বলল–চল তুমারে দারুন এক জায়গায় নিয়া যাব বেড়াইতে।
দারুন এক জায়গায় যাওয়ার জন্য আমার তর সয় না। রিক্সা করে গীতার সঙ্গে দিব্যি রওনা হয়ে গেলাম। উঠলাম গিয়ে সাহেব কোয়ার্টারে জজের বাড়িতে। বড়লোকের বাড়ি। রুহি নামের এক মেয়ে গীতার বান্ধবী, তাকে নিয়ে তার বেরোতে হবে কোথাও। রুহি, চ্যাপ্টা দেখতে মেয়ে, বেজায় ফর্সা, তার মা’কে পটাতে লাগল বাইরে বেরোবে বলে। মা’র পটতে যত দেরি হয় গীতা আর রুহি তত ফিসফিস কথা বলে নিজেদের মধ্যে, আর আমি বসে থাকি খেলনার মত সোফায়। ঘন্টা দুই পর রুহির মা পটল, রুহি মুখে লাল পাউডারের আস্তর মেখে চোখে কাজল ফাজল লাগিয়ে বের হল, তিনজন এক রিক্সায় বসে রওনা হলাম সেই দারুন জায়গায়। আমার তখন দারুন জায়গাটি ঠিক কোথায়, জানা হয়নি। ওরা রিক্সায় বসে খিলখিল হাসে, আর আমি কাঠের ঘোড়ার মত বসে থাকি গীতার কোলে। গুলকিবাড়ির এক বাড়িতে রিক্সা থামে, বাড়ির এক শিয়াল-মুখো লোক আমাদের ভেতরে ঢুকিয়ে গেটে তালা দিয়ে দেয়। লোকটিকে আমি কখনও দেখিনি এর আগে। নিঝুম একটি বাড়ি, বড় মাঠঅলা। ঘরের ভেতর ঢুকে দেখি সারা বাড়িতে আর কোনও লোক নেই, শিয়াল-মুখো ছাড়া। দুটো ঘর পাশাপাশি। ভেতরে শোবার ঘরে রুহি ঢুকে যায় লোকটির সঙ্গে। পাশের ঘরের সোফায় খেলনার মত নাকি কাঠের ঘোড়ার মত নাকি জানি না, বসে আমি দেখতে থাকি লোকটি রুহির সঙ্গে ঘন হয়ে বিছানায় বসল। এত ঘন হয়ে যে আমার পলক পড়ে না। শিয়াল-মুখো শুয়ে পড়ল বিছানায় রুহিকে বুকের ওপর টেনে। হঠাৎই এক লাফে রুহিকে সরিয়ে বিছানা থেকে উঠে এসে লোকটি আমাদের হাতে ফানটার বোতল ধরিয়ে দিয়ে গীতা যাও, লনে বস গিয়া বলে শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।
মাঠে গিয়ে আমি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করি–লোকটা কে?
মিটিমিটি হেসে গীতা বলল–খুররম ভাই। অনেক বড়লোক। গাড়ি আছে।
— রুহিরে নিয়া যে লোকটা দরজা বন্ধ কইরা দিল। ঢোঁক গিলে বলি, এহন কি হইব। আমার ডর লাগতাছে। চল যাইগা।
গীতা তার কালো মুখে শাদা হাসি ফুটিয়ে বলে, আরে বস, এহনি যাইয়া কি করবা!
দুপুর পার হয়ে বিকেল হয়ে গেল চল যাইগা চল যাইগা করে করে। আমি ছটফট করি, প্রতিটি মুহূর্ত কাটে আমার অস্বস্তিতে। শিয়াল-মুখো ঘন্টায় ঘন্টায় ফানটার বোতল দিয়ে যায় এদিকে। ফানটা খেয়ে তখন আর আমার পোষাচ্ছে না। ক্ষিধেয় চিনচিন করছে পেট। গেটের কাছে গিয়ে কান্না-গলায় বলি–গেট খুইলা দেও। আমি যাইগা। আমার আর ভাল লাগতাছে না।
গীতার মুখও শুকনো হয়ে ছিল। শোবার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল–ও খুররম ভাই। ও থাকতে চাইতাছে না। আমরা না হয় যাই গা।
বেরিয়ে এল শেয়াল-মুখো, পাকানো মোচ পুরু ঠোঁটের ওপর, আঙুলে সিগারেট, খালি গা, খালি পা।
— গীতা, ফটো তুইলা দেও তো কিছু। আসো। বলে লোকটি গীতাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম দরজায়।
রুহি মাথা নিচু করে বিছানার মধ্যিখানে বসেছিল। বাঁধা ছিল চুল ঘোড়ার লেজের মত, এখন খোলা, এলোমেলো। ঠোঁটে লিপস্টিক ছিল, নেই। চোখের কাজল ছতড়ে গেছে। বড় মায়া হতে থাকে রুহির জন্য। লোকটি কি ওকে ন্যাংটো করেছিল! ও কি চেয়েছিল ন্যাংটো হতে নাকি চায়নি! লোকটি কি ভয় দেখিয়ে, জোর করে রুহিকে আটকে রেখেছে ঘরে! কিছু ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। গীতার হাতে ক্যামেরা দিয়ে লোকটি রুহিকে দু’হাতে জাপটে ধরল, গীতা মিটিমিটি হেসে টিপ দিল বোতামে। লোকটি শুয়ে পড়ল রুহির কোলে। গীতা টিপল আবার। রুহির গালে গাল লাগাল লোকটি, গীতা টিপল।
আমাদের ছাড়া পেতে পেতে সন্ধে পার হয়ে গিয়েছিল। গীতা প্রথম রুহিকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে পরে আমাকে দিল, বলল কাউরে কইবা না কই গেছিলা। সারাদিনের নিখোঁজ কন্যার জন্য দুশ্চিন্তায় বাবা মা’র ঈদ মাটি হয়েছে। আমি পাংশু মুখে বাবা মা’র রক্তচোখের সামনে দাঁড়িয়ে পিঠ পেতে বরণ করেছি যা আমার প্রাপ্য ছিল। সেই রহস্যে মোড়া গীতা, যে আমাকে একটি দারুন দিন উপহার দিয়েছিল, সে এখন ছোটদার বউ! শহরের নামকরা গিটার বাজিয়ে ছোটদা, কলেজে তাঁর গিটারের সুরের সঙ্গে ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা নেচেই গীতা মিত্রের মাথা ঠেকানো শুরু হয়েছিল ছোটদার কাঁধে, বুকে। সেই গীতা মিত্র! বেবি বলত, ও একটা জঘন্য মেয়ে। ওর সাথে মিশবা না। গীতাও বলত বেবি খারাপ। দেইখ ও যেন আর তুমাদের বাসায় না আসে।
গলা ফাটে বাবার,–অরে আমি ত্যাজ্যা পুত্র করাম। আমার খাইয়া আমার পইরা আমাকে গলায় ছুরি বসাইল।
ফোঁপানো বন্ধ হয়ে এবার গলা চড়ছে মা’র–
শেষ পর্যন্ত একটা চাড়ালনিরে বিয়া করল!
খড়িউলার ঝিয়েরে বিয়া করল!
ওই হিন্দু খড়িউলা হইব এম বি বি এস ডাক্তারের বেয়াই!
অর মা মাসিরা রাস্তার কলপারো গিয়া গোসল করে। ছুটোলুকের জাত। কাউট্যা খাউরা জাত। মালাউনের জাত।
সমাজে মুখ দেহানো আর গেল না! মান ইজ্জত সব গেছে!
গুষ্ঠির মুহে চুনকালি দিল ছেলে!
একটা নর্তকীরে বিয়া করল, ছি ছি ছি।
এমন ছেলেরে ক্যান আমি জন্ম দিছিলাম!
মা’র বিলাপ ক্লান্তি হীন ঢেউ, সংসার সমুদ্রে। এমন বিপর্যয় এ সংসারে ঘটেনি আর। নানি নানা রুনু খালা হাশেম মামাকে ডেকে পাঠান বাবা। ঢাকা থেকে বড় মামা আসেন, ঝুনু খালা আসেন, দাদা আসেন। সকলে বিষম উদ্বিগ্ন, ঘরে মূল্যবান বৈঠক চলছে, ওতে ছোটদের, আমার আর ইয়াসমিনের উঁকি দেওয়া মানা। মধ্যরাত অবদি কথাবার্তা চলে, স্বর এত নিচে নামিয়ে কথা বলেন ওঁরা যে আমি কান পেতে থেকেও কিছু বুঝে উঠতে পারি না। শিমুল তুলোর মত ওড়ে দু’একটি শব্দ, ঠিক অনুমান করতে পারি না, হাওয়া কোন দিকে বইছে।
