বাবা এবার জোরে এক থাপ্পড় কষান গালে। কর্জ কইরা বনভোজন করস। এত শখ ক্যান? তর শখ আমি পুটকি দিয়া বাইর করাম।
পরদিন সকালে বাবা বেরিয়ে যাওয়ার আগে ইস্কুলে যাওয়া আসার রিক্সা ভাড়ার জন্য বরাদ্দ এক টাকার সঙ্গে দশ টাকার একটি নোট ছুঁড়ে দিয়ে বলেন–এরপর থেইকা যদি কথা না শুনস, যেইভাবে কই সেইভাবে না চলস, তাইলে তর পিঠে উঠানে যত খড়ি আছে, সব ভাঙবাম।
বনভোজন পার হওয়ার পর, রব ওঠে ইস্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে, যে যা জানে নাচ, গান, আবৃত্তি তাই নিয়ে মঞ্চে দাঁড়াতে হবে। কমন রুমে হারমোনিয়াম বাজিয়ে মেয়েরা গান মকশো করে। রবীন্দ্রনাথের পূজারিণী কবিতার ওপর ছোট একটা নাটকমতও। আজি ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায় লুকোচুরি খেলা গানটির সঙ্গে সঙ্গে নাচ আর চকখড়িতে ধানের ক্ষেত, শাদা মেঘের ছবি আঁকার আয়োজন হয়। এসব দেখতে দেখতে একটি হাওয়াইন গিটার হাতের কাছে পেয়ে এক ফাঁকে ছোটদার গানের খাতা দেখে গোপনে শেখা ‘এত সুর আর এত গান যদি কোনওদিন থেমে যায়, সেইদিন তুমিও তো ওগো, জানি ভুলে যাবে যে আমায়’ বাজিয়ে বসি। শুনে মেয়েরা ধরল অনুষ্ঠানে আমাকে গিটার বাজাতে হবে। বাজাতেই হল। আঙুল কাঁপছিল, পা কাঁপছিল, ওই কাঁপাকাঁপির মধ্যেই যেটুকু বেরিয়ে এল তাতে শুনেছি, অনেকে বলেছে বাহ। নতুন ইস্কুলে ততদিনে ভাল ছাত্রী বলে আমার বেশ নাম হয়েছে। ড্রইং ক্লাসে আমাকে বলা হয় জিনিয়াস, ইংরেজি ক্লাসে বলা হয়, এক্সেলেন্ট, এক্সেলেন্ট রচনা নাকি লিখেছি ভর্তি পরীক্ষায়। বাংলার মাস্টার বলেন–তুমি তো দেখছি কবি হে।
ইস্কুলে সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর শুরু হল গার্লস গাইডে মেয়ে নেওয়া। শারীরিক কসরত শুরু হল। গলায় ড্রাম বেঁধে ড্রাম বাজানো শিখছি। সার্কিট হাউজের মাঠে বিজয় দিবসে গার্লস হাইডের দল গিয়ে কাঠি নাচ নেচে এলাম। যা কিছুই করি, মুখ থাকে নিচু, চোখ লজ্জায় আনত। নাচের মাস্টার যোগেশ চন্দ্র আসেন ইস্কুলে মেয়েদের নৃত্যনাট্য শেখাতে, রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা। লজ্জাবতী লতাকে খপ করে ধরে বলেন–এই, চিত্রাঙ্গদা হবি? লজ্জাবতী যোগেশ চন্দ্রের ঠ্যাংএর ফাঁক গলে পালায়। চিত্রাঙ্গদার মহড়া শুরু হয়। মহড়া দেখে উত্তেজিত আমি বাড়ি ফিরে ইয়াসমিনকে সখী বানিয়ে বাড়ির মাঠ জুড়ে নেচে নেচে গাই গুরু গুরু গুরু গুরু ঘন মেঘ গরজে, পর্বত শিখরে অরণ্যে তমস ছায়ায়। আমিই হই চিত্রাঙ্গদা, আমিই হই অর্জুন, মদন। ইস্কুলে মহড়া চলে, আর বাড়িতে চলে আমার মঞ্চায়ন। দর্শকের সারিতে মা, মণি, দাদা, ছোটদা, পপি।
১১. প্রেম
ছোটদা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার পর বাড়িতে আবদার করলেন আনন্দ মোহন কলেজে বেবি নাম, নেত্রকোণা বাড়ি, তাঁর এক সহপাঠী মেয়েকে এ বাড়িতে থাকতে দেওয়া হোক, যেহেতু বেবির থাকার জন্য কোনও ভাল জায়গা নেই। ছোটদার আবদার মঞ্জুর হল। বেবি সুটকেস নিয়ে উঠল অবকাশে, আমার বিছানায় শোবার জায়গা হল তার। টেবিল চেয়ার দেওয়া হল তাকে পড়াশুনা করার। বেবি, দেখতে লম্বা, শ্যামলা, চমৎকার মায়াবি চোখ, দু’দিনেই খাতির জমিয়ে ফেলল বাড়ির সবার সঙ্গে। আত্মীয় স্বজনের বাইরে কারও মুখ দেখে ঘুমোতে যাওয়ার, বা ঘুম থেকে ওঠার আমার সুযোগ ঘটেনি এর আগে। বাইরের জগত থেকে আমাদের সংসারে একটি জলজ্যান্ত মানুষের প্রবেশ ঢেউ তোলে আমার নিস্তরঙ্গ জীবনে। বেবি যখন গল্প করে তার বোন মঞ্জুরি কী করে গাছের মগডাল থেকে পড়ে গিয়ে পা ভেঙেছিল, সে ই বা কী করে একা একা নেত্রকোণা থেকে চলে এল ময়মনসিংহে লেখাপড়া করতে, কী করে তার পাগল এক ভাই কংসের জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকত সারাদিন, একদিন তাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি–কংস হয়ে দাঁড়ায় আমারই নদী, ব্রহ্মপুত্র যেমন। মঞ্জুরিকে মনে হয় আমার জন্ম জন্ম চেনা। মা’র সঙ্গে চুলোর পাড়ে বসে বেবি গল্প করে কী করে তার পাগল ভাইটিকে আর খুঁজে না পাওয়ার পর মা তার নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়ে বিছানায় পড়ল, শুকিয়ে পাতাকাঠির মত হয়ে বেবিকে বলল তাকে পুকুরে নিয়ে স্নান করিয়ে আনতে, বেবি তাই করল, পুকুর থেকে নেয়ে এসে শাদা একটি শাড়ি পরে বেবির মা শুল, সেই শোয়াই তার শেষ শোয়া। মা গল্প শুনে আহা আহা করে বলেন তুমি হইলা আমার মেয়ে। আমার এখন তিন মেয়ে।
বাবা বাড়ি ফিরে বেবিকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, পড়াশুনা কেমন চলছে? ফার্স্ট ডিভিশন পাইবা ত!
বেবি মাথা নুয়ে বলে–জী খালুজান, আশা রাখি।
সাড়ে তিন মাস পর বেবিকে অবশ্য পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যেতে হল। কারণ মা হঠাৎ এক দুপুরে আবিষ্কার করেছিলেন ছোটদা বিছানায় শুয়ে আছেন, খাটের কিনারে বসে ছোটদার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে বেবি। মা ফেটে পড়লেন বেবি, এত শয়তানি তুমার মনে মনে ছিল! আমারে বুঝাইছ তুমাদের ভাই বোনের সম্পর্ক। দুধ কলা দিয়া কালসাপ পুষতাছি আমি। আমার ছেলের সাথে ফস্টি নস্টি করার উদ্দেশ্য তুমার! এত বড় সাহস!
বেবি কেঁদে পড়ল মা’র পায়ে। ছোটদার মাথা ধরেছিল বলে বেবি কেবল স্পর্শ করেছিল কপালে, এই যা। আর কোনওদিন এমন ভুল হবে না বলে সে জোড় হাতে ক্ষমা চাইল। মা ক্ষমা করার মানুষ নন। বলে দেন, মন যখন ভাঙে মা’র, একেবারেই ভাঙে। বেবির চলে যাওয়াতে বাড়িতে সবচেয়ে যে মানুষটি নির্বিকার ছিলেন, তিনি ছোটদা।
