই হয়। রবীন্দ্রনাথ ইয়াসমিনকে পড়ান পনেরো মিনিট, গল্প করেন পঁয়তাল্লিশ মিনিট। গল্প একা ইয়াসমিনের সঙ্গে করেন না, আমার সঙ্গেও। টাঙ্গাইলের কালিগঞ্জ গ্রামে তাঁর কন্যা কৃষ্ণা বড় হচ্ছে, পুত্র গৌতম বড় হচ্ছে। তিনি ময়মনসিংহ শহরের ছোট বাজারে থাকা খাওয়ার বিনিময়ে নির্মল বসাকের ছেলে গোবিন্দ বসাককে পড়ান। নিজে তিনি শহরতলির এক প্রাইমারি ইশকুলের প্রধান শিক্ষক। প্রধান শিক্ষকের চাকরি করে শহরে টিউশনি করে কালে ভদ্রে তিনি সময় পান দেশের বাড়ি যেতে। ওই কালে ভদ্রেই তিনি খরচার টাকা দিয়ে আসেন বাড়িতে, পরিবারের সঙ্গে কিছুদিন থেকেও আসেন। যতদিন শহরে থাকেন, স্ত্রী পুত্র কন্যার কথাই নিরবধি ভাবেন। আমাদের পাশে বসিয়ে প্রতিদিনই পুত্র কন্যার গল্প করেন, শুনতে শুনতে আমাদের জানা হয়ে যায় কৃষ্ণা দেখতে কেমন, কৃষ্ণা কি খেতে, কি করতে, কি পরতে পছন্দ করে। গৌতম ফুটবল পছন্দ করে নাকি ক্রিকেট, পরীক্ষায় কোন বিষয়ে কত নম্বর পেয়েছে, সব। অবশ্য হঠাৎ বাবা বাড়ি ঢুকলে আমি সরে আসি, রবীন্দ্রনাথ দাসও সচকিত হয়ে বইয়ে মাথা গোঁজেন। ইয়াসমিনের মাথার ঘিলুর পরিমাণ বাবা যখন জানতে চান, দাস মশাই সহাস্য বদনে যা বলেন তা হল, ঘিলু সাধারণের চেয়ে অধিক, তবে পড়াশোনায় মনোযোগটিই সাধারণের চেয়ে স্বল্প। বাবা বলেন, মারবেন। না মারলে ঠিক হবে না। বাবা নিজের হাতে তোশকের তল থেকে এনে দাসমশাইএর হাতে সন্ধি বেত দিয়ে যান। আমার গৃহশিক্ষককেও হাতের কাছে পেলে বলেন, আমাকে যেন পিটিয়ে লম্বা করেন। বাবার এই মত, না পেটালে ছেলেমেয়ে মানুষ হয় না। বাবার উপযর্পু রি অনুরোধের কারণে সম্ভবত শামসুল হুদা আমার পিঠে শক্ত শক্ত চড় কষাতে দ্বিধা করেন না। শামসুল হুদা শিক্ষক হিসেবে ভাল, বিদ্যাময়ী ইশকুলের অংকের শিক্ষক তিনি। বাড়িতে আমাকে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়ান। বাকি বিষয়গুলোর জন্য বিদ্যাময়ীর দুই শিক্ষক জ্ঞানেন্দ্রমোহন বিশ্বাস আর প্রদীপ কুমার পালকে রাখা হয়েছে। প্রদীপ কুমার পালের বাঁ হাতে পাঁচটির জায়গায় ছ টি আঙুল। তাঁর সামনে বসে পড়তে গেলে বইখাতা থেকে বারবারই আমার চোখ চলে যায় ওই বাড়তি আঙুলটিতে। তিনি আবার কবিতা লেখেন, প্রতিদিনই পড়া শেষে আমার একটি কবিতা শোনো বলে শার্টের বুক পকেট থেকে কবিতা লেখা কাগজ বের করে পড়ে কবিতা কেমন লাগল না লাগল জিজ্ঞেস না করে হঠাৎ উঠে চলে যান। গৃহশিক্ষক হিসেবে জ্ঞানেন্দ্রমোহন অবকাশে টিকে গেলেও প্রদীপ কুমার টেকেন না। যে শিক্ষক আমাকে যথেষ্ট কিল চড় ঘুসি লাগাচ্ছেন না, সেই শিক্ষক, বাবার ধারণা, শিক্ষক হিসেবে ভাল নন। শিক্ষক নিয়োগ করতে বাবার যেমন অল্প সময় লাগে, শিক্ষক বিদেয় করতেও। পঞ্চম শ্রেণীতে তিন বিষয়ে লাল দাগ পাওয়ার পর ষষ্ঠ শ্রেণীতে ওঠা যখন সম্ভব হয়নি ইয়াসমিনের, বাবা নিজে ওকে পড়াতে শুরু করেন। ইয়াসমিন ইশকুল থেকে ফিরে আরোগ্য বিতানে চলে যায় বই খাতা নিয়ে। ওখানে বসেই ও দেখে বেতন আনতে বাবার কাছে গৃহশিক্ষকদের ধর্না দেওয়া। বাবা ওঁদের দুতিনঘন্টা খামোকা বসিয়ে রেখে কুড়ি টাকা পঁচিশ টাকা হাতে দেন। মাসের বেতন পঞ্চাশ টাকা, সেটি বাবার কাছ থেকে কোনও গৃহশিক্ষকের পক্ষেই একবারে পাওয়া সম্ভব হয় না। সবসময় তিন চার মাসের টাকা বাকি রাখতে পছন্দ করেন বাবা। শুনে আমার লজ্জা হয় খুব, আমি আমার লজ্জা নিয়ে নুয়ে থাকি। বাবার বরাবরই বড় উন্নত শির, তিলার্ধ লজ্জারও তাকত নেই তাঁর তকতকে তল্লাট তিলমাত্র তছনছ করে। তিনি প্রায়ই আমাকে জানিয়ে দিচ্ছেন, পরীক্ষায় পাঁচটি লেটার নিয়ে তারকাখচিত নম্বর না পেয়ে পাশ না করলে আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবেন। সারা জীবন আমাকে রাস্তায় রাস্তায় ফুটো থালা হাতে নিয়ে ভিক্ষে করতে হবে।

মেট্রিক পরীক্ষা হাতের নাগালে তো বটেই, একেবারে নাকের ডগায় যখন এসে বসে, আমার আর উপায় থাকে না স্থির হওয়া ছাড়া। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে আঠারো ঘন্টা আমি পড়ার টেবিলে। হঠাৎই আমি বাড়ির বহুমূল্যবান মানুষ হয়ে উঠি। হাঁটতে গেলে সবাই সরে দাঁড়িয়ে জায়গা দেয়, পেচ্ছাব পায়খানায় গেলে মা নিজে বদনি ভরে পানি রেখে আসেন। গোসল করার আগেও বালতিতে পানি তোলার কথা বলতে হয় না, তোলাই থাকে। রাত জেগে পড়া তৈরি করতে হচ্ছে, ভাল ভাল খাবার রান্না হচ্ছে আমার জন্য। মা মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন। ফল মূল নিয়ে একটু পর পর বাড়ি আসছেন বাবা, পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন। বাড়িতে পিন পতন নিস্তব্ধতা বিরাজ করে দিন রাত। বাড়ির লোকেরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলে, যেন কোনও শব্দ আমার মগ্নতা নষ্ট না করে। পাড়ায় পুজোর গান শুরু হলে বাবা নিজে গিয়ে পুজো কমিটির চেয়ারম্যানকে বলে আসেন, গান যে করেই হোক বন্ধ করতে হবে, মেয়ের মেট্রিক পরীক্ষা। মেট্রিক পরীক্ষার মূল্য বুঝে দিলীপ ভৌমিকও পুজোর গান বন্ধ করে দেন। নিতান্তই বাজাতে হলে উল্টোদিকে মাইক ঘুরিয়ে বাজান। আমার টেবিলে খোলা বই খোলা খাতার পাশে খোলা বিস্কুটের কৌটো, পড়তে পড়তে ক্ষিধে লাগলেই যেন খাই। মা গরম দধু দিয়ে যান দুবেলা, বলেন, দধু খেলে ব্রেন ভাল থাকে, পড়া মনে থাকে। এ বাড়ির একটি মেয়ে মেট্রিক পরীক্ষা দিচ্ছে, এর চেয়ে বড় খবর, এর চেয়ে জরুরি খবর কিছু নেই আর। দিন যত কাছে আসে তত মনে হয় আজরাইল আসছে জান কবচ করতে। আমার বুক কাঁপে। গা হাত পা কাঁপে। রাত দুটো তিনটেয় আমাকে ঘুম থেকে তুলে বাবা বলেন, চোক্ষে পানি দিয়া পড়তে বস। আমি চোখে পানি ছিটিয়ে বসি। বাবা বলেন,পানিতে কাম না হইলে সরিষার তেল দেও।

প্রথম দিন বাংলা পরীক্ষা, বাংলার জন্য আমার কোনওরকম ভয় হয়নি কখনও আগে, কিন্তু পরীক্ষার দিন মনে হতে থাকে আমার পাশ হবে না। মা প্রতিদিন সকালে ডিম ভাজা খেতে দেন, বলেন ডিম খাওয়া ভাল। কিন্তু পরীক্ষার দিন ডিম খাওয়া চলবে না, ডিম খেলে ডিম জোটে পরীক্ষায়, সুতরাং সাবধান। কলাও চলবে না। কচওু না। পরীক্ষায় কলা পাওয়া কচু পাওয়া রসগোল্লা পাওয়ার মতই। যদিও কলা কচু রসগোল্লা আমার প্রিয় খাবার, কিন্তু পরীক্ষা চলাকালীন এগুলো আমাকে পরিত্যাগ করতেই হয়। আমার পরীক্ষা, অথচ বাবা ছটফট করেন আমার চেয়ে বেশি, আগের রাতে ঘুমোননি একফোঁটা। দেখে মনে হয়, বাবারই আজ পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। বারবার জানতে চাইছেন বইএর আগাগোড়া আমি মখু স্ত করেছি কি না। বাড়ি থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে রাধাসুন্দরী ইশকুল। আমি পথ চিনি, কিন্তু আমাকে একা যেতে দেওয়া হবে না। বাবা আমাকে রাধাসুন্দরীতে নিজে নিয়ে যাবেন রিক্সা দিয়ে, পরীক্ষা শেষ হলে নিজে গিয়ে নিয়ে আসবেন। সকালে মা যখন চুল বেঁধে দিচ্ছিলেন আমার, বাবাই তখন সেটি দিলেন মার হাতে,কাগজটি। কাগজটি ভাঁজ করে সুতো দিয়ে বেঁধে আমার চুলে লাগিয়ে দিতে হবে। কাগজে আরবিতে কিছু লেখা, লেখাটি মাথার ওপর থাকলে বাবাকে কে একজন বলেছেন পড়া মনে থাকে। আমি যেন কিছু ভুলে না যাই পরীক্ষার খাতায় লিখতে গিয়ে, তাই এই কাগজ, কাগজে পড়া মনে থাকার দোয়া। আমি ছিটকে সরে যাই, পড়া ভুলে যাওয়ার কোনও রোগ আমার নেই যে চুলে দোয়া দরুদ লাগিয়ে আমাকে পরীক্ষায় বসতে হবে! মা প্রতিদিনই আমার মাথায় ঠাণ্ডা নারকেল তেল দিচ্ছেন মাথা ঠাণ্ডা থাকার জন্য। সেই তেলে-মাথার তেলে-চুলে দুটো কলাবেণী করে দেন মা, এখন সুতো বাঁধা কাগজটি কেবল চুলের সঙ্গে গিঁট দিয়ে দিলেই হয়। লজ্জায় চোখ ফেটে জল বেরোচ্ছে আমার, তবু বাবা আমাকে ধরে বেঁধে কাগজের পুঁটলিটি আমার চুলে লাগিয়ে দিলেন। দেখে ছোটদা হেসেই বাঁচেন না, ফিকফিক ফিকফিক। ইয়াসমিনও ফিকফিক। ছোটদা বললেন, তর তো মেট্রিক পাশ করা হইব না, তাবিজের গুণে যদি পাশ করস।

হাতে একটি দুটি নয়, চারটে নতুন ঝরনা কলম দিলেন বাবা, আর নতুন একটি পেলিকেন কালির বোতল। লিখতে লিখতে কলমের কালি শেষ হয়ে গেলে কালি ভরে যেন লিখি। পরীক্ষার্থীর মন মেজাজ বুঝে সবাই চলছিল, পরীক্ষার্থী হ্যাঁ বললে হ্যাঁ, না বললে না, কিন্তু তাবিজের ব্যাপারে আমার কোনও না খাটেনি। সেই তাবিজ তেলে মাথায় খলসে মাছের মত ভেসে ওঠে। চন্দনাও রাধাসুন্দরী ইশকুলে পরীক্ষা দিয়েছে। শেষ ঘন্টা পড়ার পর বারান্দায় বেরোতেই দেখি ও দাঁড়িয়ে আছে, ওর খাতা জমা দেওয়া আগেই হয়ে গেছে। পরীক্ষা কেমন হয়েছে ভাল না মন্দ কিছুই না জিজ্ঞেস করে ও জানায়, বিচিত্রায় ওর একটি লেখা ছাপা হয়েছে। এরপরই চক্ষু চড়কগাছ, কি রে মাথায় এইডা কি বানছস?

ধরণী দ্বিধা হও, এ উচ্চারণ জীবনে দ্বিতীয়বারের মত করেছি, ধরণী দ্বিধা হয়নি।

পাশ করলে এমনি পাশ করাম, তাবিজের কারণে পাশ করতাম না। বাড়ি ফিরে চুলের তাবিজ একটানে খুলে ফেলে দিয়ে বলি।

মা বললেন, পড়াডা মনে থাকব।

পড়া আমার এমনি মনে থাকে। দাঁতে দাঁত চেপে বলি। ভেতরে ফোপাঁনো কান্না।

বাবা ধমকে বলেন, এইডা মাথায় আছে বইলা মনে থাকে, নাইলে থাকত না।

আমি অবাক তাকাই, দোয়া দরুদ তাবিজ কবজে বিশ্বাস করা লোকটিকে আমার বিশ্বাস হয় না যে আমার বাবা।

প্রতিটি পরীক্ষার দিন আমার মাথায় ওই তাবিজ লাগিয়ে দেওয়া হয়, আমার কোনও বাধাই টেকে না। মাথা ভরা লজ্জা নিয়ে আমাকে মাথা নত করে প্রতিদিনই যেতে হয় রাধাসুন্দরী ইশকুলে। প্রতিদিনই আমাকে সতর্কে থাকতে হয়, মাথার লজ্জাটি আবার দাঁত কপাটি মেলে প্রকাশিত না হয়ে পড়ে। প্রতিদিনই বারবার মাথায় হাত দিয়ে লজ্জাটি চুলের আড়ালে ঢাকতে হয়। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র থেকে তো বটেই উত্তরপত্র থেকেও বারবার মন মাথায় গিয়ে ওঠে। মাথা আমার জন্য বিশাল একটি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। মাথার লজ্জায় আমি মাথা নত করে পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরি। ইচ্ছে করলে খুলে ফেলে দিতে পারি, কিন্তু আবার ভয়ও হয়, যদি সত্যিই স্মৃতিশক্তি লোপ পায় আমার! যদি পাঁচ আর সাত যোগ করলে যে বারো হয়, এই সহজ জিনিসটি ভুলে যাই অঙ্ক পরীক্ষার দিন! যদি ইংরেজি পরীক্ষার দিন গরুর রচনা লিখতে গিয়ে প্রথম বাক্যটিই আর মনে না করতে পারি, দ্যা কাউ ইজ এ ডমেস্টিক অ্যানিম্যাল !

০৩. তা তা থৈ থৈ

অবকাশে ছোটদার সস্ত্রীক প্রবেশ আমার পরীক্ষার আগেই ঘটেছে। ঘটেছে মার কারণে। পুত্রশোকে যখন তিনি যারপরনাই কাতর,বাবার কাছে আবেদন নিবেদন করে ব্যথর্ হয়ে অতঃপর নিজেই হাশেমমামাকে পাঠিয়ে ছোটদা আর তাঁর বউকে ইসলামপুরের কোন এক গ্রামের কোনও এক কুড়েঘর থেকে শহরে আনলেন। কিন্তু শহরে এসে পৌঁছোনোর মানে এই নয় যে ওরা অবকাশে ঢোকার কোনওরকম অনুমতি পাবে। বাবা সোজা বলে দিলেন, কস্মিনকালেও যেন অবকাশমুখো না হয় ওরা। নানিকে বলে কয়ে নানির উঠোনে কুয়োতলার পাশে একটি ঘর, যে ঘরটি এককালে আমাদের খাবার ঘর ছিল, পয়পরিষ্কার করে একটি চৌকি পেতে দেওয়া হল ওদের থাকার জন্য। ছোটদা বউ নিয়ে ওখানে থাকতে শুরু করার পর বাবার আদেশে নানির বাড়ি বেড়াতে যাওয়া অন্তত আমার আর ইয়াসমিনের জন্য বন্ধ হয়। মা কিন্তু নিয়মিত ছোটদার সংসারে যেতে লাগলেন। মা তো আর খালি হাতে যান না, পুত্রধনের জন্য চাল ডাল আনাজপাতি অবকাশ থেকে যা যোগাড় করতে পারেন নিয়ে যান। বাবা যখন বাড়ি থাকেন না, ছোটদা ঢুঁ মারেন অবকাশে। ঢুঁ অবশ্য অহেতুক মারেন না, প্রয়োজন হলেই। বাবার নিষ্ঠুরতার কথা মা ভাবেন আর বলেন, এই মানুষটা মানুষ নাকি পাথর? মার অক্লান্ত সাধ্য সাধনার পর বাবাকে খানিক নরম করে মা একদিন অন্তত এইটুকু রাজি করালেন যে ছোটদা বউ নিয়ে অবকাশে ঢুকবেন কিন্তু কোণের একটি ছোট ঘরে ওরা বাস করবেন,সারা বাড়িতে অবাধ পদচারণার কোনও অধিকার ওদের থাকবে না। বিয়ে যখন করেইছো, বউ যখন আর ছাড়বেই না মনস্থ করেছো, যদিও এ বয়সে বিয়ে করার কোনও যুক্তি নেই, পেটালে গাধাও মানুষ হয়, তুমি হওনি—এখন দেখ লেখাপড়া শেষ করে ভবিষ্যতে ডাল ভাতের যোগাড় করার ব্যবস্থা করতে পারো কি না, এরকম ভেবেই বাবার রাজি হওয়া। মা ওঁদের জন্য দাদার ঘরের পেছনে একটি ছোট ঘর যে ঘরে মা নিজে থাকতেন গুছিয়ে দিলেন, কাপড় চোপড় রাখার একটি আলনা দাদার ঘরের সঙ্গে লাগোয়া দরজাটি বন্ধ করে দরজার সামনে রাখলেন। ছোটদার পুরোনো খাটটি দাদার ঘর থেকে এনে ছোটঘরে পাতা হল। ছোটদা বললেন আয়নার টেবিলটি তাঁর ঘরে যে করেই হোক নিতে হবে। মার বিয়ের সময় খাট পালঙ্ক ইত্যাদির সঙ্গে নানা এই টেবিলটি মাকে উপহার দিয়েছিলেন। কাঠের ফুল পাতার নকশাঅলা বহিরাবরণ, অন্তস্তলের আয়নাটি সামনে পেছনে দোল খায় নাড়লে, দুপাশে ছোট দুটো তাক, দুটো ড্রয়ার—সিংহি সিংহি এই চারপেয়ে টেবিলটি বাবার ঘর থেকে নিজে টেনে ছোটঘরে দিয়ে এলেন মা। আঁচলে মুছে দিলেন আয়নায় জমা ধুলো। গীতা টেবিলের সামনে বসে ঘন্টা খরচ করে সেজে ছোটদার সঙ্গে প্রায় বিকেলে বাইরে যান। ওঁদের বাইরে যাওয়ার দিকে আমি তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে থাকি। এরকম আমিও যদি যেতে পারতাম!

যদিও বাবা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন ছোটদা আর তাঁর বউএর মখু দর্শন তিনি করবেন না, কিন্তু ওরা অবকাশে পাকাপাকি বসত শুরু করার ঠিক দুদিন পর সকালে গোসল সেরে সার্টপ্যাণ্টজুতোটাই পরে, সর্ষের তেলে চোবানো মাথাভর্তি কোঁকড়া চুলগুলো আঁচড়ে বৈঠকঘরে পায়ের ওপর পা তুলে বসলেন, বসে ডাকলেন আমাকে। বাবা ডাকছেন, এর অর্থ বাড়ির যেখানেই থাকো না তুমি, যে কাজই কর না, পড়ি কি মরি ছুটে আসতেই হবে। বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বললেন, ওই দুইটারে ডাক। ওই দুইটা কোন দুইটা? এই প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল আমার, করিনি। বাবা যেহেতু আদেশ দিয়েছেন, আমাকে বুঝে নিতে হবে ওই দুইটা বাড়ির কোন দুইটা। কারণ এ আমার, কেবল আমার কেন, বাড়ির সবারই জানতে হবে বাড়ির কোন দুইটা কে এ সময় বাবা ডাকতে পারেন। ছোটদার ঘরে ঢুকে চাপা স্বরে বললাম, যাও, ডাক পড়ছে, একজনের না কিন্তু, দুইজনের। ছোটদার মখু মুহূর্তে বিবণর্ হয়ে উঠল, ধড়মড়িয়ে বিছানা ছেড়ে লুঙ্গির গিঁট বাধঁতে বাধঁতে।

গীতাকে ,গীতা বিমূঢ় বসা বিছানায়, সঙ্গে আসার অনুরোধ করতে করতে একবার দরজার কাছে, আবার ফিরে বিছানার ধারে, হাঁটছিলেন। “নাসরিন”—বিকট শব্দে দ্বিতীয় ডাকটি এল বৈঠক ঘর থেকে, এর অর্থ হল ওই দুইটার এত দেরি হচ্ছে কেন! অবশেষে, দুজন যখন বড় হিম্মতের সঙ্গে নিজেদের হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে সাক্ষাৎ হুতাশনের সামনে দাঁড় করালো, দরজার ফাঁকে চোখ কান নাক সব পেতে থাকলাম। গীতা উবু হয়ে বাবার পা ছুঁয়ে কদমবুসি করল। হিন্দু মেয়ের কদমবুসি, প্রণামের মতই, গীতার জন্য নতুন কিছু নয়। বাবা কেশে গলা পরিষ্কার করে, যদিও পরিষ্কারই ছিল গলা, এমন কোনও জমা কফ ছিল না গলায়, বললেন ছোটদার দিকে যতটা সম্ভব চোখ রঙিন করা সম্ভব,করে, জীবন কিরম বুঝতাছ? বিয়া করছ,লেখাপড়া চাঙ্গে উঠছে, গঞ্জে গিয়া সংসার করছ, একশ টাকা মাস চাকরি করছ, কী চাকরিডা করছ শুনি? কুলিগিরি। ঠিক না? কুলিগিরি ছাড়া তুমার ওই বিদ্যায় আর কি পাইবা! নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারছ। তাতে কার কি ক্ষতি হইছে? আমার কিছু হইছে? আমার কিচ্ছু হয় নাই। হইছে তুমার। পাগলেও নিজের বুঝ বুঝে, তুমি বুঝ নাই। পাগলের কাছে গিয়া দেখ তার টাকা যদি নিতে চাস, দিবে? দিবে না। তার খাবার যদি নিতে চাস, দিবে? দিবে না।

বাবা খানিক থেমে, বুঝি না অপেক্ষা করে কি না মূর্তিমান দুইটার মখু থেকে নিদেনপক্ষে কোনও শব্দের, বলেন, আনন্দমোহনে ভর্তি হইয়া আয়, ইন্টারমিডিয়েটে তো থার্ড ডিভিশন পাইছস, চান্স তো পাইবি না কিছুতেই, তবু দেখ চেষ্টা কইরা। যাওয়ার সময় আমার চেম্বার থেইকা টাকা লইয়া যা। বাবা এবার গীতার দিকে চোখ নাক দাঁত সব কুঞ্চিত করে বলেন, কি ভাইবা এই কাজটা করছ? নিজের ভবিষ্যতের কথা তুমিও ভাব নাই? গীতার চোখদুটো দেখা যাচ্ছে না যেহেতু মেঝের দিকে চোখ, চুলের ডালি দৃশ্যমান নয় যেহেতু আঁচলে আবৃত মাথা, ঠোঁট এমনিতেই গীতার ছোট, ছোট মুখের ছোট ঠোঁট আরও ছোট হয়ে আছে। এবারও খানিক থেমে, কফ নেই তবু ঝেড়ে,বাবা বলেন গীতা, আমার মেয়ে দুইটার লেখাপড়া আছে, ওদের সাথে আড্ডা দিতে যেন না দেখি। কথা বুঝছ? গীতা মাথা নাড়ে, বুঝেছে সে। বাবা সশব্দে উঠে আমার ঘরের লাগোয়া ওদের দরজাটি সশব্দে বন্ধ করে ভেতর বারান্দার দিকের দরজা সশব্দে খুলে যাওয়া আসা এ দরজা দিয়েই করার আদেশ দিয়ে সশব্দেই বেরিয়ে গেলেন। আদেশ মানা ছাড়া আর উপায় নেই ছোটদার। তিনি বাংলা অনাসের্ আনন্দমোহনে ভর্তি হয়ে বাড়ি ফিরলেন। বাবা তাঁর বাংলায় ভর্তি হওয়ার ঘটনাটি শুনে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ঝুলিয়ে সাতদিন কাটালেন আর বলে বেড়ালেন বাংলায় পইড়া কয়ডা বেডা মানুষ হইছে? বাংলা বিশারদেরা বড়জোর বুদ্ধি কইরা গরুর গাড়ি চালাইতে পারে, আর কিছু না। ওই বলাটুকুই, অনেকটা হাল ছেড়ে দেওয়া বাবা ছোটদাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে বিজ্ঞানের কোনও বিষয়ে ভর্তি করিয়ে আনেন না। ছোটদা নিরাপদে তাঁর বিবাহিত জীবন কাটাতে থাকেন অবকাশে। মাঝে মাঝে হাতে একটি খাতা আর পকেটে একটি ঝরনা কলম ঢুকিয়ে কলেজে যান, বিমর্ষ মুখে বাড়ি ফেরেন।

বাবার কড়া নিষেধের পরও গীতার সঙ্গে আমার আর ইয়াসমিনের সখ্য বেড়ে ওঠে। বড়রা বাড়িতে কেউ না থাকলে সাধারণত আমিই হতাম দুষ্টের শিরোমণি লংকার রাজা। মাঠে খেলতে নামা, ছাদে উঠে বিশ্ব দেখা, বিশ্ব বলতে রাস্তার বারো রকম লোক আর প্রতিবেশিদের ঘরবাড়িউঠোন, তুলসীতলা, সন্ধেধপূ , মন্দিরা বাজিয়ে কীর্তন গাওয়া, ভাড়া করা ব্যান্ড পার্টির সামনে এক প্যাঁচে রঙিন শাড়ি পরে কাঁসার লোটা হাতে মিছিল করে ব্রহ্মপুত্রের দিকে যাওয়া, গঙ্গার জল মনে করে ব্রহ্মপুত্রের ঘোলা জল দিয়ে বাড়ির পবিত্র উৎসব সারা দেখা, নয়ত অপাঠ্য পড়া। গীতা আমার রাজত্ব এক তুড়িতে দখল করে আমাকে ছাড়িয়ে মাড়িয়ে তরতর করে উঠে যায় কাঁঠাল গাছে, ডালে বসে কাঁঠালের মুচি খায়, আমি নিচ থেকে বাঁশের কঞ্চির আগায় কাপড়ের পুঁটলিতে নুন আর লংকাগুঁড়ো বেঁধে ওর নাগালে দিই। আতা গাছে লাফিয়ে ওঠে। বেল গাছেও। সবরি গাছে উঠতে পারবা? পারমু না মানে? শাড়ি পরেই সবরি গাছ বেয়ে একেবারে মগডালে গিয়ে বসে, নাগালের পেয়ারাগুলো মগডালে বসেই খায়। পাড়ার লোক রাস্তা থেকে গাছে ওঠা বাড়ির নতুন বউকে দেখে। গীতার দস্যিপনা আমাদের হাঁ করা মগ্ধু তা দেয়। আমরা ওর পেছনে লেজের মত লেগে থাকি। গাছে চড়ার কোনও বিদ্যে আমার ছিল না, গীতার কাছে হাতেখড়ি হয়। গীতার কাছে হাতেখড়ি হয় আরও অনেক কিছুর। হাতেখড়ি, পায়েখড়ি, বুকেখড়ি, পেটেখড়ি, পিঠেখড়ি—খড়ির শেষ নেই। উঠোনের খড়িগুলো গীতার প্রেরণায় ছুঁড়ে আর ছিঁড়েই ফুরোতে লাগল। বৃষ্টি হলে আমাদের পুরোনো অভ্যেস, উঠোনে মাঠে দৌড়ে দৌড়ে বৃষ্টিতে ভেজা, সিঁড়ি বেয়ে ছাদে গিয়ে ভিজে ভিজে রাজ্যির নাচ নাচা। গীতা বৃষ্টিতে দৌড়ে আর নেচে তুষ্ট হয় না, কাকভেজা হয়ে চৌচালা টিনের ঘরের মাথায় উঠে বসে থাকে। আমি বারান্দায় বসে দেখছিলাম যেদিন পড়ল ও, কালো ফটকের শব্দ শুনে তড়িঘড়ি নামতে গিয়ে পড়ল তো পড়ল একেবারে ভাঙা ইট ফেলা উঠোনে, ভেজা চাল থেকে পা পিছলে, বোঁটা ছিঁড়ে যাওয়া পাকা চাল কুমড়োর মত গড়িয়ে। ইয়াসমিন চালের মাথায়,গীতার পড়ে যাওয়া দেখে হাসব না কাঁদব বুঝে উঠতে না পারা আমি বড় ঘরের বারান্দায়, ফ্যাকাসে মুখে ভিজে চপু সে থাকা শাড়ি গায়ে উঠোনে বসে থাকা গীতা আর এর মধ্যে মা এসে ভিজে বোরখা খুলে বারান্দার দড়িতে ঝুলিয়ে খোয়ার ওপর বসে থাকা বাড়ির বউকে দেখে অবাক, আফরোজা তুমি ওইখানে কি কর! গীতা বলল, না মা কিছু করি না, ইয়াসমিন চালে উঠছে তো, এইখানে বইসা বইসা ওরে দেখতাছি।

ইয়াসমিন চালে উঠছে?

হ ওইযে দেখেন বইসা রইছে। কত কইলাম উইঠ না, পইড়া যাইবা, শুনল না। ইয়াসমিন মার ধমক খেয়ে নেমে আসে চালের চুড়ো থেকে আর ভাজা মাছটি উল্টো খেতে না জানা, অত উঁচু চাল থেকে পড়ে হাড় না ভাঙা, সামান্য আঁচড় না লাগা গীতা গোসলখানায় যায় শাড়ি পাল্টাতে। মা খিচুড়ি রেঁধে গীতার পাতে ঢেলে দুপুরবেলা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, মেয়ে দুইটারে তুমি দেইখা রাখতাছ বইলা আমি নিশ্চিন্তে একটু নওমহল গিয়া কোরান হাদিস শুনতে পারি। গীতা বলল, মা আপনে কোনও চিন্তা কইরেন না, আমি এদেরে ঠিক দেইখা রাখতাছি, খেয়াল রাখি কোনও দুষ্টামি যেন না করে। গীতার পাতে দুটোর জায়গায় তিনটে মাংসের টুকরো দিলেন মা, পাতের কিনারে আমের আচার। গীতা খেতে খেতে বলল, মাংসটা দারুন রানছেন মা। আর আচার যে কেমনে এত ভাল বানান আপনে! মা আরও মাংস, আরও আচার ওর পাতে ঢেলে বিষম উৎসাহে বলে যান, তুমারে আচার বানানোটা শিখাইয়া দিব। একেবারে সোজা, আমটা ফালি ফালি কইরা কাইটা বয়মের মধ্যে সরিষার তেল, কিছু রসুনের কোয়া, আর কিছু শুকনা মরিচ দিয়া ডুবাইয়া রাখবা। মাঝে মাঝে রোদ্রে দিবা বয়াম। গীতা বিস্ফারিত চোখ করে বলে তাই নাকি! যে কোনও কিছুতেই গীতা আকাশ থেকে পড়ে। ছোটদার বাচপুানকা দোস্ত খোকন এলেন ঢাকা থেকে, বৈঠক ঘরে বসে আছেন, খবরটি দিলে চোখ কপালে তুলে বলল সে, খোকনভাই আইছে? কখন? কেমনে? হায় হায় কামাল তো নাই। খোকন এমন আচমকা এসে উপস্থিত হয়েছে যে গীতার বিস্ময়ের সীমা নেই, অথচ বৈঠকঘরে গিয়ে মিষ্টি হেসে খোকনকে বলল আরে আপনের জন্যই তো অপেক্ষা করতেছিলাম, কামাল বলে গেছে আপনেরে বসতে, এই তো কাছেই গেছে,এখনি ফিরবে। গীতাকে দুধের বাচ্চার মত দেখতেও লাগে, শুনতেও লাগে। কালো মখু টিতে বড় বড় চোখ, এই চোখকে কেউ কেউ বলবে পটল চেরা চোখ, মাথায় অতিঘন চুলের বোঝা, টিয়ার ঠোঁটের মত ধারালো নাক, আফ্রোদিতির ঠোঁটের মত ঠোঁট, অত দূর না গিয়ে লংকা চেরা ঠোঁটই বা নয় কেন, ইঁদুরের দাঁতের মত দাঁত, সারসের গলার মত সরু গলা। ছোট ছোট হাত, ছোট ছোট পা, ছোট শরীর। কালো মেয়েকে লোকে সুন্দরী বলে না, কিন্তু গীতাকে পৃথিবীর সেরা সুন্দরী বলে আমাদের মনে হতে থাকে।

পাড়ায় পুজোর ঢাকের বাজনা শুরু হয়ে গেলে দুধের বাচ্চাকে ফিসফিস করে বলি,আজকে দূর্গা পুজা। আকাশ থেকে পড়ে গীতা, তাই নাকি? জানি না তো! জিভে চুকচুক শব্দ করে ওর জন্য দুঃখ করি, মুসলমানের ঘরে বিয়ে হওয়াতে ওর আর পুজোর আনন্দ করা হচ্ছে না। আমরা যেমন বারো মাসের তেরো পুজোতেই পাড়ার মণ্ডপ দেখে বেড়াতে পারি, অষ্টমি আর রথের মেলায় চিনির খেলনা আর বিন্নি ধানের খই কিনতে পারি—হিন্দু থেকে মুসলমান হওয়াতে গীতার পক্ষে এসব আর সম্ভব হবে না জেনে দুঃখ আমাদের শেষ হয় না, ছোটদা ছুটে আসেন বলতে বলতে দেরি হয়ে গেল গীতা, তাড়াতাড়ি শাড়িটা পইরা ফালাও।

কোন শাড়িটা? গীতা অবাক হয়ে বলে।

কালকে যে কিইন্যা আনলাম, সেইটা।

কালকে কিইন্যা আনলা? কোনটা?

আরে তোমার পূজার শাড়ি!

পূজার শাড়ি মানে? এইসব কি বল!

আমার উপস্থিতি আড়চোখে লক্ষ্য করে ছোটদা অপ্রস্তুত হেসে বলেন, ওই যে একটা নীল শাড়ি আছে না, তুমার মা যে দিছিল, সেইটা পর।

সেইটা বল। সেইটা না বইলা কেন বল যে তুমি কিন্যা আনছ? তোমার কি টাকা পয়সা আছে নাকি যে কিনবা! এক পয়সার মুরদ নাই আবার বড় বড় কথা!

তাড়াতাড়ি কর। দেরি হইয়া গেল।

কিসের দেরি? কই যাইবা?

বাবুয়ার বাসায় আমাদের দাওয়াত আছে, ভুইলা গেছ?

গীতাকে নীলাম্বরি পরী সাজিয়ে নিয়ে ছোটদা বেরোন। এরকম প্রায়ই বেরোন। পুরোনো বন্ধুর বাড়ি, চিপাচস-সদস্যদের বাড়ি, গোলপুকুর পাড়ে আড্ডা দিতে গিয়ে নতুন গজিয়ে ওঠা বন্ধুদের বাড়ি,কেবল বাড়ি বাড়ি ঘুরেই সময় কাটান তা নয়, নানান অনুষ্ঠানেও আনন্দ করে আসেন, গানের অনুষ্ঠান, নাচের অনুষ্ঠান, নাটক, সিনেমা, পারলে যাত্রাও বাদ দেন না। দেখে আমার চোখজিভ সব সচল সজল। ছোটদা নিজের গিটারখানা বিক্রি করে দিয়েছেন, শহরের ভাল গিটারবাজিয়ে হিসেবে যে নাম ছিল, সে নাম যে তুলোর মত হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে, সে দিকে তিনি বড় একটা ফিরে তাকান না। বউ নিয়ে তিনি বাপের হোটেলে থাকছেন খাচ্ছেন, কিন্তু থাকা খাওয়ার বাইরে আরও একটি জীবন আছে, সেই জীবনের জন্য হন্যে হয়ে একটি চাকরির খোঁজ করেন তিনি।

পুজোর পর ইশকুল থেকে ফিরে আমাকে গোপনে একটি খবর দেয় ইয়াসমিন, তার ইস্কুলের এক বান্ধবী দেখেছে পুজোর দিন পিওনপাড়ায় গীতার বাড়িতে সন্ধেবেলা ঢুকছে গীতা, পেছনে ছোটদা। ছোটদাকে ঘটনা জানালে তিনি আমাকে সাবধান করে দেন যেন কাক পক্ষী না জানে এই খবর। কাক পক্ষী জানে নি। কাক পক্ষী এও জানে না যে বাবা গোসলখানায় ঢুকলে প্রায়ই সকালে বেড়াল-পায়ে বাবার ঘরে ঢুকে যেন ও ঘরে কিছু একটা ফেলে এসেছেন ফেরত আনতে যাচ্ছেন অথবা বাবার সঙ্গে এক্ষুণি তাঁর জরুরি বৈঠক আছে এমন ত্রস্ত অথচ শান্ত ভাব মুখে, আলনায় ঝুলে থাকা প্যাণ্টের পকেট থেকে আলগোছে তুলে নিয়ে আসেন দশ টাকা হলে দশ টাকা, কুড়ি টাকা হলে কুড়ি টাকা, পঞ্চাশে হাত দিতেও হাত কাঁপে না ছোটদার। মা দেখেন এসব, দেখেও না দেখার ভান করেন। ছোটদার বুকের পাটা দেখে ভয়ে বুক কাঁপে আমার। ধরা পড়লে ঘটনা কি দাঁড়াবে তা অনুমান করতে যে সাহস প্রয়োজন হয়, তা আমার বা ইয়াসমিনের কারওরই নেই।

গেছো গীতা কেবল গাছেই নয়, গাছের তলেও লাফায়। নাচ শেখাবে বলে পড়ার টেবিল থেকে আমাকে আর ইয়াসমিনকে উঠিয়ে নিয়ে সারা বাড়িতে তা তা থৈ থৈ করে বেড়ায়। আমি আর ইয়াসমিন খুব অচিরে বড় নৃত্যশিল্পী হয়ে উঠছি এই বিশ্বাস আমার বা ইয়াসমিনের না থাকলেও গীতার আছে। বাবার বাড়ি আসার শব্দ পেলে নাচ রেখে দৌড়ে পড়ি কি মরি পড়ার টেবিলে গিয়ে বসি, বাবার গায়ে হাওয়া লাগে ছুটোছুটির। প্রায় রাতেই ঘুমোতে যাবার আগে আমাকে ডাকেন, ঠাণ্ডা গলায় জিজ্ঞেস করেন, খাওয়া দাওয়া হইছে?

দরজার পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে উত্তর দিই, হইছে।

পড়ালেখা হইছে?

হইছে।

খেলাধুলা হইছে?

প্রায় ঠোঁটের কাছে হইছে শব্দটি এসে যাচ্ছিল, গিলে অন্য এক শব্দজোড়া ব্যবহার করি, হয় নাই।

আড্ডা মারা হইছে?

হয় নাই।

বাবা বিস্ময় চোখে তাকিয়ে বলেন, কেন হয় নাই?

শব্দজোড়া দূরে থাক, কোনও শব্দই তখন আমার মুখে নেই।

কেন হয় নাই আড্ডা মারা? বাড়িতে তো এখন সঙ্গী সাথীর অভাব নাই।

আমি দরজার পর্দা আঙুলে পেঁচাতে থাকি।

বাবা বলেন আড্ডা মারা তো ভাল, পড়ালেখা করতে হয় না, পরীক্ষায় পাশ করতে হয় না। দেখ না তোমার ছোটদা, কত সুন্দর জীবন তার! লেখাপড়ার মত বাজে কাজ তার আর করতে হয় না।

আঙুল থেকে দরজার পর্দা ছাড়াতে থাকি।

কাল সকালে যখন আমি বাইরে যাব, তখন তুমি গপ্প মারতে বসবা, বুঝলা! আমি বাড়ি ফিরা পর্যন্ত গপ্প মারতেই থাকবা, বুঝলা কি কইলাম?

সাধারণত বাবা যখন কিছু বোঝান, মাথা নেড়ে বলতে হয় বুঝলাম। কিন্তু এখন বুঝলাম বলাটা যে বিপজ্জনক সে বেশ বুঝি।

বাবার ভয় গীতার সঙ্গে সখ্য পেতে এই বুঝি আমাদের লেখাপড়ার বারোটা বাজল। আমার ঘরের লাগায়ো ছোটদার ঘরের দরজায় তিনি তালা লাগিয়ে দিয়েছেন, যাওয়া আসা ওরা বারান্দার দরজা দিয়ে করছে কিন্তু ছোটদার দোস্ত খোকন যে রাতে থেকে গেলেন বাড়িতে, শুলেন ছোটদার বিছানায়, অগত্যা গীতাকে শুতে হল আমার বিছানায়, এক রাতের ব্যাপার এ আর এমন কি, এমন কি আমাদের কাছে হলেও বাবার কাছে নয়, তিনি গভীর রাতে পানি খেতে উঠে এ ঘর ও ঘর পায়চারি করতে গিয়ে গীতাকে আমার বিছানায় আবিষ্কার করে চিবিয়ে চেঁচিয়ে হুংকারে গর্জনে নিঝুম রাতকে গনগনে দুপুর বানিয়ে ছাড়লেন। ছোটদা আর খোকনের সঙ্গে এক বিছানায় বাকি রাত কাটাতে হল গীতার। বাবা গীতাকে আমাদের আশপাশ থেকে দূর দূর করে তাড়ালেও তার প্রতি আমাদের আকর্ষণ দূর হয় না, বরং বাড়ে। তার মুখে হাসি ফোটাতে পড়াশোনা মাচায় তুলে তার সেবায় সদা সর্বদা নিয়োজিত থাকি। জুতো চাইলে জুতো এগিয়ে দিই, চিরুনি চাইলে চিরুনি,পানি চাইলে পানি, গীতা পানির গেলাস ভেঙে ফেললে মাকে বলি আমার হাত লেগে গেলাস ভেঙেছে। গীতাকে আরও দোষ থেকে মুক্ত করি, বিকেলবেলা আমাদের ছাদে ডেকে নিয়ে বিজয়দিবসের মোমবাতি জ্বেলে রেলিংএ, রেলিংএর ওপর দিব্যি সার্কাসের মেয়ের মত হেঁটে যায়, একটু হেলে পড়লেই পড়ে গিয়ে মাথা নিশ্চিত থেতলে যাবে জেনেও সে হাঁটে, আমাদেরও উসকানি দেয় হাঁটতে। রেলিংএ লম্বা হয়ে শুয়ে ব্লাউজের ভেতর হাত দিয়ে এক শলা সিগারেট আর একটি ম্যাচবাক্স বের করে আমাদের অবাক করে দিয়ে সিগারেটে আগুন জ্বেলে টান দেয়, রাস্তার মানুষেরা হাঁ হয়ে দেখে এসব। গীতা বলে, দেখুক, আমার কী! আমার ইচ্ছা আমি সিগারেট খাইয়াম। কার কী কওয়ার আছে! এ বাড়িতে কেউ সিগারেট ফোঁকে না, কোনও পুরুষ আত্মীয়কেই আমি সিগারেট ফুঁকতে দেখিনি, সেখানে মেয়ে হয়ে রাস্তার আর পাড়ার লোককে দেখিয়ে বাড়ির নতুন বউ ছাদের রেলিংএ শুয়ে সিগারেট ফুঁকবে, বাবার কানে গেলে সর্বনাশ তো হবেই, সর্বনাশের সীমাছাড়া রূপটির কথা ভেবে আমার হিম হয়ে আসে শরীর। গীতা বলে, আরে কিচ্ছু হইব না, টান দেও ত! আমার কাপাঁ কণ্ঠ, বাবা জানলে মাইরা ফেলব! গীতা পরোয়া করে না বাবা জানলে কী হবে না হবে সেসবকে। কি করে সিগারেটে টান দিতে হয় শিখিয়ে দেয়। মখু গহ্বরে ধোঁয়া ঢুকিয়েই ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিই নীলাকাশ ঢেকে দেওয়া ধোঁয়া ধোঁয়া মেঘের দিকে। হিম শরীরে অল্প অল্প করে পুলকি উষ্ণতা। অদ্ভুত এক আকর্ষণ অনুভব করি নিষিদ্ধ জিনিসে। সিগারেট কোত্থেকা পাইছ? গীতা বলে,পাইছি। পাইছি, এর বেশি কিছু সে বলে না,ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ঝুলিয়ে রাখে শুধু সিগারেটের আর রহস্যের ধোঁয়ায় গীতাকে দেবী দুর্গার মত মনে হয়। ছাদ থেকে নেমে কুলকুচা করে ধোঁয়ার গন্ধ দূর করে ধোয়া মুখে কুলপু এটেঁ বসে থাকি। সংসারের এসব ছোট ছোট ঘটনাদুর্ঘটনায় গীতাকেই যে শুধু বাঁচিয়ে দিই, তা নয়, ছোটদাকেও বাঁচাই। ছোটদা অভাবের তাড়নায় আনন্দমোহন কলেজের দিকে যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দুশ টাকা বেতনে সাপ্তাহিক বাংলার দপর্ণ পত্রিকায় সাংবাদিকের কাজ নিয়েছেন, এতেও তাঁর অভাব ঘোচে না। প্রতিদিনই নাকি সুরে খাকি স্বরে বলতে থাকেন দে না পাঁচটা টাকা দে না, পাঁচ টাকা নাই, তাইলে চারটাকা দে, চারটাকা তো নাই, ঠিক আছে তিন টাকাই দে। তিন টাকা না হলে দুটাকাই। দুটাকা না হলে একটাকা। তাও না হলে আটআনা, চারআনাও ছোটদা ছাড়েন না। চিলের ছোঁ দিতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। দাদার ওষুধের বাক্স থেকেও গোপনে ওষধু সরিয়ে নিয়ে যান ছোটদা। আমরা তা জেনেও, পেটের ভেতর গুঁড়োক্রিমির মত লালন করি ঘটনা। দাদা সকালে গোসলখানায় যান, দাদার গোসলখানায় যাওয়া মানে পেচ্ছাব পায়খানা দাড়িকামানো গোসল সব সেরে আসতে ঘন্টা পার হওয়া, নিশ্চিন্তে দাদার পকেট থেকে তখন আলগোছে টাকা তুলে নেন ছোটদা। বাবার পকেট থেকে টাকা নিতে গেলে বড় একটি ঝুঁকি নেওয়া হয়, কারণ বাবা এত দ্রুত গোসল সারেন যে হুট করে কখন বেরিয়ে আসবেন ঠিক নেই, আর গোসলখানার দরজার মুখেই বাবার ঘর। সে তুলনায় দাদার ঘর অনেকটাই দূরে, বারান্দা পেরোও, দুটো ঘর পেরোও তারপর। ছোটদার প্রয়োজন কিছুতে ফুরোয় না। বেলগাছের তল দিয়ে বেলের গাছপাতা মাটিপাতাও যেন না জানতে পারে এমন নিঃশব্দে হেঁটে পাঞ্জাবি বা ঢিলে শার্টের তলে নয়ত বড় ঠোঙায় নয়ত বাজারের থলেয় ওষুধ নিয়ে সনপ্তর্ ণে কালো ফটক খুলে বেরিয়ে যান ছোটদা। প্রথম প্রথম বলতেন ওষধু তাঁর নিজের দরকার, তাঁর শরীরে অসুখের সীমা নেই। কিন্তু বাড়ির বাইরে ওষধু নেওয়া দেখে যখন প্রশ্ন করি, কই নিয়া যাও ওষুধ? ছোটদার উদাসীন উত্তর বন্ধু বান্ধবরা চায়। ভিটামিন চায়।

ভিটামিনে বেশিদিন পড়ে থাকেন না ছোটদা। কাশির ওষধু , জ্বরের ওষুধ, এমনকি কঠিন কঠিন রোগের কঠিন কঠিন ওষধু সরাতে শুরু করলেন। কেন? বন্ধুরা চাইছে। কেন? বন্ধুরা ওষুধ চাইছে, কারও কাশি কারও জ্বর কারও পেটের ব্যারাম, কারও আলসার। কিন্তু বন্ধুদের কি অসখু লেগেই থাকে বছরভর!

আমার কি একটা দুইটা বন্ধু নাকি!

তা ঠিক, ছোটদার বন্ধুর সীমা নেই। বাড়িতে ছোটদার খোঁজে সাংবাদিক বন্ধু কবি বন্ধু নাট্যকার বন্ধু, চিপাচস বন্ধু ছাত্র, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, বেকার—নানা রকম বন্ধু আসেন। গোঁড়ালি থেকে মাথা, মাথা থেকেও চার পাঁচ হাত উঁচু বয়সের বন্ধু ওঁদের পর্দার আড়াল থেকে দেখি, দেখি আর ইচ্ছে করে ছোটদার মত আমিও ওঁদের সঙ্গে আড্ডা দিই। আমার সে সাহস শক্তি সুযোগ কোনওটাই যে নেই, তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাই অবশ্য।

তোমার বন্ধুদের এত অসখু হয়। দেখলে ত মনে হয় দিব্যি সুস্থ।

খালি কি বন্ধুদেরই। বন্ধুর বাবার অসুখ, মার অসখু । ওদের কি কম আত্মীয় স্বজন !

কি কর ছোটদা ওষুধ নিয়া, সত্যি কইরা কও তো! একদিন বলি।

ছোটদা রহস্যের রসে ঠোঁট ডুবিয়ে হাসেন।

কেন, কি হইছে?

কিছু হয় নাই। কিন্তু আগে কি কর কও, নাইলে দাদার কাছে কিন্তু কইয়া দিয়াম। আমার হুমকিতে কাজ হয়। ছোটদা বলেন বেচি রে বেচি।

ছোটদার কথায় কাজ হয়, আমি গলে যাই মায়ায়। নিজেই দাদার বাক্স থেকে দামি ওষধু দএু কটি সরিয়ে ছোটদার হাতে দিই, ইয়াসমিনও দেয়। দাদা বাড়ি থেকে যেই না বেরোন, ছোটদা সঙ্গে সঙ্গে ও ঘরে ঢুকে ওষধু তো আছেই, টাকা পয়সা দাদা কোথাও ভুলে রেখে গেলেন কি না খোঁজেন, শেষে আলনা থেকে একটি শার্ট গায়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরোন। দাদার অগুনতি শার্ট, টের পান না। হঠাৎ মুখোমুখি হয়ে গেলে কালো ফটকের মুখে বা রাস্তায়, দাদা মখু কালো করে বলেন কী রে কামাল আমার শার্ট পরছস কেন? ছোটদা বলেন,পরছিলাম,খুইলা থইয়ামনে, চিন্তা কইর না।

একদিন,আইচ্ছা আমার টেট্রনের নীল শার্টটা কইরে? প্যাণ্টের ওপর গেঞ্জি গায়ে মোজা পায়ে সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে বোকা বোকা চোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে বলতে থাকেন দাদা।

কী জানি, মা ধুইতে নিছে বোধহয়!

আরে না, ওইটা ধোয়া ইস্ত্রি করা ছিল।

তাইলে জানিনা।

শাদা শার্টটাই বা কই! পকেটে যে শীলা ফুলের কাজ কইরা দিছিল!

সেইটা না তুমি কালকে পরলা!

আরে না, কালকে ত আমি লাল শার্ট পরছি।

মারে জিগাস কর, আমি জানি না।

দাদা মাকে জিজ্ঞেস করেন, মাও জানেন না।

ক্যাঁটকেঁটে লাল কুচরিমুচরি একটি শার্ট পরে মন খারাপ করে বাইরে চলে যান দাদা। তাঁর ব্যস্ততা অনেক, ফাইসন্স কোম্পানীর রিপ্রেজেনটেটিভ তিনি, আজ টাঙ্গাইল যাচ্ছেন, পরশু নেত্রকোণা, নেত্রকোণা থেকে ফিরেই আবার জামালপুর। দাদার ফর্সা মুখ রোদে ঘুরে ঘুরে কালো হয়ে যেতে থাকে। দাদার জন্যও আমার মায়া হয়।

ছোটদাকে বলি, ওষধু বেইচা অনেক টাকা পাও, তাইলে আমার থেইকা আর দুই তিন টাকা নেও কেন!

কি যে কস! বেশি টাকা পাই না তো! এইগুলা তো স্যাম্পল,ডাক্তারদেরে দেওয়ার জন্য, দেখস না লেখা আছে বিক্রয়ের জন্য নহে! যা দাম, তার অর্ধেকের চেয়ে কম দাম দেয় দোকানদাররা। ছোটদা বুঝিয়ে বলেন।

ওষুধের থলে হাতে করে প্রায়ই বেলগাছের তল দিয়ে ছোটদার অদৃশ্য হয়ে যাওয়া মাও লক্ষ্য করেন, বাবাকে কোমল কণ্ঠে বলেন, কামালরে একটা ভাল চাকরি টাকরির ব্যবস্থা কইরা দেওয়া যায় না!

বাবারও কোমল কণ্ঠ, হ,দিতে পারি। কুলিগিরি করার একটা ব্যবস্থা কইরা দিতে পারি।

এইসব কি কন!

কেন? কুলিগিরি তো ভাল চাকরি। কুলিগিরি কইরা মাইনষে থাকতাছে না? ও করুক। কুলিদের তো লেখাপড়া না করলেও চলে। বস্তাডা মাথায় উঠাইয়া হাঁটলেই হয়, ফিজিক্স জানতে হয় না, কেমেস্ট্রি জানতে হয় না।

কোমল থেকে দৌড়ে কণ্ঠ রোষের দিকে যাচ্ছে, লক্ষ করে সরে যান মা।

গীতা নতুন নতুন শাড়ি পরে বাইরে যাচ্ছে ছোটদার সঙ্গে, নতুন নতুন সাজার জিনিস ওর। মা আড়ে আড়ে এসব দেখে ছোটদাকে বলেন তা কামাল, তর ত একটা ভাল প্যান্ট নাই, শাটর্ও নাই, নোমানের শাটর্গু লা পরস, তুই নিজের লাইগা শার্ট প্যান্ট কিনতেও ত পারস! ঘরের মধ্যে ছিঁড়া লঙ্গি পইরা থাকস। নিজেরে শাতাস ক্যা?

টাকা আছে নাকি কিনব? ছোটদা মলিন মখু করে বলেন।

টাকা নাই কেন? চাকরি করস না?

যে টাকা পাই চাকরি কইরা, রিক্সাভাড়াও হয় না।

বউএর লাইগা ত ঠিকই কিন্যা আনস।

গীতার লাইগা? গীতারে ত আমি কিচ্ছু দিতে পারি না। ওর যা আছে, ওর নিজের। ওর মা দিছে।

শুন বাবা কামাল। তোমার কাছে আমরা কিছু চাই না। তুমি তোমার বউরে কিন্যা দিবা তা ত ভাল কথা। বউরে তুমি দিবা না তো কে দিব! আমার কথা হইল, নিজেরেও তুমি কিছু দিও। তোমার একজোড়া ভাল সেন্ডেল নাই। সেন্ডেল কিনো।

পইসা দেন, কিনি। ছোটদা বলেন।

অনেকক্ষণ নৈঃশব্দের পুকুরে একা একা সাঁতার কেটে পাড়ে ওঠেন মা।

আমার টাকা থাকলে তো তোমারে দিতামই। আমারে টাকা পয়সা কে দেয়! মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন বলতে বলতে,লেখাপড়া যদি করতে পারতাম, তাইলে তো একটা চাকরি করতে পারতাম। আমার কি কারও ওপর নির্ভর করতে হইত!

এরপর দু সপ্তাহ ধরে বাবার কাছে হাত পেতে পেতে টাকা নিয়ে মা ছোটদার জন্য একটি লুঙ্গি, দুটি শার্ট আর একজোড়া বাটার সেন্ডেল কিনে আনলেন। ছোটদার অভাব তবু শেষ হয় না। তিনি সকাল বিকাল ওষধু সরাতে থাকেন।

 

আচ্ছা শরাফ আইছিল এর মধ্যে? দাদা দুই ভুরুর মাঝখানে ঢেউ তুলে জিজ্ঞেস করেন।

কি জানি জানি না।

নিশ্চয় আইছিল।

কেমনে বুঝলা আইছিল?

আমার ওষুধ আমি গুইনা কম পাইতাছি।

শরাফ মামা নিছে নাকি?

ও একটা আস্তা চোর। ও নিছে নিশ্চয়।

শুনে চৌচির কণ্ঠে মা বলেন,দেখ নোমান, না জাইনা না শুইনা মাইনষেরে হুদাই দোষ দিস না। শরাফ এই বাড়িতে আজকে তিনমাস ধইরা আসেনা। আর ওরে যে চোর কস, ও কি চুরি করছে তর?

আরে জানেন না মা, ও আমার কাছ থেইকা পঞ্চাশ টাকা কর্জ নিছিল, কইল পরদিনই নাকি দিয়া দিব। পাঁচমাস হইয়া গেল, দেওনের নামগন্ধ নাই।

মা অন্য ঘরে চলে যান। অন্য ঘরে একা বসে থাকেন। অন্য ঘরের জানালা দিয়ে হু হু করে হাওয়া আসে, মা সেই হু হু হাওয়ার সঙ্গে মনে মনে কী কথা বলেন কে জানে। মার কষ্টের কথা আমরা কেউ বুঝি না, দাদার সঙ্গে তাল দিয়ে বলি শরাফমামা আসলেই একটা চোর, সেইদিন সে আইল, আমি তারে ঘরে রাইখা একটু বাইরে গেলাম, ফির‌্যা আইসা দেখি আমার স্বর্ণের দুলটা নাই, রাখছিলাম টেবিলের উপরে।

তাইলে তর ওই দুল শরাফই নিছে। দাদা নিশ্চিন্ত।

দাদা অবশ্য তাঁর ওষধু থেকে থেকে নেই হয়ে যাওয়ার রহস্য উদ্ধার করেন পরে। ছোটদার ঘরে কখনও কোনও কারণে গেলে আলনাতেও চোখ পড়ে তাঁর। নিজের ছ সাতটা শার্ট ছোটদার আলনা থেকে তুলে নিয়ে বেরোন ঘর থেকে, বারান্দায় বেরিয়ে মাকে দেখিয়ে বলেন কামালের ঘর সিজ কইরা এইগুলা পাইলাম।

এসব দেখে গীতা ছোটদাকে বলে, মইরা যাইতে পারো না? এই জীবন নিয়া বাঁইচা থাকার তোমার কি দরকার! নিজের মুরাদ থাকলে শার্ট কিন্যা লও। না পারলে ল্যাংটা থাকো। শুনে ছোটদা কালো মাড়ি বের করে হাসেন। গীতা চাপা স্বরে বলে, হাসো? লজ্জা শরম কিছু কি তোমার আছে? বাড়ির সবাই তোমারে অপমান করতাছে, তাতেও তোমার শিক্ষা হয় না! আমারে কেন এই নরকের মধ্যে আইন্যা ফেলছ?

গীতার মেজাজমজির্ বাড়ির কারও সাধ্য নেই বোঝে। এই নেচে বেড়াচ্ছে, হেসে বেড়াচ্ছে, এই আবার মখু গোমড়া করে বসে আছে। কখনও কখনও দরজার ছিটকিনি এঁটে সারাদিন ঘরে শুয়ে থাকে। খাবার সময় হলে মা বন্ধ দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকেন ও আফরোজা, আফরোজা! উঠ। খাইবা না? না খাইলে শরীর খারাপ হইব। উঠ আফরোজা, খাইয়া লও। গীতা মিত্র ওরফে আফরোজা কামাল মখু বিষ করে অনেক ডাকার পর উঠে খেয়ে দেয়ে আবার শুয়ে পড়ে। অনেকদিন পর মা তাঁর দেরিতে দুধ ছাড়া, দেরিতে কথা বলা, প্রায়-তোতলা প্রায়-কোলের ছেলেকে কাছে পেয়েছেন, ছেলে আর ছেলে-বউএর খাবার নিজে হাতে রেধেঁ বেড়ে ঘরে আনেন, ঘরেই ওদের, প্রায়-মুখে তুলে খাওয়ান। আধেক হিন্দু আধেক মুসলমান বউটির মন ভাল করার জন্য মা আদাজল খেয়ে লাগেন যেহেতু বউটির মন ভাল থাকলেই ছোটদার মন ভাল থাকে। অথবা গীতার মন পেতেই মা ব্যস্ত হয়ে ওঠেন যেহেতু বাড়ির আর কারও মন পাওয়া দুরূহ ব্যাপার, অথবা বাবার হম্বিতম্বিতে অনভ্যস্ত গীতাকে মা আদরে আহলাদে সহনীয় করাতে চান এ বাড়ি। বাড়ি ফিরে ছোটদা, কোনওদিকে না ফিরে, সোজা ছোট ঘরটিতে ঢুকে যান। ভেজানো দরজা ঠেলে হঠাৎ ঢুকলেই দেখি গীতা দেয়ালের দিকে মখু করে শুয়ে আছে, ছোটদা গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন আর ধ্যানমগ্ন ঋষির মত জপ করছেন, গীতা গীতা গীতা ও গীতা।

ছোটদার হাতে লিস্টি পড়তে থাকে, গীতার ব্লাউজ লাগবে, শাড়ি লাগবে, লিপস্টিক লাগবে, রুজ পাউডার লাগবে। শুকনো মখু ছোটদার আরও শুকনো লাগে, শুকিয়ে ঠোঁটের চামড়া ফেটে যেতে থাকে। বাড়ির মানুষগুলোর সঙ্গে কথা কোনও প্রয়োজন ছাড়া বলেন না। অন্যমন।

ছোটদার চাকরি করার খবর পেয়ে বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—নিজের কপাল নিজে খাইলে কার কী বলার থাকে। না,কারও কিছু বলার থাকে না। ছোটদা নিজের কপাল রীতিমত চিবিয়ে খাবার ব্যবস্থা করলেন। সাংবাদিক হয়ে গেছেন, হাতে একটি ডায়রি নিয়ে সকালে বেরিয়ে যান, দুপুরে ফিরে খেয়ে দেয়ে আবার বেরোন, সন্ধেয় ফেরেন বউ এর জন্য কোনওদিন শাড়ি, কোনওদিন ব্লাউজ, কোনওদিন রুজপাউডারলিপস্টিক নিয়ে। ছোটদা বাড়ি এলেই মা রান্নাঘরে চলে যান খাবার আনতে। যেদিন ফিরতে ছোটদার বিকেল হল, টেবিলে খাবার সাজিয়ে বসে আছেন মা, ছোটদা ঘর থেকে শুকনো মুখে বেরিয়ে খেতে আসেন,না একলা নয়, গীতার কোমর জড়িয়ে টেনে আনছেন সঙ্গে খেতে। গীতা নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলছে, আমার আবার খাওয়া কি! আমার না খাইলেও চলবে। অথচ গীতা আমাদের সঙ্গে খেয়ে লম্বা ঘুম দিয়েছিল, কিন্তু মুখ এমন শুকনো যে ছোটদা ধারণা করেন তাঁর সুন্দরী বউখানা না খেয়ে কাঁটা হয়ে যাচ্ছে। গীতা খাবে না বলে ছোটদাও খাবেন না। মা বললেন ও যখন কইতাছে, ওর সাথে আরেকবার খাও আফরোজা।

না। না। আমি খাব না।

ছোটদা গীতাকে টেনে এনে কাছে বসিয়ে ভাত তরকারি মেখে গীতার মুখে তুলে দেন। গীতা মুখে ভাত নিয়ে নাক কপাল কুঁচকে রাখে, যেন বিষ দেওয়া হয়েছে মুখে। মুখের বিষ মুখেই রেখে দেয় সে, চিবোয় না, গেলে না। ছোটদা গীতার মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলতে লাগলেন সোনা আমার, মানিক আমার, অল্প একটু খাও। তুমি না খাইলে আমি খাব না।

গীতা বিষ গিলল না, ছোটদাও খেলেন না। উঠে গেলেন। মা রান্নাঘর থেকে প্রায় দৌড়ে এসে উঠলেন খাবার ঘরে, হাতে বাটি, বাটিতে মাংস,কী রে আমি আরও তরকারি লইয়া আইলাম তুই উঠলি কেন? খাইয়া ল। সারাদিন খাস নাই, কামাল!

ছোটদা মখু ছোট করে বললেন না মা, আমি খাইছি বাইরে।

মা উদাস বসে থাকেন খাবার টেবিলে সামনে ছোটদার না খাওয়া ভাত তরকারি নিয়ে।

মার চোখের পুকুরে ছোট ছোট ঢেউ।

 

ছোটদাকে উঠোনের রোদে পিঁড়ি পেতে বসিয়ে গা মেজে এই সেদিন গোসল করিয়ে দিতেন মা। এখন ছোটদা নিজেই নিজের গোসল সারেন। মা প্রায়ই বলেন কি রে তর গোড়ালিতে এত ময়লা জমছে কেন, মাজস না নাকি? ছোটদার চুল সরিয়ে কানের পেছন, ঘাড়ে, গলায় আঙুল ডলে মা বলেন, কড় পইড়া গেছে। মা নাক কুঁচকে উঠোনে থুতু ফেলেন। ছোটদা না গোড়ালির দিকে, না মার দিকে ফিরে তাকান। তিনি তাকিয়ে থাকেন গীতার দিকে। গীতার মখু টি বিষণ্ন লাগছে কেন! গীতার মখু টি কিছুক্ষণ আগে বিষণ্ন ছিল না, গীতা ইয়াসমিনের সঙ্গে লুডু খেলছিল আর ডিমের পুডিং খাচ্ছিল। অনেকদিন নাকি পুডিং খায়নি ও, অনুযোগ করাতে মা সাততাড়াতাড়ি বানিয়ে দিয়েছেন। পুডিংএর পর চেয়েছিল খেঁজুরের গুড় দিয়ে বানানো পায়েশ খেতে, মা তাও দিয়েছেন। দিয়ে মা ফুঁকনি ফুঁকে খড়ি নেই শুকনো পাতায় রান্না করেছেন, খেতে দিয়েছেন টেবিলে, ছোটদা গীতাকে কোলের ওপর বসিয়ে ঠোঁটে চুমু খাচ্ছেন, চুমু খাচ্ছেন আর বলছেন মনডা বেজার কেন, কি হইছে? গীতা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কোনও উত্তর দেয় না। ছোটদা বাড়ি এলেই গীতার হাসি মখু টি হঠাৎ কান্না কান্না হয়ে থাকে। মখু টি এমন যেন সারাদিন খায়নি, জল অবদি পান করেনি, যেন বাড়ির মানুষগুলো গীতাকে সারাদিন অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে। বাড়িতে যতক্ষণ থাকেন ছোটদা, গীতার শুকনো মখু ভেজা করতে, কান্না কান্না মুখে হাসি ফোটাতে দিন রাত উপুড় হয়ে পড়ে থাকেন গীতায়। মা লক্ষ করেন। আমরাও। মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন গোপনে। গল্প উপন্যাস বা সিনেমা থিয়েটারের প্রেম কাহিনীর চেয়ে আমাদের বাড়িতে ঘটতে থাকা প্রেম কাহিনীতে আমরা বিভোর হয়ে থাকি। চোখের সামনে কাউকে কি এ যাবৎ দেখেছি এক বাড়ি মানুষের সামনে জড়িয়ে ধরতে, ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াতে! না।

আমি আর ইয়াসমিন গীতাকে বিস্ময় চোখে দেখি। গীতা ইস্ত্রি করা শাড়ি ভাঁজ খুলে খুলে পরে, উঁচু জুতো পরে, লিপস্টিক লাগায় ঠোঁটে, কপালে টিপ পরে, সগু ন্ধি লাক্স সাবান নিয়ে গোসলখানায় যায়। ওর সব কিছুই অন্যরকম। আমাদের চুল প্রথম বাংলা সাবান দিয়ে ধুয়ে পরে গোসলের সাবান দিয়ে ধুই। ছোটবেলা থেকেই মা এভাবে ধুতে শিখিয়েছেন। চুলের ময়লা দূর করতে গোসলের সাবান খরচ করলে সাবান ফুরিয়ে যাবে বলেই এই কপৃ ণতা। কারণ বাবা বাংলা সাবানই বেশি বাড়িতে পাঠান, গোসলের সগু ন্ধি সাবান কদাচিৎ। মাকে চারদিকে কাপর্ণ ্য করতেই হয়। বাবার ধন তো, মা বলেন, এক সংসারের জন্য নয়, গ্রামে তাঁর বাবা মা ভাই বোনের সংসার আছে, শহরে তাঁর দ্বিতীয় বউ এর সংসার। মাকে দু রকম খাবারও রাধঁ তে হয়। বাড়ির সবার জন্য এক রকম, মা আর কাজের মানুষগুলোর জন্য আরেকরকম। সেই আরেকরকমে বাসি ডাল, শুটকির তরকারি আর নিরামিষ ছাড়া অন্য কিছু যদি জোটে সে কাঁচকি মাছ নয়ত টেংরা-পুঁটির ঝোল। মাছ মাংস রান্না হলে সে আমাদের জন্যই থাকে। আমাদের মানে বাবা, ভাই বোন আর নতুন আসা গীতা। গীতাকে আগে থেকেই চিনি, এ নতুন গীতা নয় কিন্তু কামালের বউরূপে আসা গীতাকে অবকাশে অন্যরকম দেখতে লাগে। বাবার সামনে মাথায় কাপড় দেওয়া, মার সামনে মাথার কাপড় ফেলে দেওয়া, আমাদের সামনে ধেই ধেই করে নেচে বেড়ানো, ছোটদার সামনে গাল ফুলোনো গীতার সব ব্যাপারে আমার আর ইয়াসমিনের বেড়ালি কৌতুহল। স্বামী স্ত্রীর জীবন চোখের সামনে যা সবচেয়ে বেশি দেখা আমাদের,তা বাবা মার। বাবা মার সম্পর্কে তেল নুন চাল ডালের হিশেবের মধ্যে বাঁধা, এক সঙ্গে দুজনকে আমি কোনওদিনই ঘনিষ্ঠ দেখিনি,মধুর কোনও বাক্যালাপও ঘটতে দেখিনি, একসঙ্গে কোথাও দুজন বেড়াতে যান নি, এক ঘরেও এখন ঘুমোন না, এক বিছানায় তো নয়ই। মার ছোট ঘরটি ছোটদা আর গীতার জন্য গুছিয়ে দেওয়ার পর মা উদ্বাস্তুর মত থাকেন, কোনওদিন আমার ঘরে, কোনওদিন বৈঠকঘরের মেঝেয় বিছানা পেতে। বাবা হচ্ছেন বাড়ির কর্তা, বাবা যেভাবে আদেশ করবেন, সংসার সেভাবে চালাতে হবে মাকে, এরকমই নিয়ম। এই নিয়মে অভ্যস্ত আমাদের সামনে এক দম্পতিকে আমরা সবিস্ময়ে লক্ষ করি, স্ত্রী সেবায় সদা সর্বদা সজাগ স্বামী। অন্যরকম বৈকি। মার নজরে পড়ে ঘটনা, আমাদেরও পড়ে। আমাদের কৌতূহল বাড়ে, আমার আর ইয়াসমিনের। মার কমে। মা অচিরে টের পান মার কোলের ছেলে মার তোতলা ছেলে মার কোল ছাড়া হাত ছাড়া হয়ে গেছে। ছোটদার জগত জুড়ে জীবন জুড়ে এখন গীতা। গীতাকে সুখী করতে যা কিছু করতে হয় করবেন। মা বাবা ভাই বোনের মূল্য তাঁর কাছে আর নেই। মা উদাস বসে থাকেন একা বারান্দায়, থেকে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, কামাল যে কহন বাসাত আসে, কহন যায়, কিছুই টের পাই না। আমারে আর মা মা কইরা ডাকে না, ডাইকা কয় না মা যাই, মা আইছি।

গীতা হঠাৎ একদিন ঢাকা চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। গীতার সিদ্ধান্ত পাল্টানোর হাত আমাদের তো নেই-ই, ছোটদারও নেই। বাক্স পেটরা নিয়ে সে যেদিন অবকাশ ছেড়ে যাচ্ছে, কালো ফটক ধরে আমরা করুণ চোখে তাকিয়ে ছিলাম তার চলে যাওয়ার দিকে। ঢাকায় আমানুল্লাহ চৌধুরির বাড়িতে যাচ্ছে গীতা। আমানুল্লাহ চৌধুরির বাপের বাড়ি ময়মনসিংহে, গীতার বাড়ির কাছেই, সেই সূত্রে চেনা। চৌধুরির বউ রাহিজা খানম নাচের ইশকুল খুলেছে, সেই ইশকুলে নাচ শিখবে গীতা। রাহিজা সুযোগ দিলে গীতা বড় নৃত্যশিল্পী হতে পারবে। নাচের অনেক মেয়েই চৌধুরির বাড়িতে থাকে, চৌধুরির বাচ্চা কাচ্চাদের দেখে রাখে। গীতাও তাই করবে। বউকে ঢাকায় রেখে ময়মনসিংহে ফিরে আসেন ছোটদা। পরের সপ্তাহে বাবা ছোটদার হাতে টাকা দিয়ে ঢাকা পাঠালেন আবার, গীতাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর আদেশ। গীতাকে পদার্থবিজ্ঞানে ভর্তি করিয়ে দিয়ে ছোটদা ফেরেন। নিজের বাংলায় অনাসর্ পড়া গোল্লায় গেলেও গীতাকে বিদূষী বানাবেন, এই স্বপ্ন ছোটদার। ছোটদার কাজ এখানে নিজের ভবিষ্যত তৈরি করা, ভাল চাকরি জোটানো টাকা পয়সা যতটা পারেন কামিয়ে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া। বাড়িতে যতক্ষণ তিনি থাকেন, বেশির ভাগ সময় নিজের ঘরে বসে লম্বা লম্বা চিঠি লেখেন, বিয়ের আগে যেমন লিখতেন, সেই সব বত্রিশ পৃষ্ঠা চিঠির মত চিঠি। ওদিক থেকে চিঠি আসে, ছোট চিঠি, চিঠির সঙ্গে লিষ্টি আসে। লিস্টি পকেটে নিয়ে ছোটদা বেরিয়ে যান, জিনিসপত্র কিনে কাগজে মুড়ে বাড়ি নিয়ে এসে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে বড় বড় প্যাকেট করেন ঢাকা পাঠাতে। মা দেখেন, আড়ালে চোখের জল মোছেন। এই যে কামাল টাকা কামাইতাছে, বউরে কত কিছু জিনিস কিন্যা দিতাছে, কোনোদিন তো কইল না মার হাতে কিছু টাকা দিই। পাঁচটা টাকাও ত সাধে নাই কোনওদিন। মার এই হাহাকার কাউকে স্পর্শ করে না। মা একাই ছিলেন, আরও একা হতে থাকেন। অন্ধকারে বারান্দায় বসে থাকা মার হাতের তসবিহর গোটা স্থির হয়ে থাকে।

গোটা শহরে ছোটদার বন্ধু। বাড়িতে ছোটদার খোঁজে এলে ছোটদা সাধারণত ওদের নিয়ে বাইরে চলে যান। কখনও সখনও ছোটদা বাইরের বারান্দা-ঘরে বন্ধু নিয়ে বসেন। মাকে বলেন চা দিতে। মা চা বানিয়ে জরির মার হাতে পাঠিয়ে দেন। ঘরে সবসময় চায়ের সরঞ্জাম থাকে না। চিনি বা দধু না থাকলে এম এ কাহহারের বাড়ি পাঠিয়ে এক কাপ চিনি বা দুধ ধার করে আনা হয়। এম এ কাহহারের মত ধনীর বাড়ি থেকেও লোক আসে মাঝে মাঝেই চিনি বা দধু ধার করতে। এক কাপ চিনি বা দধু ধারের ব্যাপারটি আমাদের কাছে ডালভাত। চায়ের সংগে দুটো টোস্ট বিস্কুট নয়ত নাবিস্কো বিস্কুট দিতে হয়, বাড়িতে বিস্কুট সবসময় থাকে না, তখন শুধু চা তেই আপ্যায়ন সারতে হয়। এক রাতে, বলা যায় গভীর রাতে, প্রায় সাড়ে বারোটায় ছোটদার এক বন্ধু যখন দরজার কড়া নাড়ল, ছোটদা তখন কেবল শুতে যাচ্ছেন। বাবা নেই বাড়িতে,বাড়ির আর সবাই ঘুমিয়ে। আমার ঘুম ভেঙে যায় দরজার শব্দে। বৈঠকঘরের পর্দা সরিয়ে দেখি হরিণ হরিণ চোখের মিষ্টি মিষ্টি হাসির এক ছেলের নিভাঁজ নিটোল মুখে চাঁদের আলো চুমু খাচ্ছে। আমার ওই উঁকি দেওয়া মুখের অর্ধেকখানি দেখেই ছেলেটি বলল, নাসরিন না! কত বড় হয়ে গেছ তুমি! ছেলেটির দীপ্ত চোখ আমার মখু থেকে সরে না। আমি সংকোচে নত করি চোখ।

আমাকে মনে নাই তোমার? আমি জুবায়ের।

আমি কোনও উত্তর দিই না। জুবায়ের জিজ্ঞেস করে, তুমি গান পছন্দ কর? মৃদু কণ্ঠে বলি হ্যাঁ করি। দাঁড়িয়েই ছিলাম, ছোটদা বললেন, যা ভেতরে যা, মারে চা দিতে ক ত দুই কাপ। মা ঘুমিয়ে ছিলেন, ঠেলে উঠিয়ে বলি, ছোটদার বন্ধু আইছে, দুই কাপ চা দেও। মা পাশ ফিরে বলেন, জরির মারে ক। জরির মা মেঝেতে কুকুর কুণ্ডুলি, জাগিয়ে বলি, দুই কাপ চা কর। জরির মা ঘুমচোখে রান্নাঘরে গিয়ে শুকনো কাঁঠাল পাতা চুলোয় গুঁজে আগুন ধরিয়ে চায়ের পানি বসিয়ে দেয়। পানি গরম হল বটে, কিন্তু চা পাতা কই, চিনি কই, দধু ই বা কই! মা জানেন কই। মাকে আবার ডাকি, উইঠ্যা চা বানাইয়া দেও। পানি গরম হইয়া গেছে।

মা আবারও পাশ ফিরে শুলেন, এত রাইতে আমারে জ্বালাইস না। আমার শইলডা বালা না।

মা উঠলেন না। জিজ্ঞেস করলেন বাবা ফিরেছেন কি না। ফেরেনি বলাতে বললেন ওই মাগীর বাড়িত রাইত কাডাইতাছে। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে কড়িকাঠের দিকে অসহায় তাকিয়ে থাকি। চমৎকার গলায় গান গাইছে জুবায়ের। নৈঃশব্দের সুতোয় ভর করে গানের সুর ভেসে আসছে ঘরে, সে সুর ঘুমন্ত কাউকে জাগায় না, আর জেগে থাকা আমাকে ঘুমোতে দেয় না। ইচ্ছে করে পুরো রাত গান শুনি, জুবায়েরের পাশে ঘন হয়ে বসে পূর্ণিমায় ভিজে ভিজে তন্ময় হয়ে শুনি, জগত সংসার ভুলে শুনি। রাত দুটোর দিকে আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেব না ভুলিতে গানটি গেয়ে জুবায়ের চলে গেল।

পরদিন ছোটদা বিকেলবেলা বাড়ি ফিরে বিছানায় শুয়ে রইলেন চপু চাপ।

কি এই অসময়ে শুইছ কেন?

ভাল্লাগতাছে না।

কি হইছে?

কালকে যে জুবায়ের আইছিল, আমার বন্ধু অনেক বছর পরে তার সাথে দেখা।

ছেলেডা খুব সুন্দর দেখতে। গানও ত সুন্দর গায়।

আজকে ভোরে জুবায়ের আত্মহত্যা করছে।

বুকের ভেতর থেকে ঠাণ্ডা কি জানি কি সারা গায়ে মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। জুবায়েরের সঙ্গে যে মেয়েটির প্রেম ছিল, সে মেয়েকে মেয়ের বাবা ধরে বেঁধে অন্য এক ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে, ছোটদা খুব ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন। কাল রাতে জুবায়ের ওই মেয়ে সম্পর্কে একটি কথাও বলেনি। বলেছে, এত চমৎকার পূর্ণিমায় তার ইচ্ছে করেনি একা একা ঘরে বসে থাকতে, তাই বেরিয়েছে সে, তার খুব গান গাইতে ইচ্ছে করছে। জুবায়ের যখন গান গাইছিল, ছোটদা পাশে বসে ঝিমুচ্ছিলেন। জুবায়ের আরও গান গাইতে চাইছিল, কিন্তু ছোটদাই জুবায়েরকে বলেছেন চলে যেতে, কারণ বিছানায় তাঁর তখন না গেলেই নয়। প্রেমের সঙ্গে আত্মহত্যার সম্পর্কে বড় নিবিড়। ছোটদাও তাঁর বিয়ের আগে বিষ খেয়েছিলেন। চটজলদি হাসপাতালে নিয়ে পেটে নল ঢুকিয়ে বিষ বের করে নেওয়া হয়েছিল বলে বেঁচেছেন।

এরপর বেশ কয়েকটি রাত আমি ঘুমোতে পারিনি। কেবলই মনে হয়েছে রাত ফুঁড়ে একটি গান ভেসে আসছে, আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেব না ভূলিতে।

০৪. ছোট ছোট দুঃখ কথা

মার কোনও কিছু বাবার পছন্দ না হলেও মার বলা একটি ছড়া বাবার খুব পছন্দ। মন ভাল থাকলে মাকে তিনি ছড়াটি বলতে বলেন। মা হেসে দুলে দুলে বলেন,
এক পয়সার তৈল,
কিসে খরচ হৈল,
তোমার দাড়ি আমার পায়,
আরও দিলাম ছেলের গায়,
ছেলেমেয়ের বিয়ে হল,
সাতরাত গান হল,
কোনও অভাগী ঘরে গেল,
বাকি তেলটুক নিয়ে গেল।

মার উড়োখুড়ো চুল, তেল সাবান পড়ে না চুলে। ফিনফিনে চুলগুলো পেছনে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখেন, ফিতে জোটে না সবসময়। আমাদের, আমার আর ইয়াসমিনের চুলের ফিতে পুরোনো হয়ে গেলে তা দিয়ে বাঁধেন, তাও না থাকলে দড়ি। গোসল করে ভেজা চুলও পেছনে বেঁধে রাখেন, চুল ঝরে পড়ে আরও। মার ঘন দীর্ঘ কেশ ছিল এককালে, এখন নেই। নেই বলে আফসোস করেন, কিন্তু যা আছে তা হেলাফেলায় ঝরে, তিনি ফিরে তাকান না। মা যখন আমাকে আমার চুলের যত্ন নিতে বলেন, আমি বলি, আর যত্ন কইরা কি হইব, চুল ত তোমার চুলের মত হইছে, পাতলা। নিজের ছোট চোখ নিয়েও দুঃখ করে বলি, ইয়াসমিনের চোখ কত সুন্দর, বাবার চোখ পাইছে। আমার গুলা হইছে তোমার চোখের মত। নাক নিয়েও কথা, নাকটা খাড়া হইল না। হইব কেমনে, তোমার নাক পাইছি ত! যেটুকু ফর্সা হয়েছি তা বাবার কারণে, যেটুকু কালো তা মার কারণে। শরীরের যা কিছু খুঁত, তা সব মার কাছ থেকে পাওয়া, এরকমই এক বিশ্বাস আমার গভীরে ক্রমশ প্রবেশ করতে থাকে। ভাগ্য ভাল যে বাবার থুতনি পাইছি। থুতনির মধ্যে একটা ভাঁজ আছে, মেয়েরা কয় এইডা আছে বইলা আমারে সুন্দর লাগে দেখতে। বাবার কিছু পাইছি বইলা মাইনষের মত দেখতে লাগে। একদিন মার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে বলি, মা তোমার গলা কই?

গলা কই মানে?

তোমার ত গলা নাই। তোমার থুতনি সোজা নাইমা গেছে বুকে। আর তোমার কাধঁ ও ত নাই, ব্লাউজও তাই পিছলাইয়া পইরা যায়।

শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সম্পর্কে মন্তব্য সংসারে নতুন নয়। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে দেখে আসছি শরীরের কোন অঙ্গ দেখতে কেমন, চোখ নাক কান ঠোঁট, শরীরের দৈর্ঘ্য প্রস্থ, ত্বকের রং ইত্যাদি নিয়ে আত্মীয়দের গভীর আলোচনা এবং তুলনা। বাড়িতে কেউ বেড়াতে এলেও তা্‌ই হয়, অনেকদিন পর হয়ত আমাকে কেউ দেখলেন, দেখেই বলেন বাহ মেয়ে তো বেশ লম্বা হইতাছে। বাপের মত গড়ন পাইছে। অথবা কি ব্যাপার এত কালা হইতাছে কেন ও! চোখ নাক কানের দিকেও তীক্ষ ্ন দৃষ্টি ছুঁড়ে মন্তব্য করেন কোনটি ভাল কোনটি মন্দ, বাবার মত নাকি মার মত, নাকি মার বংশের বা বাবার বংশের কারও মত। মাও বলেন, ইয়াসমিনের হাত পাগুলা ওর ফুপুদের মত হইছে। রুনুখালা ঢাকা থেকে বেড়াতে এসে আমার দিকে তাকিয়ে বলেন ইস চোখগুলা এক্বেবারে বড়বু। চুলগুলা তো বড়বুই। মা নিঃশব্দে অনেকক্ষণ শরীরের খুঁত নিয়ে আমাদের খুঁতখুঁতুনি আর অভিযোগ শুনে বলেন, হ আমি ত পচা। আমি কালা। দেখতে খারাপ। তরা ত সুন্দর। তরা সুন্দর হইয়া থাক।

বাড়িতে গোসলের সাবান এলে মা তা ছেলেমেয়েদের জন্য রাখেন, নিজের জন্য জোটে না। গা থেকে গন্ধ বেরোলে কাপড় ধোয়ার সাবান দিয়ে গোসল সারেন। মাস চলে যায়, বাবা নারকেল তেল পাঠান না। খড়ি নেই, মা চুলো ধরান নারকেলের পাতা আর ডাল শুকিয়ে। এগুলোতে আগুন ভাল ধরে না কিন্তু বাবা সাফ সাফ বলে দিয়েছেন, নারকেলের ডাউগ্যা আর পাতা পুতা দিয়াই রানতে হবে। খড়ির দাম অনেক। খড়ির দাম অনেক বলে মাকে গাছ থেকে পড়া পাতা জড়ো করে রাখতে হয়। ডাবঅলা রশিদ এসে তাড়া খাওয়া কাঠবেড়ালির মত দ্রুত উঠে যায় নারকেল গাছে, দড়ি বেঁধে ডাব নারকেল মাটিতে ফেলার পর গাছগুলো সাফ করে দেয় বিনে পয়সায়। বাড়ির ডাব কিনে নিয়ে বাজারে লাভে বিক্রি করার কাজ রশিদের। রশিদ তিন চার মাস পর পর আসে এ বাড়িতে ডাব কিনতে। উঠোনে মাঠে নারকেল পাতার সপ্তূ হয়ে থাকে রশিদ গাছ পরিষ্কার করে যাওয়ার পর। সেইসব বিশাল বিশাল নারকেলের ডাউগ্যার কিনারে বটি নিয়ে বসে মা একটি একটি করে শলা বের করে উঠোন ঝাঁট দেবার, পায়খানা পরিষ্কার করবার, বিছানার ময়লা তাড়াবার ঝাঁটা বানিয়ে শলাহীন পাতা আর ডাউগ্যা কেটে জড়ো করে রাখেন। বৃষ্টি এলে উঠোনে শুকোতে দেওয়া নারকেলের ডাল পাতা, কাঁঠাল পাতা,আমপাতা, জামপাতা সব দৌড়ে দৌড়ে রান্নাঘরের বারান্দায় তোলেন। মার ছেঁড়া শাড়ি আরও ছিঁড়তে থাকে। মার বিছানার পুরোনো তোশক ছিঁড়ে শক্ত শক্ত জমা তুলো বেরিয়ে গেছে, তোশকের একদিকে ভারি, আরেক দিকে হালকা, শুলে মনে হয় রেললাইনের পাথরের ওপর শুয়েছি। একটি নতুন তোশকের কথা অনেকদিন ধরে বলছেন মা, কিন্তু মার বলায় কার কি আসে যায়! মার মশারির ছিদ্রগুলো বড়, আমাদের মশারিতে ছিদ্র নেই বললে ঠিক হবে না, আছে, তবে ছোট। আমাদের মশারির ছিদ্রগুলো বুজে দিয়েছেন মা। বড় ছিদ্র বোজা সম্ভব হয় না, মার গায়ে মশার কামড়ের দাগ ফুটে থাকে প্রতিদিন। মা একটি নতুন মশারির কথা কয়েক বছর ধরে বলেন, বাবা রা করেন না। মশারি যখন আসে শেষ অবদি, সেটি আমাদের খাটে টাঙিয়ে নিজে তিনি পুরোনো ছিদ্রঅলা মশারি টাঙান নিজের খাটে।

বাড়িতে রান্না হচ্ছে, একদিন নুন আছে তো আরেকদিন পেঁয়াজ নেই, পেঁয়াজ আছে হলুদ নেই, হলুদ আছে তো তেল নেই। নেই শুনলেই বাবা ধমকে ওঠেন, পরশুদিন না তেল কিইন্যা দিলাম, তেল গেছে কই?

রান্ধায় লাগছে।

দুইদিনের রান্ধায় এক বোতল তেল শেষ হইয়া যাইব?

দুইদিন না, দুই সপ্তাহ আগে তেল কিনা হইছিল।

দুই সপ্তাহেই বা এক বোতল শেষ হইল কেমনে?

কম রান্ধা?

রান্ধা বন্ধ কইরা দেও। দরকার নাই রান্ধার আর।

আমার লাইগা চিন্তা করি না। পুলাপান কি খাইব?

পুলাপানের খাওন লাগব না। পুলাপান আমারে সুখ দিয়া উল্ডাইয়া দিতাছে। এমন পুলাপান থাকার চেয়ে না থাকা ভাল।

মার জীবন আমাকে কোনও রকম আকর্ষণ করে না, করে বাবার জীবন। বাবার ক্ষমতা অনেক, বাবা ইচ্ছে করলে আমাদের সবকটাকে উপোস রাখতে পারেন, ইচ্ছে করলে সবকটাকে ভরপেট সখু দিতে পারেন। ইচ্ছে করলে সারা বাড়িকে ভয়ে তটস্থ করে রাখতে পারেন, ইচ্ছে করলে হেসে কথা বলে সবাইকে অমল আনন্দ দিতে পারেন। মার ইচ্ছেতে সংসারের কিছুই হয় না। মার জগতটি খুব ছোট। ছেঁড়া শাড়ি ছেঁড়া মশারি ছেঁড়া লেপ ছেঁড়া তোশক আর মাটির চুলোয় ফুঁকনি ফোঁকা তেল হীন সাবানহীন জীবন মার। এই জীবন নিয়ে তিনি দৌড়োন পীর বাড়ি, কখনও কখনও নানির বাড়ি। এ দুটো বাড়ি ছাড়া মার আর কোনও বাড়ি নেই যাওয়ার। বাড়িতে মার নিয়মিত অতিথি বলতে এক নানা। নানা যখন দুপুরবেলার দিকে আসেন, মা নানাকে গা মেজে গোসল করিয়ে ভাত খাইয়ে বিছানায় শুইয়ে দেন। বাবা বাড়ি আসার আশংকা না থাকলেই নানাকে খেতে বসান মা। আমরাও যদি দেখে ফেলি নানা খাচ্ছেন, মা অপ্রস্তুত হন, কিছু বলার আগেই তিনি বলেন, আমার ভাগেরটা বাজানরে খাওয়াইতাছি। বাড়িতে তো পীরবাড়ির কেউ আসেই না আর, ওরা আর যে বাড়িতেই যাক, কোনও কাফেরের বাড়িতে যাবে না। বাড়িতে কোনও মামা খালা এলে বাবা কটমট করে তাকান। বাবা যে ওদের কারও আসা পছন্দ করেন না, সে মা কেন, আমরা সবাই বুঝি। মার আত্মীয় কেউ বাড়ি এলে বাবা কাজের মানুষকে আড়ালে ডেকে নিয়ে জানতে চান, মা কিছু দিয়েছেন কি না ওদের হাতে। কিছু খাইয়েছেন কি না, খাওয়ালে কি খাইয়েছেন, এসব। কাজের মানুষও বোঝে, এ বাড়িতে মার আত্মীয়রা অনাকাঙ্খিত ছটকু পীর বাড়িতে ঢুকে নতুন মুন্সি হয়েছে। ইয়া লম্বা পাঞ্জাবি আর টুপি পরে একদিন এসেছিল অবকাশে, বাবা ঘাড় ধাককা দিয়ে বের করে দিয়েছেন। মার জগতের মানুষেরা যখন এ বাড়িতে নিগৃহীত হতে থাকে, মা একা হয়ে যান। তিনি তাঁর জগত বাড়াতে থাকেন পশুপাখিতে। মার শখ হয় মুরগি পালার। বাবার কাছে মার আবদার প্রতিদিনই চলতে থাকে, বাবার হাত পা পিঠ সর্ষের তেল মেখে টিপে দিতে দিতে। বাবা অবশ্য একে আবদার বলেন না, বলেন ঘ্যানর ঘ্যানর। কেন, মুরগি দিয়া কি হইব? মুরগি ডিম পাড়ব, সেই ডিম পুলাপান খাইতে পারব, ডিম ফুইটা বাচ্চা হইব, সেই বাচ্চা বড় হইব। মার স্বপ্ন শেষ অবদি সফল হয়, এক মুরগি থেকে দশ মুরগি হলে যে বাবারই লাভ, তা যখন তিনি বুঝলেন, চারটে মুরগি কিনে দিলেন মাকে। মা সেই মুরগিগুলোর জন্য নিজে হাতে খোঁয়াড় বানালেন। সকালে উঠে খোঁয়াড় খুলে মুরগিদের খুদ কুঁড়ো খেতে দেন। উঠোন জুড়ে মুরগি হেঁটে বেড়ায়, হেগে বেড়ায়। মা অপেক্ষা করেন, মুরগি একদিন ডিম দিতে বসবে। বাবার খাটের তলায় চটের ওপর বিছানো পেঁয়াজ থাকে, আলু থাকে। সেই পেঁয়াজ আলুর পাশে মা একটি ডালা পেতে দিলেন, খড় বিছানো সেই ডালায় লাল একটি মুরগি সারাদিন বসে থাকে। একদিন দেখি ঘর বারান্দা উঠোন জুড়ে একটি মা মুরগির পেছনে অনেকগুলো বাচ্চা মুরগি হাঁটছে। বাচ্চাগুলো দেখতে এত সুন্দর, হাতে নিতে ইচ্ছে করে। হাতে নিলে মা বলেন বাচ্চা বড় হবে না। মার খুশি উপচে পড়ে মুরগির বাচ্চাগুলো দেখে। কিন্তু বারোটা বাচ্চা মা গুনে গুনে খোঁয়াড়ে তোলেন, দেখা যায় পরদিন দুটো বাচ্চা নেই। উঠোনে মা মুরগির পেছনে যখন হাঁটছিল, এক ফাঁকে চতুর বেজি ধরে নিয়ে খেয়েছে। টিনের ঘরের পেছনে কোনও এক গর্তে বেজি থাকে, হঠাৎ হঠাৎ ওদের দৌড়োতে দেখি। মার ইচ্ছে হয় হাঁস পালতে। বাবা হাঁসের বেলাতেও দাঁত খিঁচিয়ে বলেন, আবার হাঁস কেন? হাঁস যে কেন, মাকে তাও বোঝাতে হয় অনেক সময় নিয়ে। বাবা নাকচ করে দিলেন মার প্রস্তাব। মা নানার কাছে পাড়লেন। নানা দুটো হাঁস কিনে নিয়ে এলেন। শাদা হাঁস, বাদামি হাঁসি। বাড়িতে যখন হাঁস এল, বারোটি মুরগির বাচ্চার মধ্যে দুটি কেবল বেঁচে আছে। বাকিগুলো অসুখে, কুকুরে আর বেজিতে ফুরিয়েছে। হাঁসি ডিম দিল। সে ডিমের ওপর মা লাল মুরগিটিকে বসিয়ে দিলেন। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোলো হাঁসের। হাঁস যায় বিলে সাঁতার কাটতে। রান্নাঘরের পেছন দিকে বাড়িঘেরা দেয়ালে মেথর আসার ছোট্ট কাঠের দরজাটি পেরোলেই বাঁদিকে প্রফুল্লর বাড়ির পায়খানা, ডানে কচুরিপানায় ঠাসা ঘোলা জলাশয়, একে পুকুর বললেও অতিরিক্ত হয়, বিল বললেও আসলে ঠিক মানায় না কিন্তু এটি বিলই, একধরণের বিল, মাছহীন ময়লা কাদা সাপ জোঁকের বিল। হাঁসের বাচ্চাগুলো মুরগির বাচ্চার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটে, একরকম দেখতে, রংও একই রকম হলুদ। কোনটি হাঁসের, কোনটি মুরগির ঠিক ঠাহর করা যায় না। হাঁস মুরগি বেশি দিন টেকেনি মার।ডিম ভেজে দিতে হয় বাড়ির মানুষকে। মুরগির বাচ্চা খানিকটা বড় হলেই দাদা বলেন, বেজিই তো খাইয়া ফেলব, তার চেয়ে বেশি কইরা পিঁয়াজ দিয়া আমার লাইগা একটা মুরগি ভুনা কইরা দেন মা। মা মুরগি রাঁধেন আর আড়ালে চোখের জল মোছেন। বাড়িতে অতিথি এল, কি খাওয়ানো যায়? কিছুই তো নাই, ঠিক আছে, মুরগি জবো করা হোক। মা উঠোনে খেলতে থাকা মুরগিরগুলোর দিকে স্বপ্ন-চোখে তাকিয়ে বলেন,পালা মুরগি আবার জবো করে কেমনে? দাদা বলেন, গলাডার মধ্যে আল্লাহু আকবর কইয়া বটির পুচ মাইরা জবো করে মা। এক্কেবারে সোজা। শেষ অবদি মার পালা মুরগি দাদার রসনা তৃপ্ত করতে, আমাদের পেট ভরাতে আর অতিথি আপ্যায়নে ব্যবহার হতে থাকে। মা পালা মুরগি বা হাঁসের একটি টুকরোও মুখে দেন না, আলু ভর্তা করে খেয়ে ওঠেন। হাঁস মুরগির খোঁয়াড় খাঁ খাঁ করে মাস না যেতেই। কেবল হাঁস মুরগি নয়, মার গাছের লাউ, সীম, কুমড়ো, ফুলকপি বাধাঁকপি, টমেটো, পুঁইশাক খেতে থাকি আমরা। চাল ডাল তেল নুন ছাড়া বাজার থেকে মাস যায় বছর যায় তেমন কিছু আনার প্রয়োজন হয় না। বাবার খরচ বাঁচান মা। ছেঁড়া শাড়ি, উড়ো চুল, রুখো ত্বকের মা সংসারে আয়ের পথ খোলা রেখেছেন। বাবা বাড়িতে যে ফলই নিয়ে আসেন, মা সে ফলের বিচি মাটিতে পুঁতে রাখেন। পোঁতা বিচি থেকে ডালিম গাছ, ফজলি আমের গাছ, জামরুল গাছ, লাল পেয়ারার গাছ, লিচু গাছ সবই গজাতে থাকে। হাঁস মুরগির শোক থেকে একদিন গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দুটো ছাগলের বাচ্চা আনলেন মা, মানুষের বাচ্চার মত ছাগলের বাচ্চাদুটোকে বোতলে দধু খাইয়ে বড় করে তুললেন। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছাগলদুটো মার ফলের গাছ গুঁড়িসুদ্ধ খেয়ে ফেলতে লাগল, মা বেড়া দেন, বেড়া ডিঙিয়ে ছাগল তাদের আধিপত্য বিস্তার করে। মা মরিয়া হয়ে ওঠেন গাছ বাঁচাতে, আবার ছাগলদেরও সুখী রাখতে। ছাগলদুটোর নাম রাখা হল, লতা আর পাতা। লতা আর পাতা লতা-পাতা খেয়ে চমৎকার জীবন যাপন করছে। এমন আদর মার লতা আর পাতার জন্য, রাতে উঠোনে বা বারান্দায় ঘুমোলে কে আবার কামড় দেয় ওদের, নিজের ঘরে এনে রাখেন। ছাগলের ভ্যা ভ্যা গু মুতে মার ঘর ভেসে থাকে। কাঁঠাল গাছে উঠে লতা পাতার জন্য কাঁঠাল পাতা পেড়ে দেওয়ার কাজ আমি নিজে চেয়ে নিই। কাঁঠাল পাতা লতা খায় তো পাতা খায় না। ওর মখু টি বড় উদাসীন দেখতে লাগে। ওর পাতা নাম ঘুচে যায় আমি যখন ওকে বৈরাগি বলে ডাকতে শুরু করি। বৈরাগি একদিন হারিয়ে যায়। মাঠে ঘাস খাচ্ছিল, ফটক খুলে বাড়িতে কেউ এসে খোলাই রেখেছে ফটক, ফাঁক পেয়ে বৈরাগি সত্যিকার বৈরাগি হয়ে ঘর সংসারের মায়া ত্যাগ করে চলে গেছে। পাড়াসুদ্ধ খোঁজা হয়। নেই। আকুয়ার গরুর খোঁয়াড়ে, যেখানে ছাড়া-গরু ছাড়া-ছাগল রাস্তাঘাটে পেলে জমিয়ে রাখা হয়, খুঁজে এলেন মা, নেই। মা চোখের জলে নাকের জলে ডুবে নদীর পাড়ে বুড়া পীরের মাজারে গিয়ে টাকা পয়সা ঢেলে মোমবাতি জ্বেলে পীরের দোয়া চেয়ে এসেছেন যেন বৈরাগি বৈরাগ্য ভুলে ঘরে ফিরে আসে। এই বুড়া পীরের মাজারটি অদ্ভুত এক মাজার। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে একটি খোলা ঘরের প্রায় সবটা জুড়ে লাল কাপড়ে মোড়া বিশাল একটি বাঁধানো কবর, সকাল সন্ধ্যা মানতকারীদের ভিড়। বুড়া পীর কে ছিলেন, কি করতেন, কবে মরেছেন, কেন তার কবরে লোকে মোম আর আগরবাতি জ্বেলে নিজের ইচ্ছের কথা শুনিয়ে আসে, মাকে জিজ্ঞেস করি। বুড়া পীর লোকটি কি মৃত্যুর ওপার থেকে কারও সাধ আহলাদ মেটাতে পারেন, যদি পারেন কি করে পারেন? আমার এই কঠিন প্রশ্নটির খুব সরল একটি উত্তর দেন মা, নিশ্চয়ই পারেন, আল্লাহ নিশ্চয়ই উনারে ক্ষমতা দিছেন পারার, না পারলে এত লোক যায় কেন মাজারে! হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান সবাই যায়। পীর মুসলমান ছিলেন, কিন্তু হিন্দুর ভিড় ওখানে মুসলমানের চেয়ে কম নয়।মার বিশ্বাস যত গভীরই হোক, বুড়া পীরে কাজ হয় না, বৈরাগি আর ফেরে না। লতা তার সঙ্গী হারিয়ে নিজেও উদাস হতে থাকে দিন দিন। বারান্দায় লতার গু মুত দেখে বাড়ির সবাই বিরক্ত কিন্তু মার কিছুতে বিরক্তি নেই। নিজে হাতে তিনি গু মুত সাফ করেন, লতাকে উঠোনে বেঁধে রাখেন, মাঠে বাধঁ লে আবার যদি খোলা ফটক পেয়ে বৈরাগির মত সেও বৈরাগ্য বরণ করে! হরিণের রঙের মত রঙ লতার, শিং আরও পেঁচিয়ে ওপরে উঠলে হরিণ বলেই মনে হত, মা বলেন। মাকে বলি, আবার হরিণ পালার শখ কইর না যেন। মা বড় শ্বাস ছেড়ে বলেন, হরিণ কি আর পোষ মানার প্রাণী! মার এত আদরের লতা, পুত্রবৎ স্নেহে যে বাচ্চাকে ছাগল করে তুলেছিলেন, সেও বৈরাগির মত একদিন নেই হয়ে গেল। মা লতার দুধের বোতল, লতার দড়ি, খুঁটি, আধখাওয়া কাঁঠাল পাতা সামনে নিয়ে চোখের পানি ফেলতে লাগলেন। মার শোক তখনও সম্পূণর্ ফুরোয়নি, বাড়িতে দেখি একটি লাল রঙের গরু। মা এনেছেন। গরু কোত্থেকে এল, গরু কেন এল বাবা এসব কোনও প্রশ্নে গেলেন না। সম্ভবত গরুর প্রতি মায়া বাবার সেই ছোটবেলা থেকেই ছিল বলে গরুর এ বাড়ি থাকা চলবে না এরকম কোনও আইন জারি করলেন না। এই গরু কোনও একদিন বাছুর বিয়োবে, সের সের দধু দেবে, অথবা বড় হলে এটিকে ভাল দামে বিক্রি করা যাবে বাবা সম্ভবত এরকমও ভেবেছিলেন। মা মহা উৎসাহে গরুকে গোসল করানো, খাওয়ানো, গরুর গা থেকে মাছি তাড়ানো, এমনকি গরুর যেন ঠাণ্ডা না লাগে পিঠে পুরোনো একটি কম্বল বিছানো—সবই করতে লাগলেন। দধু ওয়ালি ভাগীরথীর মাকে ডেকে প্রতিদিন এক খাঁচা করে ঘাস আনার ব্যবস্থা করলেন। গরুর জন্য ভাল একটি খুঁটি নিজেই বানিয়ে নিলেন। গরুর নাম মা রাখলেন ঝুমুরি। ঝুমুরিকে তিনি কিছুতেই হারিয়ে যেতে দেবেন না। কিন্তু দিন যায়, ভাগীরথীর মার খাঁচায় ঘাস কমতে থাকে। ঝুমুরির খাদ্য যোগাতে মা অস্থির হয়ে পড়েন। মাঠে যা ঘাস ছিল, সবজির বাগান করে ফেলার পর ঘাস বলতে কিছু নেই। ঝুমুরিকে শেষ অবদি ঘাগডহরে আবদুস সালামের বাড়িতে লালন পালনের জন্য দিলেন মা। গ্রামের মাঠে অঢেল ঘাস আছে, সালামের বাড়ির অন্য গরুর সঙ্গে ঝুমুরিও মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে খাবে, হৃষ্টপুষ্ট হবে। ঝুমুরিকে রাখার জন্য মা সালামের হাতে কিছু টাকা পয়সাও মাসে মাসে দিতে থাকেন, নিজেও ঘাগডহরে প্রায়ই তাঁর আদরিণীকে দেখে আসেন, গায়ে হাত বুলিয়ে আসেন। দিন যায়, সালাম একদিন মখু মলিন করে বলে, গরু চুরি হইয়া গেছে। মার কিছুই থাকে না, সব চলে যায়। গরু চুরির পর মা কবুতর নিয়ে পড়লেন। প্রথম শাদামাটা বাজারের কবুতর নিয়ে এলেন। মা তো আর ইচ্ছে করলেই কিছু নিয়ে আসতে পারেন না। মাসের পর মাস স্বপ্ন দেখেন, বাবার কাছে আবদার করেন, বাবা আবদার ফিরিয়ে দিলে তিনি তাঁর নিজের আত্মীয়দের কাছে আবদার করেন, তাতেও ব্যথর্ হলে শেষ অবদি ধারই করেন। ধার শোধ করাও মার পক্ষে চাট্টিখানি কথা নয়। নিজের গাছে যে কটি ডাব হয় তা রশিদের কাছে বিক্রি করে মার টাকা শোধ করতে হয়। মা যে ডাবগাছগুলো লাগিয়েছিলেন এ বাড়িতে আসার পর, সেসব গাছ বড় হয়ে ডাব ধরার পর বাবাই অন্য গাছগুলোর ডাবের মত মার লাগানো গাছের ডাব বিক্রি করে নিজের পকেটে পয়সা ঢোকাতেন। মা মুরগি পালার পর থেকে নিজের লাগানো গাছগুলোর ডাব তিনি নিজে বিক্রি করতে পারবেন, এই অধিকারটি দিনরাত লেগে থেকে নেন। শাদামাটা কবুতরদুটো পরদিনই উড়ে চলে গেল, মা উন্মুক্ত আকাশটির দিকে সারাদিন উন্মখু তাকিয়ে ছিলেন হাতে খাবার নিয়ে, বাকবাকুম বাকবাকুম বলে ওদের ডেকেছেন অনেক, কেবল তাই নয়, অনেক রাত অবদি বারান্দায় বসে ছিলেন, পাখিরা রাত হলে নীড়ে ফেরে, যদি ফেরে এই আশায়। যদি বাড়ির পথ চিনতে ওদের ভুল হয়ে থাকে, রাত বিরেতে চিনে আবার ফিরতেও তো পারে, মা আশা ছেড়ে দেওয়ার মানুষ নন। ওরা ফেরেনি। বাইরের বারান্দার ওপর ঢেউ খেলানো খোপে জালালি কবুতরের বাসা। কবুতরের গুয়ে শাদা হয়ে থাকে বারান্দা। অনেকদিন কবুতরগুলোকে তাড়াতে চেয়েছি, মা বলেছেন, জালালি কবুতর থাকলে সংসারে শান্তি থাকে, ওদেরে তাড়াইবি না। হাতের নাগালে ওদের একটিকে পেয়ে খপ করে ধরে দাদা মাকে ডেকে একদিন বললেন, জালালি কবুতরেরা বড় জালাইতাছে মা,এইটা রোস্ট কইরা দেন, খাই। মা দাদার হাত থেকে কবুতর কেড়ে নিয়ে আকাশে উড়িয়ে দিয়ে বলে দিলেন, জালালি কবুতর খাইতে হয় না। তর লাইগা অন্য কবুতর রাইন্ধা দিব নে, এদেরে খাইস না কোনওদিন। জালালি কবুতরের মনে কষ্ট দিলে সংসারের শান্তি জন্মের মত চইলা যায়। শাদামাটা কবুতরগুলো চলে যাওয়ার পর মোজাপরা টোপর পরা চমৎকার এক জোড়া কবুতর নিয়ে এলেন মা। এ জাতের কবুতর পাওয়া যায় না, মা মুল্লুক ঘুরে এদের এনেছেন। কবুতরের জন্য রান্নাঘরের চালের তলে কাঠের একটি ঘর বানিয়ে দিলেন মা, ঘরে ছোট্ট একটি দরজা, দরজা খুলে বেরোলে এক চিলতে বারান্দা। বারান্দায় ছোট একটি বাটিতে খাবার থাকে, কবুতরদুটো বাক বাকুম বলে ঘর থেকে বেরিয়ে খাবার খায়। এবারেরগুলোয় মা পাখনা বেঁধে দিয়েছেন যেন খুব বেশিদূর উড়তে না পারে। কবুতরগুলোকে ওড়া থেকে বঞ্চিত করার কোনও ইচ্ছে মার নেই, মা চান ওরা মার হাত থেকে খাবার খাক, উঠোনের গাছ গাছালিতে বসুক, উঠোন শাদা করে হাঁটুক, উড়ুক, উড়ুক কিন্তু বেশিদূর না যাক, বেশিদূর গেলেও বাড়ির পথ চিনে সন্ধের আগে আগে কাঠের ঘরটিতে ফিরে আসুক। কবুতরদুটো ডিম পাড়ল, বাচ্চাও ফোটালো, বাচ্চাগুলোকে বেজি নিয়ে গেল, কাকে খেলো, তারপর মোজা পরা টোপর পরা ভাল জাতের দুটো কবুতর মনের দুঃখে বসে থেকে থেকে অসখু বাঁধালো শরীরে। মা অসখু সারাতে পারেননি। কবুতর মরে যাবার পর বাবা বললেন, এই অলক্ষুণ্যা মাগির কাছে কিছুই থাকে না। সব যায় গা। তা ঠিক, মার কাছে কিছু থাকে না, সব মাকে ছেড়ে চলে যায়। বারান্দার খোপে জালালি কবুতর তখনও বাকুম বাকুম দিন কাটায়। ওদের দেখলে দাদার মত আমারও খেতে ইচ্ছে করে। বাবা বাড়িতে মাস যায় কোনও মাছ মাংস পাঠান না। শাক সবজি আর শুটকি খেতে খেতে রীতিমত বিরক্ত আমি, মাকে জানাই এখন জালালি কবুতর রাঁধা ছাড়া আর উপায় নেই। ছেলেমেয়ের কিছু খেতে ইচ্ছে হলে মা যে করেই হোক সে জিনিস খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেন। একদিন পেয়ারা খেতে ইচ্ছে করছিল, পেয়ারার দিন নয় তখন অথচ মা শহর ছাড়িয়ে কোন এক গ্রামে এক সামান্য চেনা মহিলার বাড়ি গিয়ে, শুনেছিলেন সে মহিলার বাড়ির গাছে অসময়ের পেয়ারা জন্মায়, কিছু পেয়ারা নিয়ে এসেছিলেন আমার জন্য। কিন্তু আমার কবুতর খাওয়ার ইচ্ছের গোড়ায় মা মোটেও জল ঢালেন না। আমার ইচ্ছের পাশ কাটিয়ে তিনি চলে যান। সংসারের শান্তি তিনি কিছুতেই নষ্ট হতে দেবেন না।

মাকে ছেড়ে সবাই চলে যায়। মা একা বসে থাকেন ছেঁড়া শাড়ি, উড়ো চুল রুখো ত্বক নিয়ে। ছেঁড়া তোশকের ওপর ছেঁড়া মশারির তলে সারারাত এপাশ ওপাশ করেন। মার ফুসফুস জুড়ে কফ জমে, মা কফ থুতু ঘরের মেঝেতেই ফেলেন, দেখে আমার ঘেন্না লাগে। মা নিজের জন্য কাউকে চেয়েছিলেন, মানুষ নয়ত পশু পাখি। মানুষ তো থাকেই নি, পশু পাখিও থাকেনি। ভোর বেলা থেকে রাত অবদি মা আমাদের জন্য রান্না করবেন, আমাদের খাওয়াবেন, বাড়ি ঘর গোছাবেন, কাপড় চোপড় ধোবেন, আমরা খাব দাব, হৈ হুল্লোড় করব, আমরা আমাদের লেখাপড়া খেলাধুলা গান বাজনা ইত্যাদি নিয়ে থাকব। মার জন্য কেউ থাকবে না, কিছু থাকবে না। এরকমই নিয়ম। মার কর্তব্য মা পালন করবেন। মা করেনও। সংসারের কাজ কর্ম সেরে মা একা বসে দরুদ পড়েন, আল্লাহর কালামে মন ঢালতে চেষ্টা করেন। আর থেকে থেকে বাবা যে রাজিয়া বেগমকে বিয়ে করেছেন, এ যে মিথ্যে কথা নয় তা বলেন। পীর বাড়ি যেতে আসতে মা নাকি প্রায়ই বাবাকে দেখেন নওমহলের রাস্তায়। আমি ধারণা করি বাবার বিরুদ্ধে মা কথা যা বলেন, বানিয়ে বলেন। বাবা যত দূরের মানুষই হন, বাবার প্রতাপ আর প্রভাবে আমি যতই নুয়ে থাকি, যতই কিল ঘুসি চড় চাপড় খাই, যতই সন্ধিবেতের আর চাবুকের মার পিঠে এসে পড়ে, বাবার প্রতি এক ধরণের শ্রদ্ধা আমার থেকে যায়, সেটি ঘোর দুর্যোগের সময়ও মরে না। মার অভিযোগ শুনেও আমরা রা করি না। যা চোখের সামনে ঘটে না, তা বিশ্বাস করার অভ্যেস অন্তত আমার নেই। মাকে ছিঁচকাঁদুনে অবুঝ একটি মেয়েমানুষ ছাড়া আমার কিছু মনে হয়না। মার বুদ্ধি সুদ্ধি কিছু আছে বলেও মনে হয় না, থাকলে তিনি কেন আল্লাহ রসুলে বিশ্বাস করেন! থাকলে তিনি কেন আমান কাকার সঙ্গে ওরকম একলা ঘরে নসিহতের নাম করে বসে ফিসফিস কথা বলতেন! এবাড়িতে আমান কাকার আসা বন্ধ করে দিয়েছেন বাবা। আমান কাকার বউ এসে একদিন মাকে জানিয়ে যান, তাঁর স্বামী গফরগাওঁ এ চাকরি করছিলেন, ওখানে এক মহিলাকে সম্প্রতি বিয়ে করেছেন। মা শুনে নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলেছেন, বেডার জাত তো, করবই। কোনও বেডার জাতের প্রতি মার কোনও রকম শ্রদ্ধা নেই সম্ভবত। কিন্তু বাবা তু তু করলেই মা যে কেমন মুরগির মত দৌড়ে যান বাবার কাছে!মার বসে থাকা, শুয়ে থাকা, হাঁটা চলা, দৌড়ে যাওয়া সবই বড় বিচ্ছিজ্ঞর লাগে দেখতে।

বাড়িতে সবাই ব্যস্ত বাবা ব্যস্ত রোগী নিয়ে, গ্রামের জমিজমা নিয়ে। দাদা ব্যস্ত চাকরি নিয়ে। ছোটদা ব্যস্ত গীতা নিয়ে, গীতা পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে কিছুদিন ঘোরাঘুরি করে পদার্থবিদ হওয়ার স্বপ্ন বিদেয় করে নৃত্যকলায় মন শরীর সব ঢেলে দিয়েছে। নাচের দলের সঙ্গে বার্মা যাচ্ছে। আমি ব্যস্ত লেখাপড়া নিয়ে। ইয়াসমিনও। মা পড়ে থাকেন একা। কালো কুচ্ছিত হতদরিদ্র মা। কিছু না থাকা মাকে একরকম মানিয়ে যায়। মার যে সায়া থাকলে শাড়ি নেই, শাড়ি থাকলে ব্লাউজ নেই এসব দেখে আমরা অভ্যস্ত মার ফিনফিনে তেলহীন চুল বাতাসে উড়বে, ফিতে না পেয়ে মা পাজামার দড়ি খুলে বা চটের দড়িতে চুল বাঁধবেন, দেখে আমরা মখু টিপে হাসব, আমাদের ওই হাসিতেও অনেকটা অভ্যস্ত আমরা। মা বাড়িতে অনেকটা হাস্যকর পদার্থ। মাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি হাসেন বাবা। চাকরি পাওয়ার পর দাদা মাকে শাড়ি সায়া কিনে দিয়েছেন, কিন্তু বিয়ের কথা ভেবে ভেবে নিজের সংসারের আসবাবপত্র বানাতে বানাতে আর নিজের জামা কাপড় সুটবুট কেনায় দাদাও এমন ব্যস্ত যে মাঝে মাঝেই ভুলে যান যে মার গত ঈদের শাড়িটা ছিঁড়ে গেছে। মা তাঁর ছেঁড়া শাড়িগুলো নিয়ে গিয়ে নানিবাড়ির পেছনের বস্তি থেকে কাথাঁ বানিয়ে এনেছেন। একটু শীত নামলেই মা কাথাঁ বের করে প্রত্যেকের বিছানায় দিয়ে আসেন। মার কাথাঁর উষ্ণতায় আমাদের এত আরাম হয় যে আমরা সময়ের চেয়ে বেশি ঘুমোই, আর মা তুলো বেরিয়ে আসা ছেঁড়া লেপের তলায়, গা অর্ধেক ঢাকে তো অর্ধেক বেরিয়ে আসে, এপাশ থেকে ওপাশ ফিরলে খাট নড়বড় করে, শুয়ে থাকেন। মা স্বপ্ন দেখতে থাকেন একটি নকশি কাথাঁর, কাঁথাটি বানিয়ে যদি কোনও এক রাতে বাবার শীত শীত লাগা গায়ের ওপর আলগোছে বিছিয়ে বাবাকে চমকে দিতে পারতেন! বাবা অবশ্য মার কোনও কিছুতে চমকান না। মা খুব চমৎকার খিচুড়ি রাধঁলেও না, মাথায় তেল দিয়ে ভাল একটি শাড়ি পরে, পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে মিষ্টি হেসে সামনে এলেও না। চাঁদনি রাতে জানালায় বসে ঘুম ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা এই মাধবী রাত, আসে নি তো বুঝি আর জীবনে আমার! গাইলেও না। বাবার মন মায়ে নেই। মা বোঝেন তা। আমরাও বুঝি। সংসারের হাড়ভাঙা খাটুনির মাঝখানে কখনও কখনও ক্লান্ত শুয়ে থাকেন তিনি। মার শুয়ে থাকা দেখলে বাবা চিৎকার করে বাড়ি মাথায় করেন। এভাবে শুয়ে থাকলে সংসার উচ্ছন্নে যাবে বাবার ধারণা। বাড়িতে চোর ঢুকে সব নিয়ে যাবে। কাজের মানুষগুলো কাজে ফাঁকি দেবে, চুরি করে মাছ মাংস খেয়ে ফেলবে। মেয়েরা পড়াশোনা রেখে আড্ডা পেটাবে। বাবার অমন বাড়ি মাথায় করা চিৎকারের দিনে মা একদিন শুয়ে থাকা থেকে নিজের শরীরটি টেনে তুলে বলেন,পাইলসের রক্ত গেছে অনেক। শইল কাহিল হইয়া গেছে। বাবা শুনে বলেন, ঢং দেইখা বাচি না।

মা অনেকদিন বাবাকে খুব নরম স্বরে জিজ্ঞেস করেছেন, পাইলসের কি কোনও চিকিৎসা নাই?

বাবা বলেছেন, না।

এই যে এত্ত এত্ত রক্ত যায়। পায়খানা ভইরা রক্ত যায়। এইভাবে রক্ত যাওয়া খারাপ না?

গম্ভীর কণ্ঠে বাবা উত্তর দেন, না।

মার চটি ছিঁড়ে পড়ে আছে অনেকদিন, বাবাকে চটি কেনার কথা বলা হয়, বাবা শুনেও শুনলেন না। আমার বা ইয়াসমিনের চটি পরে কোথাও যাবার হলে মা যান, আর ঘরে বারান্দায় উঠোনে তো খালি পায়েই। বাড়ির লোকের খুব একটা চোখে পড়ে না আজকাল মার কি নেই, মার কি প্রয়োজন। নানার মত বেহিসেবি বাউণ্ডুলে মানুষের নজরে পড়ে মার পাদুকাহীন জীবন। তিনি একদিন মার জন্য একজোড়া শাদা কাপড়ের জুতো কিনে নিয়ে এলেন। এরকম জুতো যে মেয়েরা কখনও পরে না সে ধারণা নানার নেই। কিন্তু মা জুতো জোড়া পেয়েই খুশিতে আটখানা, বাড়ির সবাইকে দেখালেন যে তাঁর বাজান তাঁর জন্য জুতো এনেছেন। সেদিন মা নানার জন্য বেশি মিষ্টি দিয়ে,নানার চিনি খাওয়া বারণ জেনেও,পায়েশ রাঁধেন। নানা খেয়ে দেয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে মেয়ের জন্য দোয়া করেন, মেয়ের যেন বেহেসত নসীব হয়। বেহেসতের খাবার দাবারের বর্ণনা করেন নানা, বেহেসতে এমন খানা একবার খাইব তো চল্লিশ হাজার বছর খাইতেই থাকব, ঢেকুর একটা আইব তো মেসকাম্বর। নানার বর্ণনা শুনে আমার ধারণা হয় বেহেসতের ভাল ভাল খানা খাওয়ার লোভেই নানা বুঝি নামাজ রোজা করেন। নওমহলে পীরের প্রতাপ এমনই বেড়েছে যে, এখন আর রিক্সাঅলাকে বলতে হয় না, নওমহল চান্দুর দোকানের পিছনে যাইবা? নওমহলের পীর বাড়ি বললে রিক্সাঅলা চেনে। আগে মা চারআনা করে যেতেন, দাম বেড়ে পরে আট আনা হল, আট আনা থেকেও লাফিয়ে এক টাকা। মার হাতে অত পয়সা নেই যে ঘন ঘন তিনি বাপের বাড়ি বা পীর বাড়ি ছুটবেন। অনেক সময় যেতে ইচ্ছে করলেও মাকে ইচ্ছের লাগাম টেনে ধরতে হয়। সেদিন সকালে আমি ইশকুলে যাব, এক প্যাঁচে শাড়ি পরে, তার ওপর রংচটা বোরখাটি পরে, পায়ে নানার দেওয়া কাপড়ের জুতো, বললেন আমারে নামাইয়া দিবা রেললাইনের মোড়টায়? মার আপাদমস্তক দেখে আমি নাক কুঁচকে বলি, তুমি আরেকটা রিক্সা নিয়া গেলেই তো পারো!

রিক্সাভাড়া নাই যে।

নাই তো কারও কাছ থেইকা নেও।

কেউ ত দিল না।

আজকে যাইও না তাইলে,বাদ দেও। অন্যদিন যাও।

মা আমার উপদেশ মানেন না। মার কাছে আজ এবং অন্যদিনে কোনও পার্থক্য নেই। অগত্যা সঙ্গে নিতে হয় মাকে। মনে মনে প্রার্থণা করতে হয় যেন রাস্তায় চেনা কেউ না পড়ে, রংচটা বোরখা আর মোজাহীন কাপড়ের জুতো পরা কারও সঙ্গে আমাকে যেন কেউ না দেখে। সি কে ঘোষ রোড পার হয়ে রেললাইনের সামনে মা নেমে যান। বেশির ভাগ রাস্তাই সামনে পড়ে আছে, পীর বাড়ি যেতে আরও দুমাইল পথ, তিনি হেঁটে পার হবেন। ইশকুলে পৌঁছলে আশরাফুন্নেসা সগৌরবে জানায় ,তরে দেখলাম রিক্সা কইরা আইতাছস। আমি হাত নাড়লাম, তর খবর নাই।

আমি ত তরে দেখলাম না।

দেখবি কেমনে। মাটির দিকে তাকাইয়া ছিলি ত। মনে হইতাছিল লজ্জাশীলা কুলবধূ। যাহ!

মহাকালির মোড়ে আমার রিক্সা তর রিক্সারে ক্রস করল। তর সাথে তোদের কাজের বেটি ছিল।

নিজের বুকের ধ্বক শব্দটি নিজেই শুনি। জিভের কাছে চলে আসা বাক্যটি যে না কোনও কাজের বেটি না, আমার সঙ্গে আমার মা ছিলেন নিঃশব্দে গিলে ফেলি। জানি না কে আমার ঠোঁট জোড়া শক্ত সুতোয় সেলাই করে রাখে। সারাদিন আশরাফুন্নেসার ভুলটি শুধরে দিতে চেয়েও আমি পারিনি।

 

ইশকুল থেকে ফিরে আমার কানে কানে একটি গোপন খবর বলে ইয়াসমিন, কোন এক মেয়ে নাকি তাকে বলেছে তোমার বাবা ত দুইটা বিয়া করছে।

কি কইলি তারপর?

ইয়াসমিন বলে, কইলাম দুইটা বিয়া আমার বাবা করে নাই, মিছা কথা।

আমিও ফিসফিস করে বলি, আমারেও সেদিন ক্লাসের এক মেয়ে কইল এই কথা।

মা একদিন মন খারাপ করে বসেছিলেন বারান্দায়। আমাকে কাছে পেয়ে বলেন, তর বাবা ত চাকলাদারের বউরে বিয়া কইরা ফেলছে।

আমি বললাম কি যে কও মা!

হ। নওমহলের সবাই কইল।

সবাই কারা? তারা জানে কি কইরা?

দেখছে।

কি দেখছে?

দেখছে যে বেডি নওমহলেই এক বাসায় থাকে। আর তর বাবা সবসময়ই ওই বাসায় যায়।

এইটা ত নতুন না। এই সন্দেহ ত তুমি বহুদিন ধইরা করতাছ।

নিজের চোখে ত ঢুকতে দেখছে তর বাপেরে। বেডির সাথে কথাও কইছে। বেডি নিজে কইছে যে বিয়া হইছে।

হুদাই।

হুদাই হইলে তর বাপে ওই বাড়িত যায় কেন?

যাইতেই পারে। তার মানে কি বিয়া করা?

কারও বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া মানে যে বিয়ে করা নয়, তা আমি যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করি। কেন করি, মা যেন মন খারাপ না করেন, নাকি বাবার প্রতি আমার গভীর বিশ্বাস যে এমন মন্দ কাজ তিনি কিছুতেই করতে পারেন না, নাকি বাবা দুটো বিয়ে করেছেন এ আমার জন্যও এত লজ্জার যে আমি প্রাণপণে এই লজ্জার বোঝা বইতে অস্বীকার করি, বুঝি না।

সেইদিন আকুয়া গেছিলাম, সোহেলির মার সাথে দেখা, কইল তর বাবারে আর চাকলাদারের বউরে নাকি দেখছে সিনেমায় যাইতে। আমারে নিয়া তো কোনওদিন সিনেমায় যায় না তর বাপ!

সিনেমায় কি তুমি যাইবা নাকি! তুমি না আল্লার পথে গেছ ! বলে আমি মার সামনে থেকে সরে যাই।

 

রাজিয়া বেগম নিয়ে মার ঘ্যানর ঘ্যানরের পরও মা মন দিয়ে রান্নাবাড়া করেন, স্বামী ছেলেমেয়েদের খাওয়ান, তেল পেঁয়াজ না থাকলে, বিরস মুখে ওসব ছাড়াই রাঁধেন আর খেতে বসিয়ে বলেন তেল ছাড়া পিঁয়াজ ছাড়া কি আর রান্ধা ভাল হয়! কোনওমতে খাইয়া নে আজকে। দেখি কালকে যদি …

কাল তেল আসে তো পেঁয়াজ আসে না। পেঁয়াজের সঙ্গে বাজারের পচা কই মাছ থলে ভরে পাঠিয়ে দিয়েছেন বাবা। থলে খুলেই মা দেখেন পচা মাছের গন্ধ বেরোচ্ছে। তাই বলে কি ছেলেমেয়ে উপোস থাকবে। লেবগুাছ থেকে মুঠো ভরে লেবপুাতা ছিঁড়ে এনে মাছের ঝোলে দেন। লেবুপাতার গন্ধের তলে যেন মাছের গন্ধ চাপা পড়ে। শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না, লেবপুাতার গন্ধ দিয়ে মাছের পচা গন্ধ হয়ত ঢাকা যায় কিন্তু লেবপুাতার উপস্থিতিই আমাকে সন্দিহান করে, খেতে বসেই নাক সিটকোই, লেবুপাতা দিছ কেন মা? মাছ নিশ্চয়ই পচা ছিল? এক চিলতে হাসি মার ঠোঁটের কোণে ঝিলিক দিয়েই মিলিয়ে যায়। মা আমার পাতে একটি না-ভাঙা মাছ তুলে দিয়ে বলেন, মাছগুলা জেতা ছিল। আল্লাহর কসম কইরা কও তো জেতা ছিল!

কথায় কথায় আল্লার কসম কাটতে হয় না। মা নরম ধমক লাগান।

দাদা একটি খেয়ে আরেকটি মাছ নেন। আমি থাল সরিয়ে বলি মাছ পচা, খাইতাম না।

মাছ আবার পচা কোত্থেকা হইল! মা রান্নাঘর থেকে জরির মাকে ডেকে আনেন, এই কও,কাটার সময় মাছ লাফাইতাছিল না?

জরির মা মাথা নেড়ে বলে, হ লাফাইতাছিল।

লাফাক। আমি মাছ খাইতাম না। অন্য কিছু থাকলে দেও।

দাদা মাকে বুদ্ধি দেন, মাছটা একটু নরম হইয়া গেলে ভাইজা ফেলবেন, ভাজলে আর গন্ধ থাকে না।

নাসরিনের ত শকুনের নাক। মা বলেন।

বাবা রাতে ফিরে যখন প্যান্ট খুলে লুঙ্গি পরতে থাকেন, মা বলেন পয়সা যে জমাইতাছুইন, কার লাইগা জমাইতাছুইন?

কার লাইগা জমাইতাছি মানে? এতগুলা মানুষ খাওয়াইতাছি, পরাইতাছি। চোক্ষে দেহ না?

আমি আমার কথা কই না। আমি ত ডাইল দিয়া খাইয়া উঠতে পারি। কইতাছি ছেলেমেয়েদের কথা!পচা মাছ পাঠান কেন? ইশকুল থেইকা ক্ষিদা পেটে আসে, ভাত খাইতে পারে না।

মাছ পচা ছিল নাকি?

পচা ছিল না মানে? গন্ধে তো বাড়ি উজাড় হইয়া যাইতাছিল।

হুম।

আর পিঁয়াজ যে নাই এক মাস হইয়া গেল। পিঁয়াজ কিননেরও কি পয়সা নাই?

পিঁয়াজ না পাঠাইলাম কয়দিন আগে। শেষ হইয়া গেল?

কয়দিন আগে? মা খানিকটা সময় নিয়ে হাতের কড়া গুনে বলেন, আজকে হইল রোববার, গত রোববারের আগের রোববারও পিঁয়াজ ছাড়া রান্ধা হইছে। তার আগের মঙ্গলবারে না পিঁয়াজ পাঠাইছেন!

এত তাড়াতাড়ি শেষ হইয়া যায় কেন? হিশাব কইরা খর্চা কর না কেন? বাজারে পিঁয়াজের দাম কত খবর রাখো? কামাই ত কর না, কামাই করলে বুঝতা।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। কামাই কি তিনি শখে করেন না!

 

বাবার ওষুধের দোকানের কর্মচারি আবদুস সালাম বাজার-সদাই নিয়ে বাড়ি এলে মা তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে কথা বলেন। এক বিকেলে দেখি সালামকে মাছ ভাত খাওয়াচ্ছেন রান্নাঘরে বসিয়ে। সালাম ভাল কইরা খাইয়া লও, সেই সকাল বেলা কি মুখে দিয়া যে আসো, তারপর ত সারাদিন খাওয়া নাই!

মার এমন একে ওকে খাওয়ানো নতুন কিছু নয়। বাড়িতে শুকনো মুখের কোনও ভিখিরি এলে মা ওদের বসিয়ে খাওয়ান। বাসি তরকারি পান্তা ভাত শুকনো মরিচ। ওসবই ওরা পরম সুখে খেয়ে নেয়। কারও জমিজিরেত ছিল, হঠাৎ অভাবে পড়ে ভিক্ষে করছে শুনলে পাতিল থেকে দুটুকরো নতুন রান্না করা মাংসও তুলে দেন। মার দয়ার শরীর। সালাম খেয়ে দেয়ে হাসিমুখে বিদেয় নেওয়ার পর মা আমাকে ডাকলেন, দাদাকে ডাকলেন,বললেন এই যে তর বাপ পচা মাছ কেন পাঠায়, জানস? কেন বাড়িত তেল আনেনা, পিঁয়াজ আনেনা?

কেন মা? দাদা জিজ্ঞেস করেন।

কিরীটি রায়ের মত বহুকালের রোমহর্ষক রহস্য উদঘাটন করার ভঙ্গিতে মা বলেন, কারণ দুই জায়গায় বাজার পাঠাইতে হয় ত! এত কুলাইব কেমনে! ওই বেড়ি তার কাজের লোক পাঠাইয়া দেয় ফার্মেসিতে আর তর বাপে নিজে বাজারে হাইটা যাইয়া বাজার কইরা পাঠায় বেড়ির বাড়িত। ওই বেডিরে ত বিয়া করছে। বেডির ছোট ছেলেডাও ফার্মেসিতে আইসা বইসা থাকে। ওরে লেখাপড়ার খরচ দেয়। ও ত আসলে তর বাপের ছেলে, চাকলাদারের না।

আমার অস্বস্তি হয় মার অভিযোগ শুনতে। দাদারও হয়। দাদা বলেন কী যে কন না কন, কার কাছে কি শোনেন আর চিল্লাচিল্লি করেন।

কার কাছে শুনি? আচ্ছা যা না, নওমহলেই ত থাকে বেডি, বেডির বাড়িত যাইয়া দেইখা আয়, জাইনা আয় তর বাপ বিয়া করছে কিনা, প্রত্যেকদিন বাজার-সদাই পাঠায় কি না।

হ। আমার আর কাম নাই বেডির বাড়িত যাইয়াম! দাদা সরে যান মার সামনে থেকে। আমিও যাই। মার অভিযোগ অনুযোগ সবই আমাদের চেনা। মার বিলাপ প্রলাপ সব চেনা। মার চিল্লাচিল্লিতে কোনও করুণার উদ্রেক আমাদের হয় না, যদি হয় কিছু সে বিবমিষা।

মা একা বসে থাকেন। তাঁর দুঃখ শোনার বাড়িতে আর কেউ নেই। তিনি জরির মাকে ডাকেন, বলেন, দেখ জরির মা, এই সংসারে আমার শান্তি নাই। আমার ত কপাল পুড়ছে, লেখাাপড়াডা যেদিন বন্ধ করল, সেইদিনই। আইজ যদি লেখাপড়া জানতাম, তাইলে কি আর নিজের সংসারে নিজে বান্দিগিরি করি! ছেলেমেয়েগুলাও হইছে বাপের ভক্ত। আমারে মা বইলা গ্রাহ্যই করে না।

জরির মা মার দুঃখ বোঝে না। তার নিজের দুঃখের সঙ্গে তুলনা করলে মার দুঃখ তার কাছে কিছুই মনে হয় না। তার বিয়ে হয়েছিল তিন সতিনের সংসারে, সতিনের জ্বালায় সে জ্বলেছে অনেক। স্বামীও তাকে কম জ্বালায়নি। জরি জন্ম নেওয়ার পর জরির মাকে ভাত দেওয়া বন্ধ করে দিল। শেষে তো লাত্থি গুঁতা দিয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়েই দিল। আর এ সংসারে মা তো অন্তত ভাত পাচ্ছেন। সতিন? সে তো অন্য বাড়িতে থাকে, এক বাড়িতে নয়। জরির মার কাছে মার সংসারকে সোনার সংসার বলে মনে হয়। জরির মা মার কথায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে, আমি নিশ্চিত, দীর্ঘশ্বাসটি নকল।

এত দুঃখ নিয়েও মা বাড়িঘর সাজান, খাট আলমারি টেবিল চেয়ার আলনা সরিয়ে নতুন জায়গায় ফেলেন। দেয়ালের কাছে খাট ছিল, সেটি একেবারে উল্টোদিকে জানালার কাছে নিয়ে যান, আলমারি ডানদিক থেকে সরে বাম দিকে আসে। মার এ কাজটি আমার খুব পছন্দ হয়। ঘর একেবারে নতুন নতুন লাগে। মনে হয় নতুন জীবন শুরু হল। কেবল ঘর সাজানোই নয়, মা উঠোন মাঠ ফলগাছে ফুলগাছে শাকে সবজিতে সাজিয়ে রাখেন। এক এক ঋতুতে এক একরকম। হেলে পড়া গাছগুলোর কিনার দিয়ে বাঁশের কঞ্চির বেড়া দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার করা, মাটি কাটা মাটি ফেলা নিজেই করেন। শাক সবজি মা খুব ভালবাসেন। ছড়া বলে বলে হলেও তিনি আমাদের তাজা ফল, টাটকা শাক সবজি খাওয়াতে চেষ্টা করেন। মার ধারণা ছড়া শুনলে খুশিতে নাচতে নাচতে শাক খাব আমরা। মার আরও ধারণা মার হাতে লাগানো শাক সবজির প্রতি মার মত আমাদেরও আলাদা দরদ আছে। সারাবছরই পাতে সবজি তুলে দিয়ে বলেন,গাছের লাউ, গাছের সিম, গাছের টমেটো, গাছের এটা, গাছের সেটা।

একদিন খেতে গিয়ে মার মুখে গাছের লাউ উচ্চাজ্ঞরত হতেই আমি খপ করে ধরি।

গাছের লাউ মানে? লাউ তো গাছেই ধরে। গাছ ছাড়া লাউ হয় নাকি!

মা বলেন, এইডা গাছের, এইডা কিনা লাউ না।

কিনা লাউ কি মাটির নিচে হয়?

ধুর, লাউ মাটির নিচে হইব কেন?

তার মানে লাউ গাছেই ধরে।

গাছেই ত ধরে!

তাইলে কও কেন যে এইডা গাছের লাউ! বাজার থেইকা কিন্যা আনা লাউও তো গাছের লাউ।

আরে এইডা বাড়ির গাছের।

সেইটা কও, বাড়ির গাছের। কথাও ঠিকমত কইতে পারো না।

আমি মখূর্ মানুষ,লেখাপড়া শিখি নাই। তোমরা শিক্ষিত, তোমরা গুছাইয়া কথা কইবা। মা থেমে থেমে বলেন।

লেখাপড়া নিয়ে মার আক্ষেপ সারা জীবনের। আমার মেট্রিক পরীক্ষার আগে আগে, আমি যখন টেবিল ভরা বইখাতার ওপর উবু হয়ে আছি, মা মিনমিন করেন, প্রাইভেটে মেট্রিকটা যদি দিয়া দিতে পারতাম।

আমি হেসে উঠি, এই বয়সে তুমি মেট্রিক দিবা?

কত মানুষে তো দেয়। গণ্ডগোলের সময় আমার চেয়েও কত বয়ষস্ক মানুষেরা মেট্রিক দিয়া দিল, তখন তো সবাইরে পাশ করাইয়া দিছে সরকার। ওই চাকলাদারের বউতো গণ্ডগোলের সময়ই নকল কইরা মেট্রিকটা পাশ করল। তোমার বাপেই তারে প্রাইভেটে মেট্রিক দেওয়াইছে।

তা ঠিক, একাত্তরের ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম যে মেট্রিকের আয়োজন হয়েছিল, যে যেমন ইচ্ছে বয়সে যত বড়ই হোক, অ আ ক খ হয়ত লিখতে জানে কেবল, বসে গেছে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিতে। গণহারে নকল। গণহারে পাশ। সেই গণহারে রাজিয়া বেগম পার হয়ে গেছেন।

এহন তো নকল চলে না, তুমি কেমনে পাশ করবা?

নকল করতাম কেন?

তাইলে পাশ করবা কেমনে?

আমি পইড়া পাশ করবাম।

এক পেট হাসিকে বুক-চাপা দিয়ে বলি, তোমার কি মনে থাকবে পড়া?

কেন মনে থাকবে না? থাকবে।

তুমি তো হাতের মধ্যে চাবি লইয়া সারা বাড়ি চাবি খুঁইজ্যা বেড়াও। মনে থাকবে কেমনে?

তুমি আমারে অঙ্কডা একটু দেখাইয়া দিলেই দেখবা আমি পাশ কইরা যাব। বাংলা ইংরেজি তো কোনও ব্যাপার না। ইতিহাস ভূগোল ঝাড়া মখু স্ত কইরা ফেলব।

মার দুচোখ চিকচিক করে স্বপ্নে। স্বপ্ন থাকে চোখে, স্বপ্ন চোখে রেখেই বলেন,পরীক্ষা দিলে ঠিকই পাশ করবাম। ক্লাসে আমি ফার্স্ট গার্ল ছিলাম, প্রত্যেক পরীক্ষায় ফার্স্ট হইতাম। বিয়া হইয়া যাওয়ার পরও ইস্কুলের মাস্টাররা কইছিল পড়াডা ছাড়িস না রে ঈদুন। মাকে নিঃসংশয়ে নিঃসংকোচে বলে দিই তুমি এই সব কঠিন জিনিস বুঝে উঠতে পারবে না। বলে দিই, তোমার ওই গণ্ডগোলের সময় এখন আর নেই, এখন আর যা ইচ্ছে তাই করা যায় না। বলে দিই তোমার বয়স অনেক, এত বেশি বয়সে মেট্রিক দিতে গেলে মানুষ হাসবে। মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। কোনও এক কালে ইশকুলের সেরা ছাত্রী থাকার গৌরব বয়সের লজ্জার আড়ালে ঢেকে যায়। মা অন্য ঘরে গিয়ে একা বসে থাকেন। অন্য ঘরে হু হু হাওয়ার সঙ্গে মা একা বসে কথা বলেন।

বাবার কানে খবরটি যায় যে মা মেট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। বাবা হা হা করে হাসলেন, সঙ্গে আমরাও। অবকাশ জুড়ে তখন হা হা হো হো হি হি। মা চপু সে যেতে থাকেন, মার স্বপ্নগুলো গেলাস পড়ার মত, এবাড়ির মেঝে যেহেতু শক্ত ইটের, পড়ে ভেঙে যায়। মা শেষ অবদি লেখাপড়ার শখ মেটান অন্যভাবে। পীরবাড়িতে মেয়েরা আরবি শেখে, বয়সের কোনও ঝামেলা নেই, যে কোনও বয়সের মেয়েই শুরু করতে পারে। পীরবাড়ি থেকে আরবি ভাষাশিক্ষা বই খান তিনেক নিয়ে এলেন মা আর নানির কাছ থেকে টাকা নিয়ে কিনে আনলেন বড় বড় লম্বা খাতা। ওসব খাতায় গোটা গোটা অক্ষরে আরবি ব্যাকরণের বিধিবিধান অনুশীলন শুরু করলেন ঠিক যেভাবে আমরা ইংরেজি ভাষা শিখেছি—সে খেলা করে, সে খেলা করিতেছে, সে খেলা করিয়াছে, সে খেলা করিল, সে খেলা করিতেছিল, সে খেলা করিয়াছিল,সে খেলা করিবে। মার বাংলা হাতের লেখা যেমন সুন্দর, আরবিও তেমন।

আরবি পইড়া কি হইব মা? আমি জিজ্ঞেস করি।

মা মধুর হেসে বলেন,আল্লাহর কালাম পড়া যাবে। কোরান হাদিস বুইঝা পড়া যাবে।

আমাদের সামনে পরীক্ষা, আমরা যত না পড়ি, মা তার চেয়ে বেশি পড়েন, রাত জেগে পড়েন। মার চিঠি লেখা নেই। গপ্প মারা নেই। মার লেখাপড়া বাবার নজরে পড়ে। তিনি বাড়ি ফিরেই ডাকেন, ছাত্রীসকল এদিকে আসো।

আমি আর ইয়াসমিন বাবার সামনে দাঁড়াই। বাবা ধমক দিয়ে ওঠেন, বাড়ির বড় ছাত্রী কই?

আমি হতবাক, আমিই তো বাড়ির বড় ছাত্রী, বাবা কি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন না! দরজার পর্দা আঙুলে পেঁচানো বাদ দিয়ে বাবার চোখের সামনে দাঁড়াই যেন স্পষ্ট দেখেন, এমনিতেও একেবারে চোখের সামনে না দাঁড়ালে তিনি কোনও দাঁড়ানোকেই ঠিক দাঁড়ানো মনে করেন না।

আমার দিকে চোখ রেখেই বলেন, বড় ছাত্রীরে ডাকো।

আমি তো এইখানে। আমি বলি।

বাবা বলেন, তুমি কি পি এইচ ডি দিতাছ?

না।

একজন যে পি এইচ ডি দিতাছে, তারে ডাইকা লইয়া আস।

আমার তখনও মাথায় খেলে না বাবা কার কথা বলছেন। ইয়াসমিন বুদ্ধিতে আমার চেয়ে পাকা। ও চৌকাঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকল, মা, তাড়াতাড়ি আসো। বাবা ডাকতাছে। মা খাতা কলম বন্ধ করে বাবার সামনে এলেন। মা যে বাজারের লিস্টি দিয়েছিলেন, সেই লিস্টিটি হাতে নিয়ে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, লবণ শেষ হইল কেমনে?

মা শান্ত গলায় বললেন, রাইন্ধা।

কি এত রাজভোগ রান্ধ্যা যে আড়াই সের লবণ দুই দিনে শেষ হইয়া যায়?

এত জানার ইচ্ছা থাকলে পাকঘরে বইয়া থাইকা দেইখেন কেমনে শেষ হয়।

লবণের দাম সম্পর্কে কোনও ধারণা আছে?

মা কোনও উত্তর দেন না।

বাবা দাঁতে দাঁত চেপে বলেন, আমি পরের মাসে লবণ কিনবাম, এই মাস লবণ ছাড়া খাইতে হইব সবার।

আমি লবণ ছাড়াই খাইতে পারি, আপনের ছেলেমেয়েরা পারে না, সবার পাতে আলদা লবণ লাগে। বলে মা অন্য ঘরে চলে যান। বারান্দার টেবিলে মার বইখাতাগুলো পড়ে থাকে, হাওয়ায় উড়তে থাকে খাতার পাতা।

বাবা রাতে ফিরে জরির মাকে ডেকে গলা খাটো করে জিজ্ঞেস করেন, আইচ্ছা নোমানের মা কি পিঁয়াজ রসুন চাইল ডাইল তেল এইগুলা সরায়?

কি জানি আমি জানি না।

দেখ নাই কিছু নিয়া যাইতে?

কত কিছুই তো নেয়।

কি নেয়?

ব্যাগের মধ্যে ভইরা কি নেয়, তা কি আমি দেহি! আমি কামের মানুষ, কাম করি।

ব্যাগ লইয়া বাইর হয় নাকি?

তা কি আর বাইর হয় না! কুনুহানো গেলে তো হাতে ব্যাগ একটা থাহেই।

কত বড় ব্যাগ?

ব্যাগ কি আর ছোড হয়, ব্যাগ ত বড়ই।

জরির মা বাবার ঘর থেকে ফিরলে মা জিজ্ঞেস করেন, তোমারে ডাইকা কি জিগাইল?

জিগাইল আপনে চাইল তেল এইগুলা লইয়া বাপের বাড়ি যান কি না।

কি কইছ তুমি?

কইছি আমি এইতা জানি না।

মা ফুঁসে ওঠেন, তুমি জান না? আমার বাপের কি চাইল ডাইল নাই নাকি? আমার বাপ কি পথের ফকির হইয়া গেছে? বাপের বাড়িতে এহনও বিরাট বিরাট পাতিলে রান্ধাবাড়া হয়, খাওনের অভাব নাই ওইহানে। আমগোর বাজান দালান তুলে নাই, কিন্তু খাওয়া দাওয়ায় কাপড় চোপড়ে অভাব রাখে নাই কোনওদিন। বড় বড় রুইমাছ, বড় বড় পাঙ্গাস মাছ,কাতল মাছ কিইনা আনে, পচা মাছ বাড়িত পাডায় না। আমিই উল্ডা মার কাছ থেইকা টাকা পয়সা আনি। আমারে এত মিথ্যা অপবাদ দিতাছে, আল্লার গজব পড়ব, ধং্ব স হইয়া যাইব এই দুষ্ট লোকের দেমাগ।

মা অর্ধেক রাত অবদি বিড়বিড় করেন। জরির মা মেঝেয় হাঁটু মুড়ে বসে বিড়বিড় শোনে।

পরদিন রান্নাঘরে গিয়ে আলমারি খুলে আনাজপাতি কি কি আছে, কবে কি কিনেছেন, কবে কি শেষ হল তার পই পই হিশেব নিলেন বাবা। হিসেবে গরমিল হচ্ছে বলে তিনি বড় একটি তালা কিনে এনে রান্নাঘরের আলমারিতে লাগিয়ে দিয়ে বললেন এখন থেকে চাল ডাল, পেঁয়াজ রসুন যা লাগবে, তিনি তালা খুলে বের করে দেবেন। চাবি প্যাণ্টের পকেটে নিয়ে বাবা বেরিয়ে গেলেন। পরদিন বাড়ি থেকে বেরোবার আগে আলমারির তালা খুলে মাকে ডেকে, আজকে দুপুরে মাগুর মাছ রান্না হবে, এই ধর একটা পিঁয়াজ। আর মসুরির ডাল এক কাপ রানলেই চলবে, ডালের জন্য এই নেও দুইটা কাঁচা মরিচ, একটা রসুন বলতে বলতে হাতে দেন আনাজপাতি, এক ছটাক তেলও দিয়ে যান মেপে।

বিকেলে ফিরে রাতের রান্নার আগে হিশেব করে বের করেন, কি লাগবে এবং কতটুকু। চাল লাগলে চাল, ডাল লাগলে ডাল, আর চামচে করে লবণ। এভাবেই চলে।

মা মার মত বেঁচে থাকেন। মাকে খুব নজরে পড়ে না। পড়ার টেবিলে বসে যখন মখু গুঁজে রাখি বইয়ে, মা টেবিলে গরম দধু রেখে যান এক গ্লাস, দুপুরবেলায় রেখে যান শরবত, শরবতের বা দুধের গেলাসেই নজর পড়ে, মাকে নয়। মা যখন পায়খানা থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির কাছে বসে পড়েন, মাথা বনবন করে ঘুরছে বলে উঠে দাঁড়াতে পারেন না,কি হয়েছে জিজ্ঞেস করলে ভাঙা কণ্ঠে বলেন, পাইলসের রক্ত যাইতাছে খুব বেশি, শরীরটা দুর্বল লাগতাছে, মার শরীর বা শরীরের দুর্বলতার দিকে নজর পড়ে না, পড়ে পাইলস শব্দটির দিকে।

পাইলস কি মা?

পায়খানার রাস্তায় একটা গুটি মত হয়, তারপর পায়খানা কষা হইলে রক্ত যায়।

পাইলসের চিকিৎসা কি?

তর বাপরে কত কইলাম, পাইলসটার একটা চিকিৎসা করাইতে। কই কিছু তো করে না।

হুঁ।

তাই ত কই, বেলের শরবত খাও, শাক সবজি বেশি কইরা খাও। শাক সবজি তো মুখেই তুলতে চাও না। শাক না খাইলে পায়খানা নরম হইব কেমনে! তোমারও ত কষা পায়খানা। পায়খানা নরম থাকলে অর্শ রোগ হয় না।

অর্শ রোগ কি?

ওই পাইলসের আরেক নাম অর্শ।

তাইলে যে রাস্তার কিনারে গাছে টাঙানো সাইনবোর্ড থাকে, এইখানে অর্শ রোগের চিকিৎসা হয়, সেইটা কি এই রোগ?

হ।

মা ধীরে সিঁড়ির কাছ থেকে শরীরটি তুলে ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে কড়িকাঠের দিকে মখু করে শুয়ে থাকেন। শরীর দুর্বল তাঁর। আমি পাশের ঘরে অর্শ শব্দটি নিয়ে ভাবতে থাকি, এত নোংরা একটি রোগের এত চমৎকার নাম কি করে হল!

মার এমনই জীবন। এই জীবন আমরা দেখে যেমন অভ্যস্ত, যাপন করেও অভ্যস্ত মা। একদিন কালো ফটকের শব্দ শুনে দৌড়ে গিয়ে দেখি, এক অচেনা লোকের সঙ্গে কথা বলে মা ফটক বন্ধ করলেন।

জিজেস করি কে এসেছিল।

কামালরে খুঁজতে আইছিল।

কে? কি নাম?

চিনি না, নাম কয় নাই।

কি ক্‌ইল?

জিগাইল, আপনে কে? আমি কইলাম আমি কেউ না, এই বাসায় কাজ করি।

এইটা কইলা কেন?

কামালের মা পরিচয় দিলে এই ছেলেই হয়ত অবাক হইত। ছিঁড়া ময়লা শাড়ি পিন্দা রইছি।

আমি চপু হয়ে যাই। মা হয়ত ঠিকই করেছেন মিথ্যে বলে, মনে হয়। ছোটদার ইজ্জত বাঁচিয়েছেন মা। মা যদি বলতেন তিনি কামালের মা, তবে আমার আশংকা হয় যে ছোটদার সঙ্গে দেখা হলে ওই ছেলে বলত, তোমার বাসায় দেখলাম একটা কাজের বেটি, বলল সে নাকি তোমার মা লাগে! কাজের বেটিদের আজকাল স্পর্ধা বাড়ছে অনেক।

মাকে রাখতেও পারি না, ফেলতেও পারি না। মা আমাদের জন্য রান্না করবেন, ক্ষিধে না লাগার আগে খেতে দেবেন, বাবা মারমুখি হলে বাবাকে সরিয়ে নেবেন বলে বলে যে, মেয়েরা হইল ঘরের লক্ষ্মী,ওদের গায়ে হাত তোলা ঠিক না, ওরা আর কয়দিন আছে, পরের ঘরে ত চইলা যাইব। মার হস্তক্ষেপে বাঁচি বটে, কিন্তু পরের ঘরে চইলা যাইব, বাক্যটি আমার গায়ে এত বেশি জ্বালা ধরায় যে হিংস্র বাবার চেয়ে দরদী মায়ের ওপরই আমার রাগ হয় বেশি।

পরের ঘরে চইলা যাইব মানেটা কি?

পরের ঘরে তো যাইতেই হইব! বিয়া শাদি হইলে যাইতে হইব না!

না যাইতে হইব না।

তা কি হয় নাকি?

হয়। অবশ্যই হয়।

সারাজীবন কেউ কি বাপের বাড়িতে থাকে?

থাকে। আমি থাকি। আমি থাকব।

বিয়ে শব্দটি শুনলে আমার গা রি রি করে ওঠে।

বিয়া হইয়া গেলেই তো মেয়েরা পর হইয়া যায় মা। মেয়েরা হ্‌ইল বাপের বাড়িতে একরকম অতিথি, যত পারো তাদেরে আদর যত্ন কর, পরে কপালে কি আছে সখু না দুঃখ,কে জানে!

নরম সুরে বলা হলেও মার শব্দগুলো বিষলাগানো তীরের মত বেঁধে আমার গায়ে। জন্মানো হল, শেকড় ছড়ানো হল, এতটা বছর গায়ে গায়ে লেগে থেকেও আমি কি না পর, আর বাইরে বাইরে থাকা, বিয়ে করে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া, বা বিয়ে করার স্বপ্নে বিভোর ছেলেরা আমার চেয়ে আপন মার! আমি তো বাবা সে যত পাষণ্ডই হোক, মা সে যত অসুন্দরী আর অশিক্ষিত হোক, ভাই সে যত হাড়কিপ্টে আর কুচুটে হোক, বোন সে যত বেয়াদপ আর বাচাল হোক, কাউকে পর ভাবতে পারি না। এরাই আমার সবথেকে আপন। অন্য এক অচেনা লোক আলটপকা এসে এদের চেয়ে বেশি আপন হয়ে উঠবে আমার! অসম্ভব! মাকে ইচ্ছে করে ঠেলে সরিয়ে দিই। ইচ্ছে করে মার মুখের ওপর ঠকাস করে দরজা বন্ধ করে দিই। মা খাবার দাও, মা আমার জামাটা কই, গোসলের সাবানটা আবার কই গেল মা, রিক্সাভাড়া হাতে না থাকার পরও মার ভরসায় রিক্সা চেপে বাড়ি এসে, মা তিনটা টাকা দাও তো অথবা মা গো, আমার জ্বর আসতাছে বললে মা কপাল ছোঁবেন, শুইয়ে দেবেন, শীতে হি হি করা শরীর ঢেকে দেবেন গরম লেপে,বাবাকে খবর পাঠাবেন জ্বর দেখে যেতে, ওষধু দিয়ে যেতে—এররকম ছোটখাট ব্যাপার ছাড়া মাকে জীবনের অন্য কিছুতে আমার মনে হয় না, কিছুমাত্র প্রয়োজন।

 

কালো ফটকের শব্দ হলে, বাবার ফটক খোলার শব্দ বাড়ির যে কোনও জায়গা থেকেই টের পাই যদিও, সামান্য সন্দেহ হলে আগে জানলা থেকে দেখি এল কে, সে যদি বাবা হয়, দৌড়, দৌড়ে যে যার নিজের জায়গায়।মুশকিল হল, দুপুর দুটো আড়াইটায় বই সামনে বসে আছি দেখতে পেলে ঠিক ধরে ফেলেন, তাঁর আসার শব্দ শুনে বসেছি, তখন উল্টোটা হয়,মনীষীদের বাণী ঝাড়ার আগে খিস্তি ঝেড়ে নেন। অবশ্য পরীক্ষার আগে আগে হলে দুপুর দুটো কী রাত দুটো হোক, ওখানেই বসে থাকা চাই। বাবা বলেন, চেয়ারে জিগাইরা আঠা লাগাইয়া বইয়া লেখাপড়া কর। আড়াইটায় বাবা এলেন। বাবা এলে কেবল নিজে সতর্ক হব তা নয়, বাড়ির সবাইকেই সতর্ক করতে হয়। কারণ আমি না হয়, যে সময়ে যেখানে থাকা দরকার সেখানে আছি, পড়ার ঘর থেকে সাদাসিধে ভালমানুষের মত বেরিয়ে কাঁধে গামছা নিয়ে গোসলখানায় যাচ্ছি, দপু রে নাওয়া বা খাওয়া ব্যাপারগুলো যেহেতু চলে বলে বাবা মনে করেন, কিন্তু ইয়াসমিন হয়ত আমগাছের মগডালে বসে আছে অথবা রান্নাঘরে অথবা ছাদে, যেসব, বাবা কিছুতেই মানেন না যে চলে, এবং যা চলে না তার কিছু কোথাও হতে দেখলে যেহেতু বাড়িতে হুলুস্থুল বাঁধিয়ে দেবেন—ইয়াসমিনের পিঠে তো পড়বেই কিছু আমার পিঠও বাদ যাবে না, তাই বাবাকে দেখে, আমি জানিয়ে দিই, আসলে যেই দেখে, তারই একরকম অলিখিত দায়িত্ব চেঁচিয়ে যত দ্রুত সম্ভব বাবার আগমন বার্তা ঘোষণা করে দেওয়া, সাধারণত ঘর থেকে বারান্দা অবদি দৌড়ে বাবা আইছে, বললেই বাড়ির প্রাণীগুলো যে যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, ঊর্ধশ্বাসে ছুটে যাকে যেখানে বাবা ভাবেন যে মানায়, যায়, যেমন, বাড়ির কাজের মেয়েটি যদি বারান্দায় জিরোতে থাকে, সে ছুটে রান্নাঘরে সেধোঁয় বাসনপত্র মাজতে, নয়ত জল ভরতে কলপারে যায় কিছু একটা করতে, বাবা যেহেতু কারও বসে থাকা বা শুয়ে থাকা সইতে পারেন না। জানিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইয়াসমিন উঠোনে স্তূপ করে রাখা নারকেল পাতা ছিঁড়ে মাথার মুকুট বানাচ্ছিল, ফেলে দৌড়ে ঘরে ঢোকে, ঘোষণা কে শুনেছে না শুনেছে কে কোথায় অবস্থান নিল না নিল জানার আগে দ্রুত নিজের অবস্থান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, নিজের চরকায় তেল তো দিতে হবে না কি! ঘোষণা সেরে, গামছা কাঁধে যখন আমি গোসলখানার দিকে হাঁটছি, দেখি, মা খাচ্ছিলেন, বন্ধ করে ছুটে রান্নাঘরে ঢুকে আধখাওয়া থালা রেখে হাত ধুয়ে নিলেন। আমি গোসলখানায় ঢুকে গেলাম, ইয়াসমিন অঙ্ক করতে বসল, আর মা হাত ধুয়ে কুলোয় চাল নিলেন বাছতে, রাতের রান্নার প্রস্থুতি। গোসলখানা থেকে বেরিয়ে মাকে গলা চেপে জিজ্ঞেস করলাম, বাবা গেছে গা?

যায় নাই, শুইছে।

তুমি না খাইতাছিলা, খাওয়া থেইকা উইঠা পড়লা যে!

মা চাল থেকে কাঠপোকা সরাতে সরাতে বললেন তর বাবা কোনওদিনই আমার খাওয়া সহ্য করতে পারে না।

তুমি ত আর না খাইয়া বাঁইচা রইছ না! এইডা কি বাবা জানে না?

জানে। তবু চোখের সামনে দেখলে চিড়বিড় করে।

বাবার ভয়ে আমরা খেলা ছেড়ে যেমন উঠে যাই, মা তেমন খাওয়া ছেড়ে উঠে যান। বাড়ির সবাইকে খাইয়ে মা রান্নাঘরে অবেলায় খেতে বসেছেন, কাজের বেটি বা মেয়ে যেই থাকে বসেছে সঙ্গে, এররকম দৃশ্য দেখেই আমি অভ্যস্ত এর বাইরে, উৎসব পরবের দিন হলেও বাবা বা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মা খেতে বসেন না। কেন, এই প্রশ্ন কেউ কখনও করেনি, কারও মনে এই প্রশ্নটি নেই বলেই করেনি। আমরা যখন খাব, মা পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের পাতে বেড়ে দেবেন খাবার, মা তাই করেন, এবং মাকে তাই করলে মানায় বলে বাবা যেমন জানেন, আমরাও জানি। মা চমৎকার রাঁধেন এবং বাড়েন বলে বাড়ির সবার বিশ্বাস।

ইশকুল থেকে বিকেলে ফিরে বেশ কদিন এমন হয়েছে যে ক্ষিধে পেটে খাচ্ছি, ওদিকে মা সারাদিন পর তখন দুপুরের খাবার খেতে বসেছেন, ভাত মাখছেন, মার মুখে চোখ পড়তেই দেখি ঠোঁটের কোণে অপ্রতিভ একটি হাসি, ভাতের থালা নিয়ে শেষ অবদি আমার আড়ালে চলে যান অথবা পরে খাবেন বলে হাত ধুয়ে ফেলেন।

হেসে বলি, কি উইঠা গেলা যে! তুমি শরম পাও নাকি!

মা কোনও উত্তর দেন না। মার হয় না, আড়াল ছাড়া খাওয়া ব্যাপারটি মার একেবারেই হয় না। মা আসলেই শরম পান কারও সামনে খেতে। বাবা বাড়ি এলে অবশ্য মা আড়ালেও খান না, বাবার যে আবার আনাচ কানাচের খবর নেওয়ার অভ্যেস আছে, আড়াল বলে কিছুই এ বাড়িতে তখন থাকে না। বাড়িতে, ধরা যাক বাবা শুয়ে রইলেন, শুয়ে রইলেন বলে যে আমরা খেলতে নামব বা গল্পের বইয়ে হাত দেব তা অসম্ভব কারণ শোয়া থেকে উঠে যে কোনও মুহূর্তে তিনি বেড়ালের মত পা ফেলে ফেলে সারা বাড়ি বিচরণ করতে পারেন, সুতরাং তিনি বাড়িতে, সে যে অবস্থাতেই তিনি থাকুন, এমনকি ঘুমিয়ে, কেউ এমন কিছু করার উদ্যোগ নেয় না, যা বাবা মনে করেন, উচিত নয়। হঠাৎ হঠাৎ বিকেলে বাড়িতে ঢুঁ মারেন বাবা। এমনই একদিন ঢুঁ মারতে গিয়ে, কালো ফটকের শব্দও কেউ সেদিন পায় নি, কোনও ঘোষণাও কেউ দেয়নি সতর্কে হবার, বাবা রান্নাঘরে ঢুকে পেলেন মাকে, খাচ্ছেন।

এত খাও কি? সারাদিন খালি খাওয়া আর খাওয়া। শইলে তেল বাইড়া যাইতাছে খাইতে খাইতে।

শুনে, মা থালা সরিয়ে হাত ধুয়ে নিলেন।

আমি শুনলাম, বাড়ির সবাই শুনল। আমাদের কাছে, এ অনেকটা, রাতে পড়ার টেবিলে বসে ঝিমোতে থাকলে বাবা যেমন বলেন, এত ঘুম আসে কেন! দিন রাইত খালি ঘুম আর ঘুম, শইলে এত আরাম কোত্থে আইল? পিঠে মাইর পড়লেই আরাম ছুইটা যাইব র মত।

 

ছোটদার সঙ্গে শিল্পসাহিত্য নিয়ে যেমন, রাজনীতি নিয়েও আলোচনা জমে ওঠে।

আচ্ছা ছোটদা ক্যুর পর কেন মেজর ডালিম, রশিদ, ফারুকরে দেশ ছাইড়া যাইতে হইল?

আরে তলে তলে ত একটা সেকেন্ড ক্যু হইয়া গেছে। তখন তো আর ডালিমদের পাওয়ার নাই।

আর সফিউল্লাহ? সে তো সেনাবাহিনী প্রধান ছিল। তারে কেন মাইরা ফেলল না? সে তো মুজিবের পক্ষের ছিল।

মুজিব ত তারে ফোনও করছিল রাতে, বত্রিশনম্বরে আর্মি পাঠাইতে। সফিউল্লাহ জিয়ারে ডাকল, ভোরবেলা জিয়া আইসা কইল দরকার নাই বত্রিশ নম্বরে যাওয়ার। সফিউল্লাহরও করার কিছু ছিল না।

তখন সফিউল্লাহ বুইঝা ফেলছে যে জিয়া তার অর্ডার মানতাছে না!

বুঝব না মানে! সফিউল্লাহ তহন একরকম হাউজ এরেস্ট। আর্মি চিফের অর্ডার কেউ মানতাছে না।

জিয়ারে কে সেনাবাহিনীর প্রধান বানাইল? মোশতাক, নাকি জিয়া নিজেই নিজেরে বানাইল!

কনসপিরেসিতে এরা সবাই ছিল।

খালেদ মোশাররফ যে জিয়ারে বন্দি কইরা ক্ষমতা নিয়া নিল, সেই খালেদ মোশাররফরে তো তিনদিন পরই কর্ণেল তাহের মাইরা ফেলল। তাইলে জিয়া কেন মারল কর্ণেল তাহেররে? জিয়ার ভালর জন্যই তো কর্ণেল তাহের বিদ্রোহডা করছিল।

তাহের তো খালেদ মোশাররফরে সরাইয়া দিয়া জাতীয় সরকার গঠন করতে চাইছিল। জিয়ারে চায় নাই।

কর্ণেল তাহের তো মুক্তিযোদ্ধা ছিল। আবার তো যুদ্ধে পা-ও হারাইছিল। যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধারে কি ফাঁসি দেওয়া যায়? আইচ্ছা, কোনও রাজাকাররে কি ফাঁসি দেওয়া হইছে আজ পর্যন্ত?

না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম ফাঁসি একটা মুক্তিযোদ্ধার হইল।

জিয়ার সাথে মেজর ডালিমের বিরোধটা আমি ঠিক বুঝতে পারতাছি না।

তখন আর্মির ল এন্ড অর্ডার নষ্ট হইয়া গেছে। জিয়া সফিউল্লাহরে বঙ্গভবনে বাইন্ধা রাইখা নিজেরে জেনারেল ঘোষণা করল, কিছু লোক তার পক্ষে আইল, কিছু বিপক্ষে গেল।

ডালিম কি বিপক্ষে গেছিল?

না। ডালিমরে বিদেশ পাঠাইয়া দেওয়ার মূল কারণডা হ্‌ইল, জিয়া চায় নাই, একবার যারা ক্যু এ সরাসরি জড়িত ছিল, তারা তার আশেপাশে থাক। ক্যু কইরা একবার অভ্যাস হইলে যে বারবার ক্যু করতে ইচ্ছা করে।

তাইলে রিস্ক সরাইয়া দিল?

হ। কইতে পারস। যাওয়ার আগে জেলহত্যা কইরা গেল। চারনেতারে খুন কইরা গেল। ওদেরে দিলও তো ভাল ভাল চাকরি দিয়া পাঠাইয়া, এমবাসাডার কইরা দিল ডালিমরে। ডালিমও খুশি রইল, জিয়াও যা পাইতে চাইছিল,পাইল।

মা আমাদের আলোচনার মধ্যে আচমকা ঢুকে বলে বসলেন ডালিম? ডালিম তো পাকছে গাছে, একটা খাইয়া ল না!

আমি ঘর ফাটিয়ে হেসে উঠি।

আরে রাজনীতির কথা হইতাছে, গাছের ডালিমের কথা না।

রাজনীতির কি কথা?

বুঝবা না।

বুঝাইয়া কইলেই ত বুঝি।

ক্যু বুঝ? ক্যু?

ক্যু? রাইতের অন্ধকারে দেশের সরকাররে মাইরা ফেলারে তো ক্যু কয়, না?

মার কথায় এত বিরক্ত লাগে যে বলি, যাও তো মা! এইসব আলোচনা বুঝার ক্ষমতা তোমার নাই।

মা বেরিয়ে যান। বারান্দায় ভিখিরি বসা, ওদের সঙ্গে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফেলে ওদের চালচুলোহীন জীবনের কথা শোনেন, মা ওদের কথা বোঝেন, ওরাও মার কথা। বন্যায় ভেসে গেছে কারও ঘর, কারও বাবা চলে গেছে আর ফেরেনি, কারও স্বামী মরে গেছে, কেউ অন্ধ, কেউ খোঁড়া, কারও জরায়ূ বেরিয়ে এসেছে বাইরে। জরায়ু বেরিয়ে আসা দুলুর মাকে মা আলাদা খাতির করেন। এক মুঠির বদলে এক পোয়া চাল ঢেলে দেন দুলুর মার টোনায়, আর শুকনো মখু দেখলে আগ বাড়িয়ে বলেন, দুলুর মা দুইডা খাইয়া যাও। সেদিনও, ছোটদার ঘরে বসে রাজনীতি নিয়ে যখন গভীর চিনতাভাবনা করছি, মা দুলুর মাকে খেতে দিয়েছেন। দুলুর মা বারান্দায় বসে মার দেওয়া ভাত তরকারি খেয়ে, হাত তুলে মার জন্য দোয়া করে আমার মাথায় যতগুলা চুল, ততগুলা বছর তারে তুমি পরমায়ু দিও আল্লাহ। আমারে যে খাওয়াইল, তারে তুমি সুখে রাইখ। আমার আত্মাডারে যে শান্তি দিল, তারে তুমি শান্তি দিও আল্লাহ। ঝি পুত লইয়া সে য্যান সারাজীবন সুখে শান্তিতে থাকতে পারে।

মা দুলুর মার দোয়া শোনেন ভাবলেশহীন মুখে।

 

 ০৫. অবসর

পরীক্ষার পর আমার আনন্দ আর ধরে না। অখণ্ড অবসর জুড়ে এখন আমি যা মন চায় করে বেড়াব, সিনেমা দেখে, গল্পের বই পড়ে, কবিতা আবৃত্তি করে, পদ্য লিখে। কিন্তু বাবা হুকুম জারি করলেন কোনও সিনেমা পত্রিকা পড়া চলবে না, সিনেমার নায়ক নায়িকাদের ছবিঅলা বাজে সব পত্রিকা এ বাড়িতে নিষিদ্ধ। প্‌ ড়তে যদি হয়ই তবে ভাল পত্রিকা পড়তে হবে। যে পত্রিকা পড়লে জ্ঞান বাড়ে। তো কি নাম সেই জ্ঞানদায়িনী ভাল পত্রিকাটির? আমি উৎসুক জানতে, আমার তখন কোনও কিছুতে নাক সিঁটকোনো নেই। পড়তে দিলে গোটা বিশ্ব পড়ে ফেলতে পারি। বাবার পছন্দের পত্রিকাটির নাম বেগম। বেগম আসতে লাগল বাড়িতে নিয়মিত। পত্রিকাটির আগাগোড়া পড়ে ফেলি একদিন, কি করে কি রান্না করতে হয়, কি করে চুল বাঁধতে হয়, কি করে সবজি-বাগান অথবা ফুলের বাগান করতে হয়, কি করে ঘর গোছাতে হয়, শিশুর যত্ন, স্বামীর যত্ন ইত্যাদিই বা কি করে,এসব। দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রায় একই জিনিস বেগমে, অর্ধেকের বেশি পড়া হল না। তৃতীয় সপ্তাহে অর্ধেকের চেয়েও কম। বেগম যে একেবারে না ছোঁয়া রয়ে গেল এরপর তা নয়, বরং বেগমের ওপর ঝুঁকে থাকা আগের চেয়ে বেশি বাড়ল, হাতে হাতে যেতে যেতে বেগমের কাগজ ছিঁড়ে যেতে লাগল। বেগমকে জনপ্রিয় করার কারণটি দাদা, হকারের হাতে বেগম দেখলে দাদাই প্রথম ছোঁ মেরে তুলে নেন। এরপরই ঝুঁকে থাকা, নিজে ঝুঁকবেন, বাড়ির সবাইকে ঝোঁকাবেন। পাঁচ ছটি কালো মাথা বেগমের ওপর ঝুঁকে রইল পুরো দুপুর এমনও হয়েছে, এরপর বাকি মাথাগুলো সরে গেলেও দাদার মাথাটি থেকে যায়, অলস বিকেলে, এমনকি রাতেও, সবাই ঘুমিয়ে গেলে। দাদা ঝুঁকে থাকেন এক ঝাঁক মেয়ের ছবিতে। বেগমে যারাই লেখে, গল্প কবিতা অথবা প্রাণী ও উদ্ভিদের যত্ন পদ্ধতি, তাদের ছবি ছাপা হয় এক পাতায়। এক সঙ্গে কুড়ি পঁচিশটি মেয়ের ছবি দেখতে পাওয়া যা তা কথা নয়, বেগম দাদাকে যত আনন্দ দেয়, তত আর কাউকে দেয় না। তিনি প্রতি সপ্তাহে বেগম থেকে মেয়ে পছন্দ করেন, আবার পরের সপ্তাহে সে মেয়ে বাতিল করে অন্য মেয়ে পছন্দ করেন। আসলে পরের সপ্তাহে বেগম এলে আবার নতুন কাউকে আগে যাকে পছন্দ করেছিলেন তার চেয়ে বেশি পছন্দ হয়ে গিয়ে গোল বাধাঁয়। কোনটিকে যে তিনি বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবেন নিশ্চিত না হয়ে আবার পরের সপ্তাহের বেগমের জন্য অপেক্ষা করেন, আরও ভাল যদি জোটে। দিলশাদ নুর নামের এক সুন্দরী মেয়েকে তিনি একবার পছন্দ করলেন কিন্তু তার কবিতায় সেই যে গেছে সে আর ফিরছে না, ফিরে এলে আমি তার বুকে মাথা রেখে ঘুমোবো.. লাইনটি পড়ে দাদা ঠোঁট উল্টো বললেন নাহ এরে বিয়া করা যাবে না।

কেন যাবে না? আমি জিজ্ঞেস করি।

দেখলি না কোন বেডার লাইগা ও অপেক্ষা করতাছে!

আরে এইটা তো কবিতা।

কবিতা হোক তাতে কি হইছে!

কবিতায় যদি তুমি লেখ যে আকাশে উড়তাছ, তাইলে কি সত্যিই আকাশে উড়তাছ? আকাশে সত্যিকার না উড়ি, মনে মনে তো উড়ি। কবিতায় তো মনের কথা লেখা হয়। দাদা বাতিল করে দিলেন পছন্দ হওয়া দিলশাদকেও। দাদা যখন কাউকে বাতিল করেন, দাদাকে খুব বিমর্ষ দেখতে লাগে। যেন এইমাত্র হাতের মুঠো থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ পাখিটি উড়ে গেল। অবশ্য সুলতানার বেলায় দাদার তেমন মনে হয়নি। দাদার পত্রমিতা সুলতানা দাদাকে একটি শাড়ি পরা মোড়ায় বসা ছবি পাঠিয়েছিল, সেই ছবি নিয়ে দাদা অনেকগুলো রাত নির্ঘুম কাটাবার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এই মেয়েকেই তিনি বিয়ে করবেন। নতুন কাপড় চোপড় বানালেন, নতুন সগু ন্ধী কিনলেন, জুতোও কিনলেন একজোড়া। সকালে আড়াই ঘন্টা সময় খর্চা করে গোসল করে নতুন জামা কাপড় পরে, শিশির অর্ধেক সগু ন্ধী গায়ে ঢেলে তিনি ঢাকায় রওনা হয়ে গেলেন। রাতে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে দেখি জিভে কামড় দিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন দাদা। সকলে ঘিরে ধরি, কি হয়েছে, হয়েছেটা কি? দাদা তখনও জিভ থেকে দাঁত সরাননি, যখন সরিয়েছেন, একটি কথাই হাঁফ ছেড়ে বলেছেন, বড় বাঁচাডা বাঁচলাম।

কেন?

পৃথিবীর মধ্যে যদি কোনও কুৎসিত কিছু থাইকা থাকে, তাইলে ওই বেডি।

কও কি? ছবিতে ত সুন্দরই লাগতাছিল।

উফ। তরা যদি দেখতি বেডিরে। কাইল্যা পচা। পুইট্যা। বুইড়া। হাসলে উচা উচা দাঁতগুলা রাক্ষসের লাহান বাইর হইয়া পড়ে। পাতিলের তলার লাহান কালা মাড়ি। জীবনে কোনওদিন পেত্নী দেখি নাই, আজকে দেইখা আইলাম।

কেন, চুল ত দেখলাম কত লম্বা। পাছা ছাড়াইয়া যায়!

চুল। চুল দিয়া আমি কি করাম। চুল ধইয়া পানি খাইয়াম?

একটু থেমে বললেন, মনে হয় নকল চুল লাগাইয়া ফটো তুলছে। সামনের উঁচা একটা দাঁতও নকল।

দাদা সুলতানার জন্য রঙিন কাগজে মুড়ে কিছু উপহার নিয়ে গিয়েছিলেন, সেগুলো সেভাবেই ফেরত এনেছেন। সারাদিনের না খাওয়া দাদা হাপুস হুপুস করে খেয়ে পথের ধুলো কালি ধুয়ে দীর্ঘ ঘুম ঘুমোলেন।

সুলতানার স্বপ্ন দূর করে দিয়ে দাদা পরদিন থেকে বেগমে মন দিলেন। বেগম দিতে আসা হকারকে বলে দিই চিত্রালী পূর্বাণী আর বিচিত্রা দিতে। বলি বটে, কিন্তু এখন আর ইশকুল নেই যে রিক্সাভাড়া থেকে দুআনা চারআনা জমিয়ে রাখব, কাগজও বাড়তি নেই যে শিশিবোতলকাগজঅলার কাছে বিক্রি করে বেশ কটি আধুলি উপার্জন করব। পত্রিকা পড়ার জন্য মন আকুলিবিকুলি করে কিন্তু পত্রিকা কেনার টাকা যোগাড় করব কোত্থেকে! লোকে যেমন আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আমি করি দাদার ওপর। দাদার করুণার উদ্রেক সবসময় হয় না, দাদা আল্লাহতায়ালার মত দয়াশীল দানশীল হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না বরং হাড়কিপ্টে বলে তাঁর নাম আছে। রিক্সাভাড়া যেখানে দুটাকা, তিনি আজও সেখানে হাতে আট আনা দিয়ে রিক্সাঅলাকে ধমকে বিদেয় করেন। রিক্সাঅলার সঙ্গে তারস্বরে দাদার চিৎকার বাড়ির লোক তো বটেই, পাড়ার লোকও শোনে। এতে কোনওরকম ভ্রূক্ষেপ দাদা করেন না, তাঁর ভাষ্য এই তো কয়দিন আগেই আট আনা দিয়া আইছি।

কয়দিন আগে মানে? মা বলেন, সে ত পাঁচ বছর আগে।

পাঁচ বছরকে দাদার কয়দিন আগেই মনে হয়।

হাতে পয়সা থাকলে রিক্সাঅলাকে দুটাকার জায়গায় চারটাকা দেন মা, রিক্সাঅলা যদি অভাবের কথা কোনওদিন বর্ণনা করে পথে, তবে কেবল টাকাই নয়, বাড়ি পৌঁছে খাটের তলে ডাঁই করে রাখা ঝুনা নারকেলের একটি বেছে রিক্সাঅলার হাতে দিয়ে বলেন, পুলাপান নিয়া খাইও। মার এসব আচরণ দেখে দাদা বলেন, মা হইল নানার ডুপ্লিকেট। হাতে যা থাকে সব মাইনষেরে দিয়া দেয়।

দাদা মোটেও মার চরিত্র পাননি। দাদার মন সবসময় বলে পৃথিবীর সবাই তাঁকে ঠকাচ্ছে, তাই তিনি ছলে বলে কৌশলে সবাইকে ঠকাতে চেষ্টা করেন। দোকানে গিয়ে দর কষাকষি করার অভ্যেস দাদার। সকলেই দামাদামি করে, কিন্তু দাদার তুলনা হয় না। দাদার সঙ্গে দোকানে গেলে আমাকে কম লজ্জায় পড়তে হয় না। দোকানি যদি চায় পঞ্চাশ, লোকে তিরিশ টাকায় দিবেন? বা চল্লিশে হইব? জিজ্ঞেস করে। পঞ্চাশ টাকা দাম শুনে দাদা বলেন, তিন টাকায় দিবেন? দোকানি হাঁ হয়ে থাকে। কোথায় পঞ্চাশ আর কোথায় তিন! দাদা সেই তিন থেকে সোয়া তিন সাড়ে তিন করে ওপরে ওঠেন। দোকানি শেষ অবদি কুড়ি বা একুশে রাজি হয়। রাজি হয় বটে, তবে বলে দেয় কাস্টমার অনেক দেখছি ভাই, আপনের মত দেহি নাই। ঠগাইয়া গেলেন। লাভ ত হইলই না, আসল দামডাই উঠল না।

দাদার ওপর ভরসা করি বটে, কিন্তু দাদার কৃপণতা সীমা ছাড়িয়ে গেলে ছোটদার পথ অনুসরণ করা ছাড়া আমার আর উপায় থাকে না। দাদা একবার গোসলখানায় ঢুকলে যেহেতু ছোট বড় মাঝারি সব সেরে আসতে ঘন্টাখানিক সময় নেন, ঘরের আলনায় ঝুলে থাকা তাঁর প্যাণ্টের পকেটে কাঁপা একটি হাত ঢোকে আমার। দাদার পকেটে হাত ঢুকিয়েই হাতেখড়ি হয় এ বিদ্যের, তখন বাবার পকেটেও হাত যায়। কেবল হাত নয়, বুকও কাঁপে, হাতে পাঁচ টাকা দশ টাকার বেশি ওঠে না যদিও, কিন্তু শরমে মাথা নত করতে হয়, স্বস্তি জোটে না। এ বিদ্যে পরে ইয়াসমিনকেও আক্রান্ত করে।

ছোটদার ওপর দাদার রাগ দিন দিন বাড়ে। বাইরে যাওয়ার আগে দাদা তাঁর ঘরে ওষুধের বাক্স ঢুকিয়ে তালা দিতে শুরু করেছেন। কিন্তু ঘরে তালা তো আর দিবানিশি দেওয়া চলে না। দাদা বাড়ি থাকলে ঘরের দরজা খোলাই থাকে। দাদা বাড়িতে আছেন, কিন্তু নিজের ঘরে নেই, এরকম কোনও সময় দেখলেই ছোটদা আমাদের পাঠান ওঘর থেকে ওষধু তুলে নিয়ে আসতে। ওষুধ হাতে করে নিয়ে আসতে গেলে বিপদ হতে পারে বলে দরজার তল দিয়ে পাচার করার উপদেশ দেন। দাদার আর ছোটদার ঘরে যে সবুজ কাঠের দরজা, তার তলে ওষুধের বোতল না হলেও ট্যাবলেট ক্যাপসুল পার হওয়ার মত ফাঁক আছে। ছোটদার একনিষ্ঠ বাহিনী আমি আর ইয়াসমিন প্রচণ্ড দুঃসাহস নিয়ে এই অপকর্ম করে যাই। এই খবরটি দাদার জানা হয়ে যায় একদিন। তিনি কাঠের দোকান থেকে মাপ মত একটি কাঠ এনে দরজার ফাঁক বন্ধ করে দেন। এরপরও যে ওষধু পাচারে কিছু ভাটা পড়ে, তা নয়। ঢিলে জামার আড়ালে করে ক্যাপসুল ট্যাবলেট তো বটেই, ওষুধের বোতল আনার কাজেও আমরা ব্যবহৃত হতে থাকি। বিত্তবানের বিরুদ্ধে বিত্তহীনের লড়াই, সভ্য ভাষায় বলা যায়। এত কিছুর পরও ছোটদার সঙ্গে সাপে নেউলে সম্পর্কে গড়ে তোলা দাদার পক্ষে সম্ভব হয় না, হয় না দাদার হাড় ফোটানো ব্যারামের কারণে। দাদার এই হাড় ফোটানো ব্যারামটি দাদাকে অদ্ভুত আনন্দ দান করে। হাড়ে হাড়ে ঘষর্ণ লেগে যে শব্দ হয়, সেটি তাঁর কর্ণকুহরে সংগীত মছূর্ নার সৃষ্টি করে। দাদা প্রতিদিনই তাঁর শরীরের যত হাড় আছে, তা ফোটান। আঙুলের হাড়ের প্রতিটি সন্ধিস্থল তিনি ঊর্ধ্বে নিম্নে ডানে বামে যত দিকে সম্ভব টেনে শব্দ তোলেন। পায়ের সবগুলো আঙুল নিয়েও একই কাণ্ড করেন। এরপর মেরুদণ্ডের সবগুলো হাড় তার ফোটানো চাই। এক হাত থুতনিতে আরেক হাত মাথায়, এবার হেঁচকা টান মেরে মাথাটা ডানে ঘুরিয়ে নাও, এরপর বামে, ঘাড়ের হাড়গুলো ফুটে গেল। দাদা নিজে একাই পারেন এ কাজটি করতে, কিন্তু ছোটদার সহযোগিতায় জিনিসটি ভাল হয়। ছোটদাকে হাতের কাছে পেলে দাদা বিছানায় বা মেঝেয় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েন। শুয়েই কাতরকণ্ঠে দে না কামাল দে, একটু টাইন্যা দে বলে ছোটদাকে ডাকতে থাকেন, ছোটদার পা ধরতে বলা হলে পা-ও ধরবেন এমন। ছোটদা দাদার মেরুদণ্ডের ওপরের চামড়া শক্ত করে ধরে ওপরের দিকে হেঁচকা টানেন, ফোটে। ঘাড়ের নিচ থেকে শুরু করে ফোটাতে ফোটাতে একেবারে নিতম্বের কাছের শেষ হাড়টি অবদি ফোটান। দাদার মেরুদণ্ড ফোটানো শেষ করে ছোটদা একইরকম উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েন, দাদা একইভাবে ছোটদার পিঠের সবগুলো হাড় ফুটিয়ে দেন। ছোটদাকে বর্জন করার সংকল্পে অটল থাকার অভিপ্রায়ে দাদা একদিন আমাকে বলেছিলেন পিঠের হাড় ফোটাতে। আমার হাতে সেই জাদু নেই, গায়ে যত শক্তি আছে, সবটুকু খাটিয়ে দাদার চামড়া ঊর্ধমুখি টেনেও একটি হাড়কেও নড়াতে পারি না।যাহ ছেড়ি, তুই পারস না, কামালরে ডাক দে। অগত্যা কামাল এসে দাদার হাড় ফোটানোর ব্যারামে ওষধু ঢালেন। কেবল নিজের নয়, অন্যদের হাড়ের ওপরও দাদা ঝাঁপিয়ে পড়েন। হাড় না ফুটিয়ে অন্যরা কি করে জীবন যাপন করছে তিনি ভেবে পান না। দাদা একবার অসহ্য যন্ত্রণা দিয়ে আমার হাত পায়ের কুড়ি আঙুল ফুটিয়ে দেওয়ার পর আমার ঘাড় খামচে ধরেন, ঘাড়ের হাড় ফোটাবেন। ডান দিকে ঘাড়টিকে যখন হেঁচকা টান দিলেন, আমি যন্ত্রণায় চিৎকার করে দাদার হাত থেকে দৌড়ে পালালাম। তিনি আমার পেছনে দৌড়োচ্ছিলেন বলতে বলতে যে ঘাড়ের আরেকদিকটা না ফোটালে আমার ব্যথা বাড়বে। আরেক দিকটায় দাদাকে আর কিছুতেই হাত দিতে দিই নি। হাড় ফোটানো ছাড়াও দাদার আরও একটি রোগ আছে, রোগটির নাম বায়ুরোগ। পায়ুদেশ হইতে বায়ু নিষ্কাষণ। সেটি এমনই ভয়াবহ যে অন্যদের হাসির খোরাক না হয়ে বরং বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মা বলেন, নোমানের পেটটা আইজও ভাল হইল না,জন্মের পর থেইকাই ওর পেটের গণ্ডগোল। দাদার ঘরে ঢুকতে হলে পা বাড়ানোর আগে আমার নাক বাড়াতে হয়, ভেতরে ঢোকা উচিত হবে কি হবে না তা বুঝতে। বায়ুর বিড়ম্বনা কম নয়। বাড়িতে যদি আড্ডা হচ্ছে কোনও, যেই জমছে আড্ডা তখনই দুর্গন্ধ জনিত কারণে দাদা ছাড়া বাকি সবাইকে নাক মখু চেপে উঠে আসতে হয়। রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ থেকে দাদা পড়ছেন, মন দিয়ে শুনছি, তখনই এই একটি কারণে আমার প্রস্থান ঘটে, দাদা বই হাতে একা বসে থাকেন। দাদার চেয়ে বড়দাদা কম যান না। বড়দাদা একবার দাদার এই বায়ু নিষ্কাষণ দেখে বলেছিলেন, চল লাগি। দাদা ঘর ফাটান তো বড়দাদা বাড়ি ফাটান। শব্দে গন্ধে আমরা সাত হাত দূরে ছিটকে পড়েছি। একসময় দাদার পেটে বায়ুর অভাব, জোর খাটিয়েও তাঁর পক্ষে কোনও শব্দ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। বড়দাদা দিব্যি শব্দের রাজা হয়ে বসে আছেন। জেতার জন্য দাদা এমনই মরিয়া হয়ে উঠলেন যে সারা শরীর সঙ্কুচিত করে মৃদু হলেও একটি শব্দ তৈরি করতে চাইছেন, বড়দাদা বললেন, বেশি কুত দিস না, হাইগ্যা দিবি। কিছু একটা অশোভন ঘটেছিল নিশ্চয়ই তা না হলে দাদা রণে ভঙ্গ দিয়ে সেদিন গোসলখানার দিকে দৌড়োবেন কেন!

দাদার বদঅভ্যেসগুলো বাদ দিলে মানুষ হিসেবে দাদা মন্দ নন, আমার তাই মনে হয়। তাঁর কপৃ ণতার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে হঠাৎ কিছু কিছু খসে পড়ে। তাও তো পড়ে। কিন্তু বাবার কৃপণতায় কোনও ফাঁক নেই, কিছু খসে পড়ার উপায় নেই। দাদা এবার লান্ডির মাল নয়, আমার আর ইয়াসমিনের জন্য ঈদের জামা বানাতে শার্টিনের কাপড় কিনে আনেন। ওগুলো দিয়ে মা যখন আমাদের জন্য জামা বানাতে থাকেন, দাদার একটিই অনুরোধ, শীলা যেই ডিজাইনে জামা বানাইয়া দিছিল, ঠিক ওই ডিজাইনে জামা বানাইয়া দেন। মা তাই করেন। শীলার বানানো জামার মত গলায় ঢেউ খেলানো ডিজাইন দিয়ে দেন মা। একেবারে ঠিক শীলার ডিজাইন মত বানিয়ে দিলেও দাদার মনে হয় না ঠিক হয়েছে, তাঁর ধারণা শীলার বানানো আরও ভাল। দাদা জিভে চুক চুক শব্দ করে বলেন, হইছে কিন্তু ঠিক শীলার মত হয় নাই। শার্টিনের কাপড় আরও বেঁচে যাওয়ার পর দাদাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে আমি চন্দনাকে বাকি কাপড়টি দিয়ে আসি, ও যেন ওটি দিয়ে জামা বানায়। চন্দনার বাড়ি থেকে ফিরে আসার সময় দাদা বলেন, তর কি গারো চাকমা মগ মুড়ং হাজং ছাড়া নরমাল কোনও বান্ধবী নাই?

নরমাল মানে? চন্দনা কি এবনারমাল নাকি?

এবনরমালই ত।

চন্দনার চেয়ে নরমাল আর কেউ নাই।

চন্দনাডা বালাই ছিল। নাকটা খাড়া হইলেই বিয়া কইরা ফালা যাইত। কিন্তু.. কিন্তু কি?

চাকমা ত!

চাকমা হইছে তাই কি হইছে?

আরে দূর ! শেষ পর্যন্ত চাকমা বিয়া করাম নাকি? মাইনষে কি কইব!

মাইনষের কথা ত পরে, তুমি কি কইরা মনে করলা তুমি চাইলেই চন্দনা তোমারে বিয়া করব?

দাদা হো হো করে হেসে উঠলেন, যেন আমি মজার কোনও কৌতুক বলেছি।

আমার মত যোগ্য ছেলে ও কি সারাজীবনে পাইব নাকি?

হা!চন্দনার ঠেকা পড়ছে তোমারে বিয়া করবার!

অনেকক্ষণ চপু করে থেকে দাদা বলেন, তর বান্ধবী দিলরুবাডা সুন্দর ছিল। সুন্দরী মেয়েরা থাকে না। ইষ্কুলে পড়ার সময়ই ওদের বিয়া হইয়া যায়। আইএ বিএ এমএ পড়ে যে মেয়েরা, সব হইল বিয়া না হওয়া অসুন্দরীগুলা।

 

মন ভাল থাকলে দাদা কেবল ঈদেই নয়, ঈদ ছাড়াও জিনিসপত্র কিনে দেন আমাকে আর ইয়াসমিনকে। একবার দুবোনের জন্য গলায় পরার পাথরের হার কিনে আনলেন। সেই হার পরিয়ে চিত্ররূপা ছবিঘরে নিয়ে দুবোনকে দুপাশে দাঁড় করিয়ে ছবি তুললেন ঠোঁট ভিজিয়ে হেসে। দুর্গাবাড়ি রোডে চিত্ররূপা ছবিঘর, দাদা বেলা নেই অবেলা নেই ওই ছবিঘরে গিয়েই চিত্তরঞ্জন দাসকে বলেন, দাদা, বাধাঁনো যায়, এমন ছবি তুইলা দেন তো। চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে দাদার বন্ধুত্ব ভাল। বহু বছর ধরে নানা ঢংএর ছবি তুলছেন তিনি দাদার। নকল টেলিফোনের রিসিভার কানে লাগিয়ে; পিরিচ থেকে কাঁটা চামচে নকল মিষ্টি তুলে কারো দিকে বাড়িয়ে আছেন মিষ্টি মিষ্টি হাসি মুখে; পায়ের ওপর পা তুলে সোফায় বসে ম্যাগাজিন পড়ছেন, পাশে বড় ফুলদানি; কখনও আবার বাঘ সিংহের মূর্তির মাথায় হাত দিয়ে, পেছনের পর্দায় নকল সমুদ্র বা পাহাড়ের ছবি। দাদাকে পাঞ্জাবি পাজামা পরিয়ে, শাল পরিয়ে, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা পরিয়ে, হাতে রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা ধরিয়ে বেতের চেয়ারে বসিয়ে আঁতেল বানিয়েও তুলেছেন ছবি। চিত্তরঞ্জন দাস তাঁর পছন্দ মত আমাদের দাঁড় করিয়ে দেন, দাদার ডানপাশে আমাকে রেখে আমার কাঁধে দাদার একটি হাত রাখেন, ইয়াসমিনের কাঁধে দাদার আরেকটি হাত, আমার আর ইয়াসমিনের হাতগুলো কোথায় রাখতে হবে, মখু কোনদিকে ফেরাতে হবে, মুখে কতটুকু হাসি আনতে হবে, হাসিটি কেমন হবে দাঁত বের করে নাকি মুচকি—সব বলে দেন। আমাদের মুখের ওপর কড়া আলো জ্বলে ওঠে। তিনি লম্বা পা লাগানো ক্যামেরায় চোখ রেখে দেখেন কেমন দেখাচ্ছে, কোথাও কোনও ত্রুটি আছে কি না পরীক্ষা করে এগিয়ে এসে দু আঙুলে আমাদের চিবুক ধরে সরিয়ে দেন ডানে বা বামে সামান্য, কপালে বাড়তি চুল পড়ে থাকলে তাও আলতো করে সরিয়ে দেন। কড়া আলোর তলে তখন ঘেমে নেয়ে মুখে একটি নকল হাসি ধরে রাখতে রাখতে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি জাতীয় একটি আকুলতা আমার চোখে। হাসিটি ধরে রাখতেই হবে, চিত্তরঞ্জন দাস পই পই করে বলে দিয়েছেন। ক্যামেরায় চোখ রেখে আবার জামার হাতাটা বা ঝুলটা টেনে দিতে বা গলার কাছে বুকের কাছে ভাঁজ হয়ে থাকলে সেই ভাঁজ সরিয়ে দিতে তিনি ক্যামেরা ছেড়ে আসেন। এই করে একটি ছবি তুলতে আধঘন্টার চেয়েও বেশি খরচা হয়, কিন্তু খরচা করেও ছবি যা ওঠে, তা অন্য সব ছবিঘরের চেয়েও দাদা বলেন বেস্ট। দাদা তাঁর ভাল ছবিগুলো বাধাঁই করে ঘরে সাজিয়ে রাখেন। নিজের ছবিগুলোকে কাছ থেকে দূর থেকে ডান বাম সব কোণ থেকে দেখেন আর বলেন, ক, মেয়েরা পাগল হইব না কেন! চেহারাটা দেখছস! দাদার রূপ আছে সে আমরা সবাই স্বীকার করি, কিন্তু প্যান্ট শার্ট খুলে লুঙ্গি পরলেই তাঁর বেজায় কৎু সিত স্বরূপ উদ্ভাসিত হয়। দাদার ডান বাহুতে বড় একটি কালো দাগ আছে, তিনি অবশ্য বলেন ছোটবেলায় তাঁর বাহুর ওপর দিয়ে একটি অজগর সাপ হেঁটে গিয়েছিল, চিহ্ন রেখে গেছে। অনেকদিন ওই জন্মদাগটিকে অজগরের দাগ ভেবে ভয়ে সিঁটিয়ে থেকেছি। জন্মদাগ বড় ব্যাপার নয়, এরকম সবারই কিছু না কিছু থাকে। কিন্তু লুঙ্গি পরেই তিনি যখন চুলকোনো শুরু করেন পা ফাঁক করে দুউরুর মধ্যিখানে, তখন দেখে মনে হয় না দাদা আদৌ কোনও সুদর্শন পুরুষ। এরপরও যে কাণ্ড করেন, সেটি দেখলে কেবল বমির উদ্রেক নয়, রীতিমত পেটে যা কিছু আছে সত্যিকার বেরিয়ে আসে। গায়ের ময়লা হাতে ডলে তুলে কালো গুলি বানিয়ে ফেলে দেওয়ার আগে তিনি শুঁকে দেখেন। দাঁতের ফাঁকে বাঁধা মাংস এনেও গুলি বানিয়ে শোঁকেন।

মা বলেন, নোমান তুই এইগুলা শুংগস কেন?

আমরাও অনুযোগ করি। মাঝে মাঝে আবার আমাদের তিনি গুলি বানানো ময়লাগুলো শুঁকতে বলেন। একবার তো আমি হজমের ওষুধ চাওয়াতে বেশ গম্ভীর মুখে তিনটে গুলি আমাকে দিলেন খেতে। বড়ির মত দেখতে, আমি দিব্যি গুলি খেতে যাচ্ছিল!ম, ইয়াসমিন হা হা করে ছুটে এসে বলল ওইগুলা দাদার ছাতা। আমাকে দৌড়োতে হয়েছে গোসলখানায় বমি করতে।

দাদা চাকরি করেন, মাস গেলে ভাল টাকা বেতন পান। সুটেড বুটেড হয়ে কোম্পানীর সভায় যান। কোম্পানীর সুযোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে আবার পুরষস্কারও অর্জন করেন। দাদা যত বড়ই হন, বদঅভ্যেসগুলো থেকেই যায়। আঙুল ফুলে কলাগাছটির দিকে আমরা অনেক আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকি। আমাদের কিছু ছোটখাট আশা তিনি চাহিবামাত্র না হলেও একদিন না একদিন পুরণ করেন। ছাদ থেকে দেখা প্রায় বিকেলে একটি শাদা শার্ট খয়েরি প্যান্ট পরা ছেলের জন্য যখন মন কেমন কেমন করতে শুরু করল, মনে হল ঠিক ওরকম শাদা শার্ট আর খয়েরি প্যান্ট আমিও পরি না কেন! শখ মেটাতে বাবা তো কখনও এগিয়ে আসেন না, আসেন দাদা। দাদাকে ধরে শাদা টেট্রনের কাপড় কেনা হল, প্যান্ট বানানোর খয়েরি রংএর কাপড়ও। আমার ইচ্ছে শুনে দাদা বললেন, প্যান্ট না, এই কাপড় দিয়া পায়জামা বানা। দাদা যখন আমাকে নিয়ে গাঙ্গিনার পাড়ের মোড়ে দরজির দোকানে গেলেন, আমি বললাম প্যান্ট, দাদা বললেন পায়জামা। মেয়েরা প্যান্ট পরে নাকি? প্যান্ট পরে ছেলেরা।

মেয়েরা পরলে অসুবিধা কি?

অসুবিধা আছে। মাইনষে চাক্কাইব।

চাক্কাইব কেন? এইডা কি দোষের কিছু!

হ, দোষের।

দোষের হলেও দাদা আমার শখের ওপর দয়াপরবশ হয়ে দরজিকে জিজ্ঞেস করেন, আচ্ছা প্যাণ্টের মত কিছু কি বানাইয়া দেওয়া যায়?

দরজি সহাস্যে বললেন, মেয়েদের প্যান্ট বানাইয়া দেওয়া যাবে।

মেয়েদের প্যান্ট আবার কি রকম?

পকেট থাকবে না, তলপেটের ওপর ফাড়া থাকবে না, ফাড়া থাকবে বাঁ দিকে, বাঁদিকে চেইন,বেল্ট লাগানোর জন্য যে হুক থাকে তা থাকবে না, এ হচ্ছে মেয়েদের প্যান্ট। নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল বলে সেটিই আমাকে লুফে নিতে হয়। জামার কাপড়টি দিয়ে যেহেতু শার্ট বানানোর প্রস্তাব করা অসম্ভব, তাই জামাই বানাতে হয়,কিন্তু একটি ছোট্ট আবদার জানাই, জামার হাতা যেন অন্তত শার্টের হাতার মত হয়, ভেতর দিকে নয়, বাইরের দিকে ভাঁজ। দরজি মাপ নিলেন লম্বা দাগকাটা ফিতেয়, জামার মাপ নেওয়ার সময় দরজির হাত বারবার আমার বুক ছুঁয়ে গেল। অস্বস্তি আমাকে সঙ্কুচিত করে রাখে। কিন্তু আমাকে ভেবে নিতে হয়, মাপ নেওয়ার সময় এ না হলে সম্ভবত হয় না। মেয়েদের প্যান্ট আর জামা যেদিন তৈরি হয়ে এল, আমি খুশিতে আটখানা নই, আট দ্বিগুণে ষোলখানা। কিন্তু পরার পরেই হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটল। বাবা আমাকে দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না, গা খিঁচিয়ে বললেন,এইডা কি পরছস?

আমি বললাম, প্যান্ট।

প্যান্ট পরছস কেন তুই?

কোনও উত্তর নেই।

বেডাইনের পোশাক পরছস কেন? লজ্জা নাই? এক্ষুণি খোল। আরেকদিন যদি দেখি এইসব পরতে, শরীলের কোনও চামড়া বাদ থাকবে না এমন পিটাবো।

আমাকে প্যান্ট খুলে পায়জামা পরতে হল। এরপর ওই প্যান্ট যে পরিনি তা নয়, পরেছি তবে বাবা মাইল খানিক দূরত্বের মধ্যে নেই জেনেই তবে পরেছি।

দাদার উপহার বই আর জামা কাপড় আর গয়নাগাটির সীমা ছাড়িয়ে এরপর রংএ যায়। ছবি আঁকার রং নয়, মুখে মাখার রং। আমার জন্য একটি মেক আপ বাক্স কিনে আনলেন তিনি, এটির জন্য কোনও অনুরোধ আমার ছিল না, দাদা নিজের ইচ্ছেতেই কিনেছেন। এই বাক্স সম্পর্কে আমার কোনওরকম অভিজ্ঞতাই নেই, কি করে কি মাখতে হয় তা আমি জানি না। তখন ছোটদা হলেন সহায়। চেয়ারে আমাকে মূর্তির মত বসিয়ে আমার মুখে চোখে, চোখের পাতায়, গালে, চিবুকে, ঠোঁটে রং মাখিয়ে দিলেন। ইয়াসমিনকেও দিলেন। রংএর বাক্সটিকে ম্যাজিক বাক্সের মত মনে হতে লাগল আমার, কি চমৎকার মুখের চেহারা পাল্টো দিচ্ছে, নিজেকে মনে হচ্ছে কবরী, ববিতা, শাবানার মত সিনেমার নায়িকা। বাড়িতে চন্দনা বেড়াতে এল, ওকেও বসিয়ে মুখে রং মাখানো হল। চন্দনার গালে বাক্সের গোলাপি পাউডার তুলিতে করে ছোটদা যখন বুলোচ্ছিলেন, মা বললেন, চন্দনা তো শাদাই, ওর কি আর পাউডার লাগে?

দাদা আমাকে আর ইয়াসমিনকেই যে কেবল দেন তা নয়, মাকেও দেন। মা মলিন শাড়ির ছেঁড়া ছিদ্র আড়াল করে পরেন যেন কারও চোখে না পড়ে, চোখে যদি পড়েও কারওর, চোখ এমন অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে কেউ চমকে ওঠে না বরং মা একটি নতুন শাড়ি পরলেই সবার চোখে পড়ে। একটি ভাল শাড়ি পরলেই, বাহ শাড়িডা ত সুন্দর, কই পাইছ, কে দিল! এসব মন্তে ব্যর ঝড় বয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ আমার বা ইয়াসমিনের চোখে পড়ে, যদিও চোখ ব্লাউজহীন সায়াহীন শাড়িতেও মাকে দেখেছে, ছেঁড়া শাড়ি এমন কোনও দুর্ঘটনা নয় মার জন্য, তবু দাদার কাছে শাড়ি চাও যদি বলি, মা বলেন, নোমান আর কত দিব? তোদেরে দিতাছে। যেই মানুষটার দেওয়ার কথা, সে ত আরামে আছে। নিজের দায়িত্বের কথা ভুইলা গেছে। কারও জন্য কিছু কিনার চিন্তা নাই। মা চান দাদা নয়, বাবা যেন মাকে কিছু দেন। মাকে ভাবছেন, মার জন্য করছেন বাবা, সামান্য কিছু হলেও, তিল পরিমাণ হলেও, দেখতে মা চাতক পাখির মত অপেক্ষা করেন। বাবা কারও অপেক্ষার দিকে ফিরে তাকান না, বিশেষ করে মার। আমাদের বরাদ্দ যে ঈদের জামা, সেটি দিতেও আজকাল বাবা খুব একটা আগ্রহী নন। দাদার কাছ থেকে আমরা পাচ্ছি, তা অবশ্য তিনি জানেন। নিজে তো দেবেন না, দাদা যেন আমাদের আশকারা কম দেন, আবার বেশি পেলে আমরা যে উচ্ছন্নে যাব, সে কথাটি দাদাকে ডেকে ধমকে স্মরণ করিয়ে দেন।

একথা দাদার খুব স্মরণে আছে বলে মনে হয় না। কারণ ধমক খাওয়ার পরদিনই দাদা আমাকে বলেন, কি রে পিকনিকে যাইবি? ঘর থেকে বেরোনোর সুযোগের জন্য ওত পেতে থাকা আমি লাফিয়ে উঠি। এরকম একটি প্রস্তাব পেয়ে আমার দুপুরের ঘুম রাতের ঘুম সব উবে গেল।

এই পিকনিক ময়মনসিংহের মধপুুর জঙ্গলে নয়, রাজধানী ঢাকায়। দাদার সঙ্গে ঢাকা যাওয়ার সুযোগ এবার। ঢাকার সাভারে পিকনিক করতে যাচ্ছে ফাইসন্স কোম্পানীর লোকেরা। আত্মীয় স্বজন নিয়ে যেতে পারে। দাদার বউ নেই। দুটো বোন আছে, এক ভাই আছে। বাবা মা আছেন। বাবা মাকে নেওয়া চলে না, তাঁরা পিকনিকের জন্য বেমানান। ছোটদা পিকনিকের জন্য বড় হয়ে যায়। ইয়াসমিন ছোট হয়ে যায়। একেবারে খাপে খাপে মিলে যাই আমি। সুতরাং জামা কাপড় বাছাই কর। বাছাই করার কিছু অবশ্য ছিল না আমার, ইশকুলের ইউনিফর্মের বাইরে হাতে গোনা যা আছে তাই ধুয়ে ইস্ত্রি করে তৈরি নিই। ইস্ত্রি বলতে লোহার একটি হাতলঅলা পাত, চুলোর ওপর ওটি রেখে পাতের তলা গরম হলে পুরু করে গামছা ভাঁজ করে হাতল ধরে উঠিয়ে নিয়ে কাপড়ে ঘসে নিই। জামা কাপড় নিই, আর নিই দাদার দেওয়া সেই রঙের বাক্স। ট্রেনে চড়ে ঢাকা যাওয়া, এর চেয়ে আনন্দ আর কী আছে জীবনে! সমস্ত পথ জানালায় মখু রেখে গরম হাওয়া আর ধুলো খেতে খেতে গাছপালা নদীনালা ধানক্ষেত পাটক্ষেত দালানকোঠা বাজার হাট দেখতে দেখতে ঢাকা পৌঁছি। ঢাকায় উঠতে হয় বড়মামার বাড়িতে, বড় মামার বাড়ি আর লালমাটিয়ায় নয়, বাড়ি ধানমণ্ডিতে। নিজে জায়গা কিনে ছোট ছোট ঘর তুলেছেন। ঘরে ছোট ছোট বাচ্চা। বড় মামার বাড়িতে জায়গার অভাবে দাদা রাত কাটাতে গেলেন আপিসের এক বড়কর্তার বাড়ি। আমাকে শুতে হয়েছে ঝুনু খালা আর বড় মামার ছেলে মেয়ের সঙ্গে এক চৌকিতে আড়াআড়ি চাপাচাপি গাদাগাদি করে। সকালে দাদা এলেন নিতে আমাকে। ইস্ত্রি করা জামা পরে মুখে রং মাখছি যখন শুভ্রা আর শিপ্রা বড় মামার মেয়েদুটি ভূত দেখার মত দেখছিল আমাকে। কাউকে ওরা মুখে রং মাখতে এর আগে দেখেনি। ঝুনু খালা আমাকে আড়াল করছিলেন বার বার ওদের থেকে, বলছিলেন, বড়দের সাজতে হয়, তোমাদের এখনও বয়স হয় নাই সাজার, সর। ঝুনু খালা বড় মামী থেকেও যথাসম্ভব আমাকে আড়াল করলেন। তাঁর ভয়, মুখের এসব রং দেখলে বড় মামী বড় মামাকে জ্বালিয়ে খাবেন এমন একটি রংএর বাক্স কিনে দেওয়ার জন্য। বাসে চড়ে সাভারে গিয়ে বড় এক মাঠের মধ্যে পিকনিকের বড় বড় হাঁড়িকুঁড়ি থাল বাসন সব নামানো হল। রান্না হল, খাওয়া হল, খেলা হল, নিয়াজ মোহাম্মদ নামের এক গায়ককে ভাড়া করে এনে গান গাওয়ানো হল। বাইরের লোকের সঙ্গে দাদা তাঁর চিরাচরিত স্বরচিত শুদ্ধ বাংলা চালিয়ে গেলেন র কে ড় বলে বলে। দাদার এই হয়, ঢাকার কারও সঙ্গে, যাঁরা শুদ্ধ বাংলায় কথা বলেন, কথা বলতে গিয়ে ময়মনসিংহের আঞ্চলিকতা বিসর্জন দেওয়ার জন্য এমনই সতর্ক থাকার চেষ্টা করেন যে র-র উচ্চারণ হয়ে যায় ড়, আমাড় ফাদাড় তো ডাক্তাড়, চেম্বাড়ে ড়োগি দেখছিলেন,তখনই তাড়া গেল, তাড়পড় যাড়া যাড়া আসছিল, তাদেড় সাথে আমাড় সড়াসড়ি কথা হয়েছে। পিকনিকে দাদা তাঁর কোম্পানীর বড় বড় লোকদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন, আমাড় ছোট বোন নাসড়িন, এইবার মেটড়িক দিল বলে। আর পরিচয়ের পর কথা না বলে গুড়ি মেরে বসে থাকা আমাকে দেখে দাদা হেসে বলেন, কি ড়ে শড়ম পাওয়াড় কি আছে! এদিকে আয়। আমাড় স্যাড়, স্যাড়ড়ে সালাম দে। সাভার থেকে শহরে ফিরে এসে দাদা নাক কুঁচকে কেবল একটিই মন্তব্য করলেন, রংডা বেশি মাখাইয়া ফেলছস মুখে। আমাকে নাকি সংএর মত লাগছিল।

ঝুনু খালা ইডেন কলেজ থেকে পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন বাংলায়। আমাকে তিনি পিকনিকএর পরদিন নিয়ে গেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। যতক্ষণ ছিলাম ওখানে, হাঁ হয়ে দেখেছি সব। রুনুখালার একটি ক্লাস ছিল, ওতেও নিয়ে গেলেন। ক্লাসে ছাত্ররা বসেছে ডান সারিতে, ছাত্রীরা বাঁ দিকে। আমি মেয়েদের ইশকুলে পড়া মেয়ে, আমার জন্য এ এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। ক্লাসে পড়াতে এলেন নীলিমা ইব্রাহিম। আমি নাম শুনেছি তাঁর, লেখাও পড়েছি। নীলিমা ইব্রাহিম লক্ষ করেননি ক্লাসে অল্প বয়সের একটি মেয়ে বসে আছে জড়সড়। কি পড়িয়েছেন তিনি তার ক-ও বুঝতে না পেরে ক্লাস থেকে বেরিয়ে ঝুনু খালার কানে কানে আমার ইচ্ছের কথা বড় হয়ে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য পড়ব বলি। বলি কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের চমৎকার পরিবেশটি দেখে স্বর্গ যদি কোথাও থাকে, তবে এখানেই এরকম একটি ধারণা জন্মায় আমার। কোনও একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে দাদার সঙ্গে ট্রেনে চড়ে ময়মনসিংহ ফিরে আসি। ফিরে চন্দনার কাছে নিখুঁত বর্ণনা করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলে মেয়েরা পাশাপাশি হাঁটছে, হাসছে,কথা বলছে,গান গাইছে কেউ তাদের দিকে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে না, চোখ টিপছে না, মন্দ কথা বলছে না, ঢিল ছুঁড়ছে না। মাঠের ঘাসে বসে আছে ছেলে মেয়ে গোল হয়ে, আড্ডা দিচ্ছে। কোনওরকম নির্দিষ্ট পোশাক নেই কারও জন্য। যার যা খুশি পরে এসেছে, লাল জামা সবুজ জামা, কেউ আবার শাড়ি। এ যেন স্বপ্নের জগত।স্বপ্ন চন্দনার চোখের পুকুরেও সাঁতার কাটে। নিজের ভাই ছাড়া, বাবা ছাড়া, আর কিছু ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছাড়া কারও সঙ্গে আমাদের মেশা হয়নি। বাইরের জগতটি আমাদের জন্য বিশাল এক জগত। বাইরের পুরুষ আমাদের কাছে একই সঙ্গে বিস্ময় এবং একই সঙ্গে ভয়ঙ্কর। গল্প উপন্যাস পড়া সিনেমা দেখা আমার আর চন্দনার মনে যদি কোনও পুরুষের স্বপ্ন থাকে, সে সুদর্শন সপুুরুষের স্বপ্ন। গল্প উপন্যাস পড়ার খেসারতও দিতে হয় আমাকে কম নয়। বাড়িতে চিত্রালী দিতে আসা হকারকে দাদা যেদিন এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে চিত্রালী পূর্বাণী ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিলেন জানালা দিয়ে, যেদিন বললেন, এখন থেকে এইসব আজাইরা পত্রিকা পড়া বন্ধ, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই আমি। বেরোই, কোথায় যাব তা না জেনেই বেরোই। হাতে কোনও টাকা নেই যে রিক্সা নিয়ে নানিবাড়ি চলে যেতে পারব। কপর্দকহীন কত গল্প উপন্যাসের সিনেমার নায়িকারা তো বেরোয়, রাস্তায় খানিকটা হাঁটলেই কোনও নির্জন সমুদ্র তীর বা গভীর অরণ্য বা উদাস নিরিবিলি পাহাড় জুটে যায়। কোনও অঘটন ঘটে না,বরং চমৎকার চমৎকার ঘটনা ঘটে। নায়িকা হয়ত নায়কের দেখা পেল, অথবা বিশাল ধনী এক উদার লোক নায়িকাকে পালিতা-কন্যা বানিয়ে ফেলল। অথবা নায়িকা একা একা নদী বা সমুদ্রের ধারে হাঁটল, ফুলে ছেয়ে থাকা বাগানে হাঁটতে হাঁটতে ফুলগুলোর সঙ্গে মনে মনে কথা বলল, উড়ে আসা কোনও পাখির সঙ্গেও বলল, রঙিন প্রজাপতির পেছনে দৌড়োলো, একসময় গাছে হেলান দিয়ে সুখের অথবা দুঃখের একটি গান গাইল। অথবা অঘটন ঘটলেও অঘটন থেকে নায়িকাকে উদ্ধার করে সাহসী কোনও মানুষ সারাজীবনের ভাই বা বন্ধু হয়ে গেল। গল্প উপন্যাস পড়া সিনেমা দেখা মেয়ে বুকের ভেতর ভয় এবং নির্ভয় দুটো জিনিস পুষে হাঁটতে থাকে। নদীর ধারে পুরুষের থাবা আছে জেনেও সে নদীর ধারের দিকেই হাঁটে, পার্কের দিকে। বাগান অলা একটি জায়গার দিকে, লোকে যার নাম দিয়েছে লেডিস পাকর্, সেদিকে। বিকেলে নারী পুরুষ শিশু যেহেতু বেশি কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই শহরে এখানেই আসে, বেঞ্চে বসে বাদাম চানাচুর খায়, খেয়ে হাওয়ায় হাঁটাহাঁটি করে বাড়ি ফিরে যায়। আমি যখন নির্জনতার স্বপ্ন নিয়ে ভরদুপুরে পার্কে পৌঁছে গাছের ছায়ায় একটি একাকি বেঞ্চে বসে সামনে ঝিরিঝিরি হাওয়ায় ব্রহ্মপুত্রের জলের শরীরে ছোট ছোট ঢেউ দেখি, গাছের টপু টাপ পতন দেখি জলে, ইচ্ছে করে বসে থাকি এভাবে, চেয়ে থাকি নিসর্গের এই সৌন্দর্যের দিকে, যতক্ষণ ইচ্ছে। কিন্তু গল্প উপন্যাসের চরিত্ররা যতক্ষণ ইচ্ছে বসে থাকতে পারে, আমি পারি না। একটি দুটি করে লুঙ্গি পরা ছেলে জমতে থাকে আমার চারপাশে। আমার চোখ নদীর দিকে। দুটো নৌকো যাচ্ছে, বালুর নৌকো, নৌকোর দিকে। নৌকোর মাঝি ভাটিয়ালি গান গেয়ে গেয়ে বৈঠা বাইছে, বৈঠার ছন্দময় গতির দিকে। মাঝির দিকে। চোখ যায় নদীর ওই পারে, কি চমৎকার কাশফুলে ছেয়ে আছে! এসবে মগ্ন হওয়ার কোনও সুযোগ ছেলের দল আমাকে দেয় না। আমার চারপাশের নৈঃশব্দ আর নির্জনতার বুক ছুরিতে চিরে ছিঁড়ে একজন আরেকজনকে বলে, ছেড়ির বুনি উঠছে নাহি?

আরেকজন সামনে এসে খিলখিল হেসে বলে, হ উঠছে।

কেমনে জানস উঠছে? ধইরা দেখছস?

ছেলের দল সজোরে হেসে ওঠে।

বওয়াইব নি?

চায় কত?

কতা ত কয় না।

কতা কয় না কেন? বোবা নাকি?

ভয়ে আমার গা হাতপা কাঁপে। গলা শুকিয়ে যেতে থাকে। এরা যদি এখন বুকে থাপ্পড় দেয়, সেই একবার এক ছেলে এই ব্রহ্মপুত্রের পারেই যেরকম দিয়েছিল। অন্য এক বেঞ্চে সরে গিয়ে বসি। দেখে ছেলের দলে উচ্ছঅ!স বাড়ে। হৈ হৈ করে সেই বেঞ্চের কাছে ভিড় জমায়।

এই তর নাম কি? বাড়ি কই?

এই ছেড়ি তর বাপ আছে?

কারও কোনও প্রশ্নের উত্তর দিই না। একটি লুঙ্গি পরা আমার দিকে ঢিল ছোঁড়ে, ঢিলটি পিঠে এসে লাগে। আরেকটি ছেলে কাছে এসে তার পা দিয়ে আমার পায়ে খোঁচা দেয়। পেছন থেকে আরেকজন দেয় খোঁচা, পিঠে। আমি যেন আকাশ থেকে পড়া উদ্ভট কোনও জীব, সবাই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখছে কি রকম আচরণ করি আমি। ঢিলের আর খোঁচার কোনও উত্তর না দিয়ে আমি আবার ব্রহ্মপুত্রের ছলাৎ ছলাৎ জলে। মনের দড়িতে একটি আশাকে বেঁধে রাখি শক্ত করে, কোনও উত্তর না দিলে কিংবা পাল্টা কোনও ঢিল না ছুঁড়লে এরা ধীরে ধীরে চলে যাবে। আশা ক্রমশ দড়ি থেকে মুক্ত হতে থাকে। আশা তার হাত পা খুলে আকাশে উড়াল দিতে থাকে। আমার ব্যাকুল চোখ খুঁজে ফেরে কোনও ভদ্র দেখতে লোককে, যে আমাকে উদ্ধার করতে পারে এই হিংস্র ছেলের দল থেকে। না কেউ ঢুকছে না পাকের্। ভদ্রলোকেরা সব ওই পারে বেড়াতে গেছে। এই পারে কেউ নেই।নেই কেউ। একা আমি আর এরা। দূরের মাঝিও দেখছে না কি করে আমাকে শকুনের মত ঘিরে ধরেছে কটি বর্বর ছেলে। এরা বয়সে আমার ছোট, অনুমান করি। বড়দের সঙ্গে বেয়াদবি করতে নেই, ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, আর এরা নির্ভাবনায় বেয়াদবি করে যাচ্ছে! বেয়াদবি এবার আর খোঁচায় নয়,পিঠে একটি ধাক্কা এসে পড়ে। ধাক্কাটি আমাকে চকিতে পেছন ফিরিয়ে চিৎকার করে বলায়,আমি এইখানে বইসা রইছি, তোদের কি হইছে তাতে? ভাগ।

হা হা হি হি শুরু হয় ছেলের পালে।

কতা ফুটছে মুহে। কতা জানে রে কতা জানে ..

একজন লুঙ্গি তুলে নাচতে শুরু করে আমার সামনে। দেখে আরেকজন আসে নাচে যোগ দিতে। বাকিরা হাসছে, হাততালি দিচ্ছে। একজন আসে আমার বুকের দিকে দুটো কিলবিলে থাবা বাড়িয়ে। দুহাতে সেই থাবা সরিয়ে দিই। থাবা আবার এগোয়। ফোপাঁতে থাকি। ফোপাঁনো থেকে গোঙানো। আমার জামা ধরে টানছে দুটি ছেলে। চোখ বড় করছে, দাঁত দেখাচ্ছে, জিভ দেখাচ্ছে। খেলছে আমাকে নিয়ে। মজা করছে। এখন জামাটি আমার টেনে খুলে নিতে পারলেই হয়। জামাই বা শুধু কেন, এখন পাজামাটিও টেনে খুলতে পারলে হয়! এই শুনশান পার্কে কেউ দেখবে না কি হচ্ছে এদিকে। হঠাৎ দুজন লোককে পার্কের ভেতরে ঢুকতে দেখে প্রাণ ফিরে পাই। জটলার দিকে প্যান্ট শার্ট পরা লোকদুটো এগোচ্ছে, ভদ্রলোক দুটো এগোচ্ছে। দেখে পিছু হটে ছেলেগুলো। লুঙ্গি তোলা নাচও থামে। লোকদুটো আমাকে এই নৃশংস দৃশ্য থেকে উদ্ধার করবে আশায় আমি এগোতে থাকি ওদের দিকে। কিন্তু লোকদুটোর একজন আমাকে নয়, ছেলেগুলোকে জিজ্ঞেস করে, কি হইছে কি?

ছেড়ি একলা বইয়া রইছে পার্কে।

একলা?

লোকদুটোর আরেকজন গম্ভীর মুখে বলে,একলা কি করতে আইছে?

তা ই তো জিগাইতাছি। কয় না।

কয় না কেন, কয় না কেন?

লোকদুটো সামনে দাঁড়ায় আমার। মুখে নয়, বুকে তাকায়। খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসে। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে, এরা আমাকে উদ্ধারের জন্য নয়। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে, পালাও। কোথাও কোন দিকে পালাবো বুঝে উঠতে পারি না। বুঝে উঠতে না পারা আমার দিকে একজন দাঁত মেলে হাত মেলে এগিয়ে আসে, দেখে আরেকজন পাখি উড়িয়ে হাসে। নদীর জল কাঁপিয়ে হাসে। আমার মনে হতে থাকে এরা আমাকে ছিঁড়ে ফেলবে। খেয়ে ফেলবে। খুবলে খাবে। চিবিয়ে খাবে। বিকেলের আলো নিভে আসছে। ডিমের কুসুমের মত সূর্য ব্রহ্মপুত্রের জলে রং ছড়াতে ছড়াতে ডুবে যাচ্ছে। হা হা হাসির লোকটি তার প্যাণ্টের চেইন একবার নিচের দিকে একবার ওপরের দিকে নামায় ওঠায়। ওঠায় নামায়। আমি চোখ বুজে দুহাতে বুক ঢেকে হাঁটু ভেঙে দু হাঁটুতে মাথা চেপে বসে পড়ি। কণ্ডুুলি পাকাতে পাকাতে ছোট্ট একটি পুঁটলির মত হয়ে থাকি। ঢিল পড়তে থাকে সারা শরীরে। আমার শরীর দিয়ে আমি আড়াল করে রাখি আমাকে। টের পাই লোকদুটো ছেলের দলের হাতে আমাকে সঁপে দিয়ে চলে গেছে। এরা এখন যা খুশি করার ছাড়পত্র পেয়ে গেছে। কণ্ডুুলির মধ্য থেকে আমি হঠাৎ চিৎকার করে উঠি ভয়ে। আমার চিৎকারে ছেলের দল গলা ফাটিয়ে হাসে। হঠাৎ কুণ্ডুলি থেকে উঠে ঊর্ধশ্বাসে দৌড়োতে থাকি সার্কিট হাউজের মাঠের দিকে। পেছন পেছন হাসতে হাসতে ছেলেগুলো। আমি কথা বলতে পারি, চিৎকার করতে পারি, দৌড়োতে পারি সবই এদের কাছে মজার বিষয়। চিড়িয়াখানায় বানরকে নিজে হাতে কলা খেতে দেখলে লোকে হাসে, মজা পায়। বানরের লাফানো দৌড়োনো ঝুলে থাকা সব কিছু দেখতেই মজা। নিজেকে আমার কোনও মানুষ মনে হয় না, মনে হয় কোনও লোক হাসবার জন্তু। ছেলেরা লুঙ্গি তুলে নুনু দেখিয়ে দিব্যি আমার সামনে নেচে গেছে, আমাকে ঢিল ছুঁড়েছে, খুঁচিয়েছে, হাত বাড়িয়েছে, একটওু ভাবেনি আমি এদের মন্দ বলব, কি শায়েস্তা করব কোনও একদিন মওকা মত পেলে। না কোনওকিছুকে এরা মোটেও পরোয়া করছে না। আমি আমার গন্তব্য না জেনে দৌড়োই। পার্কের আশেপাশে কিছু লোককে দেখি হাঁটছে, কিন্তু কারও দিকে আমার যেতে ইচ্ছে করে না, কাউকে বিশ্বাস হয় না আমার। এই উদভ্রান্ত দিকভ্রান্ত আমার দিকে, ঊর্ধশ্বাসের দিকে, এই উদ্ভট দৃশ্যটির দিকে হেঁটে আসতে থাকে শাদা শার্ট খয়েরি প্যান্ট। অথৈ জলে সাঁতার না জানা মেয়ের হাতে খড়কুটো। এই সেই শাদা শার্ট খয়েরি প্যান্ট, যাকে ছাদ থেকে বিকেলে দেখি, যাকে দেখার জন্য প্রায়ই ছাদে উঠি। শাদা শার্ট আমাকে থামিয়ে হুস হুস করে ছেলের পাল বিদেয় করে কাছে এসে মধুর হেসে বলে, এইখানে কখন আসছিলা?

আমি কোনও কথা বলি না। শাদা শার্ট শব্দে শব্দে হাঁটে, পেছন পেছন নিঃশব্দে আমি। হাপাঁতে হাপাঁতে আমি।

দৌড়াইতাছিলা কেন? ছেলেগুলা কিছু করছে তোমারে?

কোনও কথা নেই।

কিছু বলছে তোমারে?

এবারও কথা নেই।

ছেলেরা যা করেছে, যা বলেছে জানাতে আমার লজ্জা হয়। যেন ছেলেদের কীর্তিকাণ্ডের সমস্ত দায় আমার, লজ্জা আমার। ছেলেরা অন্যায় করেছে, যেন আমারই দোষে করেছে।

ঈশান চক্রবতীর্ রোডের কাছে এসে শাদা শার্ট বলে বাসায় যাইবা তো?

আমি দুপাশে মাথা নাড়ি।

তাইলে কই যাইবা?

আবারও দুপাশে মাথাটি নড়ে। কোথাও না অথবা জানি না জাতীয় উত্তর।

শাদা শার্টের পেছন পেছন দিব্যি আমি তাদের বাড়িতে গেলাম, ঠিক তাদের বাড়িতে নয়, তাদের বাড়িঅলার বাড়িতে, ঠিক বাড়িতেও নয়, বাড়ির ছাদে। ছাদে বসে হাওয়া খাচ্ছিল শাদা শার্টের বড় ভাই আর তার বন্ধু। আমরা ছাদে পৌঁছোলে ভাই বন্ধু দ্রুত ছাদ থেকে নেমে যায়।

কি খাইবা?

আমি মাথা নাড়ি, কিছু খাব না।

মাথা নাড়া ছাড়া শাদা শার্টের কোনও প্রশ্নের উত্তরে কোনও শব্দ উচ্চারণ করা হয় না আমার। শাদা শার্ট তার ছোট ভাইকে ছাদ থেকে গলা ছেড়ে ডেকে নিচে পয়সা ফেলে একটা সেভেন আপ নিয়ে আসার আদেশ দেয়। ছোট ভাই সেভেন আপ আনতে গেল দৌড়ে, এদিকে ছাদের অন্ধকারে শাদা শার্ট আমাকে সিনেমায় রাজ্জাক যেমন কবরীকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে তেমন করে জড়িয়ে ধরতে চায়। এরকম আলিঙ্গনের আহবান এলে আমারও আবেশে বুকে মিশে যাওয়ার কথা। কিন্তু লক্ষ করি গা কাঠের মত শক্ত হয়ে আছে আমার। কাঠ ছিটকে সরে দাঁড়ায়। সেভেন আপ আসে, একলা বসে থাকে, আমার ছোঁয়া হয় না। অবকাশের ছাদ থেকে গোলপুকুর পাড় থেকে হেঁটে এসে সের পুকুর পাড়ের মোড়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া শাদা শার্টকে দেখে মনে হত বোধহয় এর প্রেমে পড়ে গেছি। বুক যে ধুকপুক করেনি তা নয়। কিন্তু রাজ্জাকের মত ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরার ব্যাপারটি এত কৃত্রিম লেগেছে যে অস্থি মজ্জায় বুঝেছি আমি চাইলেই কবরী হতে পারি না, চাইলেই ববিতা হতে পারি না, গল্প উপন্যাস আর সিনেমার মত জীবনের সবকিছু নয়। হলে ওই আলিঙ্গনটি আমার ভাল লাগত। হলে আমি প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে ওই ছেলের পালকে আর ওই প্যান্ট শার্ট পরা অসভ্য লোকদুটোর চাপার দাঁত তুলে নিতে পারতাম। পারিনি।

সেই দুপুরে বেরিয়েছি, এখন অন্ধকার হয়ে গেছে, বাড়িতে কি শাস্তি আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে তা কল্পনা করার শক্তি আমার নেই। সেই বাড়িতে, শাদা শার্ট বলে, চল দিয়া আসি তোমারে। কোথাও যাবার নেই বলে ছাদ থেকে নেমে মরিয়ম ইশকুল ডানে, সুধীর দাসের মূর্তির দোকান বাঁয়ে রেখে গোলপুকরু পাড়ের চৌরাস্তা পেরিয়ে আমাকে বাড়ির দিকে নিস্তেজ হাঁটতে হয়। হতাশা আর আতঙ্ক সম্বল করে শাদা শার্টের পেছন পেছন অবকাশের কালো ফটক অবদি আসি। এরপর প্রাণহীন একটি জড়বস্তুর মত ভেতরে ঢুকি। বাড়ির লোকেরা আমার দিকে এমন চোখে তাকায় যেন কেউ চেনে না আমাকে। আমার নাম ধাম পরিচয় কেউ জানে না। আমি কেন এসেছি, কোত্থেকে এসেছি, কারও জানা নেই। এরপর চোখ খানিকটা ধাতস্থ করে কই ছিলি এতক্ষণ, কার কাছে গেছিলি, তর মনে কি আছে ক, অত সাহস কই পাইলি ইত্যাদি হাজারো প্রশ্নের সামনে আমি নির্বাক নিস্পন্দ নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকি। আমি আমার জীবন যৌবন কোথাও বিসর্জন দিয়ে বাড়ি ফিরেছি অনুমান করেই সম্ভবত দাদা আর মা দাঁড়িয়ে থাকা নির্বাক নিস্পন্দ আমার ওপর কিল ঘুসি লাথি, নিশ্চল আমার ওপর চড় থাপড় নির্বিকারে নির্বিচারে চালিয়ে যান। অবসন্ন শরীর পেতে সব বরণ করি। আপাতত ওই ছেলেছোকড়াদের আক্রমণ, শাদা শার্টের অস্বাভাবিক আলিঙ্গন থেকে বাঁচা গেল বটে, কিন্তু দাদা আর মার অনাচার থেকে বাঁচা সম্ভব হয় না। আমার বিবমিষা বাড়তে থাকে সব কিছুর কারণে।

ছাদে দাঁড়ালে আমার চেয়ে বয়সে ছোট এক ছেলে তাদের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে লুঙ্গি উঁচু করে তার নুনু দেখায়। আমাকে চোখ ফিরিয়ে নিতে হয়। ছাদের রেলিং থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। অন্য কিছু দেখতে চায় এই চোখ, সুন্দর কিছু শোভন কিছু বিকেলের এই ছাদে ওঠা, স্যাতসেঁতে ঘর থেকে বেরিয়ে আলো হাওয়া খাওয়া, আপন মনে জগত দেখা, এ বড় আনন্দের সময় আমার। খোলা জগত আমার কাছে তো ওটুকুই। স্বাধীনতা আমার ওখানেই। দুপুরের গা পোড়া গরমকে বিকেলের শীতল শান্ত হাওয়া যখন বিদেয় দিতে থাকে, তখনই সময় খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে হাওয়ার সেই স্নিগ্ধতা গা ভরে নেওয়ার। কেবল গা ভরে নয়, আমি প্রাণ ভরেও নিই। এই ছাদেও আমি নিরাপদ নই ভেবে কুঁকড়ে যেতে থাকি, যেন আমিই দোষী, যেন আমারই দোষে ভাল মানুষ ছেলেটি লুঙ্গি তুলেছে। তন্ন তন্ন করে নিজের দোষ খুঁজতে থাকি।নিজের এই অস্তিত্ব আমাকে ব্যঙ্গ করতে থাকে। আমি নিজের জন্যই নিজের কাছে লজ্জিত হই। লজ্জিত হই যখন কালো ফটকের উল্টোদিকে স্বপনদের বাড়ির ডান পাশের মুসলমানের বাড়ির বারান্দায় লুঙ্গি গেঞ্জি পরে দাঁড়িয়ে থাকা কৎু সিত দেখতে ছেলে জগলু পাড়ার আবদুল বারীর বউকে দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় আমাদের বাড়িতে। মৃত্যুঞ্জয় ইশকুলের মাস্টার কৃকলাশ আবদুল বারীর বেলুন-বেলুন মেচেতা-গালি বউ আমাদের বাড়িতে মাঝে মধ্যে আসেন, মার সঙ্গে শাদামাটা ঘরসংসার রান্নাবান্নার গাল গল্প করে চলে যান। তাঁর মুখে বিয়ের প্রস্তাবের কথা শুনে আমার গা কাঁপে ভয়ে, গা জ্বলে রাগে। মা অবশ্য গা জ্বলা কথা কিছু বলেন না তাঁকে। অপ্রসন্ন মুখে মখু মলিন করে বলেন, মেয়ের বাবা মেয়েরে আরও লেখাপড়া করাইব। এহনই বিয়ার কথা শুনলে খুব রাগ হইব। আবদুল বারীর বউ মার ওই কথা শোনার পরও আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে ব্লাউজের ভেতর থেকে একটি দলামোচা চিঠি আমার হাতটি টেনে হাতের ভেতর গুঁজে দিয়ে আথিবিথি বেরিয়ে যান। চিঠিটি গোসলখানায় নিয়ে খুলে পড়ি। তোমাকে ভালবাসি জাতীয় কথায় দুপাতা ঠাসা। চিঠিটি, আমাকে লেখা কোনও চিঠি এই প্রথম, কুটি কুটি করে ছিঁড়ে পায়খানার গু মুতের মধ্যে ফেলে দিই। ফেলে দিয়ে, কাউকে না জানিয়ে চিঠির কথা, বসে থাকি একা, সবার আড়ালে।

বাবা আমার বেড়ে উঠতে থাকা শরীর দেখে মার কাছ থেকে একটি ওড়না সংগ্রহ করে আমার দুকাঁধে ফেলে বললেন, এইভাবে পইরা থাকবা, তাইলে সুন্দর লাগবে। বাবার এই কথায় এত তীব্র অপমান আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধে যে বেড়ে ওঠা বুকের লজ্জায় সারারাত আমি বালিশে মখু গুঁজে কাঁদি। বুক ঢেকে রাখার এই বাড়তি কাপড়টি পরতে আমার লজ্জা হয়, কারণ এটিই আমার মনে হয় প্রমাণ করে যে এটির আড়ালে কিছু আছে, কিছু নরম কিছু শরম কিছু না বলতে পারা কিছু তাই ঢাকতে হয়, কারণ যা আছে তা বড় অশ্লীল, বড় লাগামছাড়া বেড়ে ওঠা, ওসব যেন দৃশ্যমান না হয়। ওড়না যেন না পরতে হয়, শরীরের কোনও অশ্লীলতা যেন প্রকাশিত না হয় আমি কুঁজো হয়ে হাঁটি। কুঁজো হওয়াই অভ্যেস হয়ে যাচ্ছে। মা পিঠে কিল দিয়ে বলেন সোজা হইয়া হাঁট, ওড়না পইরা ল। ওড়না পরলে সোজা হইয়া হাঁটবি, এমন যে গুঁজা হইয়া হাঁটস, পিঠের হাড্ডি পরে আর সোজা হইব না। তারপরও ইচ্ছে করে না সোজা হতে, বুক ঢাকতে ওড়নায়। জিনিসটিকে বেঢপ একটি জিনিস বলে মনে হতে থাকে। ওড়না পরি বা না পরি, মানুষ জানে যে আমি বড় হয়ে গেছি। মেট্রিক দেওয়া মেয়েদের, বিয়ে কি, বাচ্চা কাচ্চাও হয়ে যায়, মা বলেন। শুনে একটি ধারালো কাঁটা বিঁধে থাকে বুকে। বুক ধড়ফড় করে। আমার বড় হতে ইচ্ছে করে না। বিয়ে ব্যাপারটি আমার কাছে কেবল ভয়ের আর যন্ত্রণার নয়, বড় অশ্লীলও মনে হয়। সে অন্য কারও বেলায় হলে হোক, আমার বেলায় যেন কখনও না হয়। ছুঁড়ে ফেলে দিই বাবার পরিয়ে দেওয়া ওড়না। আমি বড় হয়ে গেছি, এ ব্যাপারটি কাউকে বোঝাতে আমার ভয় হয়।

পরীক্ষার পর ইশকুলের বই থেকে নিস্তার পাবো,এরকম একটি স্বপ্ন ছিল। ঢাকার পিকনিক থেকে ফিরে এলে বাবা আমার স্বপ্ন গুড়িসুদ্ধ উপড়ে নিয়ে বলেছেন পুরোনো বইগুলোই আবার আগাগোড়া পড়তে, প্রতিটি কলেজে ভর্তি পরীক্ষা হবে, খুব কঠিন সেই পরীক্ষা, না পাশ করলে আমার কপাল থেকে পড়াশোনার পাট জন্মের মত চুকে যাবে, সারাজীবন অশিক্ষিত খেতাব নিয়ে আমাকে দুঃসহ জীবন পার করতে হবে। অতঃপর সেই একই বই সামনে নিয়ে আমাকে বসে থাকতে হয়। পড়া থেকে উঠে কি করতে হবে তাও বাবা জানেন, অবসর বিনোদনের জন্য তো তিনি দিয়েই রেখেছেন বেগম।

মেট্রিকের ফল যেদিন বেরিয়েছে, রবীন্দ্রনাথ দাস দুপুরের দিকে অবকাশে ছুটে এসে উল্লাসে জয়ধ্বনি করলেন। আমি প্রথম বিভাগে পাশ করেছি। খবরটি শুনে যখন আমি বাড়িময় খুশিতে লাফাচ্ছি, বাবা এলেন, হাতে পরীক্ষার ফলের কাগজ। তিনি আমাকে কাছে ডেকে মা মা বলে জড়িয়ে ধরবেন, খাঁচা ভরে রসগোল্লা, মালাইকারি,কালোজাম, চমচম এনে বাড়ির সবাইকে খাওয়াবেন,এ ব্যাপারে আমি অনেকটাই নিশ্চিত। যখন আমাকে ডাকলেন, খুশিতে উপচে ওঠা মখু টি নিয়ে কাছে গেলাম। বাবার আলিঙ্গনের অপেক্ষায় যখন আমার শরীর প্রস্তুত, বাবার হষোগচ্ছঅ!স উপলব্ধি করতে যখন আমার মন প্রস্তুত, গালে শক্ত এক চড় কষিয়ে বললেন, থার্ড ডিভিশন পা্‌ইছস, লজ্জা করে না?

থার্ড ডিভিশন? স্তম্ভিত মখু বাবাকে শুধরে দেয়, আমি তো ফার্স্ট ডিভিশন পাইছি।

বাবা এবার আমার মুখে মাথায় ক্রমাগত চড়ের বন্যা বইয়ে দিতে দিতে বলেন, স্টার পাইছস? পাস নাই। কয়ডা লেটার পাইছস? লেটার না পাইয়া ফার্ষ্ট ডিভিশন পাওয়া মানে হইল টাইন্যা টুইন্যা পাশ করা,টাইন্যা টুইন্যা পাশ করা মানে থার্ড ডিভিশন পাওয়া। আবাসিক আদর্শ বালিকা বিদ্যায়তন থেকে মোট তিনজন প্রথম বিভাগে পাশ করেছে, কেউই তারকাখচিত নয়। কারও লেটার জোটেনি। তা না হোক, বিদ্যাময়ী ইশকুল থেইকা তো পাইছে, জিলা ইশকুল থেইকা তো পাইছে! বাবা আমাকে কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে পড়ার টেবিলের কাছে ধাক্কা দিয়ে ফেললেন। দাঁতে দাঁত ঘষে বললেন, যারা স্টার পাইছে, তারা ভাত খাইছে,তুই খাস নাই? মাস্টার রাইখা তরে আমি পড়াইছি, থার্ড ডিভিশন পাওয়ার লাইগা নাকি, হারামজাদি। সামনে একটি বই খুলে আমি স্থির বসে থাকি, বইয়ের অক্ষরে টপটপ পড়তে থাকে নোনা জল।

 

অনেক রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে আমি বেড়ালের মত শব্দহীন হেঁটে হেঁটে ইঁদুরের বিষ খুঁজতে থাকি। আমার এই বেড়ে ওঠা শরীর, আমার এই উদ্ভট অস্তিত্ব, আমার এই অপদার্থ মস্তিষ্ক সব কিছুই আমাকে এমন একরত্তি করে তোলে যে ক্ষুদ্র হতে হতে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর ইচ্ছে করে অদৃশ্য হয়ে যেতে। ইঁদুরের কোনও বিষ জোটে না, যা জোটে তা ঘরের কোণে ধুলো পড়া একটি ইঁদুর ধরার ফাঁদ।

০৬. ও আমার ছোট্ট পাখি চন্দনা

আবাসিক আদর্শ বালিকা বিদ্যায়তনে সপ্তম শ্রেনী থেকে প্রতিটি শ্রেণীতেই বৃত্তি পেয়েছি আমি, সে বৃত্তির একটি টাকাও কোনওদিন নিজের জন্য রাখতে দেননি বাবা, গুনে গুনে তুলে নিয়ে গেছেন। মা বলেছেন, তর বাবা তর ভবিষ্যতের জন্য জমা রাখতাছে টাকা। তুই বড় হইলে দিব। মার কথা বিশ্বাস হত আমার। বাবার হাতে চলে যাওয়া টাকাকে নিজের টাকা ভেবে একধরণের স্বস্তি হত। বড় হয়ে ওই টাকায় ঘর বোঝাই বই কেনার স্বপ্ন দেখতাম। ইয়াসমিন পঞ্চম শ্রেণীতে দুবার থেকে একটি কাণ্ড ঘটিয়েছে, ওকে ইশকুল বোর্ডের বৃত্তি পরীক্ষায় বসিয়েছিলেন বাবা, পরীক্ষায় ভাল করে ও দিব্যি বৃত্তি পেয়ে গেছে। এখন ইয়াসমিনকে ডাকতে হলে বাবা বলেন, কই বৃত্তিধারী ছাত্রী কই! পঞ্চম শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষা আমার দেওয়া হয় নি, অষ্টম শ্রেণীরটি দেওয়া হলেও কপালে কিছু জোটেনি। কপালে কিছু জোটেনি বলেই আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে ইয়াসমিনকে বৃত্তিধারী ছাত্রী বলে ডাকেন বাবা। কেবল তাই নয়, বাবা আমাকে নর্দমার কীটের সঙ্গে তুলনা করেছেন অনেক। শুনে নিজেকে অনেকবারই সত্যিইনর্দমার কীট বলে মনে হয়েছে। তারকাখচিত প্রথম বিভাগ জোটেনি বলেও আবার নিজেকে নর্দমার কীট বলে মনে হতে থাকে। চন্দনা দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেছে। এ নিয়ে তার কোনও দুশ্চিন্তা নেই। দ্বিতীয় বিভাগেই পাশ করেছে বেশির ভাগ ছাত্র ছাত্রী। দ্বিতীয় বিভাগ যদি আমার জুটত, তবে বাবা চাবকে আমাকে রক্তাক্ত করে বাড়ি থেকে সত্যি সত্যি তাড়িয়ে দিতেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সে দুর্ঘটনা ঘটেনি বলে স্বস্তি জোটে, প্রথম বিভাগ পাওয়ার ফলে কলেজে বৃত্তি পাব, বিনে পয়সায় কলেজে পড়ব, বাবা বৃত্তি জিনিসটি খুব পছন্দ করেন, খানিকটা হলেও ভারমুক্ত হই। অন্তত এ ব্যাপারটি না ঘটলে উঠতে বসতে বাবার দাঁত খিঁচোনো দেখতে হত। এখনও যে হয় না তা নয়। আমি নিশ্চিত, বৃত্তি না জুটলে আরও হত।

কলেজে ভর্তি হতে কোনও পরীক্ষার দরকার হয়নি। মেট্রিকের ফল দেখেই ভর্তি করে নিয়েছে কলেজে। খামোকা আমাকে মেট্রিক পরীক্ষার পরও সেই ইশকুলের বইগুলো পড়তে হয়েছে, ভেবে আফসোস হয়। সময়গুলো অযথা উড়ে গেছে, হাওয়ায় উড়েছে। আর কি কখনও ফিরে আসবে অমন অবসর!সময় হয়ত অনেক আসবে, মেট্রিকের পরের সময় আর আসবে না।

আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছে ছিল, ও কলেজে আবার ছেলেরাও পড়ে, ছেলেদের সঙ্গে গায়ে গা লাগিয়ে বসে ক্লাস করতে দিতে আর যিনিই দিন না কেন, বাবা দেবেন না। ঘাড় ধরে, আনন্দমোহনের ভাল কলেজ হিসেবে নাম থাকলেও, মুমিনুন্নিসার কোনও নাম না থাক, যেহেতু এটি মেয়েদের কলেজ, এটিতে আমাকে ঢুকিয়ে, অনেকটা হাঁসের খোঁয়াড়ে যাবার বায়না নাকচ করে দিয়ে মুরগিকে আর দশটা মুরগির সঙ্গে এক খোঁয়াড়ে ঢুকিয়ে দেওয়ার মত, স্বস্তি পেলেন তিনি। যতটা অখুশি হওয়ার দরকার ছিল এ কলেজে এসে, ততটা হইনা, এর কারণ চন্দনা। ওর বাবাও ওকে ধরে বেঁধে মুমিনুন্নিসা কলেজে ভর্তি করিয়েছেন। চন্দনাকে পেয়ে প্রতিদিন একশ ছেলের সঙ্গে দেখা না হওয়ার দুর্ভাগ্যের জন্য কপাল চাপড়ানো তো দূরের কথা, মন কালো করে যে দুদণ্ড একলা বসে থাকব, তা হয়না। আনন্দমোহন আমাদের কাছে আকাশপারের কোনও রহস্যময় সপ্তম স্বর্গ হয়ে রইল, ওটিকে আপাতত মাচায় তুলে রেখে আরও আরও স্বপ্ন তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি আমি আর চন্দনা। মুমিনুন্নিসা কলেজটি শহরের পশ্চিম কোণে বিশাল এক মাঠের ওপর। ক্লাস হয় একটি লম্বা টিনের ঘরে, গঞ্জের ইশকুলঘরের মত ঘরটি। আরেকদিকে নতুন ওঠা দালানঘর। এই দালানঘরে বিজ্ঞানের ছাত্রীদের বেশির ভাগ ক্লাস হয়। ইশকুলের মত এক ঘরেই সমস্ত ক্লাস নয়। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে দৌড়ে যেতে হয় বিভিন্ন ক্লাসে। এই নিয়মটি আমার পছন্দ হয়। ইশকুলে সেই সকালে একটি ঘরের একটি বেঞ্চে বসা হল তো সারাদিন ওখানেই বসে থাকতে হয়। কলেজের আরও একটি নিয়ম আমার ভাল লাগে। তুমি যদি কোনও ক্লাসে না যাও, মাঠে বসে থাকো বা পুকুরের পানিতে পা ডুবিয়ে বান্ধবীর সঙ্গে গপ্প কর, কেউ তোমার চুলের মুঠি ধরে নিয়ে বসিয়ে দেবে না ক্লাসে, এক ক্লাস মেয়ের সামনে কান ধরে এক ঠ্যাংএ দাঁড়িয়ে থাকার শাস্তি তোমাকে পেতে হবে না। ক্লাসে ক্লাসে নাম ডাকা হচ্ছে। ইশকুলের মত এক ক্লাসে নাম ডাকা হল তো সে নিয়ে সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা অবদি থাকা নয়। কলেজের নতুন নিয়মে চমৎকৃত হই, কিন্তু কলেজ থেকে যখন ইচ্ছে তখন বেরোতে পারব না, এ নিয়মটি আমার মোটেও ভাল লাগে না। চন্দনার তো লাগেই না। কলেজে ভর্তি হওয়ার আগে ও অনেকবার বলেছে, কলেজে পড়ার মজা কি জানস? ইচ্ছা হইলে ক্লাস করবি, ইচ্ছা না হইলে করবি না। যখন ইচ্ছা কলেজ থেইকা বাইর হইয়া পড়া যাইব। ঠিক কলেজ ছুটির টাইমে বাড়িতে আইয়া পড়লেই হইল। এই স্বপ্ন আমাকে বিভোর কম করেনি। কিন্তু কলেজে যেতে শুরু করে ছফুট লম্বা সাপের মত কালো মিশমিশে শরীরের চুলহীন দাঁতহীন গগনকে দেখে আমার পিলে চমকে ওঠে। কি রে বাবা, দারোয়ান কেন? ইশকুলের গেটে দারোয়ান থাকে। ইশকুলের বাচ্চাদের জন্য। কলেজে পড়া বড় মেয়েদের জন্য, যারা নিজের দায়িত্ব নিজেই নিতে পারে, তাদের জন্য পাহারা বসানোর তো কোনও যুক্তি নেই! চন্দনা একমত। সকাল দশটায় কলেজে এসেছি। দুটো ঘন্টা কোনও ক্লাস নেই। চন্দনা বলে চল বাইরে যাই। বাইরে কোথায় তার কোনও সিদ্ধান্ত নিই না। বাইরে। এই সীমানার বাইরে। বাড়ির সীমানার বাইরে যেতে যেমন উতলা হই, এই কলেজ সীমানার বাইরে যেতেও। কিন্তু চল বললেই কি যাওয়া হয়, গেটের দিকে যেতে নিলেই গগন আমাদের খপ করে ধরে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়, দুঘন্টা আমাদের করার কিছু নেই। না থাক। তবু গেটের বাইরে এক পা ও ফেলা যাবে না। যাবে না তো যাবেই না। গগনকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করি, আমরা আর ছোট নেই, বড় হয়েছি. আমরা হারিয়ে যাব না, বা কোনও ছেলেধরা আমাদের বস্তায় পুরে কোথাও নিয়েও যাবে না। গগনে তবু গনগনে আগুন, কোনও মেঘবৃষ্টির ছিটেফোঁটা নেই। গগন আমাদের স্বপ্নের লেজ ধরে ছুঁড়ে দেয় দূরের নর্দমায়। মেয়েদের কলেজের নিয়ম হচ্ছে, একবার ঢুকে গেলে দরজা বন্ধ হয়ে গেল, সেই বিকেলে ছুটির ঘন্টা পড়বে তো বেরোতে পারবে। ইশকুলের দশটা পাঁচটা নিয়মের মধ্যে এত বছর বন্দি থাকার পর কলেজে এসে যদি পাখা না মেলতে পারি, তবে আর কলেজে আসা কেন! আনন্দমোহন কলেজে ছেলেমেয়েরা যখন খুশি ঢোকে, যখন খুশি বেরোয়। আর মুমিনুন্নিসার মেয়েরা, যেহেতু এরা মেয়ে, এরা বড় হয়ে গেলেও এদের বড় বলে জ্ঞান করা হয়না, তাই আবারও দশটা পাঁচটার হিশেব, আবারও ইউনিফমর্, শাদা পাজামা, শাদা জামা, লাল ওড়না। ইশকুল ছেড়ে কলেজে নাম লিখিয়েছি, দালান পালটেছে, মাস্টার পালটেছে, বইপত্র পালটেছে কিন্তু নিয়ম ওই একই আছে। কলেজ চত্বরেই বিমর্ষ ঘোরাঘুরি করে আমাদের সময় পার করতে হয়।

ওড়না বস্তুটি আমার যেমন অপছন্দ, চন্দনারও। ও বস্তুটি ধারণ না করেই আমরা মাঝে মধ্যে উদয় হই কলেজে। কলেজের ছাত্রী শিক্ষকদের ছানাবড়া চোখের সামনে বুঝি যে এমন অবশ্য-জরুরি বস্তুটিকে নির্বাসন দিয়েছি বলে সকলেই মর্মাহত। কারও মর্মের প্রতি উদার হওয়া আমাদের চমের্ তত নেই। কলেজ শুরু হওয়ার পর শিক্ষক শিক্ষিকা সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি তাতে অন্তত এইটুকু বুঝি যে অংকের শিক্ষক দেবনাথ চক্রবর্তীর ক্লাস জগত উল্টো গেলেও ফাঁকি দেওয়া চলবে না। বাকি শিক্ষক শিক্ষিকাদের ক্লাস খুব প্রয়োজন না হলে বাদ। বাংলার শিক্ষক আবদুল হাকিম যিনি মোর বলতে গিয়ে মুর বলেন, একই রকম চোরকে চুর, তোরাকে তুরা, জোড়াকে জুড়া—তাঁর ক্লাসে গিয়ে চিরকুট চালাচালি কর, হাকিমবাবুর ছবি আঁকো, চঞ্চুনাশা, কদমছাঁট চুল, নাকে ঝোলা চশমা; পুস্তকি পদ্যে মন বসানোর কোনও কারণ নেই যেহেতু মন আমাদের অনেক আগেই পদ্যাক্রান্ত। শ্রীমতী সুমিতা নাহাও বাংলা পড়ান, তিনি যখন বাংলা গদ্য পদ্যের বর্ণনা করেন, প্রথম সারির মেয়ে ছাড়া আর কারও সাধ্য নেই তাঁর কণ্ঠস্বর শোনে, কণ্ঠস্বরটিকে মাটির কাছাকাছি রেখে একরকম বাঁচিয়ে চলেন তিনি, যথেষ্ট উঁচুতে উঠলে সে স্বরের ভপূাতিত হওয়ার আশংকা আছে বলেই হয়ত। তিনি নামী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী,তাঁর স্বামী আলোকময় নাহাও শিল্পী। শিল্পী আবার রাজনীতিবিদও। একবার ভোটে দাঁড়ালেন তো পাশ করে গেলেন। ভাল রাজনীতিবিদ তিনি, সে কারণে নয়। ভাল গায়ক তিনি, সে কারণেই। রসায়নবিজ্ঞানের শিক্ষিকা নাক সবসময় কুঁচকে রাখেন, যেন পৃথিবীর প্রতিটি ববস্তু থেকে দগুর্ ন্ধ বেরোচ্ছে। নাকি সুরে রসায়ন পড়ান। কি পড়াচ্ছেন ক্লাসের মেয়েরা কেউ বুঝুক না বুঝুক, তিনি পড়িয়ে যান। ঘন্টা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুঞ্চিত নাক নিয়েই বেরিয়ে যান। হঠাৎ একদিন রসায়ন ক্লাসে হাসির দমক থামাতে না পেরে আমি আর চন্দনা শাস্তি হিসেবে ক্লাসঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে আহলাদে বাঁচি না। পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক ঠোঁটে যে বঙ্কিম হাসি ঝুলিয়ে ক্লাসে ঢোকেন, তাতে কোন কোন মেয়ের হৃদয়ে উষ্ণ হাওয়া বয় তা অনুমান করতে চেষ্টা করি আমি আর চন্দনা দুজনই। জীববিজ্ঞান ক্লাসে খানিকটা ঢেউ ওঠে, ব্যাঙ ধরে মোমের ট্রেতে ব্যাঙকে চিৎ করে শুইয়ে বুকপেট কেটে দেখাতে হবে পাকতন।্ত্র মোটা শাদা কাগজে আঁকতে হবে নানারকম জীবজন্তুর ছবি। ছবি মানেই আমার রাজত্ব। সারাদিনই এইচবি, বি, থ্রিবি ইত্যাদি নানা নামের পেনসিল দিয়ে কারুকাজ করে ছবি আঁকি, যেন ছবি আঁকার ইশকুলে ভর্তি হয়েছি। দেখে বাবা বলেন, ফালতু কাম রাইখা বইয়ের পড়া মখু স্ত কর। বাবার কাছে জীববিজ্ঞানের ছবি আঁকাও ফালতু। ব্যাঙ নিয়ে যেতে হবে কলেজে, ব্যাঙএর পেছনে উঠোন জুড়ে দৌড় শুরু হয়। ব্যাঙ দৌড়োয়, পেছনে আমরা দৌড়োই। আমি, ইয়াসমিন, মা। শেষ অবদি ঘরের কোণে ঘাপটি মেরে বসে থাকা একটি সোনাব্যাঙ কাগজের ঠোঙায় ভরে কলেজে নিয়ে ব্যাঙএর হাত পা টেনে পেরেক লাগিয়ে কেটে পাকতন ্ত্র দেখাই বটে, কিন্তু ব্যাঙএর মায়ায় আমি এমনই উদাস বসে থাকি যে চন্দনা এসে গা ধাক্কা দিলে চেতন ফেরে, চেতন ফেরা মানে বেরিয়ে যাওয়া। ক্লাসঘরের দমবন্ধ আবহাওয়ায় যত কম থাকা যায়, তত মঙ্গল। বেরিয়ে যাই জীববিজ্ঞানের ল্যাবরটরি থেকে। আমাদের পাখা মেলতে ইচ্ছে করে। বন্ধন ভাঙার জন্য ভেতরে প্রবল তৃষ্ণার জন্ম হয়। সেই তৃষ্ণা নিয়ে, যেহেতু সীমানা ডিঙোনো চলবে না, মাঠের শেষমাথার শিমুলতলায় বসে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে কবিতা পড়ি দুজন দুজনের। পুরো কলেজের ছাত্রীরা আমাদের পলকহীন চোখে দেখে, আমরা নাকি অন্যরকম, ঠিক স্বাভাবিক নই। চন্দনা কলেজে আসার পথে এক ছেলের প্রেমে তখন পড়ছে পড়ছে, ওর পড়ছে পড়ছের গল্প শুনে আমারও ইচ্ছে হয় এই শাদামাটা জীবনে তরঙ্গ তুলতে। কিন্তু তরঙ্গ তোলার কেউ তো নেই হাতের কাছে। আমার কোনও পড়ছিপড়ছির গল্প নেই। আমার জীবন জুড়ে কেবল ধু ধু করে ভরদুপুরের নিস্তব্ধতা আর তপ্ত বালুময় লু হাওয়া। বড় নিঃস্ব মনে হয় নিজেকে। একদিন ইয়াসমিনকে দিয়ে শাদা শার্টের কাছে লুকিয়ে একটি চিরকুট পাঠিয়ে, সেই শাদা শার্ট ছাদ থেকে যাকে দেখে বুক ঢিপঢিপ করত একসময়, সাড়ে দশটায় কলেজ গেটে থাকতে বলে, পরদিন কলেজে না ঢুকে দাঁড়িয়ে থাকা শাদা শার্টকে রিক্সায় তুলে নিয়ে সোজা মুক্তাগাছা চলে যাই। রিক্সা করে এত দূরের পথ মুক্তাগাছা যাওয়ার পদ্ধতি ছোটদার কাছ থেকে শেখা। তিনি গীতাকে নিয়ে তাই করতেন। কিন্তু সারা পথ আমি গ্রাম দেখতে দেখতে কৃষকের হালচাষ দেখতে দেখতে রাস্তার কিনারে বসে থাকা শীণর্ গরু দেখতে দেখতে মুক্তাগাছা যাই, গিয়ে বিখ্যাত গোপাল মণ্ডার দোকান থেকে দুটো মণ্ডা কিনে খেয়ে আবার সেই রিক্সা করেই ফিরে আসি কলেজ গেটে। পথে শাদা শার্টের কিছু কিছু অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বা না ছাড়া আমার আর কিছু বলা হয় না। ঘটনাটি ঘটিয়ে আমার পুলক লাগে বটে, সাংঘাতিক একটি কাণ্ড করে চন্দনাকে সেই কাণ্ডের আদ্যেপান্ত বর্ণনা করে সাহসী বনে যাই বটে, কিন্তু শাদা শার্টের জন্য আমি লক্ষ করি, আমার মন কেমন করছে না। ইচ্ছে করছে না আরও একদিন তাকে নিয়ে দূরে কোথাও পালিয়ে হাওয়া খেতে যেতে।

এর মধ্যে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। আমাকে বাড়ি এসে পড়িয়ে যাওয়ার জন্য দেবনাথ চক্রবর্তীকে নিয়োগ করেছেন বাবা। দেবনাথ চক্রবর্তীর বাড়িতে ছাত্র ছাত্রীরা দল বেঁধে পড়তে যায় আর আমাকে তাঁর মত পণ্ডিত লোক রাজি হয়েছেন বাড়ি এসে পড়াতে,চাট্টি খানি কথা নয়, সীমা ছাড়ানো সৌভাগ্য! কিন্তু এর একটি বিপদ লক্ষ করি, কলেজের ক্লাসে আমার শ্রীমখু খানা তাঁর দর্শন করা চাই। কেবল দর্শন করা নয়, যত প্রশ্ন তাঁর, সব আমাকেই করা চাই, এবং সঠিক উত্তর আর কারও নয়, আমার কাছ থেকেই তাঁর শোনা চাই। খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমার পক্ষে উত্তর দেওয়া সম্ভব হয় না, এবং তিনি প্রতি ক্লাসে আমার মাথায় চড় ঘুসি ডাস্টার সব কিছুরই বষর্ণ ঘটান। বিকেলে যখন তিনি অবকাশে উদয় হন, শরীর আমার অবশ হয়ে আসে। গোলআলুর মত শরীর, পরনে চিরাচরিত নীল শার্ট কালো প্যান্ট, শার্টের পকেটে একটি মোটা কালো কলম, পকেটের নিচে কালির দাগ, পায়ে রাবারের কালো জুতো, সিঁথি করে চুল আঁচড়ানো, মখু ভর্তি পান,হেলে দুলে হাঁটেন, মানুষটি রাস্তায় হেঁটে যাওয়া কলিমুদ্দিন সলিমুদ্দিন যে কেউ হতে পারত, কিন্তু তিনি দেবনাথ চক্রবতীর্, বিশাল মাথা জুড়ে জটিল বিজ্ঞানের জ্ঞান, তাঁর কাছে না পড়ে কোনও ছাত্র ছাত্রীর পক্ষে সম্ভব নয় ভাল ফল করা পরীক্ষায়। দেবনাথ পণ্ডিতের কারণে আমার প্রতিটি বিকেল ধং্ব স হতে থাকে। আমি অংকে ভুল করলাম কি পদার্থবিজ্ঞানের স−ূ ত্র তিনি সঙ্গে সঙ্গে খাতা বই দলামোচা করে ছুঁড়ে ফেলে দেন মেঝেয়। ইয়াসমিন আশে পাশেই থাকে ওগুলো আবার টেবিলে তুলে দেওয়ার জন্য। শক্ত শক্ত কিল ঘুসি থাপ্পড় বিরামহীন চলতে থাকে আমার মাথা লক্ষ করে। বাড়ির মানুষেরা পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমার করুণ অবস্থা দর্শন করে। মা দয়াপরবশ হয়ে ইয়াসমিনের হাতে একদিন কাঁঠাল গাছের একটি ডাল ভেঙে পাঠালেন, যেন এটি দিয়ে আমার পিঠে মারা হয়। পিঠে যেন মারা হয়, মাথাটি যেন বাঁচে। মাথায় যেইভাবে উল্ডা পাল্ডা মারে, কবে না জানি মাথাডাই যায়! মা আমার মাথার চিন্তায় চিন্তিত। দেবনাথ পণ্ডিতের রাগ যখন ওঠে, তখন আর ডালের দিকে তাঁর চোখ পড়ে না, ডাল পড়ে থাকে ডালের মত, আগের মত আমার মাথায় কিল ঘুসি মেরেই যেতে থাকেন তিনি, আবারও আগের মত দলামোচা করে ছুঁড়ে ফেলতে থাকেন বইখাতা। আমার বিকেল কেবল নয়, জীবন অতিষ্ঠ করে তোলেন দেবনাথ পণ্ডিত।

 

অতিষ্ঠ জীবনে তারপরও উত্তেজনা কম নয়। বিচিত্রায় ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন নামে একটি বিভাগ শুরু হওয়ার পর আমি আর চন্দনা সিদ্ধান্ত নিই এতে লিখব। একটি শব্দের জন্য আটআনা খর্চা, চারটে শব্দে দুটাকা। দুতিনটাকার বেশি আমার পক্ষে যোগাড় করা সম্ভব নয়, কলেজের রিক্সাভাড়ার পয়সা বাঁচিয়ে কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে পোস্টাপিসে নেমে মানিঅর্ডার ফরমে বিজ্ঞাপন লিখে পাঠাই, চন্দনাও। সিনে পত্রিকায় চলচিত্রের চালচিত্র আর বিচিত্রায় দেশ-কাল-সমাজ নিয়ে থোড় বড়ি খাড়া খাড়া বড়ি থোড়এর বাইরে যা ইচ্ছে তাই লেখার একটি মোক্ষম সুযোগ জোটে আমাদের। আমরা যা ইচ্ছে তাই করার জন্য ছটফট করা দুজন মানুষ। কবি রফিক আজাদ ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, একটি চুমু দিলে একটি কবিতা দেব, দেখে উৎসাহ ক্যাঙারুর মত লাফায়। চন্দনা আর আমি দুজন মিলে লিখি, আমরা এক আত্মা এক প্রাণ। আমি লিখি আমি দুরন্ত দুর্বার, চন্দনা লেখে আই এম দ্যা গ্রেটেস্ট। আবারও চিত্রালীর পাতার মত কাণ্ড ঘটে, আমি একটি লিখি তো আমাকে নিয়ে কুড়িজন লেখে, কেউ পক্ষে, কেউ বিপক্ষে। মাত্র দুটো তিনটে শব্দ দিয়ে গড়া একটি বাক্য মরা পুকুরে পাথর ছোঁড়ার মত, পুকুর জুড়ে ঢেউ ওঠে। পাড়ে বসে ঢেউ দেখার আনন্দ আমি আর চন্দনা দুজনই উপভোগ করি। আমাদের গণ্ডির জীবন, চারদিকে বেড়াজাল, পায়ে পায়ে নিষেধ, গায়ে গায়ে না, এই না নিষেধ অমান্য করার শক্তি বা সাহস আমরা শব্দ দিয়ে অর্জন করি। আমাদের শব্দগুলো এমন সগবের্ সদম্ভে উচ্চাজ্ঞরত যে পড়লে যে কেউ ভেবে বসে অহংকারি, অবিনীত, উদ্ধতমনা, উন্নাসিক দুটো উগ্র কিশোরী, বাধঁ ন মানে না, নীতিরীতির থোড়াই তোয়াক্কা করে;যদিও বাস্তব সম্পূর্ণই বিপরীত, বাধঁ ন না মানা জীবনটি কেবল আমাদের স্বপ্নের জীবন। অনেকে আবার এও ভাবে, এক মানুষের আড়ালে দুটি নাম, চন্দনা আর তসলিমা ভিন্ন কোনও অস্তিত্ব নয়। রিক্সাভাড়া থেকে শীতের পিপঁ ড়ের মত দুআনা চারআনা সঞ্চয় করে শিশিবোতলকাগজ থেকে আর বাপদাদার পকেট থেকে তাঁদের জ্ঞাতসারে অজ্ঞাতসারেও যে পয়সা কামাই করি, তা ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনের খর- স্রোতে ভেসে যেতে থাকে।

চন্দনা আর আমার কখনও শুদ্ধ বাংলায় কথা হয়নি, সবসময়েই ময়মনসিংহের গ্রামঅঞ্চলের ভাষায়। আমার চেয়ে এ ব্যাপারেও চন্দনা এক কাঠি দু কাঠি নয়, চার কাঠি ওপরে। আমি বলি, গোসলটা কইরা আসি, চন্দনা বলে, গুসুলডা কইরা আহি। চন্দনার ভাষা শুনে আমার হাসি পেত প্রথম প্রথম, কিন্তু অচিরে নিজেই আমি পতিত হই ওই ভাষার জালে। কে কত বেশি আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করতে পারে, তারই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় আমাদের মধ্যে। বরাবরই আমি হেরে যাই ওর কাছে। ইশকুল কলেজে যেতে যেতে ছেলে মেয়েরা আঞ্চলিকতা যতদূর সম্ভব কমাতে চেষ্টা করে। চন্দনা পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি অঞ্চল থেকে এসেছে, বাড়িতে চাকমা ভাষায় কথা বলে, কিন্তু বাড়ি থেকে বেরোলে ওর মত শুদ্ধ বাংলা যেমন লোকে কম জানে, ওর মত আঞ্চলিক সূরে এবং শব্দে কথা বলা জন্ম থেকে এ শহরে বেড়ে ওঠা লোকও জানে কম। চন্দনা আমাকে মুগ্ধ করে তো বটেই, অবাকও করে। চন্দনার সঙ্গে কথা যেমন বলেছি ময়মনসিংহের অজ পাড়া গাঁর ভাষায়, চিঠি লেখাও সে ভাষাতেই হয়েছে। লোকে, এ জানি, মুখে যে রকম ভাষাতেই কথা বলে, চিঠির বেলায় শুদ্ধ ভাষা চাই। চন্দনা এ জিনিসটি মানেনি কোনওদিন। যার সঙ্গে যে ভাষায় ও কথা বলেছে সে ভাষাতেই চিঠি লিখেছে। ময়মনসিংহে আসার আগে ও ছিল কুমিল্লায়, কুমিল্লার বান্ধবীকে চিঠি লিখেছে কুমিল্লার আঞ্চলিক ভাষায়, কুমিল্লা আসার আগে ছিল চট্টগ্রামে, ওখানকার বান্ধবীকে চট্টগ্রামের ভাষায়। আর আমার সঙ্গে পরিচয়ের পর সব বান্ধবী বাতিল করে দিয়ে এক আমাকে নিয়েই মেতে থাকল। এদিকে আমার জগতে চন্দনা ছাড়া বাকিরা ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করেছে। আমার হাত ছিল না এতে, চন্দনার ব্যক্তিত্ব, অভিনবত্ব, অসাধারণত্ব আমাকে অভিভূত করে রাখে, আচ্ছত করে রাখে সকল সময়। মেট্রিকের পর এবং কলেজ শুরু হওয়ার আগে খুব সঙ্গত কারণেই আমাদের দেখা হওয়ার সুযোগ ছিল কম। ঘরে বসে থাকতে আমাকে যেমন হত, চন্দনাকেও। বান্ধবীর বাড়ি বেড়াতে যেতে পারব যখন তখন, প্রশ্নই ওঠে না। বাইরে বের হওয়া মানে মার সঙ্গে নানিবাড়ি বেড়াতে যাওয়া, পীরবাড়ি যাওয়া তো অনেক আগে বাদই দিয়েছি, মার কাছ থেকে অনুমতি পুরো না নিতে পারলেও অন্তত নিমরাজি করিয়ে ছোটদার সঙ্গে অনুষ্ঠানাদিতে যাওয়া, দাদার সঙ্গে সিনেমায় যাওয়া। সিনেমায় সবসময় দুপুরের শোএ যেতাম, বাবা যেন টের না পান। শো শেষ হত বিকেলে, তড়িঘড়ি বাড়ি ফিরে আমি দাদা ইয়াসমিন এমন মুখ করে বসে থাকতাম যেন কস্মিন কালেও সিনেমা কাহাকে বলে জানি না। চন্দনাকে নিয়েও কদিন গিয়েছি সিনেমায়, তবে সে দাদারই আয়ত্তাধীন হয়ে। আলমগীর কবীরের সীমানা পেরিয়ে ছবিটি দেখে আসার পর দেখে আসার পর ছবিতে বুলবুল আহমেদের সংলাপ আমাদের মুখে মুখে ফিরত। বোকা সোকা তোতলা লোকের ভূমিকায় অভিনয় করতে গিয়ে এক নির্জন দ্বীপে বুলবুল বলেছিলেন জয়শ্রীকে, ত তর লা লাইগা আমি কি না করছি, ত তরে আমি বুকে রাখছি, পিঠে রাখছি .. ! বুলবুলের এই সংলাপ আমার আর চন্দনার মুখে মুখে ফিরত। মূলত চন্দনাই শুরু করেছিল, ওর ছোটভাই সাজুর সঙ্গে ওর এক দফা যুদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর। সাজুর হাতে কিলচড় খেয়ে ক্ষুব্ধ চন্দনা আমার সঙ্গে দেখা হতেই ঘটনার বর্ণনা করে বলল, ও ওর লাইগা আমি কি না করছি, ও ওরে আমি বুকে রাখছি, পে পেটে রাখছি, মা মাথায় রাখছি, কান্ধে রাখছি। ভাই দুটোর সঙ্গে যুদ্ধ বিগ্রহের কারণে আহত হওয়ার কোনও কষ্ট চন্দনা পুষে রাখত না, কিন্তু একটি কষ্ট ও জীবনভর পুষে রেখেছে। মলিনা চাকমা যখন জন্ম দিয়েছিলেন কন্যা সন্তান, সুব্রত চাকমা বড় একটি দা নিয়ে নিজের কন্যাকে আঁতুর ঘরে হত্যা করতে এসেছিলেন, কন্যা তাঁর পছন্দ নয় বলে। আঁতুরঘরে আত্মীয়দের হস্তক্ষেপে চন্দনা বেঁচে গেছে ঠিকই, মলিনা চাকমা এরপর দুটো পুত্রসন্তান জন্ম দেওয়ার পর চন্দনার ওপর ত্রে²াধটিও সুব্রত চাকমার কমেছে, কিন্তু চন্দনা কখনই ওর বাবাকে ক্ষমা করতে পারেনি, এখনও দুঃস্বপ্নের মত দৃশ্যটি দিবসরজনী ওর মনের ভেতর নাছোড়বান্দার মত বসে থাকে।

ছোটদা খবর আনলেন, চিপাচসের অনুষ্ঠান হচ্ছে, ঢাকা থেকে অভিনেতা বুলবুল আহমেদ আসছেন। সেই বুলবুল আহমেদ, ভাল অভিনেতা হিসেবে যাঁর খ্যাতি, অদ্ভুতুড়ে মারদাঙ্গা ছবিতে আর যে অভিনেতাই থাকুন বুলবুল আহমেদ নেই সেই বুলবুল। সূর্যকন্যা ছবির বুলবুল।সীমানা পেরিয়ের বুলবুল। চন্দনার সুযোগ হয়নি অনুষ্ঠানে যাওয়ার, বাড়ি থেকে ওর অনুমতি মেলেনি। ছোটদার সঙ্গেও বাইরে বেরোনো সহজ কথা নয়, ছোটদা বখে যাওয়া ছেলে, তাঁর সঙ্গে ঘুরে আমাকে নষ্ট হতে দিতে বাড়ির কেউ রাজি নন। কিন্তু তারপরও অনুমতি জোটে, চলμচিত্রের অভিনেতা অভিনেষনীর জন্য মার এক ধরনের পক্ষপাত আছে, যতই তিনি ধার্মিক হোন না কেন। চোখের সামনে সিনেমার নায়ককে দেখব, উত্তেজনায় ছটফট করছি। ছোটদা বললেন অটোগ্রাফ খাতা লইতে ভুলিস না। অটোগ্রাফ খাতা বলতে কোনও খাতাই আমার নেই। যাবার পথে একটি লাল নীল সবুজ রঙের কাগজঅলা খাতা কিনে দিলেন ছোটদা। বুলবুল আহমেদ বসেছিলেন বিশাল এক টেবিলের এক কোণে, আর সেই টেবিলের কিনার ঘেঁসে লোক ছিল বসে, দাঁড়িয়ে। সহজ ভঙ্গিতে তিনি কথা বলে যাচ্ছিলেন সবার সঙ্গে যেন এরা তাঁর জন্ম জন্ম চেনা। যাঁর যা প্রশ্ন ছিল, হেসে উত্তর দিচ্ছিলেন। যখন অটোগ্রাফ নেবার সময় হল, বুক কাঁপছিল, কি বলব তাঁকে? আপনার অভিনয় খুব ভাল লাগে। অভিনয় নিশ্চয় খুব ভাল লাগে, তা না হলে এখানে আসা কেন, অটোগ্রাফ নেওয়াই বা কেন! অটোগ্রাফ দেওয়ার সময় নাম যখন জিজ্ঞেস করলেন, আমি মৃদু কণ্ঠে নামটি উচ্চারণ করলাম, তিনি পুরো নাম জানতে চাইলেন!বলার পর প্রাণোচ্ছল হাসিতে আমাকে অভিভূত করে বললেন, তুমি তসলিমা নাসরিন? তুমি আমার অটোগ্রাফ নেবে কি! আমি তো নেব তোমার অটোগ্রাফ। তুমি তো আমার চেয়ে বিখ্যাত হে! আমি মখু লুকোলাম ছোটদার আড়ালে। সিনেমার লোকেরা যে আর সাধারণ মানুষের মতই মানুষ, তারাও যে হাসে কাঁদে গাল দেয় গাল খায়, তারাও যে পেচ্ছাব পায়খানা করে, তাদেরও যে সর্দি হয়, গা ম্যাজম্যাজ করে আগে আমার বিশ্বাস না হলেও বুলবুল আহমেদকে কাছ থেকে দেখার পর হল। রাজ্জাক, কবরী, আজিম, সুজাতা, জাফর, ববিতা, আলমগীর শাবানা সকলে যে আমাদের মত মানুষ, তাতে বিন্দুমাত্র সংশয় রইল না।

চন্দনা পাড়ার এ বাড়ি ও বাড়ির ছেলে ছোকড়াদের ছুঁড়ে দেওয়া চিঠি বা চিরকুটের খুচরো প্রেম ছেড়ে হঠাৎ জাফর ইকবালে নিমজ্জিত হয়। জাফর ইকবাল চলμচিত্র জগতের সবচেয়ে সুদর্শন নায়ক। নায়ক জাফর ইকবাল আর নায়িকা ববিতার প্রণয় নিয়ে নানা কথা লেখা হয় পত্রিকায়। ওসব আমরা মোটেও পরোয়া করি না। সুদর্শন বলে কথা। চারদিকে সুদর্শনের এমন অভাব যে জাফর ছাড়া আমাদের গতি নেই সে আমরা দুজনই বুঝি। একদিন চিপাচসের হয়ে ছোটদা ঢাকায় গিয়ে জাফর ইকবালের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে এলেন, আমি আর চন্দনা দুজনই ছোটদার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ি আদ্যোপান্ত শুনতে। শুনে আগ্রহের আগুনে আরও সেরখানিক ঘি পড়ে। ছোটদার কাছ থেকে জাফর ইকবালের পাঁচ নয়াপল্টনের বাড়ির ঠিকানা নিয়ে সে ঠিকানায় একটি চিঠি পাঠাই। দুদিন পরই জাফর ইকবালের উত্তর। জাফ লেখা সুন্দর কাগজে ভুল বানানে বন্ধু সম্বোধন করে লেখা ছোট চিঠি। আত্মহারা বিকেল কাটে। পরদিন সকালে চন্দনাকে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে অন্য দিনের মত কলেজে যাই বটে, তবে আমাদের পুরো দিন জুড়ে জাফর ছাড়া আর কিছু থাকে না। না পড়া,না লেখা,না অন্য কিছু চিঠির বানান ভুল আপাতত আমরা ক্ষমা করে দিই, সে জাফর ইকবাল বলেই দিই। পত্রমিতা হওয়ার অনুরোধ করে যারাই ভুল বানানে চিঠি পাঠায়, তাদের কিন্তু রীতিমত উপেক্ষা করি। চন্দনাকে জাফরের কাছে লিখতে ইন্ধন যোগাই। কিছুদিন পর ওর কাছেও চিঠি আসে জাফরের। সে চিঠি নিয়ে ও পরদিন কলেজে আমার সঙ্গে দেখা না হওয়ার অপেক্ষা করে প্রায়-উড়ে অবকাশে চলে আসে। জাফরের স্বপ্নে আমাদের দুজনেরই সময় শিমুল তুলোর মত উড়তে থাকে। দাদার সঙ্গে গিয়ে দুজন দুটো ইংরেজি ছবি দেখে আসার পর আমার তেমন প্রতিক্রিয়া না হলেও, চন্দনা উঁচু জুতো কিনে জাফরের ছবি সে জুতোয় সেঁটে ছবির ওপর আই লাভ ইউ লিখে দিব্যি কলেজে আসতে লাগল। কেবল তাই নয়, বিদেশি ফ্যাশন ম্যাগাজিনএর ডিজাইন দেখে একটি লম্বা স্কার্ট বানিয়ে, পরে, মাথায় একটি বড় হ্যাট লাগিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াতে লাগল, লোকে চোখ গোল করে চন্দনাকে দেখে, যেন ও এ শহরের তো নয়ই, এ জগতেরও কেউ নয়। আমিও ঠিক একই রঙের একই রকম কাপড় কিনে চন্দনার স্কার্টের মত একটি স্কার্ট বানাই। ফ্যাশনের কোনও বোধ আমার ভেতর আগে ছিল না, বীজটি চন্দনাই বপন করে। এর মধ্যে আমার প্রাচীনপন্থী বাবা একটি কাণ্ড ঘটান যা আমাদের যগু পৎ বিস্মিত ও মগ্ধু করে। তিনি বাড়িতে একটি টেলিফোন আনেন। টেলিফোনটি তালা দেওয়া সুতরাং বাড়ি থেকে কোথাও কথা বলার সুবিধে নেই। টেলিফোন আনার মূল উদ্দেশ্য বাবা আরোগ্য বিতান থেকে ফোন করে বাড়ির মানুষ সব যে যার জায়গামত আছে কি না, যে যার কর্তব্য সুষ্ঠুভাবে পালন করে যাচ্ছে কি না খবর নেবেন। বাড়িতে ফোন আসায় সবচেয়ে খুশি ছোটদা। তিনি তারকাঁটা বাঁকিয়ে ফোনের তালা খুলে ঢাকায় গীতার কাছে প্রতিরাতে ফোন করা শুরু করেছেন। আঁচ পেয়ে বাবা তালাবন্ধ টেলিফোন তাঁর ঘরের সেত্রে²টারিয়েট টেবিলের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে ড্রয়ারে তালা দিলেন। এই সমস্যাটির সমাধান আর কারও মাথায় না খেলুক ছোটদার মাথায় খেলে। তিনি দিব্যি টেবিলের ঢাকনা সরিয়ে ড্রয়ার থেকে ফোন বের করে আগের মতই বাঁকা তারকাঁটায় ফোনের তালা খুলে কথা বলতে লাগলেন। এদিকে বাড়িতে টেলিফোন আসার আনন্দে আমি দিকে দিকে বিলি করে যাচ্ছি নম্বর। তারপর সেই সন্ধেটি আসে, যে সন্ধেয় স্বয়ং জাফর ইকবাল ফোন করেন আমাকে। ছোটদা ফোন ধরে আমাকে দিলেন। এর আগে টেলিফোনে আমি কারও সঙ্গে কথা বলিনি। হ্যালো বলার পর আমার আর স্বর ফোটে না। এক ঠাণ্ডা নিস্তব্ধতায় আমি ডুবে যেতে থাকি। মরিয়া হয়ে শব্দ খুঁজি। অন্তত একটি বা দুটি শব্দ। যত খুঁজি, ততই যেন শব্দ সব আমার ত্রিসীমানা থেকে পালায়। ওদিক থেকে জাফর একা কথা বলতে বলতে এপাশে কোনও প্রাণী নেই ভেবে ফোন রেখে দেয়। আবারও ফোন বাজে, আমি দৌড়ে অন্য ঘরে চলে যাই বলতে বলতে জাফর ইকবাল ফোন করলে আমারে দিও না। পরদিন রাতেও ওই হয়। ফোন বেজে চলে। ছোটদা ধরেন, আমাকে জানান জাফর ইকবাল আবার ফোন করেছিল। কিন্তু আমার কি করার আছে! চিঠিতে আমি তুমি লিখি জাফর ইকবালকে, তার কণ্ঠস্বরের সামনে পেটে বোমা মারলেও আমার মখু থেকে তুমি বেরোবে না। শেষে হ্যালো বলা, তুমি বলা, কেমন আছো ভাল আছি ইত্যাদি কথা ঘন্টাখানিক চর্চা করার পর যখন ফোন এলে ধরব বলে প্রস্তুতি নিই, ফোন বাজে, ধরে শুনি বাবার কণ্ঠ, ফোন কি কইরা ধরলি!ফোন ত তালা দেওয়া ড্রয়ারে। দেবনাথ পণ্ডিত যেমন চোখ্যে ভাসাইতে বলেন কোনও জটিল অংকের সমাধান, এই ফোন ধরার পরিণাম কি হতে পারে তা চোখ্যে ভাসিয়ে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলি আমার মাতৃভাষা বাংলা। এর পরের ফোনটি সাহস করে ছোটদা ধরেন, ওটি জাফর ইকবালের। আমাকে রিসিভার দিয়ে চাপা স্বরে বলেন, ক হ্যালো, হ্যালো ক। আমার হ্যালো বলা হয়, কেমন আছর উত্তরে ভাল আছি বলা হয়, চিঠি পেয়েছোর উত্তর পেয়েছি বলা হয় কিন্তু আমার দিক থেকে কোনও প্রশ্ন করা হয় না যেহেতু প্রশ্ন করতে গেলেই তুমি সম্বোধনটির প্রয়োজন হয়। কি পড় তুমি? প্রশ্নটি শোনার পর আমাকে যেন জাফর ইকবাল নিতান্তই বেণী দোলানো কিশোরী না ভাবে, বলি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বলি ঠিক এ জগতে দাঁড়িয়ে নয়, টেবিলের ঢাকনা সরিয়ে চুরি করে তারকাঁটা দিয়ে তালা খোলা টেলিফোন সেটের পাশে দাঁড়িয়ে নয়, বাইরের ল্যাম্পপোস্ট থেকে জানালার লাল নীল কাচ বেয়ে যে আলো এসে পড়ে আমার গায়ে সেটিকে চাঁদের মনোরম আলো বলে ভুল করতে করতে, জাফর ইকবালের সঙ্গে নির্জন সমুদ্রতীরে হাত ধরে মনে মনে হাঁটতে হাঁটতে।

এর পরেই আমাকে অবাক করে জাফর ইকবাল বলে, না। তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড় না। আমি জানি।

ধরায় ফিরে এসে জিজ্ঞেস করি, কি করে?

কি করে তা না বলে ভারি গলায় বলে, বন্ধুর সঙ্গে মিথ্যে কথা বলতে হয় না।

আমাকে গ্রাস করে রাখে মিথ্যে বলার লজ্জা। ফোন রেখে বিছানায় লেপের তলায় মুখ লুকোই গিয়ে। এরপর চন্দনার সঙ্গে দেখা হতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে মর্মান্তিক ঘটনাটি বলি, সব্বনাশ করছি, বয়সে বড় হইতে গিয়া একটা মিছা কথা কইয়া ফেলছি। জাফর ইকবাল জানে যে চন্দনা আমার বান্ধবী। একজন মিথ্যুক হলে আরেকজনও হতে পারে! চন্দনা অনেকক্ষণ দুঃখগ্রস্ত বসে থেকে হঠাৎ দুঃখ ঝেড়ে বলে ঠিকই তো কইছস তুই, আমরা কি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি না? পড়িই তো। মনে মনে পড়ি। বাবা পরদিনই ড্রয়ার খুলে টেলিফোনটি বগলতলায় নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি একরকম। ফোনের ছেঁড়া তার অনেকদিন ঝুলে থাকে। ছোটদা কোত্থেকে যেন একটি পুরোনো টেলিফোন এনে ঝুলে থাকা তারে জোড়া দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছেন শব্দ টব্দ নেই কোনও। এদিকে লজ্জায় জাফরের চিঠির আর কোনও উত্তর দিই না আমি। চন্দনা চিঠি পেতে থাকে জাফরের। সেসব চিঠিতে বন্ধুত্ব পেরিয়ে প্রেম উঁকি দিচ্ছে দিচ্ছে। চন্দনার চিঠিতেও। আমি দুপক্ষের চিঠিরই শ্রোতা। শ্রোতা হওয়াই আমাকে মানায়। এ ছাড়া আমি টের পাই আমার সাধ্য নেই অন্য কোনও ভূমিকা গ্রহণ করার।

ছোটদা চিপাচসের অনুষ্ঠানের আয়োজন শুরু করেন আবার। ঢাকা থেকে আসবেন শাহনাজ রহমুতল্লাহ, বিখ্যাত গায়িকা, আর তাঁরই ভাই আমাদের সবেধন প্রেমিকপ্রবর জাফর ইকবাল। অনুষ্ঠান হবে টাউন হলে,শনিবার সন্ধেবেলা। চন্দনা আর আমি কলেজের শিমুল তলায় দোদুলদোলায় দুলি, যাবো কি যাবো না জাফর ইকবালকে দেখতে। শনিবার সারাদিন দুলি, সন্ধের অনুষ্ঠানে যাওয়া হয় না আমার, ওই মিথ্যেটির কারণেই আমি গুটিয়ে থাকি, চন্দনা যাবে বলেও শেষ অবদি যায় না। অনুষ্ঠান শেষে জাফর ইকবালের আকুল আবদারে ছোটদা তাকে চন্দনার সবুজ টিনের বাড়িতে নিয়ে যান। ওখানে চা বিস্কুট খেতে খেতে চন্দনার সঙ্গে কথা বলে জাফর। চন্দনা ওই মাথা নুয়ে যতক্ষণ জাফর ছিল, ছিল। কিছু হ্যাঁ, না, কিছু অপ্রতিভ হাসিই ছিল ওর সম্বল। ঢাকা ফিরে জাফর কোনওদিন আর ওকে চিঠি লিখবে না এ ব্যাপারে ও একশ ভাগ নিশ্চিত ছিল, কিন্তু জাফরের পরের চিঠিতে থৈ থৈ করে প্রেম। এই থৈ থৈ প্রেম শেষে বিয়ের প্রস্তাবে গড়ায়। চন্দনা প্রেম করতে পারে, কিন্তু বিয়ে নৈব নৈব চ। অন্ধকার উতল সমুদ্র পাড় থেকে দেখতে ভাল লাগে, কিন্তু ঝাপঁ দেবার মত দুঃসাহস চন্দনার নেই।

 

চন্দনা এর মধ্যে নাকচ করে দিয়েছে বেশ কটি প্রেমের আবেদন। পাশের বাড়ির ম্যাজিস্ট্রেট আখতার হোসেনকে বুড়ো ধামড়া বলে গাল দিয়ে, গান গায় ছেলে অন্টুকে একদিন খালি গায়ে ছাদে হাঁটতে দেখে ওয়াক থু বলে, আর সন্দিপন চাকমা নামের যে ছেলেটি পেয়িং গেস্ট ছিল ওদের বাড়িতে ক’মাস, ওকে খেতে দেখে। ছেলেদের খালি গা দেখলে বা খাবার চিবোনো দেখলে চন্দনার বিচ্ছিজ্ঞর লাগে, রোমান্স বাপ বাপ করে পালায়। চন্দনা মাঝে মাঝে বলেওছে তুই কি জানিস মানুষকে সবসময় বিশ্রি দেখায় কখন? কখন? তারা যখন খায়। মুখ নামের একখানা ছিদ্র আছে শরীরে, মানুষ ওতে নানা কিছু ঢুকিয়ে কী অশ্লীল ভাবে দুদাঁতের পাটি ঘষতে থাকে…. ছি!! আমি যার সঙ্গে প্রেম করব, আমার সামনে সে যেন না খায়, যেন গায়ের জামা না খোলে, যেন পেশাব পায়খানায় না যায়। ব্যস সোজা হিশেব। ছুটিতে একবার রাঙামাটি বেড়াতে গেল চন্দনা। চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় তখন তার বিয়ের জন্য পাষনী খুঁজছে। এক পারিবারিক অনুষ্ঠানে চন্দনাকে দেখার পর হাঁ হয়ে গেল, এমন যোগ্য পাষনী আর সে কোথায় পাবে! এরকম সুন্দরী বুদ্ধিমতী রাঙামাটিতে আর আছে কে!চন্দনাকে তার চাই। চাই তো চাইই। চন্দনার এক খুড়তুতো দাদার সঙ্গে দেবাশীষ রায়ের বন্ধুত্ব ছিল, সেই দাদাকে ধরে চন্দনার সঙ্গে দেখা হওয়া, কথা হওয়ার সুযোগ চাইল দেবাশীষ। সুব্রত চাকমার আনন্দ আর ধরে না, মেয়ে তাঁর রাণী হতে যাচ্ছে। খুড়তুতো দাদার অনুরোধে চন্দনা গেল দেবাশীষের সঙ্গে ঝিলের পাড়ে বেড়াতে। য়চ্ছ জলে শাদা মসৃণ গ্রীবা উঁচু করে ঝাঁক ঝাঁক রাজহাঁস সাঁতার কাটছে, পাশে ঘাসে বসে দেবাশীষ প্রেমিকের মত তার চটচটে ঘামে ভেজা হাতটি চন্দনার দিকে বাড়িয়ে গলা গম্ভীর করে প্রেমের কথা যখনই বলতে শুরু করেছে, চন্দনা ফক করে হেসে ফেলল। বাড়ি ফিরে ও উৎসাহী দাদাকে বলে দিল, রাজা হোক আর যেই হোক দেবাশীষ প্রেম করতেই জানে না, তার সঙ্গে হবে না। সুব্রত চাকমা প্রথম নরম স্বরে, তারপর কড়া স্বরে দেবাশীষের বিয়ের প্রস্তাবে চন্দনাকে রাজি হওয়ার জন্য বলেন, ও রাজি হয়নি। চড় থাপড় লাগিয়েও কাজ হয়নি। বিয়েতে চন্দনার ভীষণ আপত্তি, ওর পক্ষে এ কল্পনা করা অসম্ভব যে একটি লোক খালি গায়ে ওর বিছানায় এসে শোবে, তারপর কী কী সব করবে, কী কী সব করায় আর যে মেয়েই রাজি হোক, চন্দনা রাজি নয়। দিব্যি রাজার প্রস্তাবে গুল্লি মেরে ছুটি শেষে চলে এল ময়মনসিংহে। ওর এমনিতেও ভাল লাগে না নাক বোঁচা কোনও চাকমা লোক, সে যত বড় রাজাই হোক। চন্দনার এরকম পটাপট প্রেমে পড়া আর হুটহাট ফিরিয়ে দেওয়া সবকিছুই আমাকে মগ্ধু করে। আমার কাউকে ফিরিয়ে দেওয়ার নেই, কারও সঙ্গে প্রেমও হয় না আমার।

ছোটদার মিনতিতে তাঁর বাচপুান কা দোস্তকে চিঠি লেখে চন্দনা। ধীরে ধীরে হাসান মনসুর খোকন চন্দনার এক নম্বর পত্রমিতা হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করে। খোকন নামের মধ্যে খোকন খোকন করে মায় খোকন গেল কাদের নায় গন্ধ আছে বলে চন্দনা খোকন নাম বাতিল করে সম্বোধনের জন্য হাসান বেছে নিল।না সজনী না জানি জানি সে আসিবে না গানটি শুনতে শুনতে সজনী নামটি সবে নিজের নামের লেজে জুড়েছে ও।চন্দনা নামটি ওর ভাল লাগে না, চাকমা নামটি তো নয়ই। কিন্তু এ দুটোকে ফেলতে পারে না নিজের নাম বলে। ভূতনি যার নাম, তাকে তার ভূতনি নামটিই রাখতে হয় নিজের নাম বলে। হাসানের চমৎকার চমৎকার চিঠি পড়ে চন্দনা সজনী হাসান নামটি কাগজে লিখে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে মন্দ লাগে না দেখতে। জাফর ইকবাল সুদর্শন বটে, কিন্তু তার চিঠির বানান ভুল ভাষার ভুল একদিন দুদিন ক্ষমা করে দেওয়া যায়, প্রতিদিন যায় না। চন্দনা হাসানে মগ্ন হয়। হাসান যেমন কাব্য করে অরণ্য আর সমুদ্রের কথা, কোনও এক অচেনা দ্বীপে কোনও একদিন হারিয়ে যাওয়ার কথা লেখে, চন্দনাও রঙিন আকাশে পালকের মত উদাসীন ভেসে ভেসে লেখে ওর সুচারু সুন্দর স্বপ্নের কথা। চন্দনা হাসানকে কি লিখছে, হাসানই বা চন্দনাকে কি, সব আমাকে পড়ে শোনায়। চন্দনা আর আমার মধ্যে এক বিন্দু গোপন কিছু নেই। চন্দনা, আমার বিশ্বাস হয় না, যাকে ও লেখে, তাকে কখনও বাস্তবে দেখতে চায়। ওর শব্দ নিয়ে স্বপ্ন নিয়ে খেলতে ভাল লাগে, ও খেলে। হাসানের বাঁকা হাসিটি দেখলে বুকের ভেতর কেমন জানি করত, চন্দনাকে সে কথা বলি। বলি যে হাসান দেখতে সুন্দর, বলি যে সেই শৈশবেই আমার মনে হত জগতে বুঝি হাসানের চেয়ে সুদর্শন আর কেউ নেই। চন্দনা আমার কথা মন দিয়ে শোনে,শুনতে শুনতে দূর এক অরণ্যে ও হাসানের হাত ধরে হাঁটে, মনে মনে। সেই হাসান চন্দনার চিঠি পড়েই প্রেমে অর্ধউন্মাদ হয়ে একদিন ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ চলে এল চন্দনাকে দেখবে বলে। কিন্তু দেখা হবে কি করে, হাসান দেখা করতে এসেছে শুনেই তো ও শামুকের মত গুটিয়ে গেল। মেঘলা আকাশ থেকে একটি রঙিন নরম পালক একটি বোধহীন পাথরের সঙ্গে শুকনো মাটিতে এসে সশব্দে পড়ে চন্দনার নিমগ্নতা নষ্ট করে। এই রুখো বাস্তবতা চন্দনাকে বিবণর্ করে তোলে। ছোটদার পীড়াপীড়িতে আমি নিরাসক্ত নিস্তেজ বিবর্ণকে যে করেই হোক হাসানের সঙ্গে অন্তত একটিবার দেখা করতে বলি। রাজি হলে ছোটদা আমাদের দুজনকে নিয়ে ময়মনসিংহ প্রদর্শনীতে যান, সঙ্গে গীতা, বার্মা কোরিয়া থেকে ফিরে ময়মনসিংহে থিতু হয়ে বসা গীতা। প্রদর্শনীতে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য হাসানের সঙ্গে চন্দনার অনানুষ্ঠানিক দেখা হওয়া। হাসান আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল প্রদর্শনীতে। প্রদর্শনী মানে যাত্রা সার্কাস, জলহীন কুয়োর ভেতর মোটর সাইকেলের চক্কর, দোকানপাট, ঝলমল আলো, হাউজি নামের জুয়ো। মাঠে ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে গীতার হঠাৎ হাউজি খেলার শখ হয়। গীতার শখ মেটাতে ছোটদা পাঁচ পায়ে খাড়া। তিনি দল নিয়ে হাউজিতে ঢোকেন। ওখানে আর কোনও মেয়ে নেই, আমরাই কেবল। হাউজিতে পঁচাত্তর টাকা জিতে গীতা হৈ হৈ রৈ রৈ করে খুশিতে নেচে ওঠে। রেস্তোরাঁয় পরোটা মাংস খেয়ে পঁচাত্তর টাকার অনেকটাই নাশ করা হয়। চন্দনাকে দেখার পর হাসান আর চোখ ফেরাতে পারেনি চন্দনা থেকে। চন্দনা কিন্তু আড়চোখে একবার হাসানকে দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে। হাসানের দএু কটি প্রশ্নের উত্তরে কেবল হ্যাঁ বা না বলেছে। ভাল আছ? হ্যাঁ। শরীর ভাল? হ্যাঁ। মন ভাল? হ্যাঁ। পড়াশোনা ভাল হচ্ছে? না। কিছু কিনবে? না। সাভার গেছ কোনওদিন? না। চন্দনার লাজুক লাজুক হাসি দেখে সবাই অনুমান করে যে হাসানকে চন্দনার খুব পছন্দ হয়েছে। প্রেমে হাবুডুবু খেলে এমন লাজুকই তো দেখতে লাগে মেয়েদের। চন্দনা সারাক্ষণই আমার হাত ধরে ছিল, হাতে বার বার চাপ অনুভব করছিলাম ওর হাতের। চাপের অনুবাদ করছিলাম, দেখ দেখ হাসানের চোখ দুইটা কি সুন্দর! হাসিটা দেখ, এমন সুন্দর হাসি কি কেউ হাসতে পারে! পকেটে হাত রেখে হাঁটছে, কী চমৎকার হাঁটার ভঙ্গি!আহ, মরে যাই! সে রাতে ধুলোয় ভিড়ে চন্দনার উচ্ছঅ!স দেখার সুযোগ হয়নি। পরদিন ঝাঁপিয়ে পড়ি ওর থরথর আবেগের শব্দাবলী শুনতে।

তরে ত আগেই কইছিলাম হাসান খুব সুন্দর,দেখলি তো!

চন্দনা সশব্দে হেসে ওঠে।

ক। তাড়াতাড়ি ক।

কি কইতাম?

হাসানরে কিরম লাগল, ক।

ধুর বেডা পচা! বেডার ভুড়ি আছে।

হাসান বাদ। আমি নিজেও আবার হাসানকে লক্ষ করে দেখি, বেডার ঠিকই ভুড়ি আছে। চন্দনা আমার চোখ খুলে দেয়, মন খুলে দেয়। আমি স্পষ্ট বুঝি, আমার আর চন্দনার সবাইকে ভাল লাগে, আবার কাউকেই লাগে না। আমরা প্রেমে পড়তে চাই, আবার চাইও না। প্রেম জিনিসটি ঠিক কি, সে সম্পর্কে আমরা জানি,পড়েছি, দেখেছি, কিন্তু নিজের জীবনে এ জিনিসটির উপস্থিতি আমাদের সয়, আবার সয়ও না। ভাল লাগা আর না লাগায় আমরা দুলি। আমি আর চন্দনা।

ক্লাস ফাঁকি দিয়েও গগন দারোয়ানকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে কলেজ মাঠের শেষ কোণে কাঁটা ঝোপঁ আবিষ্কার করে তার তল দিয়ে গা কাঁটায় ছিঁড়ে হলেও আমি আর চন্দনা একদিন বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়। বেরিয়েছি, এবার যাব কোথায়? আগুনে রোদ্দুর হাতে নিয়ে থমকে আছে নির্জন দুপুর। চন্দনা পার্কে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। পার্কের কথায় বুক ঢিপঢিপ করে। আবার যদি পাল পাল ছেলের পাল্লায় পড়ি! হাত ধরে আমাকে সামনে টানে চন্দনা, ওর স্পর্শই যথেষ্ট আমাকে আরও চঞ্চল, চপল, আরও চলমান করার। চন্দনার সাহসের ডানায় বসে আপাতত ছেলের পালের কথা ভুলে সেই লেডিস পার্কে যাই। অশ্বত্থ গাছের তলে দুজন বসি পা ছড়িয়ে, ব্রহ্মপুত্র তার জল থেকে শীতল স্নিগ্ধতা তুলে আমাদের স্নান করাতে থাকে। একটি ডিঙি নৌকো ডেকে নৌকোওলাকে গলুইয়ে বেকার বসিয়ে রেখে চন্দনা নিজে বৈঠা বাইতে থাকে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলে, জলের সঙ্গে বৈঠার এই শব্দ যেন আদৌ কোনও শব্দ নয়, যেন এক ধ্রুপদী সঙ্গীত। আমি জলে পা ডুবিয়ে আকাশ জুড়ে মেঘ ও রোদের খেলা দেখতে থাকি, দেখতে দেখতে আর ওভাবে ভাসতে ভাসতে বিকেল হয়ে আসে। বিকেলের সপ্তবণর্ রং দেখি কেবল আকাশে নয়, আমাদের সর্বাঙ্গে। আমারও চন্দনার মত নৌকো বাইতে ইচ্ছে হয়, ইচ্ছে হয় জলে ভেসে বেড়াই, সঙ্গীতের তালে নৌকো দুলুক সারাজীবন, কোথাও না পৌঁছুক, কোনও পারে, এভাবেই ভেসে যাক জীবন। ইচ্ছে হয় আলটপকা দুটো পাখাও গজিয়ে যাক আমার, পাখির মত উড়ে বেড়াই আকাশ জুড়ে, ওই রংগুলোর খুব কাছে চলে যাই, একটু একটু করে মিশে যাই ওই রঙে। চন্দনা, তোর কি কখনও পাখি হতে ইচ্ছা করে রে? ইচ্ছে করে চন্দনাকে প্রশ্নটি করি। ওরও নিশ্চয় পাখি হতে ইচ্ছে করে, ওর ইচ্ছেগুলো আমার ইচ্ছের মত। তবু মনে হয়, চন্দনা যা চায় তার অনেকটাই ও করে ফেলে, অবাক করে দেয় সব্বাইকে। ও হয়ত সত্যিই একদিন আকাশে উড়ে উড়ে সূর্যাস্তের রঙের অনেক কাছে চলে যেতে পারবে। ব্রহ্মপুত্রের জল ছেড়ে আমাদের উঠে আসতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু উঠে আসতেই হয়। তার চেয়ে আমাদের যদি কোথাও দ্বীপান্তর হত, আমি আর চন্দনা দুজনই ভাবি, বুঝি সুখের সমুদ্রে সত্যিকার অবগাহন হত।

 

কলেজ প্রাঙ্গণে আমাদের অন্যরকম জগত নিয়ে আমরা একা হতে থাকি, আমি আর চন্দনা। কখনও কখনও মেয়েদের আড্ডায় যে নাক গলাতে চাই না, তা নয়। একবার ক্লাস নেই,একদঙ্গল মেয়ের আড্ডায় বসে শুনি কোন মেয়ের কবে বিয়ে হচ্ছে, কবে কাকে দেখতে আসছে কোন ছেলে, ছেলের নাম ধাম, ছেলে কোথায় থাকে, কি করে ইত্যাদি কথা। চন্দনা আর আমার দুজনের ঠোঁটের কোণে ঝিলিক দেয় ফুলকি ফুলকি হাসি। হাসিটি কোনও মেয়েরই পছন্দ হয় না। হাসছি কেন এই প্রশ্নের উত্তর ওদের একজন জানতে চায়।

হাসছি এই বিচ্ছিজ্ঞর জিনিসটি নিয়ে তোমরা কথা বলছ বলে।

বিচ্ছিজ্ঞর জিনিস? মেয়েদের কারও চোখ কপালে, কারও নাকে, কারও চোখ বেরিয়ে এসেছে চোখের কোটর থেকে। যেন আমি আর চন্দনা মোটেই মানুষ নামের পদার্থ নই, অন্য গ্রহ থেকে অন্য কোনও কিম্ভূত জীব এসেছি।

একজন বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে, বিচ্ছিজ্ঞর কেন হবে?

বিচ্ছিজ্ঞরই তো। চন্দনা বলে।

ভাবটা এমন যেন তোমাদের কোনওদিন বিয়ে হইব না।

হইবই ত না। বিয়ে করলে তো হইব বিয়ে! করতাছে টা কে! আমি বলি।

চন্দনা বলে, ফুঁ:, পাগল হইছি নাকি যে বিয়ে করতাম!পাগল আর বোকা ছাড়া কেউ বিয়ে করে না।

কোনওদিন বিয়ে করব না—আমাদের এ ঘোষণাটি শুনে মেয়েরা জানতে চেয়েছে, বিয়ে না করার পেছনে আমাদের যুক্তিটি কি।

বিয়ে করার কি কোনও যুক্তি আছে, যদি থাকেই, যুক্তিটা কি?

সংসার হবে। সংসারের তো দরকার আছে।

সংসারের দরকার কি? সংসার না হইলে কি মানুষ বাঁচে না?

বাচ্চাকাচ্চা হবে।

বাচ্চাকাচ্চা না হইলে কি হয়!

খাওয়াবে কে? পয়সা দেবে কে?

লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করব। টাকা পাব। একলা থাকব। খাব দাব। ঘুইরা বেড়াবো। আনন্দ করব। যা মন চায় তা করব।

তাই কি হয় নাকি!

হবে না কেন! নিশ্চয় হবে, ইচ্ছে থাকলে সবই হয়।

আমরা সরে আসি, একসঙ্গে অনেকগুলো চোখ আমাদের দিকে পলকহীন তাকিয়ে আছে, টের পাই। চন্দনা আমার হাতটি হাতের মুঠোয় নিয়ে শিমুল তলার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে, পিছনে তাকাইস না। আমরা এভাবেই হাঁটি দুজন, হাত ধরে, কোমর জড়িয়ে ধরে, কাঁধে হাত রেখে পরস্পরের, পেছনে না তাকিয়ে। কলেজে এ কোনও নতুন দৃশ্য নয়, বান্ধবীরা এভাবেই কথা বলে অবসর কাটায়। কিন্তু চন্দনা আর আমার গ্রীবায় অদৃশ্য এক অহঙ্কার, মেয়েরা বলে, বসে থাকে।

চন্দনা আর আমার কাছে প্রেমের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে কবিতা। প্রতিদিন কবিতা লিখতে থাকি, প্রতিদিন গল্প। যা কিছুই লিখি না কেন, চন্দনার লেখার কাছে আমার সব লেখাই মলিন ঠেকে, ও যদি একটি কৃষ্ণচূড়া তৈরি করে তো আমি নিতান্তই একটি হেলে পড়া পত্রপুষ্পহীন চারাগাছ। এত মগ্ধু আমি ওর সৌন্দর্যে, ওর রঙে, রসে, ওর অসম্ভব বৈচিত্রে যে এতটুকু যদি ঈর্ষার লেশ জন্মে কখনও মনে, নিমেষে হাওয়া হয়ে যায়। আমার আর চন্দনার চিপাচসের সদস্য হওয়া হয় না, কোনও সভা সমিতিতে যাওয়া হয় না, আমরা ও কাজের জন্য নই, আমাদের জগত আলাদা। নিরবধি নিরুদ্বেগে নিরিবিলি শব্দের নিরঞ্জন খেলায় মাতি, শব্দ নিয়ে মিছিলে নামি না, রাজনীতিও করতে জানি না। ওই ধুমসে কবিতা লেখার সময়ই একদিন শফিকুল ইসলাম নামের এক মোটা কাচের চশমা পরা, শরীরের চেয়ে মাথাটি বড়, তারের মত শক্ত চুল মাথা ভরা, দেখলে মনে হয় দঞ্চু বছর গোসল করেনি, জামাও পাল্টায়নি, অনর্গল আঞ্চলিক সুরে এবং স্বরে কথা বলা বাচালকে বাড়ি নিয়ে এলেন ছোটদা, আমাকে দেখেই বলে সে, কি ব্যাপার তুমি তো বিখ্যাত হইয়া গেছ! আমি একটা লিটল ম্যাগাজিন বাইর করি। একটা কবিতা লিইখা দেও তো। শফিকুল ইসলামের অনুরোধে এক বিকেলে বসে নতুন একটি কবিতা লিখে ফেলি, নাম মুক্ত বিহঙ্গ। অনেকটা এরকম, জানালাটি খুলে দাও, আমি যাব, আকাশ জুড়ে উড়ব আমি। সম্ভবত মার হঠাৎ হঠাৎ বাড়ির বারান্দায় বসে গেয়ে ওঠা আমি মুক্ত বলাকা, মেলে দিই পাখা ওই দূর নীল আকাশে গানটি শুনতে শুনতে এই হয়। দুসপ্তাহ পর শফিকুলের কবিতা পত্রিকা বেরোল, আমার কবিতা ওতে। পদ্মরাগ মণিও কবিতা লিখেছে। পদ্মরাগ মণি মাঝে মধ্যে ছোটদা আর গীতার সঙ্গে দেখা করতে অবকাশে আসে। চোখকাড়া সুন্দরীটির সঙ্গে আমার দূর থেকে কিছুটা চোখাচোখি, মিটিমিটি হাসাহাসি, দুচারটে কথা ছোঁড়াছুঁড়ি হয়েছে। শফিকুলের কবিতা পত্রিকাটি হাতে আসার পর আরও আরও কবিতা-পত্রিকা আমার কাছে উড়ে, দৌড়ে, হামাগুড়ি দিয়ে আসতে থাকে। শহরের কবিদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে নানা রকম ছোট পত্রিকা নিয়ে বাড়ি ফেরেন ছোটদা। প্রায়ই আমাকে তাগাদা দেন, দে তো লেইখা বাংলার দর্পনের জন্য একটা কবিতা। লিখে দিই, ছাপা হয়ে যায়। চন্দু মাস্তানরে ক একটা কবিতা দিতে। চন্দনাও লেখা দিতে থাকে ছোটদার হাতে, ছাপা হতে থাকে। সেই যে এক ভোরবেলা চন্দনা সাইকেল নিয়ে চলে এসেছিল অবকাশে, সেই থেকে ছোটদা ওকে চন্দু মাস্তান ডাকে, চন্দনা অখুশি হয় না। দৈনিক জাহান থেকেও ছোটদার কাছে বলা হয় আমি যেন কবিতা পাঠাই, চন্দনাও। কবিতার পার্থিব জগতে সেই আমার হাঁটি হাঁটি পা পা প্রবেশ। চন্দনারও। আমাদের কবিতার খাতা উপচে পড়তে থাকে শব্দে। ফিকে হয়ে যায় চিত্রালী পূর্বাণী। ওসবে লেখা তো হয়ই না, ওসব কেনাও হয় না। বিচিত্রায় ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন দেওয়ার কথা ভুলেও মনে পড়ে না। বিজ্ঞাপনের প্রসঙ্গ উঠলে চন্দনা বলে, বিজ্ঞাপনে বিপদ আছে। চব্বিশ বছর বয়স্কা বীরাঙ্গনা ছাপার ভুলে হয়ে যেতে পারে বিয়াল্লিশ বছর বয়স্কা বারাঙ্গনা। সুতরাং বিজ্ঞাপন বাদ। পাঠাতেই যদি হয় কিছু কবিতা পাঠাবো, পাঠাবো রোববার অথবা সন্ধানীর সাহিত্যপাতায়।

 

কলেজে বছর শেষে প্রথম বর্ষ শেষ করে দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার একটি পরীক্ষা হবে। দেবনাথ পণ্ডিত বাড়ি এসে পড়তে বসিয়ে কিল ঘুসি চড় আমার মাথায় মুখে পিঠে ইচ্ছেমত ঢেলে মনের সাধ মিটিয়ে চলে যান। চন্দনার দেবনাথ পণ্ডিতের ঝামেলা নেই। দিব্যি আছে সে। লেখাপড়া জাতীয় বিষয়ের ওপর চন্দনার বরাবরই বড় অনাসক্তি। আমারও হত, কিন্তু বাবার কারণে হওয়ার উপায় নেই। বাবার ইচ্ছেয় আমাকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়তে হচ্ছিল। ছোটদা এই মাধ্যমে পড়েছেন, তাঁর কিছু বই পড়ে ছিল বাড়িতে, ঝেড়ে মুছে সেগুলোই সাজিয়ে রেখেছিলাম টেবিলে। দেবনাথ বাবু পরীক্ষার আগে আগে বাবাকে জানিয়ে দিলেন, বাংলায় পড়াই ভাল, এর দ্বারা ইংরেজি পোষাবে না। ইংরেজি বাদ দিয়ে বাংলায় বই কেনা হল। তাড়াহুড়ো করে বই শেষ করতে হবে, পরীক্ষা সামনে। দেবনাথ পণ্ডিত, আমি জানি না কি কারণে, পরীক্ষার আগে আগে হঠাৎ অসময়ে এসে—উস্কোখুস্কো চুল, পকেটের কালো কলম থেকে কালি চুইয়ে শার্ট প্রায় অর্ধেক ভিজে গেছে- আমাকে কিছু প্রশ্ন লিখে রাখতে বলেন, বলেন এইসবের উত্তরগুলা ঠাইস্যা পড়বা। ব্যস, ঠাইস্যা পড়ে গিয়ে দেখি পরীক্ষায় প্রায় ওই প্রশ্নগুলোই এসেছে। পরীক্ষা হল, ফল বেরোল, আমি প্রথম হলাম। কলেজে আমার নাম হয়ে গেল। প্রধান শিক্ষিকা আমাকে তাঁর ঘরে ডেকে নিয়ে বললেন তুমি হলে কলেজের গবর্, ভাল করে পড়াশুনা করতে থাক, ফাইনালে খুব ভাল রেজাল্ট চাই। খবরটি শুনে বাবা কিন্তু আদৌ তুষ্ট নন আমার ওপর। বাড়ির ঠিকানায় আমার নামে মেলা চিঠি আসে তিনি লক্ষ করেন। দাদাকে জিজ্ঞেস করেন, নাসরিনের কাছে চিঠি কারা লেখে?

পেনফ্রেন্ডরা।

পেনফ্রেন্ড মানে কি?

দাদা নিরাসক্ত কণ্ঠে বলেন, চিঠিতে ফ্রেন্ডশিপ।

চিঠিতে ফ্রেন্ডশিপ মানে?

দাদা কোনও উত্তর দেন না।

কি লেখে চিঠিতে? বাবার সর্বাঙ্গে বিস্ময়।

কি জানি আমি ত জানি না।

জানি না মানে?

আমারে তো দেখায় না চিঠি।

দেখায় না কেন? কি আছে চিঠিতে?

দাদা চপু ।

কার কাছে চিঠি লেখে?

জানি না।

এই মেয়ে কার কাছে চিঠি লেখে, কি লেখে, কেন লেখে, এইসব জানতে হবে না?

তেমন কিছু না। এই নরমাল ফ্রেন্ডশিপ!

বাবার ক্রমে উত্তপ্ত হতে থাকা মেজাজে দাদা অনুত্তপ্ত পরশ বুলোতে চেষ্টা করেন, কাজ হয় না। বাবার গলার স্বর ধাই ধাই করে ওপরে ওঠে।

নরমাল ফ্রেন্ডশিপ মানেটা কি?

শাদা দেয়ালের দিকে বোধবুদ্ধিহীন তাকিয়ে থাকেন দাদা।

মেয়ে না পুরুষলোক, কার সাথে?

দুই ধরনেরই আছে।

ও কি পুরুষলোকের সাথে ফ্রেন্ডশিপ করে নাকি?

দাদার কোনও উত্তর না পেয়ে তিনি হাপাঁতে হাপাঁতে বলেন, বিয়া বইতে চায় নাকি ও?

দাদা বলেন, না, বিয়া না।

তাইলে কি?

এমনি।

এমনি মানে? এমনি কি?

এমনি লেখে।

এমনি কেন লেখে? কি দরকারে লেখে?

না, কোনও দরকারে না।

দরকার না থাকলে লেখে কেন?

জানি না।

জানস না কেন?

বাবা রক্তচোখে বিস্ফারিত চোখে গিলে খাবেন-চোখে দাদাকে প্রশ্ন করে যান। প্রশ্নের অত্যাচার থেকে বাঁচতে দাদা পায়খানার বেগের কথা বলে গোসলখানায় গিয়ে বসে রইলেন। বাবা তাঁর চশমা ঘন ঘন খুলে, পরে; ঘন ঘন ঘরের বারান্দার এমাথা ওমাথা হেঁটে আমার টেবিলে এসে বইখাতা ঘাঁটেন। প্রতিটি বই, প্রতিটি খাতা। টেবিলের তলে পড়ে থাকা প্রতিটি টুকরো কাগজ। এমনকি বিছানার চাদরের তল, বালিশের তল, তোশকের তল। তিনি খোঁজেন কিছু।

এই ঘটনার পর বাড়িতে আমার চিঠিপত্তর আসা বন্ধ হয়ে গেল। চিঠি চলে যেতে থাকে নতুন বাজারে আরোগ্যবিতানের ঠিকানায়। ডাকপিয়নকে বাগিয়ে নিয়েছেন বাবা। নিশ্চিত হই ছোটদা যেদিন আরোগ্য বিতানে ঢুকে যেই কি না বাজারের দিকে বাবা পা বাড়িয়েছেন, ড্রয়ার খুলতেই অবকাশের ঠিকানায় আমার নামে আসা অনেকগুলো চিঠি খামখোলা পড়ে আছে দেখে এসে আমাকে খবর দেন। একটি জিনিসই আমার তখন মনে হয়েছে, এ অন্যায়। বাবা না হয় বাবা হওয়ার কারণে কোনও অন্যায়কে অন্যায় মনে করেন না। কিন্তু ডাকপিয়ন এই অন্যায়টি করবে কেন! সমস্যাটি কারও কাছে জানিয়ে আমি যে উপকার পাবো না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েই চিঠিটি লিখি। বিচিত্রার পাঠকের পাতায় লেখাটি আমার ছাপা হয় পরের সপ্তাহে। অবকাশ, আমলাপাড়ার ঠিকানায় আসা চিঠিগুলো ৬৯, রামবাবু রোডের ঠিকানায় যাচ্ছে, ডাকবিভাগের অসততা সীমা ছাড়িয়ে গেছে ইত্যাদি ..। চিঠি ছাপা হওয়ার দুদিন পর আমার খোঁজে ডাকবিভাগের একজন কর্তা আসেন অবকাশে। তিনি একটি বাধাঁনো লম্বা খাতায় আমার অভিযোগ লিপিবদ্ধ করতে এসেছেন। এসে কিন্তু নিজের অভিযোগের কথাই বর্ণনা করলেন। তাঁর অভিযোগটি আমার অভিযোগ নিয়ে। আমার চিঠি কোনও অচেনা দুর্বৃত্তের কাছে যাচ্ছে না, আমার আপন পিতার কাছেই যাচ্ছে। অবকাশের মালিক এবং আরোগ্য বিতানের মালিক এক ব্যক্তি। সুতরাং মালিকের আদেশে এক ঠিকানার চিঠি আরেক ঠিকানায় যেতেই পারে। এর উত্তরে আমি বলি, কিন্তু চিঠি তো আমার বাবার নামে আসছে না। আসছে আমার নামে। আমি তো পোস্টমাস্টাররে বলি নাই আমার চিঠি অবকাশে না দিয়া আরোগ্য বিতানে দিতে।

যেইখানেই দিক, তিনি তো আপনার বাবা।

মৃদু কণ্ঠে ভুল শুধরে দিই, হ্যাঁ তিনি আমার বাবা, তিনি আমি নন। আমি এবং আমার বাবা এক এবং অভিন্ন নই। লোকটি চলে গেলেন। সমস্যার কোনও সমাধান হল না। এই অবস্থা থেকে ছোটদা আমাকে উদ্ধার করেন তাঁর এক বন্ধুর খাতা কলমের দোকানের ঠিকানা আমাকে ব্যবহার করতে দিয়ে। পত্রমিতাদের জানিয়ে দিই আমার নতুন ঠিকানা। ছোটদা নিষ্ঠ ডাকহরকরার মত কর্তব্য পালন করেন। তাঁর সঙ্গে আমার বেশ ভাব। আমরা ঈদসংখ্যা বিচিত্রার গল্প উপন্যাস একসঙ্গে পড়ি, পড়া মানে আমি সশব্দে পড়ি আর ছোটদা শোনেন। গল্পের বইগুলোও প্রায়ই ওভাবেই পড়া হয়। কিছু কিছু বই আবার ছোটদার পছন্দ হয় না, সেগুলো আমি নিভৃতে পড়ি। ছোটবেলার দস্যু বনহুরের পাট চুকেছে, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, ফাল্গুনি মুখোপাধ্যায়, নিমাই ভট্টাচার্য, বিমল মিত্র, জরাসন্ধকে বিদেয় দিয়েছি অনেক আগে। বঙ্কিম শরৎচন্দ্রের আর কিছু বাকি নেই। রবীন্দ্রনাথ নজরুল অনেক হয়েছে। মাইকেল হয়েছে, জীবনানন্দও হয়ে গেছে। বিভূতিভুষণ, মানিক বন্দোপাধ্যায়ও। শক্তি, সুনীল, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ থেকে শুরু করে হালের নির্মলেন্দু গুণেরও যে বইগুলো এ অবদি বেরিয়েছে পড়া হয়ে গেছে। নতুন রকম বই চাই। আঁতি পাঁতি করে খুঁজি নতুন কিছু। কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে গাঙ্গিনার পাড় মোড়ের বইয়ের দোকানগুলোয় থেমে বই খুঁজি। গদ্যপদ্যপ্রবন্ধের নানারকম বই আমাকে টানে। কিন্তু বই কেনার পয়সা যথেষ্ট নেই। এ দুরবস্থা থেকেও ছোটদা আমাকে উদ্ধার করেন। এক বিকেলে পাবলিক লাইব্রেরিতে নিয়ে যান। লাইব্রেরির ভেতর ঢুকেই পঈচ্ছত প্রশান্তি আমাকে আলিঙ্গন করে। ঘরের মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত উঁচু তাকে বই। চারদিকে বই। মাঝখানে পড়ার টেবিল, পিন পতনের শব্দ নেই কোথাও, দএু কজন মন দিয়ে পড়ছে। ইচ্ছে করে সারাদিন মন্দিরের মত পরিচ্ছত বইএর এই নিরুপদ্রব ঘরটিতে কাটিয়ে দিই। লাইব্রেরির সব বই যদি বাড়ি বয়ে এনে পড়ে ফেলা যেত আজই! সেদিনই সদস্য হয়ে দুহাতে যত বই ধরে, নিয়ে আসি। বইগুলো আমার হাত থেকে যেতে থাকে চন্দনার হাতে, চন্দনার হাত থেকে আবার আমার হাতে। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, শওকত ওসমান, হাসান আজিজুল হক শেষ হলে সতীনাথ ভাদুড়ি, নরেন মিত্র, জগদীশ গুপ্তে। ফেরত দিয়ে আরও বই। গোগ্রাসে পড়তে থাকি দুজন। যেন অতি শীঘ্র পাবলিক লাইব্রেরির বইগুলোর ওপর একটি জরুরি পরীক্ষা দিতে বসব।

 

পরীক্ষা সামনে। সাধুতে যদি হায়ার সেকেন্ডারি, চলতিতে ইন্টারমিডিয়েট, আর পুস্তকি বাংলায় উচ্চ মাধ্যমিক। দেবনাথ পণ্ডিত সপ্তাহে তিনদিনের বদলে পাঁচদিন আসতে শুরু করেন। তিনি তো পড়াতে আসেন না, আসেন কিলিয়ে আমাকে মানুষ বানাতে। বাবার মত দেবনাথ পণ্ডিতেরও চোখ যায় ছোটখাট কাগজপত্রে। কোনও এক পত্রমিতাকে লেখা শেষ না হওয়া চিঠি অঙ্ক বইয়ের ভেতর থেকে একদিন টুপ করে পড়ে। পড়ে যাওয়া চিঠিটি সরাতে গেলেই দেবনাথ পণ্ডিত খাবলা মেরে চিঠিটি নিয়ে নেন, আগাগোড়া পড়েন চিঠি, পড়ে শার্টের বুক পকেটে রেখে দেন। এ কি! তিনি ঠিক বাবার মতই আচরণ করছেন, এই চিঠির কারণে কি এখন উঠোনের খড়ি ভাঙবেন আমার পিঠে! খানিক পর পর তিনি নিজের বুক পকেটে হাত দিয়ে অনুভব করছেন আধলেখা চিঠির অস্তিত্ব, চিঠিটি কোথাও উড়ে না গিয়ে যে পকেটেই আছে, তা জেনে একধরণের আনন্দ হচ্ছিল দেবনাথ পণ্ডিতের। সেই আনন্দ জ্বালা ধরানো, পেচ্ছাব পাওয়া কিন্তু ঠিক পাওয়া নয়, লোমকপূ অনেকটা দাঁড়িয়ে যাওয়া, অনেকটা বসে যাওয়া, মাথা ঝিমঝিম করেও না করার আনন্দ। দেবনাথ পণ্ডিতের পড়ানো হয় না, ডানে বামে নড়েন, সামনে পেছনে নড়েন। মন উতলা। আমাকে যে অঙ্ক করতে দিলেন, তা সারা হল আমার, অঙ্কে কোনও ভুল নেই। হঠাৎ দশ আঙুলে পদার্থবিজ্ঞান বইটি আঁকড়ে ধরে, যেন বইটির পাখা আছে, আঙুল ঢিলে করলেই উড়ে যাবে, পাতা উল্টো কঠিন কঠিন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন, সেসবেরও, কার কপৃায় জানি না, সঠিক উত্তর দিই। রসায়নএও একই ভাগ্য আমার। এরপর অঙ্ক,রসায়ন পদার্থবিজ্ঞান বই তিনটে দুহাতে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে হঠাৎ কোনও কারণ ছাড়াই প্রচণ্ড এক ঘুসি মারলেন মাথায়, কপালের ডানে। কেন! না কোনও কারণ নেই। বললেন কাইল যে অঙ্কগুলা দিয়া গেসিলাম করতে, তা করছ না কেন!

করছি তো।

করছ তো দেহাও না কেন? মন কই থাহে?

এই মোক্ষম সুযোগ আধচিঠির শাস্তি দেওয়ার। আমি অঙ্কের খাতা সামনে মেলে ধরলাম। মেলে ধরার পরও পিঠে আচমকা একটি কিল। ফুসফুস ক্যাৎঁ করে ওঠে। মার্জিন রাইখা অঙ্ক করার কথা আর কত কইয়া দিতে হইব?

মার্জিন রেখে অঙ্ক করার কথা এই প্রথম বললেন তিনি। যা হোক। এবার আসল কথা পাড়লেন।

চিঠি কারে লিখছ?

কোন চিঠি?

এবার একটি চড় উড়ে এল গাল বরাবর।

কোন চিঠি যেন জানো না? এই চিঠি।

বুক পকেট থেকে বের করলেন অর্ধেক পাতায় লেখা চিঠিটি।

জুয়েল কেডা? কই থাকে? কী করে?

ঢাকায় থাকে। কী করে জানি না।

জানো না? আমার সাথে ফাতরামি কর?

ফাতরামি আমি দেবনাথ পণ্ডিতের সঙ্গে করতে যাব, এমন সাহস আমার নেই। দেবনাথ পণ্ডিত তাঁর বিশাল শরীর, বিশাল বপু কলাগাছের গায়ের মত বাহু, আর শক্ত সাগর কলার মত আঙুল সামনে নিয়ে বসে থাকেন, আর আমি যতটা সম্ভব মৃত তৃণের মত পড়ে থাকি তাঁর পায়ের কাছে। চিঠিটি ছিঁড়ে টুকরো করে আমার মুখের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে তিনি বেরিয়ে যান। দেবনাথ পণ্ডিতের কিল চড়, বাবার ধমক, মার ঘ্যানঘ্যান, ছোটদার নিরানন্দ, গীতার অভিমান, দাদার দাদাগিরি এসবের মধ্যে আমি একা বসে থাকি। মুখ গুঁজে রাখি বইয়ে। পরীক্ষা সামনে। পরীক্ষা সামনে তা জানি, কিন্তু ছোটদার বন্ধুরা বাড়িতে বেড়াতে আসে, জ্যোতির্ময় দত্তের ছেলে বাবুয়া দত্ত, তকবীর পত্রিকার সম্পাদকের ছেলে পলক ফেলা যায় না এমন সুদর্শন তফসির আহমেদ, লেডিকিলার বলে খ্যাত সাহেব কোয়ার্টারে থাকা ডিসির ছেলে সোহান, যাকেই দেখি তার প্রেমে পড়ে যাই মনে মনে, মনে মনে তার মনের কথা শুনি,কোথায় পাব কলসি কন্যা কোথায় পাব দড়ি, তুমি হও গহীন গাঙ, আমি ডুইবা মরি। অথচ আমার দিকে ফিরে তাকায় না কেউ, নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে কৎু সিত মেয়ে বলে মনে হতে থাকে।

চিত্রালী পুর্বাণী যেমন বন্ধ হয়, পত্রমিতাদের কাছে চিঠি লেখাও ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে। কেবল ভাল কিছু সুন্দর হাতের লেখার, কাব্যময় ভাষার চিঠিগুলোর উত্তর দিই। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র কামরুল হাসান সেলিম চিঠি লেখে আশ্চর্য সুন্দর, যেন আকাশপার থেকে স্বপ্নের কথা বলছে। বাছাইয়ে সেলিমকে রাখি, চিঠি লিখতে থাকি কোনওদিন সমুদ্র না দেখা মেয়ে সমুদ্রপার থেকে। যেন এ জগতের নয়, অন্য কোনও জগতে আমরা আপন দুজন মানুষ মুখোমুখি বসে স্বপ্নের কথা বলছি। ওই স্বপ্নের জগতে কোনও মানুষ নেই, ঘরবাড়ি নেই, কেবল আকাশ আর সমুদ্র, সমুদ্রের ধারে নানার রঙের ফুল, প্রজাপতি, আকাশ জুড়ে কেবল সপ্তবণর্ রং, তুলোর মত মেঘ আর লেজঅলা পাখি। এভাবেই চলতে পারত, কিন্তু একদিন হঠাৎ, হঠাৎই কলেজ গেটের কাছে এক দীর্ঘাঙ্গ যুবক এসে সামনে দাঁড়ায়, আমার মাথার চুল তেলে চোবানো, শক্ত করে বেণী গাথাঁ, নিশ্চিত শাকচুন্নির মত দেখতে লাগছে আমাকে। সামনে দাঁড়ানো দুজন ছেলের মধ্যে একজন সেলিম। কাছে এসে নিজের পরিচয় দেওয়ার পর ছিটকে সরে গিয়ে দ্রুত একটি রিক্সা নিয়ে ধুকপুক বুক নিয়ে বাড়ি ফিরি। সেলিম সেদিন ঢাকা ফিরে গিয়ে চিঠি লেখে ময়মনসিংহে তার এক বন্ধুর কাছে সে এসেছিল, আমার সঙ্গে একবার দেখা হলে মন্দ হয় না বলেই বন্ধুকে নিয়ে সে কলেজ গেটে দাঁড়িয়েছিল আমার অপেক্ষায়, কথা বলিনি বলে মন খারাপ করে ফিরে গিয়েছে। দেখা না করার কি আছে, শব্দের সাহসী মেয়েটি বুক ফুলিয়ে বলে দেয়, এসো দেখা হবে। কোথায় দেখা হবে? এ এক সমস্যা বটে। স্টেশন রোডের তাজমহল রেস্তোরাঁয় শহরের কবিকুল আড্ডা দেয়, অবশ্য কোনও মেয়ে ওখানে একা যায় না, প্রশ্ন ওঠে না, ওখানেই সেলিমের সঙ্গে আমার দেখা হবে জানিয়ে দিই। ছোটদা এক বিকেলে গীতা আর আমাকে নিয়ে সেই রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলেন। যেহেতু ছোটদার সঙ্গে মেয়েমানুষ আছে, আমাদের বসতে দেওয়া হয়েছিল পর্দার আড়ালে। মেয়েমানুষ এলে এরকমই নিয়ম, দূরে যাও,আড়ালে যাও। তাজমহলের লোকেরা উঁকি দিয়ে বারবারই দেখেছে আমাদের। সেলিম আমার চিঠি পেয়েই ময়মনসিংহে কবে কখন আসছে জানিয়ে চিঠি লিখল। দেখা হওয়ার দিন আমি সেজেগুজে চন্দনার জন্মদিনে যাচ্ছি বলে বেরিয়ে যাই। তাজমহলের দরজায় সেলিম দাঁড়িয়ে আছে। বুকের কাপঁুনি সমস্ত শক্তিবলে থামিয়ে আমি ঢুকি রেস্তোরাঁয়, পর্দার আড়ালে কেবিনে বসতে হয়। সেলিমের মুখোমুখি বসি যদিও, চা খাব বলে দুজনের জন্য দুটো চা চাই যদিও, তার চোখের দিকে আমার তাকানো হয় না, তার কয়েকটি প্রশ্নের উত্তরে কয়েকটি নীরবতা, হ্যাঁ, হুঁ, না, নেই আর দুএকটি ভাববাচ্যে বাক্য ছাড়া আর কিছু উচ্চাজ্ঞরত হয় না, কেবল মৌনতার সঙ্গেই বাচাল হয়ে উঠি। যদিও চিঠিতে তুমি লিখি, সামনে তুমি বলা, লক্ষ করি, অসম্ভব। ওই চা পর্যন্তই, চা শেষ হলে আমি উসখুশ করি। চা তো শেষ হল, এবার কি, এবার উঠে পড়া ছাড়া আর কি হতে পারে! জিভের ডগায় যাই শব্দটি আসে আর যায়। আমার কোনও এক চিঠিতে অহল্যা শব্দটি ছিল। সে কারণেই কি না জানি না, হঠাৎ একটি প্রশ্ন সেলিম করে অহল্যা শব্দের মানে কি জানো?

আমি রা করি না।

হেসে বলে, ন্যাংটো।

যে যাই শব্দটি আমার জিভের ডগায় আসে আর যায় করছিল, সেটি এবার এসে যায়।

আমি যাই বলে য়চ্ছন্দে চলে যাই। পেছনে হতভম্ব বসে থাকে সেলিম।

ছোটদা সেদিনই খবর নিয়ে এলেন,তুই নাকি তাজমহলে গেসিলি?

কে কইল তুমারে?

কোন বেডার সাথে নাকি বইয়া আলাপ করছস? শহরে রইটা গেছে খবর। সীমা ছাড়াইয়া যাইতাছস।

সীমা ছাড়িয়ে গেছি তা বুঝি। কিন্তু সীমা ছাড়ানো মেয়েটিকে একটি গণ্ডমূখর্ বলে মনে হয়। কেন সেলিমের সঙ্গে কথা বলতে পারেনি সে! রেস্তোরাঁ থেকে হঠাৎ চলে গিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছে? সে কি বোঝাতে চেয়েছে যে সে বাজে মেয়ে নয়, সে ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা দেয় না!বড় ভদ্র ঘরের মেয়ে, ভাল মেয়ে, তাই ছেলেপিলের সঙ্গ এড়িয়ে চলে! সেলিমের সঙ্গে নিতান্তই বসতে হয়েছে সে ঢাকা থেকে এতদূর এসেছে বলে, নয়ত এতদূর পা বাড়াত না! এই কী! নাকি ওই ন্যাংটো শব্দটি শুনে তার গা ঘিনঘিন করেছে! পরদিন দুটো টাকা খামে ভরে একটি চিঠি পাঠিয়ে দেয় সে সেলিমকে—আমি খুব দুঃখিত, চায়ের পয়সা মিটিয়ে আসতে ভুলে গিয়েছিলাম, এই নাও পয়সা। বোধহয় এ বোঝাতেই যে সে পরখাওয়ইয়্যা নয়! না হলে দুটো টাকা এমন কোনও টাকা নয় যে সেলিমের পকেট থেকে গেলে সেলিম সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে, আর তাকে ডাকে টাকা পাঠাতে হবে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায়!

দেখা হওয়ার পর সেলিমের চিঠিতে আকস্মিক ভাবে আবেগ বেড়ে ওঠে। সমুদ্রে আরও ঢেউ ওঠে। আমি পিছু হটছি, কারণ তার ঠোঁটকে ঠোঁট বলে মনে হয়নি, মনে হয়েছে আস্ত না হলেও আধখানা তন্দুরের রুটি। সেলিমকে লেখা কমিয়ে দিতে থাকি, একদিন সেলিমও লেখা বন্ধ করে দেয়। কোনও চিঠি নেই, নেই তো নেইই। অনেকদিন পর হঠাৎ সুইৎজারল্যান্ড থেকে লেখা একটি চিঠি পাই সেলিমের, যদি কোনওদিন পারি যেন জুরিখ যাই, পৃথিবীতে নাকি আশ্চর্য সুন্দর এক শহর জুরিখ। জুরিখ নামটি দেশবিদেশ-লুডুর কথা মনে করিয়ে দেয়। জুরিখ আসিলে জুরিখ হাসপাতাল দর্শনে যাইতে হইবে, পাঁচ না পড়িলে গুটি বাহির হইবে না, আমার গুটি প্রায়ই জুরিখ গিয়ে পৌছত, আর পাঁচ পড়ার অপেক্ষায় থাকত। চিঠি কেবল সেলিমকে নয়, অনেককেই কমিয়ে দিয়েছিলাম। তবে কমানোর আগে চিঠির ওপারের মানুষটিকে বরাবরই রাজপুত্র মনে হয়েছে, রূপে গুণে এক নম্বর মনে হয়েছে। হাতে গোনা কিছু পত্রমিতা তখনও আছে আমার,কারও সঙ্গে বন্ধুত্বের বাইরে কোনও সম্পর্কে গড়ে ওঠেনি। কেউ লাফ দিয়ে ময়মনসিংহে আমাকে দেখতে চলে আসার বায়না ধরে না। ওই তাদেরই একজনকে রাতের পড়া সেরে খাওয়া সেরে বাবার বিছানায় বুকের নিচে বালিশ দিয়ে শুয়ে,একটি শাদামাটা কেমন আছ ভাল আছি জাতীয় কিছু লিখতে লিখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দরজায় বাবার আসার শব্দ পেয়ে ঘুম- চোখে বাবার বিছানা ছেড়ে নিজের বিছানায় শরীরটিকে ছুঁড়ে দিই। চিঠি বাবার বিছানার ওপর ওভাবেই পড়েছিল। বাবা মধ্যরাতে আমাকে ঘুম থেকে টেনে তুলে মেঝেয় ধাক্কা দিয়ে ফেললেন। ফেলেই তাঁর জুতো খুলে পেটাতে শুরু করলেন, কেন পেটাচ্ছেন কী অন্যায় আমি করেছি তার কিছু আমাকে না জানিয়ে। আমার বোঝার ক্ষমতা নেই কী কারণে বাবা এমন উন্মাদ হয়েছেন। আমার অস্ফুট বাক্য কী করছি আমি, কী হইছে? হারিয়ে যায় বাবার তর্জনের তলে। আস্ত একটি দৈত্য হয়ে উঠলেন তিনি। চুলের মুঠি ধরে শূন্যে ছুঁড়ে মারলেন, উড়ে গিয়ে আবার বাটার শক্ত জুতো পিঠে, ঘাড়ে, মাথায়, বুকে, মুখে। বাবা পেটান আমাদের, ঘুমের মেয়েকে তুলে এভাবে মধ্যরাতে আগে কখনও পেটাননি। বাবাকে ফেরাতে গিয়েছিলেন মা, মাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে ফেলে দিয়ে আমাকে খামচে ধরেছেন আবার। হাতে পায়ে শক্তি ফুরোলে তিনি থেমেছেন। আমাকে মেঝে থেকে তুলে মানুষটার আন্দাজ বরাদ্দ কিচ্ছু যদি থাকত! মাথায় মারলে মাথা যে নষ্ট হইয়া যাইব তা জানে না। এইভাবে মারার চেয়ে একেকবারে মাইরা ফেলায় না কেন। মাইরা ফেললেই তো ঝামেলা যায় বলতে বলতে বিছানায় শুইয়ে দিলেন মা। সারারাত পাশে বসে ইস্ত্রির তলে কাপড় রেখে গরম করে করে আমার শরীরের নানা জায়গায় স্যাঁকা দেন। ঘুম চোখে ছিল না আমার, এক ফোঁটা জলও কিন্তু ছিল না। বিছানায় পড়ে থাকা আমার চিঠিটিই এসবের কারণ, ঠিক বুঝি। বাবা মেরে আমার চামড়া তুলে ফেলুন, আমার হাড়গোড় সব ভেঙে ফেলুন, তবু এতে আমার এই ধারণা মরে যায়না যে ছেলে মেয়েতে বন্ধুত্ব হয়, ছেলেদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কে বা প্রেমের সম্পর্কে ছাড়াও কেবল বন্ধুত্বের সম্পর্কে হতে পারে, মেয়েতে মেয়েতে অথবা ছেলেতে ছেলেতে যেমন হতে পারে।

আমার ঠিকানা এখন আর ছোটদার বন্ধুর কাগজকলমের দোকান নয়, পোস্ট বক্স নম্বর ছয়। তাঁর নিজের চিঠি কাগজকলমের দোকান থেকে মার যাচ্ছে আশংকা করে ছোটদা পোস্টাপিসে একটি বাক্স নিয়েছেন, ওটিই আমি আর ছোটদা ব্যবহার করতে শুরু করেছি। বিচিত্রা থেকে আমার কাছে ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বিভাগীয় সম্পাদকের চিঠি আসে। অনুরোধটি পুলকিত করে আমাকে কিন্তু বিজ্ঞাপনের পথ মাড়ানোর কোনওরকম ইচ্ছে আমার জাগে না। যদিও ভুলে থাকি বিজ্ঞাপনের জগত, জগতের আর লোকেরা আমাকে ভোলে না। আমি নেই, তবু আমাকে আছে করে রাখে বিজ্ঞাপনের পাতায়। নববর্ষের নামকরণের সময় হারিয়ে যাওয়া আমার জন্যও একটি নাম বরাদ্দ থাকে। কেউ নাম দেয় সুগন্ধী গোলাপ, কেউ দেয় গোলাপ তো নয়, গোলাপের কাঁটা। ঘণৃা এবং ভালবাসা দুটোতেই ওরা দোলায় আমাকে, যদিও ওদের কারও সঙ্গেই আমার ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আমার উল্লেখ না হলে অনেকের চলে না। বিস্তর চিঠি আসে আমার ঠিকানায়। বেশির ভাগই চিঠিতেই বন্ধুত্বের আহবান। কিছু অন্ধ অনুরাগীরও আবির্ভাব ঘটেছে। কলেজে আমার এক ক্লাস নিচে পড়া শাহিন প্রতিদিন ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আমার অপেক্ষায়। ফুলের সঙ্গে চিঠি, আমাকে সে দেবী বলে মানে। মেয়েটি বড় লাজুক, নতমুখে নতচোখে আমার সামনে এসে দাঁড়ায়, এক হৃদয় উষ্ণতা আর এক শরীর শৈত্য নিয়ে আমি নিশ্চপু , মেয়েটি কি জানে তার চেয়েও বেশি লজ্জাবতী তার দেবী! চট্ট গ্রাম থেকে পাহাড়ি কুমার নামে এক ধনকুবের চিঠি লেখে সুন্দর গোটা গোটা অক্ষরে, সগু ন্ধে ডোবানো নীলাভ কাগজে। চন্দনা সেদিন অবকাশে, পাহাড়ি কুমারের উপহারের প্যাকেটটি যেদিন দিয়ে যায় ডাকপিয়ন। আমরা দুজন মাঠে বসে গল্প করছিলাম, প্যাকেট আমাদের গল্প থামিয়ে দেয়। যেহেতু এটি প্যাকেট, যেহেতু এটি আমার হাতে দিয়ে আমার সই নিতে হবে, তাই ডাকপিয়ন আরোগ্য বিতানে না নিয়ে প্যাকেট বাড়িতে এনেছে। বড় প্যাকেটের ভেতরে ছোট প্যাকেট, ছোট প্যাকেটের ভেতর আরও ছোট প্যাকেট, সেই প্যাকেটের ভেতর আরেক, শেষ প্যাকেটের ভেতর থেকে প্রাণভ্রমরাটি বেরিয়ে আসতেই চন্দনা লাফিয়ে উঠে এক হাত দূরে ঝটিতি সরে গিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ফালা এইটা।

ফালাইতাম কেন? কি হইছে?

ফালা। ফালা। এক্ষুনি ফালা।

কি এইটা?

হারামজাদা কুত্তা বেডা পচা জিনিস পাডাইছে, ফালা।

কি ফেলব তা না বুঝে আমি বিমূঢ় বসে থাকি। কৌতূহল আমাকে এমন গিলে খায় যে জিনিসটির দিকে আমি না চাইলেও আমার হাত চায় যেতে। চন্দনা ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার হাত সরিয়ে নেয় জিনিসটি থেকে। জিনিস আমার হাত থেকে কোলে, কোল থেকে মুখ থুবড়ে পড়ে মাটিতে।

কি এইটা?

বোকা চোখদুটো একবার মাটির জিনিসে, আরেকবার চন্দনায়, চন্দনার বিবমিষায়। বুঝস না কি এইটা?

না তো!কি এইটা?

এইটা প্যান্টি। শিগরি ফালাইয়া দিয়া আয়।

দৌড়ে গিয়ে আবর্জনার স্তূপে প্যাকেটসহ উপহারটি ফেলে দিই। বিবমিষা আমার দিকেও হাঁটি হাঁটি পা পা করে আসতে থাকে। চন্দনা মাঠের কিনারে বসে সত্যি সত্যি উগলে আসা বমন ত্যাগ করে।

চন্দনার এমন হয়।কামনা বাসনা শ্রীমতী নামের পর্নো ম্যাগাজিনগুলো সম্পর্কে ও বলে, আরে শালা একদিন পড়ছিলাম, ঘেন্নায় বমি করলাম। তারপর বাংলা সাবান দিয়া হাত ধুইয়া আবার লাক্স সাবান দিয়া হাত ধুইলাম। খাওয়ার সময় মনে হইতাছিল পেটে না আবার ঢুইক্যা যায়। সেই হাতে আর কোনওদিন ওসব নোংরা জিনিস ওঠেনি। আমরা যে জীবনের স্বপ্ন দেখি, সে জীবনে ন্যাংটো হওয়া নেই। পুরুষের শরীর চন্দনার কাছে বড় কদাকার একটি জিনিস। তবে ভালবাসায় ভীষণ রকম বিশ্বাসী সে।

 

চন্দনা প্লেটোনিক লাভ এর কথা বলতে শুরু করেছে। জিজ্ঞেস করেছি, এইটা আবার কি?

এইটা হইল লাভ, ভালবাসা, যেই ভালবাসায় শয়তানি নাই, নোংরামি নাই।

চন্দনার উজ্জ্বল দুটি চোখে আমার মুগ্ধ দুটি চোখ।

০৭. সেঁজুতি

আমাকে হঠাৎ একা করে দিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর চন্দনা চলে গেল। চন্দনা তো আর গেল না, ওকে ঘাড় ধরে নিয়ে গেলেন ওর বাবা ডাক্তার সুব্রত চাকমা, পাঁচ ফুট দু ইঞ্চি, চন্দনাকে জন্ম দেবার পর দু দুটো ছেলে-বাচ্চার জন্ম দিয়ে স্বামীর আশা পূরণ করেছিলেন যে মলিনা সেই মলিনার মলিন স্বামী; কুমিল্লায়। কুমিল্লা যাওয়ার আগে দাদা আমাকে আর চন্দনাকে নিয়ে ঢাকা বোর্ড থেকে সার্টিফিকেট তুলতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সকালে যাওয়া বিকেলে ফেরা। মতিঝিলে টাই টুং চিনে রেস্তোরাঁয় দুপুরে আমাদের খাওয়াতে নিয়ে দাদা বললেন, কি চন্দনা, তোমরা চোখ কান খোলা রাখো না কেন?

কেন,কি দেখি নাই কি শুনি নাই?

একটা সুন্দরী মেয়ে দেখবা না আমার জন্য? কলেজে দুইটা বছর পড়লা!

আমরা ছেলেদের দিকে তাকাইয়াই সময় পাই না। মেয়েদের দিকে কখন তাকাবো! চন্দনা হেসে ফেলে। অনাত্মীয় পুরুষদের মধ্যে চন্দনা আমার দাদাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি য়চ্ছন্দ। চাকমা রাজা দেবাশীষের কথা মনে করে চুক চুক দুঃখ করে দাদা বলেন, যে ভুলটা তুমি করছ, পরে কিন্তু এর জন্য পস্তাইবা। একটা রাজারে পাত্তা দিলা না!

চন্দনা জোরে হেসে ওঠে।

দাদার দুঃখ শেষ হয় না। আমরা রাঙামাটিতে গেলে রাজার বাড়ির অতিথি হইয়া থাকতে পারতাম! এই সুযোগটা নষ্ট কইরা দিলা।

চন্দনা আবারও হাসে।

না জানি তোমার কপালে কোন ফকির আছে!

রাঙামাটির গল্প বলতে গিয়ে দেবাশীষের চেয়ে ও বেশি বলে চেরাগ আলীর কথা। রাঙামাটিতে এক দারোগা আছে, দারোগার নাম চেরাগ আলী, চেরাগ আলী বলেন, তিনি দিনেও জ্বলেন রাতেও জ্বলেন। চন্দনা খানিকপর গম্ভীর হয়ে বলে, তবে চেরাগ আলী ইদানিং কিছু কম জ্বলেন, কারণ তাঁর চাকরিটি চলে গেছে। যদিও অল্প সময় ঢাকায়, তবওু চন্দনা আর আমি ময়মনসিংহের চেনা পরিবেশ থেকে দূরে যেতে পেরে সুখের দোলনায় দুলি। কুমিল্লা যাওয়ার আগে বলেছিলাম চন্দনাকে, যাইস না, তুই গেলে বাঁচবাম কেমনে? চন্দনারও একই প্রশ্ন ছিল, আমাদের প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই কারও কাছে। সুব্রত চাকমাকে চন্দনা এমনও বলেছে সে ময়মনসিংহ ছেড়ে যাবে না, এখানে আমার সঙ্গে অবকাশে থেকে লেখাপড়া করবে।তিনি রাজি হননি। চন্দনার আধবোজা চোখ লাল হয়ে ছিল যাবার দিন। আমার কানে কানে বলেছে, দেখিস আমি পলাইয়া একদিন চইলা আইয়াম তর কাছে। আমরা দুইজন সারাজীবন একসাথে থাকবাম। কুমিল্লা থেকে দিনে দুটি তিনটি করে চিঠি লিখছে চন্দনা। লম্বা লম্বা চিঠি। প্রতিদিনের প্রতিটি ঘটনা, দুর্ঘটনা। প্রতিদিনের মন কেমন করা। প্রতিদিনের নিঃসঙ্গতা। প্রতিদিনের হাহাকার। বাড়ির কাছে কৃষ্ণচুড়া ফুটে লাল হয়ে আছে, গাছটির দিকে যখনই তাকায় ও, আমাকে মনে পড়ে। মনে পড়ে ফেলে যাওয়া জীবনের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কুঁড়ি, প্রতিটি ফুল। জীবনটি ওর আবার ফিরে পেতে ইচ্ছে করে। চন্দনার এই যাওয়াকে আমার যাওয়া বলে মনে হয় না। মনে হয় আবার ফিরে আসার জন্য গেছে সে। এ যাওয়া সারাজীবনের মত চলে যাওয়া নয়। আমাদের আবার দেখা হবে, আমরা আবার দুলব আনন্দ দোলনায়। আবার সেই নৌকোর গলুইয়ে বসে আমি আকাশের রং দেখব, আর ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলে চন্দনা বৈঠা বেয়ে চলে যাবে বহু দূরে, সীমানা পেরিয়ে। এমন একটি জগতে যেখানে কোনও পাপ নেই, পঙ্কিলতা নেই, হিংসা নেই, ঘণৃা নেই, নিষ্ঠুরতা নির্মমতা নেই, যেখানে কোনও অন্যায় নেই, বৈষম্য নেই,যেখানে কোনও রোগ নেই, শোক নেই, মৃত্যু নেই। যেখানে শুভ্রতার ঘ্রাণ নিতে নিতে সুন্দরের সঙ্গে বাস করব আমরা, ভালবাসা আমাদের চৌহদ্দি ছেড়ে কোথাও যাবে না। চন্দনা ভাল না লাগায় ভগু তে ভগু তে লেখে আমার ভাল লাগছে না, আমি যেন জাগতিক সবকিছুর ঊর্ধে। ভাল লাগা ভালবাসা এসব শব্দগুলো সব পুরোনো মনে হচ্ছে। আমি তোকে বোঝাতে পারছি না। কেবল মনে হচ্ছে আমি যেন আমাতে নেই। আজ সারাদিন মন খারাপ, সামান্য আঘাত লেগে মেহগিনি পাতাগুলো যখন ঝিরঝির ফুলের মত প্রশান্তির মত ঝরে পড়ে তখন ইচ্ছে করে কোনও জিনস জ্যাকেটের পিঠে মাথা রেখে হোন্ডায় চড়ে দূরে কোথাও বেড়াতে যাই। আমি জানি, কি নির্মম ভাবে জানি অথচ বলিনি কারও কাছে এসব আমার জন্য কেবল অলীক স্বপ্ন মাত্র। আমাকে আঘাত কর তুই, চোখে জল না থাকলে আমি ভাল থাকি না তো, কিছুতেই না, আসলে আমার কি হয়েছে আমি তোকে বলতে পারব না, তাহলে জেনে যাবে, সবাই জেনে যাবে। আমি কেবল ছটফট করছি, আকুল হয়ে মরছি অথচ কি জানিস পুরো ব্যাপারটা তুই জানবি না, নেভার, তুই আমার এত আপন, এত ঘনিষ্ঠ, হৃদয়ের এত কাছে থাকিস তুই, তবু বলা হবে না। হায়রে মন। এই মনটাই আমার শত্রু। সব যখন ঠিকঠাক চলে, ঠিক সে মুহূর্তেই আমি বদলে যাই। মন নামক এই পদার্থটি বিট্রে করে বসে আমার সঙ্গে। আমি ভাল নেই, একদম না, চিৎকার করতে ইচ্ছে হয়, একধরনের ঈর্ষায় হিংসেয় আমি ছিন্নভিন্ন হই অবিরত, অথচ বোঝাতে পারি না। বুঝতেও পারি না এই ঈর্ষা কার বিরুদ্ধে, এই দ্বন্দ ্ব কেন। তবে কি আমি আমার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চাই? আমি কি আমাকে আর ভালবাসি না? কি জানি .. যদি কোনও এক নীল চোখের গ্রীক যুবক, যদি কোনও এপোলো আমাকে ভালবাসার কথা বলত ..! আমার ভেতর সবকিছু ওলোট পালোট হয়ে যাচ্ছে। আমি আর কোনওকিছুতে আনন্দ পাই না। মনে পড়ে আসামী হাজিরের সদানন্দ কি এক অব্যক্ত যনণ্ত্রায় আর্তনাদ করত, মনে কর তেমন কোনও অব্যক্ত যন্ত্রণায় আমি আর্তনাদ করছি। এই একঘেয়ে জীবন আর ভাল লাগে না। তুই আমাকে মনোহর উত্তরণে নিয়ে যেতে পারবি? মন কাঁদে, তুই ফেলে এসেছিস কারে মন মনরে আমার, তাই জনম গেল শান্তি পেলি না রে মন মনরে আমার। বুঝতে পারিস কি বললাম? বুঝিস না? আমি তোকে কাছে পেতে চাইছি। আমি কেবল তোকেই চাই, কতকাল দেখিনি তোকে। এই সংসার এই মায়ার বন্ধন ছেড়ে চল ঘুরে বেড়াই বাউলের একতারা নিয়ে, তুই হবি বৈষ্ণব আমি বৈষ্ণবি, টুং টাং শব্দ তুলে আমরা গাইব দুজনেই, পাখি ছটফটাইয়া মরে, শিকল ছিঁড়িতে না পারে, খাঁচা ভাঙিতে না পারে, পাখি ছটফটাইয়া মরে। অথবা চোক্ষেরই নাম আরশিনগর, একদিন ক্ষইয়া যাবে, পোড়া চোখে যা দেখিলাম তাই রইয়া যাবে।

 

চন্দনাকে দীর্ঘ দীর্ঘ চিঠি লেখা ছাড়া ছাদে, ঘরের কোণে, বারান্দায়, মাঠের ঘাসে, ভোরের শিউলিতলায়, সেগুন গাছের ছায়ায় বসে একটি জিনিসই তখন হয়, কবিতা লেখা। দেশের বিভিন্ন শহর থেকে কবিতা পত্রিকা আসে আমার ঠিকানায়। পশ্চিমবঙ্গের নানা অঞ্চল থেকেও আসে কবিতার ছোট কাগজ। এগুলো এক ধরনের শেকলের মত, একটি থেকে আরেকটি, আরেকটি থেকে আরেকটি করে করে ব্যাপ্ত হতে থাকে। ছোট কবিতা পত্রিকায়, ঢাকার সাপ্তাহিক পত্রিকাতেও পাঠাই কবিতা। কোথাও না কোথাও ছাপা হতে থাকে কিছু না কিছু একদিন আমার ভাবনার পুকুরে ঢিল পড়ে, কোত্থেকে পড়ে, কি করে পড়ে কিছু না জেনে আমি পুকুর পাড়ে নিস্পন্দ বসে থাকি। পুকুরের ছোট ছোট ঢেউ ক্রমে বড় হতে হতে পায়ে আছড়ে পড়ে, আমার শরীর ভিজতে থাকে জলে। আমি তবু নিস্পন্দ বসে থাকি। নিস্পন্দ আমাকে দেখতে লাগে, ভেতরে আমার উঁকি দিচ্ছে একটি ইচ্ছের অঙ্কুর। আমি তো চেষ্টা করলে নিজেই একটি কবিতা পত্রিকা বের করতে পারি। পারি না কি? পারি। মন বলে পারি। ডলি পালের বাড়ি থেকে ভেসে আসা উলুধ্বনির শব্দ আমাকে সচকিত করে। দশদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। কী নাম দেব পত্রিকার? কী দেব নাম? আমাকে দুদিন কিংবা তিনদিন ভাবতে হয় না। মন বলে, সেঁজুতি! হ্যাঁ সেঁজুতিই। সন্ধ্যাপ্রদীপ। চন্দনার কাছে চাওয়ামাত্র কবিতা পাঠিয়ে দেয়, ইশকুল শেষ হওয়ার পরও বাংলার শিক্ষিকা সুরাইয়া বেগম আমাকে নিয়মিত চিঠি লিখতেন, তাঁকে দিয়ে নতুন একটি কবিতা লিখিয়ে নিই আর ছোটদাকে বলে শহরের কিছু কবির কবিতা আনিয়ে শখের বশে সুখের ঘোরে পাণ্ডুলিপি তৈরি করে ফেলি সেঁজুতির, কিছু টুকরো খবর শেষের পাতায়, সাহিত্যের সাহিত্যিকের, সাহিত্যের কোন ছোট পত্রিকা কোত্থেকে কারা বের করেছে, কেমন হয়েছে ভাল না মন্দ, মন্দ হলে কেন ভাল হলে তাই বা কেন, এসব। দাদা বললেন আমার একটা কবিতা ছাপা। তাঁর কবিতার খাতা থেকে সবচেয়ে ভাল কবিতাটি নিই। আমার খবরটাও লেইখা দে। লেইখা দে পাতা পত্রিকার সম্পাদক ফয়জুল কবীর নোমানএর প্রথম কবিতার বই পারাপার শিগরি বেরোচ্ছে। তাও লিখে দিই। দাদা খুশি। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাজানোর সময় হয়ে এল, কে টাকা দেবে, কে প্রেসে যাবে, কে ছেপে আনবে সেঁজুতি! পারাপার নামে দাদা কোনও বই লেখা শুরুই করেননি, তবু তাঁর অনুরোধে খবরটি দেবার কারণেই সম্ভবত তিনি বললেন ঠিক আছে যা, আমি তর এই সেঁজুতি ছাপার খরচ দিয়াম নে। প্রেসের সবাইরে তো আমি চিনি, পাতা পত্রিকা ছাপানোর কারণে। দাদার কানের কাছে পিনপিন করে বেজেই চলল আমার গানা ও দাদা, ও দাদা, তুমি তো কইছ ছাপাইয়া দিবা, দেও।

ধৈর্য ধর। ধৈর্য ধর।
ধৈর্য আর কত ধরাম?
আরও ধৈর্য ধর। আরও।
কতদিন?
আরও কিছুদিন।

ধৈর্য ধরা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। দিন দিন অস্থির হতে থাকি। শেষ অবদি ছোটদার হাতে পাণ্ডুলিপি দিই। ছোটবাজারের একটি ছাপাখানায় সেঁজুতি দিয়ে আসার পর ছোটদার লেজে লেগে থাকি, কবে ছাপা হবে? ছাপার দেরি আছে। কত দেরি? সামনের মাসে ছাপা হইব। উফ এত দেরি! প্রেসের কি আর কাজ নাই নাকি?

আমারে একদিন নিয়া যাইবা ছাপাখানায়? তুই যাইতি কেন? আমিই ছাপাইয়া নিয়া আসব।

ছাপাখানায় যাওয়ার ইচ্ছেজ্ঞটর গলা ধরে দাদা ধাক্কা দেন, প্রেসে যাইবি কেন?

কেমনে ছাপায় দেখতে ইচ্ছা করতাছে।

মেয়েরা প্রেসে যায় না।

কেন যায় না?

যায় না।

কোনও কারণ আছে?

মেয়েদের প্রেসে যাইতে হয় না।

কেন হয় না? গেলে কি হয়?

অসুবিধা হয়।

কি অসুবিধা? মাইনষে চাক্কাইব?

চাক্কাইব না হয়ত, কিন্তু হাসব।

হাসব কেন? হাসির কি আছে? আমি সম্পাদনা করতাছি পত্রিকা, আমি কেন প্রেসে যাব না?

সম্পাদনা ঘরে বইয়া করা যায়। পুরুষমানুষের মত প্রেসে দৌড়ানোর দরকার নাই। দাদা আমার উৎসাহ নিবৃত্ত করতে পারেন না। ছোটদার সঙ্গে প্রেসে আমি যাই যে করেই হোক যাই। কালো কালো কাত করা ঘরকাটা বড় টেবিল মত, তার সামনে বসে লোকেরা এক একটি ঘর থেকে এক একটি ক্ষুদ্র বণর্ নিয়ে লোহার পাতে রাখছে। তুমি লিখতে গিয়ে, ত এর ঘর থেকে ত তুলে,ুর ঘর থেকেু তারপর একটি িনিয়ে তার পাশে ম বসাচ্ছে। এক তুমিতেই চারবার হাত বাড়াতে হয়। কি করে লোকেরা জানে কোন ঘরে ত আছে, কোন ঘরে ম, কি করে হাতগুলো এত দ্রুত সঞ্চালিত হয়! ইচ্ছে করে সারাদিন বসে প্রেসের কাজ দেখি, দেখি কি করে অক্ষর জুড়ে শব্দ বানায় ওরা। ছাপার মেশিনটি ঘড়ঘড় শব্দে ছেপে যাচ্ছে বিড়ির কাগজ, আগরবাতির কাগজ, মলমের কৌটোর কাগজ,বিয়ের কাডর্, রাজনৈতিক পোস্টার। সেঁজুতির পাণ্ডুলিপি দেখে প্রেসের মালিক হরে কৃষ্ণ সাহা অন্যরকম কিছুর স্বাদ পেয়ে অন্যরকম হাসি হাসলেন। ছেপে দেবেন শীঘ্র বললেন। প্রতি ফর্মা দুশ টাকা। কেবল দুশ টাকাই কি! আছে কাগজ কেনার টাকা। বাড়ি ফিরে শিশিবোতলকাগজঅলার কাছে বাড়িতে আস্ত অনাস্ত যত কাগজ আছে, পুরোনো চিত্রালী পূর্বাণী রোদে শুকিয়ে উই ঝেড়ে, পুরোনো রোববার সন্ধানী বিচিত্রার মায়া কাটিয়ে বিক্রি করে টাকা জমা করি। মার আঁচলের খুঁট থেকেও কিছু অর্জন হয়। এদিক ওদিক থেকে আরও কিছু যক্ষের ধন মুঠো করে ছোটদাকে সঙ্গে নিয়ে হরে কৃষ্ণ সাহার ছাপাখানার পাশেই কাগজের দোকান থেকে পছন্দ করে কাগজ কিনে দিয়ে আসি ছাপাখানায়। এরপর বাড়িতে ছোটদা প্রুফ নিয়ে এসে প্রুফ কি করে দেখতে হয় শিখিয়ে দেন। নিজে তিনি পত্রিকায় কাজ করেন, জানেন। ছাপার টাকার জন্য দাদার ওপর ভরসা করি, একবারে টাকা পাওয়া না গেলেও কিস্তিতে কিস্তিতে টাকা মেলে।

যেদিন হলুদ রঙের পাঁচশ সেঁজুতি ছাপা হয়ে বাড়িতে এল, সেঁজুতির রূপ রস গন্ধ সব গ্রহণ করার পর বিছানায় বসে সেজুঁতির পাতা ভাঁজ করে করে পিন আটকে আলাদা করে রাখছিলাম, বাবার বাড়ি ঢোকার শব্দ শুনে চালান করে দিই সব খাটের নিচে। খাটের নিচেও চোখ যায় বাবার। বাবার চোখ, ইয়াসমিন বলে, শকুনের। কারও সাধ্য নেই কিছু লুকিয়ে রাখে। বাড়িতে কি হচ্ছে না হচ্ছে, তা তিনি বেশির ভাগ সময় বাড়ি না থেকেও জানেন। কে যে কখন বাবার দূত হয়ে কাজ করে, অসম্ভব অনুমান করা। মাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি ওইসব, লেখাপড়া রাইখা করে কি মেয়ে?

মা নিস্পৃহ কণ্ঠে বলেন, কি জানি কি কবিতার পত্রিকা ছাপাইছে।

কবিতার পত্রিকা আবার কি?

কবিতা লেখে। পত্রিকা ছাপায়।

কবিতার পত্রিকা দিয়া কি হইব? তারে না কইছি লেখাপড়া করতে? মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করাইব কেডা ওরে? কবিতা দিয়া পাশ হইব?

মার ওপর ধকল যায়।

টাকা পাইল কই? বাবার কৌতূহল উপচে ওঠে।

মা নীরস মুখে বলেন, নোমান দিছে।

নোমান দিছে কেন?

চাইছে। দিছে।

চাইলেই দিতে হইব নাকি?

ছোট বোন শখ করছে তাই দিছে।

নোমানের লাভ কি?

লাভ কি সবাই খুঁজে? ভাল লাগে বইলা কবিতা লেখে। নোমানও তো কবিতার পত্রিকা ছাপত। এহন নাসরিন ধরছে।

আমি যে দিনরাইত খাইটা আইনা তাদেরে খাওয়াই, তা কি এইসব আজে বাজে কাজ কইরা সময় নষ্ট করার লাইগা?

মা বলেন,আমারে জিগান কেন? মেয়েরে গিয়া জিগান।

বাবা আমার কাছে কিছু জিজ্ঞেস করতে আসেন না। দাদাকে ধরেন, ওরে যে উস্কাইতাছস, ও পাগল হইছে বইলা কি তুইও পাগল হইছস?

দাদা মিনমিন করেন, ওরে তো উস্কাই নাই আমি।

টাকা দিছস কেন?

বেশি দেই নাই ত।

দিছস ত। তুই টাকা না দিলে এইগুলা কি করতে পারত ও?

দাদা গবের্ ফুলে বলেন, না।

কবিতা লেইখা কি হয় জীবনে? কিছু হয়?

না।

তাইলে লেখে কেন?

এমনি।

কবিতা ভাত দেয়?

দাদা মাথা নাড়েন, ভাত দেয় না।

কাপড় দেয়?

দেয় না।

১০৪

বাড়ি দেয়?

না।

ইলেকট্রিসিটি দেয়?

না।

দাদা নতমুখে নরম স্বরে উত্তর দিতে থাকেন।

শহরে ঘুইরা ঘুইরা মাইনষের জীবন ত দেখছস। কেউ কি আছে কবিতা লেইখা বাড়ি বানাইছে?

না।

কোনও ভদ্রলোকে ফালতু কাজে সময় নষ্ট করে?

না।

পাগল ছাড়া আর কেউ কি কবিতা লেখে?

দাদা এবার আর কোনও উত্তর দেন না। বাবা আরও দুবার প্রশ্নটি করে দাদাকে ওভাবেই নিরুত্তর রেখে জুতোর মচমচ শব্দ তুলে বেরিয়ে যান।

 

বাবা মুখে তালা দিয়েছেন। বাড়ির সবার সঙ্গে কথা বলবেন, আমার সঙ্গে নয়। বাবা কথা না বলা মানে টাকা পয়সা দেওয়া বন্ধ করা। আমার এখন কলেজও নেই যে কলেজে যাওয়ার রিক্সাভাড়ার দরকার হবে, একরকম স্বস্তিই পাই বাবার রক্তচোখ আর দাঁত কটমট আর গালিগালাজ আর পড়তে বসার আদেশের সামনে পড়তে হবে না বলে। বাবার স্বভাবই এমন, হঠাৎ হঠাৎ কথা বন্ধ করে দেন। দীর্ঘ দীর্ঘ দিন এভাবেই চলতে থাকে। বাড়িতে এক কাজের মানুষ ছাড়া আর সবার সঙ্গেই তিনি দফায় দফায় কথা বন্ধ করেছেন। যখন কথা বলা ফের শুরু হয়, তিনি নিজে থেকেই কথা বলতে শুরু করেন বলে হয়। মুখের তালা তিনি যখন ইচ্ছে খোলেন যখন ইচ্ছে লাগান, চাবি তাঁর বুক পকেটে। অনেক সময় এমনও হয় যে বাবা কার সঙ্গে কি কারণে কথা বন্ধ করেছেন, সে কারণ খুঁজে পাওয়া আমাদের সবার জন্য শক্ত হয়ে দাঁড়ায়।এবার আমার সঙ্গে কথা বন্ধ করার কারণটি হল সেঁজুতি। মুখে তালা দেওয়ার সপ্তাহ পার না হতেই আমার উদ্দেশে তিনি পত্র পাঠাতে শুরু করলেন। মখু বুজেই তিনি মুখের শব্দগুলো পত্রাকারে, সাধুকে চলিতের সঙ্গে গুলে পাঠাতে লাগলেন। পত্রবাহক আরোগ্যবিতানের কর্মচারি সালাম। সালামকে মা সালামের পুরো নাম ধরেই ডাকেন। সালাম হল আল্লাহর নিরানব্বইটি নামের একটি নাম। সরাসরি আল্লাহর নামে কাউকে ডাকতে হয় না, আবদুস বা আবদুল জুড়ে দিলে নামের অর্থ দাঁড়ায় আল্লাহর গোলাম। যেহেতু মানুষ মাত্রই আল্লাহর গোলাম, মা তাই সালামকে আবদুস সালাম অর্থাৎ আল্লার গোলাম বলেই ডাকেন। কুদ্দুস নামে মার এক পাড়াতুতো ভাই আছে, সবাই ওকে কুদ্দুস ডাকে, মা ডাকেন আবদুল কুদ্দুস। আবদুস সালাম আমার হাতে পত্র দিয়ে যাওয়ার পর মা আমাকে পড়ে শোনাতে বলেন প্রতিটি পত্রই। আমি জোরে পড়ি, কেবল মা নন, বাড়ির আর সবাই শোনে। দশ বারো পৃষ্ঠার পত্র, পিতার আদেশ নিষেধ মানার ফজিলত বর্ণনা করে পত্রের শুরু, চরম হতাশা আর হাহাকার দিয়ে পত্র শেষ, মাঝখানে নীতিবাক্যের নহর। শেষ বাক্যটি যথারীতি ইতি তোমার হতভাগ্য পিতা। পত্র আমি পড়ি ঠিকই, তবে ভর্তি পরীক্ষার জন্য বইয়ের ওপর উপুড় হয়ে থাকার কোনও চেষ্টাই করি না। করি না কারণ ইচ্ছে করে না। বাবা যে লেখাপড়ার কথা বলেন, সেটা না হলেও অন্য ধরণের লেখা আর পড়ায় আমি দিবস রজনী কাটাতে থাকি।

কবিদের ঠিকানায় আর বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনের ঠিকানায় সেঁজুতি পাঠাবার কিছুদিন পর থেকেই প্রচুর চিঠি আসতে থাকে, চিঠির সঙ্গে কবিতা। কবিতা পড়, শুদ্ধ কর, পরের সংখ্যায় ছাপার জন্য তুলে রাখো। সেঁজুতিকে করেছি ষৈনমাসিক। কিন্তু ইচ্ছে করে কালই ছেপে ফেলি। দীর্ঘ তিনটে মাসের অপেক্ষা সহ্য হয় না। চিঠি আসে এত, বাবা আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে মাকে বলেন,যত্র তত্র পত্রমিতালি কি ও বন্ধ করে নাই এখনো? যত্র তত্র পত্রমিতালি বন্ধ হয় বটে, যত্র তত্র কবিতা লেখা বন্ধ হয় না, ও চলে। বারান্দার টেবিলে পড়ে থাকা একটি সেঁজুতি তিনি একদিন আলগোছে সরিয়ে নেন। দুপুরে খাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে শুয়ে পড়েন সেঁজুতির সবগুলো কবিতা। পড়া হলে সেটি পকেটে নিয়েই বাইরে যান। কি হতে যাচ্ছে ঘটনা তা আঁচ করা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। রাতে তিনি মাকে নিজের ঘরে ডেকে পাশে বসিয়ে সেঁজুতি থেকে একটি কবিতা শুনিয়ে বলেন, দেখ এইখানে কবি বলতাছে কাগজ হইল মাটি, কলম হইল কোদাল, আর কবিতা লেখা হইল নিজের কবর খোঁড়া। ঠিক কইছে না? কবিরা নিজেরা খোঁড়ে নিজের কবর, এই কথা তো এক কবিই কইল।

পত্রের কোনও প্রত্যুত্তর বাবা পান না। তিনি মখু কালো করে বাড়ি ফেরেন, মখু কালো করেই বেরিয়ে যান। আমার লম্বা ফর্সা কোঁকড়া চুলের উত্তম কুমার-বাবা-র পেটে কত ধমক,কত খিস্তি জমা হয়ে আছে, ছিটকে বেরোতে চায়, কিন্তু তিনি ওসব নীতি-চাপা দিয়ে রাখেন। নৈঃশব্দ তাঁর অনেক নীতির এক নীতি কি না! পত্রাঘাতে আমি হেলে পড়ছি না বলে তিনি যে কাজটি করেন এরপর, সেটি অভিনব। তাঁর ঘরের দরজায় একটি কাগজ সেঁটে তিনি লিখেছেন,

আমি আর সহিতে পারছি না এত অন্যায়,
এই কি ছিল আমার কপালে হায়!
ছেলেমেয়েরা গেছে উচ্ছন্নে,
কাঁদিয়া মরি আমি মনে মনে।

লেখাটি পড়ে বাবার ঘরের লাল নীল জানালার লাল কাচে ভাতের আঠায় একটি কাগজ সেঁটে দিয়ে আসি, কাগজে লেখা,

কী আবার অন্যায় করলাম হঠাৎ
আমার তো কাটে দিন আর রাত
অবকাশে বসে, যাই না কোথাও,
বাড়াই না দরজার বাইরে এক পা ও।

বাবা বাড়ি ফিরলে আমি গুটিয়ে রাখি নিজেকে ঘরের ভেতর। প্রতিক্রিয়ার জন্য কান পেতে রেখেও কোনও লাভ হয়নি। বাবা নিঃশব্দে এসে নিঃশব্দে চলে গেছেন। চলে যাওয়ার পর জানালার কাগজের অবস্থাটি দেখতে গিয়ে দেখি ওই কাগজের পাশে আরেকটি কাগজ সাঁটা, ওতে লেখা

বাইরে না গেলেই কি সাধু হওয়া যায়!
এই লোক ঠিকই খবর পায়!
অবকাশে কি কি হয়।
শখ করে করা হচ্ছে জীবনের ক্ষয়।
নাই কোনও ভয়
যত্রতত্র পত্রমিতালি করে কেউ হয়না বড়,
লেখাপড়া না করলে জীবনের খুঁটি হয় নড়বড়।

বাবার লেখা পড়ে আবার কাগজে বড় বড় করে লিখি, লেখার সময় আমার মাথার পাশ থেকে ইয়াসমিনের মাথাটি কিছুতে সরে না।

তা তো জানি, তাকি আর জানি না !
তবে একটা জিনিস আমি মানি না
যে, কিলিয়ে কাউকে মানুষ করা যায়।
বাবারা কি এতে খুব সখু পায়,
কন্যারা যখন কেঁদে বুক ভাসায়!

বাবা সন্ধের মধ্যেই ফিরে এলেন, এসেই ঘরে ঢুকে ঘন্টা খানিক কারুকে ডাকাডাকি না করে কাটিয়ে, বেরিয়ে মার কাছে এক গেলাস পানি চেয়ে খেয়ে, বাড়িতে আনাজপাতি কিছু লাগবে কি না জিজ্ঞেস করে চলে গেলেন। ঘরে কেঁচো হয়ে বসে ছিলাম। বুক ধড়ফড় করে, এই খোলা পদ্যের গোলা শেষ অবদি কতটা বিস্ফোরক হবে কে জানে! বাবা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেঁচো কেটে বের করি কিংশুক।

বাবা লিখে গেছেন, এবার জানালার বেগুনি কাচে।

মরমে গিয়া আঘাত করিল আত্মজার ক্রন্দন
পিতাই শুধু বোঝে কন্যার সহিত কতখানি তার আত্মার বন্ধন।
পিতা আজ আছে, কাল যাবে মরে
তাইতো কন্যাকে সে দিতে চায় ভরে
শিক্ষা দীক্ষা আর দেখাইতে চায় সত্যের পথ
যে পথে চললে সকলে ভাল বলে, এই তো পিতার মত।

এই কথোপকথন আমাকে ভীষণ উৎসাহিত করে। বাড়ির সবাই এসে জানালার কাচে সাঁটা পদ্য পড়ে যায়। দাদার দেওয়া লাল ডায়রিতে কবিতা লেখা বাদ দিয়ে জানালায় সাঁটা এই পদ্য পদ্য খেলায় আমি মেতে উঠি।

রবীন্দ্রনাথ পড়ে কি কোনও সত্য যায় না পাওয়া?
কাজী নজরুলকে কার সাধ্য আছে করে হাওয়া!
আর সুকান্ত সে তো দুর্দান্ত।
কবিতা মানে কি মিথ্যের পথ?
যদি হয়, তবে এই দিচ্ছি নাকে খত
ওপথ মাড়াবো না,
কারো দুঃখ বাড়াবো না।
আমি অতি তুচ্ছ ক্ষুদ্র প্রাণী,
কেবল এইটুকু জানি
আমার কোনও তৃষ্ণা নেই মণি মুক্তা মালার,
একটু শুধু তাগিদ আছে সন্ধ্যাদীপ জ্বালার।

এক জানালা শেষ হলে আরেক জানালায় সাঁটা হচ্ছে। এটি পড়ে মা বললেন, আমি তুচ্ছ ক্ষুদ্র প্রাণীডা কাইট্টা দে।

কাইট্টা দিলে কি দিয়া মিলাবো?

লেইখা দে, আমি যথেষ্ট বুদ্ধিমান প্রাণী।

কাটা হয় না, কারণ বাবার পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। বাবা আজকাল ঘন ঘন বাড়িতে ঢুঁ মারেন। পেচ্ছাব পায়খানা তো আছেই, এক গেলাস পানি খেতেও নতুন বাজার থেকে আমলাপাড়া পাড়ি দেন। উদ্দেশ্য অবশ্য কবিতা। কখনও এমন হয়েছে তিনি লিখে যাওয়ার আধঘন্টার মধ্যেই খামোকা ফিরে এলেন বাড়ি। ঘরের জানালা দরজায় নতুন কিছু সাঁটা হয়েছে কি না দেখে যান। কারণ ছাড়াই আমার ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আড়চোখে দেখেন আছি কি না। চোখাচোখি হয় না, ও জিনিসটি তিনিও এড়িয়ে চলেন, আমিও। কথা বন্ধের কালে দৃষ্টিও সংযত করার নিয়ম, এ নিয়ম বাবারই শেখানো।

রবিবাবু কবিতা লিখেছেন নির্ভাবনায় জমিদারদেরই এইসব মানায়। ছাত্রজীবনে কবিতা কি শোভা পায়? এই হতভাগা বড় কষ্টে সংসার চালায় এত কষ্টের ফল কি সে পায়? পিতার কথা কি তারা এতটুকু ভাবে? আমি তো দেখি না কোনো সম্মান হাবে ভাবে। কত বলি হইতে মানুষের মত মানুষ তবওু দেখি না তাহাদের কোনও হুঁশ। সময় গেলে সময় নাহি আসে পিতা মরে গেলে কেউ আর নাই পাশে। ছাত্রজীবনে অবসর বলে কিছু নাই এই কথা আমি বারবার বলি, আবারও বলে যাই হেলাফেলা করিলে জীবনটি হবে নষ্ট দেখে আর কেউ নয়, পিতাই পাইবে কষ্ট।

বাবা এই পদ্যটি লিখতে সময় নিয়েছেন বেশ। সালামকে খুঁচিয়ে খবর জোটে, বাবা কাগজ কলম নিয়ে আজকাল আরোগ্য বিতানে বসে মাথা চুলকোন। রোগী বসে থাকে অপেক্ষা-ঘরে। তিনি চুলকোচ্ছেন, লিখছেন, ফেলছেন, আবার নতুন করে লিখছেন। পরে বেরিয়ে এসে রোগীদের আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলে তিনি বাড়ি থেকে ঘুরে যান। ঘুরে যাওয়া মানে জানালায় পদ্য সেঁটে যাওয়া।

এ পদ্যটি পড়ে মা বলেন, হুঃ! এই সংসার চালাইতে কষ্ট হয় নাকি কোনও? সাতদিনে একদিন বাজার করে। হেই বেডির বাড়িত ত প্রত্যেকদিন মাছ মাংস যায়। টাকা ত আর কম কামায় না। তোদেরে কি দেয়? শখের একটা জিনিস দিছে কোনওদিন?

মার প্রেরণায় লিখি কি হয় এমন খরচ সংসারে! কাটাই তো অনেকটা অনাহারে। ঈদ এলে জামা পাই, সব ঈদেও জোটে না মনে কত কথা জমা, মুখে কিছু ফোটে না। চারিদিকে মেয়েরা কথা বলে চুটিয়ে আমরাই এ বাড়িতে ভয়ে থাকি গুটিয়ে। মনে তবু আশা থাকে লুকিয়ে, বাবার আদর পেলে ভুলগুলো চুকিয়ে বড় হব এত বড় আকাশ নাগাল পাবো দিগন্তের ওইপারে একদিন হারাবো।

পদ্যটি পড়ে মা বলেন হারানোর কথা লেখছস কেন? দাদা শব্দ করে পড়ে বলেন, সুন্দর হইছে। বাবা এরপর আর কিছু লেখেন না। পদ্যের জীবন আর সত্যিকার জীবনে যে অনেক পার্থক্য তা একদিন বাবার নাসরিন ডাকের চিৎকারে অনুভূত হয়। বাবার সামনে আগের সেই নতমখু নতচোখ দাঁড়াই। তিনি আগের মতই দাঁত খিঁচিয়ে বলেন, কি করা হইতাছে?

আমি নিরুত্তর।

সারাদিন আড্ডা মাইরা জীবন চলবে?

নিরুত্তর।

কোনও মেডিকেলে তর মত গাধার পক্ষে যে পাশ করা সম্ভব না, এইডা বুঝা যাইতাছে না?

নিরুত্তর।

কবিতা লেখস? কবিতা কি একলা তুইই লেখতে পারস? সবাই লেখতে পারে। কামের ছেড়ি মালেকারে জিজ্ঞাসা কর, সেও পারবে লেখতে।

গাধা থেকে শব্দ বেরোয়, মালেকা তো লিখতে জানে না।

না জানুক, মুখে ত কইতে পারব। লালন ফকির মুখে মুখে কবিতা বলে নাই? হাছন রাজা বলে নাই?

নিরুত্তর।

আমি শেষ ওয়ারনিং দিয়া দিলাম, মেডিকেলে ভর্তি হইতে না পারলে বাড়িত তর ভাত বন্ধ। খবর রাখছ কবে ঢাকা ইউনির্ভাসিটির ভর্তি পরীক্ষা শুরু হইব?

নিরুত্তর।

আর্কিটেকচারে ভর্তি পরীক্ষা সামনের মাসে। ঢাকায় গিয়া পরীক্ষা দিতে হইব। এক্ষুনি অঙ্ক করতে ব। পরীক্ষায় পাশ না করলে কপালে কি আছে তা নিজে বুঝতে চেষ্টা কর।

বাবার উপদেশবাণী নীরবে হজম করে আমি নতমস্তকে তাঁর কক্ষ থেকে বেরিয়ে অঙ্ক নয়, আনন্দ উৎসব শুরু করি। ঢাকা যাওয়ার আনন্দ।

ঝিককির ঝিককির ময়মনসিং, ঢাকা যাইতে কত্তদিন ! ঢাকা যাইতে কত্তদিন, ঝিককির ঝিককির ময়মনসিং। ঢাকা যাইতে সাতদিন, ঝিককির ঝিককির ময়মনসিং!

আর্কিটেকচারে ভর্তি পরীক্ষা দিতে তিনি নিজ মুখে বলেছেন, এর চেয়ে বেশি আমি আর কি চাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় ভর্তি হওয়ার কথা বললে তিনি হয়ত ঢাকা যাওয়ার এই সুযোগ থেকেও আমাকে বঞ্চিত করবেন। আর্কিটেকচারে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পাঠাতে বাবা রাজি হতেন না যদি না এম এ কাহহারের পুত্রধন ফরহাদের মুখে শুনতেন আর্কিটেকচার ভাল সাবজেক্ট। ফরহাদ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বষের্ দীর্ঘ বছর বসে আছেন, পরীক্ষা এলেই তাঁর খুব বমি আর পাতলা পায়খানা শুরু হয়। প্রতি বছর পরীক্ষার আগে আগে ডাক্তার এসে ওষধু দিয়ে যান। পরীক্ষা দেওয়া হয় তাঁর, কিন্তু পাশ হয় না কখনও। না হলেও তাঁর কথার তো মূল্য আছে। স্থাপত্যশিল্প ভাল বিষয়, কেবল ভাল বিষয় নয়, ফরহাদ জোর দিয়ে বলেছেন, ডাক্তারির চেয়ে ভাল। যুক্তি দেখিয়েছেন, ডাক্তার মেয়েকে এক ডাক্তার ছেলে ছাড়া আর কেউ বিয়ে করে না, মেয়েদের ডাক্তারি পড়ার মুশকিল হল এই। ফরহাদ যে যুক্তিই দিন না কেন, কোনও যুক্তি বাবার কাছে টেকে না, বাবা কিছুতেই বিশ্বাস করেন না ডাক্তারির চেয়ে ভাল বিষয় পৃথিবীতে আর কিছু আছে, সে মেয়ের জন্য হোক কি ছেলের জন্য হোক, কী কুকুর বেড়াল কীটপতঙ্গের জন্যই হোক। হাত পা নেড়ে ফরহাদ দাদাকে বলে গেছেন, আরে মিয়া ঘরে বইসা কাজ করা যায়, বাইরেও যাইতে হয় না। একটা বড়লোকের বাড়ির ডিজাইন কইরা দিবা, ধর একটা গভমেণ্টের বিল্ডিং অথবা ধর নতুন সংসদ ভবনের ডিজাইন, কইরা দিলা, কোটি টাকা ঘরে বইয়া পাইয়া গেলা, সারা বছর আর তোমার কিছু না করলেও চলে। আর্কিটেকচার ভাল সাবজেক্ট এ কথা ছোটদাও বলেন। আরে আমগোর রফিক ওইখানে পড়তাছে না! রফিক পড়ছে বলেই সাবজেক্টটি ভাল,রফিক না পড়লে সাবজেক্টটি এত ভাল নাও হতে পারত। বন্ধু আর্কিটেকচারে পড়ছে বলে ছোটদা কালো-মাড়ি-হাসিটি এমন প্রসারিত করে রাখেন যে মনে হয় বিষয়টির স্বরেঅ থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত সব তাঁর নখদর্পণে। ভর্তি হওয়ার আগে সাতদিন ক্লাস করতে হয়। ক্লাস নেয় শেষ বর্ষের ছাত্ররা। তাঁর বন্ধুটি আমাকে ইভেন ফ্রি কোচিংও দিতে পারে। যে জিনিসটি স্থাপত্যশিল্পে ভর্তি হওয়ার জন্য এখন জরুরি করা, তা অঙ্ক। আমার টেবিলের ওপর সপ্তূ হয়ে আছে লিটল ম্যাগাজিন। অঙ্ক বইয়ের খোঁজ পাওয়া যে আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তা বুঝি। অঙ্কের খাতাগুলোও বাড়িতে আর আছে বলে মনে হয় না। সেরদরে বিক্রি করে সেঁজুতির কাগজ কিনতে চলে গেছে।

আমি যে খুব শীঘ্র স্থাপত্যশিল্পী হতে যাচ্ছি, সে কথা চন্দনাকে জানাই। চন্দনা ভর্তি পরীক্ষা দেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাংলা সাহিত্যে পড়াশোনা করবে। ঢাকায় আমরা একসঙ্গে থাকব, শেকল ছিঁড়ে দুটো মুক্ত পাখি হাওয়ায় উড়ে বেড়াবো, দুচোখে জীবন দেখব, দুপায়ে দৌড়ে যাবো, ক্রমশ উঁচুতে আরও উঁচুতে কি আছে না-দেখা, দেখব; স্বপ্নের সিঁড়ি আমাদের পায়ের নাগালে এসে যাচ্ছে। আমাদের ডানায় এসে ভর করছে ঝাঁক ঝাঁক আনন্দ।

 

সেঁজুতির দ্বিতীয় সংখ্যার জন্য চন্দনা তারুণ্য এ্যাক মোহন নদী নামে কবিতাটি পাঠিয়েছে।

আমার চারপাশে অমিত তারণ্যে খেলা করে কয়েকজন সুদর্শন তরুণ ঝড় ওঠে দ্রৌপদীর বুকে উন্মত্ত সজীবতায় অবিরাম ওরা হয় লুন্ঠিত, হৃতসর্বস্ব..।

জানালায় বসে কেবল কৃষ্ণচূড়াই নয়, কেবল মেহগিনি পাতার ঝরে যাওয়া নয়, চন্দনা তরুণ সুদর্শনদেরও দেখছে। এক সুদর্শনের সঙ্গে কিছু ভেবে কিছু না ভেবে দেখা করেও এসেছে। অনপুুঙ্খ বর্ণনা করেছে সেই দেখা হওয়া, সেই চোখে চাওয়া, সেই বুকের মধ্যে কেমন কেমন করা। হাত স্পর্শ করতে চেয়েছিল সুদশর্ন টি, চন্দনা আলগোছে সরিয়ে নিয়েছে নিজের হাত। ওর কেবল ভাল লেগেছে চোখে চাওয়াটুকুই, ওটুকুই ওকে বাকি দিন রাত্তির অদ্ভুত আবেশে জড়িয়ে রাখে। প্রেমের মত সুন্দর কিছু আমার মনে হয় জগতে আর নেই। প্রেমের গল্প আমি তন্ময় হয়ে শুনি। কল্পনায় এক রাজকুমার উড়ে আসে পঙ্খীরাজে করে। আমার এখন ভালবাসার সময়, আমি এখন ইচ্ছে করলেই ভালবাসার প্লাবন বইয়ে দিতে পারি..। নিজেও এমন কবিতা লিখতে থাকি।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, ঢাকার এক উদীয়মান কবি, সেজুঁতির জন্য কবিতা পাঠিয়েছে। বাঁজে থেকে চন্দ্রবিন্দু তুলে তার তামাটে রাখাল তুই কবিতাটি পরের সংখ্যায় ছাপার জন্য রাখি।

বারবার বাঁশি তো বাজে না, বাঁশি শুধু একবারই বাজে। তামাটে রাখাল তোর বাঁশিটি বাজে না কেন! বাজে তোর নিঃসঙ্গতা, বাজে তনু ব্যথিত খোয়াব গহন সুরের মত বাজে তোর দিবস রজনী- তবু কেন বাঁশিটি বাজে না।

কবিতার সঙ্গে চিঠি পাঠিয়েছে রুদ্র, লাল কালিতে লেখা চিঠি। সেঁজুতির সম্পাদিকার সঙ্গে সে পরিচিত হতে চায় এবং তাকে তুমি সম্বোধন করতে চায় কারণ আপনি সম্বোধনটি তার বড় অপছন্দ। সেঁজুতির রং হলুদ কেন প্রশ্ন করেছে। সন্ধেদীপের শিখাটি হলুদ, তাই হলুদ, সোজা উত্তর। পরের চিঠিতে অবলীলায় তুমি সম্বোধন করে সে, যেন সে কত আপন আমার! চিঠিতে মানুষকে আপন করে নেওয়া আমার স্বভাবের অনগ্তর্ ত, আমি বিস্মিত হই না।

সেঁজুতির জন্য কবিতা কেবল দুই বাংলার শহর নগর গ্রাম গঞ্জ অলি গলি আনাচ কানাচ থেকে আসছে। কলকাতা থেকে অভিজিৎ ঘোষ, নির্মল বসাক, চৈতালী চট্টে াপাধ্যায়, জীবন সরকার এরকম অনেকে কবিতা পাঠাচ্ছেন। নাম দেখে নয়, কবিতা দেখে কবিতা ছাপি। কবিতা ভাল হলে সে নতুন কবি হোক, অজ পাড়া গাঁয়ে তার বাস হোক, পরোয়া করি না। লক্ষ করি, শব্দের বানানে পরিবর্তন চলছে চারদিকে। মুখের ভাষাকে লেখার ভাষায় আনা হচ্ছে। চন্দনা এক লিখতে এ্যাক লিখেছে। আমিও কোরেছিলাম, বোলেছিলাম, দ্যাখা হয়েছে, এ্যাকা লাগছে এরকম লিখছি। নির্মল বসাক কবিতায় প্রায়ই কোনও দাঁড়ি কমা ব্যবহার করেন না। রুদ্র শব্দ থেকে ণ তুলে দিচ্ছে এটি থাকার কোনও কারণ নেই বলে। ঊ, ঈ, ী, ,ূ কেও আর জরুরি মনে করছে না। নতুন একটি যতিচিহ্নের উদ্ভাবন করেছে, ইংরেজি ফুলস্টপের মত একটি শুধু বিন্দু এই যতিতে, কমাতে যতক্ষণ থামা হয়, তার চেয়ে কম থামতে হবে। রুদ্র যখন প্রাণ লিখতে প্রান লেখে, কারণ লিখতে কারণ লেখে, দেখতে অচেনা লাগে শব্দ। তবু সেঁজুতিতে যে কোনও পরিবর্তনকে স্বাগত জানাচ্ছি। ভাষা তো স্থবির কোনও জলাশয় নয় যে থেমে থাকবে! সেজুঁতির টুকিটাকি বিভাগে লিটল ম্যাগাজিনের খবর দিই, ঠিকানাও, যে পড়বে সেঁজুতি সে আরও কুড়ি পঁচিশটি লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে। কেবল লিটল ম্যাগাজিনের খবর নয়, কোথায় কবিতার অনুষ্ঠান হচ্ছে, কে কেমন লিখছেন, কার কি বই বেরোচ্ছে, এসব খবরও সংগ্রহ করে দিতে থাকি। সেঁজুতির ঘোষণা, একজন নির্ভেজাল কবিতাপ্রেমিক মাত্রই সেঁজুতির অধিকারী। সেঁজুতির উজ্জ্বল আলোয় ঘুচে যাবে কাব্য জগতের সকল কালো। সেঁজুতি সর্বদা সত্য ও সুন্দর। সেঁজুতির বিনিময় মূল্য চাট্টে সিকি মাত্র। কিন্তু চাট্টে সিকির বিনিময়ে যে কেউ সেঁজুতি কিনছে তা নয়। বিজ্ঞাপনহীন পত্রিকা নিজের গাঁটের পয়সা খরচা করে বের করে যারাই কবিতা লেখে বা কবিতা পত্রিকা বের করে তাদের কাছে পাঠাচ্ছি। পাঠাতেও গাঁটের পয়সা কম খরচা হয় না। কবিতা পড়ুন, কবিতা পত্রিকা কিনুন, কবিতার বই কিনুন সাধারণের কাছে এই অনুরোধ জানাচ্ছি সেঁজুতির মাধ্যমে। পুরো জগতটিকে কবিতার জগত না বানিয়ে আমার স্বস্তি নেই। আমাকে সত্যি সত্যি কবিতায় পেয়েছে। কবিতা আমার রাত্রিদিনের সঙ্গী।

বাড়িতে কেউ নেই, চন্দন ও ফুল হাতে আমি আমি কবিতার পুজোয় বসেছি,
অভিমানে সারাটা দিন নিষ্কর্মার মত বসে থাকি অহেতুক,
দরোজায় দাঁড়িয়ে কৃতঘ্ন শব্দেরা চোখ টিপে সহাস্যে অপমান করে
দুধেল জ্যোৎস্নায় ওত পেতে বসে থাকে নিন্দুক ও সমালোচকের দল

টানা গদ্যে লেখা অভিজিতের দীর্ঘ কবিতাগুলো পড়তে পড়তে মাত্রাবৃত্ত স্বরবৃত্ত থেকে বহুদূরে ভাসতে থাকি সময়ের স্রোতে।

রুদ্র সদ্য ছাপা হওয়া তার প্রথম কবিতার বই উপদ্রুত উপকূল পাঠিয়েছে। বইয়ের কবিতাগুলো সশব্দে পড়ি, সঙ্গে ইয়াসমিনকেও ডেকে আনি পড়তে। অবকাশের বাতাসে রুদ্রর কবিতার শব্দ। কবিতার গন্ধ। আমাদের মুখে কবিতা। মনে কবিতা।

আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই,
আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি,
ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে
এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?
বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে
মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ।
এই রক্তমাখা মাটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধেছিল
জীণর্ জীবনের পুঁজে তারা খুঁজে নেয় নিষিদ্ধ আধাঁর
আজ তারা আলোহীন খাঁচা ভালবেসে জেগে থাকে রাত্রির গুহায়।
জাতির পতাকা আজ খামছে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন।
রক্তের কাফনে মোড়া কুকুরে খেয়েছে যারে, শকুনে খেয়েছে যারে
সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা।
স্বাধীনতা, সে আমার স্বজন হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন
স্বাধীনতা, সে আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল।
ধর্ষিতা বোনের শাড়ি ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা।

রুদ্রর কবিতা আমাকে শোয়া থেকে বসিয়ে দেয়। দাঁড় করিয়ে দেয়। বারান্দায় অস্থির হাঁটায়। এমন সত্য কথন, এমন দৃঢ এবং বলিষ্ঠ বক্তব্য আমাকে আকৃষ্ট না করে পারে না। রুদ্রর কবিতা সজোরে পড়ার মত, আবৃত্তি করার মত একঘর লোকের সামনে,খোলা মাঠে, জনসভায়। কবিতা আবৃত্তি করা নিতান্তই নতুন নয় আমার জন্য, দাদার ছোটবেলায় মা শিখিয়েছেন দাদাকে, আর আমার বড়বেলায় দাদার কাছে তালিম পেয়েছি আমি, আর আমি শেখাতে শুরু করি ইয়াসমিনকে। ইয়াসমিন ইশকুলের আবৃত্তি প্রতিযোগিতায়, কেবল ইশকুলের নয়, ময়মনসিংহ জেলার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব চলছিল, সেই উৎসবের আবৃত্তিতে নাম লিখিয়ে আসে। ঠিক ঠিক একদিন গিয়ে আবৃত্তি করে তিন তিনটি পুরষস্কার পেয়ে গেল, ময়মনসিংহ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের হাত থেকে ঢাউস ঢাউস রবীন্দ্ররচনাবলী, গীতবিতান, নজরুলের সঞ্চিতা, রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা নিয়ে বাড়ি ফিরল। গীতবিতান খুলে একা একাই ও গান গাইতে শুরু করে। ওর গানে চমৎকার সুর ওঠে, সুর শুনে বার বার বলি, তর একটা হারমোনিয়াম থাকলে ভাল হইত। বাড়িতে কোনও বাদ্যযন ্ত্র নেই। দাদার বেহালা ভেঙে পড়ে আছে, ছোটদা নিজের গিটার বিক্রি করে গীতাকে শাড়ি কিনে দিয়েছেন। বাবা গান বাজনা পছন্দ করেন না, বাবার কাছে ইয়াসমিনের জন্য হারমোনিয়াম কেনার কথা বলা মানে গালে দুটো চড় খাওয়ার ব্যবস্থা করা। গান গাওয়ার স্বপ্ন ইয়াসমিনকে আপাতত হাওয়ায় উড়িয়ে দিতে হয়। তারচেয়ে কবিতা পড়, কবিতা পড়তে কোনও যন্ত্রের দরকার হয় না।

মাথায় যখন সেঁজুতি, মনে যখন কবিতা তখন আর্কিটেকচারে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য দাদা আমাকে ঢাকা নিয়ে গেলেন। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোটদার বন্ধু রফিকের হোস্টেল-রুমে নিয়ে যান ভর্তি পরীক্ষায় কি প্রশ্ন আসে, কি রকম কি তার সামান্য হলেও যদি তিনি আভাস দেন। রফিক মলিন হেসে বলেন, কালকে পরীক্ষা, আজকে কি আর দেখাবো! তবু আমাকে বসিয়ে কাগজ পেন্সিল দিয়ে একটানে একটি সরলরেখা আঁকতে বললেন, একটানে বৃত্ত। আঁকার পর বললেন,এই ঘরটার ছবি আঁকো। তাও আঁকার পর বললেন হাত তো ভালই। ওই হাত ভাল নিয়ে পরদিন পরীক্ষা দিতে বসে ছবিগুলো, যা আঁকতে বলা হয়েছে, একেঁ দিই। কিন্তু দশটি অঙ্কের একটি করাও আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। হবে কেন, অঙ্ক নিয়ে তো বসিনি, বসেছি কবিতা নিয়ে। দুঘন্টা পরীক্ষা, কিন্তু একঘন্টা পর পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে দাদাকে নিস্প্রাণ কণ্ঠে বলে দিই, আমার পাশ হবে না। কদিন পর,আশ্চর্য, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আপিসঘরের পাশে মৌখিক পরীক্ষায় যাবার জন্য টাঙানো নামের তালিকায় আমার নামটি আছে খবর পাই। মৌখিক পরীক্ষা দিতে ঢাকা যেতে হবে, আমাদের সুটকেস গোছানো সারা। কিন্তু আমাদের যাত্রাভঙ্গ করে বাবা বললেন, ঢাকা যাওয়ার দরকার নাই।

কেন, ঢাকা যাওয়ার দরকার নাই কেন? ঢাকা না গেলে তো মৌখিক পরীক্ষা দেওয়া হবে না,না দেওয়া হলে আর্কিটেকচারে আমার ভর্তি হওয়া হবে না! বাবার অনড় অটল মূর্তিটির সামনে এক পাহাড় প্রশ্ন নিয়ে আমি স্তম্ভিত বসে থাকি।

বাবা গম্ভীর গলায় বললেন, আর্কিটেকচারে পড়তে হইব না।

আমার স্বপ্নের স্থাপত্য হুড়মুড় করে আচমকা ভেঙে পড়ে। হৃদয় জুড়ে ভাঙন নিয়ে একা উদাস বসে থাকি।

আর্কিটেকচারে পড়তে হইব না কারণ মেডিকেলে পড়তে হইব আমাকে। আমার নাম উঠেছে মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাওয়াদের তালিকায়।

০৮. নিঃসঙ্গতার সঙ্গ

বাবা যা বহাল করেন বাড়িতে, তা যে বছরের পর বছর বহাল থাকে তা নয়। দড়ি তাঁর হাতে, যখন ইচ্ছে ঢিলে করেন, যখন ইচ্ছে শক্ত। তাঁর নেওয়া কিছু কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত থেকে তিনি হঠাৎ একদিন সরে আসেন। আমার কাছে পত্রমিতাদের চিঠি আর না আসতে থাকায় তিনি নতুন আসা ডাকপিয়নকে নতুন করে বাগিয়ে নিয়ে চিঠি হাত করতে চেষ্টা করেন না। ডাকপিয়ন আগের মত বাড়িতে চিঠি দিতে শুরু করেছে। রান্নাঘরের বন্ধ আলমারির তালা খুলে যেভাবে গুনে গুনে সবকিছু দিচ্ছিলেন তাতেও ভাটা পড়ে, তাঁর পক্ষে এত ঘন ঘন নতুন বাজার থেকে প্রতিবেলা রান্না চড়ানোর আগে বাড়ি আসা সম্ভব হয় না। আলমারি এখন খোলাই থাকে। মা আগের মতই সংসারসমুদ্রে নিমজ্জিত হন। জরির মা চলে গেলে নানিবাড়ির পেছনের বস্তি থেকে মালেকাকে এনেছিলেন, সেই মালেকাও মাস পার না হতেই চলে গেছে, দুদিন এদিক ওদিক খুঁজে কাউকে না পেয়ে পাড়ার রাস্তায় ভিক্ষে করা হালিমাকে ধরে আনলেন মা। হালিমা তার মা সহ বাড়িতে বহাল হয়ে গেল। টুকটাক সওদা করতে গিয়ে রাস্তায় কোনও এক শিশিবোতলকাগজঅলার সঙ্গে দেখা হয় হালিমার, সেই অলা তাকে বিয়ে করবে বলেছে বলে খুশিতে সে আটখানা থেকে ষোলখানা হয়ে যায়। মা একটি রঙিন শাড়ি দিলেন হালিমাকে, কাগজঅলা জামাইকে একটি নতুন লুঙ্গি। বিয়ে হওয়া হালিমা সদপের্ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। হালিমার মা একাই রয়ে গেল এ বাড়িতে। খুক খুক কাশতে কাশতে একা। একা তার পক্ষে বাড়ির সব কাজ করা কঠিন হয়ে ওঠে। গা প্রায়ই জ্বরে পুড়তে থাকে। যেদিন কাশির সঙ্গে দলা দলা রক্ত বেরোল, মা তাকে হাসপাতালে নিজে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করিয়ে এলেন। দু সপ্তাহ পার না হতেই হালিমা ফিরে এল অবকাশে। কি হয়েছে? জামাই ভাত দেয় না।

হালিমা আগের মত বাসন ধোয়ায়, কাপড় ধোয়ায়, ঘর মোছায় লেগে গেল। থেকে থেকে কেবল বলে রাইতে ঘুমাইতে পারি নাই বেডার জ্বালায়। জ্বালাটি কি ধরনের জ্বালা শুনতে আমরা উৎসুক।

রাইতে ঘুমের মধ্যে শি.. শি.. বোত..ল কা….গজ কইয়া চিল্লাইয়া উডে। সারাদিন রাস্তায় ঘুইরা ঘুইরা কয় ত, রাইতে ঘুমাইয়াও রাইতেরে দিন মনে করে।

এই হালিমা আবার কিছুদিন পর রাস্তায় দেখা আরও এক কিঅলার প্রস্তাবে রাজি হয়ে অবকাশ ছাড়ে।

অবকাশে ভাসমান দরিদ্রদের আসা যাওয়ার খেলা দেখে অভ্যেস হয়ে গেছে আমাদের। কে আসছে কে যাচ্ছে কেন যাচ্ছে কোথায় যাচ্ছে এসব নিয়ে কোনও গবেষণা চলে না। কাজের মানুষ থাকলে মার খানিকটা আরাম, না থাকলে মার কষ্ট। ব্যাপারটি সম্পণূর্ মার। কেউ থাকুক বা না থাকুক আমাদের আরামে কখনও কোনও ব্যাঘাত ঘটে না। আমরা যেমন আছি তেমন থাকি। কাজের মানুষ পেতে আমাদের চেয়ে মার উৎসাহ তাই সবসময়ই বেশি। একবার হাঁটু অবদি তোলা লুঙ্গি, ছেঁড়া একটি গেঞ্জি গায়ে এক লোক ঢুকেছিল মাঠে। জোয়ান বয়স। লোকটিকে দেখেই আমার ডাকাত বলে সন্দেহ হয়। ডাকাত না হলে দা কেন হাতে!

কি চান? চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করি জানালায় দাঁড়িয়ে।

কাম করাইবাইন?

কি কাম?

দাওয়ের কাম।

দৌড়ে গিয়ে মাকে খবর দিই, একটা ডাকাত আইছে। কয় সে নাকি দাও এর কাম করে। দাওএর কাম মানে বুঝছ ত! দাও দিয়া খুন করার কাম।

মা মশলা বাটছিলেন, বললেন, খাড়ইতে ক।

আমি আর ওমুখো হই না। মা মশলা বাটা রেখে দরজা খুলে মাঠে গেলেন।

লোকটিকে দিব্যি বাড়ির ভেতরে এনে টিনের ঘরের পেছনের জঙ্গল পরিষ্কার করিয়ে এক থাল ভাত দিলেন খেতে, সঙ্গে ডাল তো আছেই, এক টুকরো মাছও। মার কোনও ভয় ডর নেই। এ বাড়িতে এত চুরি হওয়ার পরও মার কাউকে চোর বলে মনে হয় না। ডাকাতির খবরও শোনেন মা, তবু মা কাউকে ডাকাত বলেও মনে করেন না। যখন হাভাতের মত খাচ্ছে লোকটি, মা বললেন, কি গো মিয়া তোমার কোনও মেয়ে নাই? এই ধর বারো তেরো বছর বয়স। যুবতী মেয়ে কাজে রাখতে ভয় হয় মার। তাই মেয়ে চাইলে বারো তেরোর বেশি এগোতে চান না। আর বেশি বয়স হলে চল্লিশের নিচে নয়।

লোক বলল, আফা, আমার একটাই ছেলে, মেয়ে নাই।

ছেলের বয়স কত?

লোক ছেলের বয়স বলতে পারল না। দাঁড়িয়ে পেট বরাবর বাঁ হাত রেখে মাপ দেখালো, আমার পেট সমান লম্বা।

কামে দিয়া দেও ছেড়ারে। কি কও!ফুট ফরমাইসটা ত অন্তত করতে পারব।

লোকটি মার ব্যবহারে মগ্ধু হয়ে পরদিন নজরুলকে নিয়ে এল। নজরুল পেটে ভাতে থাকবে। দাওয়ের কাম করতে গিয়ে এ পাড়ায় এলে লোক তার ছেলেকে দেখে যেতে পারবে। লোক যতবার আসে, মা ভাত দেন খেতে। লোক খুশি মনে ছেলেকে একনজর দেখে চলে যায়। নজরুল প্রায় দুবছর মত টানা ছিল এ বাড়িতে। দু বছর পর একদিন পালিয়ে চলে গেল, তারপর মাস দুই গেলে আবার সেই নজরুলকে তার বাবা বুঝিয়ে দিয়ে গেছে আমাদের কাছে। রাতে সব কাজ শেষ করে সে ঘরে এসে যাত্রার রাজার ভূমিকায় অভিনয় করত। একাই করত। আমরা ছিলাম দর্শক, শ্রোতা। মাঝে মাঝে আমাদের হাত ধরে নিয়ে যেত রানি হওয়ার জন্য মুখোমুখি দাঁড়াতে, হোক না সে সংলাপহীন। কি রে নজরুল বড় হইয়া কি হইবি রে? যাত্রায় পাট করবি? নজরুল চিকচিক চোখে বলত, হ। নজরুল রাধঁ তে পারত না প্রথম প্রথম। কাপড় ধুতেও পারত না। পরে সব শিখে গেছে। যখন সে তার বাবার বুক সমান লম্বা হল, তাকে দাওএর কাজে লাগানোর জন্য নিয়ে গেল তার বাবা। যাবার দিন মা তাঁর আঁচলে আর তোশকের তলে গুঁড়ো পয়সা যা ছিল, জড়ো করে বারো টাকার মত, নজরুলের বাবার হাতে দিয়েছেন। বাড়িতে কোনও কাজের মানুষ না থাকলে মা নানির বাড়ির পেছনের বস্তিতে চলে যান, ওখানে না পেলে যান ব্রহ্মপুত্রের চরে, চরে ভাঙা বেড়া আর খড়ের ছাউনি দিয়ে ঘর তুলে দরিদ্র মানুষের বাস, এক ঘরে না পেলে আরেক ঘরে লোক মেলে। লোক না মিললে ভিক্ষে করতে যারা আসে, তাদের দিয়ে কিছু কাজ করিয়ে দুপুরে ভাত খাইয়ে বেশি করে চাল দিয়ে দেন টোনায়। তারপরও যখন হাহাকার পড়ে, কাউকেই পাওয়া যাচ্ছে না, তখন ঠেকার কাজ সামলাতে নান্দাইল থেকে কাউকে পাঠাতে বলেন বাবা। বেশির ভাগই বাবার নিজের আত্মীয়। খুব দূরের নয়, কাছেরই। নিজের বোনের মেয়ে। বাবার ছোট দু বোনের বিয়ে নান্দাইলের হালচাষ করা কৃষকের কাছেই হয়েছে। অসখু বিসুখে বোনেরা এ বাড়িতে এসে ডাক্তার ভাইকে অসখু দেখিয়ে ওষুধ নিয়ে যায়। বোনের ছেলেরা বড় হয়েছে, একা একাই চলে আসে। আসে টাকা পয়সা সাহায্য চাইতে। দুদিন এ বাড়িতে থাকে খায়, বাবা ওদের ডেকে জমিজমার অবস্থা জিজ্ঞেস করে উপদেশ এবং অর্থ দুটোই বিতরণ করেন। বিয়ের বয়সী মেয়ে নিয়ে বোনেরা আসে। পাত্রের খোঁজ পাওয়া গেছে, কিন্তু পাত্র চাকরি চায়। গ্রামের জমি চাষ করবে না, শহরে পাষনীর বড়লোক মামা থাকে, সেই মামা যদি চাকরি যোগাড় করে দেন তবে বিয়ে নচেৎ নয়। বাবা এদিক ওদিক চাকরি খোঁজেন। চাকরি দেনও ওদের। কিন্তু মেয়ে যদি বাবার কাছে বিচার নিয়ে আসে স্বামী মারধোর করে, বাবা বলেন, করুক। স্বামী মারধোর করুক, চাকরির পয়সা পেয়ে দুটো যদি ডালভাত খেতে দেয়, তবে মখু বুজে স্বামীর সংসার করতে উপদেশ দিয়ে ওদের বিদেয় করেন। আর স্বামী যখন বউ তালাক দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করে, বাবা উঠে পড়ে লেগে যান স্বামীর চাকরিটি খেতে। বাবা তাঁর বোনের মেয়ে সুফির স্বামীকে ক্যাডেট কলেজে বই বাধাঁই করার চাকরি দিলেন। ফুটফুটে একটি মেয়ে হল সুফির। এরপর স্বামী সুফিকে মেরে বের করে দিয়ে আরেকটি বিয়ে করল। সুফি এসে কেঁদে পড়ল বাবার পায়ে। বাবা বলেন, যা সতিনের ঘরে কাম কাজ কইরা বাঁইচা থাক। সুফি সতিনের ঘরে অনেকদিন ছিল, শেষে স্বামী আর ওকে ভাত দেয় না বলে চলে এল বাপের বাড়ি। বাপের বাড়িতে ফুটফুটে মেয়ে নিয়ে বাড়তি ঝামেলা পড়ে থাকে মখু বুজে। ওকে একদিন নিয়ে আসা হল শহরে। বাইরের মানুষেরা সুফিকে কাজের মেয়ে বলেই মনে করে। বাড়ির মানুষ কেউ শুধরে দেয় না যে এ কাজের মেয়ে নয়। আমরা মাঝে মাঝে ভুলেও যাই যে সুফি আমাদের ফুপাতো বোন, বাবার আপন বোনের মেয়ে। কারণ সুফি বাড়িতে কাজের মেয়ের মতই কাজ করে। কাজের মেয়ে ঈদের সময় যে কাপড় পায়, সুফিও তাই পায়। যে এঁটোকাঁটা খেতে পায়, সুফিও সেই এঁটোকাঁটা পায়।

ধান ওঠার পর নান্দাইল থেকে বাড়ির লোকেরা যখন আসে, পিঠা নিয়ে আসে, মেড়া পিঠা। পিঠা দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়েন দাদা। সেই মেড়া পিঠা ফালি ফালি করে কেটে ভেজে গুড় দিয়ে খাওয়া হয়। মাঝে মাঝে বড় পাতিলে করে শিং মাগুর মাছ পানিতে সাঁতার কাটছে, আনেন। কেউ কিছু আনলে মা খুশি হন। মাছ রান্না করে পাতে দিতে দিতে বলেন, মাছগুলা খুব তাজা ছিল, পুস্কুনির মাছ। কেউ ঝাল পিঠা আনলে দাদা একাই ভেতরের বারান্দার চেয়ারে বসে পা দোলাতে দোলাতে অর্ধেকই খেয়ে ফেলেন। বাবার বড় বোনের অবস্থা ভাল। নান্দাইলের কাশিরামপুর গ্রামে থাকেন, অনেক জমিজমা, ছেলে মেয়ে লেখাপড়া করেছে। বড় বোনের মেজ ছেলে রাশিদ শহরের কলেজে লেখাপড়া করেছে। এ বাড়িতে থেকেই কলেজে পড়ত। অবকাশে থেকে বাবার অনেক আত্মীয়ই লেখাপড়া করেছে। বাবা তাঁর ভাইয়ের ছেলেদের পড়াতে যত আগ্রহী, বোনের ছেলেদের নয়। চাকরির খোঁজে, অসুখে বিসুখে, লেখাপড়ার কারণে লোক লেগেই থাকে, যে-ই আসে জায়গা হয় টিনের ঘরে, টিনের ঘরে লম্বা বিছানা পাতা আছে গ্রাম থেকে আসা মানুষদের থাকার জন্য। মার কাঁধে নিজের স্বামী সন্তানসহ বাবার বংশের লোকদের রেঁধে বেড়ে খাওয়ানোর দায়িত্ব। মা দায়িত্ব পালনে কোনওরকম ত্রুটি করেন না। এমনকি গ্রাম থেকে ভর দুপুরবেলা বাড়ি ওঠা অনাহূত অতিথিদের পাতেও ছোট হলেও মাছ মাংস দেন মা। মা অনেকটা জাদুকরের মত। এক মুরগি রেঁধে বাড়ির সবাইকে দুবেলা খাওয়ান, পরদিন সকালেও দেখি রুটির সঙ্গে খাবার জন্য কিছু মাংস রেখে দিয়েছেন। গরুর মাংস সস্তায় মেলে, বাবা সস্তার গরুর মাংস কিনে বাড়ি পাঠান প্রায়ই। এ খেলে আমার দাঁতের ফাঁকে মাংসের আঁশ আটকে থাকে, দাঁত খুঁচিয়ে বেলা পার হয়। বেছে বেছে আমার জন্য হাড় রাখেন মা, বড় হাড় মাংস কম, এ হলে কোনওরকম চালিয়ে নিতে পারি। মুরগির দাম বেশি। মুরগি খেতেও স্বাদ। খেতে স্বাদ হলেও মুরগি খাওয়ার ইচ্ছে দপদপ করলেও মুরগি জবাই কেউ আমাকে দিয়ে করাতে পারেনি। অনেক সময় এমন হয়, মা ব্যস্ত, দোকানের কোনও কর্মচারিরও আসার নাম নেই যে মুরগি জবাই করে দেবে, দাদারাও নেই কেউ, মা আমাকে বলেন জবাই করে দিতে। উঠোনে কাজের হাতে মুরগি ধরে দাঁড়িয়ে, আমার কেবল গলার চামড়া উঁচু করে ধরে আল্লাহু আকবর বলে কাটতে হবে যতক্ষণ না পর্যন্ত ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোয়। দা নিয়ে গেছি অনেকদিন। গলার চামড়া ধরে উঠিয়েছিও। দা ও গলার কাছে এনেছি। শেষ অবদি পারিনি। আমার পক্ষে কক্ষনো সম্ভব হয়নি জ্যান্ত মুরগির গলা কাটা। গলা কাটা মুরগি যখন উঠোন জুড়ে লাফায়, দেখলে কষ্টও অমন করে আমার বুকের ভেতর লাফায়। দাদার কোনও কষ্ট হয় না দেখতে। দাদা বেশ উপভোগ করেন মুরগির অমন লাফানো। আমি মাকে অনেক সময় বলেছি,আমাদের খাওয়ার মজার জন্য মুরগিটার জীবন দিতে হইল! মা বলেন, ওদেরে আল্লাহ বানাইছেন মানুষের খাদ্যের জন্য। আল্লাহর উদ্দেশে কুরবানি দিলে কোনও গুনাহ হয় না। গুনাহ হয় না মা বলেন, কিন্তু চারমাস উঠোন জুড়ে হেঁটে বেড়ানো, ফার্মের বড় একটি শাদা মুরগিকে, যাকে মা ঝুমঝুমি বলে ডাকতেন, যাকে তাকে কামড় দিত বলে যখন জবাই করার কথা উঠল, মা বললেন, পালা মুরগিরে জবো করা ঠিক না। শেষ অবদি জবাই মুরগিটিকে করা হয়েছিল। মা যে কেবল মুখে তোলেন নি কোনও মাংস, তা নয়, উঠোন রক্তাক্ত করে ঝুমঝুমি যনণ্ত্রায় লাফাবে এই বীভৎস দৃশ্যটি দেখার আগেই যেভাবে ছিলেন যে কাপড়ে, ওপরে একটি বোরখা চাপিয়ে চলে গেছেন নানির বাড়ি। ওখানে তৃপ্তি করে শাক দিয়ে ভাত খেয়েছেন। মার থেকে থেকে মনে হয়েছে ঝুমঝুমি মাকে অভিশাপ দিচ্ছে।

 

ঢাকায় থেকে আসা বার্মা কোরিয়া ঘুরে আসা গীতাকে আমরা বিস্মিত চোখে দেখলেও সে যে মার পুত্রবধু, মা তা ভোলেন না। পুত্রবধূর হাতে সংসারের দায়িত্ব কিছুটা হলেও দিয়ে নিজে তিনি বিশ্রামের সময় পাবেন ভাবেন। মার ভাবনাই সার। গীতা রান্নাঘরের ছায়াও মাড়ায় না। আগের চেয়ে গীতার ঔজ্জ্বল্য আরও বেশি বেড়েছে। আগের চেয়ে তার হিলজুতো থেকে শব্দ হয় বেশি যখন হাঁটে। ঘাড় অবদি চুল কেটেছে। ভুরুদুটো সম্পণূর্ চেছে ফেলে কাজল-পেনসিলে দুটো ধনুক এঁকে দেয় ভুরুর জায়গায়। আগের চেয়ে মখু মালিশের জিনিসপত্র বেশি তার। ঠোঁটে কায়দা করে লাল গোলাপি লিপস্টিক লাগায়, চোখের পাতায় রং লাগায়, নীল শাড়ি পরলে নীল রং, সবুজ পরলে সবুজ। আগের চেয়ে সুন্দর শাড়ি পরে, আগের চেয়ে রঙিন। আগের চেয়ে বেশি বাইরে বেড়াতে যায়। আমি আর ইয়াসমিন আগের মতই খানিকটা বিস্ময়ে, খানিকটা মুগ্ধ হয়ে, খানিকটা আহত হয়ে, খানিকটা বুঝে, খানিকটা না বুঝে গীতাকে দেখি। মার আয়নার টেবিলটির মাথায় তিনটে বাতি লাগিয়ে দিয়েছেন ছোটদা। কড়া আলোর তলে গীতাকে ফর্সা দেখতে লাগে আয়নায়। সেজে গুজে দাঁড়ালে গোলপুকুর পাড়ে সুধীর দাসের মূর্তি বানানোর দোকানে সাজিয়ে রাখা অবিকল দগুর্ামূর্তিটি, দশ হাতের বদলে দু হাত, এই যা পার্থক্য। গীতা ফাঁক পেলেই আমাদের ঢাকার গল্প শোনায়। রাহিজা খানমের তিন ছেলেমেয়ের গল্প। শুনতে শুনতে ছেলেমেয়েগুলোর স্বভাব চরিত্র সব আমাদের জানা হয়ে যায়। বার্মা কোরিয়ার গল্প যখন করে শুনতে শুনতে মনে হয় বার্মা আর কোরিয়া বুঝি আমলাপাড়ার পরের গলিতেই। আগের মতই মা রান্না করে বাড়ির সবাইকে খাওয়ান। আফরোজা উঠ, কিছু খাইয়া লও, থেকে থেকে মার ডাক শুনি। ছোটদার জীবনে লেখাপড়া জাতীয় কিছু হওয়ার আর কোনও সম্ভাবনা নেই বলে বাবা তাঁকে উপদেশ দেন আরোগ্য বিতানে বসতে। আড়াইশ টাকা মাইনে পাবেন। ছোটদা চাকরিটি লুফে নেন। এই চাকরি নেওয়ার পর দাদার ওষুধের ওপর হামলে পড়া প্রায় পুরোটাই কমে গেছে ছোটদার। তিনি ফুরফুরে মেজাজে দিন যাপন করেন। ফুরফুরে মেজাজে বিকেলবেলা গোলপুকুরপাড়ের দিকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যান। কালো ফটকে ছোটদার বাইরে যাওয়ার শব্দ হওয়া মাত্রই দৌড়ে গিয়ে সবরি গাছের নিচে মেথরের যাওয়া-আসা করার ছোট দরজার ছিদ্রে চোখ রেখে কলস কলস নিতম্বটি বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে গীতা। ওই ছিদ্রে চোখ রাখলেই রাস্তার উল্টোদিকে ডলি পালের বাড়ি, গীতা দেখে ওই বাড়ির দিকে ছোটদার ভুলেও কখনও চোখ পড়ে কি না। বিয়ে হয়ে কাচ্চা বাচ্চার মা হয়ে তালাক হয়ে বাপের বাড়ি পড়ে আছে ডলি পাল। ডলি পালের দিকে ছোটদা এখন আর তাকান না, তারপরও বার্মা কোরিয়া ঘুরে আসা গীতার সন্দেহ মোচন হয় না। গীতার সবকিছু এমনকি সবরি গাছের তলে দৌড়ে গিয়ে ছোটদাকে দেখার কৌতূুহলও আমাদের কৌতূহলি কবে। গীতার উচ্চাজ্ঞরত শব্দও লুফে নিতে দেরি হয় না। গীতা যে ভাষায় কাজের মানুষদের গাল দেয়, তার বেশির ভাগই আমরা আগে শুনিনি, অথর্ও অনেক গালের জানি না। আমেনাকে পানি দিতে বলার পরও দিতে দেরি হচ্ছিল বলে যখন বলল, বেডি এহনো পানি দেয় নাই। করে কি বেডি? বেডির কি বিগার উঠছে নাহি! বিগার শব্দটি অর্থ না জেনে ইয়াসমিন এখানে সেখানে ব্যবহার করতে লেগে যায়।

এ বাড়িতে গীতার আদরের কমতি নেই। ঈদ এলে দাদা গীতাকে সিল্কের শাড়ি কিনে দিলেন, মার জন্য সুতি। মার পছন্দ খয়েরি বা লাল রংএর শাড়ি, দাদা কেনেন পাড়অলা শাদা শাড়ি। শাদা শাড়িতেই মাকে মা মা লাগে, দাদা বলেন। যে শাড়িই মার জন্য কেনা হয়, মা আমাকে আর ইয়াসমিনকে দেন পরতে প্রথম। আমরা পরে, পরে মানে লুটোপুটি করে শখ মেটালে, পরে মা পরেন। মার অভাব আছে, কিন্তু অভাবের বোধ নেই। শাদা শাড়িটিই, হয়ত দুদিন পরে গ্রাম থেকে কেউ এসে নিজের অভাবের কথা বলে কাঁদল, মা দিয়ে দিলেন। গীতার কাছে রাজিয়া বেগমের নতুন নতুন অনেক কথা শোনেন মা। গীতার খোঁড়া মাসির সঙ্গে, যে মাসির নাম হেনা, যে মাসি আমাদের বাড়ি এসে একসময় আমাকে আর ইয়াসমিনকে পড়াতেন, রাজিয়া বেগমের খুব ভাব। নতুন বাজারের এক এতিমখানার মেট্রন হয়েছেন রাজিয়া বেগম, সেই এতিমখানায় গীতার হেনা মাসিও চাকরি করেন। রাজিয়া বেগমের কথা যত শোনেন মা, তত মার পাগল পাগল লাগে। পাগল পাগল মা বাবা বাড়ি ঢুকলে মখু বিষ করে বসে থাকেন। বাবা রাগ দেখালে মাও রাগ দেখান। বাবা সেই রাগ দেখানো মাকে তোশকের তল থেকে চাবুক এনে মেরে রক্তাক্ত করে উঠোনে ফেলে রাখলেন একদিন। গলা কাটা মুরগির মত ত্রাহি চিৎকার করতে করতে মা লাফালেন, মার গা থেকে রক্ত ঝরল, গাছের কাকগুলো কা কা রব তুলে সরে গেল এলাকা থেকে। দৃশ্যটি নৃশংস বলে সামনে যাইনি, ঘরের দরজা বন্ধ করে আমি আর ইয়াসমিন বসে ছিলাম, বাবার হাত থেকে চাবুক কেড়ে নেওয়ার শক্তি বা সাহস কোনওটিই আমাদের নেই। আমরা পাথর হয়ে থাকি। বাবা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট পাঁচ পর ছোটদা ঢোকেন। মাকে উঠোনে পড়ে গোঙাতে দেখে দৌড়ে বেরিয়ে যান বাড়ি থেকে। সোজা আরোগ্য বিতানে। টেবিল থেকে ডাক্তার লেখা ত্রিকোণ কাঠটি নিয়ে আমার মারে মারছস কেন? তরে আমি আজকে মাইরাই ফেলছি বলে ঝাঁপিয়ে পড়েন বাবার ওপর। পুরো নতুন বাজারের লোক জড়ো হয়ে যায় চিৎকার শুনে। ছোটদাকে পাঁচজনে ধরে বেঁধে থামায়। ঘটনা ওদিকে এটুকুই। বাবার কপালের একটি দিক শুধু সামান্য ফুলে উঠেছে। এর বেশি কিছু হয়নি। ছোটদার রক্তারক্তির ইচ্ছে ছিল, সেই ইচ্ছে সফল না হলেও শান্ত হতে হয় তাঁকে। আর এদিকে উঠোনের কাদামাটি থেকে উঠে গীতাকে অদ্ভুত শান্ত গলায় বললেন, চল আফরোজা, কই যাইতে হয় চল। রক্তমাখা শাড়ির ওপরই বোরখা চাপিয়ে মা বেরিয়ে যান গীতাকে নিয়ে। আদালতে গিয়ে সত্যিকার তালাকের কাগজে সই করে বাড়ি ফিরে আমার আর ইয়াসমিনের মাথায় হাত বুলিয়ে ভাল হইয়া থাইকো তোমরা, মাইনষের মা মইরা যায় না? মনে করবা আমি মইরা গেছি। তোমার বাবা আছে, ভাইয়েরা আছে। তারা তোমাদেরে আদর কইরা রাখবে। তোমরা ভাল কইরা লেখাপড়া কইর বলে মা নিজের সহায় সম্পদ যা আছে ছোট একটি পুঁটলিতে বেঁধে চলে গেলেন নানির বাড়ি। মা চলে যাওয়ার আগেই গীতার সঙ্গে বাবার বেশ ভাব হয়েছিল। বাবা গীতাকে আলাদা করে ডেকে বাড়িতে কি হচ্ছে না হচ্ছে খবরাখবর নিতেন। বাবার চিরকাল এমনই অভ্যেস, বাড়িতে সব সময় একজন চর নিযুক্ত করেন গোপন খবর পাওয়ার আশায়। কাজের মানুষরাই সাধারণত বাবার চর হিসেবে ভাল কাজ করে। এবারের চর অবশ্য কাজের মানুষ থেকে অনেক উঁচু মর্যাদার বুদ্ধিসুদ্ধি সম্বলিত।

মা যে নেই, মা যেদিন চলে গেলেন সেদিন বুঝিনি। অথবা মা চলে গেলে বাড়িতে হৈ হৈ রৈ রৈ আগের চেয়ে আরও করতে পারার স্বাধীনতা বেড়ে গেছে বলে একধরনের গোপন আনন্দে ভুগেছিলাম। কিছুদিন পর হাড়ে কেন, মজ্জায় টের পেয়েছি। টের পেয়েছি আমাকে কেউ গা মেজে গোসল করিয়ে দেওয়ার নেই, মুখে তুলে কেউ খাইয়ে দেওয়ার নেই, চুল বেঁধে দেওয়ার নেই। কাপড় চোপড় ময়লা হলে কেউ দেখে না। খেলাম কি না খেলাম কেউ খোঁজ নেয় না। কেউ আর বিকেলে সন্ধেয় ছড়া শোনায় না। আমার কখন ক্ষিধে পেয়েছে, তা আমার জানার আগে মা জানতেন, অস্থির হয়ে উঠতেন আমাকে তৃপ্ত করতে। এখন আমার ক্ষিধে লাগলেই কি না লাগলেই কি, কারও কিছু যায় আসে না। মা চলে যাওয়ার পর সংসার দেখার জন্য নান্দাইল থেকে বাবা তাঁর ছোট ভাই মতিনের বউকে আনিয়েছেন। বউটি ইয়া মুটকি, কুচকুচে কালো। মতিন বিডিআরএ চাকরি যখন করতেন রাজশাহীতে, তখনই বিয়ে করেছেন। বউ নিয়ে কমাস আগে যখন এ বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন, আমরা মখু টিপে হেসেছি বউ দেখে। এক্কেরে মনে হয় কামের বেডি! কামের বেডির আশপাশ মাড়ায় না কেউ, কিন্তু মা দিব্যি সখু দুঃখের গল্প বললেন মতিনের বউএর সঙ্গে। যেন বউটি মার দীর্ঘদিনের সই। আমাদের মখু টেপা হাসির দিকে ফিরে মা বলেছেন, ও মেসে কাম করত। তাতে কি হইছে।মানুষটা খুব সাদাসিধাা। সাদাসিধা মানুষকে সে কাজের বেডি হোক, পথের ফকির হোক, মার পছন্দ। মতিনের বউ এ বাড়িতে রাঁধে বাড়ে, সকলকে খাওয়ায়। কিন্তু মার মত কে হতে পারে! মার মত কার আবেগ উথলে উঠবে আমাদের জন্য! খাওয়ার সময় কলমি শাক পাতে তুলে দিয়ে বলতেন, কলমি লতা কলমি লতা জল শুকোলে থাকবে কোথা? থাকব থাকব কাদার তলে, লাফিয়ে উঠব বর্ষাকালে। মার ছড়ার অন্ত ছিল না। সেই ছোটবেলায় পড়া যে কোনও ছড়াই মা অনর্গল বলে যেতে পারতেন। এত ছড়া মার জানা ছিল যে আমি মাঝে মাঝেই ভাবতাম মার সব ছড়া একদিন লিখে রাখব, কোনওদিন মা ছড়াগুলো আবার ভুলে যান যদি! মা সম্ভবত ছড়াগুলো ভুলে গেছেন, অনেকদিন তো তাঁর ছড়া বলে বলে কাউকে খাওয়াতে হয় না। মন ভাল থাকলে দিদার, সবার উপরে, হারানো সুর, সাগরিকা, বৈজু বাওরা, দীপ জ্বেলে যাই ছবির সংলাপ মা মখু স্থ বলতেন মা। রাতের অনড় স্তব্ধতা ভেঙে চমৎকার গলায় গেয়ে উঠতেন, এখনো আকাশে চাঁদ ওই জেগে আছে, তবু জেনে গেছি তুমি আছ কাছে….! এখন দিন রাত রাতের স্তব্ধতা বিরাজ করে বাড়িটিতে।

ইয়াসমিন ইশকুল থেকে ফিরে চেঁচাচ্ছে আমার ভাত কই? মতিনের বউ বলে, ভাত নাই। ভাত নাই মানে? ইশকুল থেইকা আইসা ভাত পাই নাই এইরম ত হয় নাই কোনওদিন। তা ঠিক, হয়নি কোনওদিন। মা ইশকুল থেকে ফিরলেই ভাত বেড়ে দিতেন। চিৎকার করে বাড়ি মাথায় করে ইয়াসমিন। মতিনের বউ দিয়ে সংসার চলছে না নিশ্চিত হয়ে বাবা গীতার ওপর সংসারের সমস্ত দায়িত্ব দিলেন। ছোটদার সঙ্গে বাবার যে বচসা হয়েছিল, তা আপনা আপনি মিটে গেল, যেন কোনওদিন বাবার মাথায় কোনও দ্বিকোণ, ত্রিকোণ, চতুষ্কোণ কোনও কাষ্ঠবস্তুর আঘাত লাগেনি। গীতা যা আদেশ করে, মতিনের বউ আর আমেনা সেই আদেশ পালন করে। দিন এভাবেই চলছে। দিন হয়ত চলে, আমার আর ইয়াসমিনের চলে না। গীতা আমাদের নিয়ে ছাদে দৌড়োদৌড়ি করছে, ঘরে নাচের ইশকুল খুলছে, আমাদের সিনেমায় নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কিছু যেন বাকি থেকে যায়। বাবা বাড়ি ফিরেই গীতাকে ঘরে ডাকেন, অনুমান করি রাজ্যির কথা জিজ্ঞেস করছেন, সংসার ছেলেমেয়ের কথা। কেউ আবার কোনওরকম অঘটন ঘটাচ্ছে কি না জানতে চাচ্ছেন। গীতা বাবাকে আশ্বস্ত করেন বলে যে সব কিছু সে নিখুঁত চালাচ্ছে, সবই বিন্যস্ত, সবই সন্নদ্ধ। নিষেধ থাকার পরও এক বিকেলে ইয়াসমিনকে বলি, চল নানির বাসায় মারে দেইখা আসি। ইয়াসমিন লাফিয়ে ওঠে। ভয়ডর তুচ্ছ করে একটি রিক্সা নিয়ে দুজন যখন নানির বাড়িতে পৌঁছোই, মা দৌড়ে এসে আমাদের জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠেন।

মখু টা এত শুকনা লাগতাছে কেন, খাও নাই?

মাথা নাড়ি, খাইছি।

মা কাছে বসিয়ে কি দিয়ে খেয়েছি, কে রাঁধে, কে কাপড় চোপড় গোছায়, কে বিছানা করে দেয় সব পই পই করে জিজ্ঞেস করেন। মুখে তুলে ভাত মাছ খাইয়ে আঁচলে মখু মুছিয়ে দেন। তেল না পড়া জট বাধাঁ চুল সযতে ্ন আঁচড়ে বেণি গেঁথে দেন। আড়ালে নিয়ে জিজ্ঞেস করেন বাবা কিছু বলে কি না তাঁর কথা। আমি মাথা নাড়ি। বাবা কিছু বলেন না। বাবা যে প্রায়ই আমাদের বলেন কোনও জ্বালউরা বেডি বাড়িতে নাই, এহন নিজের খাওয়া নিজে খাইবি, নিজের পরা নিজে পরবি, নিজের বুঝ নিজে বুঝবি পেটের ভেতর লুকিয়ে রাখি। মা বলেন তিনি ভাল আছেন, নানা তাঁকে শাড়ি কিনে দিয়েছেন, এখানে খাওয়া দাওয়ায় কোনও অসুবিধে হচ্ছে না, এ বাড়ির সবাই মাকে খুব ভালবাসেন।মা বারবার বলেন এই কদিনে আমি আর ইয়াসমিন দুজনই নাকি শুকিয়ে গেছি। চোখের জলে মার গাল ভিজে যায়, বুক ভিজে যায়।

আমার জন্য মন খারাপ লাগে তুমগোর? মা মা বইলা কান্দো?

আমি আর ইয়াসমিন পরস্পরের চোখে চাই। কান্দি না বললে মার যদি কষ্ট হয়, বলি না। নিরুত্তর আমাদের বুকে জড়িয়ে মা বলেন, না কাইন্দো না, কান্দা আইলে তোমরা গীতার সাথে গপ্প কইর, নাম দেশ ফুল ফল খেইল। এখন থেইকা আর কাইন্দো না।

মাথা নাড়ি। আইচ্ছা।

নোমান কামাল আইল না যে! ওদেরে বইল আসতে।

মাথা নাড়ি। আইচ্ছা।

মা খুঁটিয়ে আরও কথা জিজ্ঞেস করেন।

রান্না কেমন হয়?

ভাল হয় না।

কেন ভাল হয়না? মতিনের বউ তো খারাপ রান্ধে না।

ঝাল দেয়।

বইলা দিবা ঝাল যেন না দেয়।

শাকের মধ্যে চুল পাইছি।

শাক ভাল কইরা ধইয়া নিতে কইবা।

আইচ্ছা।

মা, তুমি কি আর কোনওদিন যাইবা না? কণ্ঠে কষ্ট চেপে বলি।

খিলালে দাঁত খোঁচাচ্ছিলেন নানি, থুতু ফেলে বললেন, কেন যাইব? নিজেরা বড় হ।

তারপরে মারে নিয়া থাহিস। ওই বাড়িত ঈদুন আর যাইব না।

মা বলেন, নোমানের ত টাকা পয়সা আছে। সে যদি আলাদা বাসা নেয়, তাইলে ত থাকতে পারি।

অনেকক্ষণ উঠোনে উদাস তাকিয়ে থেকে মা আবার বলেন, দেইখেন মা, এইবার ওই রাজিয়া বেগমরে বাড়িত আনব।

তোমার বাবা কি কিছু কয়? রাজিয়া বেগমরে বাড়িতে আনব, এই ধরনের কিছ?ু মাথা নাড়ি। না।

তোমার বাবা কি বাসায় খায়?

খায়।

খাওয়া পছন্দ হয় তার?

জানি না।

কিছু কয় না?

না।

মা পাংশুমুখে বসে থাকেন। চোখের নিচে কালি মা,বসে থাকেন। গালে চোখের জলের দাগ মা, বসে থাকেন। আমরা যখন চলে আসি, পেছনে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকেন বাসি গোলাপের মত, স্পর্শ লাগলেই ঝরে যাবেন এমন।

গীতার হাতে যখন সংসার, হাতে সংসার মানে কাজের বেডি বা ছেড়ি বা ছেড়া যেই থাকে কাজে ফাঁকি যেন না দেয়, দেখা; বাসন মাজা কাপড় ধোয়া ঘর মোছা ইত্যাদি কাজ আদেশ দিয়ে বিরামহীন করানো;পটল দিয়ে মাছ হবে, কি শাক দিয়ে মাছ হবে, ডাল পাতলা হবে কি ঘন হবে, আর ভাতের চাল কয় কৌটো নিতে হবে এসব বলে দেওয়া; গীতা যখন মাতব্বর, বাবার সঙ্গে যখন গীতার দহরম মহরম, তখনই একদিন গীতার ছোট ভাই ভাল নাম শিশির মিত্র, খারাপ নাম টুলু আসে, দেখা করে যায় বোনের সঙ্গে। এরপর প্রায়ই আসে। গীতা ঘরে ডেকে নিয়ে টুলুকে এটা সেটা খেতে দিয়ে ফিসফিস গল্প করে। টুলুর আসার খবরটি আমি আর ইয়াসমিন দুজনেই গোপন রাখি। গীতা মুসলমান বিয়ে করে মুসলমান হয়ে গেছে, তার এখন কোনও হিন্দু বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কে থাকতে পারে না, এরকম একটি অলিখিত নিয়ম চালু এ বাড়িতে। গীতা যখন ছোটদাকে নিয়ে নিজের বাড়ি যায়, সে কথা বাড়িতে গোপন রাখে। টুলুর আসার ব্যাপারটিও গোপন।

দাদা নানির বাড়িতে মাকে দেখতে যেয়ে নানির হাতের চমৎকার রান্না খেয়ে নানির পানের বাটা থেকে পান খেয়ে বাড়ি ফেরেন মখু লাল করে। ছোটদাও সন্ধেবেলা বউ নিয়ে বেরিয়ে বন্ধুদের বাড়ি হয়ে, পিওনপাড়া বউএর বাড়ি হয়ে, নানিবাড়ি গিয়ে মাকে দেখে আসেন। দুজনকেই বলি, মারে নিয়া আসো না কেন?

কেউ এর কোনও উত্তর দেন না। না দাদা, না ছোটদা। দিব্যি আছেন তাঁরা। মা-হীন অবকাশ তাঁদের কাছে মোটেও অসহনীয় বলে মনে হয় না।

দাদা একটি মোটর সাইকেল কিনে এনেছেন, লাল রঙের একশ দশ সিসি হোন্ডা।কিনেছেন কিন্তু চালাতে জানেন না। বারান্দার ঘরে রাখা হোন্ডাটি তিনি দুবেলা পরিষ্কার করেন। যতক্ষণ বাড়িতে থাকেন, হোন্ডায় বসে বিকট শব্দে ইঞ্জিন চালিয়ে ওই ঘরেই আধহাত সামনে যান, আধহাত পেছনে যান। আর হোন্ডার আয়নায় বার বার নিজের মখু টি দেখেন কেমন লাগছে। ইঞ্জিন চালিত কোনও বাহন এই প্রথম আমাদের বাড়ি এল। বাবার হঠাৎ একবার শখ হয়েছিল এম এ কাহহারের বাড়ির লাগোয়া আকন্দ লজের জুলফিকার আকন্দের পুরোনো গাড়িখানা কেনার, বায়নার পঞ্চাশহাজার টাকা দিয়েও দিয়েছিলেন। বাড়ি সুদ্ধ আমরা তখন মনে মনে সেই শাদা ফক্সওয়াগন চালাচ্ছি। কিন্তু ইঞ্জিনে কি না কি দেখা দেওয়ায় সেই গাড়ি বাবা আর কিনলেন না, বায়নার টাকাও ফেরত পেলেন না, ফেরত পাওয়ার নাকি নিয়ম নেই। হোন্ডা কেনাতে বাবাও এর তদারকি করতে লাগলেন। বারান্দার ঘরের দরজা যেন সবসময় বন্ধ থাকে, কেউ যেন আবার চুরি করে না নিয়ে যায় এটি, রাতে তিনি নিজের হাতে ঘরের দরজায় ভেতর থেকে তালা লাগাতে শুরু করলেন। সেই শখের লাল হোন্ডাটি যেটি এখনও রাস্তায় বেরোয়নি, ছোটদা তুলে নিয়ে আমাকে বললেন পেছনে বসতে। ছোটদাও এর আগে কখনও মোটর সাইকেল চালাননি। ঈশ্বরগঞ্জে বাবার হাসপাতালের জিপ চালাতে শিখেছিলেন, সেই জ্ঞান কেবল। হোন্ডা আধমাইল পর্যন্ত যেতে তিরিশবার থামল। রাস্তার লোকেরা থেমে থেমে আমাদের তিরিশবার দেখল। মেয়ে মানুষ হোন্ডায় চড়েছে, দেখার বিষয়টি ছিল এই। মেয়েমানুষ এ শহরে হোন্ডায় বসলেও কোতূক বা কৌতূহলের বিষয় হয়। অথচ এই শহরে নিতু নিজে মোটর সাইকেল চালায়, বিদ্যাময়ী ইশকুলে পড়ে নিতু ছোটবোন মিতুকে পেছনে বসিয়ে ইশকুলে যায় প্রতিদিন। শহরের বিস্ময় সে। মাঝে মাঝে আমার ইচ্ছে করে নিতু হতে, কাউকে পরোয়া না করে শহরের পথে মোটর সাইকেল চালাতে। ইয়াসমিন যখন নিতু আর মিতুর কথা বলে, আমি মোহগ্রস্তের হয়ে শুনি।

দাদা হোন্ডা শিখে হোন্ডা চড়ে শহর এবং শহরের আশেপাশের শহরগুলো কোম্পানির কাজে যেতে লাগলেন। একদিন তিনি চল তরে পাহাড় দেখাইয়া আনি বলে আমাকে তুলে নেন হোন্ডায়। অপ্রত্যাশিত আনন্দ জানলা ভেঙে হুড়মুড় করে ঢুকে আমার ভুবন ভাসিয়ে দেয়। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে এসে থামতেই আকাশ কালো করে মেঘ দৌড়োতে লাগল, যেন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে সূর্যটি, কালো ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে পোড়া সূর্য থেকে। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। ওই বৃষ্টির মধ্যেই একটি যাষনীবোঝাই নৌকোর মধ্যে আমরা, দাদার হোন্ডা, দাদা,আমি আর আমার মৃত্যুভয় উঠে পড়ি। নৌকোডুবিতে প্রাণটি যে আজ সকালে হারাতে হচ্ছে এ জেনেও জীবনে প্রথম পাহাড় দেখার ইচ্ছেজ্ঞট আমি কিছুতেই হাতছাড়া করি না। শম্ভগু ঞ্জ পৌঁছে, বাসের বাজারের কোলাহল পেরিয়ে হোন্ডা ছুটে চলল নির্জনতার দিকে। বাতাসে চুল উড়ছে, জামা উড়ছে। যেন এ আমি আর দাদা নই, দুটো প্রজাপতি উড়ে যাচ্ছে। যতদূর দৃষ্টি যায় কোনও বসতি নেই, কেবল বিল হাওড় আর ধানক্ষেত। গলা ছেড়ে হেঁড়ে গলায় গান গাইছি, মখু স্থ কবিতা বলছি, দাদার পেট ভর্তি গল্প, বানানো অবানানো, বলে যাচ্ছেন। দাদা ছোটবেলায় আমাদের গল্প শোনাতেন অনেক। কত আর গল্প জানে একজন মানুষ! দাদা পুরোনো গল্পগুলো আবার শোনাতে গেলে আমরা বিরক্ত হতাম। নতুন গল্পের জন্য জেঁকে ধরতাম। একদিন দীর্ঘ একটি গল্প শোনাবেন বলে আমাদের ডাকলেন। গল্পটি নতুন। খেয়ে দেয়ে লেপের তলায় একেবারে গল্প শোনার পরিবেশ তৈরি করে শোয়া হল, দাদা শুরু করলেন, অচিনপুর নামের এক গ্রামে আলাউদ্দিন নামের একটা কাঠুরে ছিল।একদিন দুপুরে বাড়িতে খুব খাওয়া দাওয়া কইরা একটা নতুন লুঙ্গি পইরা,কান্ধে একটা গামছা নিয়া আলাউদ্দিন বাড়ির বাইর হইল। সামনে বিশাল মাঠ, কোথাও আর কিছু দেখা যায় না। সেই মাঠে আলাউদ্দিন হাইটা হাইটা যাইতাছে, যাইতাছে তো যাইতেই আছে। যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে ..

তারপর?

তারপর মানে?

তারপর কি হইল? কই গিয়া পৌঁছল?

এহনো কোথাও পৌছায় নাই? এহনো যাইতেই আছে। যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে..

আমি উৎসুক জানতে আলাউদ্দিন কোনও নদীর ধারে পৌঁছোল নাকি কোনও বটগাছের কাছে। কিন্তু আমার জানা হয় না কারণ দাদা ওই রাতে এক যাইতে যাইতে ছাড়া আর কিছু বললেন না। পরদিন ঘুম থেকে উঠেই দাদাকে জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কি হইল, আলাউদ্দিন কই গেল? দাদা বললেন,এহনো যাইতেই আছে। এহনো যাইতেই আছে?

হ এহনো যাইতাছে।

কই যাইব?

ওইডা ত পরে জানবি। আগে যাইতে থাকুক।

সপ্তাহ পার হওয়ার পরও দাদা বললেন, যাইতাছে এহনো। কবে পৌঁছবে, কোথাও গিয়ে পৌঁছবে, কি ঘটবে পরে তার কিছুই দাদা জানান না। নতুন কোনও গল্প শুরুও করেন না। কারণ একটি গল্প তো তিনি বলছেন। একমাস পরও দাদা বললেন এখনও আলাউদ্দিন যাচ্ছে। আমি আর ইয়াসমিন গভীর চিন্তায় ডুবে থাকি, তর কি মনে হয়?আলাউদ্দিনের শেষ পর্যন্ত কি হইব? ইয়াসমিনের বিশ্বাস আলাউদ্দিন ক্ষিধের চোটে মরে যাবে পথে। দাদার কি বিশ্বাস তা তিনি কখনও বলেন না। দাদার আলাউদ্দিনের যাওয়া কখনও শেষ হয়নি। দাদার কাছ থেকে আর কোনও গল্পও আমাদের শোনা হয়নি। যেতে যেতে আমার ইচ্ছে করে আমাদের এই পথও না ফুরোক কোনওদিন। তারাকান্দা ফুলপুর পার হয়ে কাঁচা রাস্তা পাকা রাস্তা ভাঙা রাস্তা পেরিয়ে কংস নদীর সামনে আসি। বিষম স্রোতের নদী। যেন দুপাড় এক্ষুনি ভেঙে চুরে নদীর পেটের ভেতর ঢুকে যাবে। দুটো নৌকোর একটি পাটাতন, সেই পাটাতনের ওপর বাস ট্রাক ওঠে, দড়ি টেনে নদী পার করা হয়। নদী পার হতে হতে দাদা আমাকে উজান, ভাটি, লগি টানা কাকে বলে বোঝান, নদী এবং নৌকোর জীবন সম্পর্কে বোঝান। কংস পেরিয়ে আবার হাওয়ার বেগে ছোটা। ধান খেত, পাট খেত, রাস্তার ওপর শুকোতে দেওয়া ধান, পাখির এসে খুঁটে খাওয়া, মানুষের বাড়িঘর, উঠোন মাঠ দেখতে দেখতে হালুয়াঘাট পার হয়ে আরও ভেতরে গারো মেয়েদের ধানবোনা ধানকাটা, পিঠে বাচ্চা বেঁধে হেঁটে যাওয়া দেখতে দেখতে জয়রামকুরায় সুন্দর একটি হাসপাতালের সামনে থামি। এক অস্ট্রেলিয়ান গারোদের জন্য এই হাসপাতালটি বানিয়েছেন। দাদা অস্ট্রেলিয়ান ডাক্তার নেইল পালকারের সঙ্গে কথা বললেন, তাঁকে ওষধু পত্র দিলেন। আমি হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাহাড় দেখছি তখন। পাহাড়ের অন্য পাশে ভারত। বাংলাদেশ থেকে মেঘ ভেসে যাচ্ছে ভারতের দিকে, পাখি উড়ে আসছে ওদিক থেকে এদিকে। দাদাকে জিজ্ঞেস করি, পাহাড় পার হইয়া ওই পাশে যাই যদি! দাদা বললেন না যাওয়া যাবে না, ওইটা অন্য দেশ। পাহাড়ে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে অন্য দেশ ভারত, আমার মনে হয় আমি শুনতে পাচ্ছি ভারতের হৃদপিণ্ডের শব্দ, শুনতে পাচ্ছি শ্বাস ফেলার শব্দ। এত কাছে, এত কাছে ভারত যে ইচ্ছে করে কানে কানে কিছু কথা কই। কই ভাগ হলি কেন রে? তুই কি আমাদের পর? পাহাড় দেখে ফেরার পথে দাদা অনেকের সঙ্গে থেমে থেমে কথা বললেন। দুটো ফার্মেসিতে থামলেন, চা মিষ্টি দেওয়া হল আমাদের। সারাদিন না খাওয়া অথচ ক্ষিধের কিছুই অনুভব করি না। ফার্মেসির একটি লোক পেছনে তাঁর বাড়িতে বউ বাচ্চার সঙ্গে পরিচয় করাতে ঢোকালেন, বউএর সঙ্গে দিব্যি কথা বলি এমনকি বাচ্চাজ্ঞটকে কোলে নিয়ে নাম জিজ্ঞেস করি। ওখান থেকে বেরিয়ে পথে দাদা বলেন, বাহ, তর তো উন্নতি হইছে। তুই ত এমনিতে মানুষের সাথে কথা কস না। আজকে কইতে দেখলাম।

আমি হেসে বলি, সকালে ডেল কার্নেগি পড়ছি কয়েক পাতা। মনে হয় সেই কারণেই।

দাদা অট্টহাসি হাসেন। আমরা আবার হাওয়ায় ভেসে যাই।

দাদাকে এক সময় জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা দাদা, এই যে তুমি সবার সাথে এত সুন্দর ব্যবহার কর, হাইসা হাইসা কথা কও, সেই নিশিবাবুর সাথে, মাথায় হ্যাট গলায় স্টেথোককোপ ঝুলাইয়া মাটির রাস্তায় সাইকেল চালাইয়া আসা হাতুড়ে ডাক্তারটার সাথে, কেমিস্ট নাজমুলের সাথে, জনমানবহীন এই বনবাসে জীবন কাটানো হাসপাতালের ওই ডাক্তারের সাথে—তুমি কি ডেল কার্নেগি মখু স্ত করছ?

দাদা অনেকক্ষণ হেসে উত্তর দেন, ডেল কার্নেগি তো আমার সাথে দেখা করতে আইছিল, আমার লাইফটা দেইখা গিয়া উপদেশমূলক রচনা লিখছে।

ছোট ছোট কাপে চা বিক্রি করে পথের ধারে ঝপু ড়িগুলোয়, চায়ের তৃষ্ণায় থেমে ওখানে চা খেতে গেলে দাদা বলেন, চা খাইস না, চা খাইলে ভেতরে ক্ষয় হইয়া যায়। দেখস না চায়ের কাপে চা রাইখা দিলে কিরম দাগ পইরা যায়, শত চেষ্টাতেও চায়ের কাপের দাগ আর উঠতে চায় না। এইভাবে তর কইলজা ক্ষয় হইয়া যাইব চা খাইলে, তর হৃদপিণ্ডটাও চায়ের কাপের মত নষ্ট হইয়া যাইতাছে। বীভৎস হইতাছে। ঝাঁঝরা হইয়া যাইব একদিন।

মা দধু ছাড়া চায়ে আদা মিশিয়ে দেন, সেই চায়ের স্বাদের ধারে কাছে গ্রামের বাজারের দধু মেশানো বাসিগন্ধের চা দাঁড়াতে পারে না। তবওু এই ঝপু ড়িদোকানের চা আমি পরমানন্দে পান করি, পান করি ঘরের বাইরে বলেই। বাহির আমাকে টানে। সষের্ ফুলে ছেয়ে থাকা গ্রামের হলুদ ক্ষেত আর বাজারের নানারকম ঝপু ড়ি দোকান দেখতে আমার আনন্দ হয়। ব্রহ্মপুত্র পার হওয়ার সময় অদ্ভুত সুন্দর রঙে সেজে ওঠা আকাশ দেখতে দেখতে ভয় উবে যায়, নৌকো ডুবে মরে যাওয়ার ভয়। যখন বাড়ি পোঁছই, সারা গা ধুলোয় কিচকিচ, এমন কি কথা বলতে গেলে দাঁতে কিড়কিড় করে ওঠে ধুলো। ধুলোয় চুল জট হয়ে আছে। দেখতে আমাকে, ইয়াসমিন বলে, ভূতের মত লাগছে। ভূত পেত্নী যেমনই দেখাক না কেন আমাকে, এই ভ্রমণ আমাকে আশ্চর্য রকম সুখী করে। অর্ধেক রাত অব্দি দাদাকে ধমকেছেন বাবা, তর মাথায় ত বুদ্ধি টুদ্ধি আছে জানতাম। এই মেয়েরে নিয়া তুই মোটর সাইকেলে বাইর হস, মাইনষে কি কইব!

রাতে শুয়ে কড়িকাঠের দিকে চোখ, ইয়াসমিনকে বলি, ধর আমি একটা পাহাড়, আমার শরীরের অর্ধেকটা ভারত, অর্ধেকটা বাংলাদেশ। আমার ডান হাত বাঁদিকে যাইতে পারবে না, আমার বাঁ হাত ডান দিকে আসতে পারবে না। কিন্তু আমার ওপর দিয়া তুই যদি পাখি হস, যাইতে পারবি। পাখির স্বাধীনতা মানুষের স্বাধীনতার চেয়ে বেশি। নানির বাড়িতে আমরা গিয়েছি, সে খবর বাবার কাছে পৌঁছে যায়। বাবা আমাকে ডেকে বললেন, ঠ্যাং লম্বা হইয়া গেছে তর। আরেকদিন যদি শুনি বাসার বাইর হইছস, টেংরি ভাইঙ্গা ফেলব। বাবার হুমকি কাজ করে না। আমি ঠিকই নানির বাড়ি যেতে থাকি। মাকে বলি, মা চল। নানি বলেন, তুই কইলেই হইব নাকি! নোমান কামালরে পাঠা, তর বাপরে পাঠা। তর বাপ আইয়া নিয়া গেলে যাইতে পারে। শুকনো-মখু -মা, শুকনো- ঠোঁট-মা বলেন, ওর বাপ কি আসবে? মেয়েদুইটার কষ্ট দেইখাও ত মখু বুইজা রইছে। কি জানি যদি রাজিয়া বেগমরে বাড়িত তুলে, তাইলে তো আর কারও না হোক, মেয়েদুইটার কষ্ট হবে!

নানির বাড়িতে যাওয়ার আসার পথে দেখি আজিজ প্রিন্টাসর্ নামে একটি ছাপাখানা।রিক্সা থামিয়ে সেই ছাপখানায় নেমে ডিমাই সাইজ প্রতি ফর্মা ছাপতে খর্চা কত জেনে আসি। এরপর দাদার কাছে টাকা চেয়ে কাগজ কিনে ছাপাখানায় দিয়ে ওখানে বসেই সেঁজুতির দ্বিতীয় সংখ্যার প্রুফ দেখি। মোহাম্মদ আজিজ নামের লোকটি ছাপাখানার মালিক, দাদা চেনেন তাঁকে, দাদাও মাঝে মাঝে দেখে আসেন ছাপা কদ্দুর। একদিন ছাপার বাকি খরচ দিয়ে বাড়িতে সেঁজুতি নিয়ে আসেন। সেঁজুতি এবার শাদা কাগজে, দাদা একটি কপি হাতে নিয়ে বললেন, নাহ, ছাপা ভাল হয় নাই। এরপর থেইকা জমানে ছাপাইস। জমান হইল সবচেয়ে ভাল প্রেস। পাতা পত্রিকা ত জমান থেইকাই ছাপতাম। দাদা যখন তাঁর এককালের পাতার কথা স্মরণ করেন, তাঁর চোখ থেকে ঝিলমিল আনন্দ ঝরে। পাতা নামে দাদা আর তাঁর বন্ধুরা মিলে যে সাহিত্যের কাগজ প্রকাশ করতেন, তা আসলেই খুব সুন্দর ছিল। পাতার চিঠি লেখার কাগজ, এমনকি সদস্য হওয়ার কাগজ, সদস্যচাঁদা নেওয়ার রশিদ এসবও ছাপা ছিল চমৎকার জলছাপঅলা, দাদা এখনও স্মৃতি হিসেবে পাতার কাগজপত্র রেখে দিয়েছেন কাছে। মাঝে মাঝে বের করে ধুলো ঝেড়ে হাত বুলোন আর বলেন, দেখিস পাতা আমরা আবার ছাপাইয়াম। যে তিনজন পাতা ছাপতেন তার মধ্যে একজন শীলার ভাই, শীলার সঙ্গে দাদার প্রেম হওয়াতে চিকন ফরহাদ দাদার মখু দর্শন করা বন্ধ করে দিয়েছেন, আরেকজন মাহবুব, ও ছেলে পাগল হয়ে এখন মানসিক রোগীর হাসপাতালে শেকল দিয়ে বাধাঁ। দাদা একটি কেন দশটি সাহিত্যপত্রিকা ছাপতে পারেন ইচ্ছে করলে কিন্তু পাতা নামটি ব্যবহার করতে পারবেন না। পাতা দাদার একার সম্পত্তি নয়। দাদা ছিলেন যগু ্ম সম্পাদক, আসল সম্পাদক ছিলেন ফরহাদ। দাদা বলেন, ফরহাদ আর কি করত, সব ত আমিই করতাম! তা বলে স্বস্তি জোটে অবশ্য, কিন্তু কোনও পত্রিকার নাম পাতা দেওয়ার অধিকার জোটে না। দাদা আবার পত্রিকা বের করতে চান পাতা নামে, খবরটি শুনে ফরহাদ জানিয়ে দিয়েছেন, দাদার বিরুদ্ধে তিনি মামলা করবেন।

আমি যখন সেঁজুতিতে ডুবে আছি, একটি ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে বাড়িতে। ইয়াসমিনের পিঠে ছোট্ট একটি পাখা গজায়। পাখা গজানোটি ভয়ঙ্কর নয়, পাখা গজানোর কারণে যেটি ঘটে, সেটি ভয়ঙ্কর। ইয়াসমিনের এই পাখি হওয়ার ইচ্ছে কোনও ভারত বাংলাদেশ সীমানা অতিক্রম করার জন্য নয়, তার নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে একদিন খুব গোপনে উড়ে যাওয়ার জন্য। পাড়ার ফুটফুটে ছেলে বাদল, ইয়াসমিনেরই সমবয়সী, দাঁড়িয়ে থাকত রাস্তায় ইয়াসমিন যখন ইশকুলে যেত, একদিন সাহস করে এগিয়ে এসে কথা বলেছে। রাস্তায় কথা বললে আবার কে না কে দেখে ফেলে কি না কি কাণ্ড ঘটায়, তাই পরদিন সে ইয়াসমিনকে বোটানিক্যাল গার্ডেনে যেতে বলে। গণ্ডি থেকে বেরোবার এমন তীব্র আকর্ষণ ইয়াসমিনের, সে ইশকুল শেষে একটি রিক্সা নিয়ে সোজা সেই গার্ডেনে যায়। বাদল গিয়েছিল তার এক কাকাকে নিয়ে। সেই কাকা বাদল আর ইয়াসমিন বোটানিক্যাল গার্ডেনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, গাছপালা দেখছে, বাগান জুড়ে ফুটে থাকা নানা রঙের ফুল দেখছে, নদী দেখছে, কিন্তু দেখছে না ওদের দেখে পাড়ার একটি ছেলের বাবাকে খবর দেওয়ার জন্য দৌড়ে যাওয়া। খবর পেয়ে বাবা এক মুহূতর্ দেরি না করে সেই গার্ডেনে নিজে গিয়ে ধরে আনেন ওদের। বাদলকে চুলের মুঠি ধরে বাড়িতে এনে হাত পা শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে বারান্দার ঘরে সারা বিকেল চাবকেছেন বাবা। বাদলের আর্তনাদে সারা পাড়া কেঁপেছে, বাবা পরোয়া করেননি। অর্ধমৃত বাদলকে অর্ধচন্দ্র দিয়ে বাড়ির বের করেন, তাও আবার পুলিশের হাতে দিতে। মেয়ে-কিডন্যাপের মামলা ঠোকেন সেদিনই, বাদলকে কোমরে দড়ি বেঁধে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। জেল থেকে ছেলে ফিরে এলে এ পাড়া ছেড়ে বাদলের বাবা সমীরণ দত্ত চলে যান। কেবল বাদলকেই নয়, ইয়াসমিনকে ঘরের দরজা বন্ধ করে বাবা মেরেছেন একই চাবুকে।ওর শরীরের একটি ইঞ্চিও বাদ ছিল না কালসিটে দাগ থেকে। হু হু করে জ্বর আসে ওর, মাথার ঘন কালো চুল মুঠো মুঠো উঠে আসতে থাকে। এই ঘটনার পর ইয়াসমিন প্রায়ই ইশকুল থেকে ফিরে মন খারাপ করে বসে থাকে। ইশকুলে ওর ক্লাসের মেয়েরা বলতে শুরু করেছে, তুই নাকি কোন ছেড়ার সাথে ভাইগ্যা গেছিলি গা? ময়মনসিংহকে খুব বড় শহর বলে মনে হয়, কিন্তু লোকে যখন রসের গল্প বলতে গিয়ে, রজব আলীর ছোট মেয়ে একটা ছেলের সাথে ভাইগ্যা গেছিল, হাহা হিহি বলে আর এসব আমার কানেও যখন আসে, বুঝি শহরটি বড় ছোট। মানুষের মনও বড় ছোট। বাবা যদি সেদিন ওই ঘটনাটি না ঘটাতেন, ইয়াসমিন ওই গার্ডেন থেকে ফিরে আসত বাড়িতে, দেরি হইছে কেন ইশকুল থেইকা ফিরতে জিজ্ঞেস করলে হয়ত বলত, রিংকুর বাসায় গেছিলাম। ওর বান্ধবী রিংকু ইশকুল শেষ হলে রিংকুর বাড়ি থেকে ঘুরে আসা এমন কোনও অপরাধ নয়। সেদিন ইয়াসমিনের কৌতূহল বাদলের জন্য যত ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল গার্ডেনের জন্য। সেই গার্ডেন একবার দেখা হয়ে যাওয়ার পর ওর গার্ডেনের শখ হয়তো মিটত, গোপনে গোপনে গণ্ডির বাইরে যাওয়ার আনন্দ ও পুষে রাখত নিজের ভেতর। কেউই ইয়াসমিনের দিকে ছুঁড়ে দিত না কোনও ছেড়ার সাথে ভাইগ্যা যাওয়ার জন্য ঘণৃা। ইয়াসমিন নিজেকে এমন অপরাধী ভাবত না, সকলের চক্ষু থেকে এমন প্রাণপণে লুকোতে চাইত না নিজেকে।

গীতা টুলুকে কিছু দিয়েছে, বস্তায় করে। ছোট্ট খবর। এই খবরটি বাবার কানে পৌঁছয়। বাবা দাপাদাপি করেন ঘরে। ফিসফিস কণ্ঠ, কি দিছে রে কি দিছে?

কি জানি, চাইল টাইল মনে হয়। আমেনা বলে।

টুলু কয়দিন আইছে?

আইছে অনেকদিন।

আইয়া কি করে?

এই গপ্প সপ্প করে।

কার সাথে করে?

তার বইনের সাথেই।

বাবা যখন গভীর করে কিছু ভাবেন, চশমা খুলে ফেলেন এক টানে। মাথা নিচু করে বসে থাকেন। চোখ মুহূর্তে হয়ে ওঠে লাল। পায়চারি করেন বারান্দায়। হাতদুটো পেছনে। কখনও কোমরে। মাঝে মাঝে এক মাথা কালো কোঁকড়া চুল টেনে পেছনে সরিয়ে দিচ্ছেন। বসছেন চেয়ারে, চেয়ার সশব্দে সরিয়ে উঠে যাচ্ছেন। আবার বসছেন। বাবাকে এ অবস্থায় দেখলে বাড়ির সবার একটিই কাজ, অপেক্ষা করা, কারণ একটি বিষ্ফোরণ ঘটতে যাচ্ছে খুব শিগগির। কিন্তু এবার বিস্ফোরণ কিছুরই হল না। শান্ত কণ্ঠে তিনি দাদাকে ঘরে ডেকে নিয়ে বললেন, যা তর মারে নিয়া আয়।

আমরা যখন মাকে নিয়ে আসতে গেলাম, মা চমকালেন না, যেন অপেক্ষা করেই ছিলেন। মার ওই শুকনো মুখে হাসি ফুটে উঠল, মা আড়াল করতে পারেন না কোনও আনন্দ। চোখে ঠোঁটে গালে খুশির রেণু চিকচিক করে।

 

অবকাশে মার উপস্থিতি বাবা আড়চোখে দেখেন। কোনও কথা বলেন না। কিন্তু মা ঠিকই বাবার ভাত টেবিলে সাজিয়ে রাখেন। বাবা যেভাবে সংসার চালাতে বলেন, আগের চেয়ে আরও নিপণু ভাবে সেই সংসার চালাতে থাকেন। ঘরের মেঝেগুলো ঝকঝকে, উঠোন তকতকে। বাবার ঘরটি আলোময়, পরিচ্ছত। আলনায় কাপড় ধোয়া, গোছানো। বিছানায় পরিষ্কার চাদর। রাতে বাবা বাড়ি ফেরার আগেই বাবার বিছানা মশারি টাঙিয়ে তৈরি করে রাখা। আমাদের চুল বাঁধা, চুলে ফিতের ফুল বাধাঁ। ক্ষিধে লাগার আগেই আমাদের খাওয়ানো, পানি চাইতেই পানি দেওয়া। না চাইতেই ডাবের পানি, বেলের শরবত, ডাশা পেয়ারা, পাকা আম, জাম ভর্তা, ডালিমদানা হাতের কাছে, মুখের কাছে। মার উপস্থিতি আমাদের সবাইকে আরাম দিতে থাকে।

০৯. চিকিৎসাবিদ্যা

মেডিকেল ভর্তি হওয়ার জন্য এ বছর কোনও পরীক্ষার ব্যবস্থা হয়নি। মেট্রিক ইন্টারমিডিয়েটের পরীক্ষার ফল দেখে ভতির্, বারোশ নম্বরের ওপর যাদের আছে, তাদেরই নেওয়া হয়েছে। দু পরীক্ষায় বারোশর কিছু বেশি ছিল আমার, ময়মনসিংহ যদিও আমার প্রথম পছন্দ, নম্বর যেহেতু তেরোশ-চৌদ্দশ নয়, পছন্দ বাতিল করে আমাকে পাঠানো হয়েছে সিলেট মেডিকেলে। মুহূর্তে তৎপর হয়ে ওঠেন বাবা, নানা রকম দরখাসে ্ত আমার সই নেন। দাদাকে বললেন তৈরি হতে। দাদা আমাকে নিয়ে শেষরাতের ট্রেনে চড়লেন। আখাউড়া ইস্টিশনে সকালে ট্রেন থামল, এখান থেকে ট্রেন বদলে সিলেটের ট্রেনে উঠতে হবে আমাদের। ইস্টিশনে পানিঅলা, বিড়িঅলা, বাদামঅলা, ঝালমুড়িঅলা কলাঅলা পানঅলা বিস্কুটঅলার ভিড়ে আমি হারিয়ে যাই, দাদা আমাকে টেনে নিয়ে বসিয়ে দেন মেয়েদের অপেক্ষা করার একখানা ঘর আছে, সেখানে। কিছু বোরখাঅলা, কিছু বোরখাহীন, কিছু ট্যাঁ ট্যাঁ, কিছু আ আ, কিছু গু, কিছু মুত, কিছু বমি, সবকিছুর মধ্যিখানে ভদ্রলোকের মেয়ে ইস্ত্রি করা জামা পাজামা, বসে থাকি। আখাউড়া ইস্টিশন থেকে ট্রেন ছাড়ছে সিলেটের, নাগারে লোক উঠছে, লুঙ্গি, পাজামা, প্যান্ট, খালি পা, জুতো পা, টুপিমাথা, টুপিছাড়া—সুটকেস, ট্রাংক, বস্তা, ঠেলাঠেলি ভিড়। মেয়েমানুষ বলে আমাকে বসার একখানা জায়গা দেওয়া হয়েছে, মেয়ের ভাই বলে দাদাও ঠেলেঠুলে বসার একটি জায়গা করে নিলেন আমার পাশে, পরপুরুষের গায়ে যেন আমার গা না লাগে। সেকেন্ড ক্লাসে ওঠা থার্ড ক্লাস লোকগুলো সিট দখলে যায় না, মেঝেতেই পাছা পেতে বসে থাকে, কারও সামনে বস্তা, কারও সামনে খোলা দরজা গলে আসা লু হাওয়া। কোণে জড়সড় জবুথবু কটি মেয়েমানুষ, নাকে নথ, মুখে খিল। বুক পকেটে টিকিট রেখে ,সেকেন্ড ক্লাস পুরুষেরা খলবল করে কথা বলে যাচ্ছে, কান পেতে থেকেও বুঝতে পারি না একটি শব্দও।

ও দাদা কি ভাষায় কথা কয় এরা?

সিলেটি ভাষা সিলেটি ছাড়া আর কারও বাপের সাধ্য নাই যে বোঝে বলে নিরুদ্বেগে দরদাম করে এক ঠোঙা বাদাম কিনে, সঙ্গে এক চিমটি ঝালমশলা, দাদা বেশ মন দিয়ে খেতে লাগলেন। ভিড়ে গরমে চেঁচামেচিতেও আমার আনন্দ হতে থাকে নতুন একটি শহরে যাচ্ছি বলে। দাদা আমাকে জানলা থেকে দূরের একটি মাঠ দেখিয়ে বললেন ওই যে মাঠটা দেখতাছস, ওই মাঠটার ওইপারেই হইল ভারত। ইচ্ছে হয় দৌড়ে মাঠটি পেরিয়ে যাই, দেখে আসি ভারত দেখতে কেমন, ভারতের আকাশ দেখতে কেমন। ট্রেন যায় পাহাড়ের গা বেয়ে ঝরনার জলে ভিজতে ভিজতে, চা বাগানের কিনার ধরে, অন্ধকার অন্ধকার অরণ্য ডিঙিয়ে। হাত বাড়িয়ে দিই জানলার বাইরে, আঙুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় ঝুলে পড়া ডালে, পাতায়।

 

নতুন একটি শহরে পা দিয়ে খুশির ফোয়ারা ওঠে মনে। এটি ময়মনসিংহ নয়, অন্য একটি শহর, এই শহরের অন্য একটি নাম, নিজেকে বোঝাতে বারবার পড়ি দোকানের সাইনবোডর্। স্টেশন রোড, সিলেট। পুরান বাজার, সিলেট। দরগা রোড, সিলেট। এ শহরে দাদা আগে এসেছেন বলে জানেন কি করে কি করতে হয়, এখানকার রিক্সাঅলাদের ডাকতে হয় ড্রাইভার, রিক্সাঅলা বলে ডাকলে বিষম রাগ করে। একটি চৌকোনা রিক্সায় চড়ে আমরা শহরে ঢুকে পড়ি, ছোট একটি রেস্তোরাঁয় অসম্ভব ঝাল খাবার খেয়ে একটি হোটেলে শুতে যাই। জীবনে প্রথম কোনও হোটেলে রাত কাটানো আমার। দাদা বেঘোরে ঘুমোন। পাশের ঘর বা বারান্দা থেকে আসা খরখরে কথা আর হাসির শব্দে আমার হাত পা পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যায়। এক্ষুনি বুঝি লোকগুলো দরজা ভেঙে এ ঘরে ঢুকবে, এক্ষুণি বুঝি আমাকে কেটে টুকরো করবে, ছিঁড়ে খাবে, আমার সর্বনাশ করবে। দাদাকে আমি কাপাঁ গলায় নিচু স্বরে, উঁচু স্বরে, কান্না স্বরে ডেকে যাই। দাদার ঘুম ভাঙে না। এক লাফে দাদার বিছানায় গিয়ে ধাক্কা দিয়ে জাগাই, ঘুমচোখে কি হইছে বলে পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়েন। ধড়ফড় বুক নিয়ে দাদার বিছানার এক কিনারে গুটি মেরে শুয়ে থাকি, সারারাত ঘুমোতে পারি না। ভোরের আলো ঘরে এলে, ঘরের বাইরের খরখরে গলা থেমে এলে আমার ধড়ফড় থামে।

তুই রাইতে ডরাইছিলি নাকি?

হ।

আরে ধুর! এত ডরাস কেন!

সকালে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে, বদলির চিঠি জমা দিয়ে আমরা ট্রেন ধরলাম, ট্রেন সারারাত ধরে অন্ধকার অরণ্য পেরোলো, আর আমার গা ছমছম করল সারারাত।

 

সিলেট থেকে ফিরে আসার পর শাদা টেট্রনের কাপড় কিনে দুটো এপ্রোন বানিয়ে দিলেন বাবা, এপ্রোন পরে কলেজে যেতে হবে। নিজের শহরের কলেজে, বাপের কলেজ, বাড়ি থেকে দুদিনের পথ পাড়ি দিয়ে নয়, গাঙ্গিনার পাড় পেরিয়ে রেললাইন পেরিয়ে পুরোনো আবাসিক ইশকুল পেরিয়ে চড়পাড়ার মোড় ছাড়িয়ে যে কলেজ, সে কলেজে। জোয়ান রিক্সাঅলা হলে পনেরো মিনিট, বুড়ো হলে পঁচিশ। সিলেটের পাট চুকিয়ে ময়মনসিংহে। আদেশ মত এপ্রোন পরে কলেজে যাই, এপ্রোনের তলে জামা পাজামা, ওড়না পরার ঝামেলা নেই, এপ্রোনের তলে ওড়না আছে কি নেই তার খোঁজ কেউ নেয় না। এই ঘটনাটি আমাকে আনন্দ দেয় বেশ। ওড়নার বাধ্যবাধকতা নেই। যে কেউ, ছেলে বা মেয়ে, যে পোশাকই পরুক না কেন, ওপরে চাপাতে হবে শাদা এপ্রোন। এপ্রোনে কোটের কলারের মত কলার আছে, পকেট আছে, কোমরে বেল্ট আছে—পরে পুলক লাগে আমার। কলেজে সব অচেনা মখু । বেশির ভাগের বাড়ি ঢাকায়, থাকে হোস্টেলে, আমি আর হাতে গোনা দএু কজন কেবল শহরের। মেয়েদের ইশকুল কলেজে পড়ে আসা মেয়ে আমি, ছেলেছোকরা দেখে অভ্যস্ত নই, আর এখানে ক্লাসে, করিডোরে, মাঠে, সিঁড়িতে বাঁকা চোখের, হাসি চোখের, তেরচা চোখের, হাঁ হয়ে থাকা চোখের সামনে নিয়ে আমাকে হাঁটতে হয়, ভয় ভয় লাগে। জড়তা আমাকে নিবিড় করে জড়িয়ে রাখে। যে কক্ষটিতে আমাদের, নতুন ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের, প্রথম নিয়ে যাওয়া হল, সে কক্ষের দরজার মাথায় শাদা কালিতে লেখা শব ব্যবচ্ছেদ কক্ষ। কক্ষটিতে ঢুকতেই বিশ্রি একটি গন্ধে আমার চোখ নাক কুঁচকে থাকে,নাড়ি পাক খেতে থাকে, মুখে থুতু জমতে থাকে, বমি ঠেকাতে শ্বাস বন্ধ করে রাখি, কিন্তু শ্বাসেরও তো বন্ধ হয়ে থাকার একটা সীমা আছে, সীমা ছাড়ালেই গন্ধটি ছোবল দেয় নাকে, আর নাক থেকে পেটে পিঠে পায়ে, এমনকি পায়ের আঙুলেও ছড়িয়ে পড়ে। মরা মানুষগুলো টেবিলে শোয়া, টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে শাদা এপ্রোন পরা ছেলেমেয়ে, কেবল দাঁড়িয়ে নয়, রীতিমত ঝুঁকে, যেন মরা মানুষের গায়ে দোলনচাপাঁর ঘ্রাণ, শুঁকছে। মানুষগুলো একসময় হাসত, কাঁদত, কাউকে ভালবাসত, আঙুলে সুঁই ফুটলে চিৎকার করত, আর এখন এই যে কাটা হচ্ছে, ছেঁড়া হচ্ছে, বুকের মাংস সরিয়ে ভেতরের হৃদপিণ্ড তুলে আনা হচ্ছে, এতটুকু টের পাচ্ছে না। শিরদাঁড়া বেয়ে এক শীতল মৃত্যু নামতে থাকে, ছড়িয়ে যেতে থাকে আমার সমস্ত শরীরে। একদিন সবাই আমরা এক এক করে মরে যাব, মরে এরকম অনুভূতিহীন এক একটি ববস্তু হয়ে উঠব। দল ফেলে রেখে দু্রত বেরিয়ে আসি কক্ষটি থেকে, সঙ্গে মৃত্যু আসে গায়ে গায়ে লেগে। করিডোরে হাঁটি, মৃত্যুও হাঁটে। বাইরে ইউকেলিপটাস গাছের তলায় বসি, মৃত্যুও বসে।

পুরো ক্লাসের ছেলেমেয়েদের চারভাগ করে দেওয়া হল দ্বিতীয় দিন। মাথা, বুক, হাতপা, তলপেট। আমার ভাগে তলপেট পড়ল, অথবা তলপেটের ভাগে আমি। ব্যস, এখন মরা মানুষ কেটে কেটে তলপেট শেখো, তলপেটে যা যা আছে, ট্রেতে নিয়ে, সঙ্গীসহ একটি নিরিবিলি কোণ বেছে নাও,কানিংহামের বই আছে, একজন পড়বে,আরেকজন শুনবে, একজন বুঝবে, আরেকজন প্রশ্ন করবে, একজন সায় দেবে, আরেকজন আপত্তি তুলবে। সদলবলে পড়া আর যাকে দিয়ে হোক আমাকে দিয়ে হবে না। হোস্টেলের ছেলেমেয়েরা স্থায়ী সঙ্গী বেছে নিয়েছে পড়ার জন্য, আমার স্থায়ী অস্থায়ী কিছুই নেই, আমি একা। বাড়ি থেকে রিক্সা করে একা আসি, ক্লাস শেষে একা বাড়ি চলে যাই, একা পড়ি। বাবা ঢাউস ঢাউস কিছু বই কিনে দিয়েছেন, বড় বড় রঙিন ছবি আছে ওতে, পাতা উল্টো যখন বইয়ের ছবি দেখি, ইয়াসমিন বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে। পড়তে গেলে ষাট ভাগই মাথায় ঢোকে না, পনেরো ভাগ ঢুকেই আবার বেরিয়ে যায়, আর পঁচিশ ভাগ মাথা তো মাথা, আমার ত্রিসীমানায় ঘেষে না। গ্রে -র এনাটমি বইটি দেখে সবচেয়ে খুশি হন মা। মা এসব বইয়ের নাম আগেই জানেন, বাবা যখন ডাক্তারি পড়তেন, তিনি গুছিয়ে রাখতেন, চাইলে এগিয়ে দিতেন। বাবার আমলে দৈর্ঘ্যে প্রস্থে এত বিশাল ছিল না বই, আমার আমলে এসে সব আজদাহা পাথর আর গাছের গুঁড়ির আকার ধারণ করেছে। যখন বইয়ের ওপর ঝুঁকে থাকি, পড়ি কি না পড়ি, মা লেবুর শরবত, নয়ত মুড়িভাজা, নয়ত আদা চা রেখে যান টেবিলে, নিঃশব্দে। বাড়িতে আদর উপচে পড়ছে আমার জন্য, কলেজে যাবার আগে মা চুল আঁচড়ে দেন, ইস্ত্রি করে দেন জামা কাপড় এপ্রোন, সেন্ডেল এগিয়ে দেন পায়ের কাছে। আর কলেজে ঢুকেই আমার দশা রীতিমত করুণ হয়ে ওঠে – না বলতে পারি পড়া, না কাটতে পারি মড়া। ঢাকার মেয়েরা হোস্টেলে থেকে থেকে নিজেদের মধ্যে বন্ধু পেতে নিয়েছে, দল বেঁধে হাটেঁ, দল বেঁধে হাসে, দল বেঁধে উত্তর দেয় মাস্টারের রাশি রাশি প্রশ্নের। এমন দুর্দশায় সুজিত কুমার অপু নামের এক চশমা পরা, গাল বসা, তেলে চপচপ চুলের ছেলে আমাকে উদ্ধার করল, বলল চল একলগে পড়ি, তুমার বাসার লগে দিয়াই ত আমার বাসা। কি কও, বিকালে যামুনে! অপুর সঙ্গে পড়া শুরু হল আমার, তলপেট। প্রথম দিনই পড়তে হল যৌনাঙ্গ, কানিংহামের বইয়ে হাঁ হয়ে থাকা এক বেশরম যৌনাঙ্গ সামনে নিয়ে আমাকে বসতে হয়, অপু বিস্তারিত বর্ণনা করে যৌনাঙ্গের কোন মাংসের কোন তল দিয়ে কোন স্নায়ু কতদূর যায়, রক্তের নালিগুলো কোন পথে ভ্রমণ শেষে কোথায় পৌঁছয়। মা আমাদের জন্য চা বিস্কুট নিয়ে আসেন। বাবা রাতে ফিরে আরাম কেদারায় গা ফেলে আমাকে ডাকেন কি পড়তাছ দেখি, বইডা আন তো! বাবার সামনে কানিংহামের যৌনাঙ্গ মেলে ধরি, এই পড়ছি, এই পড়ানো হচ্ছে ক্লাসে। বাবা অপ্রতিভ হয়েও হন না, ইংরেজির আশ্রয় নিয়ে দুচার কথায় যৌনাঙ্গ জ্ঞান দিয়েই তিনি প্রসঙ্গ পাল্টান। কলেজ থেকে ফিরে প্রায় বিকেলে অপু পড়তে চলে আসে, যৌনাঙ্গের পুঙ্খানপুুঙ্খ বর্ণণায় যেই না মাতে অপু তাকে থামিয়ে আমি ভিন্ন প্রসঙ্গে উঁকি দিই, আচ্ছা কলেজ থেকে একটা সাহিত্য পত্রিকা বের করলে কেমন হয়! অপুর কাকা প্রণব সাহা শহরের নামকরা ছড়াকার, অপু নিজেও ছড়া লেখে, প্রস্তাব শুনে সে লাফিয়ে ওঠে। ব্যস, দলীয় পড়াশুনায় ইতি টেনে আমি নেমে পড়ি সাহিত্যচর্চায়। কলেজে টাঙানো দেখেছি কবিতা গল্প ছড়া লেখা দেয়াল পত্রিকা, আপাতত একটি দেয়াল পত্রিকাই না হয় করি! পরীক্ষা আসার আগে যেমন মন দিই পড়াশোনায়, তেমন মন দিয়ে করি কৃশানু। কিন্তু কে টাঙাবে কলেজে এটি! অপুর নিজের একটি ছড়া নিয়েছি বলে এমনই কৃতার্থ যে সে একদিন আটটার কলেজে সাড়ে সাতটায় গিয়ে দেয়ালে কৃশানু টাঙিয়ে আসে। ছাত্র ছাত্রীরা করিডোরে হাঁটতে গিয়ে পত্রিকাটির সামনে দাঁড়ায়, লেখাগুলো পড়ে—দূর থেকে দেখি। কলেজে সাংস্কৃতিক সপ্তাহ শুরু হয়ে গেছে, দেয়াল পত্রিকাও প্রতিযোগিতায় দাঁড়াবে। অপুকে বলি ক্লাসের ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে লেখা যোগাড় করতে। ঢিমেতালে কিছু লেখা পৌঁছল হাতে; না কবিতা না ছড়া না গল্প না প্রবন্ধ – ওগুলোকেই খানিকটা মানুষ বানিয়ে, বাবার পকেট থেকে আলগোছে টাকা সরিয়ে কাগজ কলম রং তুলি কিনে বসে গেলাম অমৃত নামে আরও একটি দেয়াল পত্রিকা বানাতে। বৈঠকঘরের মেঝে জুড়ে অমৃতর কাজ করি সারারাত। আমার তখন সাতখুন মাপ, শত হলেও ডাক্তারি পড়ে মেয়ে, কবিতা টবিতা লেখার শখ আছে, নাহয় থাকুক। এসব ছেলেমি একদিন কেটে যাবে।

আমার অনেক কিছু কাটে, ছেলেমি কাটে না। অপু যাচ্ছে নেত্রকোনায়,তার বাড়িতে,রেলগাড়ি করে, যেহেতু রেলগাড়ি আমাকে চুম্বকের মত টানে, কিছু হালকা বন্ধুত্ব হওয়া মেয়েদের নিয়ে অপুর সঙ্গে নেত্রকোনা যাওয়ার মতলব করি। অপু কথা দেয়, বিকেলেই ফিরে আসবে। কলেজ থেকে বাড়ির পথ বাঁয়ে রেখে ডানে ইস্টিশনের দিকে যাই, কয়লার গাড়ি কালো ধোঁয়া ছেড়ে ঝিকির ঝিকির করে চলতে শুরু করে, গাড়ি যখন চলে আমার খুব আনন্দ হয়, যখনই কোথাও থামে, মন খারাপ হয়ে যায়, জানালায় গলা বাড়িয়ে ইঞ্জিনের দিকে আকুল তাকিয়ে প্রাথর্ণা করি পুনঃ ঝিকির ঝিকিরের। নেত্রকোনা নেমে অপুর বাড়িতে খেয়ে দেয়ে, শহরের নদীমাঠ ইত্যাদি দেখে যখন রেল ইস্টিশনে পৌঁছোই ময়মনসিংহের গাড়ি ধরার জন্য, গাড়ি মুহুর্মুহু আসছে, কিন্তু যাচ্ছে মোহনগঞ্জের দিকে, ময়মনসিংহের দিকে নয়। সন্ধে নেমে আসে, আকাশ থেকে অন্ধকারের পাথর পড়ে বুকে। বাড়িতে কি হচ্ছে তা অনুমান করারও দুঃসাহস হারিয়ে ফেলতে থাকি। হোস্টেলের মেয়েদের নিশ্চিন্তি দেখে আমার ইচ্ছে করে ওদের মত ভাগ্য পেতে, বাড়িছাড়া রক্তচোখছাড়া স্বাধীন জীবন যাপন করতে। শেষ অবদি গাড়ি এল। সেই গাড়ি চলে কি চলে না করে রাত দশটার দিকে পৌঁছল ময়মনসিংহ শহরে। সারা পথই আমি নানারকম উত্তর সাজিয়েছি বাড়িতে বলার জন্য, কোনও উত্তরই জুৎসুই হয় না, সারা পথই আমার মখু গলা পেটের পানি তলপেটের দিকে নামতে থাকে। আমি একা অপরাগ বলে বাকিরা এগিয়ে আসে সমস্যা সমাধানে। অপু আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবে, বলবে সে আমাকে এবং আরও কজনকে নেত্রকোনা বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিল, যত দোষ অপু ঘোষ। সমাধানটি মনঃপূত হয় না। শেষে সকলকেই ধরে নিয়ে আসি অবকাশে, এক দঙ্গল মেয়েকে দেখিয়ে বাড়িতে বলি, এরাও ছিল আমার সঙ্গে। একা একটি পুরুষের সঙ্গে দূরে কোথাও ফূর্তি করতে যাওয়া নয়, এক দল মেয়ে নিয়ে পিকনিক পিকনিক ঘুরে আসা,বোধবুদ্ধিহীন রেলগাড়ির জন্যই দেরি হওয়াটি ঘটেছে, অপু ছিল সঙ্গে সেটিই সান্ত্বনা—মা বুঝে নেন। সে যাত্রা বেঁচে যাই। রক্ষে যে বাবা বাড়িতে ফেরেননি তখনও। ফিরলেও সম্ভবত খুব বিস্ফোরণ ঘটাতেন না, কারণ সে রাতে তিনি খবর পেয়েছেন তাঁর মা মারা গেছেন। বাবার মা, আমার দাদি। দাদি মাঝে মাঝে বড়দাদার সঙ্গে আসতেন অবকাশে বেড়াতে। দাদি দেখতে কালো, কিন্তু সুন্দরী। নাক চোখ মখু সব ধারালো। মার ধারণা এই দাদি বাবার আপন মা নন। বাবা আর বাবার বড় বোনের আপন মা ছিলেন এই দাদির বড় বোন। বড়দাদাকে, দাদিকে, বড় ফুপুকে এই গোপন কথাটি অনেকদিন জিজ্ঞেস করেও কোনও উত্তর পাইনি। আপন মা না হলেও এই মার জন্য বাবার আদর কম ছিল না। আদর বলতে শাড়ি কাপড় পাঠানো, অসখু ব্যাধিতে ওষধু পাঠানো, একেবারে শয্যাশায়ী হলে নিজে মাদারিনগর গিয়ে দেখে আসা। এবার বাবা ঠিক করলেন দাদির চল্লিশায় তিনি যাবেন গ্রামের বাড়িতে। আমাকে আর ইয়াসমিনকে চোখ নাচিয়ে বললেন, কি যাবা নাকি কান্ট্রিসাইডে? আমন্ত্রণের আভাস পেয়ে লাফিয়ে উঠি খুশিতে। আমার আর ইয়াসমিনের কখনও যাওয়া হয়নি গ্রামের বাড়িতে। দাদা ছোটদা গিয়েছিলেন যুদ্ধের সময়। দাদার ক্যামেরাটি হাতে নিয়ে বাবার সঙ্গে গ্রামের পথে রওনা হই ভোরবেলা। নৌকো, বাস, রিক্সা, পায়ে হাঁটা এসবের ধকলের পর বাড়ি পৌঁছি। ধকলকে ধকল মনে হয়নি। ঘরের বাইরে বের হতে পারার মত আনন্দ আর কি আছে! যে কোনও নতুন জায়গা, সে গ্রাম হোক শহর হোক, দেখতে ভাল লাগে আমার। ঢাকা শহরে যাওয়ার যে আনন্দ, নান্দাইলের মাদারিনগর গ্রামে যাওয়ার আনন্দ তার চেয়ে কম নয়। দুপুরবেলা প্রচুর লোক এল খেতে, গ্রামের গরিব লোক, বাবার গরিব আত্মীয়। সবাইকে উঠোনে বসিয়ে কলাপাতায় খাওয়া দেওয়া হল। বাবা নিজে পাতে পাতে বেড়ে দিলেন। ক্যামেরায় বাবার নানা ঢংএর ছবি তুলে রাখি। আমাদের দেখতে গ্রামের বাচ্চা কাচ্চা পুরুষমহিলা সব জড়ো হন ও বাড়িতে। শহর থেকে আসা যে কোনও প্রাণীই তাদের কাছে এক থোকা বিস্ময়!বাড়ির সবগুলো ঘর বাঁশের বেড়ায় বানানো, খড়ের ছাউনি,মাটির মেঝে। বড়দাদার বড় ঘরটির চারপাশ ঘিরে ঈমান আলী, রিয়াজউদ্দিন, আবদুল মতিনের ঘর তোলা হয়েছে। তাঁরা বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে খেয়ে পরে বেঁচে আছেন। বড়দাদার ঘরে একটি বড় সিন্দুক, সিন্দুকের ওপর বিছানা পেতে ঘুমোন তিনি। সারাদিন বসে বসে মাছ ধরার জাল বোনেন। চোখে ভাল দেখতে পান না। কিন্তু অসখু বিসুখে যে যাবেন শহরে, থাকবেন অবকাশে, তা নয়, তাঁকে টেনে হিঁচড়েও শহরে নেওয়া যায় না আজকাল। নিজের ভিটে ছেড়ে কোথাও তাঁর এ বয়সে যেতে ইচ্ছে করে না। বাবা দিগন্ত অবদি বিস্তৃত সবুজ ধানি জমি দেখালেন আমাদের। সব তিনি নিজে কিনেছেন। এত জমি, এত গরু, এত গোলা ভরা ধান বাড়িতে, কিন্তু কারও জীবন যাপনে চাকচিক্য নেই। পরনে মাদারিনগর বাজারের সস্তা নীল লুঙ্গি। কুঁড়েঘরের তক্তপোষে ঘুমোন, বেগুন পোড়া আর পাইন্যা ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে হুঁকো টানেন দাওয়ায় বসে, দুশ্চিন্তার সুরুজ যেন মাথার এক হাত ওপরে বসে আছে, মখু গুলো তাই তিতিবিরক্তিতে বাঁকা। বউদের পরনেও মোটা সুতির কাপড়। পনেরোকে পঁচিশ লাগে দেখতে। পঁচিশকে পঞ্চাশ। তবু গ্রামের অন্য বাড়ির চেয়ে এ বাড়ির লোকদের ভাবা হয় ধনী। ধন তাঁরা জীবন যাপনে ব্যয় করেন না, ধন জমিয়ে রেখে নতুন জমি কেনা আর এর ওর বিরুদ্ধে মামলা করার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন। এ বাড়ির জন্য বাবা হলেন ভগবান। যে যতটুক যক্ষরাজ কূবের বনেছেন, বাবার টাকাতেই বনেছেন। বাবা যেভাবে আদেশ করেন, সেভাবে সকলে চলে। কার ছেলে ইশকুলে যাবে, কার মেয়ের বিয়ের পাত্র খুঁজতে হবে, সবই বাবা বলে দেন, ইশকুলে পড়ার খরচাও বাবা দেন, বিয়ের খরচাও। গ্রামের ইশকুল শেষ হলে রিয়াজউদ্দিনের ছেলেকে শহরের ইশকুলে ভর্তি করাবেন বলে দেন। শহরের ইশকুলে ভর্তি হওয়া মানে অবকাশের উঠোনে টিনের ঘরে ওদের জায়গা হওয়া। রিয়াজউদ্দিনের বড় ছেলে সিরাজ, যখন অবকাশে থেকে শহরের ইশকুলে পড়ত, একদিন কাঠফাটা গরমের শুনশান দুপুরে ইয়াসমিনকে, বয়স কত হবে আর, নয় কি দশ, ন্যাংটো করেছিল। রুনুখালা বেড়াতে এসে উঠোনে হাঁটতে হাঁটতে টিনের ঘরের দিকে উঁকি দিয়ে ন্যাংটো দৃশ্যটি দেখে ফেলেন, খবর পেয়ে বাড়ি এসে সিরাজ আর ইয়াসমিনের পিঠে উঠোনে যত খড়ি ছিল ভেঙে, সিরাজকে সেদিনই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন বাবা। সিরাজ শহরের অন্য জায়গায় ঘর ভাড়া করে থেকে ইশকুল পাশ দিয়ে এখন কলেজে ঢুকেছে। দাদির চল্লিশায় সিরাজ এ বাড়িতে এসেছে, কিন্তু ঘটনার এত বছর পরও বাবার মুখোমুখি হওয়ার সাহস তার নেই। বাড়ির পাশেই কবর দেওয়া দাদির মাথার কাছে একটি চারাগাছ পুঁতে বাবা আমাদের সঙ্গে নিয়ে বিকেল বিকেল শহরে ফিরে আসেন। পথে তিনি নিঃসংকোচে বর্ণনা করেন তাঁর গত জীবনের দুঃসহ দারিদ্রের কথা। কোন বাড়িতে জন্ম হয়ে আজ তিনি কোথায় এসে পৌঁছেছেন, তা আমাদের বুঝতে বলেন। বলেন আমরাও যেন ওপরের দিকে তাকাই, যেন বড় হই শিক্ষাদীক্ষায় কাজেকমের্, যেন মানুষের মত মানুষ হই। আরাম আয়েশ আলসেমিতে যেন বথৃা উড়িয়ে না দিই সময়।

এদিকে কলেজে ছাত্রলীগ, ছাত্রইউনিয়ন, জাসদ-ছাত্রলীগ, ছাত্রদল ইত্যাদি রাজনৈতিক দল ঢাকা থেকে গানের শিল্পীদের এনে চমৎকার চমৎকার নবীন বরণ অনুষ্ঠান করে আমাদের বরণ করছে। এক দল আরেক দলের চেয়ে জমকালো অনুষ্ঠান করার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত এক দল খুরশিদ আলমকে নিয়ে এলো, আরেক দল ফেরদৌস ওয়াহিদকে। কেবল গানের অনুষ্ঠানই নয়, লম্বা লম্বা রাজনৈতিক বক্তৃতা দেওয়ার জন্যও ঢাকা থেকে রাজনৈতিক নেতা আনা হয়। মাহমুদুর রাহমান মান্না জাসদের অনুষ্ঠানে এসে নাগারে দুঘন্টা বক্তৃতা করেন, তন্ময় হয়ে শুনি। যে দলের যে নেতাই যে কথাই বলেন, মগ্ধু হই। এত ভাল ভাল নেতা থাকতে দেশ কেন পড়ে থাকবে জিয়াউর রহমানের মত এক সেনানায়কের হাতে, ভাবি। আবার ছাত্রদলের ভাষণ শুনে মনে হয় দেশ বুঝি ঠিকই চলছে, এর চেয়ে ভাল চলার আর কোনও ব্যবস্থা নেই। নবীন বরণ উৎসব শেষ হতে না হতেই নির্বাচনের হাওয়া লাগে কলেজে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন। কলেজে নানারকম মানুষ ভোট চায়, সবাইকে মাথা নেড়ে কথা দিতে হয় ভোট দেব। বাড়িতেও আসতে শুরু করে প্রার্থীরা। বাড়ি এসে বলে গেলে নাকি সে বলা পোক্ত হয়। বাড়িতে ভোটের জন্য অথবা যে কোনও কারণেই হোক, আমাকে খুঁজতে হরদম ছেলেপিলে আসছে, ব্যাপারটি সম্পণূর্ নতুন আমার জন্য। প্রথম বর্ষের ক্লাস গড়িমসি করে চলে, এই সুযোগে তৃতীয় সংখ্যা সেঁজুতি প্রকাশ করার উদ্যোগ নিই। কলেজে যত না সময় কাটে, তার চেয়ে বেশি কাটে জমান প্রিন্টার্সে। আগের চেয়ে আরও হৃষ্টপুষ্ট এই সেঁজুতি। এ সংখ্যা সেঁজুতিতে একটি জিনিস উল্লেখযোগ্য, প্রথম পাতার সম্পাদিকা তসলিমা নাসরিন চলে গেছে ছোট অক্ষরে শেষ পাতার শেষে। সম্পাদিকার বদলে সম্পাদক। সেঁজুতি হাতে নিয়ে দাদা প্রথম থেকে শেষ অবদি পড়ে শেষে থমকে যান, বানান ভুল রইয়া গেছে। সম্পাদিকার জায়গায় সম্পাদক ছাপা হইছে। হেসে বলি, এইটা ভুল না। এইটা আমি ইচ্ছা কইরা দিছি।

কস কি? তুই কি ছেড়া নাকি?

ছেড়া হইতাম কেন?

তুই কি লিঙ্গ বিশ্বাস করস না?

করি।

পুংলিঙ্গ স্ত্রীলিঙ্গ বইলা যে একটা ব্যাপার আছে, তা জানস?

জানি। কিন্তু সম্পাদিকা প্রকাশিকা এইসব ইকা টিকা আমি পছন্দ করি না। ছেলে মেয়ে দুইজনই সম্পাদক হইতে পারে। শব্দের মধ্যে অহেতুক কিছু লিঙ্গের আমদানি হইছে, যা আমি ব্যবহার করতে চাই না। যে মেয়ে কবিতা লেখে তারে আমি কবি কইতে চাই, মহিলাকবি না।

দাদা সেঁজুতি ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, মাইনষে তরে পাগল কইব।

 

ক্লাসে যাদের সঙ্গে আলাপ হয় এক দুকথার পরই বলি শতাব্দী চক্র নামে একটা সাহিত্যগোষ্ঠী করি, চল। হালকা হালকা বন্ধুত্বের মেয়েগুলোকেও বলি। বইপোকাগুলো মোটেও ভিড়তে চায়নি, আর পোকা যাদের ধারে কাছে ভেড়ে না, ওরা লাফিয়ে উঠল, ব্যস, চাঁদা তোলো, খামোকা লাফালে তো কাজের কাজ কিস্যু হবে না। ছোটখাট একটি কমিটি বানিয়ে ফেলে, এবার, আমার প্রস্তাব, কিছু একটা করা চাই। অমৃত দ্বিতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর ঝোঁক চাপে শতাব্দী থেকে সেঁজুতির মত একটি কবিতাপত্রিকা করার। মনে কিছু উদয় হয় তো ঝাঁপিয়ে পড়ি, অবশ্য আমার সব ঝাপাঁনোই নিঃশব্দে। বাংলা শব্দ শুদ্ধ করে লিখতে জানে, এমন যাকেই পাচ্ছি, বলছি, কবিতা লেখো। কবিতা তো আসে না বাবা! আরে আসবে। জীবনই তো কবিতা! যাপন করছ, অথচ লিখছ না! যে কটি কবিতা পাওয়া গেল, কড়া সম্পাদনা করে ছোট্ট একটা কবিতাপত্রিকা বের করি, নিজেই সি কে ঘোষ রোডের লিফা প্রিন্টাসের্ গিয়ে ছেপে আনি। ছোটদার বন্ধুর ছাপাখানা এই লিফা। লিফা দাম রাখে কম, কিন্তু রাখে। পত্রিকার নাম দিই রোদ। রোদ প্রেসে যাও, প্রুফ দেখ, রোদে ভিজে বাড়ি ফেরো। রোদ হয়ে যাওয়ার পর অপুর আবদার, দুপাতা লম্বা একটি ছড়া নিয়ে এসে, শতাব্দী থেইকা একটা ছড়াপত্রিকা হইলে কিন্তু মন্দ হয় না। তাও হবে, ছড়ার কি দোষ যে বাদ থাকবে! ঝনঝন নামে ছড়াপত্রিকাও কদিনের মধ্যে হয়ে গেল। তবে অপুর ছড়াটি কেটে আধপাতা করতে হয়েছিল, অত টাকা নেই যে এক হাত লম্বা লম্বা ছড়া ঢুকিয়ে ঢাউস কোনও পত্রিকা করা যাবে, কলেজ থেকে পাওয়া বৃত্তির টাকা শতাব্দির পেছনে খরচা করি, সদস্যরা এমাসে চাঁদা দেয় তো ও মাসে বাদ থাকে। কাঁচা কবিতা পাকা-মত করে, ছেপে, পত্রিকা করার উৎসাহ তখনও ঘোচেনি, এর ওপর উথলে উঠল নতুন উচ্ছঅ!স, নাটক। ছোটদা তখন নাটকের দলের সঙ্গে অর্ধেক রাত, আর বেশি অর্ধেক দিন কাটাচ্ছেন। ময়মনসিংহ থিয়েটার শহরে নতুন নতুন নাটক করছে, ছোটদা আমাকে মহড়া দেখাতে নিয়ে যান মাঝে মধ্যে। যখন আমার মাথায় নাটকের এক পোকা থেকে লক্ষ পোকা জন্ম নিচ্ছে, পাথর্, আমার সঙ্গেই পড়ে, একদিন সিসিম ফাঁকের মত ফাঁক করল তার ট্রাংক, বেরোল সমরেশ বসুর একটি নাটক, আবতর্। কলেজের ছেলেমেয়েদের দিয়ে এ নাটক হবে না, সত্যিকার নাট্যশিল্পী দরকার। পাণ্ডুলিপিটি আমি বাড়ি নিয়ে এসে ছোটদাকে বললাম এই নাটকটা থিয়েটারকে দাও করতে। তখন আমার পড়া হয়ে গেছে আবতর্, পড়তে পড়তে ছেলেচরিত্রে, মেয়ে চরিত্রে থিয়েটারের সদস্যদের কল্পনা করেছি, বিশাল একটি মঞ্চের সামনে থেকে পর্দা সরে যাচ্ছে, মঞ্চে আবছা আলো, সন্ধে হয়ে আসছের আলো, ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে গীতা, গীতাকেই মানাবে মংলার মা চরিত্রে, ডাকছে উৎকণ্ঠায়, মংলা ও মংলা। থিয়েটার দল লুফে নিল নাটকটি, মহড়া শুরু হল। প্রায় বিকেলে মহড়ার দিন থিয়েটার-ঘরে উহু হচ্ছে না, আরেকটু পেছনে যান, মাথাটা চুলকাতে চুলকাতে বলেন, কারণ মংলার বাবা এখন কনফিউসড, আচ্ছা আঞ্চলিক টানটা আরও আনতে হবে কিন্তু সংলাপে, যখন বলি, নাটকের জলে আকন্ঠ ডুবে, যে কেউ ভেবে বসবে আমিই বুঝি নাটকের পরিচালক। একদিন ফরিদ আহমদ দুলাল, দলের প্রায় সব নাটকের পরিচালক, যখন বলল, পরিচালনা কিন্তু যা দেখতাছি তুমিই করতাছ, সুতরাং, কি কও, নাটকটার পরিচালকই অফিসিয়ালি হইয়া যাও।

আমি?

হ্যাঁ তুমি।

লজ্জায় মখু লুকিয়ে বলি, পাগল নাকি! আমার কোনও অভিজ্ঞতাই নাই নাটকের। জীবনে প্রথম।

টেলিভিশনে কিছু নাটক আর ছোটদার সঙ্গে ঝুলে ময়মনসিংহের মঞ্চে কিছু নাটক দেখে আর কিছু নাটকের বই পড়ে নাটক পরিচালনা করার বিদ্যে অর্জন হয় বলে আমার জানা নেই। কিন্তু আমার ওপর যখন সত্যি সত্যি ভার পড়ল নাটক পরিচালনার, ছোটদা পার্থকেও বললেন ডেকে আনতে। পাথর্ তুমুল উৎসাহে নেমে গেল। প্রায় রাতে ময়মনসিংহ থিয়েটারের ভাঙা বাড়িতে মহড়া চলে। গ্রামের গরিব পরিবারের গল্প। গীতা নায়িকার ভূমিকায়, নায়িকার ভূমিকায় গীতা অবশ্য মঞ্চে প্রথম নয়, এর আগেও নানারকম নাচের দল থেকে সে নকশি কাথাঁর মেয়ে, চণ্ডালিকা, চিত্রাঙ্গদা করেছে। নায়কের ভূমিকায় ময়মনসিংহ থিয়েটারে নতুন যোগ দেওয়া গানের ছেলে সোহানকে নেওয়া হল। মংলা চরিত্রের জন্য ছোট একটি বাচ্চা ছেলে যোগাড় করা হল। প্রচণ্ড উদ্যম এক একজনের মধ্যে, উৎসাহ আর উদ্দীপনায় টগবগ করা মানুষগুলো পারলে দিন রাতের যে কোনও সময় এক পায়ে খাড়া মহড়া দিতে। রাতে মহড়া শেষে পাথর্ হোস্টেলে ফিরে যায়, কোনও কোনও রাত আবার অবকাশেও কাটায়। আবর্তর শো শুরু হল টাউনহলে, মঞ্চ সজ্জায় যার দায়িত্ব ছিল, চোখকাড়া মঞ্চ সাজিয়েছে সত্যিকার কুঁড়েঘর বানিয়ে, সত্যিকার মাটিতে সত্যিকার গাছ পুঁতে, সত্যিকার মাছ ধরার জাল উঠোনে, দেখে আমি অভিভূত। তিন রাত ধরে শো। টিকিট কিনে লোক এল নাটক দেখতে, তিনশ লোকের হল ধীরে ধীরে, আশ্চর্য, ভরে গেল। যেন চোখের পলকে ঘটে গেল এত বড় ব্যাপারটি। ময়মনসিংহ থিয়েটার শহরের নামি দল নাটকের, আর তাদের সবচেয়ে ভাল এবং সফল নাটক আবতর্। নাটকের পোস্টারে ছাপা আবর্তর দুজন পরিচালকের নাম, ঈশিতা হোসেন পাথর্ আর তসলিমা নাসরিন।

নাটক আরও দীর্ঘ দীর্ঘ দিন এভাবেই চলতে পারত, কিন ্তু গীতার ডাক পড়ল ঢাকায়। টেলিভিশনে নাচের অনুষ্ঠান হবে, রাহিজা খানম তাকে ডেকেছেন নাচতে। বুলবুল একাডেমিতে নাচের মেয়ে কম পড়েছে, ডাক ডাক গীতাকে ডাক বলে রাহিজা খানম গীতা যেখানেই থাক ডেকে নিয়ে যান। গীতা নেচে বেড়ায় ঢাকায়। টেলিভিশনে গীতার নাচ থাকলে বাড়ির সবাই বসে সে নাচ দেখি। মা আর গীতাকে নর্তকী বলে গাল দেন না। গীতার জীবনটি রহস্যে ভরা। এক্ষুনি জীবন উজাড় করে দিল, পরক্ষণেই কেড়ে নিল। মঞ্চে চমৎকার অভিনয় করে গীতা, কী জানি জীবনের মঞ্চে সে যা করছে সবই অভিনয় কি না। গীতার জীবনের অনেকটাই গীতার ট্রাংকে লুকোনো। নানারকম জিনিস ওতে, গোপন করার মত অনেক জিনিস। যখন সে বাড়ির বাইরে যায়, ট্রাংকে তালা লাগিয়ে যায়। আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করে কী কী আছে ট্রাংকের ভেতর। গোপন করার মত তখনও আমার কিছু নেই। সবই খোলা, সবই মেলা, ইচ্ছে করে আমারও গোপন কিছু থাক, আমার একার কিছু ছোটদার সঙ্গে গীতার প্রেম বা বিয়ে যখনও কিছু হয়নি, তাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম, মূলত হেনামাসির কাছে যাওয়া যে মাসিটি আমাদের পড়াতেন, তখন গীতার ট্রাংকটি দেখেছিলাম, সরু চৌকিতে, যে চৌকিতে সে শুত, তার ওপরই বালিশের কাছে রাখা। বিয়ের পর সে বাপের বাড়ি থেকে আর কিছু না আনুক, তার যক্ষের ধন ট্রাংকটি এনেছে। ট্রাংকটি একদিন তালাহীন পেয়ে দেখি ওতে রাজ্যির জিনিস, ছোটদার লেখা তিরিশ চল্লিশ পাতার চিঠি, ছোট ছোট গয়না, পয়সার থলে, আমার দৃষ্টি কাড়ে তুলো লাগানো ব্রেসিয়ারগুলো। সতেরো পার হয়েছে, কিন্তু ও জিনিসটি কখনও পরে দেখিনি। মার ব্রেসিয়ারও মা সবসময় লুকিয়ে রাখেন, শাড়ি নয়ত শায়ার আড়ালে, উঠোনের দড়িতে কখনও ব্রেসিয়ার শুকোতেও দেন না, টিনের ঘরের পেছনে, যেখানে কুকুর বেড়ালও যায় না, রোদে ফেলে শুকিয়ে আনেন, যেন সাংঘাতিক নিষিদ্ধ জিনিস এগুলো। ইয়াসমিনকে আড়ালে ডেকে, কেউ যেন না দেখে না শোনে, নিষিদ্ধ জিনিস সম্পর্কে যা জ্ঞান আছে আমার, ঝেড়ে, বললাম, যা তো গাঙিনার পাড় থেইকা এইরকম একটা জিনিস কিন্যা নিয়া আয়, রিক্সা কইরা যাইবি আর আসবি। আমি ওর হাতে টাকা ধরিয়ে দিয়ে বারান্দায় বসে রইলাম, যেন ও এলেই জিনিসটি কারও চোখে পড়ার আগে আমি আড়াল করতে পারি। সেই বিকেলে ইয়াসমিনের কিনে নিয়ে আসা ব্রেসিয়ার পরে দিব্যি চপু চাপ বসে রইলাম, নিষিদ্ধ জিনিসে আনন্দ যেমন আছে, ভয়ও আছে, চাইছিলাম না কেউ আমার আশেপাশে আসুক, বুঝুক যে আমি নতুন একটি জিনিস পরেছি আজ। কিন্তু ছোটদার সঙ্গে সখ্য তখন এমন যে, ছোটদা বাড়ি ঢুকেই হৈ চৈ করে আমাকে ডাকেন, কোনও একটি গল্পের বই আমাকে পড়তে হবে, আর তিনি খেতে খেতে শুয়ে বিশ্রাম নিতে নিতে প্রায় ঘুমোতে ঘুমোতে শুনবেন। আমি যখন জড়সড়, বারবার জামা টানছি কাঁধের দিকে, যেন কিছুতেই উঁকি না দেয় নিষিদ্ধের ফিতে, ছোটদা এসে পিঠে এক চাপড় দিয়ে বললেন কিরে কি হইছে তর, একলা একলা বইসা রইছস কেন?

পিঠের চাপড়টিই বিপদ যা ডাকার, ডাকল। ছোটদা তুমুল হেসে বললেন কি রে তুই দেখি ব্রেসিয়ার পরছস!

গলা ফাটিয়ে সারাবাড়ি জানিয়ে দিলেন, নাসরিন ব্রেসিয়ার পরছে।

পরার পর পনেরো মিনিটও যায়নি, বাড়ির সবাই জেনে গেল, আমি কি পরেছি।

টেবিলের দিকে গা ঠেসে থাকলাম, আমার মাথা ক্রমে নুয়ে আসতে থাকল বইয়ের ওপর, গোপন জিনিসটি গোপন না থাকার কষ্টে বইয়ের পাতা ভিজতে লাগল। মা এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন ব্রেসিয়ার পরার ইচ্ছা হইছে, আমারে কইবা না? আমি তো তোমার সাইজের কিন্যা দিতে পারতাম।

আমার মখু মাথা কান শরমে গরম হতে থাকল। ব্রেসিয়ারের ঘটনা স্বাভাবিক হওয়ার পর মা বলেছিলেন, বিয়ের বছর দুই পর মা যখন প্রথম ব্রেসিয়ার পরলেন, বাবা এমন ক্ষেপেছিলেন যে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ঝংকার দিয়ে উঠেছিলেন, খারাপ মেয়েছেলের মত ঢং এর জিনিস পর ! শখে বাঁচ না! এই জিনিসটি পরা মানে ঢং করা ফ্যাশন করা এরকমই ভাবে অনেকে। গ্রামের মেয়েরা সারাজীবন ব্রেসিয়ার কাকে বলে না জেনেই জীবন কাটিয়ে যায়। বাবা গ্রামের ছেলে, তাঁর দেখে অভ্যেস নেই কাপড়ের তলের বাড়তি কাপড়।

কলেজে একটি জিনিস আমাকে নিষিদ্ধ গন্ধমের মত টানে। সেটি কলেজ ক্যান্টিন। ক্যান্টিনে আর সব ছেলেদের মত চা খেতে খেতে গল্প করতে ইচ্ছে হয় আমার। ইচ্ছে হয় যদিও, ইচ্ছেকে পণূর্ করতে অনেক সময় আমি নিজেই এর বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াই। উপকণ্ঠের সম্পাদক, আবার চমৎকার কবিতাও লেখে, হারুন রশিদ, যার কবিতার মগ্ধু পাঠক আমি, আমার সঙ্গে দেখা করতে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে এসে এই ক্যান্টিনে অপেক্ষা করছিল, আমার সাহস হয়নি ভেতরে যেতে, সাহস হয়নি কোনও অসহ্য সুন্দরের সামনে দাঁড়াতে। ইতঃস্তত দাঁড়িয়ে থাকা আমার সামনে দিয়ে একটি মিষ্টি মুখের ছেলে বেরিয়ে গেল ক্যান্টিন থেকে, পেছন থেকে তাকে ডেকে থামানোর সাহসও হাত ফসকে পড়ে চৌচির হয়ে গিয়েছিল। নিজের এই অপারগতাগুলো আমি ভেতরে একা একাই লালন করি। নিজেকে আমার অপদার্থ ভীরু কা-নারী ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। মূলত ছেলেরাই যায় ক্যান্টিনে তা জানি, দিব্যি ক্লাস ফাঁকি দিয়ে নয়ত দুটো ক্লাসের মাঝের অবসরটাতে, নয়ত ক্লাস কোনও কারণে না হলে। অবসর পেলে মেয়েরা হোস্টেলে গিয়ে কিছুক্ষণ গড়িয়ে আসে, নয়ত জুটি বেঁধে নিরালায় চলে যায় মোটা বই মেলে পড়তে। মেয়েরা যায় কদাচিৎ ক্যান্টিনে, বড় ক্লাসের মেয়েরা কেবল, ছেলেবন্ধুদের নিয়ে, নয়ত দল বেঁধে। ক্যান্টিনে যাওয়ার ইচ্ছে করে আমার, ইচ্ছে করে আর সব ছেলেদের মত যখন তখন ক্যান্টিনে ঢুকে হাঁক দেব চায়ের জন্য, চা এলে পায়ের ওপর পা তুলে আরাম করে বসে চা খাবো, ইচ্ছের পণূর্ তা যেহেতু আমার পক্ষে ঘটানো সম্ভব হয় না, আমি সঙ্গী খুঁজতে থাকি। ক্লাসের যে মেয়েকেই সাধি, পিছলে যায়। শেষ অবদি হালিদা রাজি হল, সুন্দরী এক মেয়ে, উদাস উদাস চোখ, ঢাকার ইন্দিরা রোডে বাড়ি, শুদ্ধ বাংলায় কথা বলে, ওকে নিয়ে ক্যান্টিনে ঢুকেই দেখি জোড়া জোড়া ছেলে-চোখ আমাদের গিলছে, প্রথম বর্ষের মেয়ে হয়ে গটগট করে চলে এলাম ছেলেদের আড্ড াখানায়, আমাদের বুকের পাটা অনুমান করে ওরা খানিকটা চেঁচিয়েই কথা বলতে শুরু করল যেন ওদের প্রতিটি শব্দ আমাদের প্রতি লোমকপূ নাড়ায়। সেই শুরু। পরে, হাবিবুল্লাহর সঙ্গে বন্ধুত্ব হবার পর ক্যান্টিন আমার ঠিকানা হয়ে উঠল প্রায়। হাবিবুল্লাহরও বাড়ি ঢাকায়, আমার এক ক্লাস ওপরে পড়ে, দীর্ঘদিন আমাকে আড়ে আড়ে লক্ষ করে হঠাৎ একদিন পথ আগলে বলল সে আমার বন্ধু হতে চায়। বন্ধু হতে চাও ভাল কথা, তবে বন্ধু মানে বন্ধু তুই তোকারি বন্ধু। হাবিবুল্লাহকে পরদিনই তুই বলে সম্বোধন করলাম, সে চমকাল যদিও, শতর্ মত তাকেও বলতে হল তুই। হাবিবুল্লাহ এরপর আঠার মত লেগে রইল আমার পেছনে। ক্লাসে ঢুকতে বেরোতে দেখি সে, দাঁড়িয়ে আছে আমার অপেক্ষায়।

কী ব্যাপার তোর ক্লাস নাই?

আছে।

ক্লাসে যা।

ধৎু ভাল্লাগছে না। ক্লাস করব না।

কি করবি?

চল চা খাই গিয়া।

আমার ত ক্লাস আছে।

হাই স্যারের ক্লাস তো। ওই ক্লাস না করলেও চলবে।

কি কস!

আরে চল তো।

এমনিতে নাচুনে বুড়ি, তার ওপর ঢোলের বাড়ি। ক্যান্টিনে গিয়ে বসি। ক্যান্টিনে চা সিঙ্গারা আসছে, হাবিবুল্লাহর বন্ধুরা আসছে, এনাটমি থেকে শুরু হয়, রাজনীতিতে গিয়ে শেষ হয় আড্ডা। আমরা সদপের্ সগবের্ হেঁটে বেড়াই কলেজ চত্বর। ক্লাসের ফাঁকে অথবা অজরুরি ক্লাস ফাঁকি দিয়ে যেখানেই আমি, সেখানেই হাবিবুল্লাহ। হাবিবুল্লাহ বাড়িতেও আসতে শুরু করল বিকেলের দিকে। বাবা বাড়ি এলে হাবিবুল্লাহ দাঁড়িয়ে স্লামালেকুম স্যার বলে। গম্ভীর মুখে বাবা ভেতরের ঘরে ঢুকে যান। ভেতরে গিয়ে মাকে প্রশ্ন করে উত্তর পান, ছেলেটি আমার বন্ধু। কলেজের শিক্ষক হয়ে বাবা এই একটি জায়গায় আটকে গেছেন, কলেজের কোনও ছাত্রকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না।

 

কলেজে খেলার মরশুম শুরু হয়েছে, ক্যারম আর দাবা খেলায় নাম লিখিয়ে দিব্যি খেলতে লেগে গেলাম। ক্যারমে হেরে গেলাম, জেতার কোনও কারণ ছিল না, সেই কতকাল আগে, নানিবাড়িতে খেলেছিলাম! আর দাবায়, এক তুখোড় দাবারু, গত বছরের চ্যম্পিয়ানকে হারিয়ে দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে শেষ অবধি জিতে যাওয়া খেলা, অধৈর্যের কারণে ছেড়ে দিয়ে রানাসর্ আপ হলাম। অধৈর্য আমার লাগে গ্যালারির ক্লাসগুলোতেও, শিক্ষকরা কী বলেন বা কী বলতে চান, তার আশি ভাগই বুঝি না। প্রস্থানচর্চা বেশ চলে এখানে, যা ইশকুল কলেজে আগে দেখিনি, প্রক্সি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া, ক্লাস ভাল লাগল না তো পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাও। আমি বেরিয়ে পড়তে শুরু করলাম, তখন অবদি মেয়েরা পাছায় আঠা লাগিয়ে সামনের সারিতে বসে শিক্ষকদের প্রতিটি বাক্য গোগ্রাসে গেলে, দুষ্টু ছেলেরাই নাকি কেবল বেরিয়ে যায়, আমি দুষ্টুর তালিকায় পড়লাম, তবে ছেলে নই, মেয়ে। বেরিয়ে যাওয়ার এই স্বাধীনতাও বেশ উপভোগ করতে শুরু করি, মুমিনুন্নিসা কলেজ থেকে বিকেল পাঁচটার আগে গগন দারোয়ান আমাদের বেরোতে দিত না, এখানে আর যাই থাক, সেই দমবন্ধ করা খাঁচাটি নেই। ইচ্ছে হল ক্লাসে গেলাম, ইচ্ছে হল গেলাম না। এরকম নিয়ম নেই যে সকাল আটটা বা নটায় কলেজে ঢুকতেই হবে। মেডিকেলের এই ব্যাপারটি বোঝার পর আমি কখনও কখনও দুপুরে বাড়ি থেকে রওনা হই, মা অবাক হন, এই অসময়ে কই যাইতাছস?

কলেজে।

এখন আবার কলেজ কি?

ক্লাস আছে।

তর তো সকাল আটটায় কলেজ শুরু হইছে।

হ হইছে। তাতে কি! আটটার সময় যে ক্লাস ছিল করি নাই।

এখন কলেজে যাইয়া কি করবি?

দেড়টার ক্লাস করতে যাইতাছি।

যখন ইচ্ছা তখন গেলে ত হয় না।

তোমার তো দৌড় ইশকুল পর্যন,্ত এই সব বুঝবা না।

নিয়মটি আমার খুব ভাল লাগে, যখন ইচ্ছে ক্লাসে যাও, ক্লাস করতে ইচ্ছে না হলে প্রক্সি দিয়ে বেরিয়ে পড়। প্রক্সি শব্দটির চল খুব বেশি কলেজে। ক্লাস না করতে পারি, কিন্তু উপস্থিতির সংখ্যা কম থাকলে পরীক্ষায় বসা যাবে না। বন্ধুৃরা নকল উপস্থিতি দিয়ে দেয়। প্রতিটি ক্লাসে নাম ডাকার সময় ইয়েস স্যার বলে দিলেই হয়। এখন কে বলছে ইয়েস স্যার, তোফাজ্জলেরটা মোজাম্মেল বলছে কি না, তা কে তলিয়ে দেখে! মাথা নিচু করে ইয়েস স্যার বলে উপস্থিত বন্ধুর অনপুস্থিত বন্ধুকে একরকম বাঁচায়। এই উপস্থিত আবার যখন অনপুস্থিত হবে, তখন আগের সেই অনপু স্থিত উপস্থিত থেকে নতনু অনপুস্থিতকে বাঁচাবে।

সেঁজুতির চতথুর্ সংখ্যা নিয়ে পড়েছি। কলকাতা থেকে চিঠি, কবিতা,সাহিত্যপত্রিকা, বই ইত্যাদি আসে। নির্মল বসাক সময়ের খেলনা পাঠিয়েছেন, অভিজিৎ ঘোষের নিঃসঙ্গ মানুষ এসে দাঁড়ায় সামনে। তাঁদের কবিতাপত্রিকা সৈনিকের ডায়রি, ইন্দ্রাণী নিয়মিত পাচ্ছি। মোহিনী মোহন গঙ্গোপাধ্যায়, ক্ষিতিশ সাঁতরা, চিত্রভানু সরকার, শান্তি রায়, বিপ্লব ভট্টাচার্য, বীরেন্দ্র কুমার দেব, প্রণব মুখোপাধ্যায় কবিতা পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কবিতা পৌঁছতে থাকে হাতে। আলমগীর রেজা চৌধুরী, আহমদ আজিজ, খালিদ আহসান, জাহাঙ্গির ফিরোজ, মিনার মনসুর, মোহন রায়হান, রবীন্দ্রনাথ অধিকারী, রমেশ রায়, হারুন রশিদ, সাজ্জাদ হোসেন এরকম আরও অনেকের লেখা পরপর সাজিয়ে নিই। চন্দনার কবিতা হার্দিক রাইফেল নামে। আমারটির নাম দিয়েছি বুর্জোয়া কষ্টরা এসে আমার হৃদয় ধর্ষণ করছে। দুই বাংলার সাহিত্য পত্রিকা প্রতিদিন দশ বারোটি করে আসে। জমিয়ে রাখি টুকিটাকি খবরের জন্য। দশ পৃষ্ঠাই চলে যায় টুকিটাকিতে। চতুর্থ সংখ্যা সেঁজুতিতে, ছোটদাকে জানিয়ে দিই, বিজ্ঞাপন দরকার। এটি বই আকারে বের করছি, বৃহৎ কলেবরে যাকে বলে। ছোটদা পিপুলস টেইলাসর্, আর টিপটপ কনফিকশনারির দুটো বিজ্ঞাপন যোগাড় করে আনেন। বেঙ্গল এন্টারপ্রাইজের জিঙ্ক লোগো দিয়ে শেষ পাতায় একটি বিজ্ঞাপন দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন ধন। বই আকারে হবে তো বোঝা গেল, কিন্তু পঈচ্ছদ করবে কে? পঈচ্ছদ করার জন্য ছোটদাকে বলি শিল্পী যোগাড় করতে। গোলপুকুর পাড়ে পোড়ামাটি-শিল্পী অলক রায়ের ভাই পুলক রায় আড্ডা দিতে আসে, তার কাছে ছোটদা খবর পান অলক রায় শহরে নেই। সুতরাং অলক রায়ের ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় নেই, ছোটদার হাতে আর কোনও শিল্পী নেই। অতএব আমি নিজেই একটি মেয়ের মখু এঁকে ছোটদাকে পাঠাই ব্লক করে আনতে। এরপর তো তাগাদা, কই এত দেরি হইতাছে কেন, আইনা দেও। কিছুতেই দেরি সয় না আমার। সবকিছু ইচ্ছে করে আজই করে ফেলি। এক্ষুনি। এই এক্ষুনি করে ফেলার স্বভাবটি মার মধ্যেও আছে। মা শাদা টেট্রনের কাপড় পেলেন একগজ বাড়ির ছেলেদের টুপি বানানোর জন্য, ঈদের আগে আগে। কাঁচিতে দুটো টুপির কাপড় কাটা হয়েছে, এবার তৃতীয় টুপির কাপড়টি কাটার জন্য হাতের কাছে মা আর কাঁচি পাচ্ছেন না, কাঁচি পাচ্ছেন না, আশেপাশে খুঁজলেন, এঘর ওঘর খুঁজলেন খানিক, এরপর বটি হাতে নিলেন, বটি দিয়েই কাটলেন কাপড়। ছোটদাও বলেন আমার ধৈর্য নেই। জমান প্রিন্টার্সের লোকরাও। আমার কিন্তু মনে হয় না আমার ধৈর্য কিছু কম, বরং মনে হয় মানুষগুলো বড় ঢিলে, যে কাজটি পাঁচ মিনিটে হয়ে যায়, সে কাজটি করতে পাঁচ দিন লাগায়। আমার বসে থাকতে ইচ্ছে হয় না। কবিতা লিখতে গেলেও দীর্ঘক্ষণ সময় নিতে ইচ্ছে করে না। সময় নিলেই মনে হতে থাকে কবিতা আমাকে শেকলে জড়িয়ে ফেলেছে। আমার দম বন্ধ লাগে। একটি কবিতার পর নতুন একটি কবিতা শুরু করতে ভাল লাগে। কিন্তু একটি নিয়ে রাত দিন পড়ে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। ঘষা মাজাও অত পোষায় না। যা লিখেছি লিখেছি। একজনের ধৈর্য দেখেছি, সে বড়মামার শ্বশুরমশাই। বেঁটে ফর্সা ভদ্রলোক, হিমালয়ের গুহা থেকে মাত্র বেরোনো কোনও সন্ন্যাসীর মত দেখতে। তিনি স্ত্রী মারা যাবার পর বিরহ যাতনা বলে একটি কবিতা লিখেছিলেন, দিয়েছিলেন দাদার পাতা পত্রিকায় ছাপতে। তিনশ একচল্লিশটি শব্দের কবিতায় দুশ ছিয়াশিটি শব্দই ছিল হয় যুক্তাক্ষর, নয় রফলা যফলা রেফঅলা শব্দ। তিনি গোটা একটি বছর নিয়েছেন কবিতা লিখতে। দাদা পাতায় সেটি ছাপার পর দ্বিতীয় সংখ্যায় আবার একই কবিতা খানিক সংশোধন করে তিনি ছাপতে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় সংখ্যায় সংশোধিত কবিতা বের হওয়ার পর তিনি তৃতীয় সংখ্যার জন্য যখন একই কবিতার তৃতীয় সংশোধনী নিয়ে দাদার কাছে সকাল বিকাল ধরনা দিতে শুরু করলেন, একসময় এমন হল যে বড়মামার শ্বশুরমশাইএর শ্রীমখু খানা কালো ফটকের কাছে দেখলেই দাদা গোসলখানায় ঘন্টাখানিকের জন্য অদৃশ্য হয়ে যেতেন।

ক্লাস শেষে আমি বেশির ভাগ বাড়ির দিকে না ফিরে যেতে থাকি জমান প্রিন্টার্সের দিকে। জমান প্রিন্টাসর্ রাজবাড়ির ইশকুলের উল্টোদিকে একটি য়চ্ছ সরোবরের পাশে। ছাপাখানার লাগোয়া বাড়িটি উঁচু দেয়াল ঘেরা। খুরশিদ খানের বাড়ি। খুরশিদ খানেরই ছেলে মন, ধন, জন। ধনের বড় ভাই মন দাদার পাতার আমলে ছিলেন। পরে দায়িত্ব চলে গেছে ধনের হাতে। অসম্ভব অমায়িক রসিক ভদ্রলোক ধন। ধোপদুরস্ত জামা কাপড় গায়ে। আমি ছাপাখানায় ঢুকলেই তিনি তাঁর ঘরে ডেকে আমাকে বসান। চায়ের কথা বলেন। বসিয়ে রাজ্যির গল্প করেন। খুরশিদ খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের ছোট ভাই, জাত মুসলিম লীগ। অথচ ধনকে দেখে মোটেও বোঝার উপায় নেই যে বংশের রাজনীতির মোটেও তিনি বাহক। এমন কোনও প্রসঙ্গ নেই, যা নিয়ে তিনি অনর্গল কথা বলতে পারেন না। মূলত আমি শ্রোতা, ধন মাঝে মাঝেই বলেন, কি ব্যাপার আপনি সাহিত্য করেন, অথচ মখু দিয়া কোনও কথাই বার হয় না আপনার। আমি অনেক কবি লেখকের কাছেই ঘেঁষতে চাই না ওদের কথার জ্বালায়। ঠোঁটের স্মিত হাসিটুকু সম্বল করে আমি ধনের ধনচর্চা মনচর্চা জনচর্চা শ্রবণ করে সেঁজুতির যেটকুু ছাপা হয়েছে তা নিয়ে চলে আসি বাড়িতে, প্রুফ দেখে আবার পরদিন দিয়ে আসি। ছাপাখানার শ্রমিকদের সঙ্গে আমার ভাব হতে থাকে। ছাপাখানায় ঢুকলে, লক্ষ করি, ওদের মুখে প্রশান্তির ছাপ।কি আপা কেমন আছেন? আমাকে প্রতিবারই জিজ্ঞেস করেন কালিঝুলিমাখা শ্রমিকেরা। ধন না থাকলেও আমাকে বসতে দিয়ে চা নিয়ে আসে আমার জন্য। কাছ থেকে শ্রমিকদের কাজকর্ম দেখি, মেশিনগুলো কি করে চালাতে হয় শিখে নিয়ে নিজের হাতে চালাই। শ্রমিকেরা আমার কাণ্ড দেখে হাসে। কালি আমার গায়েও লাগে। ছাপাখানার বিষয়টি আমার কাছে আর দুবোর্ধ ্য বলে মনে হয় না। সেঁজুতি যেদিন ছাপা হল, মস্ত প্যাকেট গুলো রিক্সায় তোলার আগে ধনকে ছাপার খরচ দিতে গেলে তিনি বললেন, আপনার মনে হয় টাকা বেশি হইয়া গেছে। যান যান। ওই কয়টা টাকা না নিলে আমি না খাইয়া মরব না। চতুথর্ সংখ্যা সেঁজুতি ছাপা হয়ে বেরোলো, পঈচ্ছদ শাদা, ভেতরে সবুজ। পঈচ্ছদের কাগজ বাড়তি যা ছিল তা দিয়ে সেঁজুতির প্যাড বানিয়ে নিয়ে আসি। কাগজের ওপরে ডানপাশে তসলিমা নাসরিন, অবকাশ, ১৮, টি এন রায় রোড, আমলাপাড়া আবাসিক এলাকা, ময়মনসিংহ। আমলাপাড়ার লেজে এখানকার কোনও বাসিন্দা আবাসিক এলাকা জুড়ে দেয় না, এটি সম্পণূর্ ই দাদার তৈরি। ঢাকার ধানমণ্ডির মত বড়লোকদের এলাকাকে আবাসিক এলাকা বলা হয়, আমলাপাড়ায় দোকান পাট নেই, লোক বসতি কেবল, এটিকে কেন আবাসিক এলাকা বলা হবে না! যুক্তি আছে বটে।

সেঁজুতি দিকে দিকে বিলি হয়ে যাওয়ার পর আবার অস্থির হই। কিছু একটা না করলে চলে কি করে। শতাব্দী চত্রে²র সদস্যদের ডেকে বলি, চল এবার একটা অনুষ্ঠান করি, নবীন বরণ অনুষ্ঠান। নতুন ছাত্র ছাত্রীরা ঢুকছে কলেজে, তাদের বরণ করব। কি হবে অনুষ্ঠানে? সব হবে, নাচ হবে, গান হবে, কবিতা হবে, নাটক হবে। কাজ ভাগ করে দেওয়া হল সদস্যদের, মঞ্চ সাজাও, মাইক ভাড়া কর, নিমনণ্ত্র পত্র ছাপাও, বিলি কর, প্রচণ্ড উৎসাহে ওরা নেমে পড়ল কাজে। অনুপম মাহমুদ টিপু বিচিত্রায় ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন দিত, সিনেপত্রিকায় লিখত, মিষ্টি মিষ্টি হাসে, হাতের লেখাও চমৎকার, ছবি আঁকেও ভাল, নামল মঞ্চ সাজাতে। আমার সঙ্গে মুমিনুন্নিসায় পড়ত উজ্জ্বলা সাহা, গান গাওয়ার অভ্যেস আছে, ওকে ধরলাম উদ্বোধনী সঙ্গীত শোনাতে। অনুষ্ঠানের মহড়া শুরু হয়ে গেল, কেউ নাটক করছে, কেউ কবিতা, কেউ আবৃত্তি, কেউ গান। ছাত্র সংসদের সভাপতি আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, ছাত্র সংসদের আগে কোনও দল নবীন বরণ করতে পারবে না। আগে সংসদ করবে, তারপর অন্যরা। এমন ক্ষুদ্র একটি দলকে ভয় পাওয়ার তো কিছু নেই! দুচারটে তর্কসুরে বাক্য বিনিময়ের পর শেষ পর্যন্ত রণে ভঙ্গ দিয়ে সংসদকে পা বাড়াতে দিই আগে। দ্বিতীয় নবীণ বরণ অনুষ্ঠানের দায়িত্ব শতাব্দির। অনুষ্ঠানের আমনণ্ত্র পত্র ছেপে আনি। এনাটমির অধ্যাপক হারুণ আহমেদকে বলা হল সভাপতি হতে, তিনি এক পায়ে খাড়া, তাঁরও নাকি কবিতা লেখার অভ্যেস আছে, অনুষ্ঠানে কবিতাও পড়তে চাইলেন একটি। শুনেছি নির্মলেন্দু গুণ এ শহরেই আজকাল থাকেন, নীরা লাহিড়ী, গুণের বউ, আমাদের এক ক্লাস ওপরে পড়েন, কলেজের কাছাকাছি বাড়ি ভাড়া নিয়েছেন। সেওড়াতলায় আঁতিপাঁতি করে খুঁজে গুণের বাড়ি পাওয়া গেল, বর্ষার জলে ঘর ডুবে আছে, বারান্দায় একটি চেয়ারে পা তুলে বসে কানে ছোট্ট একটি রেডিও চেপে ক্রিকেট শুনছিলেন তিনি। ঘরময় জল, আমন্ত্রণপত্রখানা তাঁর হাতে ধরিয়ে, শতাব্দির অনুষ্ঠানে কবিতা পড়ার অনুরোধ করে চলে এলাম। নির্মলেন্দু গুণ থাকতে ঢাকা থেকে কবি আনার কোনও প্রয়োজন নেই। নাটকের জন্য ছোটদার বন্ধু ফরিদ আহমদ দুলালকে ধরলাম, তিনি কথা দিলেন একটি একক নাটক করে দেবেন অনুষ্ঠানে। অস্থির লাগছিল কী হয় কী হয়, আদৌ কোনও দর্শক আসে কি না। কিন্তু বেশ দর্শক এল, অনুষ্ঠান হয়ে গেল, কেউ বলল চমৎকার, কেউ বলল কবিতা আরও কমিয়ে দিলে পারতে, নাটকটা শেষে না রেখে মাঝখানে রাখলেই হত, কেউ কেউ বিষম উত্তেজিত, শতাব্দির পরের অনুষ্ঠান কবে হচ্ছে? সে জানি না কবে, ভাসছি তখন উতল হাওয়ায়, শরতের মেঘের মত হৃদয়ের সবটা আকাশ জুড়ে উজ্জ্বলার গাওয়া আনন্দধারা বহিছে ভুবনে র সুর।

 

ঢাকা থেকে গীতা চিঠি লিখল ছোটদাকে ঢাকা যেতে। ছোটদার নাকি কোথায় চাকরির ইন্টারভিউ আছে। ছোটদা আথিবিথি দৌড়ে ঢাকা গিয়ে সাতদিন পর ফিরলেন অবকাশে। ইন্টারভিউ দেওয়ার পর তাঁর চাকরি হয়ে গেছে। আমানুল্লাহ চৌধুরির অবদান এই চাকরি। তিনি বিমানের কর্তাব্যক্তিদের না ধরলে এ চাকরি হত না। ছোটদার মুখে আমানুল্লাহ চৌধুরির মত লোক হয় না ফুটতে থাকে খইএর মত। বাংলাদেশ বিমানে স্টুয়ার্ট হওয়ার ট্রেনিং নিতে তিনি ঢাকা চলে যাবেন, ওখানে বাড়ি ভাড়া নেবেন, ওখানেই থাকবেন। বিদায় অবকাশ, বিদায় বাবা মা, বিদায় ভাই বোন। বিদায় বলতে ছোটদার কণ্ঠ কাঁপে না, কিন্তু বিদায় শব্দটি শুনলে মাথা ঝিমঝিম করে আমার, বুকের ওপর দিয়ে এমন বোধ হয় যে একশ ঘোড়া দৌড়োচ্ছে, শব্দটি শুনলে একটি দৃশ্যের মধ্যে আমি নিজেকে আবিষ্কার করি, ধু ধু মরুভূুমি জুড়ে কোথাও কেউ নেই, কেবল একা আমি। এক গণ্ডূষ পানি পেতে চাইছি, একটি গাছের ছায়া চাইছি, একটি কোনও মানুষ দেখতে চাইছি, কিন্তু পাচ্ছি না কিছুই। কিন্তু ছোটদার মুখে হাসি লেগে থাকে। তিনি নিরলস বর্ণনা করতে থাকেন স্টুয়ার্টের মাহাত্ম্য।

বাবাকে খবর দেন মা, কামাল চাকরি পাইছে।

চাকরি আবার ও পায় কি কইরা? ও ত অশিক্ষিত। লেখাপড়া করে নাই। বাবা বললেন।

লেখাপড়া ওর কপালে নাই। ছোট বয়সে বিয়া করছে। এখন সংসার করতে চায়। চেষ্টা ত অনেক করছেন, ওর ত লেখাপড়ায় মন বইল না।

চাকরিডা কিয়ের শুনি? বাবা উৎসুক।

বিমানের ক্রু খুব নাকি ভাল চাকরি, বিদেশ টিদেশ যাইতে পারব।

হায় রে ভাগ্য আমার, বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, এক ছেলেরে মেডিকেলে পড়াইতে চাইলাম, চান্স পাইল না। ইউনিভার্সিটিতে মাস্টাসর্ পড়তে গেল, মাস্টার্স পরীক্ষা না দিয়া বাড়িত ফিইরা আইল। আরেক ছেলে মেট্রিকে স্টার পাওয়া, সে লেখাপড়া ছাইড়া দিয়া অহন মানুষেরা ভাত খাওয়ানোর চাকরি লইছে, প্লেনে বইয়া মাইনষে হাগব, মুতব, বমি করবে, আমার ছেলে ওইগুলা পরিষ্কার করব। এই চাকরি করার জন্য আমি তারে পাঁচটা মাস্টার রাইখা পড়াইছি? এই চাকরি করার জন্য সে মেট্রিকে স্টার পাইছিল? ভালই, ডাক্তার রজব আলী, মানুষে জিগাস করবে, তোমার দুই ছেলে কি করে, বলতে হবে এক ছেলে ঘুইরা বেড়ায়, আরেক ছেলে উইড়া বেড়ায়।

ছোটদার সঙ্গে আমার সখ্য যখন খুব, ছোটদা বিদায় নিচ্ছেন, চন্দনাও নিয়েছিল যখন চন্দনাই ছিল আমার এক এবং অদ্বিতীয় জগত। আমিই একা পড়ে থাকি যেখানে ছিলাম, সবাই আসে আর যায়। ছোটদা কথা দেন তিনি প্রায়ই ময়মনসিংহে আসবেন, প্রায়ই আমাকে ঢাকা বেড়াতে নিয়ে যাবেন। ঢাকা যাওয়ার সুযোগটি হয়েছে জেনেও আমার মন কেমন করা দূর হয় না। আমি মার মত হয়ত চিৎকার করে কাঁদি না, কিন্তু কাঁদি, গোপনে গোপনে কাঁদি।ছোটদার সঙ্গে আমার এমন নিবিড় সম্পর্কের কারণ,সাহিত্য। দাদার সাহিত্যজ্ঞান রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলে সীমাবদ্ধ, সাহিত্যাঙ্গনে নাটকাঙ্গনে সঙ্গীতাঙ্গনে ছোটদার টই টই ঘোরাঘুরির কারণে বা অন্য যে কারণেই হোক ছোটদার সাহিত্যজ্ঞান বিস্তৃতি পেয়েছিল, তাই তাঁর সঙ্গই আমাকে আনন্দ দিয়েছে বেশি। থানইটের মত মোটা উপন্যাসও দুজন পড়েছি একসঙ্গে। আমি পড়েছি ছোটদা শুনেছেন, ছোটদা পড়েছেন আমি শুনেছি। আমি শ্রোতাও যেমন হারাতে যাচ্ছি, পড়ুয়াও। হারাতে যাচ্ছি ছোটদার সঙ্গে গানের নাচের নাটকের কবিতার সাহিত্যের নানা অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ। ছোটদার, লক্ষ করি, কোনও হারানোর ব্যথা নেই, বরং পাওয়ার আনন্দ। তিনি পেতে যাচ্ছেন ঢাকায় চাকরি, ভাল চাকরি, সচ্ছল সংসার,আলাদা সংসার। এতকাল অনিশ্চিতের সঙ্গে বসবাসের পর তিনি পেতে যাচ্ছেন নিটোলনিপাটনিশ্চিতি।

 

হাবিবুল্লাহর মত আরেকজন আমার পথ আটকাল একদিন, তবে বন্ধু হতে নয়, উদ্দেশ্য অন্য। কলেজ চত্বরেই, শ্যামগঞ্জীয় উচ্চারণে জানাল সে শফিকুল ইসলামের ভাই, ভাইয়ের মত সেও কবিতা লেখে, কলেজের নতুন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছে, আমাকেও চাচ্ছে দাঁড়াই।

আমি?

হ্যাঁ তুমি।

আমি রাজনীতি করি না।

রাজনীতির কোনও প্রশ্ন নাই। তুমি সাহিত্য সদস্য পদে দাঁড়াইবা, কলেজ ম্যাগাজিন সম্পাদনার দায়িত্বে থাকবা, ফাংশান টাংশান করবা, এইসব। তুমি হইলা যোগ্য। ভোট চাইতে হয় তো! আমি ওগুলা পারব না।

ভোট চাইতে হইব না তোমার। তুমি এমনিতেই জিতবা। আরে পুরা প্যানেল, চোখ বন্ধ কইরা কইয়া দিতে পারি, জিতব।

ভোট চাইতে হবে না তো?

না মোটেও না।

ঠিক আছে।

আমি চত্বর থেকেই বাড়ির উদ্দেশে রিক্সা নিই, পেছনে ঝলকাতে থাকে হেলিমের আকর্ণবিস্তৃত হাসি, কালো মুখে শাদা দাঁত।

পরদিন হাবিবুল্লাহ আমাকে খপ করে ধরল, থমথমে মুখ, কি ব্যাপার, তুই বি এন পি করস জানতাম না তো!

আমি বি এন পি করি, কে বলল?

সবাই বলতেছে।

সবাই কারা?

সবাই কারা জানস না? তুই নির্বাচন করতেছিস বি এন পি থেকে? ঠিক কি না? ওই কথা! হ্যাঁ ঠিক, কিন্তু আমি কোনও দল করি না।

বিএনপির মত খারাপ দল আর আছে কোনও! ছাত্ররা সরকারি দল করে, সুবিধা আদায়ের তালে থাকে।

কী সুবিধা?

কী আর! পরীক্ষা পাশ। হাবিবুল্লাহ এপ্রোন খুলে ঘাড়ে ঝুলিয়ে বলল, তুই আজকেই নাম কাটা, দাঁড়াবি, জাসদ থেকে দাঁড়া।

হাবিবুল্লাহ নিজে জাসদ-ছাত্রলীগ করে, হাবিবুল্লারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাহমিদ, সেও জাসদ, চশমা চোখের ভাল ছেলে, ছুটে এল, হাবিবুল্লাহকে নাকি বলেওছিল যদিও আমি কোনও দল করি না, জাসদ থেকে সাহিত্য সদস্য কেন, সাহিত্য সম্পাদক পদে দাঁড়াব কি না, যদিও নিচের ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের করলে সদস্যই করা হয়, কিন্তু আমার বেলায় জাসদ উদার হবে। তাহমিদ জাসদ করা ছাত্রদের একটা তালিকা দেখাল, বলল এরা সব স্ট্যান্ড করা ছাত্র। আর বিএনপির আনিস-রফিক? চার পাঁচ বছর ধরে এক ক্লাসেই পড়ে আছে। জাসদ করা মানে তখন জাতে ওঠা। ছাত্রলীগেও দেখি এক পাল ফেল করা ছাত্রের ভিড়। ভাল ছাত্র ছাত্রীরা হয় জাসদ-ছাত্রলীগ অথবা ছাত্র ইউনিয়ন করে, নয়ত কোনও দলই করে না।

আমি সেদিনই হেলিমকে খুঁজে বের করে বলি আমার নামটা কেটে দেন, আমি নির্বাচন করব না।

কেন কি হইছে?

আমি রাজনীতির কিসু বুঝি না। ছেলেরা বলতেছে আমি নাকি বিএনপি করি।

আরে বোকা মেয়ে, জাসদের পোলাপানরা তোমার মাথাটা বিগড়াইয়া দিতাছে। বিএনপি কর না। কিন্তু বিএনপি থেকে দাঁড়াইতেছ যেহেতু বিএনপি জিতবে এইবার, দাঁড়াইতেছ কলেজের স্বাথের্, পার্টির স্বাথের্ না। সোজা কথাটা কেন বুঝতে পারতেছ না? আর যদি এখন ছাত্রলীগ বা জাসদ থেকে কনটেস্ট কর, জেতার কোনও প্রশ্ন আসে না।

আমি চপু হয়ে থাকি। গলায় স্বর ওঠে না, স্পষ্ট বুঝতে পারি, বড় একটি শক্ত না ছুঁড়ে দিলে হেলিমের মন খারাপ হবে, কারও মন খারাপ করে দিতে আমার অস্বস্তি হয় খুব। আমি হেলিম হয়ে নিজের দিকে তাকাই।

আর তাছাড়া লিফলেট ছাপা হয়ে গেছে। এখন কোনওমতেই কিসু ক্যানসেল করা সম্ভব না। স্ক্যান্ডাল হইয়া যাবে।

আমাকে আরও চুপ হয়ে যেতে হয়। রফিক চৌধুরী আর আনিসুর রহমান ছাত্রদলের বড় দুজন নেতা আমার বাড়ি গিয়ে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে বুঝিয়ে আসেন, আমি নির্বাচনে দাঁড়ানো মানে রাজনীতি করা নয়, কলেজের সাহিত্যসেবা করা।

নতুন নির্বাচনের মরশুম শুরু হল। সারা কলেজের দেয়ালে পোস্টার। মঞ্চে গরম গরম বক্তৃতা, ক্লাসের বেঞ্চে লিফলেটের ছড়াছড়ি, একটু পর পর বিভিন্ন দলের প্রতিযোগিরা ক্লাসে করিডোরে ক্যান্টিনে দেখা করছে, হেসে কথা বলছে, ভোট চাইছে। প্রতিটি দলের প্রতিটি ভোটপ্রার্থীকেই মনে হয় ভোট দিই। ছাত্রদলের সভাপতি আনিসুর রহমান আমাকে চা খাইয়ে, এক গাল হেসে বলেন, চল নির্বাচনী প্রচারণায়।

অসম্ভব।

রফিক চৌধুরি বললেন পার্টির মেয়ে, এত লাজুক হলে চলবে!

পার্টির মেয়ে আমি! অন্যরাও বলাবলি করে। এ রইল আমার গায়ে সেঁটে। যাই হোক, নির্বাচনের দিন কলেজে গিয়ে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ আর জাসদের ভাল ভাল ছেলেমেয়েদের, যাদের যোগ্য মনে হয়েছে, বিভিন্ন পদে, ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরলাম। পরদিন খবর পেলাম, ছাত্রদল মানে আনিস রফিক পরিষদ পুরো প্যানেল জিতেছে। গতবার জিতেছিল ছাত্রলীগ, এবার ছাত্রদল। এখন কি কাজ? ঢাকায় যেতে হবে, দেশের প্রেসিডেন্টর সঙ্গে দেখা করতে হবে।

নিস্প্রভ ছিলাম। ঢাকা যাওয়ার কথায় প্রাণ ফিরে পাই। দল বেঁধে ঢাকা যাওয়া হল বাসে। দল বেঁধে একই বাসে ফেরাও হবে। ঢাকা আমাকে কাপাঁয় তীব্র উত্তেজনায়। রুদ্রর সঙ্গে দেখা হওয়ার উত্তেজনা। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর হেলিম আমাকে ছোটদার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যায় রাতে। মুহম্মদপুরের আজম রোডে একতলা হলুদ বাড়িতে থাকেন ছোটদা। ফকরুল মামার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বাড়িটি ভাড়া নিয়েছেন তিনি। ফকরুল মামা ঢাকার গ্রাফিকস আর্টসে লেখাপড়া করে ছোটখাটো চাকরি করছেন। ছোটদার ঘর সংসার দেখে আমার ভালও লাগে, আবার কষ্টও হয়। কষ্ট হয় ছোটদা অবকাশ ছেড়ে অত দূরে থাকেন বলে। ভাল লাগে, ছোটদার স্বপ্ন সফল হয়েছে বলে, একটি ভাল চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন। চাকরিটি নিয়ে ছোটদার উচ্ছঅ!স খুব, এমন ভাল চাকরি নাকি আর হয় না। তিনি যখন তখন বিদেশ যেতে পারবেন, টাকাও নাকি প্রচুর। আমাকে তিনি পরদিন দাঁতের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন, ডাক্তারটি আবার ছোটদার বন্ধু ময়মনসিংহের অলি গলিতে যেমন ছোটদার বন্ধু ঢাকার অলিগলিতেও। ভীষণ কষ্ট দিয়ে আমার একটি দাঁত তুলে ফেলল বন্ধুটি।। দাঁত নিয়ে ছোটদা সবসময়ই বড় সচেতন। তিনি যখন প্রথম জ্যামিতিবক্স পেয়েছিলেন ইশকুলের বড় ক্লাসে পড়ার সময়, কাঁটা কম্পাসে ঢুকিয়ে আমার দাঁতের ফাঁকে লুকিয়ে থাকা মাংস এনে দিতেন আর বলতেন, দাঁত পরিষ্কার না করলে দাঁত সব পইরা যাইব কইলাম। সেই দাঁত সচেতন ছোটদার চাপে আমার ভাল দাঁতও মনে হয় দাঁতের ডাক্তার তুলে ফেলার প্রেরণা পায়। পচা দাঁত থাকার চেয়ে না থাকাই ভাল, ছোটদা নাক কুঁচকে বলেন। তুলে ফেলা দাঁতের গোড়ায় তুলো চেপে বাড়ি ফিরি। ঢাকা এসেছি অথচ রুদ্রর সঙ্গে দেখা হবে না—দাঁতের কষ্টের চেয়ে এই কষ্টটি আমাকে ভোগায় বেশি।

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে ফিরে বাড়ির সবাইকে তারস্বরে জানিয়ে দিলাম, জিয়াউর রহমানের সাথে হ্যান্ডসেক কইরা আইছি, আমার হাতের হাড্ডিা ভাইঙ্গাই যাইতাছিল, এমন জোরে চাপ দিছে হাতে।

আর্মি মানুষ তো! শইলে জোর বেশি। মা বললেন।

মা সরে যান, মার নিস্পৃহ মখু টি চোখের সামনে স্থির হয়ে থাকে, মার নিরুত্তাপ শব্দগুলোও। মনে মনে ভাবি জোর নিশ্চয়ই বেশি। জোর বেশি বলেই তিনি জোর খাটিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। বিমান বাহিনীতে জিয়ার ওপর অসন্তোষ গোপনে গোপনে বেড়েছিল, যে কোনও সময় একটি ক্যু হতে পারে আঁচ করে হাজার হাজার বিমানবাহিনীর লোককে নির্বিচারে হত্যা করেছেন। গর্তে লুকিয়ে থাকা স্বাধীনতার শত্রুদের পুনর্বাসন দিয়েছেন। শাহ আজিজের মত দেশের শত্রুকে প্রধানমন্ত্রী করেছেন। ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল এদেশে, সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়েছেন। এখন গতর্ থেকে বেরিয়ে এসেছে সাপগুলো আবার ছোবল দেবে বলে যেভাবে দিয়েছিল একাত্তরে, যেভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষ হয়ে লক্ষ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করেছিল। সংবিধানকে বাপের সম্পত্তি মনে করে নিজে হাজম হয়ে মুসলমানি ঘটিয়েছেন সংবিধানের। কোরান পড়তে গেলে যে বিসমিল্লাহির রাহমান ইররাহিম অর্থাৎ আল্লাহর নামে শুরু করিতেছি বলতে হয়, তা বসিয়েছেন সংবিধানের শুরুতে। দেশে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান সব ধর্মের মানুষকে জুতো পেটা করলেও বুঝি এর চেয়ে বেশি অপমান করা হত না। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন। জোর তো তার বেশিই। হাতটি আমি গোসলখানায় গিয়ে সাবান দিয়ে ধুই, যেন যায়, যেন একটি কালো স্পর্শ আমার হাত থেকে মুছে যায়।

রুদ্র ময়মনসিংহে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে বলল, তোমার মাথামুণ্ডু আমি বুঝি না, তুমি নাকি বিএনপি থেকে নির্বাচন করেছ? আমাকে আগে জানাওনি কেন?

জানাইনি।

কেন জানাওনি?

সব কথা জানাতে হবে নাকি!

জানাতে হবে না?

না।

ঠিক আছে, যা ইচ্ছে তাই কর। মান সম্মান তুমি আর রাখলে না!

 

নির্বাচনের হল্লা শেষ হতে না হতেই ক্লাস শুরু হয়ে গেল পুরোদমে। তলপেট থেকে আমার বুকে উত্তরণ ঘটেছে। মরা মানুষ কাটতে হচ্ছে একদিকে। আরেকদিকে ট্রেতে করে ফরমালিনে ভেজা হৃদপিণ্ডের আগাগোড়া পড়তে হচ্ছে। মরা মানুষ কেটে বাড়ি ফিরে যখন খেতে বসি, হাতে গন্ধ লেগে থাকে, আস্ত সাবান খরচ করে হাত ধুলেও হাত থেকে গন্ধ যায় না। গন্ধের সঙ্গে বসবাসের অভ্যেস হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। একদিন তো খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ার পর দেখি হাতের কিনারে মরা মানুষের মাংস লেগে আছে, হাত ধুতেই ভুলে গিয়েছিলাম খাবার আগে। আর পকেটে করে যেদিন হৃদপিণ্ড বাড়ি আনলাম পড়তে, বাড়ির সবাই জিনিসটি দেখল, নাক চেপে, মুখ চেপে, বিস্ফারিত চোখে। আমি দিব্যি হৃদপিণ্ডটি টেবিলের ওপর রেখে কানিংহামের বই খুলে পড়তে শুরু করলাম, ওদেরও দেখাতে থাকি এই হচ্ছে এট্রিয়াম, আর এই হচ্ছে ভেন্ট্রিকেল, এই এখান দিয়ে রক্ত আসে, ওপর থেকে নিচে, তারপর নিচ থেকে রক্ত চলে যায় ওপরে, চলে যায় সারা শরীরে। মার দু চোখে অপার আনন্দ।

এই তো মা আমার ডাক্তার হইয়া গেল, আমার আর চিন্তা কি, আমার চিকিৎসা আমার মেয়েই করবে। মা বলেন।

দাদার প্রশ্ন, এইটা পুরুষের হার্ট নাকি মেয়েমানুষের?

তা জানি না।

দেইখা ত ছোট মনে হইতাছে,মনে হয় কোনও মেয়ের হার্ট।

মেয়েদের হার্ট ছোট হয় তোমারে কে কইল!

একটু ডিফারেন্ট থাকবে না!

না, ডিফারেন্ট থাকবে না।

ইয়াসমিন হৃদপিণ্ডকে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখতে দেখতে বলে, বুবু এইটারেই কি হৃদয় কয়?

হৃদয় হয়ত কয়। কিন্তু এইটা হৃদপিণ্ড, হৃদয় না। হৃদপিণ্ডের কাজ রক্ত পাম্প করা, সারা শরীরে রক্ত সরবরাহ করা।

তাইলে হৃদয় কোনটা?

হৃদয় হইল মাথা। ধর আমার কাউরে ভাল লাগল, আমার স্নায়ুতন্ত্রে খবর হবে প্রথম। স্নায়ুর ঘর বাড়ি হইল মাথায়, বুকে না। বুকে যে ধ্বক শব্দ হয়, সেইটা মাথার স্নায়ুতে নড়চড় হয় বইলা।

ইয়াসমিন অবিশ্বাসী চোখে তাকায় পিণ্ডটির দিকে।

হাবিবুল্লাহর সঙ্গে জড়তা ঝেড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা যে কোনও বিষয় নিয়ে কথা বলে,একটি সহজ এবং য়চ্ছন্দ সম্পর্কে গড়ে তুলে, ছেলে মেয়েতে যে বন্ধুত্ব হতে পারে এবং তা যে কেবল চিঠিতে নয়, তা প্রমাণ করে আমার আনন্দ হয়। অবকাশে হাবিবুল্লাহর অবাধ যাতায়াত ক্রমে চোখ-সওয়া হয়ে গেছে। এই সম্পর্কটি ভবিষ্যতে স্বামী স্ত্রী পর্যন্ত গড়াবে এরকম একটি চিন্তা মাথায় এনে মা যখনই কোনও রকম স্বস্তি পেতে চান, মার অলীক কল্পনা ভেঙে দিয়ে বলি, হাবিবুল্লাহ হইল আমার বন্ধু জাস্ট বন্ধু আর কিছু না। চন্দনার সাথে আমার যেরকম বন্ধুত্ব, ঠিক সেইরকম বন্ধুত্ব, বুঝলা! আমার উত্তর মাকে খুব সুখী করে বলে মনে হয় না। হাবিবুল্লাহ দেখতে সুন্দর, নম্র ভদ্র, দুজনই আমরা ডাক্তার হতে যাচ্ছি, এর চেয়ে ভাল জুটি আর হয় না এধরনের কথা মা আমার কাছে না হলেও মিনমিন করে বাড়ির অন্যদের বলেন। আমার কানে সেসব শব্দের কণামাত্র এলে মাকে আমি ধমকে থামিয়ে দিই। আমি নিশ্চিত সম্পর্কটি কেবল নির্মল বন্ধুত্বের। হাবিবুল্লাহও নিশ্চিত। তার সঙ্গে এক রিক্সায় বসে কোথাও যেতে আসতে আমার কোনও রকম গা কাঁপে না। দাদার সঙ্গে বা ইয়াসমিনের সঙ্গে বা চন্দনার সঙ্গে রিক্সায় বসার মত। হাবিবুল্লাহ জানে যে রুদ্রর সঙ্গে একটি সম্পর্কে গড়ে উঠছে আমার, ফাঁক পেলেই রুদ্রর কবিতা তাকে শোনাই। কিন্তু আমাকে স্তম্ভিত করে হাবিবুল্লাহ একদিন সন্ধেয় বাড়িতে এসে আমাকে তুমি বলে সম্বোধন শুরু করে।তুই সম্বোধন নাকি তার ভাল লাগে না! কেন ভাল লাগে না এই প্রশ্ন করে কোনও উত্তর নয়, একটি সলজ্জ হাসি জোটে। হাসিটির কোনও অনুবাদ করা আমার সম্ভব হয় না। হাসিটি আমাকে অস্বস্তি দেয়, একই সঙ্গে আতঙ্কও। সামনে থেকে উঠে যাই, শোবার ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকি বিষণ্নতাকে দুহোতে জড়িয়ে। বৈঠক ঘরের সোফায় বসেই থাকে হাবিবুল্লাহ, দীর্ঘ একটি চিঠি লিখে ইয়াসমিনের হাতে দেয়। ইয়াসমিন ঘরে আলো জ্বেলে চিঠিটি আমাকে দিয়ে যায় পড়তে। ইংরেজিতে লেখা চিঠিটির সারমর্ম এই, আমাদের এমন চমৎকার বন্ধুত্ব যে কোনও সময় হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু যদি একটি স্থায়ী সম্পর্কে আসা যায়, তবে হারানোর প্রশ্ন ওঠে না। আর নিজেও সে ভেবে দেখেছে, নিজেকে বহুবার প্রশ্ন করে দেখেছে, উত্তর একটিই আমাকে সে ভালবাসে। বন্ধুত্বের উর্ধে এই সম্পর্কটি কি আমি নিয়ে যেতে পারি না! চিঠিটি পড়ে আমি স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় কুঁকড়ে যাই। অপমান আর লজ্জা আমাকে ছিঁড়ে খেতে থাকে। নিজেকে ওই বেদনা থেকে টেনে নিয়ে একটি ত্রে²াধের পেছন পেছন আমি হেঁটে যাই বৈঠক ঘরে। চিঠিটি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে হাবিবুল্লাহর মুখের ওপর ছুঁড়ে চিৎকার করে বলি, এক্ষুনি এ বাড়ি থেকে বার হয়ে যা। এক্ষুণি। আমি যেন কোনওদিন তোর মখু না দেখি।

হাবিবুল্লাহ, নদ্র ভদ্র সুদর্শন, ডাক্তার হতে যাওয়া হীরের টুকরো ছেলে অনেকক্ষণ একা দাঁড়িয়ে থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর কলেজে আমার সঙ্গে অনেক কথা বলতে চেয়েছে সে,কোনও সুযোগ তাকে দিইনি। অনেকদিন বাড়ির দরজায় কড়া নেড়েছে, দরজা খুলিনি।

 

আবু হাসান শাহরিয়ার, ছড়া লিখে নাম করেছে, সেও আমার সঙ্গেই পড়ে মেডিকেলে। ওর সঙ্গে কখনও কথা হয়নি আমার। আমার এপ্রোনের পকেটে একদিন ও মরা মানুষের একখণ্ড মাংসের সঙ্গে একটি চিরকুট আমার অজান্তে ফেলে রাখে, চিরকুটে ছড়া। ভীষণ বিরক্ত আমি শাহরিয়ারের ব্যবহারে, সাহিত্যের জগতের কেউ যে এত বদ হতে পারে আমার ধারণা ছিল না। বদ ছেলেটি এর কদিন পরেই মরা কাটায় অতিষ্ঠ হয়ে ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিয়ে ঢাকায় চলে যায়। ছেলে বদ হোক আর যা-ই হোক, ডাক্তারি বিদ্যা ছেড়েও যে অন্য কোথাও চলে যাওয়া যায় তা আমার বিশ্বাস হয়। কিন্তু বাবা বেঁচে থাকতে তা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না, সে আমি ভাল জানি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় পড়ার যে স্বপ্ন ছিল, সেই স্বপ্ন সুব্রত চাকমার কারণে পূরণ হয়নি চন্দনার। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে বলে ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যখন যোগাড় করছিল, ওর মেট্রিকের মার্কসিট তোলা ছিল না বলে আবাসিক আদর্শ বালিকা বিদ্যায়তনে, যেটি সম্প্রতি ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজে রূপ নিয়েছে, গিয়ে মার্কসিট যোগাড় করে ওকে পাঠিয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে চন্দনা এ মাসে ভর্তি না হলেও আগামী মাসে হবে এরকম যখন খবর, ওকে উপজাতির কোটায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি করে দিয়েছেন সুব্রত চাকমা, নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে। চন্দনা চট্টগ্রাম থেকে লিখছে, ওর মড়া কাটতে ভাল লাগে না। কুমিল্লায় ফেলে যাওয়া কোনও এক সুদর্শনএর কথা ও গভীর করে ভাবছে, সেই সুদর্শন চিঠি লিখেই যাচ্ছে চন্দনাকে, চন্দনাকে ছাড়া সে বাঁচবে না জাতীয় চিঠি। মড়ার গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে জীবিতর ঘ্রাণ নিতে চন্দনাও এক রাতের সিদ্ধান্তে চট্টগ্রাম ছেড়ে কুমিল্লা চলে যায়। কুমিল্লা থেকে হঠাৎ একদিন জানায় ও বিয়ে করেছে ওই বাঁচবে নাকে। এর চেয়ে যদি খবর পেতাম, চন্দনা মরে গেছে, আমার বিশ্বাস হত। বিয়ে আর যে কাউকে করা মানায়, চন্দনাকে নয়। এর চেয়ে বড় কোনও দুঃসংবাদ পৃথিবীতে আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। নিঃসঙ্গতার বিকট লোমশ হাত আমার কন্ঠ এমন সজোরে চেপে ধরে যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। দৌড়ে ছাদে গিয়ে সকলের আড়াল করি নিজেকে। চন্দনাকে নিয়ে এক আকাশ স্বপ্ন ছিল আমার, সেই স্বপ্নের ওপর পুরো জগতটিকে দেখি ভেঙে পড়তে। ভাঙনের স্তুপে আমি শূন্য হাতে একা দাঁড়িয়ে আছি, একা, এত একা যে হঠাৎ নিজের কোনও অস্তিত্ব আমি অনুভব করি না, মাথার ওপর অন্ধকার আর শিশির ঝরে পড়ে ঝপু ঝপু করে, তারপরও না। মাস গেলে চন্দনার বাবা ডাক্তার সুব্রত চাকমার একটি চিঠি আসে আমার কাছে, আমাকেই লিখেছেন তিনি। চন্দনা তাঁকে যে অপমান করেছে, তার প্রতিশোধ তিনি যে করেই হোক নেবেন। চন্দনাকে এ পৃথিবীতে বাঁচতে দিতে তাঁর অন্তত কোনও ইচ্ছে নেই। আমি দুদিন ভয়ে কাঠ হয়ে থেকে সুব্রত চাকমাকে লিখি চন্দনাকে যেন তিনি ক্ষমা করেন, ও ভুল করেছে এ স্বীকার করেই বলি, নিশ্চয়ই একদিন বুঝতে পারবে নিজের ভুল। সুব্রত চাকমা আমার চিঠির কোনও উত্তর দেন না। কিন্তু আবারও মাস গেলে তাঁর একটি চিঠি পাই, তিনি আমাকে নেমন্তন্ন করেছেন রাঙামাটিতে, চন্দনার শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে। নিজের মেয়ের শ্রাদ্ধ করছেন তিনি। জাতচ্যুত মেয়েকে তিনি মেয়ে বলে স্বীকার করেন না, বৌদ্ধ মেয়ে পালিয়ে গিয়ে মুসলমান ছেলেকে বিয়ে করেছে, এই মেয়ে মরে গেছে বলেই তিনি বিশ্বাস করেন। সুব্রত চাকমার এই ভয়াবহ সিদ্ধান্ত শুনে চন্দনার জন্য আমার বড় মায়া হতে থাকে। ইচ্ছে করে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে ওকে সেই সুদর্শন দুর্বৃত্তের কবল থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে আসি। মন বলে চন্দনা ভাল নেই। কষ্ট পাচ্ছে, কাঁদছে। আমারও ভাল লাগে না সারাদিন লাশের গন্ধ আর ফরমালিনে ঝাঁজের মধ্যে মোটা মোটা বইয়ে ঝুঁকে থাকতে। কলেজে খারাপ ছাত্রী হিসেবে আমার নাম ছড়াতে দেরি হয় না।

বিপর্যস্ত আমি কলেজে যাই, আসি। একদিন কলেজের অধ্যক্ষ ফর্সা লম্বা হাসি মখু মোফাখখারুল ইসলাম আমাকে তাঁর ঘরে ডেকে নিয়ে মুখের হাসিটি গিলে চোখের জ্যোতিটি নিভিয়ে খাম খুলে একটি টাইপ করা চিঠি হাতে নেন। চিঠিটি আমি চিনি। এ চিঠির একটি কপি আমি কদিন আগে পেয়েছি।

তুমি তো ডাক্তার রজব আলীর মেয়ে, তাই না?

আমার কণ্ঠে কোনও স্বর ওঠে না। মাথা নাড়ি।

আমার স্বর না ওঠা কণ্ঠের দিকে, আমার ভয়-লজ্জার নতচোখে তাকিয়ে মোফাখখারুল ইসলাম তাঁর নিজের কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব কর্কশ করা যায় করে বলেন, তোমার ভাই এর নাম কি নোমান?

আমি মাথা নাড়ি।

আরেক ভাইএর নাম কি কামাল?

এবারও মাথা নাড়ি।

কামালের বউএর নাম কি গীতা?

এবারও মাথা।

তোমার ছোট বোনের নাম ইয়াসমিন?

মাথা।

মাথা মোফাখখারুলও নাড়েন। এর অর্থ হাতে ধরে রাখা চিঠিটির সত্যতা তিনি যাচাই করতে পেরেছেন। চিঠিটি, মোফাখখারুল ইসলাম জানেন না, যে আমি আগেই পড়েছি। আবদুর রহমান চিশতি নামের মাথা খারাপ একটি লোক আমাকে নিজেই এই চিঠির কপি পাঠিয়েছে। লোকটি দিস্তা দিস্তা চিঠি পাঠাতো আমাকে। শখের পত্রমিতা হয়েছিল কদিনের জন্য। ওসব দিস্তা দিস্তা পাতার চিঠিতে রূপকথা থেকে শুরু করে পৃথিবীর বাণিজ্যনীতি সম্পর্কে কঠিন কঠিন রচনা থাকত। বেশির ভাগই আমার পড়া হত না। সেই লোক হঠাৎ একদিন প্রেম নিবেদন করে বসার পর আমি চিঠি লেখা বন্ধ করে দিই। তারপরই এই হুমকি। আমি যদি সাড়া না দিই, তবে আমার ক্ষতি করবে সে এভাবে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষকে সরাসরি চিঠি লিখে জানাবে যে আমার বংশের সকলের চরিত্র থেকে দগুর্ ন্ধ বেরোয়। আমার বাবা শুয়েছে গীতার সঙ্গে, আমার বোন শুয়ে বেড়ায় এদিক ওদিক। আমি তো আছিই। আমি তো শুয়েছিই চিশতির সঙ্গে, কেবল তার সঙ্গে নয়, তার সব বন্ধর সঙ্গেও। আমার দুভাইএরও একই অবস্থা। মেয়ে দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। শোয়। ইত্যাদি। কেবল শোয়াশোয়ির গল্প। মোফাখখারুল ইসলাম, আমি অনুমান করি, বিশ্বাস করছেন চিঠিটির প্রতিটি শব্দ।

বড় একটি শ্বাস ছেড়ে বলি, এটি একটি উড়ো চিঠি। এ চিঠির কথা আমি জানি। চিশতি নামের এক লোক এই চিঠি লিখেছে। লোকটিকে প্রস্তাবে আমি রাজি হইনি বলে শোধ নিয়েছে।

মাননীয় অধ্যক্ষের সারা মুখে বিদ্রূপ ঝলসাচ্ছে। ঠোঁটে বাঁকা একটি হাসি।

তুমি নিজেকে খুব চালাক মনে কর তাই না? প্রশ্ন করেন।

আমি উত্তর দিই না।

তুমি কি মনে কর আমি কিছু বুঝি না?

আমি নিরুত্তর।

তোমার মত বাজে মেয়েকে আমি এই কলেজে রাখব না। টিসি দিয়ে দেব। শিগগিরি।

এবার আমি আমূল কেঁপে উঠি। সামনে দুলে ওঠে অধ্যক্ষের ঘর, অধ্যক্ষ, চিঠি। আমার সরল সত্য অধ্যক্ষ মেনে নেননি। মেনে নিয়েছেন একটি উড়ো চিঠি, যে চিঠিতে চিঠির লেখকের কোনও নাম নেই, কারও কোনও স্বাক্ষর নেই। যে চিঠির লেখককে অধ্যক্ষ চেনেন না, চেনেননা লোকটির কথাই তাঁর কাছে সত্য, চেনেন মেয়েটির কথা সত্য নয়। অধ্যক্ষের ঘর থেকে বেরিয়ে লক্ষ করি কারও সঙ্গে আমি কথা বলতে পারছি না, আমি আড়াল করতে পারছি না চোখের সজল যনণ্ত্রা। বাকি কোনও ক্লাস না করে সোজা বাড়ি ফিরি। শুয়ে থাকি দেয়ালের দিকে মখু করে বিছানায়। ইয়াসমিন এলে পুরো ঘটনা বলি। মোফাখখারুল ইসলামের মেয়ে শারমিন ইয়াসমিনের ক্লাসে পড়ে বিদ্যাময়ী ইশকুলে। খুব সহজ শারমিনের কাছ থেকে ওদের পরিবারের সবার নাম যোগাড় করা। এরপর খুব সহজ একটি চিঠি লেখা। খুব সহজ চরিত্রে কালিমা লেপা। খুব সহজ চিঠিটি ময়মনসিংহ চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেওয়া। এতে অন্তত উড়ো চিঠি কাকে বলে, এই শিক্ষাটি তিনি পাবেন। শিক্ষাটি দিতে কেবল হাত নয়, মন নিশপিশ করে। কিন্তু নাম যোগাড় হওয়ার পর চিঠিটি লিখতে গিয়েও আমি লিখি না। আমার রুচি হয় না লিখতে। কুকুরের কাজ কুকুর করেছে, কামড় দিয়েছে পায়.. বলে লিখতে যাওয়া চিঠিটি ছিঁড়ে ফেলি।

কলেজে যাই যদিও, ক্লাসে মন বসে না। করিডোরে হাঁটতে গেলে মোফাখখারুল ইসলাম সামনে পড়লে যেন সামনে কোনও মানুষ পড়েনি, যেন ফাঁকা, এভাবে হেঁটে যাই। সাধারণত সামনে কোনও শিক্ষক পড়লে হাত তুলে সালাম দিতে হয়। নিয়মটি আমার কোনওদিনই ভাল লাগে না। আমি এমনিতেও ব্যাপারটি এড়িয়ে চলি। এড়িয়ে চলি বলে অভদ্র বলে আমার দুর্নাম রটে। সেই দুর্নামকেও পরোয়া করি না বলে আমি আপাদমস্তক একটি হাস্যকর বস্তু হিসেবে পরিচিত হই। পরীক্ষায় পাশ করতে হলে সালাম ছাড়া নাকি গতি নেই, এরকম ফিসফিস শুনি। ফিসফিস থেকে আমার নাক কান মখু মন সব সরিয়ে রাখি। জরুরি ক্লাস যা আছে করেই কলেজ থেকে বেরিয়ে যাই। বইয়ের দোকান থেকে রাজনীতি সমাজ সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়ের বই কিনে বাড়ি ফিরতে থাকি। বিকেলে ইয়াসমিনকে নিয়ে এদিক ওদিক বেড়াতে যেতে থাকি, পাবলিক লাইব্রেরিতে ভাল ভাল আলোচনা অনুষ্ঠানে যাই। কিছু না কিছু থাকে প্রায়ই। আর কোথাও যাবার না থাকলে পদ্মরাগমণির বাড়ি গিয়ে কবিতা নিয়ে গল্প করি, নয়ত নাটকঘরলেনে ইশকুলের বান্ধবী মাহবুবার বাড়িতে উঠোনের রোদে শীতল পাটিতে বসে চা মুড়ি খেতে খেতে সহজ সরল জীবনের খুঁটিনাটি নিয়ে কথা বলি, নয়ত নানিবাড়িতে রেললাইনের ওপারে সেই কতকাল আগে ফেলে আসা ছোট্ট চড়ুই ছানা, ছেঁড়া ঘুড়ি, নীল বেলুন, পানা পুকুর, পুঁতির মালার নিভৃত জগত থেকে ঘুরে আসি। মা বলেন, এইযে দুইটা মেয়ে এইরকম একলা একলা বাইরে যাস, মাইনষে কি কইব?

যা ইচ্ছা তাই কউক।

তগোর সাহস বেশি বাইড়া গেছে।

দোষ ত কিছু করতাছি না।

তর বাপ যদি জানে। ঠ্যাং ভাইঙা বাড়িত বওয়াইয়া রাখব।

ভাঙুক। বলে আমি মার সামনে থেকে সরে যাই। মার এই ঘ্যানঘ্যানে বড় বিরক্তি ধরে আমার।

 

চন্দনা আর আগের মত ঘন ঘন চিঠি লেখে না। যা লেখে তা শ্বশুর বাড়ির গল্প। আগের মত চন্দনা আর স্বপ্নের কথা বলে না। আর কবিতাও লেখে না। অনেক বদলে গেছে ও।

হালকা হালকা বন্ধুত্ব হওয়া ক্লাসের ছেলেমেয়েরা আসে বেড়াতে, আড্ডা দিতে, খেতে। ঢাকায় বাড়িঘর ফেলে পারিবারিক পরিবেশ থেকে দূরে হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করা এরা স্বাদ পেতে চায় কোথাও ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়ের, মায়ের হাতের রান্নার মত রান্নার। এদের সঙ্গে সময় উড়তে থাকে আমার।

আবারও কবিতায় পায় আমাকে। সেঁজুতি ছাপার নেশা দপদপ করে জ্বলে। অগুনতি সাহিত্য পত্রিকা, কবিতার খাতা আর সেঁজুতির পাণ্ডুলিপির ওপর বাবা একদিন বস্তা উপুড় করে এক শরীর হাড়গোড় ঢেলে বললেন যা দেখতাছি, দশ বছরেও তর মেডিকেল পাশ হইব না।

১০. কনে দেখা

চাকরি নেওয়ার পর থেকে দাদা অবকাশের চেহারা ধীরে ধীরে পাল্টো ফেলতে শুরু করেছেন। বৈঠকঘর থেকে বেতের সোফা বিদেয় করে নরম গদিঅলা কাঠের সোফা বসিয়েছেন। চার পাঅলা একটি টেলিভিশন কিনে বৈঠকঘরে বসিয়েছেন। বিশাল সেগুন কাঠের পালঙ্ক বানিয়ে আনলেন অভিনব এক হেডবোর্ড সহ, আঙুর গাছের তলে পুরুষ রমণী উলঙ্গ শুয়ে আছে। হেডবোর্ডের দুপাশে আবার ছোটছোট নকশাকাটা ড্রয়ার। এক একটি আসবাব আসে বাড়িতে আর আমরা দূর থেকে কাছ থেকে ছুঁয়ে না ছুঁয়ে দেখি। আয়নার টেবিলও আনলেন, সেটিও বিশাল, নানারকম নকশা অলা। সিংহের পা অলা দশজনে বসে খাবার এক খাবার টেবিল আনলেন। আবার থালবাসন রাখার জন্য আলমারি আনলেন, সেও বিশাল, সামনে কাচ লাগানো। এতসব আজদাহা আসবাবে এমন হল, যে, ঘরে হাঁটার জায়গা রইল না। দাদা খুব গর্ব করে জানিয়ে দিলেন, সব ফার্নিচার সেগুন কাঠের, আর আমার দেওয়া ডিজাইন। লোকেরা, যারাই বাড়িতে আসে, চোখে বিস্ময় নিয়ে দাদার আসবাব দেখে যায়। এরকম আসবাব আর কোথাও তারা দেখেনি। নিজে নকশা এঁকে একটি সবুজ রঙের ইস্পাতি আলমারিও বানালেন, তাঁর সবচেয়ে আনন্দ, এরকম আর অন্য কারও বাড়িতে নেই।

তা ঠিকই, নেই। বৈঠকঘরের সামনের ঘরটি দাদা বানালেন তাঁর আপিসঘর, একটি ড্রয়ারঅলা টেবিল পাতলেন;ফাইসন্স কোম্পানির যাবতীয় কাগজপত্র, ওষুধের ব্যাগ, সব সাজিয়ে রাখলেন সে টেবিলে।

এত আসবাব বানানোর মূল কারণটি হল দাদা বিয়ে করবেন। বউ আসবে, একটি গোছানো বাড়ি পাবে অর্থাৎ তৈরি সংসার পাবে। দামি দামি কাচের বাসনপত্র কিনে আলমারিতে সাজিয়ে রেখেছেন, চাবি তাঁর পকেটে।

আত্মীয় স্বজনরা ঘুরে ঘুরে দাদার সাজানো ঘরদোর দেখে বলে যান নোমানের তো সবই হইল, এইবার একটা বউ হইলেই হয়।

 

বিয়ে করবেন বলে প্রায় কয়েক বছর থেকে মেয়ে দেখে বেড়াচ্ছেন দাদা। মেয়ে দেখানো হচ্ছে, কিন্তু কোনও মেয়েকে পছন্দ হচ্ছে না। বিভিন্ন বাড়ি থেকে প্রস্তাব আসে, অথবা প্রস্তাব পাঠানো হয়, তিনি আত্মীয় বা বন্ধু সঙ্গে নিয়ে মেয়ে দেখে আসেন, যাবার সময় প্রতিবারই এলাহি কাণ্ড ঘটান, ঘন্টাখানিক সময় নিয়ে পুরো-সাবান খর্চা করে স্নান করেন, স্নান সেরে অসম্ভব বেসুরো গলায় গান গাইতে গাইতে মুখে পনডস ক্রিম আর পাউডার মাখেন, হাতে পায়ে জলপাই-তেল আর শরীরের আনাচ কানাচে তো আছেই, বুকে পেটে পিঠে, হাতের নাগালে শরীরের যা কিছু পান, মোটেও কাপর্ণ্য না করে সগু ন্ধী ঢালেন। এমনিতে সগু ন্ধীর ব্যাপারে দাদা বেশ হিশেব করে চলেন, বাড়িতে এক দাদারই সগু ন্ধীর আড়ত, মাঝে মাঝে কোথাও বেড়াতে যাবার আগে, দাদা একটু সেন্ট দিবা? যদি বলি, প্রথম বলে দেন, নাই। গাঁই গুঁই করলে কোথায় যাচ্ছি কেন যাচ্ছি ইত্যাদি সব প্রশ্ন করেন, উত্তর পছন্দ হলে তিনি তার ঘরের গোপন এক জায়গা থেকে সগু ন্ধীর শিশি বের করে বারবার বলেন এইটা হইল আর্থমেটিক, বা এইটা হইল ইন্টিমেট, মেইড ইন ফ্রান্স, মেইড ইনটা দাদা বলবেনই, তারপর এক ফোঁটা মত কিছু দিয়ে বলবেন ইস অনেকটা পইড়া গেল!

কি দিলা দেখলামই না তো!

আরে ওইটুকুর মধ্যেই তো দুইশ টাকা চইলা গেছে।

দাদা বাড়ি না থাকলে খুঁজে ওই গোপন জায়গায়, জুতোর ভেতর, সুগন্ধীর শিশি আর পাইনি, নতুন জায়গায় শিশি রেখেছেন লুকিয়ে, মা-বেড়াল যেমন বাচ্চা-বেড়ালের ঘাড়ে কামড় দিয়ে জায়গা বদলায়, দাদাও তেমন সগু ন্ধীর শিশির জায়গা বদলান। যাই হোক, প্রচুর সময় নিয়ে সাজগোজ করে, আয়নার সামনে নানা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখেন দাদা। আমাদের জিজ্ঞেস করেন কী, সুন্দর লাগতাছে না! আমরা একবাক্যে বলি, নিশ্চয়ই। নিঃসন্দেহে সুন্দর দেখতে দাদা, চুল যেমন ঘন কালো, নাক টিকলো, বড় বড় চোখ, চোখের পাপড়ি, দৈঘের্ প্রস্থে রীতিমত সপুুরুষ। চকচকে জুতো পায়ে, গরমকালেও স্যুট টাইপরা দাদা চমৎকার হাসি নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোন মেয়ে দেখতে আর প্রতিবারই ফেরেন মলিন মখু করে। প্রতিবারই পকেটের সোনার আংটি পকেটেই থাকে, কাউকে আর দেওয়া হয় না।

কী দাদা, মেয়ে কেমন দেখলা? জিজ্ঞেস করি।

দাদা নাক কুঁচকে বলেন আরে ধুর!

প্রতিবারই তিনি বাড়ির সবাইকে বৈঠকখানায় বসিয়ে দেখে আসা মেয়ের খুঁত বর্ণনা করেন।

 

বাবা একবার দাদাকে পাঠালেন তাঁর এক চেনা লোকের মেয়েকে দেখে আসতে। দাদা দেখেও এলেন। বাবা বাড়ি ফিরে দাদাকে নিয়ে বসলেন, মেয়ে পছন্দ হইছে?

দাদা সঙ্গে সঙ্গে মুখের যা কিছু কোঁচকানোর আছে কুঁচকে বললেন না।

কারণ কি? মেয়ে ত শিক্ষিত !

হ শিক্ষিত।

বি এ পাশ করছে!

তা করছে।

মেয়ে ফর্সা না দেখতে?

হ ফর্সা।

চুল লম্বা না?

হ।

মেয়ে তো খাটো না!

না খাটো না।

বাবা এডভোকেট।

হ।

বার কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ছিল ত অনেকদিন।

হ।

শহরে দুইডা বাড়ি!

হ।

ভাল বংশ।

হ।

মেয়ের কাকারা তো সব ভাল চাকরি করে। একজন সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার।

হ।

মেয়ের ফুপাতো একটা ভাই ত লন্ডনে থাকে।

হ।

মুরব্বি কারা কারা ছিল?

মেয়ের ভাই ছিল, বাবা ছিল।

বড় ভাই না ছোট ভাই?

বড় ভাই।

বড় ভাই তো বিয়া করছে কয়দিন আগে, খুব বড়লোকের মেয়েরে বিয়া করছে।

মেয়ের বাবা ডিস্ট্রিক জাজ ছিল।

হ।

ওদের বাড়িঘরের অবস্থা নিশ্চয়ই ভাল।

হ ভাল। ড্রইংরুমে দামি সোফা টোফা আছে।

টেলিভিশন আছে তো!

হ।

কি খাওয়াইল?

তিন রকমের মিষ্টি খাওয়াইল, চা খাওয়াইল।

মেয়ের কথাবার্তা কেমন? আচার ব্যবহার?

তা ভাল।

ভদ্র তো!

হ ভদ্র।

শান্তশিষ্ট মেয়ে!

হ।

তাইলে পছন্দ হইল না কেন?

সবই ঠিক ছিল, কিন্তু

কিন্তু কি?

ঠোঁটটা…

ঠোঁটটা মানে?

নিচের ঠোঁটটা চ্যাপ্টা না, উঁচা। উঁচা ঠোঁটের মেয়েদের আমার দুইচোখখে দেখতে ইচ্ছা করে না।

হুম।

 

দাদার জন্য চ্যাপ্টা ঠোঁটের মেয়ে দেখা শুরু হল। একটি মেয়ের খবর এল, টাঙ্গাইলে বাড়ি, তার বোনের বাড়ি ময়মনসিংহ, আমাদের পাড়াতেই। মেয়েকে টাঙ্গাইল থেকে বোনের বাড়ি আনানো হল। কনে দেখার দিন তারিখ ঠিক হল। দাদা যথারীতি সেজে গুজে আমাকে আর ইয়াসমিনকে নিয়ে ও বাড়িতে গেলেন। মেয়ের বোন দরজা খুলে দিয়ে আমাদের ভেতরে বসালেন। কিছু টুকটাক কথাও বললেন, যেমন, তুমি তো এবার মেডিকেলে ভর্তি হলে, তাই না?

তোমার নাম কি?

ইয়াসমিন! আমার ভাইঝির নামও ইয়াসমিন।

আমার মেয়েও তো বিদ্যাময়ী ইশকুলে পড়ে,ও আজকে ওর মামার বাড়ি গেছে।

আজকাল গরমও পড়েছে খুব, এই গরমে রাত্রে আবার ইলেকট্রিসিটি চলে যাচ্ছে!

আচ্ছা কী খাবেন বলেন, চা না ঠাণ্ডা?

এধরনের অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তার মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যাপারটি ঘটল, ট্রেতে চা বিস্কুট নিয়ে ডানো ঢুকল ঘরে। অপলক তিনজোড়া চোখ ডানোর দিকে। ডানো অপ্রস্তুত হেসে বসল একটি চেয়ারে। চা খাওয়া হচ্ছে, এবং সঙ্গে চলছে অপ্রয়োজনীয় কথা।

টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী কলেজ আর আগের মত নাই, একসময় খুব নাম ছিল।

পোড়াবাড়ির চমচমএর সাইজ আগের চেয়ে ছোট করে ফেলল, আবার দামও বাড়ায়ে দিল!

ডানো খুব কাজের মেয়ে, আমার বাসায় আসলে তো ও-ই সব কাজ করে।

বাড়িঘর গোছানো, রান্নাবান্না, সব ও করে, আবার বাগান করারও শখ আছে। নিজের জামাকাপড় নিজেই শেলাই করে, দরজির কাছে দেয় না।

টাঙাইলে কাদের সিদ্দিকীর বাড়িটা চেনেন, কাছেই নাথবাবুর বাড়ি, ওইখানে আমি মাসে একবার যাই।

ও বাড়ি থেকে হেসে বিদায় নিয়ে বাইরে বেরোতেই দাদাকে জিজ্ঞেস করলাম, কী, পছন্দ হইছে?

দাদার নাক চোখ ঠোঁটের দিকে দুজোড়া চোখ।

চোখগুলা সুন্দর। ইয়াসমিন বলল।

ঠোঁট তো চ্যাপ্টাই। আমি বললাম।

দাদার নাক কুঁচকোলো এবার, বেশি চ্যাপ্টা।

বাড়িতে জানিয়ে দেওয়া হল, ঠোঁট বেশি চ্যাপ্টার কারণে ডানোকে দাদার পছন্দ হয়নি।

মাস কয় পর খবর এল, ডানোর সঙ্গে টাঙ্গাইলের নামী মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকীর বিয়ে হয়ে গেছে।

শুনে দাদাকে বললাম, ইস কি মিসটা করলা, ওরে বিয়া করলেই পারতা!

দাদা বললেন ভাগ্যিস করি নাই। ওর সাথে নিশ্চয় কাদের সিদ্দিকীর প্রেম ট্রেম ছিল।

 

এমনিতে কোনও সুন্দরী মেয়ের বিয়ের খবর শুনলে দাদার মন খারাপ হয়ে যায়, আহা আহা করেন, যেন হাতের নাগাল থেকে চমৎকার লেজঅলা পাখিটি চকিতে উড়ে গেল। দিলরুবার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর দাদা প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলেছিলেন, মেয়েডা একেবারে শীলার ট্রু কপি ছিল।

ছিল কি !এখনও তো শীলার ট্রু কপি।

বিয়া হইয়া গেছে তো!এখন থাকলেই কি ..

হুম।

ওর একটা বইন আছে না? লতা! লতাও কিন্তু সুন্দরী ছিল।

ছিল কি এখনও সুন্দরী।

আচ্ছা লতারে প্রস্তাব পাঠানো যায় না?

কিন্তু ও তো তোমার অনেক ছোট।

তা অবশ্য ঠিক।

আর লতার সাথে শুনছি কার নাকি প্রেমও আছে।

তাইলে বাদ দে!

ময়মনসিংহ শহরে যত সুন্দরী আছে, কলেজে পড়ছে বা আইএ বিএ পাশ করেছে, সবাইকে এক এক করে দাদার দেখা হয়ে গেছে, কিন্তু কাউকে পছন্দ হয়নি। এবার ঝুনু খালা বললেন চল ঢাকায় মেয়ে দেখাই, একটা সুন্দরী মেয়ে আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইল এইবার।

ওর বাড়ি কুমিল্লা, বাবা কলেজের প্রফেসর। রুনুখালা আরও খবর দেন।

মেয়েটা আমার খুব ভক্ত, সারাক্ষণই ঝুনু আপা ঝুনু আপা করে। রোকেয়া হলে, আমার পাশের রুমে থাকে।

দেঁতো হেসে রুনুখালা বললেন।

সুন্দরী কি না কও। দাদার প্রশ্ন।

খুব সুন্দরী।

দাদার পা ডানে বামে নড়তে থাকে দ্রুত।

ঠোঁট চ্যাপ্টা তো!

হ চ্যাপ্টা।

বেশি চ্যাপ্টা না তো আবার?

না বেশি চ্যাপ্টা না।

ঠিক হল, ঢাকার নিউমার্কেটে এক আইসক্রিমের দোকানে লাভলি আর তার এক বান্ধবী বসে থাকবে, দাদা দূর থেকে দেখবেন। দাদার পছন্দ হলে পরে আরও এগোনো হবে। দাদা ঢাকা গিয়ে নিউমার্কেটে হাঁটাহাঁটি করে সময় মত আইসক্রিমের দোকানের সামনে গেলেন, মেয়ে দেখলেন। ঝুনু খালাকে চোখটা ট্যারা মনে হইল বলে ময়মনসিংহে ফিরে এলেন।

ময়মনসিংহের আশেপাশের শহর, টাঙ্গাইল, জামালপুর, নেত্রকোনা সবখানেই দাদা মেয়ে দেখতে গিয়েছেন। মুখ মলিন করে ফিরে এসেছেন। এরপর সিলেট! সিলেটে যাবেন মেয়ে দেখতে। প্রস্তাবটি এসেছে দাদার সঙ্গে এক লোক চাকরি করে, তার থেকে। সিলেটে আমিও যাব বলে গোঁ ধরলাম, গোঁ এ কাজ হল। দাদা আমাকে নিয়ে সিলেট রওনা হলেন। সারা ট্রেনে বলতে বলতে গেলেন, সিলেটের মেয়েরা কিন্তু খুব সুন্দরী হয়।

আমি বললাম, ফটোতে তো মেয়েরে সুন্দরীই মনে হইতাছে।

তা মনে হইতাছে। ফটোতে সব খুঁত কিন্তু ধরা পড়ে না।

 

সিলেটের দরগা রোডে ফাইসন্স কোম্পানীর সপুারভাইজার মুনির আহমেদএর বাড়ি উঠলাম রাতে। বিশাল বাগানঅলা সুন্দর বাড়ি। বাড়িতে ঢুকেই আমাকে অস্থিরতায় পায়। দাদা চল শহরটা ঘুইরা দেখি।

দাদার তখন শহর ঘুরে দেখায় মন নেই। মেয়ের ফটোটি বারবারই বুক পকেট থেকে বের করে কড়া আলোর তলে ফেলে দেখেন, আমাকেও দেখতে দেন ফটো, বলেন তর কি মনে হয়, আবার ভাল কইরা দেখ তো!

বলি দেখছিই তো কত বার!

আবার দেখ। বারে বারে দেখলে কিছু একটা ধরা পড়ে।

ধৎু । সিলেটে আইলাম কি বাসায় বইসা থাকতে! চল না একটু ঘরু তে যাই!

তর ধৈর্যশক্তিটা একটু কমই নাসরিন। দাদা বেজার হয়ে বলেন।

এত দূর জানির্ কইরা আইছি। শরীরে ধূলাবালি ভর্তি। গোসল টোসল করতে হইব।

কি হইব গোসল না করলে? আইসা কইর।

নাক টাক তো ঠিকই আছে কি কস! ফটোর দিকে চোখ দাদার।

আমি জানালায় বসে যতটুকু দেখা যায় বাইরেটা, দেখতে থাকি।একাই যদি বেরিয়ে পড়তে পারতাম শহরটিতে! রিক্সা নিয়ে ঘুরে ঘুরে একাই যদি দেখতে পারতাম সব!

পরদিন মেয়ে দেখা হল। মেয়ের বাবা পুলিশ অফিসার, মেয়ে বিএ পাশ।

সবই ভাল,হেভি ফর্সা মেয়ে, কিন্তু…সামনের দাঁত দুইটা একটু উঁচা। ব্যস। মেয়ে নাকচ করে দিয়ে দাদা আমাকে নিয়ে শাহজালালের মাজার দেখতে গেলেন। মাজার দেখার কোনও ইচ্ছে আমার ইচ্ছে ছিল না, তারচেয়ে শহরময় হুডফেলা রিক্সায় ঘুরে শহরের স্বভাব চরিত্র জানতে পারলে আমার আনন্দ হত।

মাজারে হাজার হ