তের বছরে তখনও আমি পা দিইনি। মা’কে ছেড়ে কখনও কোথাও থাকার অভ্যেস নেই আমার। মা চুল বেঁধে দেন, মুখে তুলে খাইয়ে দেন, জ্বর হলে মাথার কাছে বসে থেকে রাত জেগে জলপট্টি দেন কপালে, গাছের বড় পেয়ারা, বড় আম, বড় ডাব, বড় আতা, বড় মেয়ের জন্য তোলা থাকে। ফুল তোলা ঘটি হাতা জামা বানিয়ে দেন নিজে হাতে। রাতে ঘুম না আসলে পিঠে তাল দিতে দিতে গান ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি মোদের বাড়ি এসো, খাট নাই পালঙ্ক নাই, রাজুর চোখে বসো। মা আমাকে মাঝে মধ্যে আদর করে রাজু বলে ডাকেন। সেই মা’কে ছেড়ে, নিজের বিছানা বালিশ ছেড়ে, এক্কা দোক্কার উঠোন আর গোল্লাছুটের মাঠ ছেড়ে এক তক্তপোশে আমাকে বসে থাকতে হয়, যেহেতু এখানে আমাকে ফেলে রেখে গেছেন বাবা। ছাত্রীনিবাসের মেয়েরা আমাকে দেখে অবাক হয়ে বলে– তুমি হোস্টেলে এসছো কেন? তোমাদের বাড়ি তো এ শহরেই!
কোনও উত্তর নেই ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকা ছাড়া। যেন চিড়িয়াখানায় আজব এক প্রাণী এসেছে, তার পায়ে শিং, পেটে শিং দেখতে এসে মেয়েরা ঠোঁট চেপে হাসে। আমার কাউকে বলতে ইচ্ছে করে না আমার ছোটদা, ঈশ্বরগঞ্জে, ইয়াসমিন যে বাড়িতে জন্মেছিল, সে বাড়ির দেয়ালে পিঁপড়ের পেছনে পিঁপড়ে হাঁটত কালো আর লাল, লাল গুলোকে আঙুলে টিপে মারতেন আর বলতেন–লাল পিঁপড়া হিন্দু।
আমি একটি কালো পিঁপড়ে মেরেছিলাম বলে সে কি রাগ ছোটদার! পিঠে দুমাদুম কিলিয়ে বলেছিলেন–কালা পিঁপড়া মারছ ক্যা? কালা পিঁপড়া ত মুসলমান। লালগুলারে বাইছা বাইছা মারবি।
হ্যাঁ সেই ছোটদাই, হিন্দু পিঁপড়ে মারা ছোটদা এক হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করে বাড়ি ছাড়লেন। লেখাপড়া ছাড়লেন। বাবা মা ভাই বোন ছাড়লেন। ছত্রখান হয়ে গেল সংসার।
দিন সাত পর মা এলেন হোস্টেলে। হোস্টেলের সুপারের কাছে দরখাস্ত করলেন আমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে। মা’র দরখাস্ত মঞ্জুর হয়নি, যেহেতু আমার অভিভাবক হিসেবে খাতায় নাম আছে কেবল বাবার। মা কাঁদতে কাঁদতে বিদেয় হলেন। ইস্কুলের প্রিন্সিপাল ওবায়দা সাদ থাকেন ওপর তলায়, নিচ তলায় হাতে গোনা কজন মেয়ে নিয়ে নামকাওয়াস্তে ছাত্রীনিবাস সাজানো হয়েছে।
প্রায় বিকেলেই বাবা আসেন আমাকে দেখতে, বিস্কুট, চানাচুর, মালাইকারি, মন্ডা নিয়ে। ওগুলো হাতে দিয়ে প্রথমেই জিজ্ঞেস করেন–লেখাপড়া কেমন করতাছ মা?
চোখ মাটিতে। মাথা নেড়ে বলি ভাল।
বাবা মোলায়েম স্বরে বলেন–হোস্টেলে ত আরও মেয়েরা থাকে, তোমার বয়সী মেয়েরা, থাকে না?
মাথা নেড়ে বলি থাকে।
— এইখানে থাইকা ক্লাস করবা, আর ছুটির পরে হোস্টেলে ফিইরা গোসল কইরা খাইয়া দাইয়া পড়তে বসবা। আর ত কোনও কাজ নাই। হোস্টেলে তুমারে দিছি তুমার ভালর জন্য। এহন না বুঝলেও তুমি যহন বড় হইবা, বুঝবা। বাবা সবসময় ছেলেমেয়ের ভাল চায় মা। চায় না?
মাথা নেড়ে বলি হ চায়।
চোখ ফেটে জল আসে আমার। চোখের জল আড়াল করতে আকাশের তীব্র লাল আলোর দিকে তাকিয়ে থাকি, যেন বাবা ভাবেন সূর্য্যর দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকালে জ্বালা করে চোখ জল কিছু আসে, এ কান্না নয়।
বাড়ি ফেরার জন্য কতটা অস্থির হয়ে আছি, বাবাকে বুঝতে দিই না। বাবা ছাড়া আর কোনও অতিথি আসা নিষেধ আমার কাছে। এমনকি মা এলেও মা’র সঙ্গে দেখা করা যাবে না। ইচ্ছে করে দৌড়ে পালাই। কিন্তু মোচঅলা তাগড়া দারোয়ান বসে থাকে গেটে, গেট পার হয়ে কারও বাইরে যাওয়ার সাধ্য নেই। ডাক্তার রেবেকা চলে গেছেন মেডিকেল কলেজের টিচার্স কোয়ার্টারে, রুনিকেও তাই চলে যেতে হয়েছে। ওকে পেলে হয়ত যন্ত্রণা কিছু উপসম হত। আসলে হত কী! আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না।
বিকেলে ইস্কুল ছুটির পর খেয়ে ঘুমিয়ে জিরিয়ে কিছু মেয়ে নামে ব্যাডমিন্টন খেলতে, কিছু মেয়ে আড্ডায় বসে মাস্টারদের কার স্বামী আছে কার স্ত্রী, কার তালাক হয়েছে, কে একা থাকে, কার সঙ্গে কার প্রেম চলছে এসব। আমি আধেক বুঝি, আধেক বুঝি না। আমি ঠিক বুঝে পাই না ওরা কি করে মাস্টারদের ঘরের খবর, মনের খবর রাখে। আমি পারি না। ব্যাডমিন্টনের দর্শক আর আড্ডার শ্রোতা হয়ে আমার সময় কাটে। সন্ধেবেলা বই সামনে নিয়ে বসে থাকতে হয়, সুপার ঘুরে ঘুরে দেখেন মেয়েরা পড়ছে কি না। বইয়ের পাতায় ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ে আমার। অক্ষরগুলো ঝাপসা হতে থাকে, প্রতিরাতে। প্রতিরাতে আমাকে বিছানায় শুতে হয় একা, কোনও ঘুম পাড়ানি মাসি বা পিসি এসে বসে না আমার চেখে।
কী দোষ করেছিলাম, যে আমাকে ঘরবাড়ি ফেলে নির্বাসনে জীবন কাটাতে হচ্ছে! প্রেম করলেন ছোটদা, প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে আমাকে। আমার কোনও দ্বিধা হয় না ভাবতে যে বাবা অন্যায় করছেন।
প্রেম দাদাকেও করতে দেখেছি, নীরবে। অবকাশে আসার তিনদিনের মাথায় পাড়ার অনিতা নামের এক মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন। রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে দীঘল ঘন চুলের এক উজ্জ্বল মেয়েকে দেখলেন ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যস প্রেমে পড়ে গেলেন। অনিতারা মাস ছয় পর চলে যায় কলকাতা। দাদা চোখের জল ফেলতে ফেলতে কবিতা লেখা ধরলেন। শীলাকে দেখার পর কবিতা লেখায় অবশ্য ভাঁটা পড়ে। ফরহাদ নামে দু’জন বন্ধু ছিল দাদার। একজনকে ডাকা হত মুডা ফরহাদ, আরেকজনকে চিকন ফরহাদ। চিকন ফরহাদের বোনই হচ্ছে শীলা। লম্বা মেয়ে, পানপাতার মত মুখ। দাদা বলতেন শীলা দেখতে অবিকল অলিভিয়ার মত, অলিভিয়া ছিল ফিল্মের নায়িকা। সিনেমা পত্রিকা থেকে অলিভিয়ার ছবি কেটে কেটে দাদা ঘর ভরে ফেললেন। বইয়ের ভেতর, খাতার ভেতর, টেবিলক্লথের নিচে, বালিশের নিচে, তোষকের তলায় কেবল অলিভিয়া। আমি আর ইয়াসমিন কোথাও অলিভিয়ার কোনও ছবি দেখলে এনে দাদার হাতে দিতাম। ওসব ছবির দিকে দাদাকে দেখেছি ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকতে, তাকিয়ে থেকে বলতে শীলার থুতনিটা ঠিক এইরকম, নাকটা এক্কেবারে শীলার, চোখ দুইটা ত মনে হয় ওরগুলাই বসাইয়া দিছে। হাসলে শীলারও বাম গালে টোল পড়ে।
