চাবুকে ছোটদাকে রক্তাক্ত করতে করতে বাবা বলেন–এরে আমি মাইরাই ফেলব আজ। এরম ছেলের বাইচা থাইকা কুনো দরকার নাই।
–ছাইড়া দেও যাকগা যেহানে যাইতে চায়। মা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলেন, এরে মাইরা কুনো লাভ নাই। এর রগ ছুডোবেলা থেইকা ত্যাড়া । আইজকা বাপ মা ভাই বোনের চেয়ে তার কাছে বড় হইয়া গেছে এক মালাউনের ছেড়ি। যাক, ও সেহানেই যাক। ওরে ছাইড়া দেও।
ছোটদাকে ছাড়া হয় না। বন্দি করা হয় ওঁর নিজের ঘরে। ঘরের দরজায় নতুন তালা পড়ে, তালার চাবি বাবার বুক পকেটে। বাড়িতে ঘোষণা করে দেন বাবা, ছোটদাকে কোনওরকম খাবার দেওয়া চলবে না। পায়খানা পেশাব তিনি ওঘরেই করবেন, যতদিনে না তাঁর সুমতি হয়। আটকা পড়ে ছোটদা দরজা ভাঙার চেষ্টা করেন, জানলা ভাঙার। কোনওটিই ভাঙে না। ভাঙবে কেন, লোহা গলিয়ে কাঠ বানানো হয় যদি! দৈর্ঘে নফুট, প্রস্থে পাঁচ।
সারারাত গোঙরান তিনি। অনেকগুলো প্রাণী প্রাচীন কোনও প্রেত পুরীর মত বাড়িটির বালিশে মাথা রেখে গোপনে জেগে থাকে। আমিও জেগে থাকি। অনেক রাতে, সে কত জানি না, ইয়াসমিন ভাঙা গলায় বলে–বুবু, আমার ঘুম আয়ে না। আমি পাশ ফিরে বলি–আমারও না।
দীর্ঘশ্বাস ছড়াতে ছড়াতে ঘরে কুয়াশা-মত জমে, চোখে ঝাপসা লাগে সব। ঝাপসা হয়ে আসে দরজা জানালা বারান্দার আলো পড়া ঘরের আসবাব, সব। অন্ধকার আমার চুলে এসে বসে, চোখে, চিবুকে।
ছোটদা চারদিন উপোস থাকার পর মা জানালার লোহার শিকের ফাঁক গলে লুকিয়ে খাবার চালান করেন। ছোটদাকে খাইয়ে চারদিন পর নিজে তিনি খাবার মুখে তোলেন। বাবা ঘরে বসে কান পেতে থাকেন বন্ধ ঘর থেকে কোনও সমর্পনের শব্দ আসে কি না, কষ্ট পেতে পেতে, ক্ষিধের বন্দিত্বের। শব্দ আসে না। বাড়ির চুলোয় যেন আগুন ধরানো না হয়, বাবার কড়া হুকুম।
কি করে বাঁচবে তবে বাড়ির বাকি মানুষ!
মুড়ি চিবিয়ে পানি গিলবে, ব্যস।
আর ও ঘরে কেউ কোনও খাবার পাচার চেষ্টা করলে তাঁকেও চাবকানো হবে। তবু বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু না কিছু জানলা গলে ও ঘরে যায়ই। আমার স্পষ্ট ধারণা হয় বাবা টের পান যে ছোটদাকে খাবার দেওয়া হচ্ছে এবং তিনি ঘটনাটি না জানার ভান করছেন। বাবা তাঁর ছুটি আবার বাড়িয়ে বাড়িতে বসে থাকেন আর অপেক্ষা করেন ছোটদার আত্মসমর্পনের। এদিকে শুকিয়ে ছোটদার হাড় বেরিয়ে আসে বুকের, গলার, গালের। আস্ত একটি কঙ্কাল দাঁড়িয়ে গোঙরায় জানালার শিক ধরে।
বাঘে বাঘে লড়াই চলছে, আমরা অসহায় দর্শক মাত্র। লড়াই শেষ হয় পনেরোদিন পার হলে ‘পর।
লড়াইয়ে হেরে যান বাবা। ছোটদাকে শেষ অবদি ছেড়ে দিতে হয়।
ছোটদা চলে যাওয়ার পর বাবা আমাদের দু’বোনকে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন। এত শক্ত করে যে মনে হয় বুকের হাড় সব ঢুকে যাবে মাংসের ভেতর। জড়িয়ে বাবা বলেন, তুমরা আমারে কথা দেও পড়ালেখা কইরা মানুষ হবা তুমরা, কও!
আমরা মাথা নাড়ি হব।
— দুইটা মেয়েই এখন আমার স্বপ্ন। কও, তুমরা কেও তুমরার ভাইয়ের মত হইবা না। কও! বাবা বলেন।
আমরা মাথা নাড়ি হব না।
— ছেলেমেয়েদের মানুষ করার জন্য আমি সব করছিলাম। আমার কত স্বপ্ন ছিল কামালরে নিয়া। ও কী অসভব ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিল, মেট্রিকে স্টার পাওয়া ছাত্র। ও আমার কত গর্ব ছিল। আমার সব গর্ব, সব স্বপ্ন এখন শ্যাষ। তুমরা আমার শ্যাষ ভরসা। তুমাদের মুখের দিকে চাইয়া এখন আমার বাঁচতে হইব। কও আমারে বাঁচতে দিবা! লেখাপড়া করবা, কও! বলতে বলতে বাবার গলা বুজে আসে।
আমরা মাথা নেড়ে বলি করব।
— আমি আমার ছেলেরে মারতে চাই নাই। আমার কি কম কষ্ট হইছে ছেলেরে মারতে! না খাওয়াইয়া রাখতে! শেষ চেষ্টা করছি ছেলের মত যেন পাল্টায়। আদর কইরা বুঝাইছি, শুনে নাই। মাইরা কইছি, তাও শুনে নাই। তুমরা শুনবা আমার কথা, কও! আমরা মাথা নেড়ে বলি শুনব।
বাবার চোখের পানি আমাদের জামা ভিজিয়ে ফেলে। বাবাকে এই প্রথম আমরা কাঁদতে দেখি।
কিন্তু আমরা মাথা নেড়ে কথা দিয়ে দিলাম আর বাবাও তা মেনে নিয়ে মনে সুখ পাবেন, বাবা আমার এমন ধাঁচের নয়। তিনি মা’কে বলেন–পরিবেশ নষ্ট হইয়া গেছে বাড়ির। এই এত বড় বাড়ি আমি কিনছিলাম, আমার ছেলেমেয়েদের জন্য,যেন তারা একটা ভাল পরিবেশে লেখাপড়া করতে পারে। সবার জন্য আলাদা ঘর, ক্যাচর ম্যাচর নাই, গণ্ডগোল নাই। পাড়ার কারও সাথে মিশতে দেই নাই ছেলেমেয়েদের। নিরিবিলি থাইকা যেন লেখাপড়ায় মন দেয়। হইল না। বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শরীরখানা বিছানায় এলিয়ে বলেন–এই বাড়ি দিয়া আমি এখন করব কি! আমি বাড়ি বেইচা দিব। আমার চোখ ফাঁকি দিয়া নুমানে বন্ধু বান্ধব লইয়া আড্ডা দিয়া পরীক্ষায় খারাপ করছে, কামালে চইলা গেল এক ছেড়ির লাইগা নিজের জীবনটা নষ্ট করতে। এই বাড়িতে থাকলে মেয়েদুইটাও মানুষ হইব না।
মা নীরবে দেখেন সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যাওয়া মানুষের কাতরানো। নামাজ শেষে মা প্রতিদিন প্রার্থনা করেছেন ছেলের মন যেন ফেরে বিধর্মী মেয়ে থেকে। ছেলে যেন তওবা করে নামাজ শুরু করে। ছেলে যেন ঈমান আনে। মা’র প্রার্থনায় কাজ হয়নি। ছোটদা চলে যাওয়ার সময় একবারও পেছন ফেরেননি।
ছোটদা চলে যাওয়ার দু’দিনের মাথায় বাবা দুটো সুটকেসে বইখাতা কাপড় চোপড় ভরে আমাকে রেখে আসেন মডেল ইস্কুলের ছাত্রীনিবাসে, আর ইয়াসমিনেকে মির্জাপুরের ভারতেশ্বরী হোমসএ। রুখে দাঁড়ানোর সাহস আমাদের কারও ছিল না। কালো ফটকের সামনে পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে ছিলেন মা। টোকা দিলে বুড়ো গোলাপের পাপড়ির মত ঝরে পড়ত পাথর, জানি।
