ঝুনু খালা তবু সারেননি, শেষ পর্যন্ত তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় বড় মামার বাড়িতে, ঢাকায়।
রুনু ঝুনু পিঠাপিঠি বোন, দু’বোনের সখ্য পাড়ার লোকও জানে। চানাচুর অলাও বাড়ির সামনে গান ধরে ও আমার রুনু ভাই, ঝুনু ভাই কই গেলারে, গরম চানাচুর যায় খাইবা নাকি রে। হেই চানাচুর গরম। রুনু ঝুনু কাঁদেন একসঙ্গে, হাসেন একসঙ্গে। গান, নাচেন, বরই কুড়োন, শিউলি ফুল তোলেন, মালা গাঁথেন, সব এক সঙ্গে। ঝুনু তাঁর পেটের খবর রুনুকে বলেন, রুনু তাঁর পেটের খবর ঝুনুকে। দু’বোন পাশাপাশি শোন এক বিছানায়। লোকে বলে আহা যেন যমজ বইন। সেই রুনু হঠাৎ একদিন বাড়ি থেকে হাওয়া। হাওয়া তো হাওয়াই। নেই নেই, শহর জুড়ে নেই। খবর পাওয়া গেল, বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি বিয়ে করেছেন রাসুকে, আছেন এখন রাসুর গ্রামের বাড়িতে, বেগুন বাড়ি। শুনে ঝুনু পাড়া কাঁপিয়ে কাঁদেন। উঠোনের ধুলোয় গড়িয়ে কাঁদেন, বুক থাপড়ে কাঁদেন। কেন কাঁদেন! রাসু ছিলেন ঝুনুর গৃহশিক্ষক। রাসু রুনুর কেউ ছিলেন না। রাসুর সামনে বসে রাসুর চোখের ভাষা পড়েননি রুনু, বুকের ধুকপুক শব্দ শোনেনি। এক ঝুনু জানেন কি করে টেবিলের তলে ঝুনুর পায়ের ওপর এগিয়ে আসতো রাসুর পায়ের আঙুল। কি করে ঝুনুর আঙুল নিয়ে খেলত গোপন এক হাত। ঝুনু জানেন শিউলি ফুলের মালা তিনি কার জন্য গাঁথতেন। কার জন্য তিনি বিকেল হতেই আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতেন বারবার। চোখে কাজল পরতেন কার জন্য! সকলে জানত, ঝুনুকে পড়াতে মাস্টার আসেন, কেউ জানে না কয় ভাগ পড়া আর কয় ভাগ অপড়ায় সময় কাটে ছাত্রী আর শিক্ষকের। ছাত্রী পড়ানোর সময় কারও ঘরে ঢোকা মানা, কারও গণ্ডগোল করা মানা, শিক্ষকের জন্য এক ফাঁকে চা বিস্কুট দিয়ে যেতেন রুনু, ওটুকুই ছিল কেবল পড়া বা অপড়ার মধ্যে সামান্য বিশৃঙ্খলা।
সেই ঝুনুর সঙ্গে যদি রাসুর বিয়ে না হয়ে রুনুর হয়, তবে অপমানে লজ্জায় ঝুনু মরতে চাইবেন না কেন!
পুরুষ হচ্ছে জানোয়ারের জাত, ঝুনু খালার ধারণা তাই।
পুরুষের কথায় মজছ কি মরছ, ঝুনু খালা ঘাটে বসে পুকুরের জলে পা ডুবিয়ে বলছিলেন, মৌলবির ফুঁ এর দু’দিন পর।
শুয়োরের চেয়ে অধম এরা। এরা যারে পায় তারে চাখে। এগোর কুনো নীতি নাই।
তুমারে আইজ কইল ভালবাসে, পরদিন আরেকজনরে একই কথা কইব।
ঝুনু খালার পিঠ পেরিয়ে পাছায় নামা ঘন চুল, সে চুলে জট, কালি পড়া কাজল না পরা চোখ,.গায়ের কাঁচা হলুদ রঙ দেখায় মরা ঘাসের মত।
নানির চার মেয়ের মধ্যে ফজলি খালা একশতে আশি, ঝুনু খালা একশতে পঞ্চাশ, রুনু খালা তিরিশ, আর মা .. . .
দাদা ইস্কুলের মাস্টারের মত রূপের নম্বর এভাবে দিতেন, — আর মা কত?
দাদা চেয়ারে বসে দু’পা নেড়ে নেড়ে, দাঁতে পেনসিল কামড়ে বলতেন, মা হইল রসগোল্লা।
— বুঝলা গেঁতুর মা, তুমিও যেরম আমিও তেমন। তুমারে এক লোকে কষ্ট দিছে, আমারেও দিছে। উপরে যদি আল্লাহ থাকে, আল্লাহ এইটা সইব না। ওগোর বিচার আল্লাহই করব। ঝুনুখালা, পঞ্চাশ পাওয়া রূপসী, নতুন সন্যাসিনী বলেন।
— গেতুঁর মার সাথে এত কি ফুসুর ফুসুর আলাপ ঝুনুর! জানালায় দাঁড়িয়ে দুজনের ঘনিষ্ঠ বসে থাকা দেখে নানি অসন্তুষ্ট স্বরে বলেন,–ঝুনু ত আবার পেডো কথা রাখতে পারে না, কী না কী কয় আবার!
গেঁতুর মা’র বুক কেঁপে দীর্ঘশ্বাস বেরোয়–আল্লাহ আসলে বিচার করে না। আল্লাহ বড় একচোখ্যাপনা করে। গেতুঁর বাপ আমারে মাইরা পুড়াইয়া খেদাইয়া, বিয়া করছে আরেকটা। হে ত সুহেই আছে। সুহে নাই আমি, বাপ নাই যে বাপের কাছে যাই, ভাই আছে দুইডা, ভাইয়েরা আমারে উঠতে বইতে গাইল্লায়, কয় আমারই দুষে আমারে খেদাইছে গেঁতুর বাপ।
গেঁতুর মা’র পোড়া হাত ভেসে থাকে ঝুনুখালা হাঁটুর ওপর থুতনি রেখে বলেন–এই দুনিয়ায় আমার বাঁচতে ইচ্ছা করে না। আবার ভাবি আমি মরতাম ক্যান একলা, ওই দুইটারে মাইরা নিজে মরবাম। আমি সুখে নাই, তরা সুখে থাকবি ক্যান!
এঁদো গলি থেকে পায়ে পায়ে হেঁটে এসে অন্ধকার ঢুকে পড়ে নানির বাড়ির উঠোনে। পুকুরের জলে আধখানা চাঁদ কচুরিপানার কম্বল মুড়ে ঘুমোয়। গেঁতুর মা’র পোড়া হাতখানা ঘুমোয় ছেঁড়া আঁচলের তলে। ঝুনু খালার ইচ্ছে করে না কোথাও যেতে। ইচ্ছে করে পুকুর ঘাটে, বাঁকা খেজুর গাছের এই তলায় তিনি বসে থাকবেন সারারাত আর টুপ টুপ করে তাঁর জটা চুলে শিশির পড়বে। শিশির ভেজা ঘাস থেকে তিনি আর আঁচল ভরে ভোরবেলা শিউলি কুড়োবেন না। আর কারও জন্য মালা গাঁথার তাঁর দরকার নেই। আর কারও জন্য বিকেলে লাল ফিতেয় কলাবেণি করে চোখে কাজল পরে অপেক্ষা করার দরকার নেই।
ঝুনু খালার বড় খালি খালি লাগে। তিনি এক দৌড়ে ঘর থেকে এক ঝুড়ি কাগজ নিয়ে আসেন, রাসুর লেখা চিঠি, নেপথলিনের গন্ধ অলা চিঠি, টিনের ট্রাংকে কাপড় চোপড়ের ভেতর চিঠিগুলো রেখে ছিলেন তিনি, সযতনে। আধখানা চাঁদ যখন ঘুমোচ্ছে আর খেঁজুর গাছে বাদুরের মত ঝুলছে অন্ধকার, ঝুনু খালা আগুন ধরান চিঠিগুলোয়।
— চল গেঁতুর মা, আগুন তাপাই। শীত পড়তাছে।
আগুনে পোড়া চিঠির ছাই উড়ে এসে ঝুনুখালার জটা চুলে পড়ে।
গেঁতুর মার মুখখানা লাল হতে থাকে আগুনে, আগুন দেখলে তার ইচ্ছে করে ভাত ফুটোতে, হাঁড়ির কাছে মুখ নিয়ে বলক পাড়া ভাতের গন্ধ শুঁকতে ইচ্ছে করে খুব। গেঁতুর মার মাথার ওপর অন্ধকারের বাদুরখানা ঝপ করে পড়ে।
