আমি শ্বাস বন্ধ করে রাখি। বাবা তাঁর খড়খড়ে গাল আমার গালে ঘসে বলেন– তুমার যে মেধা আছে তা আমি জানি মা। তুমাকে পড়াতে গিয়া সেইটা বুঝছি। বল ত মা, মাই ফাদার হ্যাজ বিন ক্রাইং ফর মোর দেন টু আওয়ারস কি টেনস?
— প্রেজেন্ট পারফেক্ট কনটিনিউয়াস। মিনমিন করে বলি।
— এই তো আমার লক্ষ্মী মা, এই তো সব পারে আমার মা।
বাবা আমার পিঠে হাত বোলান, বেতে-কাটা ঘাএ স্পর্শ রেগে যন্ত্রণায় ধনুকের মত বেঁকে ওঠে পিঠ। তবু অসাড় শুয়ে থাকি। বাবার জন্য হঠাৎ আমার মায়া হতে শুরু করে।
হাসপাতাল থেকে বাবা সুস্থ হয়ে ফিরে এলে মাছের বাজারে নেমে আসে মাঝরাতের ঠান্ডা স্তব্ধতা। আমার জীবনেও। আমাকে ইস্কুল বদলাতে হবে। বিদ্যাময়ী ভাল ইস্কুল, এতে কোনও দ্বিমত নেই বাবার, কিন্তু আরও একটি ভাল ইস্কুল খুলেছে, রেসিডেনসিয়াল মডেল ইস্কুল, ওতে আমাকে পড়তে হবে। ততদিনে বিদ্যাময়ীতে আমার বান্ধবী বেড়েছে, রুনির সঙ্গে আমার গোপন আত্মীয়তা হয়েছে, আর আমাকে কি না সবার মধ্য থেকে বলা নেই কওয়া নেই, বাজপাখি এসে ঝাঁ করে তুলে নিয়ে যাবে! বলি, উদ্বাস্তু হওয়ার আগে মাটি আঁকড়ে ধরার মত–আমি বিদ্যাময়ী ছাইড়া কুথাও পড়তে চাই না।
বাবা ধমকে বলেন–তুই চাওয়ার কে? আমি চাই তরে মডেলে পড়াইতে।
আমি ফুঁপিয়ে বলি–বিদ্যাময়ী ভাল ইস্কুল।
বাবা কেশে বলেন–মডেল আরও ভাল।
যত সাহস আছে শরীরে, সবটুকু ঢেলে, চোখ শক্ত করে বুজে, দাঁতে দাঁত চেপে বলি — আমি অন্য ইস্কুলে পড়ব না।
বাবা আয়নার সামনে গলায় টাই বাঁধতে বাঁধতে বলেন–তুই পড়বি, তর ঘাড়ে পড়বে।
নতুন ইস্কুলের ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রে এইম ইন লাইফ বলে একটি রচনা লিখতে বলা হয়েছিল। ওই একটি কাজই পরীক্ষার খাতা জুড়ে করি, রচনা লিখি, লিখতে লিখতে লক্ষ করি ইংরেজি ভাষাটি কড়া কথা বলার জন্য, রাগ করার জন্য, গাল দেবার জন্য বেশ চমৎকার। ঝড়ের মত আবেগ নামে বাংলায়, মায়ামমতা বুকের দরজা খুলে হুড়মুড় বেরিয়ে আসে বাংলায় তাই ভাষাটিকে অন্তত সেদিনের জন্য এড়িয়ে চলি। আমি স্পষ্ট জানিয়ে দিই আমার জীবনের এইম নয় এই ইস্কুলে পড়া। ইস্কুলটি একটি ভূতুড়ে বাড়ির মত। আমি একটি ইস্কুলে পড়ছি, সেটি খুবই ভাল, এবং আমি সেটিতেই পড়তে চাই। আমার ইচ্ছের বাইরে বাবা আমাকে দিয়ে তাঁর যা ইচ্ছে তা করাতে চান, এ আমার সয় না। তিনি যদি চান আমাকে ব্রহ্মপুত্রে ভাসিয়ে দেবেন, তিনি দেবেন কারণ তিনি চেয়েছেন ভাসিয়ে দিতে। আমি ভাসতে চাই কি না চাই, তা তিনি পরোয়া করেন না। আমার জীবনটি কি আমার, না তাঁর? যদি আমার হয়, যা আসলে আমারই, তবে আপনাদের কাছে সর্নিবদ্ধ অনুরোধ, আমাকে এই ইস্কুলে ভর্তি করাবেন না। আমার জীবনের এত বড় ক্ষতি আপনারা করবেন না আমার বিশ্বাস।
প্রশ্নপত্রের আর কোনও প্রশ্নের দিকে ফিরে তাকাই না। বাবাকে বেশ জব্দ করা গেল বলে একধরনের সুখ হয় আমার।প রীক্ষার শেষ ঘন্টা পর্যন্ত খামোকা বসে থেকে যখন বেরিয়ে আসি, করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাবা, উড়ে এসে জিজ্ঞেস করেন–পরীক্ষা কেমন হইছে?
বলি, শুকনো মুখে–ভাল।
বাবা হেসে বলেন–সব প্রশ্নের উত্তর দিছ তো!
— হ। সুবোধ কন্যার মত মাথা নেড়ে বলি।
— খুব কড়াকড়ি। পরীক্ষা দিল দুইশ জন। নিবে মাত্র তিরিশ জন। বাবার কপাল ঘামে দুশ্চিন্তায়।
মিথ্যে কথা বলার অভ্যেস নেই, কিন্তু এই মিথ্যেটি আমি চোখ বুজে অনেকক্ষণ আওড়েছিলাম যেন চোখ কান নাক সব বন্ধ করে একবার বলে ফেলতে পারি কোনওরকম।
বাবা আমাকে সোজা নিয়ে গেলেন নতুন বাজারে বাবার ওষুধের দোকানে, দোকানের ভেতরে রোগী দেখার কোঠা তাঁর। অন্যের ফার্মেসিতে বসার দরকার হয় না বাবার আর, যুদ্ধের পর নানার দোকানের দু’কদম দূরে দোকান কিনে নাম দিয়েছেন, আরোগ্য বিতান। ভেতরে তাঁর গদির চেয়ারটিতে আমাকে বসিয়ে পোড়াবাড়ির চমচম কিনে এনে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে দিতে বললেন–ভাল কইরা লেখাপড়া করবা। প্রত্যেক ক্লাসে তুমার ফার্স্ট হওয়া চাই। আদা জল খাইয়া এহন থেইকা লাগো। বাবার স্বপ্ন যে ক’দিন পরেই মরা পাতার মত ঝরে পড়বে, তা তিনি না জানলেও আমি জানি। আমার এই জানা, মণিকে গভীর রাতে ন্যাংটো করার ঘটনার মত গোপন।
ক’দিন পর বাবা সুখবর আনলেন নতুন ইস্কুলের ভর্তি পরীক্ষায় আমি পাশ করেছি। মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। এ কী করে সম্ভব! হ্যাঁ, বাবা যা ইচ্ছে করেন, তাই সম্ভব হয়। অন্তত অন্য কোথাও না হলেও, আমার জীবনে। সেই প্রায় বিস্তীর্ণ মরুভূমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নির্জন নিরব ইস্কুল নামের বাড়িটিতে এনে বাবা বললেন ব্রহ্মপুত্রে তুমারে আমি ভাসাইয়া দিতে চাই না। তুমি আমার মেয়ে। আমার আত্মজা। আমি ছাড়া তুমার ভাল কেউ চায় না। ব্রহ্মপুত্রে যদি তুমি ডুবতে থাকো, তুমারে বাচাইয়া আনতে যদি কেউ ঝাঁপ দেয়, সে আমিই।
সারা ইস্কুলে হাতে গোণা ক’জন ছাত্রী মাত্র। পাঁচ ছ’জন মাস্টার। চোখের জল দু’হাতের তালুতে ঘন ঘন মুছে আমাকে বসতে হয় ক্লাসঘরে। ওদিকে বন্ধুরা বিদ্যাময়ীতে বিক্ষোভ করছে বাজ পাখির বিরুদ্ধে, যুদ্ধ-দেখা যুদ্ধংদেহি বন্ধুরা।
নতুন ইস্কুলে আমার মন বসে না। ইয়াসমিনেরও মন বসে না রাজবাড়ি ইস্কুলে। যুদ্ধের পর খিস্টান মিশনারিদের চালানো মরিয়ম ইস্কুল বন্ধ হয়ে গেলে ওকে রাজবাড়িতে ভর্তি করা হয়। টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার বা হামটি ডামটি স্যাট অন এ ওয়াল এর বদলে ওকে এখন পড়তে হয় তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে। ইস্কুলের মাদার ওকে কোলে নিয়ে আদর করত বলেই কিনা নাকি বেশিদিন এক জায়গায় কাটানোর পর একধরনের মমতা জন্মায় বলে ও ফাঁক পেলেই বিকেল বেলা বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা-পথ মরিয়ম ইস্কুল, গিয়ে তালা বন্ধ লোহার গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। ইস্কুলের দালান ফেটে বটগাছের চারা বেরোচ্ছে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ওর এত মমতা বাড়িটির জন্য, বাড়িটি ভাঙা হোক কি মলিন হোক; বাড়ির পাশের গাছটির জন্য, গাছের পাশে মাঠটির জন্য, মাঠের পাশে পুকুরটির জন্য, ইস্কুলের দোলনাটির জন্য ও এত মন খারাপ করে থাকে যে বাবা ওর জন্য বাড়ির মাঠে একটি দোলনা বসিয়ে দিলেন। দোলনায় দুলতে দুলতে ও চোখ বুজে, মনে নিয়ে এটি ওর পুরোনো ইস্কুলের মাঠ, গায়– হাউ আই ওয়ান্ডা হোয়াট ইউ আর। পেছনে আমি কি ফেলে এসেছি ভাবি। কোনও দোলনা বা দালানের জন্য আমার মন কেমন করে কি আদৌ! না। রুনির জন্য করে, টের পাই। কেবল রুনির জন্যই কি! না। রুনি অনেকটা ধ্রুবতারার মত, তীব্র আলো ওর, কিন্তু বড় দূরের। ওকে অবশ্য দূরেই থাকা মানায়। ধুলো কাদায় আমার সঙ্গে প্রতিদিনকার লুটোপুটিতে ওই রূপসীকে আমি টানি না। যাদের নাকে সর্দি, দাঁতে ময়লা, চুলে উকুন, তাদের সঙ্গে আমার অভ্যস্ত জীবনের জন্যও মন কেমন করে। অভ্যস্ত জীবন এমনই, যে, মানুষ, বিশেষ করে সে যদি অন্তর্মুখি হয়, বোধহয় ভয় পায় সে জীবন থেকে দূরে এসে আবার নতুন কিছুতে অভ্যস্ত হতে। তৃণের সঙ্গে তৃণের দৈনন্দিন প্রীতি গড়ে উঠতে সময় নেয় না হয়ত, কিন্তু, তৃণ বটে আমি, ভিন্ন জাতের তৃণ, কুঁকড়ে থাকা।
