নতুন ইস্কুলে আবার টিফিন নিজেদের নিয়ে আসার নিয়ম। বাবা প্রতিরাতে চাক চাক করে কাটা বড় ফ্রুট কেক নিয়ে আসেন বাড়িতে, ইস্কুলের টিফিন। টিফিন নিয়ে আসি ঠিকই, খেতে ইচ্ছে করে না। তার চেয়ে মনে হয় পুরোনো ছেঁড়া জুতো বেচে যে কটকটি পাওয়া যায়, খেতে আরাম হত। স্বাদ বদলাতে ইচ্ছে করে আমার। ফ্রুট কেক জগতে সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার বলে বাবা বিশ্বাস করতে পারেন, আমি করি না। অন্তত এইটুকু স্বাধীনতা আমার তো আছে, এ জিনিস আমার পছন্দ না করার এবং না খাওয়ার। সেদিন, টিফিন টিফিনের মত ফেলে রেখে বারান্দার রেলিং ধরে একা দাঁড়িয়ে ছিলাম, সামনে দেখার কিছু ছিল না পচা ডোবা বুজে মাঠ-মত বানানো ঊষড় জমি ছাড়া, আমাকে বিষম চমকে দিয়ে পিঠে হাত রেখেছিল রুনি। রুনিকে দেখে পেছোতে থাকি একপা দু’পা করে। ও আমার বেশি কাছে এলে যদি বুকের ধুকপুক আর রোমকূপের রিনরিন শুনে ফেলে, তাই পেঁছোই। রুনি পা পা করে সামনে এগোতে এগোতে বলতে থাকে, তেমনই মিষ্টি হেসে, আমি এখন এ ইস্কুলের টিচার্স কোয়ার্টারে থাকব। কী মজা তাই না! রেবেকা আপাকে চেনো? ইস্কুলের ডাক্তার। সে আমার বড় বোন।
আমি একটি নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে রুনিকে দু’চোখ ভরে দেখতে থাকি। রেবেকা আপাকে আমি চিনি কি চিনি না তার উত্তর দিতে ভুলে যাই। আমাকে মূক করে ফেলে ধূমকেতুর মত রুনির পতন আমার নিঃসঙ্গ আঙিনায়। ভালবাসা, ভাবি, খুব গভীর হলেই সম্ভবত পারে কাংখিত মানুষকে চোখের সামনে এনে দাঁড় করাতে। রুনি আমার দিকে এগোতে থাকে হাত বাড়িয়ে, পেছোতে পেছোতে আমি দেয়ালে সেঁটে যাই।
— এই এত লজ্জা কেন তোমার! বলে সে কাঁধে হাত রাখে আমার। শরীরের ভেতর জাগে সেই অদ্ভুত শিহরণ, আমি যার অনুবাদ জানি না। দ্রুত শ্বাস পড়ে আমার, এত দ্রুত যে শ্বাস আড়াল করতে আমি দু’হাতে মুখ ঢাকি।
— বনভোজনে যাবে না? ইস্কুল থেকে সবাইকে বনভোজনে নিচ্ছে ধনবাড়ির জমিদার বাড়িতে। আমি যাব। সেই কতদূরে ধনবাড়ি। আমার খুব দূরে যেতে ইচ্ছে করে। রুনির দু’চোখে অল্প অল্প করে চোখ রাখি, দু’চোখে তার আকাশের সবটুকু নীল। ইচ্ছে করে পাখা মেলে উড়ি। রুনির নিটোল শরীর হেসে ওঠে আমার আধফোটা চোখে চেয়ে। এমন করে হাসতে পারে রুনি ছাড়া আর কে! রুনিকে আমি ভালবাসতেই পারি, ওকে যে কেউ যে কোনও দূরত্ব থেকে ভালবাসতে পারে। কিন্তু আমার প্রতি ওর ভালবাসা, জানি না এর নাম ভালবাসা কি না, সম্ভবত স্নেহ অথবা একধরনের প্রশ্রয় আমাকে বড় অপ্রতিভ করে। ও আমাকে যত কাছে টানে, তত আমি ক্ষুদ্র হতে থাকি। মহিরূহ যদি কোনও তুচ্ছ তৃণের দিকে ঝুঁকে থাকে, তবে তৃণ যে তৃণই তা বিষম প্রকট হয়ে ওঠে! আমি নিজের কোনও অস্তিত্ব অনুভব করি না রুনি যখন আমাকে ভালবাসে, বুঝি।
গাঢ় অমাবস্যায় যদি হঠাৎ চাঁদ উঠে জ্যোৎস্নায় ভিজেয়ে ফেলে চারদিক আর সেই জ্যোৎস্না যদি আমাকে ভাসিয়ে নেয় দোলন চাঁপার বাগানে, তবে! রুনি চলে যাওয়ার পরও আমি দাঁড়িয়েই থাকি সেখানে, যেন এটিই আমার একমাত্র গন্তব্য যেখানে পৌঁছব বলে স্বপ্ন দেখছি সহস্র বছর। হঠাৎ নতুন ইস্কুলের মরা গাছপালাকেও বড় জীবন্ত মনে হয়। ইস্কুলের দালানগুলোকে বড় প্রাণবান মনে হয়। ধুলো ওড়ানো হু হু হাওয়াকেও মনে হয় চমৎকার দখিনা বাতাস। ধুসর মাটিও রুনির পা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবুজ হয়ে উঠেছে। ইচ্ছে করে খালি পায়ে দৌড়ে যাই ঘাসে।
বনভোজনে যেতে হলে দশ টাকা চাঁদা দিতে হবে ইস্কুলে। বাবার কাছে দশ টাকা চাইলে শান্ত কণ্ঠে বললেন–যাওয়ার দরকার নাই।
এও কি হয়! আমি বলি–যাইতেই হইব।
বাবা খেঁকিয়ে ওঠেন–যাইতেই হইব! কে তরে জোর করবে! বনভোজন কি কোনও সাবজেক্ট? না গেলে নম্বর কম ওঠে!
বাবা টাকা দিলেন না।
এদিকে ইস্কুলে মেয়েরা বনভোজনে যাওয়ার খুশিতে বুঁদ হয়ে আছে। আমি কেবল একা আহত পাখির মত তড়পাচ্ছি। আমাকে বাঁচায় আয়শা নামের এক মেয়ে, বলে তুমার টাকা না থাকলে আমার কাছ থেইকা কর্জ নেও। সে দিব্যি দশ টাকা কর্জ দিয়ে দিল। বনভোজনে যাওয়ার লিস্টিতে নাম উঠল আমার। ভোরবেলা ট্রাকে করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল ধনবাড়ি। রুনি বসেছিল মাস্টারদের আর বড় ক্লাসের মেয়েদের সঙ্গে বাসে। বড় বড় ডেকচি পাতিল, চাল ডাল, থালবাসন বাসের ছাদে তুলে মাইকে গান বাজিয়ে রওনা হয়ে গেল আমাদের যন্ত্রযান। ধনবাড়িতে রুনির সৌন্দর্য আমি দূর থেকে দেখি, ও বামে গেলে আমি ডানে ফিরি, ও ডানে গেলে আমি বামে। ও চোখের আড়াল হলে আমি অস্থির হয়ে খুঁজি ওকে। ওকে দৃষ্টির নাগালে রেখে আমি বসে থাকি চুপচাপ গাছের ছায়ায় কিম্বা সিঁড়িতে, একা। বনভোজন থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধে পার হয়ে যায়, বাড়ি ফিরে দেখি বাবা দাঁড়িয়ে আছেন বারান্দায় আমার অপেক্ষায়।
— এত দেরি হইল ক্যান ইস্কুল থেইকা ফিরতে? বাবা খপ করে ধরলেন আমাকে।
নখ খুঁটতে খুঁটতে জবাব দিলাম–বনভোজনে গেছিলাম।
বাবা টেনে আমাকে উঠোনে নিয়ে কাঁঠাল গাছের ডাল ভেঙে এনে পেটান। বাবা মা পেটালে পিঠ পেতে রাখতে হয়, এরকমই নিয়ম। পিঠ পেতে রাখি আমি। মনের ঝাল মিটিয়ে পিটিয়ে বাবা জিজ্ঞেস করেন–টেকা কেডা দিছে বনভোজনে যাওয়ার? স্বর ফুটতে চায় না গলায়, তবু বলি, যেহেতু বাবা মা কোনও প্রশ্ন করলে উত্তর দিতেই হয়, যে ক্লাসের এক মেয়ে কর্জ দিছে।
