বৈঠকের পরদিন এক ভয়ংকর ঘটনা ঘটে। ছোটদাকে ধরে এনে বৈঠকঘরে মোটা শেকলে বাঁধেন বাবা আর হাশেম মামা। পায়ে শেকল, হাতে শেকলে, শেকলে তালা। চাবি বাবার বুক পকেটে। বাবার গর্জনে বাড়ি কাঁপে, গাছপালা কাঁপে। জানালার ফাঁকে চোখ রেখে দৃশ্য দেখে গা ঘামতে থাকে আমার। ইয়াসমিন বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ রেখে কাঁদতে থাকে। মা বারান্দায় অস্থির হাঁটেন, বিড় বিড় করতে করতে দ্রুত সরাতে থাকেন তসবিহর গোটা।
— গীতারে ছাড়বি কি না ক! না ছাড়লে তরে আমি ত্যাজ্য পুত্র করাম। থেকে থেকে বাবার গর্জন।
ছোটদা বলেন নিরুত্তাপ কণ্ঠে–ত্যাজ্য পুত্র করেন, আমি গীতারে ছাড়তাম না। বাবার চোখ বেরিয়ে আসতে থাকে কোটর থেকে, শার্ট ঘামে ভিজে লেপ্টে আছে শরীরে। কোমরে দু’হাত রেখে হাঁপাতে থাকেন, রক্তচাপ বাড়ছে বাবার।
— তুই বাড়ি থেইকা কুথাও যাইতে পারবি না। কুথাও না। কলেজে পড়বি। পরীক্ষা দিবি।
ছোটদা চড়া গলায় বলেন–আমি এই বাড়িতে আইতে চাই নাই। মিছা কথা কইয়া আমারে আপনেরা নিয়া আইছেন। আমি গীতারে বিয়া করছি। আমারে ছাইড়া দেন। আমি গীতার কাছে যাইয়াম। আপনাগোর কাছে আমি কিচ্ছু চাই না। আমারে ছাইড়া দেন।
— গীতারে ছাড়। নাইলে তর মরন আমার হাতে। আমি তরে চাবকাইয়া একেবারে মাইরা ফালাব। বাবার দু’চোখ থেকে আগুন ঝরে।
ছোটদাকে বাবা দু’ঘন্টা সময় দিয়েছেন ভাবার, ওই দুঘন্টা সময় জুড়ে ছোটদা দেয়ালে হেলান দিয়ে চোয়াল শক্ত করে বসে থেকেছেন। আর দফায় দফায় গিয়ে নানি, রুনু খালা, মা বলেছেন– বাবারে তুমি ভাল ছেলে। তুমার বাবা যা কয় মাইনা লও। এই বয়সে ছেলেরা অনেক ভুল করে, তুমার বাবা তুমারে মাপ কইরা দিব যদি বাড়িত ফিইরা আইসা লেখাপড়া কর, পরীক্ষা দেও। তুমি ডাক্তারি পইড়া বড় ডাক্তার হইবা। হ বিয়া করছ করছ। মেয়েও তার বাবার বাড়ি ফিইরা যাক। লেখাপড়া শেষ কর দুইজনেই। পরে তুমার বাবা বড় অনুষ্ঠান কইরা মানুষরে জানাইয়া এই মেয়েরেই ঘরে তুলব তুমার বউ কইরা। তুমি ছাত্র মানুষ, এই যে বিয়া কইরা বাড়ি ছাইড়া গেলা গা, খাইবা কি, বউরে খাওয়াইবা কি? যেটুক লেহাপড়া করছ এটুক দিয়া ত কুনো চাকরিই পাওয়া যাইত না। তুমি কি কুলিগিরি করবার চাও? তুমি কি রিক্সা চালাইবা? তুমার বাবা বড় ডাক্তার, শহরে তারে এক নামে সবাই চিনে। বাপের কথা মাইনা লও। ত্যাজ্য পুত্র করলে তুমি বাপের সম্পত্তির কানাকড়িও পাইবা না। বাবা, তুমার ত বুদ্ধি আছে, মেয়েরে গিয়া কও তার বাড়িত ফিইরা যাইতে। তুমার বাপ কথা দিছে বিয়া করার সময় অইলে যারেই তুমি বিয়া করতে চাও, তুমার বাপ তারে দিয়াই বিয়া করাইব।
ছোটদার চোয়াল শক্তই থাকে। তাঁর একটিই কথা, শেকল খুলে দেওয়া হোক। শক্ত চোয়ালকে বাবা পরোয়া করেন না, গরু পিটিয়ে মানুষ করার খ্যাতি আছে তাঁর। জীবন নিয়ে জুয়ো খেলছে ছেলে, এ তিনি বাবা হয়ে সহ্য করতে পারেন না। চোখের সামনে ছেলে তাঁর আগুনে ঝাপ দিচ্ছে, কেন তিনি তা হতে দেবেন! এ তাঁর নিজের ছেলে, এ ছেলের শরীরে তাঁর রক্ত, ছেলের মুখে তাঁর মুখের আদল। ছেলেকে মানুষ করতে তিনি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টাকা রোজগার করেছেন, খাইয়ে পরিয়ে বড় করেছেন, ছেলে তাঁর বংশের বাতি, ছেলে তাঁর, ছেলেকে তিনি যে করেই হোক ফেরাবেনই। দু’ঘন্টা পর বাবা আসেন বৈঠক ঘরে শক্ত শেকলে বাঁধা চোয়াল শক্ত ছেলের সামনে। হাতে তাঁর চাবুক।
— কি তর সিদ্ধান্ত কি? আমার কথা মত চলবি কি চলবি না। বাবা না নরম না গরম কণ্ঠে বলেন।
ছোটদার চোয়াল আরও শক্ত হয়। বলেন–আমারে ছাইড়া দেন।
— হ তরে ত ছাড়বই। আমার কথা ছাড়া কুথাও এক পাও লড়বি না। গীতার কাছে যাওয়া তর চলবে না।
দাঁতে দাঁত চেপে ছোটদা বলেন–আমার কথা একটাই, এর কুনো নড়চড় নাই। আমি এই বাড়িতে থাকতাম না। আমি গীতার কাছে যাইয়ামই।
— গীতারে খাওয়াইবি কি, নিজে খাইবি কি? চাবুক নাড়তে নাড়তে বলেন বাবা।
— সেইডা কারও চিন্তা করার দরকার নাই। চোয়াল তখনও শক্ত ছোটদার, দাঁতে দাঁত।
ছোটদার জায়গায় আমি হলে, সব শর্ত সম্ভবত মেনে নিতাম। বাঘের থাবায় এসে বাঘের সঙ্গে রাগ দেখানো বোকামো ছাড়া আর কী!
চোয়াল এবার শক্ত হয় বাবার। চোখ হয় করমচার মত লাল।
চাবুক চালান ছোটদার ওপর, ক্ষুধার্ত বাঘের মুখে এতদিনে আস্ত হরিণ। চাবুক যেন আমার পিঠে পড়ছে। আমারই সারা গা থেকে রক্ত ঝরছে। চামড়া কেটে মাংস বেরিয়ে গেছে পিঠের, মাংস কেটে হাড়। চোখ বুজে থাকি। চোখ বুজে অপেক্ষা করি চাবুক থামার। চাবুক থামে না। বৈঠক ঘর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসেন মা, নানি, বড় মামা, রুনু খালা। কেউ বারান্দার থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সামনে তাকিয়ে থাকেন জানেন না কিছু দেখছেন কিনা সামনে, কেউ ধীরে হাঁটতে থাকে, জানেন না হাঁটছেন কি না, কেউ নিজের চুল খামচে ধরে থাকেন, জানেন না তাঁর চুলে তিনি হাত দিয়েছেন কি না। একেকজন যেন মৃত মানুষ, কবর থেকে উঠে এসে হাঁটছেন গন্তব্যহীন, তাঁরা কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছেন না, সামনে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, অন্ধকারে শুয়ে আছে অরণ্য আর অরণ্য থেকে একটি কেবল শব্দ আসছে, সে চাবুকের।
মা দৌড়ে যান বৈঠক ঘরে, গিয়ে চাবুকের আর মা মা চিৎকারের তলে যেন না হারায় তাঁর নিজের শব্দ, চিৎকার করে বলেন–ছেলেটা ত মইরা যাইব। মাইরা ফেলতে চাও নাকি! আমার ছেলেরে তুমি মাইরা ফেলতে চাও!
