পুরোনো খাতা ফেলে নতুন খাতা ভরে দাদা নতুন উদ্যমে কবিতা লিখতে শুরু করেন আবার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রেমের গান শোনেন একা একা। কলেজে যাওয়ার রিক্সাভাড়া আর টিফিনের পয়সা জমিয়ে বেহালা কেনেন, যামিনী রায়ের কাছে বেহালা বাজানো শিখে এসে শীলাকে ভেবে বেহালায় করুণ সূর তোলেন। শীলা তখনও প্রেমে পড়েনি দাদার, দাদাই একা। দাদার বেহালা শুনে মন গলবে না শীলার, গলবে কোনও এক দিন, কবিতায়। বলদের ডাগর চোখে চোখ রেখে হরিণী বলবে, কবিতা লেখা শিখলেন কোত্থেইকা? ভালই লেখেন।
বলদ লাজুক হাসবে।
হরিণী বলবে–আপনে আমার দিকে এত তাকায়ে থাকেন কেন।
বলদ লাজুক হাসবে।
হরিণী বলবে–আপনে যে এত ঘন ঘন সামনের রাস্তা দিয়া হাঁটেন, আমার ভাই কিন্তু দেইখা বলে নোমান কাঁচিঝুলিতে এত আসে কেন!
বলদ লাজুক হাসবে।
হরিণী বলবে–আপনে আসেন তাতে কার কী, এই রাস্তা কি ফরহাদের কেনা!
আপনে হাঁটেন, আপনের আরও বন্ধু ত কাঁচিঝুলিতে থাকে, তাদের বাসায় যান।
বলদ লাজুক হাসবে।
হরিণী বলবে–আপনে না আপনের দুই বোনের জামা বানাইতে দিবেন, কই নিয়া আসেন একদিন, আমি জামা ভালই শিলাই করতে জানি।
বলদ মাথা নাড়বে।
হরিণী বলবে–ইস কী গরম পড়ছে, ছাদে গিয়া বসলে একটু বাতাস লাগবে।
আপনেরও নিশ্চয় গরম লাগতাছে?
বলদ মাথা নাড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানের এম এ ক্লাসের ছাত্র দাদা। তাঁর মন পড়ে থাকবে ময়মনসিংহ শহরের কাঁচিঝুলিতে। আর বিজ্ঞান ঝুলে থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরের অশ্বত্থ গাছে, বাঁদরের অথবা বাদুরের মত। দাদা ছুটির নামে ঘন ঘন বাড়ি ফিরবেন। বিষন্ন হরিণীর সঙ্গে দেখা হবে কাঁচিঝুলির শিমুলতলায়।
হরিণী বলবে, বাবা আমার বিয়ে ঠিক করতেছে।
বলদ বলবে, কার সাথে?
হরিণী বলবে, যার সাথেই হোক, তুমার সাথে না।
বলদ বলবে,ও।
হরিণী বলবে, বাবার অসুখ, ভাবতেছেন মরে টরে যাবেন, মেয়ের বিয়ে দিলে নিশ্চিন্তে মরবেন।
বলদ বলবে, কী অসুখ?
হরিণী বলবে, যে অসুখই হোক, বিয়ে দিবেন আমার।
বলদ বলবে, ও।
হরিণী বলবে, তুমার বাবা যদি প্রস্তাব নিয়া আসে আমার বাবার কাছে, বাবা মনে হয় না করবেন না।
বলদ বলবে, ও।
হরিণী কাঁদবে।
বলদ বলবে, কাঁদো কেন?
হরিণী বলবে, কাঁদি কেন, তুমি বোঝ না!
বলদ মাথা নাড়বে, সে বোঝে না।
হরিণী বলবে, তুমি না মনোবিজ্ঞান পড়? অথচ মনের কিছুই বোঝ না!
বলদ বিব্রত, অপ্রতিভ।
দাদা বাড়িতে মা’কে প্রথম পাড়বেন কথাটি যে শীলা খুব লক্ষ্মী একটি মেয়ে, ওর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে শিগরি, ওকে লাল শাড়িতে খুব সুন্দর দেখাবে, ও চমৎকার রান্না করতে জানে, চমৎকার শেলাই জানে, শীলা তাঁর শ্বশুর শাশুড়িদের খুব যত্ন করবে, ওর ফুটফুটে সব বাচ্চা হবে।
মা বলবেন, তর বন্ধুর একটা বইন সুন্দরী, সংসারি। ভাল খবর। তা আসল কথাটা কি, ক!
আসল কথাটি বলতে দাদা সময় নেবেন। এক কাঠি দু’কাঠি এগোতে এগোতে একদিন বলবেন শীলাকে তিনি বিয়ে করতে চান। বাবার কানে কথাটি মা মিছরির গুঁড়োর সঙ্গে মিশিয়ে ঢালবেন। মিছরির গুঁড়োর স্বাদও খুব তেতো লাগবে বাবার। এক কাঠি দু’কাঠি পেছোতে পেছোতে বাবা একদিন বলবেন ঠিক আছে মেয়েকে দেখতে চাই আমি।
বলদ বলবে, চল, আমাদের বাড়িতে তোমার দাওয়াত। তোমারে বাবা দেখতে চাইছেন।
হরিণী লাজুক হাসবে।
বলদ বলবে, আমার যে কি খুশি লাগতাছে। তুমি আমার বউ হবা।
হরিণী লাজুক হাসবে।
বলদ বলবে, তুমারে দেখার পর বাবা বিয়ের প্রস্তাব নিয়া তুমাদের বাসায় আসবে।
হরিণী লাজুক হাসবে।
বলদ বলবে, তুমি চুড়ি পইও না আবার হাতে, কানের দুলও না। মুখে রঙ লাগাইও না। বাবা পছন্দ করে না। আর, কইবা মেট্রিকে ফাস্ট ডিভিশন পাইছ, স্টার আছে কইবা। থাক ধরা পইরা যাইতে পার, দরকার নাই। আই এ পড়, খুব পড়াশুনা করতাছ যাতে ফাস্ট ডিভিশন পাও আর বিয়ার পরও লেখাপড়া চালাইয়া যাইবা। এইম কি জিগাস করলে বলবা কলেজের টিচার হওয়া।
হরিণী লাজুক হাসবে।
শীলা আসবে বাড়িতে। বৈঠক ঘরে শীলার সামনে বসে থাকবেন বাবা, দাদা বসে থাকবেন নিজের ঘরে, দাদার পা নড়তে থাকবে দেয়াল ঘড়ির পেন্ডুলামের মত, হাঁটুতে হাঁটুতে লেগে ঠক ঠক শব্দ হবে। বৈঠক ঘরে যেতে তাঁর লজ্জা হবে। মা দুধ শেমাই রান্না করে, ট্রেতে চা, বিস্কুট, মিষ্টি, শেমাই সাজিয়ে সোফার সামনের টেবিলে রাখবেন। খেতে খেতে শীলার সঙ্গে গল্প করবেন বাবা। বাবার ঠোঁটে হাসি ঝিলিক দেবে।
শীলার যাওয়ার সময় হলে নিজে তিনি রিক্সা ডেকে ওকে তুলে দেবেন। কালো ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে হাত নাড়বেন হেসে।
নতুন শাড়ি পরা মা, পান খেয়ে ঠোঁট লাল করা মা, খুশির দোলনায় দোলা মা দৌড়ে যাবেন বাবার সামনে। বলবেন, দেখতে মধুবালার মত।
বাবা বলবেন, ঠিকই।
মা বলবেন, মেয়েটা খুব লক্ষ্মী।
বাবা বলবেন, তা ঠিক।
মা বলবেন, ছেলের বিয়ার বয়স হইছে। তাড়াতাড়িই বিয়াটা হইয়া যাওয়া ভাল।
শার্ট পরা, প্যান্ট পরা, টাই পরা, জুতো পরা, চশমা চোখের, কোঁকড়া চুলের বাবা বলবেন, এই মেয়ের সাথে আমার ছেলের বিয়া দিব না।
হাকিম নড়বে তো হুকুম নড়বে না।
দু’মাস পর তেইশ বছরের ফারাক নিয়ে এক ভুঁড়িঅলা, মোচঅলা, পাঁচ ফুট দু’ইঞ্চি লোকের সঙ্গে শীলার বিয়ে হয়ে যাবে।
হরিণী আটকা পড়বে খাঁচায়।
ঝুনু খালা কেঁদেছিলেন দাদার মত নিরালায় বসে নিঃশব্দে নয়। পাড়া কাঁপিয়ে। নাওয়া খাওয়া ছেড়েছিলেন। বাড়ির কাচের বাসন কোসন ছুঁড়ে ছুঁড়ে ভেঙেছিলেন। গলার ওড়না পেচিয়ে কড়িকাঠে ফাঁসি নিতে গিয়েও নেওয়া হয়নি, আগেই দরজা ভেঙে হাশেম মামা ঢুকে নামিয়ে আনেন। ঝুনু খালাকে কবিরাজ দেখানো হয়, মাথায় মাথা ঠান্ডা হওয়ার তেল মাখা হয়, মৌলবি ডেকে এনে ফুঁ দেওয়ানো হয় মুখে।
