— এক বাত কাপড়ের লাইগা, গেঁতুর মা বলে, বেডাইনের লাত্থি গুতা খাইয়া পইড়া থাহি। আমগো পেডো ক্ষিদা, পেডো ক্ষিদা থাকলে মন পক্কীর লাহান উইড়া যায়। মন দেওয়া নেওয়া করি নাই কুনোদিন। হেইতা বড়লুকেরেই মানায়। মন নাই, আমগোর খালি জ্বলাউরা পেট আছে। যে ভাত দেয়, হেরেই ভাতার কই।
ঝুনুখালার ভাল লাগে না গেঁতুর মা’র ক্ষিধের গপ্প শুনতে। তাঁর কদিন ধরে ক্ষিদেই পায় না। মুখে ভাতের লোকমা তুললেই বমি-মত লাগে। বুকের মধ্যে মনে হয় বিরান এক চর পড়েছে। রাসুর সঙ্গে গাছের তলায়ও তিনি জীবন কাটাতে পারতেন, রাসুর চোখের দিকে তাকালে ঝুনুখালা ক্ষিধে তৃষ্ণা সব ভুলে যেতেন, রাসুর সঙ্গে জলে ডুবে মরলেও তাঁর সুখ হত।
শেষ চিঠিটি, আধেক পুড়ে আগুন নিবে যায়। ঝুনু খালা আধপোড়া চিঠি হাতে নিয়ে বসে থাকেন অন্ধকারে। তাঁর খুব পড়তে ইচ্ছে করে চিঠিটি। এটি সম্ভবত সেই চিঠি, তিনি ভাবেন, যে চিঠিতে রাসু লিখেছিরেন ঝুনুখালাকে তিনি প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসেন। ঢাকা চলে যাওয়ার আগে আগে ঝুনু খালা, আমি আর ঝুনুখালাই কেবল জানি, জুবলিঘাটের হলুদ একটি দোতলা বাড়ির সামনে, বাড়ির গায়ে ডাক বাংলো লেখা, রিক্সা থেকে নেমেছিলেন, পেছন পেছন আমি। ডাক বাংলোর বারো নম্বর ঘরে যখন টোকা দিচ্ছিলেন, ঝুনুখালার নাকের ডগায় দেখেছিলাম ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল এক টিংটিঙে, চিবুক অবদি লম্বা মোচঅলা, দেখতে গেছো ভূত এর মত, নানির বাড়ির দু’বাড়ি পেছনের বাড়ির লোক, দু’একদিন দেখেছি, জাফর ইকবাল নাম। ঝুনুখালাকে ঘরটিতে ঢুকিয়ে দুয়োর এঁটেছিল সে লোক, আর আমি দাঁড়িয়েছিলাম বারান্দায়, ব্রহ্মপুত্রের দিকে তাকিয়ে, আমার বিকেল পার হয় ব্রহ্মপুত্রের ঢেউ ভাঙা ঝিলমিল জল দেখতে দেখতে আর সে জলের ওপর দেখতে দেখতে ভাটিয়ালি গান গেয়ে গেয়ে মাঝিদের নৌকো বাওয়া। পশ্চিমের আকাশ লাল করে ডিমের কুসুমের মত সূর্য যখন ডুবছিল ব্রহ্মপুত্রের জলে, আমি সম্মোহিতের মত, ওখানেই, যেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছিলেন ঝুনুখালা, ছিলাম।
সূর্য ডুবল আর ঝুনু খালা দুয়োর আঁটা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আমার গালে হাতের তেলোয় আদর করে বললেন–শোন, কেউ যদি জিগায় কই গেছিলি, বলবি ঝুনুখালার এক বান্ধবীর বাসায়।
বাংলো থেকে বেরিয়ে রিক্সায় উঠতে উঠতে ঝুনু খালা আবার বলেন–যদি জিগায় কী নাম সেই বান্ধবীটার, বাড়ি কোন জায়গায়?
ঝুনুখালার মুখের দিকে ভাবলেশহীন তাকিয়ে উত্তরের অপেক্ষা করি। তিনি বলেন–কইবি ফাতেমা, থাকে হইতাছে কালিবাড়ি। না না কালিবাড়ি না, কইবি ব্রাহ্মপল্লী। ঠিক আছে?
ঠিক আছে কি ঠিক নেই কিছুই ঝুনুখালাকে আমি বলি না। সম্ভবত তিনি বুঝে নেন, তিনি বলুন আর না বলুন আমার মুখের কপাট সহজে যেহেতু খোলে না, খুলবে না।
১২. প্রত্যাবর্তন ১
চার মাস পর আমাকে হোস্টেল থেকে বাড়ি নিয়ে আসেন মা। সে এক কান্ড বটে। যে মা’র সঙ্গে আমার দেখা করাই মানা ছিল, সেই মা’র হাতে সঁপে দেওয়া হল নিষিদ্ধ গন্দম। মা প্রায়ই হোস্টেল সুপারের সঙ্গে দেখা করে কাঁদতেন, বলতেন ওর বাবা একটা বিয়ে করবে, তাই মেয়েকে হোস্টেলে পাঠায়ে দিছে। সবই হচ্ছে ষড়যন্ত্র। বাড়ি বিক্রি কইরা দিয়া নতুন বউ নিয়া সে আলাদা বাড়িতে থাকবে। এখন মেয়েকে আমার কাছে দিয়া দেন, দুই ছেলের কেউই কাছে নাই, মেয়ে বাড়িতে থাকবে, দেখি কী কইরা তার বাপ বাড়ি বিক্রি করে, কী কইরা বিয়ে করে আরেকটা।
সুপারের মন মা’র কান্নায় গলল। মেয়ে দিয়ে দিলেন মায়ের কাছে।
চার মাস পর বাড়ি ফেরে মেয়ে।
ইয়াসমিনকেও ফেরত আনা হয়েছে মির্জাপুর থেকে।
দু’মেয়েকে দু’পাশে নিয়ে বসে থাকেন মা। সন্ত্রস্ত।
বাবা বাড়ি ঢুকে আমাদের দেখে ভূত দেখার মত চমকে ওঠেন। বাবার চোখ লাল হতে থাকে। চোয়াল শক্ত হতে থাকে। দাঁতে লাগতে থাকে দাঁত। ভয়ে মিইয়ে থাকি আমি, ইয়াসমিন মা’র পিঠের পেছনে লুকোতে চেষ্টা করে মুখ।
মেয়েদেরে ত, মা মিনমিন করে বলেন, জন্ম আমি দিছি। এদের উপর আমার অধিকার নাই নাকি!
কথাটি মা ছুঁড়ে দেন বাতাসে, যার গায়ে লাগে লাগুক।
বাবা টুঁ শব্দ করলেন না। বাড়িতে খাবার পাঠানো বন্ধ করে দিলেন। নানার দোকান থেকে ঠোঙা করে খাবার এনে আমাদের খেতে দেন আর শব্দ ছুঁড়তে থাকেন প্রতিদিন বাতাসে–বিয়া করার খায়েশ হইছে। মেয়েদুইটারে দূর কইরা বিয়া করব। এই শয়তানি আমি বাঁইচা থাকতে হইতে দিব না। বেডা পুইল্যা খেতা লইয়া শহরে আইছিল, আমার বাপে বেডারে টেকা পইসা দিয়া বাচাইছে।
মা হাঁটতে হাঁটতে শব্দ ছোঁড়েন বাতাসে। বাতাসে, দেখে তাই মনে হয়, আসলে ছোঁড়েন বাবার উদ্দেশে। সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে নয়, বাবা যে ঘরে বসে আছেন, তার পাশের ঘর আর বারান্দা থেকে উঁচুস্বরে, এমন উঁচুস্বরে যেন কান খাড়া না করেই বাবা শুনতে পান।
ইস্কুলে যাওয়ার রিক্সা ভাড়া দেওয়াও বন্ধ করে দিলেন বাবা। বন্ধ রইল ইস্কুলে যাওয়া। মা বলেন দেখি কয়দিন লেখাপড়ার খরচ না দিয়া পারে!
মা’র বিশ্বাস এ ব্যাপারে অভিমান বা রাগ দেখিয়ে বেশিদিন থাকা সম্ভব নয় বাবার। তিনদিন ইস্কুলে না যাওয়া লক্ষ করে বাবা শেষ পর্যন্ত নিজেই তাঁর নীরবতা ভাঙেন। ভোরবেলা ঠান্ডা পানিতে গোসল করে কাপড় চোপড় পরে তৈরি হয়ে আমাকে ডেকে গলা কেশে, যেন গলার তলে কফ জমে আছে, বলেন–কি লেখাপড়া করার আর দরকার নাই!
